পাতা:সাহিত্যের পথে - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১৯০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


》○● সাহিত্যের পথে বহুমূল্য হইযা উঠিতেছে, দেশের পক্ষে তাহা দুর্ভাগ্যের লক্ষণ। অর্থাৎ, বাংলাভাষা ও সাহিত্যের প্রতি এই কারণে বাঙালির মমত্ব বাড়িয়া চলিয়াছে— সাধারণ দেশহিতের উদ্দেশেও বাঙালি এই কারণে নিজের ভাষাকে ত্যাগ করিতে চাহিবে না। তাহার বিশ্বাস ছিল, ভারতের ঐক্যসাধনের উপাযস্থরূপে অন্য কোনো ভাষাকে আপন ভাষার পরিবর্তে বাঙালির গ্রহণ করা উচিত ছিল। দেশের ঐক্য ও মুক্তিকে যাহারা বাহিরের দিক হইতে দেখেন, তাহারা এমনি করিযাই ভাবেন । র্তাহারা এমনও মনে করিতে পারিতেন যে, দেশের লোকের বিভিন্ন দেহগুলিকে কোনো মন্ত্রবলে একটিমাত্র প্রকাও দৈত্যদেহ করিষা তুলিলে আমাদের ঐক্য পাকা হইবে, আমাদের শক্তির বিক্ষেপ ঘটিবে না। শু্যামদেশের জোডা যমজ যে দৈহিক শক্তির স্বাধীন প্রযোগে আমাদের চেযে জোর বেশি পায নাই, সে কথা বলা বাহুল্য। নিজের দেহকে তাহার নিজের স্বতন্ত্র জীবনীশক্তি-দ্বারা স্বাতন্ত্র্য দিতে পারিলেই, তবে অন্য দেহধারীর সঙ্গে আমাদের যোগ একটা বন্ধন হইযা উঠে না । বাংলাভাষাকে নির্বাসিত করিযা অন্ত যে-কোনো ভাষাকেই আমরা গ্রহণ করি না কেন, তাহাতে আমাদের মনের স্বাতন্ত্র্যকে দুর্বল করা হইবে। সেই দুর্বলতাই যে আমাদের পক্ষে রাষ্ট্ৰীয বললাভের প্রধান উপায হইতে পারে, এ কথা একেবারেই অশ্রদ্ধেয। যেখানে আমাদের আত্মপ্রকাশ বাধাহীন সেখানেই আমাদের মুক্তি। বাঙালির চিত্তের আত্মপ্রকাশ একমাত্র বাংলাভাষায, এ কথা বলাই বাহুল্য। কোনো বাহিক উদ্দেশ্যের খাতিরে সেই আত্মপ্রকাশের বাহনকে বর্জন করা, আর মাংস সিদ্ধ করার জন্য ঘরে আগুন দেওয, একই-জাতীয মুঢ়ত । বাংলাসাহিত্যের ভিতর দিয বাঙালির মন যতই বড়ো হইবে, ভারতের অন্ত জাতির সঙ্গে মিলন তাহার পক্ষে ততই সহজ হইবে । আপনাকে ভালো করিযা প্রকাশ করিতে না পারার দ্বারাই মনের পঙ্গুত, মনের অপরিণতি ঘটে ;