পাতা:সেকালের কলকাতার ধর্মীয় চিত্র - ইন্দ্রজিৎ দাস.pdf/২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

(১২১৯ হিজরি) জাফর আলী খাঁন দ্বারা পুননির্মিত হয় সেটি লেখা ছিল। জনশ্রুতি আছে, দেওয়ান রেজা খাঁ পলাশীর যুদ্ধের (১৭৫৭ খ্রিঃ) পর চিৎপুরে এসে বসবাস শুরু করেন। সেই সময় থেকেই এরা চিৎপুরের নবাব বলে পরিচিত হন এবং এই মসজিদটি রেজা খাঁ নির্মাণ করেছিলেন বলে শোনা যায়।

 সপ্তদশ শতাব্দীর শেষে দিকে জোব চার্নকের কলকাতায় আসার প্রায় সঙ্গেই, আর্মেনিয়ানরাও সুদূর ইউরোপ থেকে কলকাতাতে আসে। পর্তুগীজরা কিন্তু এর অনেক আগেই অর্থাৎ ষোড়শ শতকে বাংলার হুগলী এবং সপ্তগ্রামের কাছে উপনিবেশ গড়েছিল। মনে করা হয়, খজা ফানুস কালান্তার নামে সুরাটের এক আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ী তার ভাইপো খজা ইসরায়েল সারহাদকে সঙ্গে নিয়ে লন্ডনে গিয়েছিলেন তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে আলোচনা করতে। সেখানে তাদের সাথে চুক্তি হয় এবং সেই চুক্তি অনুযায়ী তারা কলকাতায় তাদের নিজেদের জন্য গির্জা তৈরি করতে পারবেন বলে অনুমতি পান, সম্ভবত এই চুক্তিটি হয়েছিল ১৬৮৮ সালে। এরপরে আর্মেনিয়ানরা কলকাতায় একটি কাঠের গির্জা তৈরি করেন। ১৭০৭ সালে এই কাঠের গির্জা আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায়। পরবর্তীকালে এই একই জমিতে পাকা গির্জা ‘দ্যা হলি চার্চ অফ্‌ নাযারেথ’ তৈরি করা হয় এবং গির্জা তৈরির কাজ শেষ হয় ১৭২৪ সলে। কলকাতায় এটিই খ্রিস্টানদের প্রথম গির্জা বলে মানা হয়। এখানে আর্মেনিয়ানদের একটি বিশেষ রীতির উল্লেখ করা প্রয়োজন। সাধারণত, খ্রিস্টানরা প্রতি বছর যীশু খ্রিস্টের জন্মদিন অর্থাৎ বড়দিন ২৫শে ডিসেম্বর পালন করে থাকেন। কিন্তু আর্মেনিয়ানরা খ্রিস্টান হলেও তারা যীশু খ্রিস্টের জন্মদিন এখনও প্রতিবছর ৬ই জানুয়ারী পালন করেন। বর্তমানে, কলকাতায় এই আর্মেনিয়ান গির্জা ছাড়া আরেকটি আর্মেনিয়ান চ্যাপেল আছে।

 ক্যাপ্টেন অ্যালেক্সান্ডার হ্যামিলটনের বিবরণ থেকে জানা যায়, কলকাতায় ১৭০৯ সালের ৫ই জুন, পুরনো ফোর্ট উইলিয়ামের কাছাকাছি সেন্ট অ্যানে চার্চ, যা প্রকৃত অর্থে কলকাতার প্রথম অ্যাঙ্গলিকান্‌ (ইংরেজি) চার্চ, তৈরি হয়। বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ১৭৫৬ সালের জুন মাসে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা আক্রমণ করেন এবং সেই সময় সম্পূর্ণরূপে এই গির্জা ধ্বংস হয়। আজ তার আর কোন অবশিষ্ট নেই। কলকাতার ধর্মীয়স্থান, বিশেষত এখানকার গির্জা নিয়ে আলোচনা করলে, কলকাতার প্রথম ক্যাথিড্রাল বা প্রথম প্রধান গির্জা সেন্ট্‌ জোন্স চার্চের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। এই চার্চ প্রতিষ্ঠার আগে সেই জমি লাগোয়া একটি খ্রিস্টান কবরখানা ছিল, যা আজও বিদ্যমান। ১৭৬৬ সাল থেকে এখানে কবর দেয়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রস্তাবে শোভাবাজারের নবকৃষ্ণ দেব এই জমি কিনে নেন। তিনি হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও সেন্ট জোন্স চার্চ তৈরির সময় এই জমি দান করেন। সেন্ট জোন্স চার্চের কবরখানায় তদানীন্তন কিছু বিশিষ্টজনের কবর আছে যেমন, জোব্‌ চার্ণক, তাঁর হিন্দু স্ত্রী, তাঁর মেয়েদের, ডাঃ হ্যামিল্টন, ওয়াটসন, বেগম জনসন, আরও অনেকের। ২৪শে জুন ১৭৮৭ সালে এটির উদ্বোধন হয়, তারপর থেকে ১৮৪৭ সাল অব্দি এটিই কলকাতার ক্যাথিড্রাল ছিল। এরপরে সেন্ট পলস্‌ চার্চকে কলকাতার ক্যাথিড্রাল করা হয়। সেন্ট জোন্স চার্চ ক্যাথিড্রাল না থাকলেও আমাদের দেশ স্বাধীনতা পাওয়ার আগে অব্দি এর সমস্ত ভার ছিল লন্ডনের অ্যাঙ্গলিকান্‌ খ্রিস্টানদের ওপর।

ভ্রমণআড্ডা • ঊনবিংশ সংকলন ২০১৭ • ৮০