পাতা:সুকুমার রায় রচনাবলী-দ্বিতীয় খন্ড.djvu/৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


তবে অবনীন্দ্রনাথও শিশুর বইয়ের ছল করে মানুষের (সকলের। বই লিখেছেন'। শকুন্তলার ব্যাতিক্রম বাদ দিলে তার শিশুগ্ৰন্থ সর্বজনীন। এই নতুন পর্বের অগ্রপথিক সুকুমার রায়। আপন স্বাতন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছেন বাঙলা শিশুসাহিত্যে। পূর্বযুগের লক্ষণের কিছু কিছু আভাসের সন্ধান তার রচনায়ও ইতস্তত্ব পাওয়া যেতে পারে। যেমন উপেন্দ্র- কিশোরেও এই পরবর্তী যুগের কিছু কিছু আভাস লক্ষ্য করা যায়। যুগলক্ষণের দিক থেকে পিতা-পত্রের এই এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গার মধ্যিখানের চর হচ্ছে। অবন ঠাকুর -যিনি ছবি লেখেন'। কিন্তু পিতার সাহিত্যিক উত্তরাধিকারকে অতিশ্রম করে বাল্যবঙ্গে এক নতুন জোয়ার আনমেন অভিনব খেয়াল রসে'র স্রষ্টা সুকুমার রায়। বাঙলা শিশুসাহিত্যে এ এক নতুন বিদ্রোহ -যার একতম নায়ক সুকুমার রায়। ১০২১ সালের মাঘ মাসে বাল্যবঙ্গে এক প্রচণ্ড সাহিত্যিক বিস্ফোরণ ঘটালেন সুকুমার রায় - -সদেশে তার •আবােল তাবোল’ পর্যায়ের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হল ‘খিচুড়ি'। তার এই আবোল তাবােসের আজব দুনিয়ায় যে-সব উদ্ভট জীবজন্তুকে তিনি ছেড়ে দিলেন, তাদের দেখে সেদিনের কিশাের দুনিয়ায় যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল তা একালের গ্রহান্তরে যাত্রার বিষয়ের সঙ্গেও কি তুলনীয় ? বাঙলার কিশোর-পাঠকদের কাছে তখনাে লিয়রের ছড়ার বিচিত্র জগত বা ক্যারলের অ্যালিস-এর স্বপ্নরাজ্য তত পরিচিত নয়। কিন্তু তাদের সেজন্য আপসোস করার ক্ষতি সুদে-আসলে পূরণ করে দিয়েছেন সুকুমার। ক্যারলের রচনার জনপ্রিয়তার অন্যতম একটি কারণ তার অভিন্নহৃদয় বন্ধু জন টেনিসেলের আঁকা ছবিগুলি । অ্যালিসের আজব দেশের নানা বিচিত্র ছবি যদি তার তুলিতে তিনি অমন সুন্দর করে, জীবন্ত করে তুলতে না পারতেন তা হলে অ্যালিসের এই বিশ্বব্যাপী একচ্ছত্র আধিপত্য কতটা ক্ষুন্ন হত তা ভাববার বিষয়। এমন- কি, অনেক সময় টেনিয়েল সাহেবের ছবিকে বাঁচাতে ক্যারল সাহেব নিজেব লেখাকে সংশােধনও করেছেন। তাতে টেনিয়েল সাহেব বেঁচেছেন ঠিকই, সম্ভবত ক্যারল সাহেব বেঁচেছেন আরাে বেশি করে। বাঙলার কিশোর-পাঠকদের ‘ভাগ্যবলে’ সুকুমারকে কোনাে টেনিয়েল সাহেবের খোঁজ করতে হয় নি। যে আজব দেশের হাঁসের পালকের থেকে তার কলম তৈরি হয়েছিল, তারই আর-একটি পালক ভেঙে নিয়ে তিনি তার তুলি বানিয়েছিলেন। এ ঘটনা যদি না ঘটত, তা হলে—হাঁসজারু, হাতিমি বা হুকোমুখাে হ্যাংলা, কিংবা ঠাশ গােরু, কিংবা হিজি বিজ বিজু বা চিল্লানোসরাস ইত্যাদি বস্তুগুলি কি—এইটি কোনাে শিল্পীকে বােঝাতে গিয়ে গলদঘর্ম হয়ে সুকুমার সম্ভবত বহু আগেই তার লেখায় ইস্তফা দিতেন। এবং তার অনেক রচনাই আজও বাঙলাদেশের কিশোর-পাঠকের কাছে প্রাগৈতিহাসিক শিলালিপির মতাে মনে হত। একদিকে আবােল তাবোল, হযবরল, হেশােরাম হুশিয়ারের ডায়েরি ও অন্যান্য বহু কবিতায় এই বিচিত্র শব্দসৃষ্টিা ও উদ্ভট খেয়ালরসের বন্যা, অন্যদিকে কিশাের-হৃদয়ের সেই ‘দুরন্ত রাজা’ পাগলা দাশুর আবির্ভাব। তখনকার কিশাের-পাঠকের কাছে সন্দেশ’-এর পাতায় এ এক অভিনব ভেজ। বাঙলা সাহিতে এর আগে ও পরে ইস্কুলের গল্প (স্কুল স্টোরি) আরাে লেখা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ‘পাগলা দাও এ্যাণ্ড কোম্পানী কে মুনি করতে পারে এমন একটি চরিত্রও আজ পর্যন্ত সৃষ্টি হয় নি বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু সুকুমার রায়ের আর-একটি পরিচয়ও ছিল। বাংলাদেশে এ যাবৎ যত শিশু ও কিশাের পয়িকা বেরিয়েছে তার মধ্যে সন্দেশ’-এর একটি বিশিষ্ট স্থান আছে। শিশু ও কিশােরদের জন্য পত্রিকা কি ধরনের হওয়া উচিত, তার যে একটা আদর্শ উপেন্দ্রকিশোর-সুকুমার-সম্পাদিত “সন্দেশ তৈরি করে দিয়ে গিয়েছে, তাকে আজও কেউ অতিক্রম করতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না। সম্পাদক হিসেবে সুকুমার কিশাের-মনকে আকর্ষণ করার জন্য, তাদের মনের ভােজ জোগাবার জন্য যেসব লেখা লিখে গেছেন তার তথ্যমূল্য আজ অনেক ক্ষেত্রে না থাকতে পারে। কিন্তু শিশু ও কিশাের সাহিত্যের ভাষা কিরকম হওয়া উচিত তা অজিও আমরা এই-সব লেখা পড়ে শিখতে পারি। এ ছাড়া পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে কিশাের-মনের কৌতুহলের চেহারাটা কিরকম ছিল তার একটা স্পষ্ট ধারণা আজকের পাঠকের কাছেও মুল্যবান। সেদিক থেকে এর ঐতিহাসিক মূল্যও অনস্বীকার্য। সন্দেশের সেই বিচিত্র রচনাগুলিও এই ঋণ্ডর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মুখ্যত্ব খেয়াল রসের স্রষ্টা হলেও আবোল তাবােল পর্বের কবিতার আগেও সন্দেশে সুকুমারের কিছু গল্প