পাতা:সুকুমার রায় রচনাবলী-দ্বিতীয় খন্ড.djvu/৭১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


তাহার পিতার দুরবস্থা ক্ৰমে বাড়িয়া শেষটায় এমন হইল যে, তিনি আর পড়ার খরচ দিতে পারেন না । কলেজের কর্তারাও দেখিলেন, এ ছোকরা নিজের পড়াশুনার চাইতে জ্যামিতি ও অন্যান্য বাজে’ বইয়েতেই বেশি সময় নন্ট করে। বুঝাইতে গেলে উলটা তর্ক করে, আপনার জেদ ছাড়িতে চায় না। সুতরাং গালিলিওর কলেজে টেকা দায় হইল । তিনি বাড়িতে ফিরিয়া আবার অঙ্কশাস্ত্রে মন দিলেন । তার পর পচিশ বৎসর বয়সে অনেক চেস্টার পর, তিনি মাসিক ষোলো টাকা বেতনে সামান্য এক মাস্টারির চাকরি লইলেন । কিন্তু এ চাকরিও তাহার বেশিদিন টিকিল না। কেন টিকিল না, সে এক অদ্ভুত কাহিনী । সে সময়ে লোকের ধারণা ছিল, এবং পণ্ডিতেরাও এইরূপ বিশ্বাস করিতেন যে, যে-জিনিস যত ভারী, শূন্যে ছাড়িয়া দিলে সে তত তাড়াতাড়ি মাটিতে পড়ে । গ্যালিলিও একটা উচু চুড়া হইতে নানারকম জিনিস ফেলিয়া দেখাইলেন যে, এ কথা মোটেও সত্য নয়। সব জিনিসই ঠিক সমান হিসাবে মাটিতে পড়ে। তবে কাগজ, পালক প্রভৃতি নিতান্ত হাল্কা জিনিস যে আস্তে আস্তে পড়ে তার কারণ এই যে, হাল্কা জিনিসকে বাতাসের ধাক্কায় ঠেলিয়া রাখে । ঠিক কিরকমভাবে জিনিস কত সেকেণ্ডে কতখানি পড়ে, Q তাহারও তিনি চমৎকার হিসাব বাহির করিলেন । কিন্তু এত বড়ো আবিষ্কারে লোকে খুশি না হইয়া বরং সকলে গ্যালিলিওর উপর চটিয়া গেল। পণ্ডিতেরা পর্যন্ত গ্যালিলিওর হিসাব প্রমাণ কিছু না দেখিয়াই সব আজগুবি বলিয়া উড়াইয়া দিলেন । এবং তাহার ফলে ঘোর তর্ক উঠি য়া গ্যালিলিওর চাকরিট গেল । যাহা হউক, অনেক চেচটায় গ্যালিলিও আবার আর-একটি চাকরি জোগাড় করিলেন এবং কয়েক বৎসর একরূপ শান্তিতে কাটাইলেন । কিন্তু বিনা গোলমালে চুপচাপ করিয়া থাকা তাহার স্বভাব ছিল না। ১৬০৪ খৃস্টাব্দে চল্লিশ বৎসর বয়সে তিনি কোপানিকাসের মত সমর্থন করিয়া তুমুল তর্ক তুলিলেন । কোপানিকাসের পূর্বে লোকে বলিত, ‘পৃথিবী শূন্যে স্থির আছে-সূৰ্য গ্ৰহ চন্দ্র তারা সব মিলিয়া তাহার চারিদিকে ঘুরিতেছে। কোপানিকাস যখন বলেন যে ‘পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে তখন লোকে তাহার কথা গ্রাহ্য করে নাই । সুতরাং গ্যালিলিও যখন আবার সেই মত প্রচার করিতে আরম্ভ করিলেন, তখন আবার একটা হৈ চৈ পড়িয়া গেল । সে সময়কার পণ্ডিতেরা প্রায় সকলেই গ্যালিলিওর বিরুদ্ধে—কিন্তু গ্যালিলিও একাই তেজের সহিত তর্ক চালাইয়া সকলকে নিরক্ত করিতে লাগিলেন । এই সময়ে গ্যালিলিও দূরবীক্ষণের আবিষ্কার করেন । হল্যাণ্ড দেশের এক চশমাওয়ালা কেমন করিয়া দুইখানা র্কাচ লইয়া আন্দাজে পরীক্ষা করিতে গিয়া দৈবাৎ একটা দূরবীক্ষণ বানাইয়া ফেলে । এই সংবাদ ক্ৰমে ইটালি পর্যন্ত ছড়াইয়া পড়িল , গ্যালিলিও শুনিলেন যে, একরকম যন্ত্র বাহির হইয়াছে, তাহাতে দূরের জিনিস খুব নিকটে দেখা যায়। শুনিয়াই তিনি ভাবিতে বসিলেন এবং রাতারাতি জিনিসটার সংকেত বাহির করিয়া নিজেই একটা দুরবীন বানাইয়া ফেলিলেন। হল্যাণ্ডের চশমাওয়ালীটি দুরবীন দিয়া দূরের ঘরবাড়ি দেখিয়াই সস্তুতট ছিল, গ্যালিলিও তাহাকে আকাশের দিকে ফিরাইলেন । W* সুকুমার সমগ্র রচনাবলী : ৯