পাতা:সেকালের কলকাতার ধর্মীয় চিত্র - ইন্দ্রজিৎ দাস.pdf/৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

যা আমরা বাংলায় জরথুষ্ট্রীয় বলে জানি। ১৮৩৯ সালের ১৬ই অগস্ট এজরা স্ত্রীটে তৈরি হয় পার্সিদের ফায়ার টেম্পল, তদানীন্তন বিখ্যাত পার্সি রুস্তমজী কাওসজী বানাজী যিনি জাহাজ কোম্পানীর মালিক ছিলেন, তিনি এই টেম্পলটি তৈরি করেন। ১৯১২ সালে কলকাতার মেটক্যাফ্‌ স্ট্রীটে ‘আরভাদ্‌ ধুনজীভাই মেহতা যর্‌য়াষ্ট্রিয়ান আঞ্জুমান আতাস আদারন’ নামে আরেকটি ফায়ার টেম্পল তৈরি করেন স্বর্গীয় শেঠ দাদাভাই বেহ্‌রামজী মেহতার বিধবা স্ত্রী খুড়সেটবাই এবং তাদের পুত্র শেঠ রুস্তমজী ভি মেহতা। বর্তমানে কলকাতার একমাত্র এই মন্দিরটিতে পার্সিদের সমস্ত রকম ধর্মীয় কাজ হয়। কলকাতার রেইনী পার্কে আরেকটি ফায়ার টেম্পল তৈরি করেছিল মেহতা পরিবার কিন্তু মন্দিরটি থাকলেও এর সম্পর্কে বিশেষ নথি পাওয়া যায়না।

 ভারত চীন দুই বিশাল প্রতিবেশি রাষ্ট্রের প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিশাল ব্যাপ্তি সবারই জানা। দুই দেশের সম্পর্ক বহুদিনের। বৌদ্ধ ধর্মের জন্ম ভারতে হলেও তার ব্যাপ্তি চীনে প্রসারিত। ব্রিটিশদের সঙ্গে চীনারাও নিজেদের ভাগ্য অন্বেষণে ভারতে এসেছিল। টং অছি নামক চীনা প্রথম ভারতে আসেন। তিনি ওয়ারেন হেস্টিংস এর (বাংলার গভর্নর জেনারেল, ১৭৭৩-১৭৮৫) থেকে ৬৫০ বিঘা জমি বছরে ৪৫ টাকা কর-বাবদ পান এবং সেখানে চিনির কারখানা তৈরি করেন। এরপর থেকেই চীনাদের কলকাতায় বাসস্থান গড়ে ওঠে, আজও এরা এই শহরের অভিন্ন অংশ। কলকাতায় বেশ কিছু চীনা টেম্পল আছে। বিশেষত, পুরোনো চীনা পাড়া বা টেরিট্টি বাজারে। সবথেকে বিখ্যাত চীনা মন্দির ‘তুং অন’। এই মন্দিরের এক তলায় একসময় ‘নানকিং’ নামে এক চীনা রেস্তরাঁ ছিল, রেস্তরাঁটি তৈরি হয়েছিল ১৯২৪ সালে। এটি কলকাতার প্রথম এবং সম্ভবত ভারতের প্রথম চীনা রেস্তরাঁ। এখানে কুয়ানদী বা যোদ্ধাদের দেবতা রয়েছেন, তিনি তার হাতে এক বিরাট ছুরি নিয়ে বিদ্যমান। এছাড়াও বিরাট এক বৌদ্ধ মূর্তিও রাখা আছে। মূলত, মন্দিরে ওনাদেরই পুজো হয়। এটির খানিক পাশেই রয়েছে ‘সী ইপ টেম্পল’। চীনা জুতো নির্মাতারা ১৮৮২ সালে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। চীনাদের কৃপার দেবী কুয়ান্‌ ইউমের মূর্তি এবং অনেক ধরনের চীনা অস্ত্রশস্ত্রও রয়েছে মন্দিরে। আরও কয়েকটি চীনা মন্দির রয়েছে এই অঞ্চলে। যেমন চীনা ছুতোরমিস্ত্রীরা ১৯০৮ সালে তৈরি করেন ‘সী ভয় উন্ লেওং ফুথ চার্চ’। ১৯৪৩ সালে নান-হাই, ফেন-উ ও সান্‌ তাক্‌ থেকে আসা চীনারা তৈরি করেন ‘নাম্‌ সুন্‌’ চার্চ, এই মন্দিরের আরাধ্য দেবতা কুয়ান্‌ তাই, সী ফো এবং চোই চোই। আরেকটি পুরোনো চীনা মন্দির হল ‘চুংঘী ডং থিয়েন হুএ’, তৈরি হয় ১৮৫৯ সালে, এখানে চীনাদের ভাগ্যের দেবতা কুয়ান কুন্‌ এর পুজো হয়। আরেকটি চীনা মন্দির হল ‘গী হিং’, এটি তৈরি হয় ১৮৮৮ সালে। বর্তমানে মন্দিরটি যেখানে আছে সেটি তৈরি হয় ১৯২০ সালে। কলকাতার চাঁদনিচকে রয়েছে ‘চুং ইয়ে থং’ মন্দির, যেখানে কনফুসীয়, তাও ও বৌদ্ধধর্ম এই তিনটি ধর্মীয় বিশ্বাস এক জায়গায় বিরাজ করছে।

 কলকাতার যশোর রোডেও চীনাদের বৌদ্ধ মন্দির এবং কলকাতার চৌবাগাতে হিউ-এন-সাং-এর মন্দির আছে। লেক রোডে রয়েছে ‘নিপ্পোযান্‌ মিহযি’ জাপানীদের বৌদ্ধ মন্দির। কলকাতায় আরও কয়েকটি বৌদ্ধ মন্দির আছে, বিশেষত উল্লেখ্য, কলেজ স্কোয়ারের শ্রীলঙ্কান বৌদ্ধ মন্দির এবং ইডেন হসপিটাল রোডের বার্মিস বৌদ্ধ মন্দির।

ভ্রমণআড্ডা • উনবিংশ সংকলন ২০১৭ • ৮২