পাতা:সুকুমার রায় রচনাবলী-দ্বিতীয় খন্ড.djvu/১৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

কাক বলল, “দেখেই বোঝা যাচ্ছে অঙ্কটা এল-সি-এম্‌ও নয়, জি-সি-এম্‌ও নয়। সুতরাং হয় এটা ত্রৈরাশিকের অঙ্ক, নাহয় ভগ্নাংশ। পরীক্ষা করে দেখলাম আড়াই সেরটা হচ্ছে ভগ্নাংশ। তা হলে বাকি তিনটে হল ত্রৈরাশিক। এখন আমার জানা দরকার, তোমরা ত্রৈরাশিক চাও, না ভগ্নাংশ চাও?”

বুড়ো বলল, “আচ্ছা দাঁড়াও, তা হলে একবার জিজ্ঞাসা করে নি।” এই বলে সে নিচু হয়ে গাছের গোড়ায় মুখ ঠেকিয়ে ডাকতে লাগল, “ওরে বুধো! বুধো রে!”

খানিক পরে মনে হল কে যেন গাছের ভিতর থেকে রেগে বলে উঠল, “কেন ডাকছিস?”

বুড়ো বলল, “কাক্কেশ্বর কি বলছে শোন্‌।”

আবার সেইরকম আওয়াজ হল, “কি বলছে?” বুড়ো বলল, “বলছে, ত্রৈরাশিক না ভগ্নাংশ?”

তেড়ে উত্তর হল, “কাকে বলছে ভগ্নাংশ? তোকে না আমাকে?”

বুড়ো বলল, “তা নয়। বলছে, হিসেবটা ভগ্নাংশ চাস, না ত্রৈরাশিক?”

একটুক্ষণ পরে জবাব শোনা গেল, “আচ্ছা, ত্রৈরাশিক দিতে বল।”

বুড়ো গম্ভীরভাবে খানিকক্ষণ দাড়ি হাতড়াল, তার পর মাথা নেড়ে বলল, “বুধোটার যেমন বুদ্ধি! ত্রৈরাশিক দিতে বলব কেন? ভগ্নাংশটা খারাপ হল কিসে? না হে কাক্কেশ্বর, তুমি ভগ্নাংশই দাও।”

কাক বলল, “তা হলে আড়াই সেরের গোটা সের দুটো বাদ গেলে রইল ভগ্নাংশ আধ সের, তোমার হিসেব হল আধ সের। আধ সের হিসেবের দাম পড়ে—খাঁটি হলে দুটাকা চোদ্দোআনা, আর জল মেশানো থাকলে ছয় পয়সা।”

বুড়ো বলল, “আমি যখন কাঁদছিলাম, তখন তিন ফোঁটা জল হিসেবের মধ্যে পড়েছিল। এই নাও তোমার শ্লেট, আর এই নাও পয়সা ছটা।”

পয়সা পেয়ে কাকের মহাফুর্তি। সে ‘টাক্‌-ডুমাড়ম্ টাক্‌-ডুমাড়ুম’ বলে শ্লেট বাজিয়ে নাচতে লাগল।

বুড়ো অমনি আবার তেড়ে উঠল, “ফের টাক-টাক বলছিস; দাঁড়া। ওরে বুধো বুধো রে। শিগ্‌গির আয়। আবার টাক বলছে।” বলতে-না-বলতেই গাছের ফোকর থেকে মস্ত একটা পোঁটলা মতন কি যেন হুড়্‌ মুড়্‌ করে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। চেয়ে দেখলাম, একটা বুড়ো লোক একটা প্রকান্ড বোঁচকার নীচে চাপা পড়ে ব্যস্ত হয়ে হাত-পা ছুড়ছে। বুড়োটা দেখতে অবিকল এই হুঁকোওয়ালা বুড়োর মতো। হুঁকোওয়ালা কোথায় তাকে টেনে তুলবে না সে নিজেই পোটলার উপর চড়ে বসে, “ওঠ বলছি, শিগ্‌গির ওঠ্‌” বলে ধাঁই-ধাঁই করে তাকে হুঁকো দিয়ে মারতে লাগল।

কাক আমার দিকে চোখ মট্‌কিয়ে বলল, “ব্যাপারটা বুঝতে পারছ না? উধোর বোঝা বুধের ঘাড়ে। এর বোঝা ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে, এখন ও আর বোঝা ছাড়তে চাইবে কেন? এই নিয়ে রোজ মারামারি হয়।”

এই কথা বলতে-বলতেই চেয়ে দেখি, বুধো তার পোঁটলাসুদ্ধ উঠে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়েই

১৬
সুকুমার সমগ্র রচনাবলী: ২