পাপের পরিণাম

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
 

পাপের পরিণাম

 
প্ৰথম অধ্যায়। সূচনা

বিজয় কলিকাতায় পড়িতেন। অনেকদিন পূৰ্ব্বে তাঁহার মাতার পরলোক হইয়াছিল। এক্ষণে পিতার পরলোক হইল। খরচ অভাবে তাহার লেখাপড়া বন্ধ হইয়া গেল। এক জ্যেষ্ঠভ্ৰাতা ব্যতীত সংসারে তাহার। আর কেহ ছিল না। জ্যেষ্ঠভ্রাতা পশ্চিমে কৰ্ম্ম করিতেন। নিরুপায় হইয়া বিজয় তাহার নিকট চলিয়া গেলেন। ভ্ৰাতৃজায়া তাহাতে বড় অসন্তুষ্ট হইলেন। প্রথমদিন হইতেই বিজয়কে তাড়াইতে চেষ্টা করিলেন। ভাই, স্ত্রীর নিতান্ত অনুগত। তাঁহার নিজের চক্ষু থাকিয়াও ছিল না, কৰ্ণ ছিল না, মন ছিল না। গৃহিণীর চক্ষু দিয়া তিনি দেখিতেন, তাহার কর্ণ দিয়া শুনিতেন, তাহার মন দিয়া তিনি ভাল-মন্দ বিচার করিতেন। ফলকথা, গৃহিণী তাঁহাকে যাহা বলিতেন, তিনি তাঁহাই করিতেন। ভাইও বিজয়কে দূর করিবার নিমিত্ত চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ইতিপূৰ্ব্বে দেশ হইতে একজন ভদ্রলোক এই স্থানে আসিয়াছিলেন। সামান্য একটি ঘর ভাড়া করিয়া নিৰ্জ্জনে একাকী তিনি বাস করিতেন। বিজয়ের সহিত তাহার আলাপপরিচয় হইয়াছিল। সন্ধ্যার সময় তিনি ও বিজয়গঙ্গাতীরে কােন এক নিভৃত স্থানে গিয়া বসিতেন । a 9 একদিন বিজয়কে নিতান্ত বিষ য়া তিনি কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন । বিজয় আপনার দুঃখের কাহিনী তাঁহাকে । এই লোকটির নাম বেণীমাধব হালদার। বেণীবাবু বলিলেন,- “তুমি ভাবিও না, কলিকাতা গিয়া কৰ্ম্মকাজের চেষ্টা কর। এক বৎসর খরচের নিমিত্ত তোমাকে আমি দুইশত টাকা দিব। এক বৎসরের ভিতর কৰ্ম্মকাজ হয় ভালই; না হয়। পরে দেখা যাইবে।” বিজয় তাহাকে বার বার ধন্যবাদ করিলেন, আর তিনি বলিলেন,- “এ টাকা আমি ভিক্ষাস্বরূপ লইব না। সাধ্য হইলেই আপনার টাকা আমি পরিশোধ করিব।” বেণীবাবু বলিলেন,- “ধন্যবাদে আমার প্রয়োজন নাই। যদি যথার্থই তোমার মনে হয় যে, আমি তোমার উপকার করিলাম, তাহা হইলে পরে আমার নিন্দা করিও না, আর আমার কোন অনিষ্ট করিও না ।” বিজয় বলিলেন,- “বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কথা।” বেণীবাবু উত্তর করিলেন, — “লোকে বলে বটে, কিন্তু ইহা ঠিক বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কথা নহে। অনেক পূৰ্ব্বে একজন ফরাশি বলিয়াছিল,— “অমুক আমার নিন্দা করিতেছে বটে, কেন বল দেখি? আমি তো কখন তাহার কোন উপকার করি নাই।” পাপের পরিণাম 9 sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro বিজয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “আপনি কোন লোকের উপকার করিয়াছিলেন, তাহার পর সে আপনার অপকাৱা করিয়াছিল?” বেণীবাবু একাকী থাকিতেন। তাঁহার বাসায় কোন লোককে যাইতে দিতেন না। বিজয়কেও তিনি মানা করিয়াছিলেন। কিন্তু বিজয় আজ থাকিতে পারিলেন না। তাহার বাসায় তিনি গমন করিলেন। গিয়া দেখিলেন যে, বেণীবাবুর ভয়ানক জুর হইয়াছে। বিজয় বলিলেন,- “চারিদিকে বসন্ত হইতেছে। আপনি আরোগ্যলাভ না করিলে আমি কলিকাতায় যাইতে পারি না।” বেণীবাবু উত্তর করিলেন,- “জুরটা অধিক হইয়াছে বটে। বােধ হয়, ম্যালেরিয়া জ্বর। দুই-এক দিনের মধ্যে আমি ভাল হইব। আমার জন্য তোমার কোন চিন্তা নাই। কল্য প্ৰাতে তুমি কলিকাতায় চলিয়া যাও।” বিজয় তাহার কথা শুনিলেন না। বেণীবাবুর জ্বর আরও বৃদ্ধি হইল। চারিদিনের দিন তাঁহার সৰ্ব্ব শরীরে বসন্ত দেখা দিল । আহারনিদ্রা পরিত্যাগ করিয়া রাত্রিদিন বিজয় তাহার সেবা করিতে লাগিলেন । পীড়া কঠিন হইয়া উঠিল। এ রোগের চিকিৎসকগণ আসিয়া বলিল যে, জীবনের কোন আশা নাই । বিজয় বলিলেন, — “বেণীবাবু। আপনার আত্মীয়স্বজনকে তারে সংবাদ দিলে হয় না?” বেণীবাবু উত্তর করলেন "পৃথিবীতে আমার আহ্বজন কেহ নাই। যে ছিল, সে অতি নিৰ্দয়ভাবে আমাকে ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে।” @ রাত্রি অবসান হইয়াছে। সমন্ত রাত্রি বিজয় বুেগ্ৰীষ্টাৰ্বর নিকট বসিয়া আছেন। রোগী অজ্ঞানঅভিভূত হইয়া চক্ষু মুদ্রত করিয়াছিলেন। তুৰ্থন'চক্ষু চাহিয়া তিনি বলিলেন,-“বিজয়! তুমি আমার অনেক করিলে! আতি ভয়ানক রূৰ্চত্র রোগে মানুষ মানুষের নিকট যায় না। প্ৰাণের ভয় না করিয়া রাত্রিদিন তুমি আঙ্গুষ্ট সেবা করিলে। দেখ, আমি নিতান্ত নিঃস্তু নািহ। গোলোকধাম গ্রামে আমার বাটী, বাগান ও অনেক ভূমি আছে। সেই গ্রামে আমার জমিদারী। এ সমুদয় বিষয় উইল দ্বারা আমি তোমাকে দান করিব। তুমি শীঘ ইহার আয়োজন কর। আজ রাত্রিতেই আমাকে বোধ হয় যাইতে হইবে। অতএব তুমি বিলম্ব করিও না। শেষ অবস্থায় অজ্ঞান হইয়া পড়িতে পারি। উইল রেজেষ্টারী না করিলেও চলে, কিন্তু তুমি আমার নিম্পর সেজন্য রেজেষ্টারী করিতে পারিলে ভাল হয়।” বিজয় প্রথমে কিছুতেই সম্মত হইলেন না । কিন্তু উইলের জন্য রোগী নিতান্ত ব্যস্ত হইলেন। বেণীবাবু তাঁহাকে বুঝাইয়া বলিলেন যে, যদি তিনি আরোগ্যলাভ করেন, তাহা হইলে উইল ছিড়িয়া ফেলিলেই হইবে, অথবা অন্য উইল করিলেও চলিবে। অগত্যা বিজয়সম্মত হইলেন । vxobr frig ož3. g3 ze - www.amarboicomfo%"*"**”**** দ্বিতীয় অধ্যায়। ऎछब्ल না। তাহার জ্যেষ্ঠ রাইচরণ রায়-মহাশয়কে গিয়া তিনি সকল কথা বলিলেন। বিজয় যেদিন আসিতে দিতেন না। বাহিরে দাঁড়াইয়া বিজয় ভ্রাতাকে সকল কথা বলিলেন। রাইচরণ রায়মহাশয় আশ্চৰ্য্যান্বিত হইলেন। কোথাকার কে একজন নিম্পর, যাহার সহিত অল্প দিন পূৰ্ব্বে কিছুমাত্র আলাপ-পরিচয় ছিল না, তিনি বিজয়কে এত টাকার সম্পত্তি দিয়া যাইতেছেন, ইহা অপেক্ষা আর আশ্চর্য্যের বিষয় কি আছে? মুখে তিনি আহাদ প্ৰকাশ করিলেন, কিন্তু মনে মনে তাঁহার হিংসা হইল। বিজয়কে বাহিরে রাখিয়া তিনি বাটীর ভিতর গমন করিলেন। কিছুক্ষণ গৃহিণীর সহিত পরামর্শ করিয়া পুনরায় বাহিরে আসিয়া তিনি কনিষ্ঠকে বলিলেন,- “বিজয়! তুমি আমার এই পত্ৰখানি লইয়া সবরেজিষ্টারের নিকট গমন কর, তিনি আমার বন্ধু, আমার পত্ৰ পাইলে তিনি বেণীবাবুর বাটীতে আসিবেন। আমার বন্ধু জগৎবাবু ও আর একজনকে লইয়া সে স্থানে আমি যাইতেছি। তাহারা উইলের সাক্ষী হইবেন।” বিজয়ের জ্যেষ্ঠভ্রাতা রাইচরণ রায়মহাশয় দুই জন বন্ধুকে লইয়া বেণীবাবুর বাসায় উপস্থিত হইলেন। সাবরেজিষ্টারকে লইয়া বিজয়ও সেই স্থানে ভূঁসিয়া উপস্থিত হইলেন। যখন উইল লেখা ও রেজেক্টরী হইল, তখন রাইচরণবাবু বিৰ্ভয়কৈ ঔষধ আনিতে পাঠাইলেন। তিনি বলিলেন,- “আমরা সব ঠিক করিতেছি। তোমার্কে কোন কাগজে সাক্ষর করিতে হইবে না। বেণীবাবুর নিমিত্ত তুমি শীর্ঘ এই ঔষধ আনয়ন্ত্রকর ঔষধ লইয়া বিজয় যখন প্রত্যাগমনুষ্ঠুকরিলেন, তখন তিনি দেখিলেন যে, উইল হইয়া গিয়াছে। সকলে চলিয়া গিয়াছেন, কেঁকিল রাইচরণবাবু রোগীর নিকট বসিয়া আছেন। রাইচরণ রায়মহাশয় বলিলেন,- “এই দেখ, উইল রেজেষ্টারী করা হইয়াছে। এ কাগজ এখন আমার নিকট থাকুক। আমি এক্ষণে বাটী গমন করি।” রায়মহাশয় চলিয়া গেলেন। বিজয় রোগীর নিকট বসিয়া রহিলেন । সমস্ত দিন কাটিয়া গেল। অপরাহে পুনরায় জুর ফুটিল। রোগী পুনরায় অজ্ঞান হইয়া পড়িলেন। চক্ষু মুদিত করিয়া রোগী এ-পাশ ও-পাশ করিতে লাগিলেন। বিজয় মাঝে মাঝে তাঁহার মুখে একটু একটু জল দিয়া তাহার শুষ্ককণ্ঠ সিক্ত করিতে লাগিলেন । রাত্রি দুই প্ৰহরের সময় একটু চেতন হইল। চক্ষু চাহিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, — “তুমি 6क?' বিজয় উত্তর করিলেন,- “আমাকে চিনিতে পারেন না? আমি বিজয় ।” কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, — “যে কাগজ তাহার নাম কি, তাহা লেখা হইয়াছে?” বিজয় বলিলেন,- “উইল? হাঁ, তাহা লেখা হইয়াছে।” বেণীবাবু পুনরায় বলিলেন,- “আর একটা কথা তোমায় বলিব। কিন্তু কি কথা, তাহা ঠিক মনে হইতেছে না। এই মনে আসিতেছে, আর তৎক্ষণাৎ উড়িয়া যাইতেছে। রও—ঠিক কাপড় কাচা সাবাঙের মত ।” পািপনী পরিণাম দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ లిసి বিজয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “কাপড় কাচা সাবাঙের মত? সে আবার কি? সাজি মাটি?” বেণীবাবু বলিলেন,— “তাহার নাম আমার মনে হইতেছে না। এত বড়; লম্বা লম্বা। চক bक दी ।" বিজয় ভাবিলেন, — “রোগী প্ৰলাপ বকিতেছেন।” কিছুক্ষণ পরে রোগী পুনরায় বলিলেন,- “কাছে মুখ লইয়া এস, তোমাকে চুপি চুপি বলিব। কোথায় রাখিয়াছি? অন্ধকার। মাথার উপর! তাহাকে কি কাষ্ঠ বলে, ঝমৃ-ঝম, ঝমঝম, ঝম-ঝমি গাছ। কচি কচি মেয়েরা পাড়িতে গিয়াছিল। চক্ষুর জল বাঘের গায়ে পড়িয়াছিল। সেই ঝমৃ-ঝমি কাঠের ভিতর। ঝমৃ-ঝম।” কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া পুনরায় তিনি বলিলেন,- “চাবি লও। ঐ বাক্স খোল।” বিজয় তাহাই করিলেন। বেণীবাবু পুনরায় বলিলেন,- “দক্ষিণ পার্শ্বে দেখ। একখানি মেয়েমানুষের ছবি পাইবে। তাহার উপর কি আছে? মানুষের নাক। সোনা দিয়া বাধাইয়াছি। তুমি সৰ্ব্বদা গলায় পরিধান করিবে। তোমার ভাল হইবে। তাহার পর ঐ স্ত্রীলোককে দিবে। হা, হা, হা, সোনা দিয়া বঁধানো মানুষের নাক, হা, হা, হা।” বিজয় যথার্থই বাক্সের ভিতর একখানি ছবি ও সোনা দিয়া বঁধানো মানুষের শুষ্ক নাক দেখিতে পাইলেন। বিজয় মনে ভাবিলেন,— “মৃত্যুকালে ইনি আমাকে এই নাক গলায় পরিধান করিতে আজ্ঞা করিলেন। আমি ইহার আজ্ঞা প্ৰতিপালন করিব।” বেণীবাবু তাহার পর অজ্ঞান হইয়া পড়িলেন। আর) জ্ঞান হইল না। মৃদুস্বরে মাঝে মাঝে কেবল তিনি বলিতে লাগিলেন, — “অন্ধকার! ধ্ৰুরি উপর! কাপড় কাচা সাবাঙা। চকচকে। ঝমৃ-ঝমূ, ঝমৃ-ঝমি গাছ। তাহার ভিতর আফ্ৰিঞ্জীখিয়াছি। সােনা বঁধানাে নাক। হা, হা, হা।” নাকের কথা ব্যতীত অন্য সকল প, অথবা ইহার কোন অর্থ আছে, বিজয় তাহা বুঝিতে পারিলেন না। রোগী ক্ৰমে সুস্থির হইলেন। তিনি ইহধাম পরিত্যাগ করিলেন। তৃতীয় অধ্যায় টাকার লোভ যথাসময়ে বিজয় বেণীবাবুর শ্ৰাদ্ধ করিলেন। তাহার পর তিনি ভ্ৰাতাকে বলিলেন, — “দাদা ! তবে আমি এক্ষণে বেণীবাবুর গ্রামে গমন করি। সে গ্রামের নাম গোলকধাম। বেণীবাবু আমাকে বলিয়াছিলেন যে, তাহার কৰ্ম্মচারীর নাম নৃসিংহ বড়াল। সকলে তাঁহাকে বড়ালমহাশয় বলে। তিনি তাঁহার স্ত্রীর সহিত বেণীবাবুর বাটীতে বাস করেন। চাষবাসের কাজ ও জমিদারীর কাজ সমন্ত বিষয়ের তিনি তত্ত্বাবধান করেন। আমি সেস্থানে গিয়া উইলের প্রোবেট লাইব ও বড়ালমহাশয়ের হিসাব দেখিব। উইলখিানি আমাকে প্ৰদান করুন!” w8o fi:Ilă zi, o ga se - www.amarboi conf** রায়মহাশয় উত্তর করিলেন, — “তোমাকে আমি বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি। বেণীবাবু মনে করিলেন যে, তুমি বালক, তুমি বিষয় রক্ষা করিতে পরিবে না। সেজন্য তিনি আমার নামে উইল করিয়াছেন। সমুদয় বিষয় তিনি আমাকে দিয়াছেন।” বিজয়ের মাথায় যেন আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল । তিনি বলিলেন,- “সে কি দাদা। জ্যেষ্ঠ ভাই হইয়া আমাকে আপনি ফাঁকি দিলেন? বেণীবাবু পীড়িত ছিলেন। সে সময় তাহার জ্ঞান ছিল की ।" রায়মহাশয় বলিলেন, — “ও কথা বলিও না। যদি অজ্ঞান অবস্থায় তিনি উইল করিয়া থাকেন, তাহা হইলে সে উইল কোন কাজের নহে। কিন্তু তখন অজ্ঞান ছিলেন না। যাহারা সে সময় উপস্থিত ছিলেন, তাহারা সকলেই সে সম্বন্ধে সাক্ষ্য দিবেন।” বিজয় বলিলেন, — “তবে উইলে আমার নাম না লিখিয়া চুপি চুপি আপনি নিজের নাম বসাইয়া দিয়াছিলেন। বেণীবাবু তাহা জানিতে পারেন নাই।” রাইচরণবাবু বলিলেন, — “উইল আমি নিজের হাতে লিখি নাই। জগজীবনবাবু তাহা লিখিয়াছিলেন। সবরেজিষ্টারের সমক্ষে উচ্চৈঃস্বরে তিনি উইল পাঠ করিয়া বেণীবাবুকে শুনাইয়াছিলেন। যাহারা সে সময় উপস্থিত ছিলেন, তাঁহাদের বরং তুমি জিজ্ঞাসা করিয়া দেখা!” অনেকক্ষণ দুই ভ্ৰাতায় তর্ক-বিতর্ক হইল। বিজয় নিশ্চয় বুঝিলেন যে,দাদা শঠতা করিয়া উইলে নিজের নাম বসাইয়া দিয়াছেন। রুগ্ন অবস্থায় বেণীবাবু তাহা বুঝিতে পারেন নাই। কাঁদিতে কাঁদিতে জ্যেষ্ঠকে তিনি বলিলেন,- “ভাই আপনি বড়ই নিষ্ঠুর কাজ করিলেন। আপনাকে বেণীবাবু কেন বিষয় দিবেন, আপনার কেন তিনি উইল করবেন? আপনার তাহা হইয়াছে। আমাকে অৰ্দ্ধেক বিষয় द्रञ् ।* তাহাতেও রায়মহাশয় সম্মত । স্ত্রীর পরামর্শে বিজয়কে তিনি বাটী হইতে বাহির করিয়া দিলেন। বিজয় কলিকাতা যাইবার নিমিত্তে যাত্রা করিলেন। পথে যাইতে যাইতে তিনি ভাবিলেন, — “গোলোকধামে বেণীবাবুর বাড়ী। বড়ালমহাশয় তাহার কৰ্ম্মচারী। সে স্থানের ভাবটা কিরূপ, একবার তাহা জানিয়া যাই। বিজয় গোলোকধামে গিয়া উপস্থিত হইলেন। লোককে জিজ্ঞাসা করিয়া বরাবর তিনি বেণীবাবুর বাটীতে গমন করিলেন। সে স্থানে গিয়া শুনিলেন যে, তাহার জ্যেষ্ঠ,- বড়ালমহাশয়কে বেণীবাবুর মৃত্যুসংবাদ দিয়াছেন, আর তিনি কিরূপ উইল করিয়াছেন, তাহাও লিখিয়াছেন । বিজয় আরও দেখিলেন; বিড়ালমহাশয় বেণীবাবুর বাড়ীর অনেকগুলি ঘরের মেঝে খনন कदू3िg@gछ्०ा । বড়ালমহাশয় বলিলেন, — “আপনার ভ্রাতা চারিদিন পরে এই বাটীতে আসিবেন। ঘরের মোজে সব নষ্ট হইয়া গিয়াছিল; সেজন্য মেজেগুলি নূতন করিয়া আমি করিতেছি।” সে কথায় বিজয়ের প্রত্যয় হইল না। মেজে খুঁড়িয়া বড়ালমহাশয় যেন কি খুঁজিতেছেন— এইরূপ তাহার সন্দেহ হইল। “অন্ধকার! ঝম-বমি গাছের ভিতরে আমি রাখিয়াছি।” মৃত্যুকালে বেণীবাবু এইরূপ কথা বলিয়াছিলেন। এ কথার কি কোন অর্থ আছে? বিজয় তাহা পাপের পরিণাম sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro w8S ভাবিতে লাগিলেন। সোনা দিয়া বঁধানো নাক ও ছবির কথাও তিনি সেই সময় বলিয়াছিলেন। তাহা সত্য। তবে এ কথা সত্য হইবে না কেন? বেণীবাবুর সে সময় জ্ঞান ছিল না। তিনি এক দ্রব্যের নাম করিতে অন্য দ্রব্যের নাম করিয়াছেন। ইহাই সম্ভব। কিন্তু ঝম-ঝমি গাছের মূলে যে কিছু সত্য আছে—বিজয়ের তাহা নিশ্চয় বিশ্বাস হইল। বিজয় জিজ্ঞাসা করিলেন,— “বাটীর চারিদিক দেখিতেছি বৃহৎ বাগানের দ্বারা পরিবেষ্টিত। ইহার ঝমৃ-ঝমি নামক কি কোন গাছ আছে?” বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন,- “ঝমৃঝমি গাছ! কিস্মিনকালে এ গাছের নাম শুনি নাই।” বিজয় বলিলেন, — “মৃত্যুকালে বেণীবাবু বলিয়াছেন যে, কাপড়কাচা সাবাঙের ন্যায় কোনরূপ চকচকে দ্রব্য তিনি এই ঝমৃ-ঝমি গাছের ভিতর রাখিয়াছেন। ইহার অর্থ কি?” বড়ালমহাশয় বলিলেন, —“তবে আর আমি বৃথা ঘরের মেজে খনন করি কেন?” বিজয় জিজ্ঞাসা করিলেন, “মেজে খুঁড়িয়া আপনি কি খুঁজিতেছেন?” বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন,- “কিছুই নহে। আর কি খুঁজিব?” বিজয় বলিলেন,- “এই যে বলিলেন, তবে আর বৃথা খনন করি কেন?” বড়ালমহাশয় সে প্রশ্নের ভালরূপ উত্তর দিলেন না। অন্য কথা বলিয়া সে কথা তিনি চাপা। gिनन् । বেণীবাবু একাকী পশ্চিমে গিয়াছিলেন কেন? সঙ্গতিপন্ন লোক হইয়া একাকী নিভৃতে। কালব্যাপন করিতেছিলেন কেন,-“এই সমুদয় কথা বিজয় তাহার পর বড়ালমহাশয়কে জিজ্ঞাসা করিলেন; কিন্তু তাহারও ভালরূপ কোন উত্তর না । এইমাত্র কেবল তিনি জানিতে পারিলেন যে, একদিন রাত্রিকালে সহসা তিনি য়া গিয়াছিলেন । তাহার পর সেই গ্রামের দুই-চারি জন তিনি জিজ্ঞাসা করিয়া অবগত হইলেন যে, বেণীবাবু ও তাঁহার স্ত্রী এই বাটীতে বাস । বেণীবাবুর স্ত্রীকে গ্রামের লোক ‘সোনা-বীে” বলিয়া ডাকিত। তিনি সৰ্ব্বদা পূজা- জপ-তপ লইয়া থাকিতেন। কিছুদিন পরে একজন পীড়িত সন্ন্যাসী তাঁহাদের বাটীতে আগমন করেন। বিশেষরূপ যত্ন করিয়া বেণীবাবু তাঁহাকে রোগ হইতে মুক্ত করেন। সন্ন্যাসীর গায়ের বর্ণ নিতান্ত কালো ছিল। সেজন্য “কালা-বাবা।” বলিয়া সকলে তাঁহাকে ডাকিত। প্রায় তিন বৎসর “কালা-বাবা’ বেণীবাবুর বাটীতে বাস। করেন। তাহার পর সহসা বেণীবাবু, “কালা-বাবা’ ও ‘সোনা-বীে” কাশী গমন করিলেন, কেহ। তাহা জানে না। বড়ালমহাশয় বোধ হয় ইহার বিশেষ কারণ অবগত আছেন; কিন্তু কাহাকেও তিনি কোন কথা প্ৰকাশ করিয়া বলেন না । সে সন্ন্যাসী কোথায় গেলেন, বেণীবাবুর স্ত্রী ‘সোনা-বীে’ বা কোথায় গেলেন, তাহাদিগকে ছাড়িয়া বেণীবাবু অন্য স্থানে গমন করিলেন কেন,-এ সমুদয় কথার সন্ধান বিজয় কিছুই পাইলেন না। যাহা হউক, বিজয় কলিকাতা চলিয়া গেলেন। বেণীবাবু যে টাকা দিয়াছিলেন, সেই টাকায় তিনি সামান্যভাবে ব্যবসায় আরম্ভ করিলেন। অদৃষ্ট সুপ্ৰসন্ন হইল। সকল কাজেই তিনি প্রচুর লাভ করিতে লাগিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি একজন ধনবান লোক হইয়া উঠিলেন। বেণীবাবুর আদেশ সোনা দিয়ে বঁধানো সেই মানুষের নাক তিনি গলায় পরিয়াছিলেন। তাঁহার মনে ধ্রুববিশ্বাস হইল যে, এই নাক তাঁহার ভাগ্যের মূল। V8S দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comম্পিািকস্তানাখ মািট”সখিৰ চতুৰ্থ অধ্যায়। ভয়াবহ শব্দ রাইচরণ রায়মহাশয় যথাসময়ে গোলোকধামে আসিয়া বেণীবাবুর বাটীতে বাস করিতে লাগিলেন। বড়ালমহাশয় তাহাকে সমুদয় সম্পত্তি বুঝাইয়া দিলেন। বড়ালমহাশয়কে তিনি কৰ্ম্মচুত্যুত করিলেন না। যেমন বেণীবাবুর সময়ে তিনি কাজকৰ্ম্ম করিতেন, এখনও তিনি সেইরূপ কাজকৰ্ম্ম করিতে লাগিলেন। বেণীবাবুর আত্মীয়স্বজন কেহ ছিল না। সেজন্য উইলের প্রোবেট লাইতে কোন গোলযোগ হয় নাই। কিন্তু অল্পদিন পরে গ্রামবাসীদিগের সহিত গোলযোগ উপস্থিত হইল। গ্রামের সকলেই রায়মহাশয়ের প্রজা। প্ৰজাদিগের খাজনা বৃদ্ধি করিতে রায়মহাশয় চেষ্টা করিলেন। তাহদের সহিত সেজন্য নানারূপ মোকদ্দমা-মামলা চলিতে লাগিল । রায়মহাশয়ের পুত্র ছিল না, কেবল এক কন্যা। কন্যা ও জামাতা তাঁহার বাড়ীতেই থাকিত। তাহা ব্যতীত রায়মহাশয়ের স্ত্রীর ভগিনীর কন্যা, অর্থাৎ বোন-ঝি ও তাঁহার দুই কন্যা এই সংসারে থাকিত। স্ত্রীর ভগিনীর কন্যা বিধবা ছিলেন। সাত বৎসর এইরূপে কাটিয়া গেল। তাহার পর একদিন রাত্রিতে রায়মহাশয়ের সহসা নিদ্রাভঙ্গ হইল। মানুষের পদশব্দ তাঁহার কর্ণগোচর হইল। বাটীতে চোর প্রবেশ করিয়াছে, এইরূপ অনুমান করিয়া তিনি আলো জ্বলিলেন। দোতলার প্রায় সকল ঘরেই সারসি খড়খড়ি সম্বলিত জানালা ছিল । রায়মহাশয় যে ঘরে শয়ন করি বাটীর ভিতর দিকে তাহাতে দুইটি জানােলা ছিল। বিছানার নিকট যে জানালা,(স্তোিহর খড়খড়ি খোলা ছিল; কিন্তু সারসি অর্থাৎ কাচ বন্ধ ছিল। রায়মহাশয় দেখিলেন যে৯%দালানে দাঁড়াইয়া একজন ঘোর কৃষ্ণকায় লোক সেই কাচের উপর মুখ রাখিয়া উকিও মন্ত্র । কাচের উপর এত সবলে সে আপনার মুখ রাখিয়াছে যে, তাহার নাক যেন বৃষ্টিাির্গয়াছে। নাক যেন নাই এইরূপ বােধ হইতেছিল। “কে ও! কে ও!” বলিয়া রায়মহাশয় তাড়াতাড়ি ঘর হইতে বাহির হইলেন। দুড়দুড় করিয়া পদশব্দ হইল। পূৰ্ব্বদিকের সিঁড়িতেও সেইরূপ শব্দ হইল। তাহার পর আর কিছু তিনি শুনিতে বা দেখিতে পাইলেন না। বাটীর সকলে জাগিয়া উঠিল। নীচে একজন চাকর বাস করিত, সে দৌড়িয়া আসিল । রায়মহাশয়ের জামাতা উঠিলেন। বাহির বাটীতে বড়ালমহাশয় বাস করিতেন, তিনি আসিলেন । সমস্ত বাটী সকলে তন্নতন্ন করিয়া অনুসন্ধান করিল। চোরের চিহ্নমাত্র কেহ দেখিতে পাইল না। সদর দরজা ও অন্তঃপুরের খিড়কি-দরজা সন্ধ্যার পর যেরূপ বন্ধ করা হইয়াছিল, এখনও সেইরূপ বন্ধ ছিল। আশ্চৰ্য্য কথা! চোর কিরূপে পলায়ন করিল? বদ্ধদ্বার জানালার ভিতর দিয়া অথবা প্রাচীর ভেদ করিয়া রক্ত-মাংসের শরীরবিশিষ্ট মানুষ পলাইতে পারে না। রায়মহাশয় কি স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন? অথবা যে কৃষ্ণকায় মূৰ্ত্তি তিনি দেখিয়াছিলেন, তাহা কি মানুষ নহে? নানারূপ তর্ক-বিতর্ক হইতে লাগিল। একমাত্র বড়ালমহাশয় নিস্তব্ধ রহিলেন। কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া অবশেষে জিজ্ঞাসা করিলেন, — “মানুষটা কিরূপ ঠিক করিয়া তাহা আমাকে বলিতে পারেন?” রায়মহাশয় উত্তর করিলেন,- “কেবল নিমিষের নিমিত্ত সে আমার নয়নগোচর হইয়াছিল। আমি অধিক কিছু বলিতে পারি না যে, তাহার বর্ণ অতিশয় কালো। বয়ঃক্রম চল্লিশ হইবে।

                • দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ w8wo সারসিতে এরূপভাবে সে আপনার নাসিকা চাপিয়া ধরিয়াছিল যে, তাহাতে নাক একবারে চেপৃটাি হইয়া গিয়াছিল। এরূপ লোক এ গ্রামে কেহ আছে?”

