পাতা:সুকুমার রায় রচনাবলী-দ্বিতীয় খন্ড.djvu/৬৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


নিজের স্বার্থের জন্য-সর্বদা তাহার অনিস্ট চেস্টা করিত। সক্রেটিসকে সে কথা জানাইলে তিনি তাহা হাসিয়া উড়াইয়া দিতেন।

 একবার সে দেশের শাসনকর্তারা তাঁহাকে হুকুম দিলেন, “আমরা অমুককে সাজা দিব, তুমি তাহার খোজ করিয়া দাও।” সক্রেটিস তাঁহাদের মুখের উপর বলিলেন, “আমি অন্যায় কাজে সাহায্য করি না।” শাসনকর্তারা চটিলেন। আর একবার এথেন্সের লোকেরা কয়েকজন সেনাপতির উপর ক্ষেপিয়া, জুলুম করিয়া বিনা বিচারে তাহদের মারিতে চাহিয়াছিল, একমাত্র সক্লেটিস ছাড়া সে কার্যে বাধা দিতে আর কাহারও সাহস হয় নাই। এই ব্যাপারেও তাহার অনেক শত্র জুটিল। পণ্ডিতের দল তো আগে হইতেই ক্ষেপিয়া ছিল। তার পর যখন চারিদিক হইতে নানাশ্রেণীর লোকে সক্রেটিসের কাছে ঘন ঘন যাতায়াত করিতে আরম্ভ করিল, তখন শাসনকর্তারা ভাবিলেন, ইহার মনে নিশ্চয়ই কোনো মতলব আছে—এ হয়তো—কোনদিন এই-সকল লোককে ক্ষ্যাপাইয়া একটা গোলমাল বাধাইয়া তুলিবে। তাহারা সক্রেটিসকে শাসাইয়া দিলেন, “খবরদার, তুমি এথেন্সের যুবকদের সঙ্গে আর কথাবার্তা বলিতে পারিবে না।” সক্রেটিস তাহাতে ভয় পাইবেন কেন? তিনি পূর্বেরই মতো উৎসাহে সকলকে শিক্ষা দিতে লাগিলেন— “যাহারা জ্ঞানের অহংকার করিয়া বেড়ায় তাহারাই যথার্থ মূখ, যাহারা অন্যায় করিয়া দেশের আইনকে ফাকি দেয়, তাহারা জানে না যে ভগবানের কাছে ফাকি চলে না। যে মানুষ খাওয়ায় পরায় অল্পতেই সম্ভস্ট, সহজভাবে সরল কথায় সৎচিন্তায় সময় কাটায়, সেই সুখী—আধপেটা খাইয়াও সুখী, মানুষের নিন্দা অত্যাচারের মধ্যেও সুখী।” এমনি করিয়া ঋষি সক্রেটিস বাহাত্তর বৎসর বয়স পর্যন্ত যুবকের মতো উৎসাহে নিজের কাজ করিয়া গেলেন।

 ইহার মধ্যে সক্রেটিসের শক্রপক্ষ ষড়যন্ত্র করিয়া তাহার নামে মিথ্যা নিন্দা রটাইয়া এথেন্সের বিচারসভায় তাহার বিরুদ্ধে অন্যায় নালিশ উপস্থিত করিল। শক্রর দল যে যেখানে ছিল সকলে হা হা করিয়া সাক্ষ্য দিতে আসিল, “সক্রেটিস বড়ো ভয়ানক লোক, সে এথেন্সের সর্বনাশ করিতেছে।” অন্যায় বিচারে হকুম হইল, “সক্রেটিসকে বিষ খাওয়াইয়া মার।” সক্রেটিসের বন্ধুরা বলিলেন, “হায় হায়, বিনা দোষে সক্লেটিসের শাস্তি হইল।” সক্রেটিস হাসিয়া বলিলেন, “তোমরা কি বলিতে চাও যে আমি দোষ করিয়া সাজা পাইলেই ভালো হইত?”

 সক্রেটিসকে কয়েদ করিয়া রাখা হইল, কবে তাহাকে বিষ খাওয়ানো হইবে সে দিনও স্থির হইল। জেলের অধ্যক্ষ সক্রেটিসের ভক্ত ছিলেন, তিনি বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করিলেন সক্লেটিসকে রাতারাতি এথেন্স হইতে সরাইয়া ফেলিবেন, কিন্তু সক্রেটিস তাহাতে রাজি হইলেন না। তিনি বলিলেন, “আমার দেশের লোকে বিচার করিয়া বলিয়াছেন আমার শাস্তি হউক। আমি সে শাস্তিকে এড়াইয়া দেশের আইনকে অমান্য করিতে চাই না।” ক্লমে দিন ঘনাইয়া আসিল। সক্লেটিসের বন্ধুরা কাদিতে কাদিতে ফিরিয়া গেলেন, কেহ কেহ রাগে দুঃখে এথেন্স ছাড়িয়া চলিয়া গেলেন—মহাপণ্ডিত প্লেটো প্রভৃতি কয়েকটি শিষ্য শেষপর্যন্ত তাহার কাছেই বসিয়া রহিলেন। সক্রেটিসের

৬০
সুকুমার সমগ্র রচনাবলী॥ ২