‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধ-পাঠ
গত ২৫ বৎসর যাবৎ দেশে যে সাধনা চলিতেছে রবীন্দ্রবাবুর প্রবন্ধ তাহারই ফল। এক সময়ে পশ্চিমগগনপ্রান্ত সৌরকরচ্ছটায় দীপ্ত হইয়া আমাদিগকে আমন্ত্রিত করিয়াছিল। এখন যদি আমাদের পক্ষে পশ্চিমে সূর্যাস্ত হইয়া থাকে তবে তাহার অভিমুখী হইয়া থাকা পণ্ডশ্রম মাত্র। এখন নবসূর্য পূর্বদিক হইতে সমুদিত হওয়ার লক্ষণ দেখাইতেছে। আর পশ্চিমের দিকে তাকাইলে চলিবে না। এক সময় আমরা ভাবিয়াছিলাম ইংরেজও মানুষ আমরাও মানুষ। তাঁহাদের যাহা সাধ্যায়ত্ত আমাদেরও তাহাই। সে ভ্রম এখন ঘুচিয়া গিয়াছে। তখন ফরাসি বিপ্লবের প্রচণ্ড আলোকে ইংরেজ আমাদিগের রাজ্যে অভিনব মৈত্রীর মহাবাণী প্রচার করিয়াছিলেন, আমরা তাহাতেই লুব্ধ হইয়াছিলাম। রেড ইণ্ডিয়ানের মতো আমরা শ্বেতাঙ্গের মোহিনীতে মুগ্ধ হই নাই। ইংরেজ এখন সেই মৈত্রীর প্রতিশ্রুতি ক্রমেই ভুলিয়া যাইতেছে। কিন্তু বুদ্ধ যে দেশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন সে দেশের লোক মনুষ্যত্বের উচ্চতম আদর্শ কখনোই বিস্মৃত হইবে না। জাতীয় উন্নতি এখন আর পরকীয় দান-দ্বারা ঘটিবে না, স্বকীয় সাধনা দ্বারা অর্জন করিতে হইবে। বিলাতে রাজা প্রজার প্রতিনিধি, এখানে তাহা নহে। দশজন দেশীয় লোক আজ সাহেবের সভা আলো করিয়া বসিবেন, ৩০০ প্রস্তাবের মধ্যে তিনটি প্রস্তাব সম্বন্ধে কথঞ্চিৎ সার্থকতা লাভ করিবেন, ইহাকেই দেশের বিরাট হিত বলিয়া ঘোষণা করিতে হইবে—মিউনিসিপাল কর্পোরেশনে যেখানে দেশীয় লোকের পক্ষ হইতে ৩০০৲ টাকা মঞ্জুর করিবার প্রস্তাব হইল, সেই স্থানে তিন টাকা মজুরি পাইয়াই কি আমরা ধন্য হইব—এই অকিঞ্চিৎকর চেষ্টা ত্যাগ করিয়া যাহাতে আমরা নিজের পায়ের উপর নিজেরা দাঁড়াইতে পারি তাহারই চেষ্টা করা কর্তব্য। রবীন্দ্রবাবু জাতীয় জীবনের যে নূতন আদর্শ দেখাইয়াছেন তাহাই আমাদের পক্ষে একান্ত অবলম্বনীয়।
৫৫