বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:সুকুমার রায় রচনাবলী-দ্বিতীয় খণ্ড.djvu/৩৯১

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

অমনটি আর কোথাও খেলাম না। ঠিক যেন চিনির পানা, ঠিক যেন কেওড়া-দেওয়া শরবৎ।

 পথিক। তা মশাই আপনার জল আপনি মাথায় করে রাখুন—আপাতত এখন এই তেষ্টার সময় যাহয় একটু জল আমার গলায় পড়লেই চলবে—

 বৃদ্ধ। তা হলে বাপ তোমার গাঁয়ে বসে জল খেলেই তো পারতে? পাঁচ ক্রোশ পথ হেঁটে জল খেতে আসবার দরকার কি ছিল? ‘যা হয় একটা হলেই হল’ ও আবার কিরকম কথা? আর অমন তাচ্ছিল্য করে বলবারই-বা দরকার কি? আমাদের জল পছন্দ না হয় খেও না- ব্যস। গায়ে পড়ে নিন্দে করবার দরকার কি? আমি ওরকম ভালোবাসি নে। হ্যাঁঃ—

[ রাগে গজগজ করিতে করিতে বৃদ্ধের প্রস্থান

পাশের এক বাড়ির জানলা খুলিয়া আর এক বৃদ্ধের হাসিমুখে বাহির করণ

 বৃদ্ধ। কি হে! এত তর্কাতকি কিসের?

 পথিক। আজ্ঞে না, তর্ক নয়। আমি জল চাইছিলুম, তা উনি সে কথা কানেই নেন না—কেবলই সাত-পাঁচ গপ্‌পো করতে লেগেছেন। তাই বলতে গেলুম তো রেগে-মেগে অস্থির!

 বৃদ্ধ। আরে দূর দূর। তুমিও যেমন! জিগ্‌গেস করবার আর লোক পাও নি? ও হতভাগা জানেই-বা কি, আর বলবেই-বা কি? ওর যে দাদা আছে, খালিপুরে চাকরি করে, সেটা তো একটা আস্ত গাধা। ও মুখ্যুটা কি বললে তোমায়?

 পথিক। কি জানি মশাই—জলের কথা বলতেই কুয়োর জল, নদীর জল, পুকুরের জল, কলের জল, মামাবাড়ির জল, বলে পাঁচরকম ফর্দ শুনিয়ে দিলে-

 বৃদ্ধ। হুঃ—ভাবলে খুব বাহাদুরি করেছি। তোমায় বোকা মতন দেখে খুব চাল চেলে নিয়েছে। ভারি তো ফর্দ করেছেন। আমি লিখে দিতে পারি, ও যদি পাঁচটা জল বলে থাকে তা আমি এক্ষুনি পঁচিশটা বলে দেব—

 পথিক। আজ্ঞে হ্যাঁ! কিন্তু আমি বলছিলুম কি একটু খাবার জল—

 বৃদ্ধ। কি বলছ? বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা শুনে যাও। বিষ্টির জল, ডাবের জল, নাকের জল, চোখের জল, জিভের জল, হুঁকোর জল, শান্তি জল, ফটিক জল, রোদে ঘেমে জ—ল, আহ্‌লাদে গলে জ—ল, গায়ের রক্ত জ—ল, বুঝিয়ে দিল যেন জ–ল —কটা হল? গোনো নি বুঝি?

 পথিক। না মশাই, গুনি নি—আমার আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই—

 বৃদ্ধ। তোমার কাজ না থাকলেও আমার কাজ থাকতে পারে তো? যাও, যাও, মেলা বকিও না—একেবারে অপদার্থের একশেষ!

বৃদ্ধের সশব্দে জানলা বন্ধ করণ

 পথিক। নাঃ, আর জল-টল চেয়ে কাজ নেই—এগিয়ে যাই, দেখি কোথাও পুকুর-টুকুর পাই কি না।

লম্বা-লম্বা চুল, চোখে সোনার চশমা, হাতে খাতা-পেন্সিল, পায়ে কটকী জুতো, একটি ছোকরার প্রবেশ

লোকটা নেহাত এসে পড়েছে যখন একটু জিজ্ঞাসাই করে দেখি। মশাই, আমি অনেক দূর থেকে আসছি, এখানে একটু জল মিলবে-না কোথাও?

 ছোকরা। কি বলছেন? ‘জল’ মিলবে না? খুব মিলবে। একশোবার মিলবে। দাঁড়ান এক্ষুনি মিলিয়ে দিচ্ছি—জল চল তল বল কল ফল—মিলের অভাব কি? কাজল-সজল-উজ্জ্বল-জ্বলজ্বল—চঞ্চল চল চল, আঁখিজল ছলছল, নদীজল কলকল, হাসি শুনে খলখল, অ্যাঁকানল, ব্যাঁকানল, আগল ছাগল পাগল—কত চান?

 পথিক। এ দেখি আরেক পাগল! মশাই আমি সেরকম মিলবার কথা বলি নি।

 ছোকরা। তবে কোনরকম মিল চাচ্ছেন বলুন? কিরকম, কোন ছন্দ, সব বলে দিন—যেমনটি চাইবেন তেমনটি করে মিলিয়ে দেব।

 পথিক। ভালো বিপদেই পড়া গেল দেখছি—(জোরে) মশাই! আর কিছু চাই নে, (আরো জোরে) শুধু একটু জল খেতে চাই!

 ছোকরা। ও, বুঝেছি। শুধু—একটু —জল—খেতে—চাই। এই তো? আচ্ছা বেশ। এ আর মিলবে না কেন?—শুধু একটু জল খেতে চাই—ভারি তেষ্টা প্রাণ আই-ঢাই। চাই কিন্তু কোথা গেলে পাই–বল্ শীঘ্র বল্ নারে ভাই। কেমন ঠিক মিলছে তো?

 পথিক। আজ্ঞে হ্যাঁ, খুব মিলছে-খাসা মিলছে-নমস্কার। (সরিয়া গিয়া) নাঃ বকে বকে মাথা ধরিয়ে দিলে—একটু ছায়ায় বসে মাথাটা ঠাণ্ডা করে নিই পথিক একটা বাড়ির ছায়ায় গিয়া বসিল

 ছোকরা। (খুশি হইয়া লিখিতে-লিখিতে) মিলিবে না? বলি, মেলাচ্ছে কে? সেবার যখন বিষ্টুদা 'বৈকাল' কিসের সঙ্গে মিল দেবে খুঁজে পাচ্ছিল না, তখন ‘নৈপাল' বলে দিয়েছিল কে? নৈপাল কাকে বলে জানেন তো? নেপালের লোক হল নৈপাল (পথিককে না দেখিয়া) লোকটা গেল কোথায়? দুত্তেরি!

[ ছোকরার প্রস্থান

নেপথ্যে বাড়ির ভিতরে বালকের পাঠ—
পৃথিবীর তিন ভাগ জল এক ভাগ স্থল
সমুদ্রের জল, লবণাক্ত, অতি বিস্বাদ।

৩৮৬
সুকুমার সমগ্র রচনাবলী : ২