পাতা:সাহিত্যের পথে - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৫৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রূপশিল্প [ 55 বলেছেন। আমারও কিছু বলবার আছে। এক জায়গায় তিনি বলেছেন “দশ-বারো শতকের প্রাচীন পারস্তাদেশের নিত্যব্যবহারের পানপাত্রগুলি ঐ একই সুরে বাধা ’ এখানে সুর শব্দের তিনি প্রয়োগ করেছেন অনির্বচনীয়তাকে বোঝাতে । সুর অনির্বচনীয়ের প্রধান বাহন। কিন্তু মানুষ কেবল যে ব্যবহার্য সামগ্রীর সঙ্গেই অনির্বচনীয়কে প্রকাশ করতে চেয়েছে তা নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যাকুল হয়ে চেয়েছে আপন সুখদুঃখ ভালোবাসার সহযোগে । অর্থাৎ যে-সব শব্দ তার হৃদয়াবেগের সংবাদমাত্র দেয়, শিল্পকলার দ্বারা তার মধ্যে সে অসীমের ব্যঞ্জনা আনতে চায়। আদিকাল থেকেই মানুষ তাই শব্দের সঙ্গে সুরকে মিলিয়ে গান গেয়েছে। এ কথা মানি শব্দের নিজেরই একটা শিল্প আছে, ছন্দ তার প্রধান অঙ্গ। কিন্তু ছন্দ তার একলার নয়, গানেরও বটে। এ ছাড়া কাব্যের আছে বিশেষ ভাবে শব্দ-যোজনা ও শব্দ-বাছাই । তা হোক, তবু দেখা গেছে, মানুষ যেমন চেয়েছে কাব্যকে তেমনি চেয়েছে গানকে। জানি নে ইতিহাসে কবে মানুষের ভাষা এমন অনাথ ছিল যখন সুর তাকে অবজ্ঞা করে তাকে পর বলে বর্জন করেছে। আমার তো মনে হয়, এই সম্বন্ধের মধ্যে যেটুকু পরত্ব আছে তাতে পরকীয়া প্রতি বাড়ে বই কমে না । প্রিয়জনকে এ কথা বলবার বেদন মনে সহজেই জাগে যে, ‘ভালোবাসিবে বলে ভালোবাসি নে” । ভাষা যদি নিজেই স্বীকার করে বাক্যটাতে সবটা বলা হল না, সে অবস্থায় ভৈরবীর সঙ্গে সে মিতালি করলে ওস্তাদরা কি বলবেন অসবর্ণ মিলনে সংগীতের জাত গেল ? অপর পক্ষে নির্বাকৃ ভৈরবী একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট আবেগ প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু ঠিক ঐ কাব্যের কথাটি বলতে গেলে সে বোবা । অথচ বলতে গেলে যেমন দরকার কথার তেমনি দরকার সুরেরও । তা হলে কি হুকুম হবে দরকারটাকেই সমূলে উচ্ছেদ করা চাই ? মাহষ কি এ হুকুম মানবে ?