পাতা:সুকুমার রায় রচনাবলী-দ্বিতীয় খন্ড.djvu/১৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

কাক বলল, “তুমি যখন বলেছিলে, তখনো পুরো চোদ্দো হয় নি। তখন ছিল, তেরো টাকা চোদ্দো আনা তিন পাই। আমি যদি ঠিক সময় বুঝে ধাঁ করে ১৪ লিখে না ফেলতাম, তা হলে এতক্ষণে হয়ে যেত চোদ্দো টাকা এক আনা নয় পাই।”

আমি বললাম, “এমন আনাড়ি কথা তো কখনো শুনি নি। সাত দুগুণে যদি চোদ্দো হয়, তা সে সব সময়েই চোদ্দো। একঘণ্টা আগে হলেও যা, দশদিন পরে হলেও তাই।”

কাকটা ভারি অবাক হয়ে বলল, “তোমাদের দেশে সময়ের দাম নেই বুঝি?”

আমি বললাম, “সময়ের দাম কিরকম?”

কাক বলল, “এখানে কদিন থাকতে, তা হলে বুঝতে। আমাদের বাজারে সময় এখন ভয়ানক মাগ্যি, এতটুকু বাজে খরচ করবার জো নেই। এই তো কদিন খেটেখুটে চুরিচামারি করে খানিকটে সময় জমিয়েছিলাম, তাও তোমার সঙ্গে তর্ক করতে অর্ধেক খরচ হয়ে গেল।” বলে সে আবার হিসেব করতে লাগল। আমি অপ্রস্তুত হয়ে বসে রইলাম।

এমন সময়ে হঠাৎ গাছের একটা ফোকর থেকে কি যেন একটা সুড়ৎ করে পিছলিয়ে মাটিতে নামল। চেয়ে দেখি, দেড় হাত লম্বা এক বুড়ো, তার পা পর্যন্ত সবুজ রঙের দাড়ি, হাতে একটা হুঁকো তাতে কলকে-টলকে কিচ্ছু নেই, আর মাথা ভরা টাক। টাকের উপর খড়ি দিয়ে কে যেন কি-সব লিখেছে।

বুড়ো এসেই খুব ব্যস্ত হয়ে হুঁকোতে দু-এক টান দিয়েই জিজ্ঞাসা করল, “কই হিসেবটা হল?”

কাক খানিক এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, “এই হল বলে।”

বুড়ো বলল, “কি আশ্চর্য। উনিশ দিন পার হয়ে গেল, এখনো হিসেবটা হয়ে উঠল না?” সুকুমার রায় রচনাবলী-দ্বিতীয় খন্ড ১৫.png

কাক দু-চার মিনিট খুব গম্ভীর হয়ে পেনসিল চুষল তার পর জিজ্ঞাসা করল, “কতদিন বললে?”

বুড়ো বলল, “উনিশ।”

কাক আমনি গলা উঁচিয়ে হেঁকে বলল, “লাগ্‌ লাগ্‌ লাগ্‌ কুড়ি।”

বুড়ো বলল, “একুশ।” কাক বলল, “বাইশ” বুড়ো বলল, “তেইশ।” কাক বলল, “সাড়ে তেইশ।” ঠিক যেন নিলেম ডাকছে।

ডাকতে-ডাকতে কাকটা হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি ডাকছ না যে?”

আমি বললাম, “খামকা ডাকতে যাব কেন?”

বুড়ো এতক্ষণ আমায় দেখে নি, হঠাৎ আমার আওয়াজ শুনেই সে বন্‌বন্‌ করে আট দশ পাক ঘুরে আমার দিকে ফিরে দাঁড়াল।

১২
সুকুমার সমগ্ন রচনাবলী: ২