বড়ালমহাশয় বলিলেন, — “না, আমি কিছু বুঝিতে পারিলাম না।” পরদিন গ্রামে কোন লোকের বাড়ীতে পাঠা বলিদান হইয়াছিল। রাত্রিতে অনেকগুলি বন্ধুকে সে নিমন্ত্ৰণ করিয়াছিল। আহারাদির পর একজন লোক বাটি করিয়া একটু রাধা মাংসা লইয়া যাইতেছিল। বর্ষাকাল । অন্ধকার রাত্রি। বামহাতের উপর পাঠার বাটি রাখিয়া দক্ষিণহস্তে লাঠির শব্দ করিতে করিতে কাদা-কিচা ভাঙ্গিয়া লোকটি আস্তে আস্তে যাইতেছিল। পথে একটি হেলা বেলগাছ হইতে কে "খুপ” করিয়া তাহার হাত হইতে পাঠার বাটিটি তুলিয়া লইল। ভয়ে আউমাউ করিয়া সে রুদ্ধশ্বাসে পলায়ন করিল ও কিছুদূর গিয়া একেবারে অজ্ঞান হইয়া পড়িল । নদীর নিকট গ্রাম। গ্রামের ভিতর তখন বান আসিয়াছিল। মাঝে মাঝে ভূমি উচ্চ করিয়া তাহার উপর লোকে গৃহ নিৰ্ম্মাণ করিয়াছিল। লোকের বাটীগুলি যেন দ্বীপের ন্যায় হইয়াছিল। নিকটস্থ কয়েক বাটী হইতে লোক দীেড়িয়া আসিল । অনেক কষ্টে সেই ভয়প্রাপ্ত লোককে তাহারা সচেতন করিল। সে রাত্রিতে বেলগাছের দিকে যাইতে কেহ সাহস করিল না। পরদিন প্ৰাতঃকালে সকলে দেখিল যে, বেলতলায় কাসার বাটিটি পড়িয়া আছে। মাংসাটুকু ভূত চাটিয়া-পুটিয়া খাইয়াছে। তাহার পর দুইদিন সন্ধ্যার পর দুইজন গ্রামবাসীর সহিত ভূতটির সাক্ষাৎ হইল। তাহারা অবশ্য ঘোরতর ভীত হইয়া চীৎকার করিতে করিতে তুহার নিকট হইতে পলায়ন করিল। সেইদিন হইতে গ্রামের লোক সন্ধ্যার পর আর কেহ।। ऊ दांशिद्ध ट्रेऊ न्ी । काश्ी क्षेळ्ञ्श्रे তাহার নাক নাই । দুইদিন পরে বিষম বর্ষা আরম্ভ ঘোর দুৰ্যোগ। রাত্রিদিন টিপু টিপু করিয়া জল পড়িতে লাগিল। মাঝে মাঝে মুষলধারে বৃষ্টি আসিতে লাগিল। আকাশ ঘোর মেঘাচ্ছন্ন হইয়াছিল। বাতাসের শো-শো ও বৃষ্টি-ঝাপটের চট্ট চট্ট শব্দে পৃথিবী কম্পিত হইতেছিল। নদীতে আরও প্রবলবেগে বান আসিল। গ্রাম পূৰ্ব্ব অপেক্ষা আরও গভীরভাবে প্লাবিত হইল। এক একটি উচ্চ স্থানের গৃহগুলিকে দ্বীপের ন্যায় দেখাইতে লাগিল। চারিদিকে প্রশস্ত বাগান দ্বারা পরিবেষ্টিত রায়মহাশয়ের বৃহৎ অট্টালিকা উচ্চ ভূমিতে ছিল। তাহার ভিতর নদীর জল কখন প্রবেশ করে নয় { শো শো, ভোঁ ভো, চট্ট চট্ট, পটু পটু,-ঝড় ও জলের শব্দ। একে বান, তাহাতে ভূতের ভয়, তাহাতে ঘোর দুৰ্য্যোগ। আজ দিনের বেলাতেই ঘর হইতে কেহ বড় বাহির হয় নাই। মানুষের কথা দূরে থাকুক, জীব-জন্তু কাক-পক্ষীও আজ আহারান্বেষণে বাহির হয় নাই। সন্ধ্যা হইল, নিবিড় অন্ধকারে পৃথিবী আচ্ছন্ন হইয়া পড়িল। রাত্রি দুই প্রহর অতীত হইয়াছে। এমন সময়ে সেই বৃষ্টির শব্দ ভেদ করিয়া আর একপ্রকার শব্দ উত্থিত হইল। রায়মহাশয়ের বাটীর নিকট একটি বৃহৎ তেঁতুল গাছ আছে। সেই তেঁতুল গাছের নিবিড় শাখাপল্লবের ভিতর হইতে এই ভয়াবহ শব্দ উখিত হইল। “হু হু! হু হু! হু হু হু!” শব্দটা এইরূপ। কিন্তু অতি ভয়াবহ শব্দ। অতি ভীষণ শব্দ। w88 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comখ্রিসার্ক"********* পঞ্চম অধ্যায় খাদা ভূত তেঁতুল গাছ হইতে সেই ভীষণ শব্দ উথিত হইল। সেই শব্দে গ্রামের সমস্ত লোক জাগরিত হইল। কি ভয়ানক ব্যাপার! এ কি সেই খাদা ভূতের কাণ্ড, অথবা অন্য কোন দানাদৈত্য রাক্ষসেরা চীৎকার! সকলের বক্ষঃস্থল ভয়ে ধড় ধড় করিতে লাগিল। ঘোর আতঙ্কে সকলের হস্তপদ কঁপিতে লাগিল। বালক-বালিকাগণ চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। “চুপ চুপ” করিয়া মাতা-পিতাগণ তাহাদিগকে সান্তুনা করিতে লাগিলেন। শিশুগণ মাতাগণকে জড়াইয়া ধরিল। মাতাগণ তাহাদিগকে কোলে টানিয়া লইলেন। বয়স্ক লোকগণ দুর্গা দুৰ্গা বলিয়া দেবতাগণকে স্মরণ করিতে লাগিল। পুরুষগণ উঠিয়া বিছানায় বসিল। আলো জুলিয়া তামাক সাজিবে, সে সাহস কাহারও হইল না। “হু হু। হু হু। হু হু হু।” তেঁতুল গাছ হইতে যাই এই শব্দ উথিত হইল, আর চারিদিকে “হঁ্যাক্কা হুয়া, হ্যাক্কা হুয়া হু” শৃগালগণ ডাকিয়া উঠিল। সেই সময় কাক-পক্ষিগণ অন্ধকার না মানিয়া, বৃষ্টি-বাদল না মানিয়া, বৃক্ষশাখা পরিত্যাগ করিয়া উড়িতে লাগিল। কা কা রবে: তাহারা একবার এ ডালে হইতে উড়িয়া অন্য ডালে গিয়া বসিতে লাগিল। নিকটস্থ বঁাশঝাড়ে বকের পাল পালকের ভিতর মস্তক লুকাইয়া বৃষ্টির জলে ভিজিতেছিল। কক ককরবে তাহারাও চারিদিকে উড়িতে লাগিল। বাদুড়গণ সনু সন্ন শব্দে স্ংেস্থান হইতে পলায়ন করিতে লাগিল। পেচকগণ হুঠ হুঠ রবে রায়মহাশয়ের অট্টালিকা- র ভিতর আশ্ৰয় লইল। নিকটস্থ কয়েক বাটী হইতে কুকুরগুলো ডাকিতে ডাকিস্তবাহির হইল। কিন্তু কিছুদূর অগ্রসর হইলে, যেই সেই তেঁতুল গাছ তাহাদের নয়নগােচুৰ্ভুইর্ল, আর তাহারা বসিয়া পড়ল। লাঙ্গুল ভিতরে রাখিয়া পশ্চাৎ পদদ্বয়ের উপর ভর দুয়ু উচ্চভ বা বসিয়া, দূর হইতে তেঁতুল গাছের দিকে একদৃষ্টি চাহিয়া তাহারা অতি ভয়ঙ্করঞ্জৰ্দৈ ক্ৰন্দন করিতে লাগিল। সেই গভীর নিশাকালে সেই ক্ৰন্দনে আতঙ্কের আর সীমা রহিল না। অল্পক্ষণ পরে পৃথিবী নীরব হইল। কিন্তু সে স্থিরভাবে অধিকক্ষণ রহিল না। তেঁতুল গাছ হইতে পুনরায় সেই ভীষণ শব্দ উথিত হইল— 'छ, छ, छ, छ, छ, छ, छ ।" আর পরীক্ষণেই শৃগালগণ পুনরায় ডাকিয়া উঠিল— “शाकों इशा, शाका इशी इश् ।।” পুনরায় পক্ষীর কোলাহল আরম্ভ হইল। পুনরায় কুকুরগণ কাদিয়া উঠিল। অক্ষণ পরে আর একবার পৃথিবী সৃদ্ধি হইল, কিন্তু পরমুহূর্বে পুনরায় সেই ভয়াবহ শব্দ 'छ, छ, इ२, ३, छ, छ, छ ।" সেইসঙ্গে শৃগালগণের ডাকে পৃথিবী পরিপূরিত হইল,— পূৰ্ব্বের ন্যায় কাক-পক্ষিগণের কোলাহলে ও কুকুরের ক্ৰন্দনে মানুষের হৃদয় স্তম্ভিত হইয়া পড়িল। তিনবার চারিদিকে ঘোর কোলাহল উপস্থিত হইল, তাহার পর আর সে শব্দ হইল না। বায়ুর সন্য সন ও বৃষ্টি-ঝাপটের চটু চাটু ব্যতীত আর কোন শব্দ হইল না। পুরাপের পরিণাম V8 sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro কিন্তু গ্রামের লোকের আর নিদ্রা হইল না। ভয়ে শঙ্কিত হইয়া দেবতাদিগকে ডাকিয়া সকলে রাত্রি যাপন করিল। পরদিন গ্রামের লোক পরস্পর চুপি চুপি বলাবলি করিতে লাগিল,— “পুরুষপুরুষানুক্রমে আমরা এ স্থানে বাস করিতেছি। এরূপ বিষম ব্যাপার গ্রামে পূৰ্ব্বে কখন ঘটে নাই। ভূতের কণ্ঠস্বর খোনা হয় সত্য, কিন্তু ভূত যে খাদা হয় তাহা কখন আমরা শুনি নাই। তাহার উপর ঘোর রাত্ৰিতে এই ভয়ানক শব্দ! এরূপ ভয়াবহ শব্দ কেহ কখন শ্রবণ করে নাই। ভূস্বামীর পাপে এই সকল অমঙ্গল ঘটিয়াছে। রাজাবাবুর সময়ে আমরা পরম সুখে কালযাপন করিতেছিলাম। কোথা হইতে একটা অনাহুত হতভাগা লোক আসিয়া আমাদের সর্বনাশ করিল। এ গ্রামে আর আমাদের ভদ্রস্থ নাই। পরদিন প্ৰাতঃকালে রাইচরণ রায়মহাশয় তাহার কৰ্ম্মচারী বড়ালমহাশয়কে ডাকিতে পাঠাইলেন। ভূতের ভয়ঙ্কর চীৎকার সম্বন্ধে দুই জনে অনেক কথাবাৰ্ত্ত হইল। বড়াল বলিলেন, — “না মহাশয়! আমাদের গ্রামে পূৰ্ব্বে খাদা ভূতের উপদ্রব ছিল না। রাত্রি দুই প্ৰহরের সময় এরূপ ভয়ঙ্কর চীৎকারও কেহ শ্ৰবণ করে নাই।” সেইদিন রায়মহাশয় আপনার স্ত্রীকে বলিলেন, “দেখ রায়ণী ! আমার মনে কিরূপ একটা আতঙ্ক উপস্থিত হইয়াছে, খাদা ভূত প্ৰথমে আমার বাটীতে আসিয়াছিল। তাহার পর আমার তেঁতুল গাছ হইতে সে বিকট শব্দ করিয়াছে। বিজয়কে প্ৰবঞ্চনা করিয়া আমরা এই বিষয় লইয়াছি। আমি দেখিতেছি যে, ইহাতে আমাদের ভাল হইবে না। আমাদের সর্বনাশ করিবার নিমিত্ত খাদা ভূতের আবির্ভাব হইয়াছে।” স্বামীকে ধমক দিয়া রায়ণী বলিলেন,- “ ( র সাহস থাকে। কিন্তু তোমার মত ষষ্ঠ অধ্যায় ঘোর অনুতাপ সে বৎসর খাদা ভুতকে আর কেহ দেখিতে পাইল না। আর সেরূপ ভয়ঙ্কর শব্দ হইল না। কিন্তু অল্পদিন পরে রায়মহাশয়ের জামাতা রোগ দ্বারা আক্রান্ত হইলেন। সেই রোগে তাঁহার হইল । "এক কন্যা ব্যতীত রায়মহাশয়ের অন্য সন্তান ছিল না। সেই কন্যা বিধবা হইল, কন্য এখনও অল্পবয়স্কা, এখনও তাহার সন্তান-সন্ততি হয় নাই। রায়মহাশয় ও তাঁহার গৃহিণী গভীর শোক-সাগরে নিমগ্ন হইলেন। এত কাণ্ড করিয়া সম্পত্তি লাভ করিলেন, সে সম্পত্তি এখন কে ভোগ করিবে? গৃহিণীর অন্তঃকরণেও ঘোর অনুতাপ উপস্থিত হইল। মিথ্যাকথা,নীচতা, নিষ্ঠুরতা, প্রবঞ্চনা প্রভৃতি পাপকাৰ্য্য করিলে, মানুষ যে তাহার প্রতিফল পায়, এখন তাহার মনে নিশ্চয় বিশ্বাস \სტ8\სტ দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comপূির্ড"*?)".********* হইল। গাছতলায় বাস করিয়া, দিনান্তে শাকান্ন ভোজন করিয়া, ধৰ্ম্মপথে থাকিয়া, মানুষ যদি প্রিয়জনের অকাল-মৃত্যু-জনিত শোক হইতে নিস্কৃতি পায়, সেও ভাল; তথাপি শোক-বিদীর্ণ হৃদয়ে কোটিপতি হওয়াও কিছু নহে। তিনি ভাবিলেন যে,- “এই মুহূৰ্ত্তে সৰ্ব্বস্ব পরিত্যাগ স্ত্রী-পুরুষে ঘোর দুঃখে দিনপাত করিতে লাগিলেন। এক বৎসর কাটিয়া গেল। পুনরায় ভদ্রমাস আসিল । নদীর বানে গ্রাম পুনরায় প্লাবিত হইল। রায়মহাশয় নিদ্ৰা যাইতেছিলেন। সহসা তাহার নিদ্রাভঙ্গ হইল। তাহার মনে কিরূপ একটা আতঙ্ক উদয় হইল। তাড়াতাড়ি তিনি আলো জুলিলেন। গত বৎসরের ন্যায় বাড়ীর ভিতর বারেণ্ডার দিকের খড়খড়ি খোলা ছিল, কিন্তু সারসি বন্ধ ছিল। সেইদিকে তাঁহার দৃষ্টি পড়িল। তিনি দেখিলেন যে, কাচের উপর মুখ রাখিয়া ঘোর কৃষ্ণবর্ণের সেই খাদা ভূত দাঁড়াইয়া আছে। রায়মহাশয় ভীরু ছিলেন না। এই অমানুষিক মূৰ্ত্তি দেখিয়া ঘোরতর ভীত হইয়াছিলেন বটে, তথাপি তিনি সাহস করিয়া ঘর হইতে বাহির হইলেন। কিন্তু কোন স্থানের ভূতের চিহ্নমাত্র পাইলেন না। চাকর উপরে আসিল । গোলমাল শুনিয়া বড়ালমহাশয় বাহির বাড়ী হইতে আসিলেন। তন্নতন্ন করিয়া সকলে সমুদয় বাড়ী অন্বেষণ করিল। কিন্তু ভূতের চিহ্নমাত্র কেহ দেখিতে পাইল না। সদর দ্বার ও খিড়কি দ্বার পূৰ্ব্বের ন্যায় বন্ধ ছিল। সুতরাং ভয় দেখাইতে অথবা চুরি করিতে, বাহির হইতে কেহ বাটীর ভিতর প্রবেশ করে নাই। বাড়ীটি বৃহৎ। দুই মহল, দুই তলা, কতক কতক একালের চক-মিলান বাটী। বাড়ীর ভিতর উত্তর দিকে দােতালায় দুইটি বৃহৎ ঘর দুই ঘরে রায়মহাশয় ও তাঁহার স্ত্রী বাস করেন। পশ্চিম দিকে দুইটি ঘর। हू5* য়র কন্যা ও জামাতা বাস। করিতেন। এক্ষণে একজন বি লইয়া তাহার কুন্ঠী একাকিনী দুই ঘরে বাস করেন। উত্তরপশ্চিম কোণে একটি সিঁড়ি। পূৰ্ব্বদিকে শয়নাগার। তাহাতে রায়মহাশয়ের স্ত্রীর ভগিনীকন্যা আপনার দুই কন্যা লইয়া । পূৰ্ব্বে এই দুইটি ঘরে বেণীবাবু ও তাঁহার স্ত্রী শয়ন করিতেন। ইহার পার্শ্বে অন্ধকার ঘর। তাঁহাতে বেণীবাবুর জিনিসপত্র থাকিত। তাহার পার্শ্বে পূৰ্ব্বদিকে আর একটি সিঁড়ি। অন্তঃপুরের দক্ষিণ দিকে পূজার দালানের পশ্চাৎপ্রাচীর। পূৰ্ব্বে দালানে পূজা হইত। এক্ষণে ক্রিয়াকলাপ বন্ধ হইয়া গিয়াছে। দালানের সম্মুখে, বাহির বাটীর প্রাঙ্গণ ঘাস ও বনে পরিপূর্ণ হইয়াছে। বাহির-বাটীতে উপর ও নীচে অনেকগুলি ঘর। তাহার দুইটি ঘরে বড়ালমহাশয় সপরিবারে বাস করেন। সদর দরজা সৰ্ব্বদাই বন্ধ থাকে। ভিতর-বাটীর পশ্চিম দিকে খিড়কি দ্বার। সেই দ্বারা দিয়া সকলে আনাগোনা করেন। প্ৰাতঃকালে রায় মহাশয় জানিতে পারিলেন যে, পূৰ্ব্ব দিকে যে অন্ধকার ঘর আছে, তাহার অনেকটা প্রাচীর ভূতে খনন করিয়াছে। তাহা দেখিয়া সকলে আশ্চৰ্য্যান্বিত হইল। ভূতে কি কখন কোন স্থান খনন করে? অন্ধকার ঘর তালা দ্বারা আবদ্ধ ছিল। তালা সেইরূপ বন্ধ ছিল। সুতরাং মানুষে ঘরের প্রাচীর খনন করে নাই। কিন্তু ভূতে দেয়াল খুঁড়িল কেন? বড়ালমহাশয়কে ডাকিয়া কৰ্ত্তা জিজ্ঞাসা করিলেন,— “ভূত গত রাত্রিতে চাের-কুঠরির প্রাচীর খনন করিয়াছে। ইহার কারণ কি, অনুমান করিতে পারেন?” বড়ালমহাশয় কারণ অনুমান করিতে পারিলেন না। রায়মহাশয় একটু চিন্তা করিয়া পুনরায় বলিলেন,- “এ স্থানে দেখিতেছি লোকের খনন করা বাই। মানুষেও খনন করে, ভূতেও খনন করে। এ বাড়ীতে প্ৰথম যখন আমরা আগমন পাপের পরিণাম sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro Վ98 Ղ করি, তখন আসিয়া দেখিলাম যে আপনি অনেকগুলি ঘরের মেজে খুঁড়িয়া নূতন করিয়াছেন। আপনাকে আমি এ কাজ করিতে বলি নাই। তাহার পর কখনও এ স্থান, কখনও সে স্থান, মাঝে মাঝে আপনি খনন করেন। কখনও বা ঘরের দেয়ালে ঘা মারিয়া পরীক্ষা করেন। ইহার কারণ কি, তাহা আমি বুঝিতে পারি না। কোনও স্থানে ধন প্রোথিত আছে?” বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন,- “বালি-কাম ফাঁপিয়াছে কি না, পুনরায় মেরামত করিতে হইবে কি না তাহাঁই আমি পরীক্ষা করিয়া দেখি ।” রায়মহাশয় বলিলেন,- “বাগানের ভূমিতে বালি-কাম আবশ্যক হয় না। বাগানেও এ স্থান সে স্থান খনন করেন কেন? কিছুদিন হইতে আপনি আবার গাছ কাটিতে আরম্ভ করিয়াছেন। আমার অনুমতি না লইয়া সেদিন বড় একটি শিরীষ গাছ আপনি কাটিয়াছেন। ইহার কারণ R్మూ বড়ালমহাশয়ের মুখ শুষ্ক হইয়া গেল। মনের অসাবধানতাবশতঃ সহসা তিনি বলিয়া ফেলিলেন,- “ঝম-বমির গাছ?” রায়মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “সে আবার কি? বমি-বমির গাছ আবার কি?” বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন,- “শিরীষ গাছের স্ট্রটি শুষ্ক হইলে বাতাসে ঝম ঝাম করিয়া শব্দ হয়।” রায়মহাশয় আর কোন কথা বলিলেন না। বড়ালমহাশয় যে কোন বিষয় গোপন করিতেছেন, তাহা তিনি বুঝিতে পারিলেন। কিন্তু জিজ্ঞাসা করা বৃথা বলিয়া চুপ করিয়া রহিলেন । န္တိမ် তারপর তিন চারি রাত্রি রায়মহাশয়ের গ খুঁটিখাট শব্দ হইল। মানুষের পদশব্দও কেহ শুনিতে পাইল । রায়মহাশয় দুই চারি জন চাকরকে দালানে শয়ন করিতে বলিলেন । সেইদিন হইতে দোতলায় শব্দ হইল না। কিন্তু নিম্নের তলায়, বিশেষতঃ পূৰ্ব্ব দিকের ঘরগুলিতে নানারূপ লাগিল। এই সময় কোন গ্রামবাসীর সহিত খাদা ভূতের সাক্ষাৎ হইল। গ্রামের লোক উভয়ে জড়সড় হইয়া পড়িল। সন্ধ্যার পর ঘর হইতে বাহির হওয়া একেবারে বন্ধ হইয়া গেল । অমাবস্যার রাত্রি আসিল। ভদ্রমাস। বর্ষাকাল। ঘোর অন্ধকার। রাত্রি দুই প্ৰহরের পর সেই তেঁতুল গাছ হইতে পুনরায় সেই ভীষণ শব্দ উখিত হইল,— छ् छ्, छ् इ६, छ् छ् छ्! পুনরায় পূৰ্ব্বের ন্যায় শৃগাল ডাকিয়া উঠিল,— ईJाका छशों, ईशांकों छशों छ। পুনরায় পূর্বের ন্যায় জীব-জন্তু, কাক-পক্ষীর কোলাহল পড়িয়া গেল। গ্রামের লোক সেইরূপে ভীত হইল। ঘোরতর অমঙ্গলের আশঙ্কা করিয়া দেবতাদিগকে তাহারা স্মরণ করিতে ब्लश्रिोब्ल। রায়মহাশয় ভাবিলেন যে,- “গত বৎসর তেঁতুল গাছ হইতে এইরূপ ভয়ানক হাঁক আসিয়াছিল। সেই হকের পর আমার জামাতার পরলোক হইল। এবার আবার কি হয় দেখা ।” সত্য সত্যই ঘোর অমঙ্গল ঘটিল। রায়মহাশয়ের বিধবা কন্যাটি পীড়িত হইল। সেই রোগেই তাহার মৃত্যু হইল। স্ত্রী-পুরুষ শোকে অভিভূত হইয়া পড়িলেন। পাগ করিয়া তাঁহাদের মনে ঘোর অনুতাপ উপস্থিত হইল। ধন্যবান হইয়াও মানুষ যদি নিদারুণ শোক দ্বারা সন্তপ্ত হয় &ኃ8br দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comাির্ডলাকনাথ রচনা সংগ্ৰহ তাহা হইলে সে ধনে প্রয়োজন কি? যে তেঁতুল গাছ হইতে হাঁক আসিতেছিল, সেই গাছটি রায়মহাশয় কাটিয়া ফেলিলেন। বাড়ীতে নানরূপ পূজা-পাট স্বস্ত্যয়ন করাইলেন। ভূতের রোজাগণের দ্বারাও নানারূপ ক্রিয়াকলাপ করাইলেন। বড়ালমহাশয় বলিলেন, — “আমি আপনার বাটীতে বাস করি, কোন দিন আমার নিমিত্ত হয় তো হাঁক আসিবে। তেঁতুল গাছ কাটিয়া ফেলিলে কি হইবে? ভূত অন্য গাছে বসিয়া হাঁক দিবে। মন্ত্র-তন্ত্রে এ ভূত যাইবে না। খাদা ভূত কিজান্য আসিতেছে, বােধ হয়, তাহা আমি বুঝিয়াছি। সেই দ্রব্যটি তাহাকে আনিয়া দিলেই সে বোধ হয় আর আসিবে না।” রায়মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “সে কি দ্রব্য?” বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন,- “রাজাবাবুর নিকট শপথ করিয়াছিলাম যে, তাহার ঘরের কথা কাহাকেও আমি বলিব না। কিন্তু খাদা ভূতের দীেরাত্ম্যে যখন আমাদের প্রাণ লইয়া টানাটানি হইতেছে, তখন অগত্যা আমাকে বলিতে হইল।” রায়মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, — “রাজাবাবু কে?” বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন,- “বেণীবাবুকে আমরা বাজাবাবু বলিতাম।” বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন,- “এখনও আপনার প্রাণ, আপনার গৃহিণীর প্রাণ, সুচিন্তা এবং সুবালাদিদির প্রাণ, তাহাদের মাতার প্রাণ,- এই সমুদয় প্রাণের জন্য মঙ্গল কামনা করিতে হইবে। তাহার পর এই বাটীতে আমরাও বাস করি। আমাদেরও প্ৰাণের ভয় আছে।” পূৰ্ব্বেই বলিয়াছি যে, রায়গৃহিণীর ভগিনীর কন্যা এই বাটীতে বাস করেন। বিধবা হইয়া দুইটি কন্যা লইয়া মাসীর আশ্রয়ে তিনি দিনপাত করিতেছেন। তাঁহার কনিষ্ঠা কন্যা সুবালা এখনও নিতান্ত শিশু । রায়মহাশয় বলিলেন, — “ভাল! বেণীবাবু সংসারের কি কথা আমাকে বলিলেন, তাহা বলুন। যদি টাকা খরচ করিলে খাদা ভুত দূর হয়, তাহা আমি করিব।” বড়ালমহাশয় বলিতে লাগিলেন,- “রাজাবাবু অর্থাৎ বেণীবাবু, স্ত্রী লইয়া এই বাটীতে বাস করিতেন। তাঁহার পিতা পূৰ্ব্বদেশ হইতে আসিয়াছিলেন। এ অঞ্চলে তাঁহার আত্মীয়স্বজন কেহ। ছিল না। তাহার স্ত্রী সুন্দরী ছিলেন। সেজন্য সকলে তাঁহাকে সোনা-বীে বলিয়া ডাকিত। সোনা-বীে ধৰ্ম্মপরায়ণ স্ত্রীলোক ছিলেন। গরীব-দুঃখী লোককে কখনও এক পয়সা দিতেন না বটে, কিন্তু সৰ্ব্বদাই পূজা-পাঠ জপ-তপ লইয়া থাকিতেন। রাজাবাবু স্ত্রীকে বড় ভালবাসিতেন, কিন্তু সোনা-বীে তাঁহাকে সেরূপ ভালবাসিতেন না। রাজাবাবু রামপক্ষী, বিলাতী বিস্কুট প্রভৃতি

                  • দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ V8s সামগ্ৰী আহার করিতেন। সেজন্য জপ তপপরায়ণা স্ত্রী তাঁহাকে ঘূণা করিতেন।

“এইরূপে তাহারা স্ত্রী-পুরুষে দিনযাপন করিতেছিলেন। আমি তাহার কৰ্ম্মচারী ছিলাম। বীরু নামে রাজাবাবুর একজন প্রিয় চাকর ছিল। এক বৎসর ভদ্রমাসে নদীতে বান আসিয়াছে। প্ৰাতঃকালে সকলে দেখিল যে, এই বাগানের নিম্নে নদীর কিনারায় কৃষ্ণবর্ণের একটি লোক পড়িয়া আছে। মাথায় জটা ও গলায় রুদ্রাক্ষমালা দেখিয়া তাঁহাকে সন্ন্যাসী বলিয়া বোধ হইল। আমরা দেখিলাম যে, তিনি তখনও জীবিত আছেন। রাজাবাবু তাঁহাকে আপনার বাটীতে লইয়া আসিলেন। কয়েক ঘণ্টা পরে তাঁহার চৈতন্য হইল বটে, কিন্তু তিনি জুর-বিকার রোগ দ্বারা আক্রান্ত হইলেন। নিকটে আমাদের ভাল ডাক্তার নাই। দূর হইতে সুচিকিৎসক আনাইয়া, অনেক অর্থব্যয় করিয়া, রাজাবাবু তাঁহার প্রাণরক্ষা করিলেন। “সুস্থ হইয়া সন্ন্যাসী এই বাটীতে বাস করিতে লাগিলেন। দিনান্তে দুই সেরা দুগ্ধ ও ফল-মূল ব্যতীত অন্য কোন দ্রব্য তিনি আহার করিতেন না। সেজন্য সকলে বুঝিল যে, তিনি অতি পবিত্ৰ সাধু। গ্রামের লোকে যখন শুনিল যে, সন্ন্যাসী কেবল দুগ্ধ খাইয়া প্ৰাণধারণ করেন, তখন তাহাদের ভক্তির আর সীমা রহিল না। দলে দলে আসিয়া তাঁহার পদধূলি লইতে লাগিল। কিন্তু ভক্তি হইল সোনা-বীেয়ের! সে ভক্তির কথা আপনাকে আর কি বলিব! ভক্তিরসে তিনি একেবারে গলিয়া গেলেন । “গিলিলাম না কেবল আমি আর গলিল না বীরু, চাকর। আর গলিলেন না। রাজাবাবু নিজে। স্ত্রীর সহিত সন্ন্যাসীর ঘনিষ্ঠতা দেখিয়া রাজাবাবু চটিয়া গেলেন। বীরু, চটিয়া গেলা-সন্ন্যাসীর রামপাখী ভোজনে। রাজাবাবুর নিমিত্ত রামপক্ষী ৰু সন্ন্যাসী গোপনে তাহা বীরুর নিকট হইতে চাহিয়া লইতেন। আমি চটিল্যষ১াির্তাহার ব্ৰাণ্ডিপানে। রাজাবাবু সুরাপান করিতেন না। কিন্তু সময় অসময়ের জন্য দুই-এক বোতল ব্ৰাণ্ডি রাখিয়া দিতেন। সেই ব্ৰাণ্ডি লইতে সাধুকে আমি এ ফেলিলাম। সাধু বলিলেন যে, ইহার নাম “কারণ”; ইহা দ্রবীভূত তারা। সন্ন্যাসীদিগকে মদ্য, মাংস, মৎস্য ও মুড়ি দিয়া পূজা করিতে হয়। “সোনা-বেঁকে সন্ন্যাসী ধৰ্ম্মশিক্ষা দিতে লাগিলেন। আমরা সকলেই তাহাতে বিরক্ত হইলাম। রাজাবাবু স্ত্রীকে বড়ই ভালবাসিতেন ও তাঁহাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করিতেন। সেজন্য প্ৰথম প্রথম তিনি কোন কথা বলিলেন না। কিন্তু অবশেষে সাধুকে তিনি বাড়ী হইতে দূর করিয়া দিলেন। নদীর ধারে যে শিবমন্দির আছে, সন্ন্যাসী তাহাতে গিয়া বাস করিতে লাগিলেন । “ইহার অল্পদিন পরে সোনা-বীেয়ের একটি কন্যা হইল। রাজাবাবু সেই কন্যাটির উপর প্ৰাণমন সমৰ্পণ করিলেন, কিন্তু মাতার যেরূপ স্নেহ থাকা উচিত, তাহা ছিল বলিয়া আমাদের বোধ হইল না। মাতা প্রথম তাহাকে স্তন্যপান করাইতে সম্মত হন নাই। রাজাবাবুর ভৎসনায় শেষে তিনি সম্মত হইলেন। যাহা হউক, ছয় মাসের হইয়া একদিন সহসা কন্যাটি মারা পড়িল। শিশুর শোকে রাজাবাবু অধীর হইয়া পড়িলেন। “আরও কিছুদিন গত হইল। বাটীতে এক দিন রাত্ৰিতে আমি নিদ্ৰা যাইতেছি। বড়ালিনী আমাকে জাগাইয়া বলিলেন,- “দেখ বাড়ীর ভিতর কি গোলমাল হইতেছে। শীঘ তুমি বাড়ীর ভিতর গমন কর।” “তাড়াতাড়ি উঠিয়া আমি বাড়ীর ভিতর গমন করিলাম। দেখিলাম যে কাপড়-পোড়া গন্ধে Wło fi:Ilă zi, o ga se - www.amarboi conf** বাড়ীটি পরিপূর্ণ হইয়াছে, আর উপরে রাজাবাবুর ঘরে গিয়া দেখিলাম যে, ঘরের মাঝখানে একখানি কাপড় পুড়িতেছে। নিকটে কাঠের বঁটি-সম্বলিত একটি লোহার সিক পড়িয়া আছে। রাজাবাবু খাটের উপর চক্ষু মুদিত করিয়া পড়িয়া আছেন। কালা-বাবাকে মাটিতে ফেলিয়া বীরু তাহার বক্ষঃস্থলে হাঁটু দিয়া তাহাকে ধরিয়া আছে। “ঘরে প্রবেশ করিবামাত্র বীরু, আমাকে বলিল,- “বড়ালমহাশয়! শীর্ঘ এই ভক্ত তপস্বী বেটাকে বধিয়া ফেলুন। রাজাবাবুকে এ খুন করিয়াছে।” নিকটে কাঠের আলনা হইতে আমি একখানি কাপড় লইলাম। সেই কাপড় দিয়া বীরুতে আমাতে সন্ন্যাসীকে খাটের পায়াতে বাধিয়া ফেলিলাম। “তাহার পর রাজাবাবুকে গিয়া দেখিলাম। দেখিলাম যে, তিনি জীবিত আছেন। তাঁহার শিয়রে একখানি রুমাল ও একটি শিশি পড়িয়া আছে। রুমাল ও শিশি হইতে একপ্রকার উগ্র মিষ্টগন্ধ বাহির হইতেছে। তখন আমি বুঝিলাম যে, যে ঔষধ দিয়া ডাক্তারেরা রোগীকে অজ্ঞান করে, সেই ঔষধ প্রয়োগ করিয়া রাজাবাবুকে সন্ন্যাসী অজ্ঞান করিয়াছে। মাথায় জল দিয়া ও নানাপ্রকার শুশ্ৰষা করিয়া আমরা রাজাবাবুর চৈতন্য উৎপাদন করিলাম। তিনি উঠিয়া বসিলেন। “ঘরের মধ্যস্থলে যে কাপড় পুড়িতেছিল, তাহার আগুন আমরা নিবাইয়া ফেলিলাম। কাপড়ের সামান্য একটু অংশ অবশিষ্ট ছিল, পুড়িয়া যায় নাই। পাড় দেখিয়-চিনিতে পারিলাম যে, তাহা সোনা-বীেয়ের শাড়ী। লোহার সিক কোথা হইতে আসিল, কে আনিল, কেন আনিল, তাহা আমরা বুঝিতে পারিলাম না। সিকটি হাতে করিয়া যে, ঘোর উত্তপ্ত, অনেকক্ষণ পৰ্যন্ত কে যেন ইহাকে আগুনে রাখিয়াছে। তাড় আমি উহা ফেলিয়া দিলাম। মনে করিলাম যে, কাপড়-পোড়া আগুনে এইরূপ “রাজাবাবু আমাদের দুইজনকে সম্বোধন কৃষ্ট্র y বীরু ! এই পাষণ্ড আমার প্রাণবধ করিত্যুে হইয়াছিল। কিন্তু ইহাকে আমি পুলিসে পারি না । মকদ্দমা করিতে গেলে নটীরূপ ঘরের কথা বাহির হইয়া পড়িবে। কিন্তু এই নরাধমকে একেবারে ছাড়িয়া দিতেও পারি না। ইহার কোনরূপ দণ্ড করিতে হইবে।” “বীরু বলিল,- “বেটার নাক কাটিয়া লইতে হইবে।” আমি-ও সেই প্ৰস্তাবে সম্মত হইলাম। সমুদয় কথা গোপন রাখিবার নিমিত্ত আমরা দুই জনে তিন সত্য করিলাম।” তাহার পর রাজাবাবু বলিলেন,- “বেটার নাকটি ভালরূপে কাটিয়া লইতে হইবে। নাকটি আমি চিহ্নস্বরূপ রাখিয়া দিব।” বীরু ও আমি কালা বাবার হাত-পা উত্তমরূপে ধরিয়া রহিলাম। সুতীক্ষু ছুরি বাহির করিয়া রাজাবাবু নিজ হাতে অতি সুন্দরীরূপে তাহার নাকটি কাটিয়া লইলেন। তাহার পর একটি শিশিতে তাহা রাখিয়া ব্ৰাণ্ডি দ্বারা শিশিটি পরিপূর্ণ করিলেন। সন্ন্যাসীকে আমরা ছাড়িয়া দিলাম। তাহার বক্ষঃস্থল রক্তে ভাসিয়া যাইতে লাগিল। জলে ভিজাইয়া সেই রুমালখানি আমরা তাহাকে দিলাম। রুমাল দিয়া নাক মুছিতে মুছিতে সন্ন্যাসী পলায়ন করিল।” রায়মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “সোনা-বীে এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?” বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন,- “বাবাজী তাঁহাকে মদ্যপান করিতে শিক্ষা দিয়াছিলেন। সেই অবধি তিনি স্বামীর নিকট শয়ন করিতেন না। তাহার। পূৰ্ব্বদিকে যে ঘরে রাজাবাবু শয়ন করিতেন, তাহার পাশের ঘরে তিনি থাকিতেন। রাত্রিতে আমাকে জপ করিতে হয়, এই বলিয়া

                • দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ G(S তিনি স্বতন্ত্র থাকিতেন। এতক্ষণ তিনি বোধ হয় আপনার ঘরে ছিলেন। যাহা হউক, প্ৰাতঃকালে উঠিয়া আমরা তাঁহাকে দেখিতে পাইলাম না। শিবের মন্দিরে সন্ন্যাসীকেও কেহ। দেখিতে পাইল না। আমরা বুঝিলাম যে, তাহারা দুইজনে কোথায় চলিয়া গিয়াছেন।”

