পাতা:সুকুমার রায় রচনাবলী-প্রথম খন্ড.djvu/৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


পরে উপেন্দ্রকিশোরের সবচেয়ে ছোট ভাই প্রমদারঞ্জনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। উপেন্দ্রকিশোরের ষষ্ঠ সন্তান জন্মানোতে এবং কুলদারঞ্জনের সন্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি তাঁর তিন সন্তানসহ এই পরিবারের অন্তভুক্ত হলে পরিবারটির আয়তন আরো বাড়ে। অদ্ভুত এই বাড়িটায় একদিকে জাতীয় নবজাগরণের উপকরণ, অন্যদিকে জাতির ভবিষ্যতের উপাদান, দায়ের আদান-প্রদানে একটা নতুন সত্তা জেগে উঠছিল। যে-সব বড়রা এই বাড়িতে সব দা আসা-যাওয়া করতেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের আচাৰ্য বিখ্যাত সমাজসংস্কারক, পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী, ধামিক নবদ্বীপচন্দ্র দাস, আচাৰ্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছোটবেলা থেকেই উপেন্দ্রকিশোরের সংগীতে ঝোঁক ছিল, তিনি বাঁশি ও বেহালা বাজাতেন এবং কলকাতায় আসার পর সম্ভবত গানবাজনার সত্র ধরেই জোড়াসাঁকোয় যাতায়াত করতে থাকেন। এই সময় থেকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর যে আজীবনসখ্য পথাপিত হয়েছিল তার রেশ তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর সন্তানদের– বিশেষত সকুমার ও তাঁর সত্রীর প্রতি নেহরপে বষিত হয়েছিল। এই পরিবারের আবহাওয়াটা অসাধারণ ছিল ; লীলা মজুমদার লিখেছেন– “মনে হয়, ওঁদের ছিল অবারিত দুবার, কোনো দুঃখী, নিরাশ্রয় ওঁদের বাড়ি থেকে ফিরে যেতো না। কত র্যগণ লোক এসে চিকিৎসা করিয়ে যেত। একবার এক বন্ধ * পাগল ভদ্রমহিলাও অনেকদিন থেকে গেলেন। বাড়িসদ্ধ সকলে নাস্তানাবাদ, কিন্তু উপেন্দ্রকিশোরের বাড়ির দরজা তবুও তেমনি খোলা রইলো।” পুণ্যলতা চক্লবতীও সমৃতিচারণ করেছেন, “আমাদের বাড়িটা ছিল আত্মীয় সবজন, বন্ধ বান্ধব অতিথি অভ্যাগত সকলেরই সখের মিলনের জায়গা—“বারো মাসে তেরো পাবণের মতো ছোটখাটো কত আনন্দের উৎসব নিত্য লেগে থাকতো। ভগবানের নামগানে, প্রাণখোলা । আদর-যত্নে, হাসি-আলাপে, গান-বাজনায় সকলেই কত তৃতি ও আনন্দ পেতেন। বাবার এক বন্ধ বলতেন, “এ বাড়ির মানুষগুলো সব সময়েই যেন হাসছে—বাড়িটাও যেন হাসছে’ !” এই বিরাট বাড়িটাতেই বাংলার নতুন সমাজের একটা ছোট সংস্করণ ছিল। ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ে ছোট ছেলেমেয়েরা এক সঙ্গেই পড়তো, বিকেলবেলায় বাড়িটার আবাসিক সমস্ত ছেলেপিলে প্রকান্ড ছাতে খেলা করতো, পণ্যলতা চক্লবতী লিখেছেন, “লকোচুরি, চোর-চোর, কুমির-কুমির, কানামাছি এ-সব খেলা তো ছিলই তাছাড়া মন থেকে বানিয়ে কতরকম খেলা হত—নতুন নতুন খেলার কলপনা দাদার মাথায় খাব আসতো।” সন্ধেবেলায় সকলে মিলে গোল হয়ে বসাটা একটা মসত ব্যাপার ছিল। কোন-কোনদিন অনেক ছেলেমেয়ে জড়ো হয়ে ম্যাজিক লন্ঠন, শ্যাডোপেল এই-সব দেখা হতো আর "রোজ সন্ধ্যায় ছিল গলপ শোনার পালা—কত দেশ-বিদেশের কথা, রপেকথা, রামায়ণ মহাভারতের গল্প, যন্ধে ও বিপদের কত রোমাঞ্চকর গল্প, শনতে শুনতে যেন কোন সবগুনরাজ্যে চলে যেতাম।” সাধনার তীর্থক্ষেত্র এই বাড়িতে কয়েকটা কাজের ঘর ছিল। পণ্যলতা চক্লবতী বলেছেন, “একটাকে আমরা বলতাম, কংকালের ঘর’..এটা ছিল আমাদের ডাক্তার দিদিমার পড়াশোনার ঘর। আরেকটা ছিল ‘অন্ধকার ঘর’ তার চারদিক বন্ধ। ভিতরে 8 সকুমার সমগ্র রচনাবলী