পাতা:সুকুমার রায় রচনাবলী-প্রথম খন্ড.djvu/১২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


 কোনো মেলা বা একজিবিশনে গিয়ে উপেন্দ্রকিশোর ছেলেমেয়েদের সব জিনিস দেখিয়ে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিতেন। তাঁরা যেখানেই যেতেন, তাঁদের চারদিকে ভিড় জমে যেতো—সবাই ছেলেপিলেদের সঙ্গে ছোট হয়ে গিয়ে কথাগুলো শুনতো। এই শিক্ষা সব অবস্থায়, সব সময়ে চলতো। একবারের কথা পণ্যলতা লিখেছেন“আমরা রেলগাড়িতে চড়ে কোথায় যেন বেড়াতে যাচ্ছি, আর ক্রমাগত বাবাকে প্রশ্ন করে চলেছি—এটা কি? ওটা কেন?’-বাবা বুঝিয়ে দিচ্ছেন। খানিক পরে ওদিককার সিট থেকে একজন ভদ্রলোক উঠে এসে বললেন, ‘মাফ করবেন, আপনার সঙ্গে আলাপ না করে পারছি না। কি আশ্চর্য সুন্দর করে আপনি ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেন! আমি এরকম আর দেখি নি।”

 বাল্য ও কৈশোর: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের খেলার প্রকৃতিও বদলাতে লাগলো আর এই পরিবর্তনের মধ্যে দিয়েই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি ফুটে উঠলো। একটা খেলা ছিল ‘রাগবানানো’। পণ্যলতা এর বর্ণনা দিয়েছেন, “হয়তো কারো ওপর রাগ হয়েছে, অথচ তার শোধ দিতে পারছি না, তখন দাদা বলত, ‘আয় রাগ বানাই!’ বলেই সেই লোকটি সম্বন্ধে যা তা অদ্ভুত গল্প বানিয়ে বলতে আরম্ভ করত, আমরাও সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বলতাম। তার মধ্যে বিদ্বেষ কিংবা হিংস্রভাব কিছু থাকতো না, সে ব্যক্তির কোনো অনিষ্টচিন্তা থাকতো না, শুধ, মজার মজার কথা।...হাসির স্রোতে রাগটাগ সব কোথায় ভেসে যেতো—মনটা আবার বেশ হাল্কা খুশিতে ভরে উঠতো।” হ-য-ব-র-লয়ের হিজিবিজবিজের জন্মস্থান কোথায় তা এর থেকেই বোঝা যায়।

 ছান্দসিকতা রায়বংশের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল। লোকনাথ রায়ের দাদা ভোলানাথ রায় অনেক সময় সাধারণ কথাবার্তাও ছড়া কেটে বলতেন। মুন্সী শ্যামসুন্দর নিজের রচিত স্তোত্র দিয়ে গৃহদেবতার পুজো করতেন। উপেন্দ্রকিশোর ছেলেমেয়েদের কবিতায় চিঠি লিখতেন। পরিবারের সান্ধ্য আসরেও ছড়াকাটার খেলা। হতো। একজন কবিতার একটা ছত্র বলতেন, আরেকজন তার সঙ্গে মিল দিয়ে পরের ছত্র—এইভাবে বলতো। একদিন আরম্ভ হল—

‘একদা এক বাঘের গলায় ফুটেছিল অস্থি’, ‘যন্ত্রণায় কিছুতেই নাহি তার স্বস্তি,'
‘তিনদিন তিনরাত নাহি তার নিদ্রা,'
‘সেঁঁক দেয়, তেল মাখে, লাগায় হরিদ্রা!’

   ক্রমে মুক্তিদারঞ্জন যখন বললেন, “ভিতরে ঢুকায়ে দিল দীর্ঘ তার চঞ্চ”তখন কেউ আর তার মিল দিতে পারে না। কিন্তু সুকুমার চট করে বলে ফেললেন,

“বক সে চালাক অতি চিকিৎসক-চুঞ্চু!”

সকলে আপত্তি করে উঠলো, “চুঞ্চ” আবার কি কথা! মুক্তিদারঞ্জন তাঁর পিঠ চাপড়ে বলে দিলেন, “চু মানে, ওস্তাদ, এক্সপার্ট।”

 সমারের এই বয়সের রচিত রবীন্দ্রনাথের “বিশ্ববীণা” গানের “আষাঢ়” অংশের একটা প্যারডি’ পাওয়া যায়।

"বৃষ্টি বেগভরে রাস্তা গেল ডুবিয়ে,

জীবনী