রায়মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “তাহার পর?” বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন,- “সোনা-বীে যে বাটী পরিত্যাগ করিয়া কোথায় চলিয়া গিয়াছেন, সে কথা রাজাবাবু আমাদিগকে প্রকাশ করিতে মানা করিলেন। সমুদয় জিনিষপত্র ও গেলেন। এক্ষণে কথা এই, সে নাক কোথায়?” অষ্টম অধ্যায় সে নাক কোথায় রায়মহাশয় বিস্মিত হইয়া বলিলেন,- “সে নাক কোথায়?” বড়ালমহাশয় বলিলেন, — — “হী! সে নাক ? যাইবার সময় রাজাবাবু আমাকে বলিয়া গেলেন, — “যে স্থানে ঐ নরাধম। আর ঐ পাপীয়সী যাইবে, সেই স্থানে আমিও যাইব । সকলকে ইহাদের পাপের কথা বলিব । ইহাদিগকে ঘূণিত করিব। কোন স্থানে ইহাদিগকে সুখে বাস করিতে দিব না। ইহাষ্ট্রের জীবন অসহ্য করিয়া তুলিব।” যাইবার সময় মরিয়া গিয়াছে। মরিয়া ভূত হইয়াছে। ভূত হইয়া আপনার নাকের জন্য সে আসিতেছে। ভাদ্রমাসে কালা বাবা নদীর বানে ডাসিয়া আসিয়াছিল। ভাদ্রমাসে তাহার নাসিকা ছেদন হইয়াছিল। গত ভদ্রমাসে তাহার ভূত নাসিকার জন্য আসিয়াছিল। এক্ষণে নাকটি পাইলেই সে সন্তুষ্ট হইয়া চলিয়া যাইবে। আমাদের প্রাণও বঁচিয়া যাইবে। এখন সে নাক কোথায়?” রায়মহাশয় উত্তর করিলেন,- “রাজাবাবু নানা স্থান হইতে মাঝে মাঝে আমাকে পত্র লিখিতেন। কিন্তু সে তাঁহার বিষয় সম্বন্ধে, নাকের বিষয় তিনি কিছু লেখেন নাই। তবে বীরু একবার আমাকে লিখিয়াছিল যে, সেঁকো বিষ প্রভৃতি মসলা দিয়া রাজাবাবু নাকটিকে টাটকা অবস্থায় রাখিয়াছেন, ইহা পচিয়া যায় নাই। তাহার পর সোনা দিয়া তাহাকে তিনি বাধাইয়াছেন। হারের ন্যায় চেন করিয়া সেই নাক তাহাতে তিনি সংলগ্ন করিয়াছেন। চেনসম্বলিত সেই নাক কখন তিনি গলায় পরিধান করেন, কখন বা বাক্সর ভিতর অতি যত্নে রাখিয়া (नन ।।” রায়মহাশয় বলিলেন,- “মৃত্যুকালে তাঁহার নিকট আমি ছিলাম না। আমার ভ্রাতা বিজয় তাহার নিকট ছিল। বাক্সর চাবি তিনি বিজয়কে দিয়াছিলেন। বাক্সর ভিতর যে টাকা ছিল, তাহা লইয়া বিজয় তাহার শ্ৰাদ্ধ করিয়াছিল।” W96łR দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.comশ্মির্ত্যািক্যনাথ ******* বড়ালমহাশয় বলিলেন, — “বসন্ত রোগ দ্বারা আক্রান্ত হইয়া রাজাবাবু আমাকে এক পত্ৰ লিখিয়াছিলেন। তাঁহাই তাহার শেষ পত্র। সেই পত্রে বিজয়বাবুর তিনি অনেক সুখ্যাতি করিয়াছিলেন, আর উইল করিয়া সম্পত্তি তাহাকে দিয়া যাইবেন, এই কথা আমাকে লিখিয়াছিলেন।” রায়মহাশয় বলিলেন,- “বিজয় তখন অজ্ঞ যুবক ছিল। পৃথিবীর বিষয়ে সে কিছুই জানিত না। আমরা নিষ্পর। উইল লইয়া যদি মকদ্দমা হয়, তাহা হইলে বিজয় সে বিবাদে কৃতকাৰ্য হইবে না। বিষয় পাইলেও সে রক্ষা করিতে পরিবে না। এইরূপ ভাবিয়া-চিন্তিয়া বেণীবাবু শেষে আমার নামে উইল করিলেন।” বড়ালমহাশয় বলিলেন, — “তাহার বাক্সতে নাক ছিল। নাকের বিষয় বিজয়বাবু বোধ হয় বলিতে পরিবেন।” রায়মহাশয় বলিলেন,- “কল্যই আমি কলিকাতায় বিজয়ের নিকট গমন করিব। বিজয় নাক লইয়া কি করিবে? যদি ফেলিয়া দিয়া না থাকে, তাহা হইলে তাহার নিকট হইতে নাক আনিয়া খাদা ভূতকে প্রদান করিব।” বড়ালমহাশয় বলিলেন,- “আমার নিশ্চয় বােধ হইতেছে যে, নাক পাইলে খাদা ভূত আর আমাদিগের উপর উপদ্রব করিবে না।” রায়মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “সোনা-বীে কোথায় গেলেন? বীরুই বা কোথায় গেল? এ স্থান হইতে প্ৰস্থান করিলে পরে কি হইল?” বড়ালমহাশয় বলিলেন, — “বীরু মাঝে মাঝে পত্র দিত। তাহার পত্ৰ পাঠ করিয়া আমি অবগত হইলাম যে, কালা বাবা ও প্রথম কাশী গিয়াছিলেন। কিন্তু রাজাবাবু যখন সেই স্থানে গিয়া উপস্থিত হইলেন, রা। কাশী পরিত্যাগ করিয়া বেরিলি নামক নগরে পলায়ন করিলেন। রাজাবাবুও তাঁহাঙ্গের পশ্চাৎ পশ্চাৎ সেই স্থানে গমন করিলেন। তখন করিলেন। তাহার পর রাজাবাবু তাহাদের কোন সন্ধান পাইলেন না। বদ্যিনাথ, কেদারনাথ দৰ্শন করিয়া রাজাবাবু হরিদ্বারে আসিলেন। সেই স্থানে বিসূচিকা রোগ দ্বারা আক্রান্ত হইয়া বীরুর মৃত্যু হইল। রাজাবাবু তাহার পর, আপনি যে স্থানে ছিলেন, সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সেই স্থানে তাহার পরলোক হইল। খাদা ভূতের আগমনে বুঝিলাম যে, কালা বাবার মৃত্যু হইয়াছে। কিন্তু সোনা-বীে আছেন কি নাই; যদি থাকেন তাে কোথায় আছেন, কি করিতেছেন, তাহার আমি কিছুই জানি না।” পরদিন রায়মহাশয় কলিকাতা গমন করিলেন। বিজয়বাবু এখন ধনবান লোক। বৃহৎ বাটীতে বাস করেন। নানা প্রকার মূল্যবান দ্রব্যে তাঁহার গৃহ সুসজ্জিত। লোক-জন চাকরনফরে তাঁহার বাড়ী পরিপূর্ণ। সকলের মুখে রায়মহাশয় তাহার সুখ্যাতি শ্রবণ করিলেন। বিজয়বাবুর স্ত্রী সতীলক্ষ্মী, দয়াময়ী। তাহার নাম অন্নপূর্ণা, কাজেও তিনি তাই, সকলের তিনি মী-জননী। বিজয়বাবুর একটি পুত্র হইয়াছে। তাহার বয়স ছয় বৎসর। ছেলেটি দেখিতে যেন রাজপুত্র। তাহার মৃদু-মধুর কথা শুনিলে হৃদয় শীতল হয়, বিজয়ের সুখ ঐশ্বৰ্য, বিশেষতঃ মনে শান্তি দেখিয়া ও সেই সঙ্গে নিজের অবস্থা ভাবিয়া রায় মহাশয় একটি দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিলেন । বিজয়বাবু জ্যেষ্ঠভ্রাতাকে বিশেষরূপে অভ্যর্থনা করিলেন। দুই ভ্ৰাতা একত্ৰ বসিয়া নানারূপ পাপের পরিণাময় sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro G6√S কথোপকথন করিতে লাগিলেন। পূর্বের কথা কেহই উল্লেখ করিলেন না। তবে রায় মহাশয় যখন খাদা ভূতের দৌরাত্ম্য ও নিজের বিপদের বিবরণ করিলেন, তখন বিজয়বাবু কেবল এই কথা কহিলেন– “টাকা অতি তুচ্ছ বস্তু, টাকার জন্য পৃথিবীর লোক কেন যে পাগল, তাহা আমি বৃঝিতে পারি না। যম-যন্ত্রণা-অপেক্ষা দুঃখ আর কিছুই নাই। অর্থবলে মানুষ যখন সে যন্ত্রণা হইতে নিস্কৃতি পায় না, তখন ধনের জন্য মানুষ কেন যে এত লালায়িত হয়,তাহা আমি বুঝিতে পারি না। ঈশ্বরের নিকট টাকার জন্য কখন আমি প্রার্থনা করি নাই। কিন্তু তিনি নিজেই আমাকে প্রচুর অর্থ দিয়াছেন। ভগবানকে প্ৰসন্ন রাখিলে মানুষের কোন অভাব থাকে না।” রায়মহাশয় বলিলেন,- “হা, অধৰ্ম্ম করিলে কিছুতেই মঙ্গল হয় না। শীঘ্য হউক বিলম্বে হউক, পাপের ফল ফলিয়া যায়। আমার ঘোর সর্বনাশ হইয়া গিয়াছে। বাকি আর কিছুই নাই। বাকি আছে কেবল আমার নিজের প্রাণ ও তোমাদের বড়-বীেয়ের প্রাণ। আমাদের জন্য কোন দিন হয় তো হাঁক আসিবে। আমাদের প্রাণরক্ষার নিমিত্ত কেবল একমাত্র উপায় আছে। সে প্ৰতিকার তোমার হাতে ।” বিজয়বাবু বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,- “আমার হাতে? আমি কি করিতে পারি?” বিজয়াবাবু বলিলেন,- “হঁ্যা বাক্সর ভিতর যে টাকা ছিল, তাহা লইয়া আমি তাঁহার শ্ৰাদ্ধ করিয়ছিলাম।” রায় মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, — “বাক্সর ভিতর আর কি ছিল।” বিজয়বাবু উত্তর করিলেন, — “র্তাহার বাটীর ফৰ্দ ছিল। খান কয়েক চিঠি ছিল, কতকগুলি দলিল ছিল, সে সমুদয় আমি क्रिशछि ।” রায় মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন,-“আৰু ၇• বিজয়বাবু উত্তর করিলেন,- “ ছবি ছিল, আর সোনার একটি অলঙ্কার ছিল। তাহার অধিক মূল্য নহে। কিন্তু হউক, সে অলঙ্কার তিনি আমাকে দিয়া গেছেন। সেই অলঙ্কার গলায় পরিধান করিতে মৃত্যুকালে তিনি আমাকে বার বার অনুরোধ করিয়া গিয়াছেন। তার পর যদি কখন কোন লোক আসিয়া প্রার্থনা করে, তাহা হইলে সেই অলঙ্কার তাহাকে দিতে তিনি বলিয়া গিয়াছেন।” রায়মহাশয় বলিলেন,- “সেই অলঙ্কার আজ আমি প্রার্থনা করিতে আসিয়াছি। তুমি আমাকে তাহা প্ৰদান কর।” বিজয়বাবু বলিলেন, — “আপনাকে দিতে তিনি বলিয়া যান নাই। আপনাকে আমি তাহা दि की ।” রায় মহাশয় বলিলেন,- “নিজের জন্য তাহা আমি চাই না। সে অলঙ্কার কি, ও সে দ্রব্য কাহার, তাহা যদি আমি বলিতে পারি, তাহা হইলে তুমি আমাকে দিবে কি না?” বিজয়বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন,- “সে দ্রব্য কি তাহা বলুন দেখি, শুনি । কিন্তু এখন হইতে আমি বলিয়া রাখি যে, বেণীবাবু যাহাকে দিতে বলিয়াছেন, সে লোক ভিন্ন অন্য কাহাকেও আমি তাহা দিব না।” রায় মহাশয় উত্তর করিলেন,- “সে দ্রব্য মানুষের নাক; সোনা দিয়া বাধাইয়া তাহার সহিত সোনার চেন সংলগ্ন করিয়া বেণীবাবু তাহা গলায় পরিতেন, অথবা বাক্সর ভিতর তুলিয়া রাখিতেন। সে নাক একজন সন্ন্যাসীর। সে এখন মরিয়া ভূত হইয়াছে; সে সেই খাদা やQ8 afraig -iibg gis so! - www.amarboi.comf437******** ভূত,-“যে আমার সর্বনাশ করিতেছে। নিজের নাক ফিরিয়া পাইলে সে ক্ষান্ত হইবে, আর আমার কোন অনিষ্ট করিবে না। সেজন্য নাকটি তুমি আমাকে প্ৰদান কর।” বিজয়বাবু উত্তর করিলেন,- “সে অলঙ্কারটি মানুষের নাক বটে, কিন্তু বেণীবাবু তাহা আপনাকে অথবা সন্ন্যাসীকে দিতে বলিয়া যান নাই। কুসংস্কার বলিতে ইচ্ছা করেন, বলুন:-কিন্ত আমার একান্ত বিশ্বাস যে, এই নাক আমার সমস্ত সৌভাগ্যের মূল। এই দেখুন, নাকটি আমি গলায় পরিয়া আছি। কিছুতেই এ নাক আমি আপনাকে দিতে পারি না। বেণীবাবু যাহাকে দিতে বলিয়া গিয়াছেন, একমাত্র সেই লোক ভিন্ন এই নাক আমি অন্য কাহাকেও দিব না।” রায় মহাশয় ক্রুদ্ধ হইয়া বলিলেন,- “দিবে না? উইল দ্বারা বেণীবাবু আমাকে তাঁহার সমস্ত সম্পত্তি দিয়া গিয়াছেন। সেজন্য আইন অনুসারে এ নাক আমার । জান, মকদ্দমা করিয়া তোমার কান মলিয়া এ নাক আমি লইতে পারি?” দুই ভ্ৰাতায় এইরূপ ঘোরতর বিবাদ হইল। বিজয়বাবু কিছুতেই নাক দিলেন না। হতাশ হইয়া রায় মহাশয় বাটী প্ৰত্যাগমন করিলেন। নবম অধ্যায় ভূতের SNర్ (C) ঘোরতর ক্রোধাবিষ্ট হইয়া রায় মহাশয় গৃহিণীকে সকল কথা বলিলেন। রায়ণী বলিলেন,- “আমি তো চিরকাল তোমাকে বলিয়া আসিতেছি যে, ঠাকুরপোর দয়াধৰ্ম্ম নাই।” রায় মহাশয় বলিলেন, — “আমি মনে করিয়াছিলাম যে, আমার অবৰ্ত্তমানে তুমি সম্পত্তির উপস্বত্ব ভোগ করবে। তাহার পর বিজয় ইহা পাইবে । কিন্তু এক্ষণে বিজয় যাহাতে না পায়, সেইরূপ উইল করিব।” বড়াল মহাশয়কেও তিনি সকল কথা বলিলেন। আরও বলিলেন যে, তাঁহার মৃত্যুর পর বিজয় যাহাতে বিষয় না পায়, সেইরূপ উইল করিবেন। তিনি বলিলেন, — “কিন্তু দেখুন বড়াল মহাশয়! সোনা-বীেয়ের কথা শুনিয়া আমি বড় ভীত হইয়াছি। যতদিন রায়-গৃহিণীর বয়স অধিক না হয়, ততদিন তাঁহাকে আমি দানবিক্রয়ের ক্ষমতা দিব না। বয়ঃক্রম পঞ্চাশ বৎসর পূর্ণ হইলে পরে তিনি দান-বিক্রয় করিতে পরিবেন।” রায় মহাশয় এইরূপ উইল করিলেন, — প্রথম। তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার ভাৰ্য্যা বিষয়ের উপস্বত্ব ভোগ করবেন। দ্বিতীয়। যতদিন না। তাঁহার বয়ঃক্রম পঞ্চাশ বৎসর পূর্ণ হয়, ততদিন তিনি সম্পত্তি দানবিক্রয় করিতে পারেন না। তৃতীয়। অমুক সালের ২রা শ্রাবণ তাঁহার বয়ঃক্রম পঞ্চাশ বৎসর পূর্ণ হইবে। তাহার পর যে দিন ইচ্ছা, যাহাকে ইচ্ছা, এই সম্পত্তি তিনি দান অথবা বিক্রয় করিতে পরিবেন। পাপের পরিণাময় sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro W20ł6ł চতুর্থ। রায়-গৃহিণীর বয়ঃক্রম পঞ্চাশ বৎসর পূর্ণ হইলে, বড়াল মহাশয় পুরস্কারস্বরূপ এক হাজার টাকা পাইবেন। পঞ্চম। যতদিন তাহার স্ত্রী জীবিত থাকিবেন, ততদিন বড়াল মহাশয় ৫০ টাকা হিসাবে বেতন পাইবেন । এইরূপ উইল করিয়া বড়াল মহাশয়কে তিনি বলিলেন,- “আমার স্ত্রীর জীবনের উপর আপনার স্বাৰ্থ রাখিয়া দিলাম। তাঁহাকে জীবিত রাখিতে আপনি যত্ন করবেন। আমার ভাই যাহাতে এ সম্পত্তি না পায়, ইহাই আমার একান্ত ইচ্ছা। এরূপ নারধম নিষ্ঠুর ভাই আমি কখনও দেখি নাই। আমাকে প্ৰবঞ্চনা করিয়া, বেণীবাবুকে ফুসলাইয়া সে এই সম্পত্তি লইতে চেষ্টা করিয়াছিল ।” রায় মহাশয় পুনরায় বলিলেন, — “উইল করিয়া এক্ষণে আমি নিশ্চিন্ত হইলাম। খাদা ভূতের যাহা ইচ্ছা এখন করুক। কিন্তু এবার ভাদ্রমাসে পুনরায় আসিয়া যদি সে পূৰ্ব্বরূপ হুঙ্কার শব্দ করে, তাহা হইলে, এ গ্রাম পরিত্যাগ করিয়া আমি অন্যত্র গমন করিব। ভাদ্রমাস আসিলা। খাদা ভূত যথারীতি উকি মারিতে না পারে, সেজন্য বাড়ীর ভিতরদিকের জানালা দুইটি রায় মহাশয় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করিয়া রাখিলেন। একদিন রাত্রিতে সহসা তাঁহার নিদ্রাভঙ্গ হইল। মনে পূৰ্ব্বের ন্যায় আতঙ্ক উপস্থিত হইল! “আলো জ্বলিব না, কোনওদিকে চাহিয়া দেখিব না,”— এইরূপ বার বার মনে মনে তিনি সঙ্কল্প করিলেন। কিন্তু কিছুতেই তিনি থাকিতে পারিলেন না। উঠিয়া আলো জ্বলিলেন। বাগানের দিকে জানালা খোলা ছিল। সেই জানালার ধারে দাঁড় করিলেন। দেখিলেন যে, নিম্নে একজন মানুষ দাড়াইয়া আছে। অন্ধকারে চিনিতে পারিলেন না; খাদা ভূত এবার এক অদ্ভুত বা ঐ করিল। অরন্ধর পূর্বদিন রায় মহাশয়ের বাটীতে প্রচুর পরিমাণে অন্ন-ব্যঞ্জন রন্ধন হইয়াছিল, পরদিন প্ৰাতঃকালে উঠিয়া সকলে দেখিল যে, ভূত এক হাঁড়ি ইলিস মাছ, আধ হাঁড়ি কচুশাক ও সেই পরিমাণে ভাত-দলি খাইয়া গিয়াছে। ভূতের খোয়াক, না রক্ষসের খোরাক! সেই রাত্রিতে ভয়ানক রবে পূৰ্ব্বরূপ ভূতের হাঁকে পৃথিবী কম্পিত হইল, এবার তেঁতুল গাছ ছিল না। এবার রায়মহাশয়ের বাটীর ছাদে আলিসার উপর বসিয়া ভূতে হাঁক দিল। হাঁকের পরদিন হইতে খাদা ভুতকে আর কেহ দেখিতে পাইল না। সেই রাত্রিতে রায় মহাশয় পক্ষাঘাত রোগ দ্বারা আক্রান্ত হইলেন; তাহার অৰ্দ্ধ অঙ্গ একেবারে পড়িয়া গেল, তাহার চলৎশক্তি একেবারে রহিত হইয়া গেল। ডাক্তার বলিল,-“এ অবস্থায় তাঁহাকে নাড়া-চাড়া করিলে হঠাৎ মৃত্যু হইতে পারে। রায় মহাশয় সঙ্কল্প করিয়াছিলেন যে, এবার ভূতের হাঁক আসিলে তিনি অন্যস্থানে গমন করিবেন। তাহা আর হইল না। ঘোর কষ্টে রায় মহাশয় দিনযাপন করিতে লাগিলেন। আর এক বৎসর কাটিয়া গেল। পুনরায় ভাদ্র মাস আসিল। ভদ্রমাসের শেষে পুনরায় খাদা ভূতের উপদ্রব আরম্ভ হইল। গ্রামের প্রান্তভাগে একজন বিধবা সদূগোপনী বাস করিত। একদিন সন্ধ্যার পর ঘরের দাওয়া অর্থাৎ পিড়াতে বসিয়া সে রন্ধন করিতেছিল। হঠাৎ সেই স্থানে খাদা &ኃdኵAኃ দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com/f4র্জ্যািক্যনাথ রচনা সংগ্ৰহ ভূত আসিয়া উপস্থিত হইল। “মা গো” বলিয়া চীৎকার করিয়া সদৃগোপনী ঘরের ভিতর পলায়ন করিল ও দ্বার বন্ধ করিয়া দিল। সে রাত্রি সে আর ঘরের ভিতর হইতে বাহির হইল। না। পরদিন প্ৰাতঃকালে সে দেখিল যে, খাদা ভূত তাহার ভাত-দলি ও ব্যঞ্জন লইয়া গিয়াছে। হাঁড়ি, মালসা ও সারা করিয়া সমুদয় দ্রব্য সে লয় নাই। নিভৃতে মাঠে লইয়া খাদা ভূত ভাতব্যঞ্জন আহার করিয়াছিল। পরদিন সকলে দেখিল, সে হাঁড়ি, মালসা ও সারা সেই স্থানে পড়িয়া আছে। দুইদিন পরে খাদা ভূত যথারীতি রাত্রি দুই প্ৰহরের সময় হাঁক দিল। খাদা ভূত গ্রামে আসিয়াছে শুনিয়া রায় মহাশয় ছাদের উপর লোক রাখিয়াছিলেন। সেজন্য ছাদের উপর এবার সে হাঁক দিতে পারিল না। তাঁহার বাগানে দাড়াইয়া সে হুহুঙ্কার করিল। রায়মহাশয়ের স্ত্রীর ভগিনীর বিধবা কন্যা, অর্থাৎ বোনঝি, এই সংসারে বাস করিতেছিলেন। দুইটি কন্যা লইয়া তিনি আসিয়াছিলেন। একজনের নাম সুচিন্তা, তাহার বয়ঃক্রম দ্বাদশ বৎসর। অপর কন্যার নাম সুবালা, বয়ঃক্রম ছয় বৎসর। সুচিন্তার বিবাহ হইয়াছিল, কিন্তু এখনও সে শ্বশুরালয়ে ঘর করিতে যায় নাই। জামাতা মধ্যে মধ্যে রায়মহাশয়ের বাটীতে আসিতেন। এ বৎসর ভূতের হাঁকের পর সুচিন্তার প্রসববেদনা উপস্থিত হইল। তিনদিন ঘোরতর কষ্ট পাইল; কিছুতেই প্রসব হইতে পারিল না। সেই যন্ত্রণায় তাহার মৃত্যু হইল। ডাক্তার বলিল,— “কিন্যাটি নিতান্ত বালিকা। এত অল্পবয়সে গর্ভ হইলে তাহার ফল। এইরূপ হইয়া থাকে।” বালিকার যন্ত্রণার কথা শুনিয়া রায়মহাশয়ের দুঃখ ও রথ হইল। বালিকার মাতাকে ডাকিয়া ऊिनि ललित्लन,- ‘जाभात मिखाद्ध कमा ७ আমি নিজে পক্ষাঘাত রোগ দ্বার আক্রান্ত হইয়া_ভজঠুর 26S অন্যত্র গমন কর। তাহা না করিলে তুমি ་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་་ বোনুঝি উত্তর করিলেন,- আঙ্গুষ্ট প্রাণ গেলেই কি আর থাকিলেই কি? খাদা-ভূতকে আমি ভয় করি না! ভাবনা সুবালার জন্য। তাহার কাকার নিকট আমি যাইতে পারি। কিন্তু তাহার স্ত্রীর সহিত আমার বানিবে না। তাঁহার স্ত্রী মন্দ লোক নহেন। কিন্তু তাঁহার গলগ্ৰহ হইয়া আমি থাকিতে ইচ্ছা করি না। তাহার পর এ স্থানে আপনার ও মাসীমায়ের শরীর ভাল নহে, আপনাদিগকে ছাড়িয়াও আমি যাইতে ইচ্ছা করি না। বর্ষাকালে বিশেষতঃ ভদ্রমাসে ভূতের উপদ্রব হয়। শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন,-এই তিনমাস আপনি যদি সুবালাকে তাহার কাকার নিকট রাখেন, তাহা হইলে ভাল হয়। কিন্তু বারোমাস তাহাকে ছাড়িয়া আমি থাকিতে পারিব না। বৎসরের বাকী কয় মাস সে আমার নিকট থাকিবে ।” বোনঝির দেবীর অর্থাৎ সুবালার কাকার সহিত রায় মহাশয়ের আলাপ-পরিচয় ছিল না। অতি দূরসম্পর্ক-স্ত্রীর ভগিনীর কন্যার দেবর। তিনি কখনও রায় মহাশয়কে দেখেন নাই। যাহা হউক, পত্র লিখিয়া ও বড়ালমহাশয়কে পাঠাইয়া রায় মহাশয় স্থির করিলেন যে, আগামী শ্রাবণ মাসে সুবালা তাহার কাকার নিকট গমন করিবে। সে স্থানে সুবালা শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন এই তিন মাস থাকিবে, তাহার পর রায় মহাশয়ের বাটীতে মাতার নিকট ফিরিয়া আসিবে। এক বৎসর কাটিয়া গেল। শ্রাবণ মাস আসিল । কিন্তু কাকার নিকট সুবালার যাওয়া হইল। না। সুবালার মাতা গ্ৰহণী রোগ দ্বারা আক্রান্ত হইলেন। সকলে তাঁহার জীবনের আশা পরিত্যাগ করিল। কাজেই সুবালাকে মাতার নিকট থাকিতে হইল। "*" firls six g3 8.8l www.amarboicom a GR দশম অধ্যায় মাতা ও সুবালা ভদ্রমাস পড়িল। মাসের শেষে পুনরায় খাদা ভূতের আবির্ভাব হইল। “হুহু”, “হুহু”, আস্তে আস্তে এই শব্দ করিয়া রাত্রিকালে খাদা ভূত মাঠেঘাটে বেড়াইতে লাগিল। কিন্তু খাদা ভূতের উপদ্রব অধিক দিন থাকে না। ছয় সাত দিন পরে সেই বিকট রবে হাক দিয়া সে কোথায় চলিয়া যায়। সেই কয়দিন গ্রামের লোক ঘোরতর শঙ্কিত হইয়া কালব্যাপন করে। এবারও অরন্ধনের পূর্ব রাত্ৰিতে খাদা ভূত বড়ালমহাশয়ের হাড়ি খাইয়া গেল। রায়মহাশয়ের বাহির বাটীতে দুইটি ঘরে বড়ালমহাশয় নিজে, তাহার গৃহিণীও ও তাঁহার শ্যালকপুত্ৰ ধনুকধারী নামক দশ বৎসরের একটি বালক, এই কয়জনে বাস করিতেন। নিকটে একটি ছােট ঘরে তাঁহাদের রান্না হইত। অরন্ধনের নিমিত্ত বড়াল-গৃহিণী যাহা কিছু রাধিয়া রাখিয়াছিলেন, খাদা ভুত তাহা খাইয়া গিয়াছিল। আর একটি আশ্চৰ্য্য কথা-আহারাদি করিয়া খাদা ভূত সম্মুখের রকে বসিয়া মলত্যাগ করিয়াছিল। সকলেই ঘোরতর বিস্মিত হইল। গ্রামের বৃদ্ধ লোকেরা বলিল,— “এই বয়সে অনেক ভূত দেখিয়াছি, অনেক ভূতের গল্প শুনিয়াছি; কিন্তু খাদা ভূতের ন্যায় অদ্ভুত ভূত কখন দেখি নাই। ভূতে পান্তাভাত ও কচুশাক খায়, কচুশাক খাইয়া মলত্যাগ করিয়া যায়, এরূপ কথা কখন আমরা শুনি নাই।” রায় মহাশয়ের বাগানের পূৰ্ব্বভাগে বৃহৎ এক বঁাশঝড়ছিল। এবার সেই বীশঝাড়ের ভিতর বসিয়া খাদা ভূত হুঙ্কার দিল। পরদিন সে যথারীতি (ফেঁথায় সুবালার বয়ঃক্রম এক্ষণে সাত বৎসর। কন্যাটি যে খুব রূপবতী ছিল, তাহা নহে। তাহার গায়ের বর্ণ খুব গীেরবর্ণ ছিল না, গঙ্গাজলী গমের ন্যায় এক প্রকার উজ্জল মাজা মাজা বর্ণ ছিল। নাসিকাটি টিকোলা ও চক্ষু দুইটি চাকচিক্যশালী কৃষ্ণবর্ণের ছিল। নিবিড় কেশরাশি হাঁটু পৰ্যন্ত পড়িত। মুখের ও শরীরে এক প্রকার চমৎকার মেয়েলি ভাব ছিল। তাহার মৃদুমধুর ভাব ও লজ্জাশীলতা দেখিয়া এবং সুমিষ্ট কথা শুনিয়া সকলেই সুবালাকে ভালবাসিত। মৃত্যুর একদিন পূৰ্ব্বে মাতা সুবালাকে ডাকিয়া কাছে বসাইলেন। মাতা বলিলেন, — “সুবালা! তুমি সাত বৎসরের বালিকা, আমার সকল কথা এখন তুমি বুঝিতে পরিবে না। কিন্তু কথাগুলি তুমি মনে করিয়া রাখিও, মাঝে মাঝে আমার কথাগুলি স্মরণ করিও। যত বড় হইবে, তত তুমি আমার কথার অর্থ বুঝিতে পরিবে। সুবালা! মা! আর তুমি আমাকে দেখিতে পাইবে না।” সুবালা হাপুসা নয়নে কাঁদিতে লাগিল। চক্ষুর জলে তাহার বক্ষঃস্থল ভাসিয়া যাইতে লাগিল। কঁদিতে কঁদিতে সে বলিল,— “না মা। আমাকে ছাড়িয়া তুমি যাইও না। তুমি গেলে আমি মাতা বলিলেন,- “তোমার দাদামহাশয় ও দিদিমণি তোমাকে ভালবাসেন। তুমি তাঁহাদের নিকট থাকিবে। সুবালা! তোমার দিদির শোকে আমি বড় কাতর হইয়া আছি। তাহাকে স্মরণ করিয়া সৰ্ব্বদাই আমার বুক ফাটিতেছে। তোমার দিদি যে স্থানে গিয়াছে, আমি সেই স্থানে যাইতেছি।” \ኳ6አby sib Prize uskla »ižo 333) a www.amarboi.comio সুবালা বলিল,- “সে কোথায় মা? সে স্থানে গেলে যদি দিদিকে দেখিতে পাই, তাহা হইলে আমিও সেইখানে যাইব । তুমি যদি মা, সেই স্থানে যাও, তাহা হইলে আমাকে সঙ্গে লইয়া চল ।” মাতা উত্তর করিলেন,- “সুবালা! মনে করিলে কেহ সে স্থানে যাইতে পারে না। আমাদের মাথার উপর যে পরমেশ্বর আছেন, তিনি না লইয়া গেলে সে স্থানে কেহ যাইতে পারে না। তিনি আমাকে ডাকিতেছেন, সেইজন্য আমি সেই স্থানে যাইতেছি। যখন তুমি বুড়ো হইবে, যখন তোমার দাঁত পড়িয়া যাইবে, চুল পাকিয়া যাইবে, তখন তোমাকেও তিনি ডাকিবেন। তখন তুমি সেই স্থানে যাইবে। তখন আমাকেও তুমি সেই স্থানে দেখিতে পাইবে!” সুবালা বলিল,- “তোমার চুল পাকে নাই, দাঁত পড়িয়া যায় নাই, তবে তিনি তোমাকে ডাকিতেছেন কেন?” মাতা উত্তর করিলেন,- “কোন কোন লোককে তিনি আগে থাকিতে ডাকিয়া লন, সেইজন্য আমি যাইতেছি।” সুবালা জিজ্ঞাসা করিল,- “সে কিরূপ স্থান মা?” মা উত্তর করিলেন,- “সে অতি সুন্দর স্থান। সে স্থানে কোনরূপ দুঃখ নাই। তোমার দিদি। রোগে কত কষ্ট পাইয়াছিল। সে স্থানে কাহারও রোগ হয় না, কেহ সেরূপ কষ্ট পায় না। তোমার দিদি আমাকে ছাড়িয়া গিয়াছে। তোমার দিদির জন্য আমি কত কাঁদিতেছি, তুমি কত কাদিয়াছ। সে স্থানে কেহ কাহাকেও ছাড়িয়া যায় না, পিতা-মাতাকে সে স্থানে কাঁদিতে হয় भां ।” ঈল কাজ করে, তাহা হইলে তাঁহাদের পুত্ৰ-কন্যা ষ্টীয় না। বড় হইলে তোমারও পুত্র-কন্যা হইবে। তুমি কখনও কুকাজ করিও না। তাহা তুমি মনের সুখে থাকিবে, কখনও তোমাকে দুঃখ ভোগ করিতে হইবে না।” সুবালা বলিল,— “তুমি যখন যাহা বল, তাহা আমি শুনি। সেদিন সেই চড়ুই পাখী। ধরিয়াছিলাম; তুমি বলিলে,— “সুবালা! চড়ুই পাখীকে কষ্ট দিও না; আমি তৎক্ষণাৎ তাহাকে ছাড়িয়া দিলাম।” মাতা বলিলেন, — “তুমি লক্ষ্মী মেয়ে। ভগবান তোমাকে কুশলে রাখুন, ভগবান তোমাকে সুখী করুন। আমি যাহা বলিতেছি, এক্ষণে ভালরূপ তাহা তুমি বুঝিতে পরিবে না। দেখ, সুবালা! কখনও মিথ্যা কথা বলিও না, কখনও প্রতারণা করিও না, কখনও নিষ্ঠুর হইও না, নীচের ন্যায় ব্যবহার করিও না, কখন কাহাকেও কষ্ট দিও না। কাহারও নিকট হইতে কিছু লইব- এ প্রত্যাশা কখনও করিও না। লোককে দিতে পারি, সেই কামনা করিবে। পরমেশ্বর সর্বদা তোমার নিকট আছেন, এই কথা ভাবিয়া সকল কাজ করিবে। বালকবালিকাদিগকে তিনি বড় ভালবাসেন। আমি মা, পরমেশ্বর তোমাকে দিয়াছিলেন—তুমি আমার প্রাণের সুবালা, তাহার অনুগ্রহে তোমাকে পাইয়াছিলাম। এস, মা! একবার জনমের মত তোমাকে আদর করি।” সুবালা মাতার মুখের নিকট আপনার মস্তক অবনত করিল। দুই হাতে মাতা তাহার গলা জড়াইয়া ধরিয়া তাহার মুখচুম্বন করিলেন। মাতার বক্ষঃস্থলে মাথা রাখিয়া সুবালা কাঁদিতে

                • দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ CCI) লাগিল। মাতা সুবালাকে সাস্তুনা করিতে লাগিলেন।

পরদিন সুবালার মাতার মৃত্যু হইল। সুবালা মাটিতে পড়িয়া কঁদিতে লাগিল। কেহই তাঁহাকে সান্তুনা করিতে পারিল না। রায় মহাশয় ও তাঁহার গৃহিণী দুঃখিত হইলেন বটে, কিন্তু কথায় বলে,- “অল্প শোকে কাতর, আর অধিক শোকে পাথর”; তাঁহারা পূৰ্ব্ব দুর্ঘটনায় যেরূপ অস্থির হইয়াছিলেন, এবার ততদূর অধীর হইলেন না। কিছুদিন পরে রায় মহাশয় সুবালাকে তাহার কাকার বাড়ীতে পাঠাইয়া দিলেন। সেস্থানে খুড়ীমাতা তাহাকে যথেষ্ট আদর-যত্ন করিতে লাগিলেন। কাকার পুত্ৰ-কন্যাদিগের সহিত খেলা করিয়া মাতার শোক সুবালা অনেক পরিমাণে ভুলিয়া গেল। এইস্থানে আর একটি বালকের সহিত সুবালার সাক্ষাৎ হইল। এই বালকটির নাম বিনয়। কলিকাতায় ইহার পিতা বাস করেন। এই গ্রামে ইহার মাতুলালয়। বালকের বয়ঃক্রম দশ বৎসর। বিনয় উত্তমরূপে ঠাকুর গড়িতে পারিত। দুর্গা, কালী প্রভৃতি প্রতিমা সে গড়িয়া দিত, মনের আনন্দে বালক-বালিকাগণ তাহা পূজা করিত। কুম্ভকার হইয়া বিনয় ঠাকুর গড়িত, চিত্রকর হইয়া সে রং কিরিত, মালী হইয়া সে সাজাইত, পুরোহিত হইয়া সে পূজা করিত, কামার হইয়া সে কচুগাছ বলিদান করিত, অন্যান্য বালকগণের সহিত ঢাকিচুলি হইয়া সে বাজনা বাজাইত। নানা সাজে সাজিয়া সে ও অন্যান্য বালকগণ ঠাকুরের সম্মুখে যাত্রা করিত অথবা থিয়েটারের অভিনয় করিত। কাৰ্ত্তিক মাসে সুবালা রায় মহাশয়ের বাটীতে প্রত্যাগমন করিল। তাহার সংসারের সকলেই একে একে মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে। এক সুবালা তাঁহাদের সংসারে এখন আর কেহ। ছিল না। তাঁহারা স্ত্রী-পুরুষে সুবালার উপর মন-প্ৰা ণ করিলেন। কিরূপে সুবালা বঁচিয়া থাকিবে, রাত্রিদিন এখন তাঁহাদের সেই চিন্তা হইল।” রায় মহাশয় একদিন গৃহিণীকে বলিলেন, ক এক বার মনে হয় যে, নূতন উইল করিয়া সুবালাকে সমস্ত সম্পত্তির উত্তারিধারিণী পঞ্চদশ বৎসর বয়ঃক্রমের কথা কাটিয়া দিই ও যখন ইচ্ছা তখন বিষয় হস্তান্তর রক্ষমতা তোমাকে প্রদান করি। কিন্তু খাদা ভূতের কথা মনে হইলে কিছু আর করিতে ইচ্ছা হয় না।” গৃহিণী উত্তর করিলেন, — “সুবালা আগে বঁচি থাকুক, তাহার পর অন্য কথা। আপাততঃ এ বিষয়ের সহিত সুবালার কোন সংস্রবে কাজ নাই। আমি যদি পঞ্চাশ বৎসর। পৰ্যন্ত বঁচিয়া থাকি, তাহা হইলে সুবালাকেই সমস্ত সম্পত্তি দিয়া যাইব ।” রায় মহাশয় বলিলেন,- “তোমাকে একটি প্রতিজ্ঞা করিতে হইবে। সুচিন্তা ও সুবালার গুণে কন্যা ও জামাতাকে আমরা ভুলিয়া ছিলাম। সুচিন্তার শোক আমার হৃদয়ে যেন শেলের ন্যায় বিধিয়া আছে। যেরূপ নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করিয়া সে মরিয়াছে, তাহা মনে হইলে আর জ্ঞান থাকে না। আমি সৰ্ব্বদাই সেই কথা ভাবিয়া থাকি। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিয়াছি যে, যদি বঁচিয়া থাকি, তাহা হইলে অল্পবয়সে আমি সুবালার বিবাহ দিব না। পািনর বৎসর পূর্ণ না হইলে তাহার বিবাহ আমি দিব না। সুবালার কাকাকে আমি এ সম্বন্ধে পত্র লিখিয়াছিলাম। তিনি আমার প্রস্তাবে সম্মত হইয়াছেন। আমার যদি পরলোক হয়, তাহা হইলে ষোড়শ বৎসর বয়ঃক্রমের পূৰ্ব্বে সুবালার তিনি বিবাহ দিবেন না,-আমার নিকট তিনি এইরূপ সত্য করিয়াছেন। তুমিও আমার নিকট সেইরূপ সত্য কর; কারণ, যেরূপ রোগে পড়িয়া আছি, তাহাতে কখন কি হয়, তাহা বলিতে পারা যায় না। ডাক্তারে বলিয়াছে যে, আর দুইবার আমার পীড়া বৃদ্ধি হইবে, সেই সময় আমি অজ্ঞান হইয়া পড়ব। দ্বিতীয় আক্রমণে বাঁচিয়া গেলেও wo দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.comন্মিলাক্যনাথ রচনাসংগ্ৰহ যাইতে পারি। কিন্তু তৃতীয় আক্রমণে-আর কিছুতেই রক্ষা পাইব না।” রায়মহাশয় স্ত্রীকে কঠোর সত্যে আবদ্ধ করিলেন, — (প্ৰথম) যে, তাহার বয়ঃক্রম পঞ্চাশ বৎসর পূর্ণ হইলে, উইল করিয়া সমুদয় সম্পত্তি সুবালাকে দিবেন, অন্য কাহাকেও দিবেন না। (দ্বিতীয়) যে, সুবালার বয়ঃক্রম পঞ্চদশ বৎসর পূর্ণ না হইলে তিনি বিবাহ দিবেন না। রায় মহাশয় বলিলেন, — “আমি হিসাব করিয়া দেখিয়াছি যে, যে বৎসর শ্রাবণ মাসে কাৰ্ত্তিক মাসে সুবালার বয়সও পািনর বৎসর সম্পূর্ণ হইবে। সেই বৎসর শ্রাবণ মাসে তুমি উইল করিবে ও কাৰ্ত্তিক মাসের পর যখন ইচ্ছা তখন সুবালার বিবাহ দিবে। এক্ষণে সুবালাকে ভালরূপে লেখাপড়া শিখাইতে হইবে।” সুবালার নিমিত্ত রায়মহাশয় ভাল এক জন গুরুমা নিযুক্ত করিলেন। সুবালা মনোযোগের সহিত লেখাপড়া শিখিতে লাগিল। একাদশ অধ্যায়। জোড়া শাকচুন্নি সুবালার সহিত খেলা করিবার पिता वाष्पित्री पानीडल बाट রাধা নামে গােয়ালিনী দুইটা কন্যা লইয়া বাসুক্টেরিত। তাহাদের নাম ছিল চঞ্চল ও চপলা। চঞ্চলার ভালরূপ জ্ঞান গোচর ছিল না। ઉિી না হউক, অনেকটা বটে। সেজন্য তাহার স্বামী তাহাকো লয় নাই। নাম চঞ্চল হইলেও লোকে তাহাকে পাগলী বলিয়া ডাকিত। তাহার ছােট ভগিনী চপলার বয়স নয়-দশ বীটল্সর হইবে। রায় মহাশয় তাহাকেই সুবালার সঙ্গিনীরূপে নিযুক্ত করিলেন। কিন্তু পাগলী ছোট ভগিনীকে বড়ই ভালবাসিত। কিছুক্ষণ না দেখিলে সে থাকিতে পারিত না। সেজন্য সেও আসিয়া সুবালার সহিত খেলা করিত। একদিন ঝগড়া করিয়া সুবালাকে সে চাপড় মারিয়াছিল। সেই অবধি রায় মহাশয় তাহাকে বাড়ীতে আসিতে দিতেন না। কিন্তু চপলাকে না দেখিয়া সে থাকিতে পারিত না। যখন সুবালা ও চপলা বাগানে খেলা করিতে যাইত, তখন পাগলীও সেই স্থানে চুপি চুপি আসিয়া তাহাদের সহিত খেলা করিত। রায় মহাশয় জানিতে পারিয়া তাহাও বন্ধ করিয়া দিলেন। ভগিনীকে না দেখিয়া পাগলীর বড় কষ্ট হইল। চপলা সমস্ত দিন রায় মহাশয়ের বাড়ীতে থাকিত। রাত্রিতেও সুবালার নিকট একঘরে শয়ন করিত। ভগিনীকে একবার দেখিবার নিমিত্ত পাগলী কখন কখন রায় মহাশয়ের বাগানে দাড়াইয়া থাকিত। চপলা পূৰ্ব্বদিকে দোতলায় জানালার নিকট দাঁড়াইত, দূর হইতে ভগিনীকে দেখিয়া পাগলী সন্তুষ্টচিত্তে বাড়ী ফিরিয়া যাইত। সুবালা ও চপলার সহিত আর একজন খেলা করিত। তাহার নাম ধনুক ধাৱী । বড়ালমহাশয়ের শ্যালকপুত্র। বড়ালমহাশয়ের পুত্রকন্যা ছিল না, সেজন্য তাহাকে আপনার সংসারে রাখিয়াছিলেন। সুবালা অপেক্ষা সে দুই তিন বৎসরের বড় হইবে। সুবালা ও চপলা যখন বাগানে বেড়াইতে যাইত, ধনুকধারী তখন তাহাদের সহিত গিয়া মিলিত। যে উচ্চ গাছ হইতে বালিকা দুইটি ফুল পাড়িতে পারিত না, ধনুকধারী গাছে উঠিয়া পাপের পরিণাম দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ We'BS তাহা পাড়িয়া দিত। ফুল লইয়া সুবালা ও চপলা নানারূপ অলঙ্কার গড়িয়া গায়ে পরিত। ধনুকধারী গাছ হইতে নানারূপ ফলও তাহাদিগকে পাড়িয়া দিত। কুল, তেঁতুল, আমড়া, কামরাঙ্গা প্রভৃতি অন্নফল খাইলে রায়নী বকিতেন। কিন্তু শিশুমুখে এই সকল দ্রব্য অপেক্ষা সুখাদ্য আর কি আছে? পাকা আমড়ার সময়, কখন টুপ করিয়া একটি আমড়া পড়িবে, সেই প্রতীক্ষায় সুবালা ও চপলা, উৰ্দ্ধমুখে গাছ পানে চাহিয়া থাকিত। কঁচা তেঁতুল, কামরাঙ্গা ও কুলের সময় আঁচলে বাধিয়া তাহারা লবণ লইয়া যাইত। ধনুকধারী গাছ হইতে পাড়িয়া দিত, মনের সুখে তাহারা লবণ দিয়া তাহা ভক্ষণ করিত। পাকা ও ডাঁসা করঞ্চাগুলি লুণ দিয়া খাইতে কি সুন্দর! কষা-বকুল-ফল কি অমৃততুল্য নহে? প্রচুর শস্যসম্বলিত কলসীর খেজুর সুবালার ভাল লাগিত না। কেবলমাত্র খোসা দিয়া বীজটা ঢাকা সেই যে দেশী খেজুর, বল দেখি সে কেমন? ধনুকধারী কাল যে আমলকী পাড়িয়া দিয়াছে, তাহা চিবাইয়া জল খাইলে কেমন মিষ্টি बले ! এইরূপে সুবালা দিনযাপন করিত লাগিল। সুবালার প্রতি রায় মহাশয় ও তাঁহার গৃহিণীর স্নেহ দিন দিন বাড়িতে লাগিল। সুবালার গুণে সকল লোক মুগ্ধ হইল। রায়মহাশয়কে সুবালা দাদামহাশয় বলিয়া ডাকিত,রায়-গৃহিণীকে আদর করিয়া সে দিদিমণি বলিত। এই সময় গ্রামের লোকের আর একটি নূতন ভয় উপস্থিত হইল। রায় মহাশয়ের বাগানে দুইজন মালী কাজ করে—ত্ৰিলোচন ও শঙ্করা। বাগানের উত্তর সীমায় একখানি চালাঘরে তাহারা বাস করে। একদিন রাত্রিকালে গ্ৰাম হইতে তাহারা বাগানে প্রত্যাগমন করিতেছিল। তাহারা দেখিল যে, সাদা কাপড় পরিধেয় দুইটি বাগানের ভিতর দাড়াইয়া আছে। চীৎকার করিয়া তাহারা তৎক্ষণাৎ পলায়ন করিল। গিয়া তাহারা বলিল যে, সে স্ত্রীলোক দুইটির পায়ের গোড়ালি সম্মুখ দিকে। ৱ বুঝিতে। আর বাকী রহিল না। সেই দুইটি স্ত্রীলোক মানুষ নহে, তাহারা শাকচুন্নি বলে। পরদিন মালী দুইজন রায় মহাশয়কে বলিল যে, স্ত্রীলোক কুগাঁয়ে বড় বড় কৃমি বুলিতেছিল। তাহাদের দাঁতও প্রায় একহাত লম্বা উপর দিকে পা রাখিয়া, হাতে ভর দিয়া, দেড় হাত জিহবা লক লক্‌ করিয়া, বাগানের ভিতর তাহারা বন বন শব্দে ঘুরিতেছিল। তাহার পর আরও কয়জন গ্রামবাসী শাকচুন্নি দুইজনকে দেখিতে পাইল। গ্রামে হুলুস্কুল পড়িয়া গেল। আতঙ্কের আর সীমা রহিল। না। সকলে বলিল যে,- “এ খাদা ভূতের কৰ্ম্ম। কোথা হইতে একজোড়া শাকচুন্নি আনিয়া আমাদের গ্রামে সে ছাড়িয়া গিয়াছে; একটা নয়, দুইটা,-একজোড়া। এক তো খাদা ভূতের জ্বালাতেই অস্থির। তাহার উপর শাকচুন্নির উপদ্রব,—একটা নয়, একজোড়া। বল দেখি, ছেলেপুলে লইয়া এ স্থানে আমরা কি করিয়া বাস করি! একটা নয়, একজোড়া!” গ্রামের লোক ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িল । পুনরায় শ্রাবণ মাস আসিল। শাকচুন্নির উপর আবার খাদাভূত আসিয়া পাছে কোন বিপদ ঘটায়, সেই ভয়ে রায়মহাশয় আগে থাকিতে সুবালাকে তাহার কাকার বাড়ীতে পাঠাইয়া দিলেন, সে স্থানে গিয়া প্রথম প্রথম সুবালার মনে সুখ হয় নাই। বিনয় তখন সে গ্রামে ছিল না। গত বৎসর বিনয় বলিয়া গিয়াছিল,— “সুবালা! যখন তুমি তোমার কাকার বাড়ীতে আসিবে, আমিও সেই সময় আমার মামার বাড়ীতে আসিব ।” তবে কেন বিনয় আসিল না।” সুবালার মনে দুঃখ হইল। বিনয়ের উপর তাহার রাগ হইল। চারি পাঁচ দিনের পরে বিনয়ের মাতুলানীকে সে জিজ্ঞাসা করিল,- হ্যা গা! তোমাদের S দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comঙ্গিাকনাথ ঠ"সংগ্ৰহومان বিনয় এবার মামার বাড়ী আসে নাই কেন?” মাতুলানী ঈষৎ হাসিয়া উত্তর করিলেন, — “বিনয় এখন স্কুলে পড়িতেছে। স্কুল-কামাই করিয়া সে কিরূপে আসিবো?” মাতুলানীর সেই ঈষৎ হাসি দেখিয়া সুবালা লজ্জায় অধোমুখ হইয়া রহিল। কিছু আর না বলিয়া সে স্থান হইতে সে আস্তে আস্তে প্ৰস্থান করিল। যাহা হউক, কিছুদিন পরে বিনয় মাতুলের বাটীতে আসিল । সুবালা রাগ করিয়া প্ৰথম তাহার সহিত কথা কহে নাই। অনেক বুঝাইয়া বিনয় তাহাকে সান্তুনা করিল। বিনয় বলিল,— “দেখ সুবালা! তুমি যে এখানে আসিয়াছ, তাহা আমি জানিতে পারি নাই। যখন জানিতে পারিলাম, ভখনও আমি আসিতে পারিলাম না। স্কুল-কামাই করিয়া কিরূপে সুবালা বলিল,— “আর বারে কি করিয়া আসিয়াছিলে? বিনয় উত্তর করিল,- “গত বৎসর আমার পীড়া হইয়াছিল। সেজন্য স্কুল-কামাই করিয়া নিয়ত আমি এ স্থানে ছিলাম। এখন আমি ভাল আছি। এখন আর স্কুল-কামাই করিতে পারি भां ।” সুবালা জিজ্ঞাসা করিল,- “তবে আর তুমি আসিবে না? আর আমাদের সেরূপ ঠাকুরপূজা হইবে না?” বিনয় উত্তর করিল,- “বাবা বলিয়াছেন যে, যদি পরিশ্রম করিয়া ভালরূপে পড়া প্ৰস্তুত করিয়া রাখিতে পারি, তাহা হইলে তিনি প্ৰতি শনিবারে এখানে আসিতে দিবেন। অন্যদিনে খুব পরিশ্রম করিয়া আমি থের্ভা করিয়া রাখিব। শনিবার দিন এখানে আসিব । রবিবার দিন থাকিব। সােমবার প্রাতঃর্জািলৈ কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিব।” আসিতে লাগিল। পূর্বের ন্যায় ইন্টা করিয়া আমোদ-আহদে সকলে দিনযাপন করিতে এ দিকে রায়মহাশয়ের বাটীতে এবার এক আশ্চৰ্য ঘটনা ঘটিল। ভাদ্র মাসের শেষে পুনরায় খাদা ভূতের উপদ্রব আরম্ভ হইল। একদিন রাত্রিকালে রায় মহাশয়ের বাটীর পূর্বদিকে, বাগানে সহসা দুইবার “মা গো|” এইরূপ শব্দ হইল। কে যেন ভীত হইয়া এইরূপ শব্দ করিল। কেহ কেহ বলিল যে, সে একজনের কণ্ঠস্বর নহে, দুইজনের। একবার “মা গো!” বলিয়া যে শব্দ হইল, তাহা রায়মহাশয়ের বাটীর ঠিক পূৰ্ব্বগায়ে হইয়াছিল। দ্বিতীয় বারে যে “মা গো!” বলিয়া শব্দ, তাহা বাগানের ভিতরে কিছুদূরে হইয়াছিল। দুই শব্দ দুইজনের, একজনের নহে। তাহার দুই তিন ঘণ্টা পরে বাগানের ভিতর হইতে খাদা ভূতের হুহুঙ্কার আসিল। যে সময়ে রায় মহাশয়ের বাগানে “মা গো” বলিয়া শব্দ হইয়াছিল, তাহার অল্পক্ষিণ পরেই গ্রামের ভিতর আর একটি ঘটনা ঘটিল। চপলার ভগিনী-যাহাকে পাগলী বলে, দৌড়িয়া সে বাটী আসিয়া অজ্ঞান হইয়া পড়িল। অনেক কষ্টে যখন লোকে উহার দাঁত-কপাটি ভাঙ্গিল, তখন সে “খাদা ভুত” বলিয়া “আউ-মাউ” করিয়া সে মূচ্ছিত হয়। সমস্ত রাত্রি তাহার এইরূপ হইতে লাগিল । রাত্রিকালে সে কোথা গিয়াছিল, কি দেখিয়া সে ভয় পাইয়াছিল, সে সম্বন্ধে কোন কথা সে दनिष्ठ ख़िब्ल नी। """ firls six g3 xel- www.amarboicom a VAVO আরও একটি আশ্চৰ্য্য ঘটনা ঘটিল। পরদিন প্ৰাতঃকালে সকল দেখিল যে, চপলা, রায়মহাশয়ের বাড়ীতে নাই। বাড়ীর সদর ও খিড়কি দরজা যেমন বন্ধ, তেমনি বন্ধ ছিল, কিন্তু চপলাকে কেহ। দেখিতে পাইল না। পূৰ্ব্বদিকে যে ঘরে সুবালা শয়ন করিত, চপলা, সেই ঘরে শয়ন করিত। যখন সুবালা এখানে ছিল, তখন দুইজনে একসঙ্গে শয়ন করিত। সুবালা এখন এখানে নাই। সেজন্য চপলা একেলা সেই ঘরে শয়ন করিত। চপলা কোথায় গেল? কি করিয়া সে বাড়ী হইতে বাহির হইল? সে সমস্যার মীমাংসা কেহই করিতে পারিল না । রায়মহাশয় শয্যাগত। তথাপি তিনি যথাসাধ্য চপলার অনুসন্ধান করাইলেন। চপলার মাকে তিনি সংবাদ দিলেন। মায়ের নিকট চপলা গমন করে নাই। প্ৰাতঃকালেও পাগলী মূৰ্ছিত হইতেছিল। তাহাকে লইয়া মা ব্যস্ত ছিল । চপলার কোন সংবাদ সে দিতে পারিল না। চপলা, বালিকা। কাহারও সহিত কোন স্থানে যে চলিয়া যাইবে, সেরূপ বয়স তাহার হয় নাই। তাহার পর সদর ও খিড়কি দরজা বন্ধ ছিল। যাইবেই বা কি করিয়া? ভিতর-বাটী বাহির-বাটী, উপর তালা, নীচে তালা, সমস্ত বাড়ী—সকলে তনুতন্ন করিয়া খুঁজিয়া দেখিল। সমস্ত বাগান, সমস্ত গ্রাম, বন, মাঠ, নদীর ধার সকলে খুঁজিয়া দেখিল। রায়মহাশয়ের বাগানে যতগুলি পুষ্করিণী ছিল, জাল টানিয়া তাঁহাতে দেখা হইল। কোন স্থানে চপলার চিহ্নমাত্র কেহ দেখিতে পাইল না। রায়মহাশয় পুলিশে খবর দিলেন। পুলিশ আসিয়াও কিছু করিতে পারিল না। চারিদিকে দশ ক্রোশ যতগুলি গ্রাম আছে, সকল স্থানে রায়মহাশয় অনুসন্ধান করাইলেন। চপলার কেহ। পাইল না। করিল যে, খাদা ভূত চপলাকে খাইয়ী ফেলিয়াছে, তাহার হাড়গুলি পৰ্যন্ত রাখে নাই। অথবা সে শাকচুন্নি দুইজন তাহাকে আপনাদের সঙ্গী করিয়া লইয়া গিয়াছে! কিন্তু খাদা ভূত যে তহাকে খাইয়াছে, এই কথায় সকলের অধিক প্রত্যয় হইল। નિસાન ફ્રેન গ্রামের লোক ভয়ে অস্থির হইয়া পড়িল। সকলে বলিল যে—“খাদা ভুত আজ চপলাকে খাইল, কাল আমাদেরও তো খাইতে পারে। এখন উপায় কি? রায়মহাশয়ের বাটীতে অনেক পূজা-পাঠ শান্তি- স্বস্ত্যয়ন হইয়াছিল। তাহাতে কোন ফল হয় নাই। দুইবার ভূত নামানো হইয়াছিল। রোজার সহিত একটা মামৃদো ভূত, একটা রাকিনী, একটা শাকিনী এবং একটা হাঁকিনী আসিয়াছিল। অন্ধকার ঘরে তাহারা কেবল দুপ দাপ্ত করিল, খোন সুরে অনেক কথা বলিল, V8 află cios (gs se - www.amarboicom** একধামা সন্দেশ ও দুই হাঁড়ি ক্ষীর খাইয়া গেল। কিন্তু খাদা ভূত কি জোড়া শাকচুন্নি তাহারা কিছুই করিতে পারিল না। এখন করা যায় কি?” গড়া হইল, পূজাও হইল। “খাদা ভূত ও তাহার শাকচুন্নি জোড়াকে মা, তুমি দূর কর”-এই কামনায় স্ত্রীলোকেরা ধূনা পোড়াইল। তাহার পর গ্রামের পুরুষগণ প্রতিমার সম্মুখে যোড়হাতে দাঁড়াইয়া প্রার্থনা করিল,— “হে মা রক্ষাকালী! তোমার নিকট আমরা আর কিছু চাই না, খাদা ভূত ও শাকচুন্নি জোড়ার দৌরাত্ম্য হইতে তুমি আমাদিগকে রক্ষা কর। হে মা! ভূতের উপদ্রবে: আমরা জরজর হইয়াছি। তুমি খাদা ভূতের দমন কর, শাকচুন্নি জোড়াকে তুমি দূর করা। যদি না কর, মা, তাহা হইলে আর কেহ তোমার পূজা করিবে না।” রক্ষাকালী পূজা করিয়া উপকার হইল। শাকচুন্নি জোড়াকে আর কেহ দেখিতে পাইল না। সে বৎসর খাদা ভুতকেও আর কেহ দেখিতে পাইল না। কাৰ্ত্তিক মাসে সুবালা বাড়ী ফিরিয়া আসিল। বাড়ী আসিয়া সেও চপলা সম্বন্ধে নানারূপ তদন্ত করিল। পরদিন প্ৰাতঃকালে যাহারা সেই পূৰ্ব্বদিকের ঘর দেখিয়াছিল, তাহারা বলিল, “কাজ-কৰ্ম্ম সারিয়া, আপনার ঘরে গিয়া মাদুরের উপর বসিয়া চপলা, বোধ হয়, মাথা আঁচড়াইতেছিল। ঘরে প্রদীপ জ্বলিতেছিল। সকালবেলা আমরা দেখিলাম যে, প্ৰদীপের সমস্ত তেল ও সলিতা পুড়িয়া গিয়াছে। মাদুরের উপর চিরুণী ও ছেড়া চুল পড়িয়া আছে। এলোচুলে মাথা আঁচড়াইবার সময় ভূতে ছিদ্ৰ পাইয়া তাহাকে উড়াইয়া লইয়া গিয়াছে।” চপলার মাতা বলিল,— “কি বলিব দিদি! দুইটি মেটায় লইয়া এই সংসারে ছিলাম। বিধাতা তাহাতেও বাদ সাধিলেন!” 9. য়া সেখাির্কতে পারিত না। যেদিন হইতে রায়মহাশয় তাহাকে তোমাদের বাড়ী যাইতে মানা করিলেন, সেইদিন হইতে তাহার বড় কষ্ট হইল। তোমাদের বাগানে দাঁড়াইয়া দােতলায় জানালার দিকে সে একদৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিত। একবার যদি দূর হইতে চপলাকে সেই জানালার ধারে দেখিতে পাইত তাহা হইলে কৃতাৰ্থ হইয়া প্ৰফুল্লমুখে সে বাটী ফিরিয়া আসিত। আমি এ দিনের বেলার কথা বলিতেছি। রাত্ৰিতে সে কোথায় গিয়াছিল, তাহা আমি জানি না।” সুবালা বলিল,- “সে রাত্রে পাগলী বােধ হয় খাদা ভূতকে দেখিয়াছিল?” চপলার মা উত্তর করিল,- “হাঁ দিদি! তাহাই বোধ হয় হইয়াছিল। একে তো পাগলী! তাহার উপর ভয় পাইয়াছিল। মুখ শাকবর্ণ হইয়া সে বাড়ীতে আসিয়া পড়িল। আমরা তাহার দাঁতকপাটি ভাঙ্গিলাম। কিন্তু জ্ঞান আর কিছুতেই হয় না। অনেকক্ষণ পরে জ্ঞান হইল। তাহার পর “খাদা ভুত” এই কথাটি বলে আর পুনরায় মূৰ্ছিত হয়। রাত্রি দুই প্রহরের পর খাদা ভূতের সেই ভয়ানক ‘হু হু' শব্দ হইল। সেই শব্দ শুনিয়া মেয়েটা এমনি মূৰ্হিত হইল যে, আমরা মনে করিলাম, আর সে বঁাচিবে না। যাহা হউক, আপাততঃ তাহার প্রাণটা বঁচিয়াছে। কিন্তু সেই অবধি কাহারও সহিত ভালরূপ কথা কয় না। কবিরাজমহাশয় বলিয়াছেন যে, তাহা “স্তান্ত্রিত বাই” হইয়াছে। তোমরা দিদি, বড়-মানুষ। কিন্তু আমি খাদা ভূতের কি করিয়াছি যে, সে আমার উপর এরূপ বাদ সাধিল । আমার একটি কন্যাকে সে একেবারে খাইয়া ফেলিল। আর

                • দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ wo একটিকে সে ভয় দেখাইয়া আরও পাগল করিল।”

বলা বাহুল্য যে, সুবালা পূৰ্ব্বদিকের ঘরে আর শয়ন করিত না। পশ্চিম দিকের ঘরে সে বাস করিতে লাগিল। সুবালার খেলাইবার সঙ্গিনী আর হইল না। ওরূপ বিপদসঙ্কুল বাড়ীতে কেহই আপনার কন্যা পাঠাইতে সম্মত হইল না। গুরুমায়ের নিকট থাকিয়া সুবালা মনোযোগের সহিত বিদ্যা অধ্যয়ন করিতে লাগিল। কখন কখন ধনুকধারী আসিয়া পড়িবার ঘরে বসিত। সুবালা বাগানে বেড়াইতে গেলেও ধনুকধারীর সহিত সৰ্ব্বদা সাক্ষাৎ হইত। সুবালার প্রতি রায়মহাশয় ও তাহার। ভাৰ্যার স্নেহ-মমতার আর পরিসীমা রহিল না। পাছে সুবালার কোনরূপ অনিষ্ট হয়, সেজন্য সৰ্ব্বদাই তাঁহারা শঙ্কিত হইয়া রহিলেন । সুবালাকে সমুদয় সম্পত্তি লিখিয়া দিবার নিমিত্ত রায়মহাশয় কতবার চিন্তা করিলেন। কিন্তু এ পাপের বিষয় তাহাকে দিলে পাছে কোনরূপ অমঙ্গল ঘটে, সেই ভয়ে তিনি তাহা করিলেন না। “আমার অবৰ্ত্তমানে যাহা হয় হইবে”, এইরূপ ভাবিয়া তিনি চুপ করিয়া রহিলেন। পুনরায় শ্রাবণ মাস আসিল। সুবালা খুড়ামহাশয়ের বাড়ীতে গমন করিল। সে স্থানে পূৰ্ব্বের ন্যায় আমোদ-আহাদে কালব্যাপন করিতে লাগিল । ভাদ্র মাস পড়িল। ভাদ্র মাসের শেষে খাদা ভূত পুনরায় দেখা দিল। ঘোর রাত্রি। রায়মহাশয় নিদ্রা যাইতেছিলেন। সহসা আঁহার নিদ্ৰাভঙ্গ হইল। ঘরে আলো জুলিতেছিল। “টুপ” করিয়া একটি টিল। তাঁহার ঘরের ভিতর পড়িল। নিম্নে বাগান হইতে জানােলা দিয়া ঘরের ভিতর কে সেই ঢ়িলটি ফেলিল। রায়মহাশয় আপনি উঠিয়া বসিতে পারেন না। চাকর ঘরের মেজেতে শয়ন করিয়া নিদ্রা যাইতেছিল। তাহাকে — “গদা! গদা! আমাকে তুলিয়া বাসা।” SNర్ চাকর উঠতে না-উঠতে, "টুপ” করিয়া সুগ্ৰীকিট চিল পড়ল। “গদা! গদা! ওঠ । আমাকে তুলিয়া বৃষস্থাৎসর্গ রায় মহাশয় পুনরায় বলিলেন। “টুপ”—আর সেই মুহূৰ্ত্তে বাগানোেহাঁইরে ঘরের ঠিক নিম্নে খাদা ভূতের হু-হু শব্দ হইল। রায়মহাশয় অজ্ঞান হইয়া পড়িলেন। পক্ষাঘাত রোগের শেষ আক্রমণ দ্বারা তিনি আক্রান্ত হইলেন। তিন ঘণ্টা পরে তাহার পরলোক হইল। আহা! সেইদিন সন্ধ্যাবেলা রায়মহাশয় আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছিলেন, — “টাকা স্থাদিয়া সুশরীর ক্রয় করিতে পারা যায় না। পক্ষাঘাত রোগে আমি কষ্ট ভোগ করিতেছি। টাকা আমাকে রোগ হইতে মুক্ত করিতে পারে না। অনেক ধনবান লোকের কথা আমি শুনিয়াছি, যাঁহাদের পাকস্থলী নষ্ট হইয়া গিয়াছে, পরিপাকশক্তি একেবারে লোপ পাইয়াছে, একটু সাবু খাইয়া তাহাদিগকে দিনপাত করিতে হয়। তাহারা টাকা দিয়া নূতন পাকস্থলী ক্রয় করিতে পারে না। যযাতি রাজার গল্প সকলেই অবগত আছেন। টাকা দিয়া প্রিয়জনের পরমায়ু ক্ৰয় করিতে পারা যায় না। আমার কথা দূরে থাকুক, বিপুল ঐশ্বৰ্য্যশালী রাজা-মহারাজকেও পুত্ৰ-কন্যার মৃত্যুজনিত মৰ্ম্মভেদী শোকে সন্তাপিত হইতে হয়। হায়, হায়! তবুও অধৰ্ম্ম করিয়া মানুষ অর্থে পাৰ্জন করিতে চেষ্টা করে। সেই অধৰ্ম্মের প্রতিফলস্বরূপ পরিণামের কত যে দুঃখ ভোগ করিতে হয়, সে সম্বন্ধে মানুষের যদি স্থির বিশ্বাস থাকিত, পাপের ফল যদি সঙ্গে সঙ্গে ফলিত, তাহা হইলে কখনই কেহ অধৰ্ম্ম করিত না । সুবালার মাতা সৰ্ব্বদাই কন্যা দুইটিকে বলিত—“দেখ সুচিন্তা! দেখ সুবালা! মিথ্যা কথা, মিথ্যাচরণ, নীচতা, নিষ্ঠুরতা, সৰ্ব্বদা বিষবৎ পরিত্যাগ করবে।” বেশ বুঝিতেছি যে, আমি আর অধিক দিন বাঁচিব না। দূর-অতিদূর পর্য্যন্ত

    • află cios (gs se - www.amarboi conf ماناكا আমার মানসিক দৃষ্টি যাইতেছে! জীবনের নানা বিষয় চিন্তা করিয়া আমার হৃদয় কম্পিত হইতেছে। আমি তোমাদিগকে বলিতেছি যে, পাপের প্রতিফল ভুগিতেই হয়, নিশ্চয় ভুগিতে হয়, তবে দুইদিন আগে আর দুইদিন পরে।”

পক্ষাঘাতের শেষ আক্রমণ দ্বারা যখন তিনি আক্রান্ত হইলেন, তখন তাঁহার জ্ঞান ছিল না! মাঝে মাঝে গুটিকত কথা বিজ বিজু করিয়া তাহার মুখ দিয়া বাহির হইতেছিল। নিকটে যাহারা ছিল, কান পাতিয়া তাহারা শুনিল। একবার তিনি বলিলেন,- “নদীকূলে কে ও বসিয়া? কি ভয়ানক মূৰ্ত্তি! যমের কিঙ্কর? উহার নাক নাই। কাদা দিয়া নাক গড়িতেছে, মুখের উপর বসাইতেছে। তাহার পর ফেলিয়া দিতেছে। এইরূপ বারবার করিতেছে। ও কি পাগল, না ভূত, না যমদূত?” কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া আবার বলিলেন,- “অতি দূরে ঊষর প্রান্তর; পার্শ্বে, বৃক্ষলতায় বসিয়া কে ও স্ত্রীলোকটি কঁদিতেছে? আহা! উহার মলিন বদন দেখিয়া বড়ই দুঃখ হয়। তুমিও কি বাছা পাপ করিয়াছিলে, তাহার প্রতিফল তুমিও কি ভোগ করিতেছ? পূৰ্ব্বে তুমি এই বাড়ীর কত্রী ছিলে? পাপের ফলে এখন তুমি অনাথিনী? তোমার হৃদয় রাত্রিদিন দগ্ধ হইতেছে? বাছা! আমি আর তোমাকে কি বুঝাইব? আমিও সেইরূপ আগুনে দগ্ধ হইতেছি। অধিক কথা নহে, আমরা যদি লোকের মনে দুঃখ না দিতাম; লোককে আমরা যদি না কাদাইতাম, তাহা হইলে আমাদের কাঁদিতে হইত না।” ক্রমে রায়মহাশয়ের গলা ঘড়ঘড় করিতে লাগিল তাঁহার মুখমণ্ডল বিকৃত হইয়া অতি ভয়ানক মূৰ্ত্তি ধারণ করিল। পক্ষাঘাত রোগে হয় নাই, তাহার শরীরের সেইদিক আতি ভয়ানকভাবে প্রসারিত ও কুঞ্চিত লাগিল। তাঁহার যন্ত্রণা ও বিকট আকৃতি দেখিয়া উপস্থিত ব্যক্তিদিগের ঘোরতর আড়ষ্ক হইল। বড়ালমহাশয় বললেন,— “মৃত্যুকালে অনেক লোকের নিকটে আমি উপস্থিত , কিন্তু এরূপ ভয়াবহ ব্যাপার কখনও আমি দর্শন করি নাই। আমি আর দেখিতে পারি। এই বলিয়া সে স্থান হইতে তিনি পলায়ন করিলেন। অল্পক্ষিণ পরে রায়ণীও সেই কথা কাঁদিতে কাদিতে ঘর হইতে পলায়ন করিলেন । গদা৷ চাকরীও ভয়ে ভীত হইয়া পলায়ন করিলেন। মৃত্যুকালে রায়মহাশয় একলা পড়িয়া রহিলেন। var V-J রায়মহাশয়ের পরলোক হইলে, রায়-গৃহিণী সুবালাকে আনিতে পাঠাইলেন। সুবালা আসিয়া দাদামহাশয়ের জন্য অনেক কাদিল । “আমাকে তোমরা সংবাদ দাও নাই কেন? আমি দাদামহাশয়কে দেখিতে পাইলাম না।” এই বলিয়া সুবালা খেদ করিতে লাগিল । “রায়মহাশয়ের হঠাৎ মৃত্যু হইয়াছে, সংবাদ দিবার সময় ছিল না,”— এই কথা বলিয়া সুবালাকে সকলে বুঝাইতে লাগিল। সুবালাকে কাছে ডাকিয়া রায়-গৃহিণী অনেক আদর করিলেন। তিনি বলিলেন,- “সুবালা! °"”* *f°"" ifGrRIlg{ °ii%3° q35 zx8! ~ www.amarboi.com ~ چه وي আমার যাহা হইবার তাহা হইয়া গিয়াছে। একে একে সকলেই গেল। বাকী কেবল আমি আর তুমি । ভগবান তোমার মঙ্গল করুন, ইহাই আমার প্রার্থনা। তুমি কোন পাপে নাই। আমার নিশ্চয় বিশ্বাস যে, খাদা ভূত তোমার অনিষ্ট করিতে সাহস করিবে না। ভগবান তোমাকে রক্ষা করবেন।” সুবালা বলিল,- “তোমাকেও, দিদিমণি, তিনি বঁাচাইয়া রাখিবেন।” রায়ণী বলিলেন, — “বাঁচিয়া থাকিতে আমার তিলমাত্ৰ সাধ নাই। তবে, কেবল তোমার নিমিত্ত আর সাত বৎসর পৃথিবীতে থাকিতে ইচ্ছা হয়। তাহা হইলে তোমাকে এই বিষয় দিয়া যাইতে পারি। এই সম্পত্তি তোমাকে দিয়া একজন রূপবান গুণবান বরের হস্তে তোমাকে সমৰ্পণ করিয়া মানে মানে যাইতে পারিলেই আমি এখন কৃতাৰ্থ হই!” রায়-গহিণী পুনরায় বলিলেন,- “আরও কথা এই, সুবালা! এই সম্পত্তি পাছে অন্য লোকের হাতে পড়ে, সেজন্য আমার বড় ভয়! তুমি বোধ হয় শুনিয়া থাকিবে যে, রায়মহাশয়ের এক ছোট ভাই আছে, তাহার নাম বিজয়। সে কলিকাতায় থাকে। তাহার বড় অহঙ্কার। সে বড় দুষ্ট । তোমার দাদামহাশয় আমাকে বারবার বলিয়া গিয়াছেন যে, সম্পত্তি কিছুতেই যেন সে না পায়। যদি আমার বয়ঃক্রম পঞ্চাশ বৎসর পূর্ণ না হয়, যদি সম্পত্তি তোমাকে আমি উইল করিয়া দিতে না পারি, তাহা হইলে সেই দুৰ্বত্ত ইহা পাইবে।” সুবালা জিজ্ঞাসা করিল,— “তিনি বড় দুষ্ট!” রায়-গৃহিণী উত্তর করিলেন,- “সে বড় দুষ্ট! যকৃত্যু বিষয় লইতে চেষ্টা করিয়াছিল। তাহার পর খাদা ভুতীেয় উপদ্রবে। উৎপীড়িত হইয়া, তোমার না। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার প্রতি তাহার কিছুমাত্র মম। না। তবেই বুঝিয়া দেখা যে, সে কেমন নিৰ্দয়, কেমন নিষ্ঠুর!” সুবালা জিজ্ঞাসা করিল,-“তিনি-ষ্ট্ৰেখিতে কিরূপ, দিদিমণি?” রায়-গৃহিণী উত্তর করিলেন- আঁমি অনেক দিন পূৰ্ব্বে তাহাকে দেখিয়াছি। এখন বােধ হয়, বিভীষণের মত তাহার মুখ হইয়া থাকিবে । চক্ষু দুইটা জবা ফুলের মত হইয়া থাকিবে। ভগদত্তর হাতীর মত তাহার শরীর হইয়া থাকিবে। নাকটা বাঁশের মত হইয়া থাকিবে।” সুবালা বলিল,— “সৰ্ব্বনাশ! কি ভয়ঙ্কর চেহারা!” রায়-গৃহিণী বলিলেন, — হাঁ, সে পাপাত্মার নাম করিও না; তোমার ভয় হইবে।” পুনরায় বর্ষাকাল পড়িল। শ্রাবণ মাসে সুবালা কাকা-মহাশয়ের গৃহে গমন করিলেন। ক্ৰমে তিনি বড় হইতে লাগিলেন, সেইসঙ্গে খেলাধূলাও বন্ধ হইতে লাগিল। বিনয়ের সহিত আর তিনি সেরূপ খেলা করিতেন না। তবে মনে মনে দুই জনে বিলক্ষণ প্ৰণয় হইয়াছিল। সেই প্ৰণয় দিন দিন পরিবদ্ধিত হইতে লাগিল। দেখা-সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত, এক স্থানে বসিয়া গল্প-গাছা করিবার নিমিত্ত, দুইজনে সৰ্ব্বদাই উৎসুক হইয়া থাকিতেন। পূৰ্ব্বের ন্যায় এখন আর ঘন ঘন দেখা হইত না। যখন দেখা হইত, তখন দুইজনে লেখা-পড়ার গল্প করিতেন। গত বৎসর রক্ষাকালীর পূজা করিয়া গ্রামের লোক শাকচুন্নির হাত হইতে পরিত্রাণ পাইয়াছিল। এ বৎসরও তাহারা রক্ষাকালীর পূজা করিল। একেবারেই গ্রামে আসিল না। গ্রামের লোকের আনন্দের আর পরিসীমা রহিল না। সকলে বলিল,— “রক্ষাকালী জাগ্রত দেবতা। ভূত-প্ৰেত সকলে তাঁহাকে ভয় করে। তাঁহার কৃপায় খাদা ভূতের হাত হইতে আমরা ty দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comশ্মির্ত্য"ক "******* পরিত্রাণ পাইলাম।” নানা বিপদে বিপন্ন হইয়া রায়মহাশয় ইদানীং গ্রামের লোককে উৎপীড়ন করিতেন না। সেজন্য শেষ অবস্থায় গ্রামবাসীদের সহিত তাঁহার কতকটা সদ্ভাব হইয়াছিল। তথাপি কেহ। কেহ বলিল,- “রায়মহাশয়ের পাপে খাদা ভূত এ গ্রামে আসিত। এখন তিনি নাই। সেজন্য খাদা ভূত এ গ্রামে আসে নাই।” পর বৎসরও খাদা ভূতের উপদ্রব হইল না। বৎসর কাটিয়া গেল। খাদা ভূতের দেখা নাই; গ্রামের লোকে ক্রমে তাঁহাকে বিস্মৃত হইল। কিন্তু পাঠক! খাদা ভূতের জন্য দুঃখ করবেন না। খাদা ভূতের সহিত পুনরায় সাক্ষাৎ হইবে। আর শাকচুন্নির হাড় দেখিয়া যদি;—থাক, সে কথায় এখন কাজ নাই । খাদা ভূত আর আসিল না। সেজন্য বড়ালমহাশয় ও রায়-গৃহিণীর আহাদ হইল। রায়ণীকে জীবিত রাখিবার নিমিত্ত বড়ালমহাশয় যথাসাধ্য যত্ন করিতে লাগিলেন। “ইনি যতদিন জীবিত থাকিবেন, ততদিন আমি মাসিক পঞ্চাশ টাকা পাইব । রাজাবাবু আমাকে যাহা দিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুত হইয়াছিলেন তাহা আমি পাই নাই। রায়গৃহিণীকে সেই কথা আমি বলিয়া দেখিব।” এইরূপ চিন্তা করিয়া বড়ালমহাশয় রায়ণীকে বঁাচাইয়া রাখিবার নিমিত্ত বিধিমতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। এইরূপে পাঁচ বৎসর কাটিয়া গেল। রায়ণী মনে মনে ভাবিতেছিলেন – “যখন খাদা ভূতের দৌরাত্ম্য দূর হইল, তখন আর ভাবনা নাই। পাঁচ বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। কেবল আর দুই বৎসর বাকী আছে। এ দুই বৎসর নিশ্চয়ই আমি বাঁচিয়া থাকিব। দুই বৎসর পরে শুরুপ্ত মােস আসিলে সমুদয় বিষয় সুবালাকে আমি লিখিয়া দিব। তাহার পর সুবালার বিবৰ্হি দিব। এই দুইটি কাজ হইয়া গেলে মরি-মারব। সে মরণে আমার খেদ নাই। কুিষ্ঠু কিছুদিন হইতে রাত্রিতে আমার গলা খুস খুস্ করে। সে জল কাসি, সে কিছু নহে।” কিছু নহে?—তাহা বড় নয়। সেই কাসির শব্দ ক্রমে বড়ালমহাশয়ের কর্ণগোচর হইল। তাঁহার ভয় হইল। তিনি র আনাইলেন। ডাক্তার বলিলেন,- “আপাততঃ কোন আশঙ্কা নাই। কিন্তু আমার সন্দেহ হইতেছে।” ডাক্তার ঔষধ দিয়া গেলেন। আপাততঃ কোন ভয় নাই বটে, কিন্তু রায়-গৃহিণী দিন দিন কৃশ হইতে লাগিলেন। বর্ষাকালে সুবালা খুড়ামহাশয়ের গৃহে গমন করিয়াছেন। রায়ণীকে সৰ্ব্বদা তিনি পত্ৰ লিখিতেন। একবার তিনি লিখিলেন, — “দিদিমণি! এ স্থানে বিনয় বলিয়া একটি লোক আছেন। ছেলেবেলা হইতে তাঁহাকে আমি জানি। তাঁহার বাড়ী কলিকাতা, এই গ্রামে তাঁহার মামার বাড়ী। তিনি বড়মানুষের ছেলে। তিনি চাকুরি করিবেন না। সেজন্য তিনি বি-এ, এম-এ, পাশ করেন নাই। ছবি আঁকার দিকে তাহার ঝোঁক । ফটোগ্ৰাফ লাইতে ও ছবি আঁকিতে তিনি উত্তমরূপে শিখিয়াছেন। আমার তিনি ফটোগ্ৰাফ লইয়াছেন। একখানি তোমার নিকট পাঠাইলাম। ঠিক যেন আমি। এখন রং দিয়া আমার বড় একখানি ছবি তিনি আঁকিতেছেন। আমার নিতান্ত ইচ্ছা যে, এইরূপ তোমার একখানি ছবি আঁকা হয়। নামাবলী গায়ে দিয়া জপের মালা হাতে করিয়া তুমি বসিয়া আছ, সেইরূপ ছবি আমার সাধ। আমি বিনয়কে বলিয়ছিলাম। আমাদের বাড়ী গিয়া তোমার ছবি আঁকিতে তিনি সম্মত আছেন। তাহার পিতা সঙ্গতিপন্ন লোক। কাহারও নিকট হইতে তিনি কিছু গ্ৰহণ করেন না।” ፵Igጭg ጭi8ጭሸ(፲ sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro సి প্রত্যুত্তরে রায়-গৃহিণী লিখিলেন,- “আমি মেয়েমানুষ, হতভাগিনী! আমার আবার ছবি কেন? যাহা হউক, তোমার যদি সাধ হইয়া থাকে, সে সাধ আমি পূর্ণ করিব। যদি সে লোক সম্মত হন, তাহা হইলে তুমি যখন এখানে আসিবে, সেই সময় তাহাকেও আসিতে বলিবে।” কাৰ্ত্তিক মাসে সুবালা বাড়ী ফিরিয়া আসিলেন। রায়-গৃহিণীর ছবি আঁকিবার নিমিত্ত অগ্রহায়ণ মাসে বিনয়ও সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। গায়ে নামাবলী ও হাতে জপের মালা দিয়া সুবালা তাঁহাকে বসাইতেন। বিনয় তাহার ছবি আঁকিতেন। প্রতিদিন এক ঘণ্টার অধিক রায়গৃহিণী বসিতে পারিতেন না। কারণ, কাসি এখনও তাঁহার ভাল হয় নাই। ক্রমেই তিনি দুৰ্ব্বল ও কৃশ হইয়া পড়িতেছিলেন। ছবি শেষ হইতে সেজন্য বিলম্ব হইতেছিল। বাহির-বাটীতে ভাল একটি ঘর বড়ালমহাশয় সাজাইয়া গুজাইয়া রাখিয়াছিলেন । সেই ঘরে বিনয় বাস করিতেছিলেন । যতক্ষণ ছবি আঁকা হইত, সুবালা ততক্ষণ সেই স্থানে উপস্থিত থাকিতেন। সেই সময় তিনজনে কথা-বাৰ্ত্ত হইত। বিনয় কত হাসির গল্প করিতেন। তাহা শুনিয়া রায়ণীও হাসিতেন, সুবালাও হাসিতেন। বিনয় ও সুবালার ভাব দেখিয়া রায়ণীর মনে সন্দেহ উপস্থিত হইল। রায়-গৃহিণী ভাবিলেন,- “সুবালা এখন আর নিতান্ত বালিকা নহে। আমি দেখিতেছি যে, ইহাদের দুইজনে প্ৰণয় হইয়াছে। তাহা ভাল নহে। যুবক ব্ৰাহ্মণ বটে। কিন্তু ইহার পরিচয় আমি জানি না। সুবালার বাপ কিরূপ ব্ৰাহ্মণ, কুলীন কি বংশজ।--তাহা আমি জানি না। ছেলেটি ভাল, ধীর, শান্ত, মিষ্টভাষী। ইহার শরীরে কোন দোষ আছে বোধ হয় না। কিন্তু তাহা হইলে কি । এখন আর খাদা ভূতের উপদ্রব নাই। ব না। সুবালার কাকাকে পত্ৰ লিখিব। যদি চিত্র অর্জনকাল ও অন্য সমািপ্প চিন্তা রায়-গৃহিণীর মুনে উদয় হইত। গুরু-মাকে সঙ্গে লইয়া বৈকাল বৈল সুবালা বাগানে বেড়াইতে যাইতেন, বিনয়ও কখন কখন সেই স্থানে যাইতেন। তিনজনে এ গাছ সে গাছ দেখিয়া বেড়াইতেন ও বেড়াইতে বেড়াইতে বিনয় নানারূপ গল্প করিতেন। সুবালা নিজে একটি ফুলের বাগান করিয়াছিলেন। বিনয় তাঁহাকে অনেক প্রকার বিলাতী ফুলের বীজ দিয়াছিলেন। সুবালা নিজ হাতে গাছগুলির গোড়া খুঁড়িয়া দিতেন, তাহাদের মূলে জলসেচন করিতেন। কোন গাছ অঙ্কুরিত হইতেছে, তিনি বড় ভালবাসিতেন। বিনয় ও সুবালাকে একসঙ্গে দেখিলে হিংসায় ধনুকধারীর বুক ফাটিয়া যাইত। ধনুকধারী মনে করিত,-“বাঁকড়া-চুলো এ উপসৰ্গটা কোথা হইতে উড়িয়া আসিয়া জুড়িয়া বসিল? আমি এখন কেহ নই। ধনুকধারী লবণ লইয়া এস, ধনুকধারী লঙ্কা লইয়া এস, ধনুকধারী আমড়া পাড়িয়া দাও, ধনুকধারী এ কাজ কর, সে কাজ কর, তখন ধনুকধারী গোলাম ছিল— এখন ধনুকধারী কেহ নয়। এখন ধনুকধারী কৰ্ম্মচারীর শ্যালকপুত্র কীটস্য কীট, পদদলিত করিবার উপযুক্ত পােত্র!” চিত্র-অঙ্কন কাৰ্য্যে নিযুক্ত শিল্পকারগণ মাথায় বড় বড় চুল রাখিয়া দেন। প্রচলিত প্ৰথা অনুসারে বিনয়ও মাথায় বড় বড় চুল রাখিয়াছিলেন। সেইজন্য ধনুকধারী দ্বারা তিনি “ঝোঁকড়া WʻqRO দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboicom"33"oro"***"o"PER* চুলো এ উপসর্গ নামে অভিহিত হইলেন। রাগে গর গরু করিয়া, অন্তরাল হইতে ধনুকধারী তীহাদিগকে দেখিত। “দূর কর, আমি আর দেখিব না, দেখিলে আমার বুক ফাটিয়া যায়।” এই বলিয়া একদিন ধনুকধারী একটি গাছের আড়ালে দাঁড়াইয়া চক্ষু বুজিয়া রহিল। অধিকক্ষণ চক্ষু মুদিত করিয়া থাকিতে পারিল না। পুনরায় চক্ষু চাহিল। সেই সময় বিনয় সুবালাকে কি বলিলেন, সুবালা হাসিয়া উঠিলেন। দূর হইতে হাসির শব্দ ধনুকধারীর কর্ণকুহরে প্রবেশ করিল। হাসি অতি সুমিষ্ট বটে, কিন্তু সে হাসি৷ ঐ বেঁকড়া-চুলো ছবি-আঁকা ছোড়ার কথায় উৎপত্তি হইয়াছিল। ধনুকধারীর কানে যেন বিষ ঢালিয়া দিল । দূর হইতে ভাল করিয়া তাহাদিগকে দেখিবার জন্য ধনুকধারী এক অশ্বখ গাছের উপর উঠিল। অতি উচ্চে ডালের উপর বসিয়া বিরাসবদনে সুবালা ও বিনয়কে সে দেখিতে লাগিল। “খুট” করিয়া গাছের একটু শব্দ হইল। বিনয়ের দৃষ্টি সেই দিকে পড়িল। বিনয় বলিলেন,- “দেখ, দেখ! অশ্বথ গাছে কে একটা লোক বসিয়া রহিয়াছে।” তিনজনে নিকটে আসিলেন। নিকটে আসিয়া সুবালা তাহাকে চিনিতে পারিলেন। সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন, — “ধনুকধারী! তুমি গাছের উপর বসিয়া কেন?” ধনুকধারী উত্তর করিল,— “বসিয়া আছি।” গুরু-মা জিজ্ঞাসা করিলেন,- “ঐ কি বসিয়া থাকিবার স্থান?” ধনুকধারী উত্তর করিল,- “দোষ কি?” সুবালা কোন কথা জিজ্ঞাসা করিলেন না। তিনজনে সে স্থান হইতে চলিয়া গেলেন। অভিমানে, দুঃখে ও ক্ৰোধে ধনুকধারীর বীর কপিতে লাগিল । ধনুকধারী ভাবিতে লাগিল,“বেটার প্রখর সৃষ্টিদেখ! আমি গাছে বসিয়া আছি, তা তোর কি রে। বেটা? আমি কেহ নাই, কিছুতেই র সমকক্ষ নই, আমি মানুষ নই। বটে! তোমরা ধন্যবান, আমি গরীব, তোমরা ব্ৰাহ্মন্ধৎসু মমি কায়েত, কোন বিষয়ে তোমাদের আমি সমকক্ষ নই, সেইজন্য আমাকে এত অবজ্ঞা, ঘটী|” চতুৰ্দশ অধ্যায় আর সে কাল নেই এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে ধনুকধারী গ্রামের ভিতর প্রবেশ করিল। সে স্থানে এক ব্ৰাহ্মণকুমারের সহিত দেখা হইল। ব্ৰাহ্মণ বলিল,— “কি হে ধনুকধারী! বিরসবদন কেন?” ধনুকধারী উত্তর করিল,— “তোমার কি?” ব্ৰাহ্মণ বলিল,— “ইস্! কেউটে সাপ! তোমার পিসে মহাশয় আমাদের দেখিলে যোড়হাতে প্ৰণাম করেন। তুমি মেজাজ গরম করিয়া থাক। ভ্ৰক্ষেপ কর না।” ধনুকধারী উত্তর করিল,— “যাও যাও! আর সে কাল নাই। কলিকাতায় সভা হইয়াছে। নূতন শাস্ত্ৰ বাহির হইয়াছে। এখন আর কায়স্থ নয়, বাছাধন! এখন ক্ষত্রিয়! গলায় এখন এই— izog foi sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro NGAN সকলেই এখন পরিতেছে।” দিতেছে। যাহাদের নাই, তাহারা ইহার জন্য লালায়িত হইয়াছে। পৃথিবীর রহস্য কিছু বুঝিতে পারা যায় না। সে যাহা হউক, তোমার পিসে মহাশয় বড়াল। বড়াল কি কখনও কায়স্থ হয়?” ধনুকধারী উত্তর করিল,— “বড়াল নহে, বটব্যাল। লোকে বড়াল বলে। বটব্যাল একটা গ্রামের নাম। তোমাদের যেমন খড়দহ। সেই গ্রামের নাম হইতে পিসে মহাশয়ের পদবী হইয়াছে। বড়াল ব্ৰাহ্মণ আছে, বণিক আছে, কায়স্থও আছে।” ব্ৰাহ্মণ বলিল,— “তা যেন হইল, কিন্তু ব্ৰাহ্মণ দেখিয়া প্ৰণাম করিবে না কেন?” ধনুকধারী উত্তর করিল,- “সে এখন উঠিয়া গিয়াছে। বিশেষতঃ আমি দত্ত। দত্ত কাহারও ভৃত্য নহে। কায়স্থ, নামের পূৰ্ব্বে আর “দাস” লিখিবে না। দাস ঘোষ, দাস বােস, এসব এখন উঠিয়া যাইবে। আমরা রামের জাতি, কৃষ্ণের জাতি, তােমাদিগকে এখন আমাদের পায়ে—না, আর অধিক কথার প্রয়োজন নাই, সেকেলে গোড়ার রাগ করবে।” এই বলিয়া ধনুকধারী গজ গজ করিতে করিতে সেস্থান হইতে চলিয়া গেল। ছবি অঙ্কন শেষ হইল। বিনয় কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিলেন। রায়ণী সুবালার কাকাকে পত্ৰ লিখিলেন,- “আমার ছবি আঁকিতে বিনয় বলিয়া যে ছেলেটি আসিয়াছিল, সে অতি ভাল ছেলে। তাহার রূপে ও গুণে আমি মুগ্ধ হইয়াছি। কিন্তু তোমাদের কিরূপ বংশ, তাহার কিরূপ বংশ, সে সকল কথা আমি জানি না। তাহার মামার তোমাদের গ্রামে। যদি কোন আপত্তি না থাকে, তাহা হইলে সুবালার সহিত তাহার ? আমার শরীর ভাল নহে। কাসি কিছুতেই ভাল হইতেছে না। দিন দিন আমি কৃশু ও হইয়া পড়িতেছি। কোন একটি ভাল ছেলের হাতে সুবালাকে সমর্পণ করিয়া যাইক্রোন্তৰ্গরিলে আমি সুখে মরিতে পারি।” বাস্তবিক রায়ণীর শরীরের অবস্থা মন্দ হইতে মন্দতর হইতে লাগিল। ডাক্তারে বলিল যে, তাহার ক্ষয়কাস হইয়াছে, তুষ্টব্য আশু বিপদের আশঙ্কা নাই। বড়ালমহাশয়ের প্রাণ উড়িয়া গেল”। কিরূপে আর দুইটা বৎসর তাঁহাকে বঁাচাইয়া রাখিবেন, সেজন্য তিনি ভাবিত হইলেন। ডাক্তারদিগের নিকট অনেক মিনতি করিলেন। ডাক্তারগণ বলিল,— “ভগবান ভিন্ন মানুষের কেহ প্ৰাণ দিতে পারে না। দুই বৎসর দূরে থাকুক, একদিনের জন্য কেহ কাহারও পরমায়ু বৃদ্ধি করিতে পারে না। কোন কোন রোগ ঔষধ প্রয়ােগ করিয়া বড়জোর ঘণ্টা কয়েক মানুষকে জীবিত রাখিতে পারা যায়, কিন্তু তাহাও সন্দেহ।” রায়-গৃহিণীর প্রথম ডাক্তারী চিকিৎসা হইল। কোন ফল হইল না। তাহার পর হােমিওপ্যাথি চিকিৎসা হইল, কিছুই হইল না। অবশেষে কবিরাজী চিকিৎসা হইল। কলিকাতা হইতে অনেক বৈদ্য আসিলেন। রোগীকে তাহারা বুড়ি ঝুড়ি রংকরী কুইনাইনের বড়ি খাওয়াইলেন। বাগিনীর দুগ্ধ, গণ্ডরের পিত্ত প্রভৃতি অনেক প্রকার সুলভ অনুপানের ব্যবস্থা করিলেন। বড়ালমহাশয় প্ৰাণপণে সে সমুদয় বস্তু আহরণ করিলেন। অবশেষে একজন বড় কবিরাজ আসিয়া বলিলেন—“যদি কুন্তীরের মাথার চুলের সাত শত একান্নটি উকুন আনাইতে পারেন, তাহা হইলে রোগিণীকে আমি রোগ হইতে মুক্ত করিতে পারি।” বড়ালমহাশয় এইবার পরাস্ত হইলেন। সে বস্তু তিনি আনিতে পারিলেন না। এরূপ অনায়াসলভ্য দ্রব্য যদি না আনাইতে পারিলেন, তাহা হইলে রোগিণী কি করিয়া ভাল হইবেন! সুবালার কােকা মহাশয় রায়-গৃহিণীর পত্ৰ পাইলেন। বিনয়ের বংশপরিচয় কাকমহাশয় প্রথম ՖԳՀ fi:Ilă zi, o ga se - www.amarboi conf** হইতেই অবগত ছিলেন। কুলমৰ্যাদা সম্বন্ধে দুই বংশ আদান-প্ৰদান হইতে পারে। বিনয়ের পিতা সঙ্গতিপন্ন ব্যক্তি। মায়ের মাসীর কল্যাণে সুবালা নগদ টাকা ও ভূসম্পত্তির অধিকারিণী হইবেন। তাহার পর, বিনয় পিতামাতার একমাত্র পুত্র। সুবালা সম্বন্ধে অনেক দিন হইতেই লোকে তাহার মনের ভাব বুঝিয়াছিল। এই কথা তাঁহাকে ও সুবালাকে অনেকে তামাসা করিয়াছিল। বিনয় যাহাতে সন্তোষ লাভ করেন, তাহার পিতা-মাতা নিশ্চয় তাহা করিবেন। সুবালার কাকমহাশয় মনে মনে এইরূপ চিন্তা করিয়া কথাবাৰ্ত্তা আরম্ভ করিলেন। সৌভাগ্যক্রমে বিনয়ের মাতা সেই সময় পিত্ৰালয়ে ছিলেন। প্ৰথম স্ত্রীলোকে স্ত্রীলোকে কথার সূচনা হইল। বিনয়ের মাতা সম্মত হইলেন। তাহার পর কাকমহাশয় বিনয়ের পিতার নিকট গমন করিলেন। তিনিও এ বিবাহে সম্মত হইলেন। কথা হইয়া থাকিবে, কিন্তু কেন সুবালার এখন বিবাহ হইবে না, সে সমুদয় বৃত্তান্ত কাকামিহাশয় বিনয়ের পিতাকে প্ৰদান করিলেন। কথাবাৰ্ত্তার সময় কাকা মহাশয় সুবালার পিতার নাম করিলেন। সুবালার পিতা কে, সে সম্বন্ধে অধিক পরিচয় দিতে হইল না। করে না। রায় মহাশয় সুবালার মায়ের মেসো ছিলেন, সুবালার সহিত তাঁহার অন্য কোন নিকট সম্বন্ধ ছিল না । সেজন্য বিবাহের কথাবাৰ্ত্তার সময় রায়মহাশয়ের নাম পৰ্যন্ত কেহ উল্লেখ করিল না। সুবালা যে রায়মহাশয়ের বাটীতে প্ৰতিপালিত হইয়াছেন, সুবালা রায়মহাশয়ের সম্পত্তির যে উত্তরাধিকারিণী হইবেন, এ কথার দুর্গ বিনয়ের পিতা জানিতে পারিলেন না। তিনি কেবল এইমাত্ৰ শুনিলেন যে, কন্যার মাসীর ভূসম্পত্তি আছে। কন্যা সেই সম্পত্তির অধিকারিণী হইবেন । কন্যা মায়ের থাকেন। বিনয়ের পিতা-মাতা সম্মত হইলেন। দুই বৎসর পরে, অর্থাৎ সুবালার পঞ্চদশ বৎসর পূর্ণ হইলে বিবাহ হইবে। এখন কথা স্থির হইয়া রহিল। দুই পী সত্য করিলেন । লোক-পরম্পরায় বিবাহের কথা র কানে উঠিল, বিনয়েরও কানে উঠিল। বলা বাহুল্য যে, দুইজনেই আহাদিত সুবালা ভাবিলেন, — “বিনয়কে দেখিয়া আমি কি করিয়া লজ্জা করিব। এখন আমি লজ্জা করিতে পারিব না। আমি যেন এ কথা শুনি নাই, সেইভাবে বিনয়ের সহিত কথোপকথন কিরিব।” বিনয় ভাবিলেন,- “সুবালাকে যদি কেহ এ কথা এখনও না বলে, তাহা হইলে ভাল হয়। এ কথা শুনিলে সুবালা হয় তো আর আমার সহিত ভাল করিয়া কথা কহিবে না। যাহা হউক, আমি এ বিষয়ের বিন্দুমাত্র উল্লেখ করিব না।” “বিবাহের কথা যেন আমি শুনি নাই, এইভাবে বিনয়ের সহিত আমি কথা কহিব”— সুবালা মনে মনে এইরূপ স্থির করিলেন বটে, কিন্তু কাজে তিনি তাহা করিতে পারিলেন না। স্বভাবতঃ লজ্জাশীলা স্ত্রীলোকের লজ্জা আপনা হইতে আসিয়া পড়ে। বিনয়ের সহিত তিনি কথোপকথন করিতেন বটে, কিন্তু মুখ তুলিয়া আর বড় চাহিতে পারিতেন না। এক প্রকার লজ্জিত, কুষ্ঠিত, শঙ্কিতভাবে তিনি বিনয়ের সহিত কথা কহিতেন। ক্ষয়কাস! দ্রুতবেগে রায়-গৃহিণী পীড়া বৃদ্ধি হইল না বটে, কিন্তু শুষ্ক হইয়া দেহ তাঁহার অস্থিচৰ্ম্মসার হইয়া পড়িল । প্রায় দুই বৎসর কাটিয়া গেল। এ বৎসর শ্রাবণ মাসের ২০শে রোগিণীর বয়ঃক্রম পঞ্চাশ পাপের পরিণাম। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro wo বৎসর পূর্ণ হইবে। আষাঢ় মাস পড়িল। আর দিন। এত দিন কাটিয়াছে; এই কয়টা দিন কি আর কাটিবে না? কিন্তু বর্ষা-আরম্ভে রায়-গৃহিনী ফুলিয়া পড়িলেন। উদরের দােষও হইল। শ্রাবণ মাসের ২০শে পৰ্যন্ত বঁচিয়া থাকিবেন কি না,-“ডাক্তার-বৈদ্য কেহই নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারিল না। বড়ালমহাশয় ও রায়-গৃহিণী দুইজনে পরামর্শ করিয়া এবার সকাল সকাল সুবালাকে কাকার বাড়ী পাঠাইয়া দিলেন। সুবালা কিছুতেই যাইতে সম্মত হন নাই। “দিদিমণির এমন অসুখ কি করিয়া এ অবস্থায় তাহাকে আমি ফেলিয়া যাইব,”— এই বলিয়া সুবালা কাঁদিতে লাগিলেন । কিন্তু রায়-গৃহিণী তাঁহার কথা শুনিলেন না। “তুমি সেখানে না গেলে আমার প্রাণ সুস্থির হইবে না। মন অস্থির থাকিলে আমার পীড়া বৃদ্ধি হইবে। যদি বা কিছুদিন বীচিতাম, তোমার ভাবনায় তাহাও বঁচিব না। “যাও দিদি, যাও! আমার কথা অমান্য করিও না।” রায়-গৃহিণী। এইরূপে তাঁহাকে বুঝাইতে লাগিলেন । সুবালা বলিলেন,- “তোমার কথা আমি অমান্য করিব না, আমি চলিলাম। কিন্তু দিদিমণি! তােমার পীড়া যদি বৃদ্ধি হয়, তাহা হইলে বড়ালমহাশয় তৎক্ষণাৎ যেন আমাকে সংবাদ দেন। সংবাদ পাইলেই আমি চলিয়া আসিব ।” বড়ালমহাশয় স্বীকৃত হইলেন। বিরসবদনে, ছল ছলনয়নে সুবালা খুড়ামহাশয়ের বাটীতে গমন করিলেন। ?' রায়-গৃহিণীর অবস্থা আরও মন্দ হইল। ডাক্তার-বৈদ্যগণ হতাশ হইয়া পড়িলেন। ২০শে শ্রাবণ পৰ্যন্ত তিনি যে বঁচিয়া থাকিবেন, সে সম্বন্ধে বিলক্ষণ সন্দেহ হইল। এই সময় গ্রামের লোকের আর একটি বিপদ উপস্থিত হইল। এই দুর্ভাগা গ্রামের লোকের কি কপাল! বিধাতা কি ইহাদিগকে সুস্থির হইয়া কালব্যাপন করিতে দিবেন না? প্রথম খাদা ভূতের জ্বালায় কয়েক বৎসর লোক জর্জরিত হইল। রাত্রি দুই প্ৰহরের সময় তাহার ভয়াবহ হুহুঙ্কার রবে লোকের পেটের প্লীহা চমকিত হইল। তাহার পর শাকচুন্নি!! একটা নহে দুইটা,-একজোড়া। লক লক্‌ জিহ্বায় কাহাকে খাই, কাহাকে খাই করিয়া কিছুদিন গ্রামের লোককে উৎপীড়িত করিল। শাকচুন্নির উপদ্রবের সময় শঙ্করা আরও দুই তিন বার দূর হইতে তাহাদিগকে দেখিয়াছিল এবং শঙ্করাই গ্রামের লোককে শাকচুন্নির আকৃতি-প্রকৃতির পরিচয় দিয়াছিল। অতি কষ্টে এই দুই বিপদ হইতে লোক পরিত্রাণ পাইল। এখন আবার এক নূতন বিভীষিকা উপস্থিত হইল। একদিন প্ৰাতঃকালে যুধিষ্ঠির ঘোষের পঞ্চমবধীয় পুত্র হেরম্ব, পথে একটি নেকড়ার অর্থাৎ ছিন্নবস্ত্রের পুঁটুলি মাড়াইয়া ফেলিল। পথে তিনটি পুঁটুলি পড়িয়াছিল। V8 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comৰ্ম্মিািক্যনাথ ******** যে-সে পথ নহে, তিন মাথার পথ, অর্থাৎ তিনটি গ্ৰাম্য পথ এই স্থান হইতে তিন দিকে গিয়াছিল। তেমাথা পথের ঠিক সন্ধিস্থলে পুঁটুলি তিনটি পড়িয়াছিল। লোকে ভাবিয়া দেখিল যে, নিরীক্ষণ করিয়া দেখিল । ভয়ে তাহারা হতভম্ব অবাক হইয়া রহিল! বলিবে আর ছাইভস্ম কি ! এ ঘোর সকর্বনাশের কথা বাক্য দ্বারা প্ৰকাশ করিয়া বলিতে পারা যায় না । সেজন্য অতি গভীরভাবে দুই-চারি বার ঘাড় নাড়িয়া তাহারা স্ব স্ব স্থানে প্ৰস্থান করিল। কিন্তু গ্রামের লোক নিৰ্ব্বোধী নহে! বুঝিতে। আর কিছু বাকি রহিল না। উহাকে তুক বা গুণ বলে। অতি সাংঘাতিক তুক্‌! এ তুক মাড়াইলে বা ডিঙ্গাইলে আর রক্ষা নাই। গ্রামের লোকের এরূপ সৰ্ব্বনাশ কে করিয়াছে, তাহাও কি আর বুঝিতে বাকী থাকে? কাহার অনেক টাকা আছে? মরণাপন্নরোগগ্ৰস্ত হইয়া কে বিছানায় পড়িয়া আছে? কে তাহাকে বঁাচাইয়া রাখিতে চেষ্টা করিতেছে? বড়ালমহাশয়কে সকলে ছিছি করিতে লাগিল । দূর হইতে পুঁটুলি তিনটির উপর অনেক শুষ্ক খড় নিক্ষেপ করিয়া অগ্নিদ্বার দগ্ধ করা হইল। তাহা যেন হইল। কিন্তু যুধিষ্ঠির ঘোষের পুত্র হেরম্ব পুঁটুলির উপর যে পা রাখিয়াছিল, এখন তাহার উপায় কি? সকলে বলিল যে, সে আর কিছুতেই রক্ষা পাইবে না! তাহার পিতামহী, তাহার মাতা, তাহার জ্যেঠাই-মা, তাহার খুড়ী-মা সকলে উচ্চৈঃস্বরে ক্ৰন্দন করিতে লাগিল। গ্রামের অন্যান্য স্ত্রীলোকও আসিয়া সেই ক্ৰন্দনে যোগদান করিল। ক্ৰন্দনের কোলাহলে গ্রাম পরিপূর্ণ হইল। বালক হেরম্ব তৎক্ষণাৎ শয্যাশায়ী হইয়ুপুড়িল। মুখ দিয়া তাহার কথা বাহির হয় না, দেখিতে দেখিতে সে দুৰ্ব্বল হইয়া পড়িলু (6রৈাগ নহে যে, ডাক্তার-বৈদ্য আসিয়া চিকিৎসা করিবে। যুধিষ্ঠির ঘোষ মাথায় হাত শি হইয়া বসিয়া পড়িল । ভাগ্যে গ্রামে গৌরিবিণী নামে এক রণী ছিল। সেকালে যখন ডাইনীর উপদ্রব অতিশয় প্রবল ছিল, তখন গীেরবিণী দিদিমায়ের নিকট হইতে অনেকগুলি আড়াই অক্ষরের মন্ত্র ও অনেকগুলি ঔষধ রাখিয়াছিল। তুকের জনরব ও কান্নার রোল শুনিয়া লাঠি ধরিয়া ঠক ঠক করিতে গুড়ি গুড়ি গীেরবিণী বুড়ী আসিয়া উপস্থিত হইল। “ভয় নাই, ভয় নাই, আমি ছেলেকে বঁাচাইব”, এই বলিয়া সকলকে সে আশ্বাস প্ৰদান করিল। তাহার পর হেরম্বর নিকটে বসিয়া সে ঝাড়-ফু আরম্ভ করিল। মন্ত্র ও ফুৎকারের প্রভাবে বালক উঠিয়া বসিল। গীেরবিণী বলিল যে, রাম-কবিচের কৰ্ম্ম নহে। এ ভূত নহে যে, রাম-কবচকে ভয় করিবে। ইহাকে যাদু বলে। অবশেষে সে ঔষধসম্বলিত একটি নেকড়ার পুঁটুলি অর্থাৎ মাদুলি বালকের গলায় পরাইয়া দিল! তাহা পরিধান করিয়া বালক সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হইল। গ্রামের লোক ভাবিল যে, গীেরবিণী অসাধ্য সাধন করিল, বলিতে গেলে মরা মানুষকে প্ৰাণদান করিল। সকলে তাহাকে ধন্য ধন্য করিতে লাগিল। গীেরবিণীর আরও সুখ্যাতি এইজন্য হইল যে, মন্ত্র অথবা ঔষধের মূল্যস্বরূপ কাহারও নিকট হইতে সে একটি কপৰ্দকও গ্ৰহণ করে না। তবে কি জান যে, যে গাছের শিকড় ঔষধস্বরূপ ব্যবহৃত হয়, সে গাছকে প্রথম জানান দিতে হয়। পূৰ্ব্ব রাত্রিতে সে গাছের মূলে পাঁচটি পয়সা, পাঁচ সের ধান, পাঁচ গণ্ডা পান, পাঁচ গণ্ডা সুপারি ও পাচ গণ্ডা বিচালি বা খড়ের আটটি রাখিয়া আসিতে হয়। গীেরবিণী বলিল, “এবার আমি অনেক কষ্ট শিকড় পাইয়াছি। কিন্তু আজ রাত্রিতে ঐ সকল দ্রব্য সেই গাছের গোড়ায় রাখিতে হইবে। যদি না রাখি, তাহা হইলে ভবিষ্যতে আর আমি কখন ঔষধ পাইব না। শিকড় দূরে থাকুক গাছটি পৰ্যন্ত অদৃশ্য হইয়া যাইবে।” পুত্রের পাপের পরিণাম। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro &9ግ6ኡ প্ৰাণ পাইয়া যুধিষ্ঠির ঘোষ আহাদে আটখানা হইয়াছিল। তৎক্ষণাৎ গীেরবিণীকে সে ঐ সকল দ্রব্য প্ৰদান করিল। গীেরবিণীর একটি গাই গরু ছিল। তুক ক্ষান্ত হইল না। বুধবার দিন প্ৰাতঃকালে সকলে দেখিল যে, গ্রামের কোন পথে কতকগুলি ছেড়া চুল, কোন পথে সিন্দুর, কোন পথে কণাকড়ি পড়িয়া আছে। দুৰ্ব্বত্ত যাদুকর মঙ্গলবার রাত্ৰিতে এইরূপ গুণ করিয়াছিল। গ্রামের লোক অতি সাবধানে সে সমুদয় তুক্‌ পোড়াইয়া ফেলিল। এখানে পা ফেলিয়া, সেখানে পা ফেলিয়া, অতি সন্তৰ্পণে সকলে পথ চলিতে লাগিল। ফলকথা, এ গ্রামে বাস করা লোকের পক্ষে ভার হইয়া উঠিল। যাহারা এ সৰ্ব্বনাশ করিতে প্ৰবৃত্ত হইয়াছেন, তাঁহারা বড়লোক। ভয়ে কোন কথা তাঁহাদিগকে বলিতে পারিল না। কি কুক্ষণে যে এ গ্রামে রায়মহাশয় ও তাঁহার গৃহিণী পদার্পণ করিয়াছিলেন, সকলে তাহাই ভাবিতে লাগিল। সকলে আরও বলিল যে, সুবালা দিদি এখানে থাকিলে আমাদের উপর এরূপ অত্যাচার হইত না। নিশ্চয় তিনি আমাদের দুঃখ দূর করিতেন। কত আর সতর্ক হইয়া লোক পথ চলিতে পারে? একদিন না একদিন কেহ না কেহ গুণের উপর পা ফেলিয়া বসিবে, অথবা গুণকে ডিঙ্গাইয়া যাইবে । সেই আশঙ্কায় লোক অস্থির হইয়া পড়িল। যাহাদের উপায় ছিল, তাহারা আপন আপন পুত্ৰ-কন্যাদিগকে মাতুলালয়ে অথবা অন্য আত্মীয়স্বজনের নিকট পাঠাইয়া দিল। কিন্তু যাহাদের সে উপায় নাই, তাহারা করে কি? এই দুঃসময়ের গীেরবিণী তাহাদিগকে রক্ষা করিল। গীেরবিণী বলিল যে, যেমন তুকুতাক গুণী-জ্ঞান হউক না কেন তাহারা নেকুড়ার পুঁটুলি অর্থাৎ মাদুলি গলায় পরিধান করিয়া সে তুক মাড়াইলে অথবা ডিঙ্গাইলে কিছুমাত্র অনিষ্ট হইবে না। তাহা শুনিয়া র প্রাণ অনেকটা সুস্থির হইল। প্ৰাণ আগে না পয়সা আগে। অতি দীন দুঃখীও এক মাদুলির জন্য পাঁচটি পয়সা, পাঁচ সের ধান্য, পাঁচ গণ্ডা পান, পাঁচ গণ্ডী সুপারি ওষ্ট্রেষ্ট/গণ্ডা বিচালির আঁটি জানান দিতে লাগিল। পয়সা, ধান প্রভৃতির কথা যাউক, .ে র দাঁত পড়িয়া যায় নাই। অনায়াসে সে পান চিবাইতে পারিত। এক্ষণে কু খাইয়া সৰ্ব্বদাই সে মুখ রাঙা করিয়া রাখিত । একগাল পান চিবাইতে চিবাইতে যখন সে বিনামূল্যে লোকদিগকে ঔষধ বিতরণ করিত, তখন তাহার সেই রক্তবর্ণেরঞ্জিত মুখ দেখিয়া লোকের মন ভক্তিরসে ভিজিয়া যাইত। রাত্রিতে উঠিয়া নিকটস্থ অন্যান্য গ্রামে গীেরবিণী ঔষধ তুলিতে যাইত। সেই সময় হইতে সে গ্রামেও তুক আরম্ভ হইত। কাজেই অন্যান্য গ্রামের লোকও আসিয়া গীেরবিনীর নিকট হইতে ঔষধ গ্ৰহণ করিত। অন্যান্য গ্রামেরও এই সুযোগে পুরুষ-চিকিৎসক ও স্ত্রী-চিকিৎসকের আবির্ভাব হইল। গীেরবিণীর ন্যায় তাহারাও বিনামূল্যে ঔষধ বিতরণ করিতে লাগিল। কিন্তু ততদূর পসারপ্রতিপত্তি আর কাহারও হইল না। গ্রামে মাতুঠাকুরাণী অর্থাৎ মাতঙ্গিনী নামে এক বিধবা ব্ৰাহ্মণী বাস করেন। তাঁহার কয়েক বিঘা। ভূমি আছে। ভাগে দিয়া তাহা হইতে যে ধান্য লাভ করেন, তাহাতে সুখে-স্বচ্ছন্দে তাঁহার দিন কাটিয়া যায়। সেজন্য মৃত্যুকে তিনি বড় ভয় করেন। তামাসা করিয়া কেহ তাঁহাকে “মর” বলিলে আর রক্ষা থাকে না । গালি দিয়া সে লোকের তিনি প্ৰাণান্ত করেন। একদিন প্ৰাতঃকালে তিনি উঠিয়া দেখিলেন যে, তাহার দ্বারে একটি শুষ্ক শুভ্ৰবর্ণের গরুর মাথা পড়িয়া রহিয়াছে। সৰ্ব্বনাশ! মাথায় আবার সিন্দুর! গ্রামের লোক দলে দলে আসিয়া তাঁহার দ্বারে দাঁড়াইল । কিন্তু এ যে কিরূপ গুণ, কেহ তাহা ভাল বুঝিতে পারিল না। অবশেষে ধনুকধারী আসিয়া ইহার প্রকৃত অৰ্থ ব্যাখ্যা করিয়া দিল। ধনুকধারী বলিল, “এই যে তুক্‌টি তােমরা দেখিতেছি, এ

