পাতা:সুকুমার রায় রচনাবলী-প্রথম খন্ড.djvu/১২৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


মতো তাকিয়ে রইলেন। দরজার কাছে একটা ছেলে বসেছিল, সে হঠাৎ ভ্যাঁ করে কোঁদে উঠল, যে লোকটা চামর দোলাচ্ছিল, চামরটা তার হাত থেকে ঠাঁই করে রাজার মাথার ওপর পড়ে গেল। রাজামশায়ের চোখ ঘুমে ঢুলে এসেছিল, তিনি হঠাৎ জেগে উঠেই বললেন, “জল্লাদ ডাক।”

 বলতেই জল্লাদ এসে হাজির। রাজামশাই বললেন, “মাথা কেটে ফেল।” সর্বনাশ! কার মাথা কাটতে বলে; সকলে ভয়ে ভয়ে নিজের মাথায় হাত বুলাতে লাগল। রাজামশায় খানিকক্ষণ ঝিমিয়ে আবার তাকিয়ে বললেন, “কই মাথা কই?” জল্লাদ বেচারা হাত জোড় করে বলল, “আজ্ঞে মহারাজ, কার মাথা?” রাজা বললেন, “বেটা গোমুখ্য কোথাকার, কার মাথা কিরে! যে ঐরকম বিটকেল শব্দ করেছিল, তার মাথা।” শুনে সভাসুদ্ধ সকলে হাঁফ ছেড়ে এমন ভয়ানক নিশ্বাস ফেলল যে, কাকটা হঠাৎ ধড়ফড় করে সেখান থেকে উড়ে পালাল।

 তখন মন্ত্রীমশাই রাজাকে বুঝিয়ে বললেন যে, ঐ কাকটাই ওরকম আওয়াজ করেছিল! তখন রাজামশাই বললেন, “ডাকো পন্ডিত সভার যত পন্ডিত সবাইকে।” হুকুম হওয়া মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে রাজ্যের যত পন্ডিত সব সভায় এসে হাজির। তখন রাজামশাই পন্ডিতদের জিজ্ঞাসা করলেন, “এই যে একটা কাক এসে আমার সভার মধ্যে আওয়াজ করে এমন গোল বাধিয়ে গেল, এর কারণ কিছু বলতে পার?”

 কাকে আওয়াজ করল তার আবার কারণ কি? পন্ডিতেরা সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। একজন ছোকরা মতো পন্ডিত খানিকক্ষণ কাঁচুমাচু ক’রে জবাব দিল, “আজ্ঞে, বোধ হয় তার খিদে পেয়েছিল।” রাজামশাই বললেন, “তোমার যেমন বুদ্ধি! খিদে পেয়েছিল, তা সভার মধ্যে আসতে যাবে কেন? এখানে কি মুড়ি-মুড়কি বিক্রি হয়! মন্ত্রী ওকে বিদেয় করে দাও—” সকলে মহা তম্বি ক’রে বললে, “হাঁ হাঁ, ঠিক ঠিক, ওকে বিদেয় করুন।”

 আর-একজন পন্ডিত বললেন, “মহারাজ, কার্য থাকলেই তার কারণ আছে—বৃষ্টি হলেই বুঝবে মেঘ আছে, আলো দেখলেই বুঝবে প্রদীপ আছে, সুতরাং বায়স পক্ষীর কন্ঠ নির্গত এই অপরূপ ধ্বনিরূপ কার্য্যের নিশ্চয়ই কোন কারণ থাকবে, এতে আশ্চর্য কি?”

 রাজা বললেন, “আশ্চর্য এই যে, তোমার মতো মোটা বুদ্ধি লোকেও এইরকম আবোল তাবোল বকে মোটা মোটা মাইনে পাও। মন্ত্রী, আজ থেকে এঁর মাইনে বন্ধ কর।” অমনি সকলে হাঁ হাঁ করে উঠলেন, “মাইনে বন্ধ কর।”

 দুই পন্ডিতের এরকম দুর্দশা দেখে সবাই কেমন ঘাবড়ে গেল। মিনিটের পর মিনিট যায়, কেউ আর কথা কয় না। তখন রাজামশাই দস্তুরমত খেপে গেলেন। তিনি হুকুম দিলেন, এর জবাব না পাওয়া পর্যন্ত কেউ যেন সভা ছেড়ে না ওঠে। রাজার হুকুম—সকলে আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল। ভাবতে ভাবতে কেউ কেউ ঘেমে ঝোল হয়ে উঠল, চুলকে চুলকে কারো কারো মাথায় প্রকাণ্ড টাক পড়ে গেল। বসে বসে সকলের খিদে বাড়তে লাগল—রাজামশাইয়ের খিদেও নেই, বিশ্রামও নেই— তিনি বসে বসে ঝিমুতে লাগলেন।

 সকলে যখন হতাশ হয়ে এসেছে, আর মনে মনে পন্ডিতদের ‘মূর্খ অপদার্থ নিষ্কর্ম্মা’ বলে গাল দিচ্ছে, এমন সময় রোগা শুঁটকো মতো একজন লোক হঠাৎ বিকট

দেশ-বিদেশের গল্প
১১৯