কিন্তু উহা দক্ষিণপূর্ব্ব দিকে বহিতে লাগিল। বিপরীত তরঙ্গের আঘাতে তরীখানি টলমল করিতে লাগিল। মধ্যাহ্নে তুফান অনেক কমিয়া গেল—আকাশ অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার হইল। রাত্রি একরূপ মন্দ কাটিল না। প্রভাতে বুন্স্বি কহিল, “সাংঘাই এখনো ১০০ মাইল।” একদিনে এই শত মাইল পথ অতিক্রম করিতে না পারিলে জাহাজ ধরা অসম্ভব। বুন্স্বি চিন্তিত হইল।
ক্রমে বাতাস একেবারেই থামিয়া গেল। কয়েকদিনের অবিরাম সমরের পর একান্ত শ্রান্ত হইয়া সমুদ্র যেন সুপ্তিমগ্ন হইল। পালে আর বাতাস লাগে না! মধ্যাহ্নে দেখা গেল সাংঘাই ৪৫ মাইল দুরে! মিঃ ফগ হিসাব করিয়া দেখিলেন, আমেরিকার জাহাজ সাংঘাই বন্দর ছাড়িতে আর ছয়ঘণ্টা মাত্র বিলম্ব আছে।
বাতাস—বাতাস—আর একটু বাতাস! কাল এত ঝড় বহিয়াছিল, এত তরঙ্গ ছুটিয়াছিল, সেই ক্ষিপ্তসাগর এত গর্জ্জিয়াছিল, আজ কি তার কিছু থাকিতে নাই! তঙ্কাদিরি অত্যন্ত মন্দগতি হইয়া পড়িল। ফিলিয়াস্ ফগের যথাসর্ব্বস্ব তখন তঙ্কাদিরির উপর নির্ভর করিতেছিল। তিনি নির্ব্বাক্ নিস্পন্দ নিরুদ্বেগ হইয়া বসিয়া রহিলেন।
দেখিতে দেখিতে সন্ধ্যা ছয়টা বাজিল। আরক্তিম রবি সমুদ্রগর্ভে ঢলিয়া পড়িল। সাংঘাই তখনো তিন মাইলের পথ! মাঝি বুন্স্বি ক্ষোভে আর্ত্তনাদ করিয়া উঠিল, “আর হইল না―পুরস্কার পাইয়াও হারাইলাম।” সে তখন মিঃ ফগের দিকে কাতর দৃষ্টিতে চাহিল। মিঃ ফগ মাঝির মুখের দিকে একবার তাকাইলেন বটে, কিন্তু সে দৃষ্টি ধীর স্থির রোধকলঙ্কশূন্য—সে দৃষ্টির মধ্যে উদ্বেগের চিহ্ন পর্য্যন্ত ছিল না!
ওই যে একখানি জাহাজের ধূমোদ্গীরণ-নল দেখা যাইতেছে—ওই ত সেই নলমুখে ঘোরকৃষ্ণ ধূমরাশি বিনির্গত হইয়া বাতাসে ভাসিয়া যাইতেছে!