              • '16'afraig -iibg gis so! - www.amarboi.com وهما ঘোর সাৰ্ব্বনাশের তুক, এ যে-সে তুক নহে। হাঁ করিয়া গরুর মুখ বাড়ীর দিকে রহিয়াছে। এই বাড়ীতে গরু ঘাস-জল খাইবে, অর্থাৎ এই বাড়ীর লোকের পরমায়ু সে ভক্ষণ করিবে।” এই কথা শুনিয়া মাতুঠাকুরাণীর মুখ ভয়ে শুষ্ক হইয়া গেল। তিনি বলিলেন, “তাই তো বলি যে, কাল রাত্রি হইতে আমার পেট এত হুটপাট করে কেন! ঐ গো-ভূত আমার পেটের পেট এত হুটপাট করে কেন। ঐ গো-ভূত আমার পেটের ভিতর প্রবেশ করিয়াছে। শিশু বাছুরের ন্যায় আমার পেটের ভিতর সে ছুটিাছুটি করিতেছে। গরুতে যেরূপ ঘাস ছিড়িয়া খায়, পেটের নাড়ীভৃড়ি সে সেইরূপ ছিড়িয়া খাইতেছে।” বলা বাহুল্য যে, বিধবার ঘোরতর ত্রাস হইল। তাহার গালাগালির শব্দে কয়েক দিন গ্ৰাম কম্পিত ও স্ফটিত হইতে লাগিল। যাহা হউক, গীেরবিণী তাঁহাকে বিপদ হইতে রক্ষা করিল। কিন্তু তিনটি নেকড়ার মালা তাঁহাকে গলায় পরিধান করিতে হইল। ধনুকধারী আসিয়া যখন সে স্থানে দণ্ডায়মান হইয়াছিল, তখন সকলে দেখিল যে, তাহার হাতে ও কাপড়ে সিন্দুর লাগিয়াছে। তাহা দেখিয়া সকলে বুঝিতে পারিল। বড়ালমহাশয়কে লক্ষ্য করিয়া, আঙ্গুল মটকাইয়া, আকাশের দিকে চাহিয়া, বিধবা রাত্রিদিন গালি দিতে লাগিলেন। তাহা শুনিয়া বড়ালিনী একদিন তাহার সহিত ঝগড়া করিতে গিয়াছিলেন। কিন্তু মহারথী কর্ণের সহিত যুদ্ধ করিতে গিয়া নকুলের যে দশা হইয়াছিল, তাহারও তাহাই হইল। রণে ভঙ্গ দিয়া অবিলম্বে তাহাকে পলায়ন করিতে হইল । গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা গলায় বড় বড় নেকড়ার পুঁটুলি পরিধান করিল। কিছুদিন গ্রামের লোকের গলদেশ অপূৰ্ব্ব শোভা ধারণ করিল।

গ্রামে নানারূপ তুক হইতে লাগিল। ভুকের ভারসীম অধিকতর ভয়ঙ্কর হইয়া উঠিল। গ্রামের লোক ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িল। একদিন প্ৰান্তর্ভুকালে সকলে দেখিল যে, অনেকের দ্বারে তিনটি করিয়া গোবরের পুত্তলিকা পড়িয়া লির কপালে সিন্দুর ছিল, যেন বলিদানের নিমিত্ত উৎসর্গ করা হইয় র পর তাহদের গলদেশ কীৰ্ত্তিত হইয়াছিল। গলা-কাটা পুত্তলি দেখিয়া গ্রামের র প্রাণ উড়িয়া গেল। সকলে ভাবিল যে, তাহাদের প্ৰাণ-পুত্তলির গলদেশ এইরূপে কৰ্ত্তিত হইবে এবং তাহাদের পরমায়ু লইয়া রায়-গৃহিণীকে প্ৰদান করা হইবে । অমাবস্যা আসিল। দৈবক্রমে সেইদিন শনিবার পড়িল। অতি সাংঘাতিক দিন। গ্রামে গ্রামে সেদিন হুলস্থূল পড়িয়া গেল। জনরব উঠিল যে, সেইদিন বড় বাড়ীর লোকেরা নিশাজাগরণ করিবে, অর্থাৎ সন্ধ্যার পর কালীর প্রতিমা সদ্য গড়িয়া তাঁহার পূজা হইবে। তাহার পর শিবাবলি প্রদত্ত হইবে। ছাগমাংস, কলামাংস, মহামাংস ভক্ষণ করিয়া, শৃগাল-শৃগালীগণ সম্মুখের দুই পা তুলিয়া আনন্দে নৃত্য করিতে থাকিবে। অবশেষে একটি ডাব-নারিকেল ছুলিয়া তাহার মুখ টাকার ন্যায় চক্রাকার করিয়া কাটিতে হইবে। টাকার ন্যায় খোলার কিয়দংশ এরূপভাবে নারিকেলের সহিত সংলগ্ন হইয়া থাকিবে, যেন বাক্সর ডালার মত তাহাকে খুলিতে ও বন্ধ করিতে পারা যায়। রাত্রি দুই প্ৰহরের সময় রায়-গৃহিণীর যাদুকর সেই নারিককেলটি লইয়া গ্রামবাসীদিগের দ্বারে আসিয়া তিনবার ডাক দিবে,-“শশধর! শশধর! শশধর!” শশধর যদি উত্তর প্রদান করে, তাহা হইলে, তাহার প্রাণ তৎক্ষণাৎ নারিকেলের ভিতর প্রবেশ করিবে: ও গুণী ব্যক্তি তৎক্ষণাৎ নারিকেলের মুখ বন্ধ করিয়া দিবে। সেই নারিকেলের জল রায়-গৃহিণী পান করিলে তিনি রোগ হইতে মুক্ত হইবেন । কিন্তু যে লোক উত্তর দিবে, তাহার প্রাণ বিনষ্ট হইবে । তিন ডাকে শশধর। যদি উত্তর প্রদান না করে, তাহা হইলে গুণী ব্যক্তি হলধরের দ্বারে

      • firls six g3 8.8l www.amarboicom a AA গিয়া ডাক দিবে। হলধর যদি উত্তর না প্ৰদান করে, তাহা হইলে গদাধরের বাড়ী যাইবে । গুণী ব্যক্তি এইরূপে সমস্ত রাত্রি লোকের দ্বারে দ্বারে ঘুরিবে। আতঙ্কে গ্রামবাসীদিগের মন কম্পিত হইল। কি উপায়ে এই বিষম বিপদ হইতে প্রাণরক্ষা করি, তাহা ভাবিয়া সমস্ত লোক ছেলেপুলে লইয়া প্ৰদীপ জ্বালাইয়া বসিয়া কাটাইল। গ্রামের লোক সতর্ক হইয়াছে, কেহই উত্তর দিবে না, এইরূপ ভাবিয়া বোধ হয় বড় বাড়ীর লোক নিশাজাগরণ করিতে আগমন করিল না। অতিকষ্টে গ্রামবাসীদিগের প্রাণরক্ষা হইল।

রায়-গৃহিণীর কিন্তু কোন উপকার হইল না। কাশি, উদরাময় ও শোথ ব্যতীত তাঁহার শরীরের নানাস্থানে ক্ষত হইল। বড়ালমহাশয় ভাবিলেন যে, বিছানায় ক্রমাগত শয়ন করিয়া এইরূপ ক্ষত হইয়াছে। কিন্তু সে ক্ষত শুষ্ক হইল না। বড়াল মহাশয় হতাশ হইয়া পড়িলেন। অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া অবশেষে তিনি কলিকাতা গমন করিলেন। সে স্থান হইতে ভাল একজন চিকিৎসক আনিলেন। ইনি পাশকরা ডাক্তার নহেন, ইহার বয়স অধিক হয় নাই। কিন্তু বড়ালমহাশয় সকলকে বলিলেন যে, চিকিৎসা সম্বন্ধে ইহার অসাধারণ ক্ষমতা। বাস্তবিক যেদিন হইতে ইনি চিকিৎসা আরম্ভ করিলেন, সেদিন হইতে রোগিণী অনেকটা সুস্থ বোধ করিতে লাগিলেন। বড়ালমহাশয়, বড়ালমহাশয়ের স্ত্রী, ধনুকধারী ও নূতন চিকিৎসক, এই কয় ব্যক্তি ব্যতীত অন্য লোককে রোগিণী তাঁহার কাছে আসিতে দিতেন না। তিনি বলিতেন৷ “আমি দুৰ্ব্বল হইয়াছি, কথা কহিতে আমার কষ্ট বােধ হয়। পাঁচজনে আসিলেই দুই একটা কথা কহিতে হয়, তাহাতে আমার অসুখ বৃদ্ধি হয়। আমােৱ পীড়া হইয়াছে, ঘরে রথ-দোল হয় নাই যে, পুঞ্জ পুঞ্জ লোক দেখিতে আসিবে।” উপরি-উক্ত কয়জন রোগিণী সেবা করিতেন ৫ািতর্নি কেমন আছেন, সে সংবাদ বাহিরের লোক তাহদের নিকট হইতেই পাইত। দিনের পর দিন ধীরে ধীরে লাগিল। ১৫ই শ্রাবণ আসিল ও গেল, ১৬ই শ্রাবণ গেল আর গোটা কয়েক দিন হইলেই সকলের মনোবাঞ্ছা সিদ্ধ হয়। ১৮ই শ্রাবণ হইতে চিকিৎসক এক প্রকার নূতন ধরনের চিকিৎসা আরম্ভ করিলেন। সেই চিকিৎসায় প্রতিদিন দুই মণ বরফের আবশ্যক। প্রতিদিন কলিকাতা হইতে দুই মণ বরফ আসিতে লাগিল। এই সময় বড়াল মহাশয় বিজয়বাবুকে পত্র লিখিলেন, “আপনার জ্যেষ্ঠভ্রাতা রাইচরণ রায় মহাশয় কিরূপ উইল করিয়া গিয়াছেন, তাহা আপনি অবগত আছেন। আগামী ২০শে শ্রাবণ আপনার ভ্রাতৃজায়ার বয়ঃক্রম পঞ্চাশ বৎসর পূর্ণ হইবে। তাহার পরদিন অর্থাৎ ২১শে শ্রাবণ তিনি উইল করিবেন। পাছে পরে কোন আপত্তি হয়, সেজন্য রায় মহাশয় পূৰ্ব্ব হইতে আপনাকে সংবাদ দিতে বলিয়া গিয়াছেন। আপনি নিজে অথবা আপনার নিয়োজিত কোন লোক সেই সময় উপস্থিত থাকেন, আপনার ভ্রাতা সেইরূপ ইচ্ছা প্ৰকাশ করিয়াছিলেন। সেজন্য আপনাকে সংবাদ দিলাম।” ২০শে শ্রাবণ আসিল। রায়-গৃহিণীর বয়স পঞ্চাশ বৎসর হইল। আনন্দের আর সীমা রহিল। না। বড়ালমহাশয় ধুমধাম করিয়া গ্ৰাম্যদেবতার পূজা দিলেন। গ্রামের ব্ৰাহ্মণ ও অন্যান্য লোকদিগকে সমারোহের সহিত ভোজন করাইলেন। “এ আনন্দের দিন দিদিমণি তুমি আমাকে লইয়া গেলে না,” এই বলিয়া সুবালা খেদ করিয়া রায়-গৃহিণীকে পত্র লিখিলেন। কলিকাতা হইতে বিজয়বাবু নিজে আসিলেন না, আপনার উকীলকে পাঠাইয়া দিলেন। বড়ালমহাশয়কে তিনি লিখিলেন, “ঐ সম্পত্তিতে আমার প্রয়োজন নাই। বড় বধু-ঠাকুরাণী ዪኃግbr দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.comশ্মির্ত্যািক্যনাথ রচনাসংগ্ৰহ যাহাকে ইচ্ছা, তাহাকে প্ৰদান করুন। আমি কিছুমাত্র গোল করিব না। কেবল কৌতুহলের বশবৰ্ত্তী হইয়া আমি আমার উকীলকে প্রেরণ করিলাম।” বিজয়বাবু যে নিজে আসিবেন না, বড়ালমহাশয় তাহা বুঝিয়াছিলেন। তিনি আসিবেন জানিলে, বড়ালমহাশয় বোধ হয় তাহাকে আহবান করিতেন না। যাহা হউক, ২১শে শ্রাবণ রায়-গৃহিণী উইল করিলেন। বড়ালমহাশয়, ধনুকধারী, নূতন চিকিৎসক, রায়মহাশয়েরর উকীল ও বিজয়বাবুর উকীল, এই কয়জন সে স্থানে উপস্থিত ছিলেন। ধনুকধারী ব্যতীত আর সকলে উইলে সাক্ষী হইলেন। নূতন চিকিৎসার গুণে রোগিণী কয়দিনে বিশেষরূপ ফললাভ করিয়াছিলেন। ক্ষয়কাস ও উদরাময় রোগে এতদিন যে তিনি ভূগিতেছিলেন, মুখশ্ৰী দেখিয়া তাহা বোধ হইল না। তবে অনেক দিন রোগে ভূগিলে যাহা হয়,-তিনি খিটখিটে ও রাগী হইয়াছিলেন। উইল করিবার সময় চিকিৎসকের আজ্ঞায় ধনুক ধায়ী তাঁহাকে ঔষধ দিতে গেল। ঔষধে কি একটু পড়িয়াছিল। তাহা দেখিয়া ক্ৰোধে তিনি কাচের গেলাস ছুড়িয়া ফেলিয়া দিলেন। গেলাসটি মেজেতে ঝনাৎ শব্দে পড়িয়া শতখণ্ডে ভাঙ্গিয়া গেল! কাৰ্য সমাপ্ত হইলে উকীল দুইজন একবাক্যে বলিলেন, “আপনাকে যে এরূপ সুস্থ অবস্থায় দেখিব, সে প্রত্যাশা আমরা করি নাই। আপনি যে কঠিন রোগে কষ্ট পাইতেছেন, আপনার মুখশ্ৰী দেখিয়া তাহা বোধ হয় না। ভরসা করি, শীঘ্রই আপনি সম্পূর্ণভাবে আরোগ্যলাভ করিবেন।” এই বলিয়া সকলে প্রস্থান করিলেন। রায়-গৃহিণী যে উইল করিলেন, তাহার মৰ্ম্ম এইরূপ,- প্রথম। স্থাবর-অস্থাবর সমুদয় সম্পত্তির সুবালা অধিকারিণী হইবেন। দ্বিতীয়। অনেকদিন বিশ্বাসের সহিত কাজটুকুৰ্ম্ম করিয়াছেন, সেজন্য পুরস্কারস্বরূপ বড়ালমহাশয় এক হাজার টাকা পাইবেন। ৫৫%, তৃতীয়। যতদিন বড়ালমহাশয় , ততদিন তিনি পঞ্চাশ টাকা হিসাবে মাসিক বেতন পাইবেন । চতুর্থ। তাঁহার মৃত্যু হইলে তাঁহার স্ত্রী ভরণপোষণের নিমিত্ত ত্রিশ টাকা হিসাবে মাসিক বৃত্তি পাহিবেন । পঞ্চম। তাঁহার মৃত্যু হইলে তাঁহার কৰ্ম্মে ধনুকধারী নিযুক্ত হইবে। আপাততঃ সহকারী কৰ্ম্মচারিস্বরূপ ধনুকধারী কুড়ি টাকা বেতন পাইবে । নূতন চিকিৎসার গুণে রায়-গৃহিণী আরোগ্য লাভ করিবেন, সকলে এইরূপ আশা করিয়াছিল। কিন্তু সে আশা সফল হইল না। উইল করিবার দুইদিন পরে অর্থাৎ ২৩শে শ্রাবণ সহসা তাঁহার মৃত্যু হইল। সকলে বলিল যে, “সুবালার কি সৌভাগ্য। কেবলমাত্র দুইদিন পূৰ্ব্বে যদি রায়গৃহিণীর মৃত্যু হইত, তাহা হইলে সুবালা এ সম্পত্তি পাইতেন না। সুবালাকে বিষয় দিবার নিমিত্তই যেন তিনি জীবিত ছিলেন ।” এই দুর্ঘটনার চারিদিন পরে বড়ালমহাশয় সুবালাকে আনাইলেন। সুবালার কাকা ও বিধবা পিসী সঙ্গে আসিলেন। কাকা কলিকাতায় কৰ্ম্ম করেন। তিনি নিয়ত সুবালার কাছে থাকিতে পারিলেন না। সুবালার খুড়ীমাতা ছোট ছোট পুত্ৰ-কন্যা লইয়া ব্যস্ত। তিনি আসিতে পারিলেন না। সুবালাকে রক্ষণাবেক্ষণ করিবার নিমিত্ত পিসীমা তাঁহার সহিত বাস করিতে লাগিলেন। বড়ালমহাশয় সমুদয় কাজকৰ্ম্ম করিতেন। কাকা মহাশয় মাঝে মাঝে আসিয়া তত্ত্বাবধারন করিতেন।

                • দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ দিদিমণির জন্য সুবালা অনেক কঁদিলেন। দিদিমণির মৃত্যুকালে তাঁহাকে আনয়ন করা হয় নাই, সেজন্য বড়ালমহাশয়কে তিনি অনেক ভৎসনা করিলেন। “দিদিমণির শেষ অবস্থায় তোমরা আমাকে তাহার সেবা করিতে দিলে না,”৷ এই কথা বলিয়া সুবালা খেদ করিতে লাগিলেন ।

