পাতা:সুকুমার রায় রচনাবলী-প্রথম খন্ড.djvu/১৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


সমস্ত যান্ত্রিক ও বাণিজ্যিক কাজের মধ্যেও তাঁর গানবাজনা, ছবি আঁকা ও সাহিত্যসৃষ্টি অটুট ছিল এবং তাঁর ছেলেমেয়েরাও সেই পথেই অগ্রসর হচ্ছিলেন।

 সুকুমার নাটক লিখতে লাগলেন, পর পর ‘ঝালাপালা’, ‘লক্ষণের শক্তিশেল’ ইত্যাদি রচনা করে ভাইবন্ধুদের নিয়ে একটা দল গড়লেন এবং সম্ভবত ১৯০৭ সাল থেকে এই দল ‘ননসেন্স ক্লাব’ নাম নিয়ে দানা বেঁধে ওঠে। 'সাড়ে বত্রিশ ভাজা' নামে একটা হাতে-লেখা পত্রিকা এই ক্লাবের মুখপত্র ছিল। পণ্যলতা লিখেছেন, “কাগজের সম্পাদক দাদা, মলাট ও মজার মজার ছবিগুলো সব দাদার আঁকা, অধিকাংশ লেখাও দাদারই।...বিশেষ করে ‘পঞ্চতি পাঁচন’ নামে সম্পাদকের পাঁচমিশেলি আলোচনার পাতাটি বড়রাও আগ্রহের সঙ্গে পড়তেন; পঞ্চতিক্ত নাম হলেও সেটা কিন্তু মোটেই তেতো ছিলো না, বরং খুব মুখরোচক ছিল। দাদার ঠাট্টার বিশেষত্বই এই ছিল যে তাতে কেউ আঘাত পেত না, কারো প্রতি খোঁচা থাকতো না, থাকতো শুধু, মজা, শুধ, সহজ নির্মল আনন্দ।”

 ননসেন্স ক্লাবের অভিনয়ও ছিল সুকুমারের সমস্ত কাজের মতোই সহজ, সরল, অনাড়ম্বর। বাঁধা স্টেজ, সিন, সাজসজ্জা, মেক-আপ প্রায় কিছুই থাকতো না, রস জমতো নিছক সাহিত্যসৃষ্টি ও অভিনয়ের উৎকর্ষের জন্য। সুকুমার নাটক লিখতেন, অভিনয় শেখাতেন আর সাধারণত প্রধান পার্টটা নিজেই নিতেন। পণ্যলতা লিখেছেন—“‘প্রধান’ মানে সবচেয়ে বোকা আনাড়ির পার্ট! হাঁদারামের অভিনয় করতে দাদার জুড়ি কেউ ছিল না!”

 সুকমারের পুত্র সত্যজিতের মধ্যেও নাট্যকৃতির এই সব্যসাচিত্ব দেখতে পাই, কেবল ‘হাঁদারাম’ বা যে-কোনো অংশে অভিনয় ছাড়া।

 সুকুমারের এই সহজ নেতৃত্বের কথা তত্ত্বকৌমুদী পত্রিকায় বিমলাংশপ্রকাশ রায় খুব সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছিলেন—“তাঁর দল গড়ে উঠেছিল অতি সহজ, স্বাভাবিকভাবে, যেমন করে জলাশয়ের মধ্যেকার একটা খুটিকে আশ্রয় করে ভাসমান পানার দল গিয়ে জমাট বাঁধে। সত্যই তিনি ছিলেন খুটিস্বরুপ, আমাদের অনেকের আশ্রয়। তাঁর বন্ধুপ্রীতি ছিল অপূর্ব্ব। তাঁর স্নিগ্ধ, শান্ত, উদার চোখদুটির মধ্যে একটা সম্মোহনী শক্তি ছিল। যার দিকে তাকাতেন তাকেই বশ করে ফেলতেন। তাঁর দলের আসন ছিল পথে পথে, তদানীন্তন সমাজপাড়ার প্রবাসী কার্যালয়ের সামনে সংকীর্ণ গলিতে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, বা অধুনা অবলুপ্ত ‘পাণ্ডির মাঠে’ (যেখানে এখন বিদ্যাসাগর হস্টেল হয়েছে) বসে, অথবা তাঁর ২২ নম্বর সুকিয়া স্ট্রিটের ভাড়াটে বাড়িতে, ননসেন্স ক্লাবের সাময়িক বৈঠকে, বা ১০ নম্বর কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটে গগন হোম মহাশয়ের বাড়িতে প্রশস্ত রান্নাঘরে বসে বা দাঁড়িয়েই মাছভাজা বা আলুভাজা চর্বণের সঙ্গে সঙ্গে। আবার অনেক সময়ে আড্ডা জমতো প্রশান্ত মহলানবিশের ঘরে।”

 এই দলের মধ্যে ছিলেন দ্বারকানাথ গংগোপাধ্যায়, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ও গরুচরণ মহলানবিশদের বাড়ির ছেলেরা এবং আরো অনেকে।

 তখন ব্রাহ্ম যুবকদের ছাত্রসমাজ বলে একটা সংগঠন ছিল কিন্তু তার অবস্থা ভালো ছিল না দেখে সমার ব্রাহ্ম যুবসমিতি গঠিত করলেন। এই সমিতির সভ্যেরা সমাজসেবামূলক কাজ এবং সভা করে আধ্যাত্মিক, সামাজিক প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করতেন। বুধবার বুধবার যুবকেরাই ব্রাহ্মসমাজমন্দিরে উপাসনা

১০
সুকুমার সমগ্র রচনাবলী