পাতা:সুকুমার রায় রচনাবলী-প্রথম খন্ড.djvu/১০২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


শুনে রাজা গম্ভীর হয়ে গেলেন। অফেরো চেয়ে দেখলে রাজার চোখে হাসি নেই, মুখখানি তাঁর ভাবনাভরা। অফেরো তখন জোড়হাতে দাঁড়িয়ে বলল, “মহারাজের ভাবনা কিসের? কি আছে তাঁর ভয়ের কথা?” রাজা হেসে বললেন, “এক আছে শয়তান আর আছে মৃত্যু—এ ছাড়া আর কাকে ডরাই?” অফেরো বলল, “হায় হায়, আমি এক কার চাকরি করতে এলাম? এ যে শয়তানের কাছে খাটো হয়ে গেল। তবে যাই শয়তানের রাজ্যে; দেখি সে কেমন রাজা!” এই বলে সে শয়তানের খোঁজে বেরোল।

 পথে কত লোক আসে যায়—শয়তানের খবর জিজ্ঞাসা করলে তারা বুকে হাত দেয় আর দেবতার নাম করে, আর সবাই বলে, “তার কথা বলো না ভাই, সে যে কোথায় আছে, কোথায় নেই কেউ কি তা বলতে পারে?” এমনি করে খুঁজে খুঁজে কতগুলো নিষ্কর্মা কুঁড়ের দলে শয়তানকে পাওয়া গেল। অফেরোকে পেয়ে শয়তানের ফুর্তি দেখে কে! এমন চেলা সে আর কখনো পায় নি।

 শয়তান বলল, “এসো এসো, আমি তোমায় তামাসা দেখাই। দেখবে আমার শক্তি কত?” শয়তান তাকে ধনীর প্রাসাদে নিয়ে গেল, সেখানে টাকার নেশায় মত্ত হয়ে লোকে শয়তানের কথায় ওঠে বসে; গরিবের ভাঙা কুঁড়ের ভেতরে গেল, সেখানে এক মুঠো খাবার লোভে পেটের দায়ে বেচারিরা পশুর মত শয়তানের দাসত্ব করে। লোকেরা সব চলছে-ফিরছে, কে যে কখন ধরা পড়ছে, কেউ হয় তো জানতে পারে না; সবাই মিলে মারছে কাটছে কোলাহল করছে ‘শয়তানের জয়’।

 সব দেখে-শুনে অফেরোর মনটা যেন দমে গেল। সে ভাবল, ‘রাজার সেরা রাজা বটে, কিন্তু আমার তো কই এর কাজেতে মন লাগছে না।’ শয়তান তখন মুচকি মুচকি হেসে বললে, “চল তো ভাই, একবারটি এই শহর ছেড়ে পাহাড়ে যাই। সেখানে এক ফকির আছেন, তিনি নাকি বেজায় সাধু। আমার তেজের সামনে তাঁর সাধুতার দৌড় কতখানি, তা একবার দেখতে চাই।”

 পাহাড়ের নীচে রাস্তার চৌমাথায় যখন তারা এসেছে, শয়তান তখন হঠাৎ কেমন ব্যস্ত হয়ে থমকে গেল—তারপর বাঁকা রাস্তা ঘুরে তড়বড় করে চলতে লাগল। অফেরো বললে, “আরে মশাই, ব্যস্ত হন কেন?” শয়তান বললে, “দেখছ না ওটা কি?” অফেরো দেখল, একটা ক্রুশের মত কাঠের গায়ে মানুষের মূর্তি আঁকা! মাথায় তার কাঁটার মুকুট শরীরে তার রক্তধারা! সে কিছু বুঝতে পারল না। শয়তান আবার বলল, “দেখছ না ঐ মানুষকে—ও যে আমায় মানে না, মরতে ডরায় না—বাবারে! ওর কাছে কি ঘেঁষতে আছে? ওকে দেখলেই তফাৎ হটি।” বলতে বলতে শয়তানের মুখখানা চামড়ার মত শুকিয়ে এল।

 তখন অফেরো হাঁপ ছেড়ে বললে, “বাঁচালে ভাই! তোমার চাকরি আর আমায় করতে হল না। তোমায় মানে না, মরতেও ডরায় না, সেই জনকে যদি পাই তবে তারই গোলাম হয়ে থাকি।” এই বলে আবার সে খোঁজে বেরোল।

 তারপর যার সঙ্গে দেখা হয়, তাকেই সে জিজ্ঞাসা করে, “সেই ক্রুশের মানুষকে কোথায় পাব?”—সবাই বলে, খুঁজতে থাক, একদিন তবে পাবেই পাবে। তারপর একদিন চলতে চলতে সে এক যাত্রীদলের দেখা পেল। গায়ে তাদের পথের ধুলো, হাঁটতে হাঁটতে সবাই শ্রান্ত, কিন্তু তবু তাদের দুঃখ নেই—হাসতে হাসতে গান গেয়ে সবাই মিলে পথ চলছে। তাদের দেখে অফেরোর বড় ভালো লাগল—সে বলল,

সু.স.ম—১৩
৯৭