রায়-গৃহিণীর শ্ৰাদ্ধাদি ক্রিয়া মহাসমারোহের সহিত সম্পন্ন হইল। বিজয়বাবুকে সং দেওয়া হইয়াছিল; কিন্তু তিনি আসিলেন না অথবা নিমন্ত্রণ রক্ষা করিবার নিমিত্ত কাহাকেও প্রেরণ করিলেন না। জ্যেষ্ঠভ্রাতা রায়মহাশয়ের মৃত্যু হইলে কলিকাতায় তিনি স্বতন্ত্রভাবে শ্ৰাদ্ধ করিয়াছিলেন। বড় বধু-ঠাকুরাণীরও তিনি স্বতন্ত্রভাবে শ্ৰদ্ধা করিলেন। তাহার পর ধীরে ধীরে দিন কাটিতে লাগিল। সুবালা সমুদয় সম্পত্তির অধিকারিণী হইলেন। বিধবা পিসীমায়ের সহিত তিনি বাস করিতে লাগিলেন। কাকা মহাশয় মাঝে মাঝে আসিয়া তাহাদিগকে দেখিতেন শুনিতেন। রায় মহাশয় ও রায় গৃহিণীর পরলোকে গ্রামের লোকের আনন্দ হইল। তাহারা ভাবিল যে, ভূতে অথবা মানুষে আর আমাদিগকে উৎপীড়িত করিবে না। সুবালা লক্ষ্মীস্বরূপা দেবী। তিনি আমাদের সকল দুঃখ দূর করবেন। রায়বাড়ীর লোকদিপের সহিত গ্রামবাসীদিগের এখন বিলক্ষণ সদ্ভাব হইল। কিন্তু ধনুকধারীর উপর এখনও তাঁহাদের সম্পূর্ণ রাগ রহিল। ള് ○ ፬በዟ পূৰ্ব্ব হইতেই সুবালার গুণে গ্রামের লোক মুগ্ধ হইয়াছিল। শৈশবকাল হইতে তিনি এই গ্রামে প্রতিপালিত হইয়াছিলেন। সকলে তাঁহাকে জানিত, তিনিও সকলকে জানিতেন। ব্ৰাহ্মণ, শূদ্ৰ, হিন্দু, মুসলমান, সকল শ্রেণীর লোকের সহিত তাঁহার একটা না একটা সুবাদ-সম্পর্ক ছিল। কাহাকেও দাদা, কাহাকেও দিদি, কাহাকেও মাসী বলিয়া তিনি ডাকিতেন। গ্রামের লোকও তাঁহাকে সেইরূপ সম্পর্ক ধরিয়া ডাকিত। যথাসাধ্য তিনি লোকের দুঃখ দূর করিতেন। যাহার দুঃখ দূর করিতে পারিতেন না, সুমিষ্ট কথায় তাহাকে প্ৰবোধ দিতেন। তাঁহার দয়ামায়া সম্বন্ধে শত শত গল্প এই গ্রামে প্রচলিত আছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ দুইটি ঘটনার বিষয় এ স্থানে কেবল উল্লিখিত হইল। এ সমুদয় ঘটনা রায়-গৃহিণী জীবিত থাকিতেই ঘটিয়াছিল। সকলে তাঁহার আত্মীয়, সকলে তাঁহাকে স্নেহ করে, সেজন্য সুবালা একেলা নিৰ্ভয়ে এ-বাড়ী সে-বাড়ী করিয়া বেড়াইতেন। একদিন অপরাহে তিনি গ্রামে গিয়াছিলেন। পথের পার্শ্বে সুগ্ৰীব চঙ্গের ঘর ছিল। সুগ্ৰীব গরিব মানুষ, মজুরী করিয়া সে দিনপাত করে। তাহার কেবল একখানি চালাঘর। সুবালা দেখিলেন যে, সেই ঘরের দাওয়া অর্থাৎ পিড়ার একপার্শ্বে সুগ্ৰীবের স্ত্রী মায়া, ভাত রাধিতেছে। কিছুদূরে তাহার তিন কি চারি বৎসরের বালক ধামি হাতে করিয়া উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিতেছে। সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন,- “মায়া! তোমার ছেলে কাঁদিতেছে কেন?” মায়া কোন উত্তর করিল না। সুবালা নিকটে আসিয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “ভুলু কাঁদিতেছে কেন, Vrd দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.comশ্মির্ত্যািক্যনাথ রচনাসংগ্ৰহ মায়া?” তবুও মায়া কোন উত্তর করিল না। সে ঘাড় হেঁট করিয়া রহিল। তাহার চক্ষু দিয়া জল পড়িতে লাগিল। মাঝে মাঝে আচল দিয়া সে চক্ষু মুছিতে লাগিল। সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোন মায়া! কি হইয়াছে? তুমি কাঁদিতেছ। কেন?” মায়া। তবুও কোন উত্তর করিল না, কেবল কাঁদিতে লাগিল। মায়ার নিকট কোন উত্তর না পাইয়া সুবালা অবশেষে বালককে জিজ্ঞাসা করিলেন, — “ভুলু! তুমি কাঁদিতেছিলে কেন? তোমার মা কাঁদিতেছে কেন?” ভুল বলিল- “মা আমাকে মারিয়াছে।” তাহার মা কেন কাঁদিতেছে, ভুলু তাহা জানে না, সে প্রশ্নের ভুলু কোন উত্তর দিল না। পীড়িত ও শয্যাশায়ী হইয়া সুগ্ৰীব ঘরের ভিতর পড়িয়ছিল। সুবালা তাহা জানিতেন না। তিনি মনে করিয়াছিলেন যে, সে কাজ করিতে গিয়াছিল। বসিয়া বসিয়া অতি কষ্টে সে দ্বারের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল। সে বলিল,— “কাল ইহাদের কিছু হয় নাই, আজ এ পৰ্যন্ত কিছু হয় নাই। সেইজন্য ভুলু কাঁদিতেছে। যাও, দিদি, তুমি বাড়ী যাও, তোমার এ সব কথা শুনিয়া কাজ নাই।” সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন,- “কিছু হয় নাই, তাহার মানে কি? তুমি আমাকে সব কথা বল, না বলিলে আমি বাড়ী যাইব না।” সুগ্ৰীব উত্তর করিল, “আমি মজুরী করিয়া দিনপাত করি। রোজ আনি, রোজ খাই। আজ একমাস আমি বিছানায় পড়িয়া আছি। ঘরে ঘটি-বাটি যাহা কিছু ছিল, তাহা বেচিয়া এতদিন কোনরূপ চলিতেছিল। কিন্তু কাল আর কিছু ছিল না, সেজন্য কাল আমাদের রান্না হয় নাই।” সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন,- “তবে কাল তোমরা কি খাইয়াছিলে?” সুগ্ৰীব উত্তর করিল,— “আমি পীড়িত। আমার রর বড় প্রয়োজন নাই। মায়া কাল কিছু খায় নাই। দুইটি কলমী শাক তুলিয়া ভুলুকে করিয়া দিয়াছিল।” মায়া এখন কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল,— “ রা। সকল সহ্য করিতে পারি; কিন্তু ভুলু কাল যখন “আমাকে ভাত দাও, আমাকে * বলিয়া ক্ষুধায় চীৎকার করিতে লাগিল, তখন আমার বুক ফাটিয়া যাইতে লাগি আমি ভাবিলাম যে, এ যন্ত্রণা আর সহ্য হয়। না। ছেলেটিকে বুকে লইয়া জলে १ निदे।" সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন, — পর আজ কি হইল?” সুগ্ৰীব উত্তর করিল,— “বেচিয়া দুই পয়সা হয়, ঘরে এমন আর কোন দ্রব্য ছিল না। পিতল-কঁাসার সামান্য যাহা কিছু ছিল, তাহা সব ফুরাইয়া গিয়াছিল। আজ দুই প্ৰহরের সময় ছেলে যখন ক্ষুধায় বড় চীৎকার করিতে লাগিল, তখন আমার হঠাৎ মনে পড়িল যে, ঘরের দ্বারে এখনও কপাট- জোড়াটি আছে। কপাট-জোড়াটি করিতে আমার দুই টাকা খরচ হইয়াছিল, কিন্তু দুর্লভ বড়াই তাহার জন্য কেবল আমাকে চারি আনা পয়সা দিল। মায়া গিয়া চৌদ্দ পয়সার চাউল, এক পয়সার লবণ ও এক পয়সার মুড়ি কিনিয়া আনিল। আমাকে ও ভুলুকে সে মুড়ি কয়টি ভাগ করিয়া দিল! ভুলু মুড়ি কয়টি খাইয়া আরও চাহিল। আমার ভাগ তখন আমি খাইয়া ফেলিয়ছিলাম, সেজন্য তাহাকে দিতে পারিলাম না। ভুলু কাঁদিতে লাগিল। মায়া তাহাকে দুইটি ভিজা চাউল দিল। কাল সমস্ত দিন, তাহার পর আজ এতক্ষণ পৰ্যন্ত উপবাস করিয়া আছে। সে বালক! সে কি জানে! ভিজা চাউল কয়টি খাইয়া, সে আরও চাহিল। না পাইয়া কাঁদিতে লাগিল। সেজন্য মনের দুঃখে মায়া তাহাকে একটি চাপড় মারিয়াছিল । সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন, — “এ চারি আনা পয়সায় তোমাদের কয়দিন চলিবে?” সুগ্ৰীব উত্তর করিল,- “আজ আর কাল অতি কষ্টে চলিবে । চোঁদ পয়সার চাউল আমরা ጭ]ርጭig ጭi8ጭij¥j sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro try কিনিয়াছি। কেবল লবণ দিয়া ইহারা ভাত খাইবে।” সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন, — “তাহার পর কি হইবে?” সুগ্ৰীব উত্তর করিল,- “ভগবান যাহা করিবেন, তাহাই হইবে।” সুবালা আর কোন কথা বলিলেন না। নিজের হাতের একগাছি বালা খুলিয়া সুগ্ৰীবকে দিলেন। কিন্তু সে কিছুতেই লইতে চাহিল না। সে বলিল,— “তুমি ছেলেমানুষ। বাপ রে! তোমার বালা কি আমরা লইতে পারি। তাহা কখনই হইবে না।” সুবালা তাহার কথা শুনিলেন। না। বালা ফেলিয়া তিনি চলিয়া গেলেন । কিন্তু বাড়ী গিয়া সুবালার বড় ভয় হইল। রায়-গৃহিণী তাঁহাকে ভৎসনা করিবেন, সেই ভয়ে তাহার সহিত তিনি সাক্ষাৎ করিলেন না। সন্ধ্যার পর রায়-গৃহিণী তাঁহাকে ডাকিতে পাঠাইলেন। কঁাপিতে কঁাপিতে সুবালা তাঁহার নিকট গিয়া উপস্থিত হইলেন। কিছু না বলিয়া তিনি রায়-গৃহিণীর গলা জড়াইয়া ধরিলেন। অনেক আদর করিয়া সুবালা বলিলেন, — “দিদিমণি! আজি আমি এক কাজ করিয়াছি। তাহার জন্য তুমি বোধ হয় আমাকে অতিশয় বকিবে। কিন্তু আমাকে ক্ষমা করিতে হইবে। বল যে, তোমাকে ক্ষমা করিলাম। তবে তোমার আমি গলা ছাড়িয়া দিব। তাহা না বলিলে তোমার গলা আমি ছাড়িয়া দিব না।” রায়-গৃহিণী ভাল মানুষ ছিলেন না। কিন্তু পৃথিবীতে মানুষ যতই দােষী হউক না কেন, তাহার একদিকে না একদিকে একটু গুণ থাকে। রুয়-গৃহিণী সুবালাকে প্রাণ অপেক্ষা ভালবাসিতেন। হাসিতে হাসিতে তিনি উত্তর “তুমি যে মন্দ কাজ করিয়াছ, এ কথা কখনই আমার বিশ্বাস হয় না। যে জন্যমে একটিও কটু বাক্য বলে নাই, জনমে যে কাহারও মনে কষ্ট প্রদান করে নাই, তাহাকৃেত্যুবীর আমি ক্ষমা করিব কি? কি হইয়াছে দিদি। বল, নিশ্চয় আমি তোমাকে ক্ষমা করিলামন্ত বালা অঙ্গীকার সত্ত্বেও রায়-গৃহিণী গভীরভাবে চুপ করিয়া রহিলেন, কোন উত্তর করিলেন না। এমন সময় একজন দাসী আসিয়া রায়-গৃহিণীকে বলিল,— “সুবালা দিদি কোথায় বালা ফেলিয়া আসিয়াছিলেন। সুগ্ৰীবের স্ত্রী মায়া তাহা দিতে আসিয়াছে।” “তুমি তবে বালা ফিরিয়া লইবে!”— এই কথা বলিয়া সুবালা কাঁদিতে লাগিলেন। সুবালার চক্ষু জল দেখিয়া রায়-গৃহিণী আর থকিতে পারিলেন না। তিনি বলিলেন,— “না দিদি! আমি বালা ফিরিয়া লইব না। আর যদি লই, তাহা হইলে মূল্য দিয়া লইব । সুগ্ৰীব বালা লইয়া কি করিবে? আমি তাহার নিকট কিনিয়া লইব ।” এই কথা বলিয়া তিনি বড়ালমহাশয়কে ডাকিতে পাঠাইলেন। বড়ালমহাশয় আসিলে রায়গৃহিণী তাঁহাকে বলিলেন, — “সুগ্ৰীব চাঙ্গ পীড়িত হইয়াছে। তাহাদের বড় কষ্ট হইয়াছে। আপনার হাতের বালা খুলিয়া সুবালা তাহাকে দিয়াছিল। মায়া এখন সেই বালা ফিরিয়া দিতে আসিয়াছে। মূল্য দিয়া তাহার নিকট হইতে বালা আপনি ফিরিয়া লউন।” এই কথা বলিয়া রায়-গৃহিণী বড়ালমহাশয়কে চক্ষু টিপিয়া ইসারা করিলেন। তাহার অর্থ এই যে, যৎসামান্য কিছু দিয়া তাহাকে বিদায় করুন। বালার সম্পূর্ণ মূল্য তাঁহাকে দিবেন না। সুবালা তবুও রায়-গৃহিণীর গলা ছাড়িয়া দিলেন না। আরও অধিক স্নেহের সহিত তাঁহাকে আদর করিতে লাগিলেন। “আমার লক্ষ্মী দিদিমণি!” এই কথা বলিয়া তিনি তাঁহার বক্ষঃস্থলে gajgfjq griljzjz webrS uskla »ižo 3333| a www.amarboi.comio আপনার মস্তক রাখিলেন । রায়-গৃহিণী বলিলেন,- “আবার কি? যাহা বলিলাম, তাহা তো শুনিলে। এখন আমার গলা ছাড়িয়া দাও।” সুবালা উত্তর করিলেন, — “না দিদিমণি! আমার একটি নিবেদন আছে। সে কথাটিও তুমি বড়ালমহাশয়কে বলিয়া দাও, তবে তোমার গলা ছাড়িয়া দিব।” রায়-গৃহিণী বলিলেন, — “দেখ সুবালা! এই সমুদয় বিষয় তোমার। তুমি যাহা বলিবে, তাহাই হইবে। পৃথিবীতে আমার কোন সুখ নাই। তুমিই আমার একমাত্র সুখ। আর কি চাই, दब्न?" সুবালা উত্তর করিলেন,- “দেখ দিদিমণি! সুগ্ৰীবের শিশুপুত্রের কথা তোমাকে এইমাত্ৰ বলিলাম। দুইদিন সে উপবাসী ছিল। ক্ষুধায় সে চীৎকার করিতেছিল। সেই সময় আমি পথ দিয়া যাইতেছিলাম। তাঁহাদের দুঃখের কাহিনী শুনিয়া আমার বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল। আহা! যাহারা অতি শিশু, পৃথিবীর কথা তাহারা কি জানে? ক্ষুধা পাইলেই পিতামাতার নিকট শিশু ক্ৰন্দন করে। মনে করে, মা আমাকে আজ খাইতে দিতেছে না কেন? এইরূপ শিশু গ্রামে উপবাস করিয়া থাকিবে, আর আমি পাঁচ ব্যঞ্জন দিয়া ভাত খাইব, তাহা হইবে না। দিদিমণি! সে ভাত আমার পক্ষে বিষ তুল্য হইবে। যোড়হাতে তোমার নিকট আমি প্রার্থনা করি, দিদিমণি! বড়ালমহাশয়কে তুমি আজ্ঞা কর, আজ হইতে এই গ্রামে কেহ যেন উপবাসী না থাকে।” এই কথা বলিতে বলিতে সুবালা রায়-গৃহিণীর গলা ছাড়িয়া দিলেন। তাঁহার সম্মুখে তিনি লাগিল। জলে পূর্ণ হইয়া তাঁহার সেই মৃদু নয়ন দুইটি উজ্জ্বল হইল। আহা স্বর্গের শোভা যেন সেই চক্ষু দুইটিতে আবির্ভূত হইল। রায় মন যতই নিষ্ঠুর হউক না কেন, সে অলৌকিক ভাব দেখিয়া তাহার চিত্ত হইল। বড়ালমহাশয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া তিনি বলিলেল,— “বড়ালমহাশয়! যাহা বলিতেছে, তাহা আপনি করিবেন। আপনি দেখিবেন, যেন আজ হইতে এ গ্রামে কৈহ উপবাসী না থাকে।” কিন্তু নিজের স্বভাব। তিনি একেবারে পরিত্যাগ করিতে পারিলেন না। তিনি পুনরায় বড়ালমহাশয়ের প্রতি চক্ষু টিপিয়া ইসারা করিলেন। তাহার অর্থ এই যে, “সুবালাকে এখন ভুলাইবার নিমিত্ত আমি এইরূপ আজ্ঞা করিতেছি, কাজে আপনি কিছু করিবেন না।” কিন্তু সুবালা ছাড়িবার পাত্রী ছিলেন না। রায়-গৃহিণী যতই ইঙ্গিত করুন না কেন, তাঁহার সে ইঙ্গিত বিফল হইল। সুবালা আঁহার সে আজ্ঞা কাৰ্য্যে পরিণত করিলেন। বড়ালমহাশয় মন্দ লোক ছিলেন না। তিনি সুবালার পক্ষে হইলেন। বালার সম্পূর্ণ মূল্য সুগ্ৰীবকে প্ৰদান করা হইয়াছিল কি না, সুবালা তাহা জানেন না। কিন্তু সেইদিন হইতে তাহার দুঃখ দূর হইল। কিন্তু সেইদিন হইতে তাহারা উদর পূর্ণ করিয়া খাইতে পাইল। সুগ্ৰীবের চিকিৎসাও হইল। অল্পদিন পরে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করিয়া পুনরায় সে কাজকৰ্ম্ম করিতে সমর্থ হইল । গ্রামে পাছে কেহ উপবাসী থাকে, সে সম্বন্ধে সুবালা সৰ্ব্বদা খরতর দৃষ্টি রাখিতেন। গত কয় বৎসর যথাসময়ে ভালরূপে বৃষ্টি হয় নাই। সেজন্য ধানও ভালরূপ জন্মে নাই। তাহার পর নদীর বানে বালি পড়িয়া অনেকের ভূমি নষ্ট হইয়া গিয়াছিল। গ্রামের লোকের সেজন্য বড় কষ্ট হইয়াছিল। সুবালা যথাসাধ্য সকলের কষ্ট দূর করিতে লাগিলেন; অন্ততঃ অন্ন বিনা কাহাকেও ጭ]gጓg ጭቬ85ijw sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro re উপবাসী থাকিতে হইল না। গ্রামের লোক ক্ৰমে জানিতে পারিল যে, সুবালাকে একবার বলিলেই তাঁহাদের দুঃখ দূর হইবে, কেহ তাহাদিগের উপর অন্যায় অত্যাচার করিতে পরিবে: না। দুই হাত তুলিয়া সুবালাকে সকলে আশীৰ্ব্বাদ করিতে লাগিল। বড়ালমহাশয় এই কাৰ্য্যে সুবালার বিশেষরূপে সহায়তা করিতে লাগিলেন। তিনি সকল কথা রায়-গৃহিণীকে জানিতে দিতেন না। অধিক খরচ হইতেছে দেখিয়া রায়-গৃহিণী যদি বকিতেন, তাহা হইলে সুবালা আহার পরিত্যাগ করিয়া কঁদিতে বসিতেন। কাজেই রায়-গৃহিণীকে চুপ করিয়া থাকিতে হইত। সুবালা সম্বন্ধে আর একটি গল্প এই—নিফর ডোম নামক একজন গ্রামবাসী বাগানে কাঁচা তাল কাটিতে আসিয়াছিল। তালশাস ছাড়াইবে, সেজন্য তাহার স্ত্রী সঙ্গে আসিয়াছিল। দুই বৎসরের শিশু কন্যা তাহার সহিত ছিল । সুবালা সেই কন্যার হাতে দুইটি সন্দেশ দিয়াছিলেন। সন্দেশ সে কখনও খায় নাই। সেরূপ উপাদেয় মিষ্টদ্রব্য ভক্ষণ করিয়া তাহার। আনন্দের আর সীমা রহিল না। তাহার মা বলিল,— “ইনি তোমার মাসী, সুবালা মাসী । ইহার পায়ে গড় করা।” শিশু বলিল,— “খুবালা মাখী।” সুবালা বলিলেন, — “আহা! কেমন আধা-আধা স্বরে এ আমাকে থুবালা মাসী বলিল। তোমার কন্যার নাম কি?” তাহার মাতা বলিল,— “ইহার এখনও নাম হয় নাই, ইহাকে আমরা খুকী বলিয়া ডাকি।” কিছুদিন পরে সেই কন্যার জুরবিকার হইল। তাহার বঁচিবার আশা কিছুমাত্র ছিল না। একদিন রাত্ৰিতে বিকারের ঘোরে সে বায়না লইল যে,- “আমি খুবালা মাখীর কাছে। যাইব ।” তাহার পিতা-মাতা তাহাকে বিধিমতে ভুলাইতে চেষ্টা করিল। শিশু কিন্তু কিছুতেই গান্ত হইল না। সে ক্রমাগত কাঁদিতে লাগিল,— “আমি খুবালা মাখীর কাছে যাব।” পরদিষ্ট’প্ৰাতঃকালেও সেই কথা বলিয়া সে gাছিল। চাকর-চাকরাণীদের মধ্যে সেই বিষয় ফুল্লিতেঁছিল,- “নীচে লোকের একবার আম্পৰ্দ্ধা দেখ! সুবালার দিদি নািফর ডোমের দিয়াছিলেন। সে এখন পীড়িত হইয়াছে। সকলে বলিতেছে যে, সে বঁাচিবে সেই সন্দেশের লোভে কাল হইতে সে আবদার ধরিয়াছে যে, আমি সুবালা মাসীর যাব । নীচ লোকের একবার আম্পৰ্দ্ধা দেখা!” সুবলার কানে সেই কথা উঠিল। কাহাকেও কিছু না বলিয়া তিনি তৎক্ষণাৎ খানকয়েক বিস্কুট গোটাকতক ঘড়ার খেজুর, একটু মিশ্রি ও একটি কমললেবু লইয়া বাড়ী হইতে বাহির হইলেন। বরাবর নফর ডোমের বাড়ী গিয়া উপস্থিত হইলেন। সে স্থানে গিয়া দেখিলেন যে,একটি অতি কদাকার ময়লা বালিশ মাথায় দিয়া একখানি চেটাইয়ের উপর শিশু চক্ষু মুদ্রিত করিয়া পড়িয়া আছে। তাহার মাতা নিকটে বসিয়া কাঁদিতেছে, তাহার মুখ হইতে মাছি তাড়াইতেছে, আর পিপাসায় যখন সে হাঁ করিতেছে, তখন তাহার মুখে একটু জল দিতেছে। সুবালাকে দেখিয়া ডোেমনী চমকিত হইয়া দাঁড়াইল। সে বলিল,— “তুমি দিদি, আমাদের এই কুড়েঘরে!” সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন,- “তোমার কন্যা এখন কেমন আছে, তাহা বল।” ডোমিনী উত্তর করিল,— “কাল সমস্ত রাত্রি খুকী ছটুফটু করিয়াছে ও মাথা চালিয়াছে। সেই সঙ্গে সে বায়না লইল যে, আমি সুবালা মাসীর কাছে যাইব । তোমাকে একবার মাত্র সে দেখিয়াছিল, তথাপি তোমার কথা তাহার মনে ছিল। তোমার ঐ চাদমুখখানি, দিদি, একবার যে দেখিয়াছে, তোমার মধুর কথা যে একবার শুনিয়াছে, সে কি আর কখন তাহা ভুলিতে পারে? আহা! বাছা আমার কি জানে যে, তুমি কে আর আমরা কি! তোমাকে দেখিবার নিমিত্ত r8 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comৰ্ম্মিািক্যনাথ রাষ্ট’ সংখ্যাই সে ক্রমাগত কাঁদিতে লাগিল। কিছুতেই তাহাকে আমরা ভুলাইতে পারিলাম না। আজ প্ৰাতঃকালেও সেই কথা বলিয়া সে কাদিতেছিল । এখন চুপ করিয়াছে। বোধ হয়, আর বিলম্ব নাই!” ডোমনীর চক্ষু জলে ভাসিয়া গেল। সুবালা শিশুকে ডাকিতে লাগিলেন– “খুকী!! খুকী। খুকী!” সে চক্ষু চাহিল না, অথবা কোন উত্তর করিল না। পুনরায় সুবালা ডাকিতে লাগিলেন,- “খুকী!! খুকী! চাহিয়া দেখ, তোমার জন্য কেমন খাবার আনিয়াছি।” এই বলিয়া কমললেবুটি তাহার হাতে দিলেন। লেবুটি সে মুঠা করিয়া ধরিল । পুনরায় সুবালা তাহাকে ডাকিতে লাগিলেন। বার বার ডাকের পর সে চক্ষু উনীলিত করিল। কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে সুবালার মুখের দিকে সে চাহিয়া রহিল। অবশেষে সে ব্যস্ত হইয়া হাত-পা নাড়িতে লাগিল। উশাখুশ করিয়া,- “আমি উঠিয়া বসিব,”— যেন এইরূপ ইচ্ছা সে প্রকাশ করিল। তাহার মা তাহাকে তুলিয়া বসাইল। তাহার পর দুই হাত সুবালার দিকে শিশু প্রসারিত করিয়া দিল । তাহার মাতা বলিল,- “না, মা। তোমার সুবালা মাসী তোমাকে কোলে লইবেন না। তোমার জন্য তিনি কি সব আনিয়াছেন, দেখ। না, মা! তুমি তাঁহার কোলে যাইতে চাহিও भां ।” এই বলিয়া ডোমিনী বিস্কুট ও খেজুর তাহাকে । কিন্তু সেদিকে সে দৃকপাত করিল। না। সুবালার কোলে যাইবে, সেইজন্য হাত দুইটি প্রস্তারিত করিয়া একান্তমনে একদৃষ্টিতে সে সুবালার দিকে চাহিয়া রহিল। C “কি কর, দিদি! কি কর, দিদি!” ব্যস্ত, হইল। সুবালা তাহার নিষেধ শুনিলেন “ছি, ছি, আমরা ডোম। আমার তুমি কোলে লইলে । কি করিলে, দিদি! আমাদের কি ছুইতে আছে? ও মা! রায়- । এ কথা শুনিলে আমাকে কি বলিবেন? বড়ালমহাশয় আমাকে কি বলিবেন? গ্রামের লোক আমাকে কি বলিবে? আর নয় দিদি। খুকী এখন চুপ করিয়াছে। চেটাইয়ের উপর পুনরায় উহাকে শয়ন করাইয়া দাও। ও মা আমি কি করি!” খুকী বাস্তবিক চুপ করিয়াছিল। অতি সন্তোষের সহিত দুই হাতে সুবালার গলা জড়াইয়া ধরিল। লেবুটির সহিত একহাত তাহার মুষ্টিবদ্ধ হইয়া রহিল। তাহার পর সুবালার স্কন্ধে সে আপনার মস্তকটি রাখিল । মনের সুখে সে চক্ষু দুইটি মুদিত করিল। তাহার মুখশ্ৰী শান্তিভাবে পূর্ণ হইল। সেই মুহূৰ্ত্তে যেন তাহার সকল দুঃখ, সকল রোগ তিরোহিত হইল। “ও মা, আমি কি করি!” এই কথা বলিয়া ডোমনী আপনার কপালে করাঘাত করিতে লাগিল। সুবালা তাহাকে প্ৰবােধ দিয়া অতি মৃদম্বরে বলিলেন,- “চুপ, চুপ! খুকী নিদ্রা যাইবে । ঘুমাইলে তাহার জুর ছাড়িয়া যাইবে । চুপ, চুপ!” নিরুপায় হইয়া ডোিমনী চুপ করিল। ঘোরতর আশ্চৰ্য্যান্বিত ও ভীত হইয়া সতৃষ্ণ নয়নে সুবালার দিকে চাহিয়া, ঘরের দেয়াল ঠেস দিয়া সে দাঁড়াইয়া রহিল। শিশুকে আপনার বক্ষঃস্থলে ধারণ করিয়া সুবালা এদিকে-ওদিকে বেড়াইতে লাগিলেন। যথার্থই শিশু অঘোর নিদ্রায় অভিভূত হইয়া পড়িল। তাহার শরীরে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিল । জ্বর-মগ্ন হইবার উপক্রম হইল। ডোমিনী সুবালাকে নিষেধ করিতে উদ্যত

      • firls six g3 xel- www.amarboicom a V.br প্ৰায় এক ঘণ্টাকাল সুবালা তাহাকে লইয়া বেড়াইলেন। যখন নিতান্ত শ্ৰান্ত হইয়া পড়িলেন, তখন অতি ধীরে ধীরে তিনি তাহাকে তাহার মায়ের কোলে সমৰ্পণ করিলেন। “বৈকালবেলা পুনরায় আসিয়া দেখিব,”— এই কথা বলিয়া তিনি গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন। বাটী গিয়া বড়ালমহাশয়কে বলিয়া, কন্যাটির জন্য তিনি ভাল চিকিৎসক আনাইলেন। কিন্তু সুবালাকে দেখিয়া, সুবালার মধুর কথা শুনিয়া, সুবালাকে স্পর্শ করিয়া, সে রোগ হইতে মুক্ত হইয়াছিল। চিকিৎসা বড় আর আবশ্যক হইল না।

সেই অবধি গ্রামের লোকের মনে বিশ্বাস জনিল যে, সুবালা লক্ষ্মীস্বরূপা দেবী। তিনি একবার স্পর্শ করিলে রোগ দূরে পলায়ন করে। রোগ দ্বারা কেহ আক্রান্ত হইলে আগ্রহসহকারে তাহার বাড়ীর লোক সুবালাকে ডাকিয়া আনিত। অধিক বয়স্ক ব্ৰাহ্মণ অথবা ব্ৰাহ্মণী হইলে, “সুবালা তাহার মস্তক একবার স্পর্শ করুন,” এই বলিয় তাহার প্রার্থনা করিত। অপর জাতি হইলে সুবালার পদধূলি অতি ভক্তিভাবে মস্তকে গ্ৰহণুকেরির্ত। সুবালা সম্বন্ধে এইরূপ অনেক গল্প গ্রামে ধ্ৰুত আছে। এই সমুদয় ঘটনা রায়-গৃহিণী “আমাদের সুবালা দিদি এখন গ্রামের হইলেন। এ গ্রামে ভূত-প্ৰেত। আর আসিতে সাহস করিবে না, তুকতাক করিয়া কেহ প্ৰাণ বিনষ্ট করিতে চেষ্টা করিবে না । অনাহারে অথবা বিনা চিকিৎসায় আর আমাদের মরিতে হইবে না। আমাদের সকল দুঃখ এইবার দূর হইবে।” এইরূপ ভাবিয়া গ্রামের লোকের আনন্দের আর সীমা রহিল না। বিধাতাও গ্রামের লোকের প্রতি সুপ্ৰসন্ন হইলেন। কয় বৎসর যথাসময়ে সুবৃষ্টির অভাবে ভালরূপ ধান্য উৎপন্ন হয় নাই। এ বৎসর সুবৃষ্টি হইল। লোকের গোলায় ধান রাখিবার জন্য এ বৎসর স্থান হইবে না, এইরূপ সম্ভাবনা হইল। সে সমুদয় ভূমি বালি পড়িয়া নষ্ট হইয়া গিয়াছিল, এ বৎসর বন্যায় সেই বালি হয়। ধুইয়া গেল অথবা তাহার উপর গভীরভাবে পলি পড়িল। সে সমুদয় পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিকতর উৰ্ব্বারা হইল। সেজন্যও গ্রামের লোকের আহাদের আর সীমা রহিল না। যেরূপ মানুষের প্রতি, জীবজন্তুর প্রতিও সুবালার সেইরূপ দিয়ামায়া ছিল। পশুপক্ষিগণও তাহার গুণে মুগ্ধ হইয়াছিল। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro দ্বিতীয় ভাগ প্ৰথম অধ্যায়। ধনুকধারীর বাসনা ভাদ্র মাসের শেষ। নদীতে বান আসিয়াছে। গ্রাম যথারীতি জলপ্লাবিত হইয়াছে। একদিন বৈকালবেলা সুবালা একেলা বাগানে গিয়াছিলেন। তিনি যে ফুলগাছগুলি পুঁতিয়া ছিলেন, তাহাদের শুষ্কপত্র ও শাখা-প্ৰশাখা ভাঙ্গিয়া দিতেছিলেন। এমন সময়ে সেই স্থানে ধনুকধারী গিয়া উপস্থিত হইল। সুবালা এক্ষণে প্ৰভুনী, ধনুকধারী তাঁহার বেতনভোগী ভৃত্য। কিন্তু বালককালের কথা এখনও ধনুকধারী ভুলিতে পারে নাই। সুবালার সহিত “আপনি” বলিয়া কথা কহিতে কখনও তাহার অভ্যাস হয় নাই। তবে সুবালার নাম ধরিয়া ডাকিতে সে সাহস করিত না। আবশ্যক হইলে “ও গো,’ ‘হঁ। গো” বলিয়া কোনরূপ কাজ সারিত। নিকটে গিয়া ধনুকধারী কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল। ঘােড় হেঁট করিয়া পা দিয়া মাটি খুঁড়িতে লাগিল। কােন কথাবলিত সাহস করিল না। ১৫% সুবালা বলিলেন,- “কিরূপ একটা গন্ধ ধনুকধারী উত্তর করিল— “একটি সুবালা বলিলেন,- “কি বলিবে, ধনুকধারী বলিল,- “ Vx এক সঙ্গে অনেক খেলা করিয়াছি কত ফুল, কত ফল তোমাকে পাড়িয়া দিয়াছি। যখন চপলা ছিল, তখন কত আহলাদ-আমোদে আমরা কালক্ষেপণ করিয়াছি।” সুবালা বলিলেন,- “এই কথা তুমি বলিতে আসিয়াছ?” ধনুকধারী বলিল,- “যখন যাহা বলিয়াছ, তখন তাহা করিয়াছি। কুকুরের ন্যায় তোমার আজ্ঞা পালন করিয়াছি।” সুবালা বলিলেন,- “এ আর নূতন কথা কি? তুমি বড়ালমহাশয়ের আত্মীয়—সেজন্যও বটে, আর ছেলেবেলায় তুমি আমার সঙ্গী ছিলে— সেজন্যও বটে, দিদিমণি তোমার উপকার করিয়াছেন। কুড়ি টাকা বেতনে তোমাকে তিনি কৰ্ম্ম দিয়াছেন। পরে তোমার আরও ভাল হইবে, সে ব্যবস্থাও তিনি করিয়া গিয়াছেন।” ধনুকধারী বলিল,- “আমি চাকরী চাই না।” সুবালা বলিলেন,- “চাকরী চাও না! তবে কি চাও, তা বল। কাকা মহাশয় আসিলে তাঁহাকে বলিব। যদি অসঙ্গত না হয়, তাহা হইলে অবশ্য তিনি তোমার বাসনা পূর্ণ করবেন।” ধনুকধারী বলিল,— “পাছে তুমি রাগ কর, সেই ভয়ে সে কথা বলিতে আমার সাহস হইতেছে না ।” পুরাপের পুরিণাম। Wbre sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro ! ধনুকধারী! কি মনে করিয়া?” সুবালা উত্তর করিলেন,- “কি গন্ধা! ঠিক যেন ব্ৰাপ্তির গন্ধ। রাগের কথা তুমি কি বলিবো?” ধনুকধারী বলিল,— “আমি যাহা চাই, মনে করিলে তুমি তাহা দিতে পার। কাকা মহাশয়কে বলিয়া কি হইবে?” সুবালা বলিলেন, — “তুমি কি চাও, তাহা না জানিলে কি করিয়া উত্তর দিব?” কিছুক্ষণ ইতস্ততঃ করিয়া অবশেষে ধনুকধারী বলিল,— “ছেলেবেলা হইতে আমি তোমাকে বড় ভালবাসি। তোমার জন্য আমি প্ৰাণ বিসর্জন করিতে পারি। আমি তোমাকে চাই।” সুবালার মুখ রক্তবর্ণ হইল! স্তম্ভিত হইয়া কিছুক্ষণ ধনুকধারীর দিকে তিনি চাহিয়া ৱিহিলেন। তাহার পর তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,- “তুমি মদ খাইয়ােছ।” ক্ৰমে ধনুকধারীর সাহস বৃদ্ধি হইল। সে বলিল,— “তোমাকে এ কথা বলিতে আমার সাহস হইত না, সেজন্য একটু মদ খাইয়াছি!” সুবালা বলিলেন, — “ছেলেবেলার কথা স্মরণ করিয়া তোমাকে আমি ক্ষমা করিলাম। যাও, বাড়ী যাও। যতক্ষণ না তোমার জ্ঞান না হয়, ততক্ষণ শুইয়া নিদ্ৰা যাও।” একে মনের আবেগে উন্মত্তপ্রায় হইয়াছিল, তাহার উপর আবার সুরাপান করিয়াছিল। ধনুকধারীরও ক্ৰোধ হইল। সুবালার সহিত সমান উত্তর করিতে তাহার সাহসী হইল। ধনুকধারী বলিল,- “বাল্যকাল হইতে আমি তোমার সঙ্গে আছি। যখন যাহা বলিয়াছ, তখন তাহা করিয়াছি। একসঙ্গে কত খেলা, কত আমোদ-আহাদ করিয়াছি। আজ আমি কেহ হইলাম না, আর সেই কেঁকড়া-চুলো ছবি-অাঁকা বেটা সব হইল? ষে বড়মানুষের ছেলে, আমি গরীবের ছেলে। সেইজন্য তুমি আমাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করি ব্ৰাহ্মণ, আমি কায়স্থ, সেইজন্য তুমি আমাকে পদদলিত করিবে? আর সেদিনই – ? কলিকাতায় সভা হইয়াছিল, তাহাতে স্থির হইয়াছে যে, আমরা ক্ষত্রিয়। চারিদিকে)কায়স্থরা যজ্ঞোপবীত গ্ৰহণ করিতেছে। আর একমাস অশুচি নাই, এখন বারে দিন। ধ্ৰুজ্জার দাস নাই, এখন বৰ্মা। যেমন দেবযানী—“ এইরূপ বুলিতে বলিতে ধনুকধারীর্ভুক্ত? একটু সংজ্ঞা হইল। দেবযানীর গল্প বলিতে তাহার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সে বলিতে পারিল না, বলিতে বলিতে চুপ হইয়া গেল। তাহার পর ধীরে ধীরে সুমিষ্ট স্বরে সে বলিল,— “সুবালা! তোমাকে প্রাণ অপেক্ষা আমি ভালবাসি। যদি তুমি আমাকে বিবাহ না কর, তাহা হইলে এ প্ৰাণ আমি আর রাখিব না। এই দেখ আমি একখানি ছোরা প্ৰস্তুত করিয়াছি। তোমাকে আমি কিছু বলিব না, কিন্তু এই ছোরা আমি নিজের বুকে মারিয়া প্ৰাণ বিসৰ্জ্জন করিব।” এই কথা বলিয়া, জামার ভিতর হইতে একখানি ছোরা বাহির করিয়া সে সুবালাকে দেখাইল । সুবালা একটু ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, — “তোমার কথায় রাগ করিব, কি হাসিব, তাহা আমি বুঝিতে পারিনা। তুমি পাগল হইয়াছ। উপন্যাস-পুস্তক পাঠ করিয়া তােমার মস্তিষ্ক বিকৃত হইয়া গিয়াছে। যাও, বাড়ী যাও। তোমার মন্দ করিতে ইচ্ছা করি না। কিন্তু পুনরায় যদি ওরূপ কথা আমাকে বলিতে সাহস কর, তাহা হইলে আমি বড়ালমহাশয়কে বলিয়া দিব। তিনি তোমাকে বাড়ী হইতে দূর করিয়া দিবেন।” ধনুকধারী পুনরায় রাগিয়া উঠিল। পুনরায় সে ক্ৰোধ সম্বরণ করিতে পারিল না। সে বলিল— “বড়ালমহাশয় আমাকে বাড়ী হইতে দূর করিয়া দিবেন? হা, হা, হা! ভাল কথা বটে ! বড়ালমহাশয় আমাকে তাড়াইয়া দিবেন! হা, হা, হা!” Web'br দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comৰ্ম্মিািক্যনাথ রচনাসংগ্ৰহ ধনুকধারী এই কথা বলিতে লাগিল, আর হা-হা রবে কিন্তুতকিমাকার ভঙ্গী করিয়া বিদ্রুপের হাসি হাসিতে লাগিল। সুবালা আশ্চৰ্য্যান্বিত হইয়া তাহার মুখপানে চাহিয়া ৱিহিলেন। অল্পক্ষিণ পরে সুবালা বলিলেন, — “তুমি মদ খাইয়াছ, তুমি পাগল হইয়াছ, তোমার এখন জ্ঞান নাই। কিন্তু তোমার মুখের ভঙ্গী ও কথার ভাব দেখিয়া আমার সন্দেহ হইতেছে। যাহা হউক, তোমার সহিত আমি তর্ক-বিতর্ক করিতে ইচ্ছা করি না। বড়ালমহাশয় কি করিয়াছেন, তাহা আমি জানি না, আর শুনিতে চাই না। তিনি বৃদ্ধ, তোমার পিসেমহাশয়। তাঁহাকে বিদ্রুপ করিতে চাও কর । কিন্তু তুমি এখন যে কথা আমাকে বলিলে, সে কথা যদি পুনরায় আমাকে বল, তাহা হইলে আমি নিজেই তোমাকে বাড়ী হইতে দূর করিয়া দিব। বাড়ী আমার।” ধনুকধারী আরও ক্রুদ্ধ হইয়া বলিল,— “বাড়ী তোমার? হা, হা, হা, শুনিলে হাসি পায়। কাহার বাড়ী, বাছাধন? হা, হা, হা! জান, তোমার দৰ্প আমি চূর্ণ করিতে পারি? অধিক নয়, যদি একটা কথা আমি মুখ দিয়া বাহির করি, তাহা হইলে বাছাধন তোমার কি হয়?” বিস্মিতা হইয়া সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন,- “ও আবার কি কথা?” সুবালার মনে ঘোরতর সন্দেহ হইল। ধনুকধারীর ভাবভঙ্গী দেখিয়া তাহার মনে সন্দেহ হইল যে, “এ সকল নিতান্ত মাতালের কথা নহে। এই সমুদয় কথার কোন গুঢ় অর্থ আছে!” কিন্তু ধনুকধারী প্ৰকাশ করিয়া কিছু বলিল না। ধনুকধারীর এখন পুনরায় জ্ঞান হইল। রাগের মাথায় সে এইসব কথা বলিয়াছিল। ভয়ে তাহার মুখ শুক হইয়া গেল। তোমাকে ভয় দেখাইবার নিমিত্ত মিছামিছি। আমি ও কথা বলিয়াছি। তুমি আমাকে ক্ষমা কর! যোড় হাত কুরিয়াঁ তোমার নিকট আমি ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি। আমি ক্ষিপ্ত হইয়াছি, এখন । সুবালা! তুমি আমাকে ক্ষমা কর। দ্বিতীয় অধ্যায়। ডাকিলে কেন সুবালা স্তম্ভিত হইয়া সেই স্থানে দাঁড়াইয়া রহিলেন। ধনুকধারী যাহা বলিল, তাহা সুরাপানে উন্মত্তের কথা, অথবা তাহার মূলে কিছু সত্য আছে? তাহার কথার ভাবে বোধ হইল যে, সে মনে করিলে বড়ালমহাশয়কে জব্দ করিতে পারে, আমারও সে অনিষ্ট করিতে পারে। এ সব কথার অর্থ কি?—সুবালা এইরূপ ভাবিতে লাগিলেন। আবার ভাবিলেন।— “এ সম্পত্তি কি প্রকৃত আমার নহে? বাস্তবিক এ সম্পত্তির আমি কে? মায়ের মেসোর সম্পত্তির উপর আমার কি অধিকার আছে? আইন অনুসারে এ সম্পত্তি আমার নহে; তা যেন হইল। কিন্তু বড়ালমহাশয়কে সে কিরূপে জব্দ করিতে পারে? ইহার মানে কি?” ভাবিতে ভাবিতে সুবালা বাড়ী ফিরিয়া আসিলেন। ঘরে আসিয়া একখানি চৌকিতে তিনি বসিয়া পড়িলেন। সেই স্থানে বসিয়া ক্রমাগত তিনি চিন্তা করিতে লাগিলেন। তাহার পর "“”* *f°"" gfrRiig °iiğ3° g35 zx84 ~ www.amarboi.com ~ Very সমস্ত রাত্রি ধনুকধারীর ভাব-ভঙ্গী ও কথা চিন্তা করিতে লাগিলেন। সমস্ত রাত্রি তাঁহার নিদ্রা হইল না । প্ৰাতঃকালে উঠিয়াও সুবালা সেই চিন্তা করিতে লাগিলেন,- “কাহাকে জিজ্ঞাসা করি? বড়ালমহাশয়কে জিজ্ঞাসা করিতে পারি না। ধনুকধারী তাঁহার আত্মীয়। কাহার সহিত পরামর্শ করি? কাকা মহাশয়কেও বলিতে পারি না। এ কথা শুনিলেই তিনি হুলস্থল করিবেন, ধনুকধারীকে তৎক্ষণাৎ দূর করিয়া দিবেন। যদি সে সুরাপান পরিত্যাগ না করে, তাহা হইলে পরে তাহাকে তাড়াইতে হইবে। কিন্ত। আপাততঃ তাহার মন্দ করিতে আমি ইচ্ছা করি না । উন্মত্ত অবস্থায় সে হয় তো প্ৰলাপ করিয়াছে; আমাকে সে যাহা বলিয়াছে, তাহা পাগলের কথা ব্যতীত আর কিছুই নহে। যাহা হউক, এ সম্পত্তি যদি প্রকৃত আমার না হয়, অথবা ইহার ভিতর যদি কোনরূপ। জুয়াচুরি থাকে, তাহা হইলে, এ বিষয় আমি লইব না। যাহার বিষয়, তাহাকে ফিরাইয়া দিব। কিন্তু কাকামহাশয়কে এ কথা বলিতে পারি না। তিনি আমার কথায় কৰ্ণপাত করিবেন না। কাহাকে জিজ্ঞাসা করি? কাহার সহিত পরামর্শ করি?” অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া, লজ্জা-সরমে জলাঞ্জলি দিয়া, বিনয়কে তিনি পত্র লিখিলেন, — “বিশেষ একটা কথা আছে। একদিনের জন্য যদি তুমি এখানে আসিতে পাের, তাহা হইলে আমার বড় উপকার হয়।” বিনয়ের ঠিকানা তিনি জানিতেন না। তাঁহার পিতার নাম পৰ্যন্ত সুবালা জানিতেন না। বিনয়ের মাতুলালয়ে সেই চিঠি পাঠাইলেন। সৌভাগ্যক্রমে বিনয় সে চিঠি পাইলেন। দুইদিন :::::$ যথারীতি সুবালা তখন বাগানে গি কোন ফুলগাছটিতে ফুল ফুটিয়াছে, বড় ভালবাসিতেন। এদিক ওদিক গাছগুলি তিনি দেখিতেছিলেন। নিকটে দুইটি কাঠবিড়াল একবার এ গাছে পুনরায় তাহা হইতে নামিয়া দ্রুতবেগে অন্য গাছে উঠিতেছিল। চারি পাঁচটি নীলকণ্ঠ পক্ষী ফুলগাছের মূলে কীট-পতঙ্গের অনুসন্ধান করিতেছিল। ছাদের আলিসা হইতে একঝাক গোলা পায়রা নামিয়া সুবালার চারিদিকে বিচরণ করিতেছিল। বিনয় সেই স্থানে গমন করিলেন। সুবালা এখন অতি সলজ্জভাবে বিনয়ের সহিত কথোপকথন করিতেন। প্ৰথম, ফুলগাছ সম্বন্ধে তাঁহাদের নানারূপ কথাবাৰ্ত্ত হইল। তাহার পর বিনয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “সুবালা! আমাকে তুমি কি কথা বলিবে?” ধনুকধারী যাহা যাহা বলিয়াছিল, সুবালা আদ্যোপােন্ত তাহা বৰ্ণনা করিলেন। সুবালাকে সে বিবাহ করিতে চাহিয়াছিল, এই কথা শুনিয়া বিনয় হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। কিন্তু বড়ালমহাশয়ের নামে সে যেভাবে হাসিয়াছিল ও সুবালাকে সম্পত্তি সম্বন্ধে সে ইঙ্গিতে যাহা বলিয়াছিল, যখন তাহা তিনি শুনিলেন, তখন তিনি গম্ভীরভাবে নীরব হইয়া রহিলেন। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বিনয় বলিলেন,— “জুয়াচুরি আছে, তুমি সেই সন্দেহ করিতেছ?” সুবালা উত্তর করিলেন,- “হাঁ, আমি যতই ভাবিতেছি, ততই আমার বিশ্বাস হইতেছে যে, ইহার ভিতর কোনরূপ প্রতারণা আছে। সে প্রতারণা কি, তাহা আমি জানিতে ইচ্ছা করি।” এতক্ষণ দাঁড়াইয়া কথা হইতেছিল। নিকটে একটি শুষ্ক বৃক্ষ পড়িয়াছিল। সুবালা সেই bo afraig -iibg gis so! - www.amarboi.comf'37******* কাঠের একপার্শ্বে বসিয়া পড়িলেন, বিনয় তাহার অপর পার্শ্বে বসিলেন। বিনয় বলিলেন,- “সম্পত্তির তুমি অধিকারিণী হইয়াছ, রায় মহাশয় ও তাঁহার পত্নী যদি উইল করিয়া না। যাইতেন, তাহা হইলে রায়মহাশয়ের ভ্রাতা বিজয়বাবু ইহা পাইতেন। তিনি কোন আপত্তি করেন নাই, করিবেনও না। তবে প্রতারণা আছে কি না, সে অনুসন্ধান করিয়া ফল কি?” সুবালা উত্তর করিলেন,- “প্রতারণা করিয়া আমি কাহারও সম্পত্তি ভোগ করিতে চাই না।” বিনয় জিজ্ঞাসা করিলেন, — “যদি প্রতারণা থাকে, তাহা হইলে তুমি যাহার বিষয় তাহাকে সুবালা উত্তর করিলেন, — “নিশ্চয়! কিন্তু সে কথার এখন প্রয়োজন নাই। কোনরূপ গোলযোগ আছে কি না, যদি থাকে, তাহা হইলে কি, তাহাই আমি এখন জানিতে ইচ্ছা করি। যতদিন তাহা জানিতে না পারিব, ততদিন আমার প্রাণ সুস্থির হইবে না।” চুপ করিয়া বিনয় ভাবিতে লাগিলেন। এই সম্পত্তি রায়মহাশয় কিরূপে পাইয়াছিলেন, রায়মহাশয় কিরূপ উইল করিয়াছিলেন, তাহার পর সুবালা ইহা কিরূপে পাইলেন, সে সকল কথা বিনয় পূৰ্ব্বে শুনিয়াছিলেন। কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া বিনয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “তোমার দিদিমণির বয়ঃক্রম কবে পঞ্চাশ বৎসর পূর্ণ হইয়াছিল? কবে তিনি উইল করিলেন? কবে তাহার মৃত্যু হইল?” সুবালা উত্তর করিলেন, — ২০শে শ্রাবণ তাঁহার বয়ঃক্রম পঞ্চাশ বৎসর পূর্ণ হইয়াছিল; ২১শে শ্রাবণ তিনি উইল করিলেন; ২৩শে শ্রাবণ তাঁর্ভুক্ত श्ल।” বিনয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “কি রোগে ভুঞ্ছার মৃত্যু হইল? কে তাঁহার চিকিৎসক আনিয়াছিলেন। শুনিলাম যে, এক প্রকার উদ্ভট প্রণালীতে শেষ কয়দিন তিনি চিকিৎসা হইয়াছিল। পূৰ্ব্বে অনেক বড় বড় ডাক্তার ও বৈদ্য তাঁহার চিকিৎসা করিয়াছিলেন। শেষে বড়ালমহাশয় কলিকাতা হইতে একজন চিকিৎসক আনিয়াছিলেন। শুনিলাম যে, এক প্রকার উদ্ভট প্রণালীতে শেষ কয়দিন তিনি চিকিৎসা করিয়াছিলেন । কলিকাতা হইতে প্রতিদিন দুই মণ করিয়া বরফ। তিনি আনাইতেন।” বিনয় বলিলেন,- “আশ্চৰ্য্য কথা! কাস রোগে বরফ দিয়া চিকিৎসা। মৃত্যুকালে তাঁহার নিকটে কে ছিলেন?” সুবালা উত্তর করিলেন, — “বড়ালমহাশয়, তাহার স্ত্রী, ধনুকধারী ও চিকিৎসক, এই কয়জন তাহার নিকট ছিলেন।” বিনয় পুনরায় চিন্তা করিতে লাগিলেন। অবশেষে তিনি বলিলেন,- “যদি কোন কথা থাকে, তাহা হইলে বড়ািলনীর মুখ হইতে তাহা বাহির করিতে হইবে। দুইজন লোককে আমি পুলিসের কনেষ্টবল সাজাইয়া আনিব। বড়ালিনীকে তাহারা ভয় দেখাইবে। ভয়ে বড়ালনী বোধ হয়, সকল কথা বলিয়া ফেলিলেন। কিন্তু বড়ালমহাশয় কি ধনুকধারী উপস্থিত থাকিলে চলিবে না।” সুবালা বলিলেন, — “বড়ালমহাশয় প্ৰাতঃকালে উঠিয়া কাজে গমন করেন। দুই প্রহর পৰ্যন্ত তিনি বাড়ীতে থাকেন না। বড়ালমহাশয়কে বলিয়া পাঁচ ছয় দিনের নিমিত্ত ধনুকধারীকে আমি কোন স্থানে পঠাইয়া দিব। তবে কথা এই, কৃত্রিম কোন বিষয় করিতে আমি ইচ্ছা করি পাপের পরিণাম। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro SS না। সে এক প্রকার মিথ্যা কথা ব্যতীত আর কিছুই নাহে।” বিনয় বলিলেন, — “তবে অন্য কোনরূপ উপায় যদি স্থির করিতে পারি, তাহা আমি ভাবিয়া দেখিব। কিন্তু চারি পাঁচ দিনের নিমিত্ত ধনুকধারীকে তুমি অন্যত্র প্রেরণ করবে।” তাহার পর বিনয় পুনরায় বলিলেন,- “আমি অতিশয় ক্লান্ত হইয়া আছি। কল্য আমি কোন কাজ করিতে পারিব না। পরদিন যাহা হয় একটা করিব। জ্যেঠাইমায়ের ছবি ভাল স্থানে টাঙানো হইয়াছে?” সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন, — “জ্যেঠাই-মা আবার কে?” বিনয় হাসিয়া বলিলেন,— “আশ্চৰ্য্য! ধনুকধারীর কথা শুনিয়া আমি অন্যমনস্ক হইয়াছিলাম। তোমার দিদিমণির সে ছবি টাঙানো হইয়াছে?” সুবালা উত্তর করিলেন,- “উত্তর দিকে যে ঘরে তিনি বাস করিতেন, ছবি এখন সেই ঘরে আছে। কিন্তু আমি শুনিয়াছি যে, মৃত্যুর কয়েক দিন পূৰ্ব্বে দিদিমণি পূৰ্ব্ব দিকে চােরকুঠুরির নিকট ঘরে গিয়াছিলেন। সেই ঘরে তাঁহার মৃত্যু হইয়াছে। আমার ইচ্ছা যে, ছবি সেই ঘরে থাকে ৷” বিনয় বলিলেন, — “কল্য আমি সেই ঘরের প্রাচীরের গায়ে ছবি ঝুলাইয়া দিব!” বাহির-বাটীতে পূৰ্ব্বে যে ঘরে ছিলেন, বিনয় এবারও সেই ঘরে বাস করিতে লাগিলেন। ಆಳ್ತಞ್ಞ! পরদিন অপরাহুে বিনয়, সুবালা ও তাঁহার পি রায়-গৃহিণীর ছবি লইয়া পূৰ্ব্ব দিকের শয়নাগারে গমন করিলেন। কোন স্থানে ছবিটি ভাল দেখাইবে, সেই স্থান তাহারা মনোনীত করিতে লাগিলেন। সুবালার একটি কুকুর ছিল, ১৯ৗম বাঘা; শৈশবকালে সুবালা তাহার প্রাণরক্ষা করিয়াছিলেন। বড় হইয়া সেও র প্রাণরক্ষা করিয়াছিলেন । বাঘা ইহাদের সঙ্গে আসিয়াছিল। ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়া চোরকুঠুরির দ্বারের নিকট দাঁড়াইয়া প্রথম সে ফোঁস ফোঁস করিতে লাগিল। তাহার পর সে গৰ্জ্জন করিয়া উঠিল। বিনয় বলিলেন,- “চােরকুঠুরির ভিতর ইদুর অথবা বিড়ালের গন্ধ পাইয়াছে। সেই জন্য বােধ হয়। কুকুরটা এইরূপ করিতেছে।” পিসীমা বলিলেন,- “গেল যা! কুকুরটার একবার আম্পৰ্দ্ধা দেখ। ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়াছে। সুবালা! তোমার কুকুরকে এত আদর দিও না।” ঈষৎ হাসিয়া সুবালা বাঘাকে বাহিরে যাইতে আদেশ করিলেন। কিন্তু প্ৰথম সে যাইতে সম্মত হইল না। চােরকুঠুরির দ্বারের নিকট দাঁড়াইয়া সে গৰ্জ্জন করিতে লাগিল। পরে সুবালা যখন ধমক দিয়া তাহাকে বাহিরে যাইতে বলিলেন, তখন সে অতি ধীরে ধীরে ঘরের বাহিরে ছবির নিমিত্ত স্থান মনোনীত হইলে বিনয় বলিলেন,- “চাকরের নিকট হইতে পেরেক ও হাতুড়ি লইয়া আসি।” এই বলিয়া তিনি সে ঘর হইতে প্ৰস্থান করিলেন। পিসীমা ও সুবালা সেই ঘরে রহিলেন । সুবালা বলিলেন,- “পিসীমা! এই ঘরের পার্শ্বে যে ঘর, তাহাতে মা, দিদি ও আমি বাস করিতাম। তাহার পর এই ঘরে চপলা ও আমি থাকিতাম।” W»SR frig -ibs gas se - www.amarboicon:5'" পিসীমা বলিলেন,- “চপলার কথা আমি শুনিয়াছি। বড়ই আশ্চৰ্য্য কথা সে বালিকাটির কোন সন্ধান হইল না?” সুবালা উত্তর করিলেন,- “না পিসীমা! সকলে বলে যে, খাদা ভুত তাহাকে খাইয়া ফেলিয়াছে। কিন্তু সে কথা আমার বিশ্বাস হয় না। তবে কিরূপ কোথায় সে গেল, আজ পৰ্যন্ত তাহা আমি বুঝিতে পারি নাই।” পিসীমা বলিলেন,- “খাদা ভূতের কথা আমি শুনিয়াছি। এই বাড়ীর সে সৰ্ব্বনাশ করিয়াছে।” সুবালা উত্তর করিলেন, — “হাঁ পিসীমা! এই বাড়ীর সে সৰ্ব্বনাশ করিয়াছে। অন্ততঃ তাহার হাঁকের পর এই বাড়ীতে নানারূপ বিপদ ঘটিয়াছে। গভীর রাত্ৰিতে সে যে বিকট শব্দ করিত, তাহা তোমাকে কি বলিব! দাদামহাশয়ের জামাতা, তাহার কন্যা, আমার দিদি, আমার মা, চপলা, শেষে দাদামহাশয় নিজে,- খাদা ভূতের হাঁকের পর এতগুলি লোকের মৃত্যু হইয়াছে।” পিসীমা জিজ্ঞাসা করিলেন,- “সে খাদা-ভূত এখন কোথায় গেল?” সুবালা উত্তর করিলেন,- “দাদামহাশয়ের মৃত্যুর পর আর সে এ গ্রামে আসে নাই।” পিসীমা বলিলেন, — “তামাক-পোড়ার কীেটা লইয়া এই বলিয়া তিনি সে ঘর হইতে প্ৰস্থান করিলেন সে ঘর হইতে প্ৰস্থান করিলেন, নিকট দাঁড়াইয়া পুনরায় সে ফোস্ ফোস্ ও গ্লার্জন করিতে লাগিল। সুবালা বললেন,— “চুপ বাঘ!! চুপ! চুপ, আয় এ দিকে আয়।” :ে29 সুবালা একেলা ঘরে রহিলেন। ঘরে9ৰ্কখানি খাট ও বিছানা ছিল। সেই খাটের উপর তিনি বসিয়া বাঘাকে নিম্নে মেজেতে উ করিতে আদেশ করিলেন। সেই স্থানে বসিয়া চােরকুঠুরির দ্বারের দিকে একদৃষ্টিতে বাঘা চাহিয়া রহিল। সুবালা ভাবিতে লাগিলেন,- “দিদিমণি যদি এখন ভূত হইয়া দেখা দেন, তাহা হইলে ভয়ে আমি চীৎকার করি, কি সহজ মানুষের মত তাঁহার সহিত কথাবাৰ্ত্ত কহি? এই সময় যদি খাদা ভূত আসিয়া উপস্থিত হয়, তাহা হইলেই বা কি করি? খাদা ভুত।” শেষ দুইটি কথা— “খাদা ভূত!” সুবালা একটু পরিস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করিলেন। ঠিক যেন তাহার প্রত্যুত্তরে অন্ধকার ঘর হইতে খোনা স্বরে কে বলিল,— “কেঁন?” সেই শব্দ শুনিয়া বাঘা গৰ্জ্জন করিয়া উঠিল । যে ঘরে সুবালা বসিয়াছিলেন, তাহার ঠিক পার্শ্বে অন্ধকার ঘর। দুই ঘরের মধ্যস্থলে দ্বার ছিল। দ্বারটি এখন বন্ধ ছিল। সেই ঘর হইতে “কেন” এইরূপ শব্দ আসিল । ঘোরতর বিস্মিতা ও ভীত হইয়া সুবালা সেই দ্বারের দিকে চাহিয়া রহিলেন। তাঁহার কি ভ্রম হইয়াছে? না, সত্য খোন স্বরে কে বলিল “কেন?” অল্পক্ষণ পরে অন্ধকার ঘর হইতে পুনরায় কে বলিল,- “তুমি আমাকে ডাকিলে কেঁন?” বাঘা পুনরায় গৰ্জ্জন করিয়া উঠিল। সুবালা ভয়ে কঁাপিতে লাগিলেন। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro তৃতীয় অধ্যায় সুবালা ও পশুপক্ষী ভয়ে সুবালার মুখ শুষ্ক হইয়া গেল। ভয়ে তাহার পদদ্বয় কঁাপিতে লাগিল। খাট হইতে তিনি যে পলায়ন করিবেন, অথবা সে স্থানে বসিয়া তিনি যে চীৎকার করবেন, সে ক্ষমতা তাঁহার রহিল। না। তবে বাঘা নিকটে আছে, সেজন্য কিয়ৎপরিমাণে তাঁহার মন আশ্বাসিত হইল। পূৰ্ব্বেই বলিয়াছি যে, সুবালা বাঘার প্রাণরক্ষা করিয়াছিলেন। বড় হইয়া সেও সে ঋণ পরিশোধ করিয়াছিল। দীন-দুঃখী-পীড়িত-তাপিত মানুষদিগের প্রতি যেরূপ সুবালার দয়া-মায়া ছিল, জীব-জন্তুর প্ৰতিও সেইরূপ দিয়া ছিল। বাড়ীতে অনেকগুলি দুগ্ধবতী গাভী ছিল। তাহাদের ভালরূপ সেবা হইতেছে কি না, প্রতিদিন সন্ধ্যার পূৰ্ব্বে সুবালা নিজে গোয়ালে গিয়া সে বিষয়ের তত্ত্বাবধারণ করিতেন। কোন গরুর সম্মুখে আহার না থাকিলে কখন কখন তিনি নিজেই খড় কাটিতে বসিতেন। গোেশালা সৰ্ব্বদাই পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন থাকিত। কোন স্থানে বিন্দুমাত্র গোময় বা গোমূত্র পড়িয়া থাকিত না। কোন গরুর গাত্রে বিন্দুমাত্র লাগিয়া থাকিত না। কোন বিষয়ে অপরিষ্কার দেখিলে তিনি নিজে পরিষ্কার করিতেন । মাতা উপদেশ দিয়াছিলেন যে,— “সুবালা! কখনও নিষ্ঠুর হইওনা। চড়ুই পাখীটি ছাড়িয়া দাও।” জ্ঞান হইলে সুবালা বুঝিয়াছিলেন যে, পক্ষীপ্রগকে পিঞ্জরে বন্ধ করিয়া রাখিলে তাহাদের ক্লেশ হয়, সেজন্য কখনও তিনি পক্ষী পাির্দষ্ট করেন নাই। তবে ঘটনাক্রমে একবার একটি শালিক পাখী তাহার হস্তগত w পাখীতে বাসা করিয়াছিল। তাহাদের দুইটি ১t মাটিতে পড়িয়া গিয়াছিল, একটি মরিয়াংখ্রিয়ছিল, অপরটি জীবিত ছিল; কিন্তু তাহার একটি পা ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। ছানাটিকে বাড়ী সানিয়া ভাঙ্গা পায়ে চুন-হলুদ লেপন করিয়া, নেকড়ার ফালি দিয়া সুবালা তাহার উপর ছানাটিকে রাখিয়া, পাখীদের বাসার নিকট গাছে সেই চুবড়ীটি তিনি বুলাইয়া দিলেন। ছানাটির মাতা-পিতা প্রথম নিকটে আসিতে সাহস করে নাই। নিকটস্থ ডালে বসিয়া কেচর-মোচর করিতে লাগিল। শাবককে বাসায় আসিবার নিমিত্ত যেন তাহারা ডাকিতে লাগিল। যখন দেখিল যে, ছানা ঘরে ফিরিয়া আসিল না, তখন ক্রমে ক্রমে নিকটে আসিয়া তাহারা তাহার মুখে আহার দিতে লাগিল। দূর হইতে সুবালা পাখী দুইটির ব্যবহার দেখিতেছিলেন। মাতা-পিতা সন্তানকে আহার দিতে লাগিল দেখিয়া সুবালার আনন্দ হইল। সন্ধ্যা হইলে সুবালা ছানাটিকে বাড়ীতে আনিয়া রাখিলেন। তিনি মনে করিয়াছিলেন যে, বড় হইয়া উড়িতে শিখিলে সে তাহার মাতা-পিতার সহিত চলিয়া যাইবে। কিন্তু ততদিন পৰ্যন্ত মাতা-পিতা তাহাকে প্রতিপালন করিল না। ছানাটি উড়িতে শিখিবার পূৰ্ব্বেই তাহারা কোন স্থানে চলিয়া গেল। তখন হইতে সুবালাকে কাজেই তাহার প্রতিপালনের ভার গ্ৰহণ করিতে হইল। পাখীটি বড় হইয়া সৰ্ব্বদা সুবালার নিকট থাকিতে, তাহার কাধে বসিতে, অথবা তাঁহার সহিত এ ঘর সে ঘর বেড়াইতে ভালবাসিত। রাত্রিকালে সে একটি আলমারির মাথায় শয়ন করিয়া নিদ্রা যাইত। সুবালা কখনও তাঁহাকে পিঞ্জরে আবদ্ধ করিয়া রাখিতেন না। গ্ৰীষ্মকালে দিনের বেলা কখন কখন সে বাগানে যাইয়া কোন গাছের পত্রের ভিতর লুক্কায়িত থাকিত। কিন্তু সুবালা ডাকিলেই সাড়া দিত ও গাছ হইতে উড়িয়া তাঁহার মাথায় আসিয়া বসিত। w8 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.comন্মিলাক্যনাথ রচনাসংগ্ৰহ করিল। তাহার শোকে সুবালা অনেক কাদিয়াছিলেন এবং তিন চারি দিন ভালরূপে আহারাদি করেন নাই । আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে, এই শালিক পাখীটি অন্যান্য পক্ষীদিগকে ডাকিয়া আনিয়া সুবালার সহিত আলাপ-পরিচয় করিয়া দিয়াছিল। এক দিন প্ৰাতঃকালে সুবালা বাগানে গিয়াছিলেন! শালিক পাখীটি তাঁহার সঙ্গে গিয়াছিল। সুবালার হাতে একখানি বাসি রুটি ছিল। তাহা হইতে অল্প অল্প ছিড়িয়া তিনি শালিক পাখীকে দিতেছিলেন। সহসা পাখী গাছের দিকে উড়িয়া গেল। সুবালা ভাবিলেন, পাখী কোথায় গেল, কেন উড়িয়া গেল! অল্পক্ষণ পরে সে আর দুইটি শালিক পক্ষীকে লইয়া ফিরিয়া আসিল; কিন্তু তাহারা নিকটে আসিতে সাহস করিল না, দূরে বসিয়া পোষা পক্ষীর আহার দেখিতে লাগিল। রুটি ছিড়িয়া সুবালা তাহাদের জন্য দূরে নিক্ষেপ করিলেন। দূর হইতে আহার করিয়া সেদিন তাহারা প্রস্থান করিল। এই দুইটি পক্ষী পুনরায় আসে কি না, তাহা দেখিবার নিমিত্ত সুবালা পরদিন প্ৰাতঃকালে সেই গাছের গোড়ায় গিয়া বসিলেন। সেদিনও সেই বন্যপক্ষী দুইটি আসিয়া উপস্থিত হইল। পূৰ্ব্বদিন অপেক্ষা তাহারা আরও নিকটে আসিয়া আহার করিল। প্রতিদিন প্ৰাতঃকালে গাছতলায় বসিয়া পক্ষীদিগকে আহার প্রদান করা সুবালার এক খেলা হইল। পুরাতন পক্ষীটির ন্যায় নূতন দুইটি পক্ষীও সম্পূর্ণরূপে পোষ মানিল। তাঁহাদের দেখাদেখি অন্যান্য শালিক পক্ষীও নিয়মিতরূপে ঘিরিয়া, কেচর-মোচর করিয়া, প্রতিদিন তাহারা আহার করিতে আকাশে উড়িতে উড়িতে কতকগুলি বন্য গোলাপীয়রা এই পক্ষীভোজন দেখিতে পাইল । পায়রাদিগের জন্য সেদিন সুবালা ঐটর আনিয়াছিলেন । আনন্দে মটর ভোজন করিয়া কপোতগণ প্ৰস্থান করিল। তাহার পরওঁকৈ বঁকে পায়রা আসিয়া সুবালার প্রদত্ত আহার নিত্য নিত্য ভোজন করিতে লাগিল। কিছুদিন পরে তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ ভাবিল যে, এ স্থানে যদি এরূপ আহারের আয়োজন আছে, তবে দূরে আর যাই কেন। রায়মহাশয়কে বলিয়া সুবালা ছাদের আলিসা আরও উচ্চ করিয়া গাথাইলেন ও পায়রাদিগের বাসস্থানের উপযোগী অনেকগুলি ছিদ্র বা খোপ সেই প্রাচীরে রাখিয়া দিলেন। পূৰ্ব্বে রায়মহাশয়ের বাটীতে একটিও পায়রা ছিল না। এক্ষণে শত শত কপোত-কপোতী আসিয়া সেই সমুদয় কোটরে বাস করিল। কিন্তু তবুও তাঁহাদের মধ্যে বাদবিসম্বাদ একেবারে নিবারিত হইল না। এক একটি দুষ্ট পায়রা বিনা কারণে অন্যের গৃহ অধিকার করিতে চেষ্টা করিত। যাহাদের ঘর, তাহারা আপত্তি করিলে, দুষ্ট পায়রা তাহাদিগকে অতি নিষ্ঠুরভাবে চঞ্চ ও পক্ষ দ্বারা প্রহার করিত। প্রায় প্রতিদিন সুবালাকে এইরূপ মোকদ্দমা মীমাংসা করিতে হইত। শান্তশিষ্ট কপোত-কপোতী দিগকে তিনি আদর করিতেন ও নিজের হাত হইতে তাহাদিগকে আহার খুঁটিয়া খাইতে দিতেন। কিন্তু দুষ্টদিগকে তিনি অনেক ভৎসনা করিতেন ও তাঁহার হাত হইতে আহার করিয়া করিয়া পুনরায় সুবালার গ্ৰীতিভাজন হইতে চেষ্টা করিত। কোন কোন পায়রা সুবালার ক্রেগড়ে বসিয়া তাহার নিকট হইতে আদর পাইতে চেষ্টা করিত। কিছুদিন পরে পায়রাদিগের আর একটি নূতন শত্রু আসিয়া উপস্থিত হইল। একদিন কোথা হইতে অনেকগুলি নীলকণ্ঠ পক্ষী আসিয়া পায়রাদিগের ডিম্ব ফেলিয়া দিল ও তাহদের কোটির °"“”° °f°°i" gfGrRIlg{ °i12,35 (q35 zx84 ~ www.amarboi.com ~ visor অধিকার করিতে চেষ্টা করিল। সেদিন বাড়ীর ভৃত্যগণ তাহাদিগকে তাড়াইয়া দিল; কিন্তু প্রতিদিন তাহারা আসিয়া এইরূপ বিবাদ-বিসম্বাদ করিতে লাগিল। সেজন্য সুবালা তাহাদের জন্য গুটিকতক নূতন কোিটর নিৰ্ম্মাণ করাইলেন। প্রথম তাহারা সে নূতন গৃহে যাইতে সম্মত হইল না। কিন্তু লাঠি হাতে করিয়া চপলার ভগিনী পাগলী পায়রাদিগকে রক্ষা করিতে লাগিল। সেজন্য নিরুপায় হইয়া তাহারা নূতন নিৰ্ম্মিত কোটরে গিয়া বাস করিল। যে বৃক্ষতলে বসিয়া সুবালা পক্ষীদিগকে ভোজন প্ৰদান করিতেন, সেই বৃক্ষে দুইটি কাঠবিড়ালী বাস করিত। গাছে বসিয়া অনেকদিন ধরিয়া তাহারা দেখিতেছিল যে, তাহদের বাড়ীর নিকট প্রতিদিন সদাব্রত হইতেছে। এক মানবকন্যা সেই পুণ্যকার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছেন। এই মানবীর মুখশ্ৰী অতি মৃদু, অতি মধুর, দয়ামায়াতে পরিপূর্ণ। তাঁহার নিকট গমন করা উচিত কি না, অনেক দিন ধরিয়া কাঠবিড়াল ও কাঠবিড়ালী এই চিন্তায় নিমগ্ন রহিল। সুবালা ও পক্ষিগণ স্ব স্ব স্থানে প্ৰস্থান করিলে, কাঠবিড়াল দুইটি সভয়ে নিম্নে নামিয়া যৎসামান্য যাহা কিছু উচ্ছিষ্ট পড়িয়া থাকিত, দুই হাতে তাহা ভক্ষণ করিত। তাহা দেখিয়া সুবালা কাঠবিড়ালদের জন্য ছোলা আনিতে আরম্ভ করিলেন। অন্যান্য পক্ষীদিগের ভোজন সমাপ্ত হইলে কাঠবিড়ালদিগের জন্য সুবালা চলিয়া গেলে, গাছ হইতে নামিয়া তাহারা সেই ছোলা ভক্ষণ করিত। দিন দিন তাহাদের সাহস বৃদ্ধি হইতে লাগিল। তাঁহাদের ভয় দূর করিবার নিমিত্ত সুবালা আপনার পশ্চাৎদিকে ছোলা বিকীর্ণ করিতে লাগিলেন। মানব-কন্যা অন্যমনস্কা আছে, আমাদিগকে দেখিতে পাইবে না, এইরূপ ভাবিয়া চুপিচুপি গাছ হইতে নামিয়া তাহারা সেই ছোলা খাইতে লাগিল। সুবালা ক্ৰমে নিজের ছোলা ছড়াইয়া দিলেন। নিৰ্ভয়ে সে। স্থানের খাদ্যও তাহারা ভক্ষণ করিতে লাগিল। তাঁহায় স্থানের খাদ্যও তাহারা ভক্ষণ করিল। অবুশোিধ’তাহারা সুবালার স্কন্ধে বসিয়া তাঁহার হাত হইতে খাদ্য গ্ৰহণ করিতে কিছুমাত্র সঙ্কুচূিড্ৰইইল না।

  • পাষ্ট্ৰঞ্জী আহারের লোভে সে স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইল। শালিক পাখী, চড়ুই পাখী, পায়রা,’টিয়া পাখী, কাক, কাঠবিড়াল প্রভৃতি পশু-পক্ষী দ্বারা পরিবৃত হইয়া সুবালা যখন গাছতলায় বসিয়া থাকিতেন, তখন সে বিচিত্র দৃশ্য দর্শন করিয়া সকলেই আশ্চৰ্য্যান্বিত হইত। গ্রামে কোন লোকের বাড়ীতে কুটুম্ব আসিলে, তাহারা এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখিতে আসিত। সকলে বলিত যে, সুবালা মনুষ্য নহেন। ইনি লক্ষ্মী অথবা সরস্বতী অথবা স্বয়ং ভগবতী মানুষের আকার ধারণ করিয়া পৃথিবীতে অবতীর্ণ হইয়াছেন।

বাগানের এক পুষ্করিণীতে সুবালা অনেকগুলি বড় বড় রুই মৎস্য পুষিয়া রাখিয়াছিলেন। সুবালার কণ্ঠস্বর তাহারা বুঝিতে পারিত। সানবাঁধা ঘাটে দাঁড়াইয়া সুবালা যখন তাহাদিগকে “আয়, আয়” বলিয়া ডাকিতেন, তখন নিকটে আসিয়া তাহারা হুড়াছড়ি করিত। মুড়ি ও ময়দার গুলি তিনি জলে নিক্ষেপ করিতেন। মৎস্যগণ তাহা ভক্ষণ করিত। ক্রমে তাহারা এত নিৰ্ভয় হইয়াছিল যে, আহারীয় দ্রব্য হাতে করিয়া জলের ধারে বসিলে, সুবালার হাত হইতে তাহারা কাড়িয়া খাইত। একটি রোহিত মৎস্য বড়ই দুৰ্দান্ত হইয়াছিল। সুবালার হাত হইতে সে সমুদয় কাড়িয়া খাইত, অন্য কাহাকেও তাঁহার নিকটে যাইতে দিত না। পক্ষী ও মৎস্যদিগকে প্রথম প্ৰথম সুবালা একেলাই ভোজন প্ৰদান করিতেন। কিন্তু ছাদে যখন অনেক গোল-পায়রা আসিয়া বাস করিল, তখন তাহাদিগকে আহার প্রদান করিবার নিমিত্ত রায়-গৃহিণী একজন বৃদ্ধ স্ত্রীলোক নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তাহার দ্বারা এ কাজ ভালরূপে \\ দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.comশ্মির্ত্যািক্যনাথ রচনা সংগ্ৰহ সম্পন্ন হইল না। পায়রা দেখাইবার নিমিত্ত রাধা গোয়ালিনী একদিন পাগলীকে সঙ্গে করিয়া আনিয়াছিলেন। সেই সময় নীলকণ্ঠ পক্ষিগণ পায়রাদিগের উপর উপদ্রব আরম্ভ করিয়াছিল। সুবালা বলিলেন- “চঞ্চল৷ এই লাঠি হাতে করিয়া এই স্থানে বসিয়া থাক। নীলকণ্ঠ পাখী। আসিলে তাড়াইয়া দিও।” পাগলী সে কােজ উত্তমরূপে করিল। তাহার ভয়ে নীলকণ্ঠ পাখীরা পায়রাদিগের উপর আর উপদ্ৰব করিতে সাহস করিল না। তাহাদিগের জন্য যে কয়টি নূতন খোপ প্রস্তুত হইয়াছিল, সেই খোপে গিয়া তাহারা বাস করিতে লাগিল । পরদিন প্ৰাতঃকালে সুবালা পক্ষী-ভোজনের সময় পাগলীকে দেখিয়া তাহারা সেরূপ ভয় করিল না। একপ্রকার আশ্চৰ্য-জ্ঞানবলে তাহারা বুঝিতে পারিল যে, এ আমাদের অনিষ্ট করিবে: না। সুবালা যেদিন পাগলীকে পরিবেশণ করিতে দিলেন। সুবালাকে পশু-পক্ষিগণ যেরূপ ভালবাসিত, ততটা না হউক, কিন্তু পাগলীর সহিতও তাঁহাদের সদ্ভাব হইল। গোশালায় গাভীদিগকে, ছাদে কপােতগণকে, জলাশয়ে মৎস্যগণকে ও বৃক্ষতলে পক্ষিগণকে আহার দিবার নিমিত্ত ক্ৰমে ক্ৰমে সুবালা পাগলীকে নিযুক্ত করিলেন। কখন দুইজনে একসঙ্গে, কখন পাগলী একেলা, এখন সুবালা একেলা বৃক্ষতলে গিয়া পক্ষীদিগকে ভোজন প্ৰদান করিতেন। সুবালা যখন সেদিন খুড়ামহাশয়ের বাড়ী যাইতেন, তখন পাগলী একেলা এই কাজ করত। মেঘাচ্ছন্ন আকাশের ন্যায় তাহার মুখ সৰ্ব্বদাই বিষন্ন হইয়া থাকিত। জীবজন্তুদিগের সহবাসে তাহার মন এখন পূৰ্ব্বাপেক্ষা প্ৰসন্নভােব ধারণ করিল। তাহার মাতা ও র সহিত দুই একটি কথা ব্যতীত অন্য কোন নৱলোকের সহিত সে কথোপকথন না। কিন্তু নিভৃতে গোয়ালে বসিয়া গরুদিগের সহিত অথবা ছাদে পায়রাদিগের অথবা ঘাটে মৎসাদিগের সহিত, অথবা গাছতলায় পক্ষী ও কাঠবিড়ালদের সহিত জনৈক গল্প-গাছা করিত। কিন্তু নিকটে মানুষ গেলেই অমনি সে নীরব হইত, তাহার তখন আর একটিও কথা বাহির হইত না । বাঘার গল্প করিতে করিতে পক্ষীর কথা বাহির হইয়া পড়িল । সুবালা যখন সাত কি আট বৎসরের বালিকা ছিলেন, একদিন তিনি গ্রামের ভিতর বেড়াইতে গিয়াছিলেন। তিনি দেখিলেন যে, জনকয়েক বালক ছোট একটি কুকুর-শাবকের পায়ে দড়ি বঁাধিয়া তাঁহাকে পুষ্করিণীর জলে ফেলিতেছে ও তুলিতেছে! নিদারুণ যাতনায় কুকুরছানাটি কঁাপিতেছে। তাহার ক্লেশ দেখিয়া নিষ্ঠুর বালকগণ হাততালি দিয়া আনন্দে নৃত্য করিতেছে। তাঁহাদের নিষ্ঠুরতা। দেখিয়া, সুবালার সাৰ্ব্বাঙ্গ জুলিয়া গেল। অনেক ভৎসনা করিয়া তাহাদের নিকট হইতে কুকুরছানাটি তিনি কাড়িয়া লইলেন। জলে ও কাদায় তাহার। সৰ্ব্বশরীর ময়লা ও ভিজা হইয়াছিল। সেই অবস্থাতেই সুবালা তাহাকে বুকে লইয়া বাড়ী আসিলেন। ছানাটিকে তিনি প্রতিপালন করিতে লাগিলেন এবং তাহার নাম বাঘা রাখিলেন। কালক্রমে বাঘা সাহসী ও বিক্রমশালী কুকুর হইয়া উঠিল। দৌড়াদৌড়ি করিয়া সুবালার সহিত খেলা করিতে অথবা তাহার সঙ্গে সকল স্থানে যাইতে বাঘা বড় ভালবাসিত। কিন্তু অন্য কুকুরের সহিত সে ঝগড়া কিরিত, বিড়াল দেখিলে তাড়া করিয়া যাইত, পক্ষীদিগের সে ভয় দেখাইত, সেজন্য সকল সময়ে সুবালা তাহাকে সঙ্গে যাইতে দিতেন না। বাঘাকে লইয়া সুবালা একদিন বাগানে গিয়াছিলেন। বাঘা ছুটাছুটি করিয়া খেলা করিতেছিল। সহসা নদীর দিকে একটা কলরব উপস্থিত হইল। বাঘা গৰ্জ্জন করিয়া উঠিল। কুকুর পাছে সেই দিকে দৌড়িয়া যায়, সেজন্য নিকটে ডাকিয়া সুবালা তাহার গলার অলস্কৃত পাপের পরিণাম। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro Vs সুন্দর বকলসটি ধরিয়া রহিলেন। সুবালার পশ্চাদিকে কোলাহল ক্রমে নিকটবৰ্ত্তী হইতে লাগিল। সুবালার হাত হইতে মুক্ত হইয়া সেই দিকে যাইবার নিমিত্ত বাঘা লম্বফ ঝমৃঢ় করিতে লাগিল। মাটিতে বসিয়া দুইহাতে প্ৰাণপণে সুবালা তাহার গলার বকলস ধরিয়া রহিলেন। কিন্তু বাঘা এত লাফালাফি করিতে লাগিল যে, তাহাকে ধরিয়া রাখা ভার হইল। পশ্চাদিকে গোলমাল আরও নিকটবৰ্ত্ত হইল। বাঘাকে লইয়া সুবালা ব্যস্ত ছিলেন । পশ্চাদিকে কেন এত । গোলামাল হইতেছিল, তাহা দেখিবার নিমিত্ত তিনি অবসর পাইতেছিলেন না। পশ্চাদিকে ত্ৰিলোচন ও শঙ্করার কণ্ঠস্বর তিনি শুনিতে পাইলেন । উচ্চৈঃস্বরে তাহারা চীৎকার করিতেছিল,— “সুবালা দিদি, পলাও, সুবালা দিদি, পলাও!” সেই মুহূৰ্ত্তে সম্মুখ দিক হইতে বড়ালমহাশয় চীৎকার করিয়া বলিলেন,- “সুবালা দিদি, বাঘকে ছাড়িয়া দাও। শীঘ্ৰ বাঘাকে ছাড়িয়া দাও।” সুবালা বাঘকে ছাড়িয়া দিলেন। তাহার পর ফিরিয়া দেখিলেন যে,- সৰ্ব্বনাশ! একটা হন্যা বা ক্ষিপ্ত শৃগাল নক্ষত্ৰবেগে তাঁহার দিকে দৌড়িয়া আসিতেছে। তাহার পশ্চাতে ত্ৰিলোচন, শঙ্করা ও অন্যান্য অনেক লোক লাঠি হাতে করিয়া দৌড়িতেছে। কিন্তু সে-দ্রুতগামী ক্ষিপ্ত শৃগালের সহিত কে দৌড়িতে পারে? তাহারা অনেক পশ্চাতে পড়িয়াছিল। সম্মুখ দিকে বড়ালমহাশয়ও অনেক দূরে দৌড়িয়া আসিতেছিলেন। কি পশ্চাতের, কি সম্মুখের কেহই সুবালাকে রক্ষা করিতে পারিত না। তাহার সেস্থানে পীে ছিবার পূৰ্ব্বেই শৃগাল সুবালার উপর পড়িয়া তাহাকে দংশন করিয়া ক্ষত-বিক্ষত করিত। নিকটস্থ গ্রামে অনেকগুলি মানুষ ও গরুকে সে দংশন করিয়াছিল। যে সকল মানুষ ও সে দংশন করিয়াছিল, তিনমাসের মধ্যে তাহারা সকলেই ভয়ানক জলাতঙ্ক রোগে পতিত হইয়াছিল। সেজন্য সুবালাকে যদি হন্য শৃগাল কামড়াইত, তাহা হইলে ঘটিত । বাঘকে ছাড়িয়া, পশ্চাদিকে ফিরিয়া, দেখিলেন যে, শৃগাল তখন প্রায় বিশহত দূরে রহিয়াছে। কিন্তু এত দ্রুতবেগে সে আসিতেছিল যে, নিমিষের মধ্যে সে সুবালার উপর আসিয়া পড়িত। ভাগ্যে বড় * ছাড়িয়া দিতে বলিলেন, ভাগ্যে সুবালা তৎক্ষণাৎ তাহাকে ছাড়িয়া দিলেন, তাই সুবালার প্রাণরক্ষা হইল। চক্ষুর পলকে বাঘা গিয়া শৃগালের উপর পড়িল। তাহার টুটি ধরিয়া দুই চারিবার তাহাকে এ-দিকে ও-দিকে ঝাকাইল। সামান্য আঘাতেই ক্ষিপ্ত শৃগালের প্রাণবিয়ােগ হয়। তীক্ষ্ণদন্ত দ্বারা তাহার গলদেশ ধরিয়া বাঘা যেই তাহাকে দুই চারিবার এ-দিকে ও-দিকে নাড়িল, আর তৎক্ষণাৎ তাহার মৃত্যু হইল। বাঘা এইরূপ কৌশলে তাহাকে ধরিয়াছিল যে, শৃগাল তাহাকে কামড়াইতে অবসর পায় নাই। কিন্তু শৃগাল যদি দংশন করিত, তাহা হইলে বাঘারও প্রাণসংশয় হইত। পশ্চাৎ ও সম্মুখদিকের লোকসকল আসিয়া মৃত শৃগালের নিকট দাঁড়াইল। ঘোর বিপদ হইতে সুবালা রক্ষা পাইলেন, সেজন্য সকলের আনন্দের সীমা রহিল না। বাঘাকে সকলে আদর করিতে লাগিল। অস্থিসম্বলিত ভাল মাংস আনাইয়া রায়-গৃহিণী সেদিন বাঘকে নিমন্ত্ৰণ করিলেন। শৈশবকালে সুবালা বাঘার প্রাণরক্ষা করিয়াছিলেন, বাঘা এক্ষণে সেই ঋণ পরিশোধ করিল। অন্ধকার ঘর হইতে খোনা স্বরে কে যখন বলিল,- “তুমি আমার্কে ডাকিলে কেঁন?” তখন বাঘা সেইদিকে একদৃষ্টিতে চাহিয়া মেঘগৰ্জ্জনের ন্যায় গভীর গর্জনে গোঙাইতে লাগিল। “সুবালাকে একেলা ফেলিয়া যাওয়া উচিত নহে,” বোধ হয় এইরূপ ভাবিয়া বাঘা সে স্থান হইতে উঠিল না, অন্ধকার ঘরের ভিতর প্রবেশ করিতে সে চেষ্টা করিল না। Vestr দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comৰ্ম্মিািক্যনাথ রচনা সংগ্ৰহ “বাঘা আমার নিকটে আছে,” এইরূপ ভাবিয়া সুবালার মনে অনেকটা সাহসের সঞ্চার হইল। তথাপি ভয়ে তাহার মুখশ্ৰী বিবৰ্ণ হইল, ভয়ে তাহার কণ্ঠ শুষ্ক হইল, ভয়ে তাহার হস্তপদ কঁাপিতে লাগিল। মানুষ যতই সাহসী হউক না কেন, বড় বড় বীরপুরুষের মনেও ভূতের নামে কিরূপ একটা আতঙ্ক উপস্থিত হয়। ব্যাঘ-ভালুকের সহিত সম্মুখ যুদ্ধ করিতে যাহারা কিছুমাত্র সঙ্কুচিত হয় না, রণক্ষেত্রে অকাতরে যাহারা প্ৰাণ বিসৰ্জ্জন করিতে পারে, এরূপ লোকের হৃদয়ও ভূতের ত্ৰাসে কম্পিত হয়। চতুৰ্থ অধ্যায়। বড়াল-গৃহিণী ভাগ্যক্রমে এই সময় বিনয় পেরেক প্রভৃতি লইয়া উপস্থিত হইলেন। সুবালার মুখ দেখিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,- “কি হইয়াছে?” হাত দিয়া সুবালা অন্ধকার ঘর দেখাইলেন। ঘোরতর বিস্ময়াপন্ন হইয়া বিনয় জিজ্ঞাসা করিলেন, “২১”ও ঘরে কি?” সুবালা উত্তর দিতে না দিতে চোরকুঠরি হইতে স্বরে শব্দ আসিল,— “ঐ ঘরে আমি! আমি কালা বাঘা । আমি খাদা ভূত।” (Nరీ সাতিশয় আশ্চৰ্য্যান্বিত হইয়া বিনয় কুছুক্কুল সেই অন্ধকার ঘরের দিকে চাহিয়া রহিলেন। ভীরু বলিয়া বাঙ্গালী জুতির অপবাদুষ্কছ, বিনয় তাহা পুস্তকে পাঠ করিয়াছিলেন। সে জন্য w তিনি দৃঢসংকল্প করিয়াছিলেন যে, মা হইতে যতটুকু হয়, আমি এ অপবাদ দূর করিতে চেষ্টা করিব। প্ৰাণ থাকে। আর যায়, কোন কাজে আমি ভয় করিব না।” খাদা ভূতের ভয়ে তিনি ভীত হইলেন না। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,- “দিনের বেলা ভূত! তুমি মানুষ না ভূত?” সে উত্তর করিল,— “আমি জীবিত মানুষ।” সন্ন্যাসী কালা-বাবা অনেক দিন হইতে খাদা ভূত নামে পাঠকদিগের নিকট পরিচিত হইয়াছে। সেজন্য তাহাকে আমরা খাদা ভূত বলিয়া ডাকিব। নাসিকবিহীন হইয়া তাহার খোনা হইয়া গিয়াছে। খোনা কথা লিখিতে ও পড়িতে কষ্ট হইবে। সেজন্য সহজ ভাষায় তাহার কথা আমরা এ স্থানে লিখিব। বিনয় বলিলেন, — “যদি তুমি জীবিত মানুষ, তাহা হইলে ও ঘর হইতে এ ঘরে এস।” খাদা ভূত উত্তর করিল,- “তোমাদের কুকুর আমাকে কামড়াইবে। ঘর হইতে কুকুর বাহির করিয়া দাও।” সুবালার দিকে চাহিয়া বিনয় আস্তে আস্তে বলিলেন,- “এ আবার নূতন ব্যাপার!! বৃত্তান্ত কি, জানিলে ভাল হয় না?” সুবালা বাঘকে বাহিরে যাইতে বলিলেন। কিন্তু তাঁহাকে এ ভয়ের মাঝে ছাড়িয়া যাইতে বাঘা স্বীকৃত হইল না। সুবালা তাহাকে সঙ্গে লইয়া নীচের তলায় গমন করিলেন। চাকরের

              • দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ &&& নিকট বাঘকে রাখিয়া, সত্বর তিনি প্রত্যাগমন করিলেন। মাঝের দ্বার দিয়া খাদা ভূত তখন সেই ঘরে প্রবেশ করিল।

ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, নাসিকা-বিহীন, পলিত-কেশ,- বিকট মূৰ্ত্তি। সে মূৰ্ত্তি দিনের বেলা দেখিলে ভয় হয়, রাত্রির তো কথাই নাই। তাহার আকৃতি দেখিয়া বিনয় পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “যথার্থই কি তুমি জীয়ন্ত খাদা ভূত উত্তর করিল,— “আমাকে বরং তুমি টিপিয়া দেখা।” ঈষৎ হাসিয়া বিনয় তাহার হাত টিপিয়া দেখিলেন। যথার্থই রক্তমাংসের শরীর বটে ! বিনয় বলিলেন,- “তোমার। পূৰ্ব্ব-কাহিনী আমি অনেক শুনিয়াছি। তুমিই সেই কালাবাবা? তুমিই খাদা ভূত সাজিয়া এ গ্রামের লোককে উৎপীড়িত করিয়াছিলে? কিজান্য পুনরায় এ স্থানে আসিয়াছ?” খাদা ভূত উত্তর করিল,— “আজ তিনদিন উপবাসী আছি। ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় আমার জঠর জুলিয়া যাইতেছে; আমার কণ্ঠ শুষ্ক হইয়া গিয়াছে। যদি তোমাদের দয়া-ধৰ্ম্ম থাকে, তাহা হইলে আমাকে প্রথম কিছু আহার প্রদান কর। পরে সকল কথা বলিব।” সুবালা উঠিয়া দাঁড়াইলেন। বিনয় বলিলেন,- “তোমার পিসীমাকে এখন এখানে আসিতে মানা করিবে। বলিবে যে, পূৰ্ব্বদিকের সিঁড়ি দিয়া একজন বাহিরের লোক আসিয়াছে।” মুড়ি, দুগ্ধ ও গুড় লইয়া অল্পক্ষিণ পরে সুবালা ফিরিয়া আসিলেন। আহার করিয়া খাদা ভূত পরম পরিতোষ লাভ করিল। م)C( শ্রমিয়াছি যে, রায়মহাশয় নামক একব্যক্তি এখন এ বাড়ীর কৰ্ত্ত। তিনি কােথায়? তাঁহারােষ্ট্র আমার কিছু গোপনীয় কথা আছে।” বিনয় উত্তর করিলেন,- “রায়মহাশয়ের কাল হইয়াছে।” খাদা ভূত জিজ্ঞাসা করিল,— “তবে এ বাড়ীর এখন কৰ্ত্তা কে? তাঁহার সহিত আমার অতি আবশ্যকীয় কথা আছে।” সুবালাকে দেখাইয়া বিনয় উত্তর করিলেন, — “ইনিই এখন এ বাড়ীর কত্রী।” খাদা ভূত বলিল,— “ইহার এখন বিবাহ হয় নাই?” বিনয় উত্তর করিলেন,- “না।” খাদা ভূত বলিল,— “ইনি ক্ষেত্ৰজ্ঞা অথবা অম্বিকা কুমারী । শাস্ত্ৰে বলিয়াছে— ‘ত্রয়ােদশোলক্ষ্মৗদ্বিসপ্তা পীঠনায়িকা; ক্ষেত্ৰজ্ঞা পঞ্চদশভিঃ মহ ষোড়শো চাম্বিকা স্মৃতি”।” খাদা ভূত পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল,— “তুমি কে?” বিনয় উত্তর করিলেন, — “আমি ইহাদের বন্ধু। কুটুম্ব বলিলেও চলে।” সুবালাকে সম্বোধন করিয়া খাদা ভূত অতি বিনীতভাবে বলিতে লাগিল,— “মা! আমি ঘোর পাপিষ্ঠ। আমার কথা কিছু না কিছু তুমি শুনিয়া থাকিবে। দয়ার উপযুক্ত পােত্র আমি নই। কিন্তু, মা, আমি বড় দুঃখে পাড়িয়াছি। যদি নিজগুণে তুমি আমাকে কৃপা কর, তাহা হইলে আমি কৃতাৰ্থ হই।” সুবালা উত্তর করিলেন, — “আমি সামান্য বালিকা, আমার নিকট কেন আপনি ঐ রূপ বিনয় Գօօ দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.confািলকানাথ রচনা সংগ্ৰহ করিতেছেন? পাপৰূপ বীজ হইতে সকল দুঃখই উৎপন্ন হয়। সুতরাং পাপ-পুণ্যের বিচার করিয়া যদি দয়া করিতে হয়, তাহা হইলে কাহারও প্রতি দয়া করা হয় না। আমি কে যে, পাপ-পুণ্যের বিচার করিব! সে বিচার ভগবানু করিবেন।” w খাদা ভূত বলিল,— “তোমার মুখশ্ৰী দেখিয়া বোধ হয় যে, তুমি মা, দয়াময়ী। তুমি মা, সাক্ষাৎ ভগবতী। নানা আকারে সেই মহাশক্তি আবির্ভূত হন। রুধিরা-বসনা শ্যামারূপে তিনি বিশ্বসংসারকে চৰ্ব্বণ করেন। গ্রিসনাৎ সৰ্ব্বসত্ত্বনাং কালদন্তোন চৰ্ব্বণাৎ। তদ্রক্তসজেঘা দেবেশ্যা বাসোরূপেণ ভাষিতম।] অনুপূর্ণরূপে তিনি জীবগণকে আহার প্রদান করেন, আবার জগদ্ধাত্রীরূপে তিনি মাতার ন্যায় সকলকে প্রতিপালন করেন। তুমি মা, দয়ারূপিণী মহাশক্তি । তুমি মা, আমার প্রতি কৃপা কর।” সুবালা বলিলেন,- “আপনার কি উপকার করিতে পারি, তাহা বলুন।” খাদা ভূত উত্তর করিল,- “দিন কয়েকের জন্য আমি ঐ অন্ধকার ঘরে লুক্কায়িত থাকিব। প্ৰথম, সেই অনুমতি আমি প্রার্থনা করি।” সুবালা বলিলেন,- “যদি আপনি কাহাকেও বধ করিয়া, অথবা চুরি করিয়া অথবা কোনরূপ দুষ্কৰ্ম্ম করিয়া এ স্থানে আসিয়া থাকেন, তাহা হইলে কি করিয়া আপনাকে আমরা আশ্রয় প্ৰদান করি?” খাদা ভূত উত্তর করিল,— না, মা! সেরূপ কোন মন্দকৰ্ম্ম করিয়া আমি আগমন করি নাই। আমাকে আশ্রয় প্ৰদান করিলে কাহারও বিন্দুমাত্র অনিষ্ট হইবে না। বরং তোমার মঙ্গল হইবে, সুবালা বলিলেন,— “আপনার দুঃখ দূর ক যথাসাধ্য চেষ্টা করিব। কিন্তু দেখুন, আমি সামান্য বালিকা। কর্তৃপক্ষদিগের বিন্যঃ কোন কাজ করা আমার উচিত নহে। বড়ালমহাশয়কে আপনি জানেন? এ স্থাষ্ট্ৰেতিনি আমার রক্ষক ও অভিভাবক। তাঁহাকে না। জিজ্ঞাসা করিয়া আমি কোন উত্তর స్ట్రా? সুবালা বলিলেন,— “বড়ালমহাশয় বৃদ্ধ হইয়াছেন। প্ৰাতঃকালে তিনি কাজে গিয়াছেন। দুই প্ৰহরের পর বাটী প্রত্যাগমন করিয়া আহারাদি করিয়া একটু শয়ন করিয়াছেন। এখন তাঁহাকে আমি ডাকিব না। একঘণ্টা পরে তিনি আপনি উঠিবেন। তখন তাঁহাকে ডাকিয়া আনিব।” চুপ করিয়া বিনয় দুইজনের কথোপকথন শুনিতেছিলেন ও মনে মনে চিন্তা করিতেছিলেন। এক্ষণে তিনি উঠিয়া ঘরের বাহিরে বারাণ্ডায় গমন করিলেন। সে স্থানে সুবালাকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, — “নিতান্তই কি তুমি উইল সম্বন্ধে তদন্ত করিবে? উইল সম্বন্ধে কোন কথা উত্থাপন করিয়া আর আবশ্যক কি? এ সম্পত্তি যদি আইনানুসারে তোমার না হয়, তাহা হইলে বিজয়বাবুর হইবে। কিন্তু বিজয়বাবু বড়ালমহাশয়কে লিখিয়াছেন যে, এ সম্পত্তিতে তাঁহার প্রয়োজন নাই। তিনি কোনরূপ আপত্তি করিবেন না। আর আমি নিশ্চয় বলিতে পারি যে, উইল যদি কৃত্রিমও হয়, তাহা হইলে তােমাকে বঞ্চিত করিয়া কিছুতেই তিনি এ বিষয় লইবেন না। তবে উইলের কথা তুলিয়া আর আবশ্যক। কি?” এ সম্পত্তি যদি আইনানুসারে তোমার না হয়, তাহা হইলে বিজয়বাবুর হইবে। কিন্তু বিজয়বাবু বড়ালমহাশয়কে লিখিয়াছেন যে, এ সম্পত্তিতে তাহার প্রয়োজন নাই। তিনি কোনরূপ আপত্তি করবেন না। আর আমি নিশ্চয় বলিতে পারি যে, উইল যদি কৃত্রিমও হয়, তাহা হইলে তোমাকে বঞ্চিত করিয়া কিছুতেই তিনি এ বিষয় লাইবেন না। তবে উইলের কথা তুলিয়া আর আবশ্যক কি?” পাপের পরিণাম দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ oy সুবালা উত্তর করিলেন,- “সত্য কি, তাহা আমি জানিতে ইচ্ছা করি। যতদিন তাহা না জানিতে পারি। ততদিন আমার প্রাণ সুস্থির হইবে না। মুহুর্মুহুঃ আমি মনে করিতে থাকিব যে, পরের ধন আমি অপহরণ করিতেছি। বিজয়বাবু কি করিবেন, না করিবেন, সে কথায় আমার প্রয়োজন কি? আমার যাহা কৰ্ত্তব্য, তাহাঁই আমি করিব।” বিনয় বলিলেন, — “তবে, এতক্ষণ চিন্তা করিয়া আমি এক উপায় স্থির করিয়াছি। খাদীভূতের দ্বারা বড়ালনীকে ভয় দেখাইব, ভয় দেখাইয়া তাঁহার মুখ হইতে সকল কথা বাহির করিব।” সুবালা উত্তর করিলেন, — “না। তাহা হইবে না। বড়াল-দিদিকে তুমি ভয় দেখাইতে পরিবে না ।” তুমি আনিতে দিবে না। বড়ালনীকে একটু ভয় দেখাইতে দিবে না। যদি কোনরূপ প্রতারণা থাকে, তাহা হইলে তুমি কি মনে করিয়াছ যে, বড়ালিনী সহজে তাহা প্ৰকাশ করিবেন? কিছুতেই নহে। এ বিষয়ে তুমি আর কোন আপত্তি করিও না, একটু ভয় পাইলে তোমার বড়াল-দিদি গলিয়া যাইবেন না।” সুবালা চুপ করিয়া রহিলেন। দুইজনে পুনরায় ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলেন। খাদা ভূতকে সম্বোধন করিয়া বিনয় বলিলেন, — “একঘণ্টা পরে বড়ালমহাশয় আসিলে, ভূমির সম্বন্ধে যাহা হউক একটা স্থির হইবে। আপাতৃঃ সামান্য একটু তুমি ইহার উপকার করিবে?” খাদা ভূত জিজ্ঞাসা করিল,— “আমি করিতে পারি?” বিনয় বললেন,— “কােন একটি গ্রেঞ্জনীয় বিষয় ইনি জানিতে ইচ্ছা করেন। বড়ািলনী বােধ হয় তাহা অবগত আছেন; কিন্তুষ্ট্র তিনি তাহা প্রকাশ করিবেন না। খাদা ভূত সাজিয়া তাঁহাকে একটু ভয় দেখাইতে হইবে। ভয়ে তিনি হয় তো সে কথা প্রকাশ করিয়া ফেলিবেন ।” ঈষৎ হাসিয়া খাদা ভূত উত্তর করিল,— “বড়ালনীকে একটু ভয় দেখাইলে যদি ইহার উপকার হয়, তাহা হইলে নিশ্চয় আমি তাহা করিব। কুমারীকে সন্তুষ্ট করিলে মানুষ অক্ষয় পুণ্য লাভ করে,- “পূজিতাঃ প্ৰতিপূজ্যন্তে, নিৰ্দহন্ত্যবমানিতা। কুমারী যোগিনী সাক্ষাৎ কুমারী পরদেবতা।’ যাহারা কুমারী পূজা করে, তাহারা সৰ্ব্বত্র পূজনীয় হয়। কুমারীকে অবজ্ঞা করিলে দেবী সবংশে তাহাকে ধ্বংস করেন। কারণ কুমারীই সাক্ষাৎ পরম দেবতা। আবার জ্ঞানার্ণবে উক্ত হইয়াছে,- “কুমারীপূজয়া দেবীফলং কোটিজুণং ভবেৎ। । পুষ্পং কুমায্যৈ যদিওং তম্মেরুসদৃশং ফলস৷” “কুমারীপূজা দ্বারা কোটিগুণ ফললাভ হয়। কুমারীকে একটি পুষ্প দান করিলেও সুমেরুসৃদশ পুষ্পদানের ফল হয়।” বিনয় বলিলেন,- “তবে তুমি পুনরায় অন্ধকার ঘরে গমন কর। বড়ালনীকে আমি ডাকিতে পাঠাই। চুপি চুপি আমি তাঁহাকে সে কথা জিজ্ঞাসা করিব। তিনি যদি না বলেন, তাহা হইলে আমি সঙ্কেত করিব। তখন প্রথম তুমি কথায় ভয় দেখাইবে। তাঁহাতেও যদি তিনি না বলেন, তাহা হইলে পুনরায় আমি সঙ্কেত করিব। তখন এই মাঝের দ্বারের নিকট দাঁড়াইয়া তুমি তাহাকে ভয় দেখাইবে।” (C) উপকার করব। আমি ইহার কি উপকার ግoS দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comশ্মির্ত্যািক্যনাথ ঠ"সংগ্ৰহ খাদা ভূত অন্ধকার ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল। বিনয় মাঝের দ্বার বন্ধ করিয়া দিলেন। তাহার পর বারেণ্ডাতে গিয়া বড়ালিনীকে ডাকিবার নিমিত্ত একজন চাকরকে তিনি আদেশ করিলেন। বড়ালিনী উপস্থিত হইলেন। বসিবার নিমিত্ত সুবালা মাদুর পাতিয়া দিলেন। সুবালা বলিলেন, — “বড়াল-দিদি। এই ঘরে দিদিমণি প্ৰাণত্যাগ করিয়াছেন। তাঁহার ছবি আমি এই ঘরে রাখিব। ভাল হইবে না, বড়াল-দিদি?” বিনয় বলিলেন,- “চুপি চুপি কথা কহ। ঐ অন্ধকার ঘরে কে আছে। সে যেন শুনিতে না। পায় ।” বড়ালিনী চুপি চুপি বলিলেন,- “ছবি এখানে রাখিলে উত্তম হইবে।” সুবালাও আস্তে আস্তে কথা কহিতে লাগিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,- “শেষ অবস্থায় - দিদিমণি আমার নাম করিতেন?” বড়ালিনী উত্তর করিলেন, — “তোমার নাম করিবেন না? তোমার নাম তাহার জপমালা হইয়াছিল। তোমাকে বিষয় লিখিয়া দিতে পারিলেন না, সেজন্য তাঁহার দুঃখের সীমা ছিল না।” বিনয় সহসা জিজ্ঞাসা করিলেন,- “উইলে তবে কে সহি করিয়াছিল?” অন্যমনকভাবে বড়ালিনী বলিয়া ফেলিলেন, — “কেন, আমি— ” এই কথা বলিয়াই তিনি চমকিত হইলেন। কথা ফিরাইতে চেষ্টা করিলেন । তিনি বলিলেন,- “তা, এ সকল বিষয় আমি কি জানি, বল । স্ত্রীলোক। আমরা গরিব মানুষ। উইলোয় কথা আমরা কি জানি। যখন উইল হয়, সে স্থানে উপস্থিত ছিলাম না। ডাক্তারের সম্মুখ বাহির না হইলে চলিত না। তাহার সম্মুখে বাহির হইতাম। উইল করিবার সময় দুইজন উকীল উপস্থিত আমি সে স্থানে ছিলাম না। কিন্তু আমি শুনিয়াছি যে, উকীল উইল লিখিয়াছিল, ৰু ণী তাঁহাতে সহি কারিয়াছিলেন।” পঞ্চম অধ্যায়। প্রকৃত বিবরণ বিনয় বলিলেন,- “বড়াল-দিদি! আর গোপন করিলে চলিবে না। এখন সামান্য একটু কথার সূচনা হইয়াছে, ক্রমে সমস্ত কথা প্ৰকাশ হইয়া পড়িবে। তখন বড় বিপদ ঘটিবে; এমন কি, এ বিষয়ে যাহারা লিপ্ত আছেন, তাহাদিগকে হয়তো জেলে যাইতে হইবে। তুমি স্ত্রীলোক, তোমার বয়স হইয়াছে। এই বৃদ্ধবয়সে তোমাকে এবং বড়ালমহাশয়কে যদি জেলে যাইতে হয়, তাহা হইলে বড়ই দুঃখের বিষয় হইবে।” বড়ালনীর হাত-পা কাঁপিতে লাগিল। কিন্তু মুখে তিনি বলিলেন, — “আমি কি জানি, তাই! আমি কি বলিব? আমাকে জেলে দিতে হয়, দাও; কাটিয়া ফেলিতে হয় ফেল; আমি কিছুই জানি না ।” বিনয় সঙ্কেত করিলেন। অন্ধকার ঘর হইতে পুনরায় অন্ধকার খোনা স্বরে কে বলিয়া পৃথ্বীপের পরিণাম sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro Rox উঠিল,— “বঁল, বঁল, সর্ত্য কথা বঁল, না বঁলিলে এখনি তীের ঘাড় মটকাইব ।” বিনয় বলিলেন,- “সৰ্ব্বনাশ!” বড়ালিনী থর থর করিয়া কাপিতে লাগিলেন । পুনরায় অন্ধকার ঘর হইতে শব্দ আসিল,-“বল বল, সত্য কথা বল, না বলিলে তোকে খাইয়া ফেলিব।” বিনয় বলিলেন,-“সৰ্ব্বনাশ খাদা ভূত!” বড়ালিনী তথাপি ইতস্ততঃ করিতে লাগিলেন। বিনয় পুনরায় সঙ্কেত করিলেন। মাঝের দ্বার অল্প খুলিয়া খাদা ভূত আসিয়া সেই স্থানে দণ্ডায়মান হইল। বড়ািলনীর কথা দূরে থাকুক, এখন তাহার সেই ত্রিভঙ্গ-মুরারি বিকট রূপ দেখিয়া সুবালারও মুখ শুষ্ক হইয়া গেল। কঁাপিতে কঁাপিতে অপরিস্ফুট স্বরে বড়ািলনী বলিলেন– “উহাকে সরিয়া যাইতে বল। ঐ দেখ, হা করিতেছে। চপলার মত আমাকে আস্তো গিলিয়া ফেলিবে। আমি সকল কথা বলিতেছি। তাহার পর আমার কপালে যাহা থাকে, তাহা হইবে।” খাদা ভূতকে সরিয়া যাইবার নিমিত্ত বিনয় আদেশ করিলেন। দ্বারের নিকট হইতে খাদা ভূত সরিয়া গেল। বিনয় পুনরায় দ্বার বন্ধ করিয়া দিলেন। সুবালা বলিলেন, — “বড়াল-দিদি! শৈশবকাল হইতে তোমরা আমাকে প্রতিপালন করিয়াছ; প্ৰাণ থাকিতে তোমাদের কোন অনিষ্ট হইতে দিব না। নিৰ্ভয়ে সমস্ত কথা বল। তোমার কোন उठश नाई।" दgालनी ठखद्ध कब्रिएलन,- ‘नूवाला निनि 1 उठ ভঙ্গ মন্দ বল, যাহা আমরা করিয়াছি, সে কেবল তোমার মঙ্গলের জন্যই করিয়াছি। w was পূৰ্ব্বেই তাঁহার মৃত্যু হইবে। যাহা কিছু রয়াছি, তাহার আজ্ঞাক্ৰমেই করিয়াছি। তিনি এই কাজ করিবার নিমিত্ত কিরূপ কাত রাধ করিয়াছিলেন, তাহা যদি দেখিতে, তাহা হইলে তুমি আমাদিগকে দােষ দিত্বে গ্রুঞ্জ আমি লেখাপড়া জানি না। নিজের কাছে বসাইয়া তাহার মত স্বাক্ষর করিতে শিখিবার প্রতিদিন তাঁহার কাছে বসিয়া শত শত বার তাহার নাম আমাকে লিখিতে হইত। তাহার পর সেই কাগজ তাহার সাক্ষাতে আমি পোড়াইয়া ফেলিতাম। উইলের সময় তিনি জীবিত ছিলেন না। রায়-গৃহিণী সাজিয়া আমি এই খাটের উপর শয়ন করিয়া ছিলাম। উইলে আমি সহি করিয়াছিলাম। যাহা করিয়াছি, তাহার আজ্ঞায় করিয়াছি, আর সুবালা দিদি। তোমার ভালর জন্যই করিয়াছি। সকল কথা বলিয়া ফেলিলাম। এখন আমাদিগকে রাখিতে হয় রাখ; মারিতে হয় মার; যাহা ইচ্ছা হয়, তাহা কর।” দিদিমণির জন্য সুবালা কাঁদিতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ পরে বিনয় বলিলেন, — “কাঁদিলে আর কি হইবে। বড়ালমহাশয়কে এখন ডাকিতে পাঠাও। এতক্ষণে তিনি বোধ হয় উঠিয়া থাকিবেন । তিনি আসিলে প্ৰথমে তাহাকে উইলের কথা জিজ্ঞাসা করিতে হইবে। তাহার পর খাদা ভূতের কথা।” চক্ষু মুছিতে মুছিতে সুবালা বাহিরে গিয়া বড়ালমহাশয়কে ডাকিতে পাঠাইলেন। বড়ালমহাশয় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বিনয় বলিলেন,- “আস্তে আস্তে কথা কহিবেন। ঐ অন্ধকার ঘরে একজন আছে সে যেন আমাদের কথা শুনিতে না পায়। আমরা সকল কথা শুনিয়াছি। আর গোপন করা বৃথা। সুবালার নামে যে উইল হইয়াছে, তাহা প্রকৃত নহে।” ዓo8 afraig -iibg gis so! - www.amarboi.comf'37******* সকোপ নয়নে পত্নীর দিকে দৃষ্টি করিয়া বড়ালমহাশয় বলিলেন,- “কে বলে যে উইল প্রকৃত নহে। দুইজন উকীলের সাক্ষাতে সে উইল হইয়াছিল। সুবালা দিদির সহিত তোমার বিবাহ হইবে, তাঁহাই জানি। এই সম্পত্তির তুমি একদিন অধিকারী হইবে, তাহাই জানি। সুবালা দিদির সহিত শক্রিতা করিয়া তুমি যে তাঁহাকে এই সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত করিতে চেষ্টা করিবে, স্বপ্নেও তাহা ভাবি নাই।” বিনয় উত্তর করিলেন,- “সুবালার আমি অনিষ্ট করিব না। উইল প্রকৃত হউক, সুবালার কোন অনিষ্ট হইবে না। সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি সত্য করিয়া বলিতেছি যে, সুবালার কোন অনিষ্ট হইবে না। তবে প্রকৃত ঘটনা কি হইয়াছিল, সুবালা তাহা জানিতে ইচ্ছা! করেন। জাল উইল প্ৰস্তুত করা সামান্য অপরাধী নহে। আমার বোধ হয়, ধনুকধারী সকল কথা অবগত আছে। ধনুকধারীকে বিশ্বাস করিবেন না। তাহার কথাতেই সুবালার মনে সন্দেহ উপস্থিত হইয়াছে। সমস্ত বিষয় সাধারণের নিকট প্রকাশ হইলে বিপদ ঘটিতে পারে। কি ঘটিয়াছিল, এক প্রকার আমরা অবগত হইয়াছি। কিন্তু বিস্তারিত বিবরণের জন্য বড়ালদিদিকে আমরা উৎপীড়িত করিতে ইচ্ছা করি না। সেই জন্য আপনাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি।” সুবালা বলিলেন, — “বড়ালমহাশয়! পিতাকে আমি জানি না। আমি যখন শিশু, তখন তাহার পরলোক হইয়াছিল। তাহার পর বড় ভগিনী ও মাতাও আমাকে ছাড়িয়া চলিয়া গেলেন । পিতা-মাতার ন্যায় স্নেহ-মমতা করিয়া আপনারাই আমাকে প্ৰতিপালন করিয়াছেন। তাহার পর এই উইলও আমার মঙ্গলের জন্যই আ করিয়াছেন। আমি যে আপনাদের অনিষ্ট করিব, সে চিন্তা মনেও স্থান দিবেন না।” @ বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন,- “তুমি ধ্ৰুর্দ করবে, সে ভয় আমার হয় নাই। পাছে তুমি আমাদের সমুদয় পরিশ্রম বিফল ভয় আমার হইতেছে। বাল্যকাল হইতে তােমাকে আমি জানি। সমগ্ৰ পৃথিবীর ধনরত্ন যদি এক দিকে হয়, আর সত্য যদি অপর দিকে হয়, তাহা হইলে রত্নকে তুচ্ছ করিয়া, সত্যকেই তুমি গ্ৰহণ করিবে । সুবালা দিদি! যাহা শুনিয়াছ, তাহা ; আর অধিক কথা জানিয়া আবশ্যক নাই।” সুবালা উত্তর করিলেন, — “যাহা শুনিয়াছি, তাহাই যথেষ্ট; তবে অকারণ কেন আপনি বিস্তারিত বিবরণ গোপন করিতেছেন, তাহা আমি বুঝিতে পারি না। এখন বলুন, কবে দিদিমণির পরলোক হইয়াছিল, উইলই বা কবে হইয়াছিল?” কিছুক্ষণ নীরবে বড়ালমহাশয় চিন্তা করিতে লাগিলেন। তাহার পর তিনি বলিলেন, — “যখন সকল কথা শুনিয়াছ, তখন আর গোপন করা বৃথা। ১৮ই শ্রাবণ অর্থাৎ পঞ্চাশ বৎসর বয়ক্ৰম পূর্ণ হইবার দুইদিন পূৰ্ব্বে তোমার দিদিমণির মৃত্যু হইয়াছিল। ২২শে শ্রাবণ উইল হইয়াছিল।” বিনয় বলিলেন, — “আদ্যোপােন্ত সমস্ত বিবরণ সুবালা জানিতে ইচ্ছা করেন।” বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন,- “এ সম্বন্ধে অধিক কথা কিছু নাই। শ্রাবণ মাসের প্রথমে চিকিৎসকগণ জবাব দিল। সকলে বলিল যে, সম্ভবতঃ সাত আট দিনের মধ্যে রোগিণীর মৃত্যু হইবে। রায়-গৃহিণী নিজেও বুঝিলেন যে, তাহার আয়ু শেষ হইয়াছে। আমি হতাশ হইয়া পড়িলাম। যদি কোন প্ৰতিকার করিতে পারি, সেজন্য আমি কলিকাতায় গমন করিলাম। সেস্থানে সেই নূতন চিকিৎসকের সন্ধান পাইলাম। সকলে বলিল যে, সন্ন্যাসিম্প্রদত্ত স্বপ্নলব্ধ নানারূপ ঔষধ তিনি অবগত আছেন। ডাক্তার-বৈদ্য কর্তৃক পরিত্যক্ত অনেক পীড়িত ব্যক্তির S6 পুরাপের পরিণাম। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro Գod; প্রাণ রক্ষা করিয়াছেন। আমি তাহাকে লইয়া আসিলাম । রোগিণীকে পরীক্ষা করিয়া ডাক্তারবৈদ্যগণ যাহা বলিয়াছিলেন, তিনিও তাঁহাই বলিলেন। ২০শে শ্রাবণ পৰ্যন্ত জীবিত থাকা সম্ভব নহে, রায়-গৃহিণীকেও তাঁহা বােধ তিনি প্রকাশ করিয়া বলিয়াছিলেন। রোগিণী ও চিকিৎসক দুইজনে ফুসফুস করিয়া পরামর্শ হইতে লাগিল। দিন দুই পরে, একদিন রায়-গৃহিণী আমাকে বলিলেন— “বড়ালমহাশয়! আমার একটি কথা রাখিতে হইবে। আমার নিকট একটি সত্য করিতে হইবে। ডাক্তার সে স্থানে উপস্থিত ছিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,-“কি সত্য করিতে হইবে?” রায়-গৃহিণী উত্তর করিলেন,- “উইলের সময় পৰ্যন্ত যদি আমি জীবিত না থাকি, তাহা হইলে সুবালা যাহাতে সম্পত্তি পায়, তাহা আপনাকে করিতে হইবে। সে কাৰ্য্যে ডাক্তার মহাশয় আপনার সহায়তা করিবেন।” আমি উত্তর করিলাম,- “কি করিয়া তাহা আমি করিব? আমি সামান্য ব্যক্তি। আমার ক্ষমতা কি?” ডাক্তার বলিলেন,- “ধনবান লোকদিগের ঘরে এরূপ ঘটনা প্ৰায়ই ঘটিয়া থাকে। আমি উইল করিব, ধনবান লোক এইরূপ মানস করেন। আজ করিব, কাল করিব বলিয়া দিনপাত করিতে থাকেন। অবশেষে হঠাৎ একদিন তাহার মৃত্যু হয়। তখন তাঁহার কৰ্ম্মচারিগণ অথবা আত্মীয়স্বজন একখানি উইল প্রস্তুত করেন। ইহাতে কোন পাপ নাই। কারণ, তিনি যেরূপ ইচ্ছা করিয়াছিলেন, উইল সেইভাবে প্ৰস্তুত হইয়া থাকে। এ ক্ষেত্রেও তাঁহাই হইবে। রায়মহাশয় যেরূপ ইচ্ছা করিয়াছিলেন, ইনি এক্ষণে যেরূপ ইচ্ছা করিতেছেন, উইল ঠিক সেইরূপ হইবে। ভগবান করুন। ইহার অবৰ্ত্তমানে আমাদিগকে এ কাজ না করিতে হয়। অদ্য আমি যে ঔষধ প্ৰদান করিয়াছি, তাহার গুণে ইনি হয়ত অনেক দিন জীবিত থাকিবেন।” S. সকলেই অবগত আছে। কবে ইহার পঞ্চাশ বৎসর বয়ঃক্রম পূর্ণ হইবে, সকলে তাহা শুনিয়াছে। অতএব তাহার পূৰ্ব্বে যদি কোনরূপ অমঙ্গল ঘটে, তাহা হইলে কি হইবে?” ডাক্তার উত্তর করিলেন,- “সে সম্বন্ধে কোন চিন্তা নাই। আমরা তাহা গোপন রাখিব।” “সেইদিন হইতে রোগিণীর নিকট বাহিরের লোক কেহ যাইতে পাইত না। কেবল ডাক্তার, আমি, আমার স্ত্রী ও ধনুকধারী, এই কয়জনে তাঁহার সেবা-শুশ্ৰষা করিতাম। তোমার দিদিমণি ক্রমেই ক্ষীণ হইয়া পড়িলেন। ডাক্তারের আদেশে কলিকাতা হইতে প্রতিদিন দুই মণ বরফ আসিতে লাগিল। কাসিরোগের চিকিৎসার জন্য শীতল বরফ! সকলে আশ্চৰ্য হইল, কিন্তু কেহ কিছু বলিল না। ডাক্তার বরফ ব্যবহার করিতেন না। ঐ অন্ধকার ঘরে পড়িয়া বৃথা গলিয়া যাইত। ডাক্তারের আজ্ঞায় চারি হাত লম্বে ও দুই হাত প্রস্থে একটি কাঠের বাক্স আমি প্ৰস্তুত করাইলাম। তাহাও তিনি ঐ অন্ধকার ঘরে য়াখিয়া দিলেন।” বড়ািলনী বলিলেন,—“কি করিয়া তাহার নাম স্বাক্ষর করতে হয়, এই সময় রায়-গৃহিণী আমাকে শিক্ষা দিতেছিলেন।” বড়ালমহাশয় বলিলেন,-“হা, পূৰ্ব্ব হইতেই তিনি নিজে স্থির করিয়াছিলেন যে, যদি তাহার মৃত্যু হয়, তাহা হইলে আমার স্ত্রী উইলে সহি করিবেন। শেষ পৰ্যন্ত তাঁহার সম্পূর্ণ জ্ঞান RONA দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.comন্মিলাকনাথ রচনাসংগ্ৰহ ছিল ১৮ই শ্রাবণ সন্ধ্যাকালেও তিনি গল্প করিয়াছিলেন। কিছুক্ষণ পরে তাঁহার নাড়ী ছাড়িয়া গেল, নিঃশ্বাস-প্ৰশ্বাস ফেলিতে কষ্ট হইতে লাগিল। প্ৰবল শ্বাসের ভিতরও তিনি বলিতেছিলেন, — “আমি চলিলাম। দেখিবেন, যাহা বলিয়াছি, তাহার যেন অন্যথা না হয়। সুবালা যেন, এই সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত না হয়। এইজন্যই সুবালাকে আমি তাড়াতাড়ি তাহার কাকার বাড়ী পাঠাইয়া দিলাম। সুবালা এ স্থানে থাকিলে আপনারা কিছুই করিতে পারিতেন না। আমার কি সাধ নহে যে, সুবলার চাদ মুখখানি দেখিতে দেখিতে প্ৰাণত্যাগ করি!” ষষ্ঠ অধ্যায়। বড়ালমহাশয়ের কথা বড়ালমহাশয় বলিতেছেন,- “রায়-গৃহিণী প্রাণত্যাগ হইলে, ডাক্তারের আদেশে তাঁহার মৃতদেহ আমরা সেই বাক্সের ভিতর রাখিলাম। উপরে ও নীচে বরফ দিয়া বাক্সটি পূর্ণ হইল। সেজন্য মৃতদেহ নষ্ট হইল না। ডাক্তার কেন যে কাঠের বাক্স প্ৰস্তৃত করাইতে বলিয়াছিলেন ও কেন যে তিনি কলিকাতা হইতে দুই মণ বরফ আনাইতেছিলেন, পারিল না। মৃত্যুর চারিদিন পূৰ্ব্বে কৎস আমার গৃহিণী ও ধনুকধারী পূর্বের নৃষ্ঠে সৰ্ব্বদা এই ঘরে বসিয়া থাকিতাম। পূর্বের ন্যায় যথাসময়ে এই ঘরে রোগিণীর পথািঢ়ী আসিতে লাগিল। তাঁহার মৃত্যুর তিনদিন পরে উইল হইল। উইলের পরদিন আমরা তাঁহার মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ করিলাম ও যথাবিধি তাঁহার মৃতদেহের সৎকার করিলাম। রায়মহাশয়ের পরলোক হইলে বিজয়বাবুকে আমি পত্ৰ লিখিয়াছিলাম। সেই পত্রের তিনি যে উত্তর দিয়াছিলেন, তাহাতে আমি বুঝিলাম যে এ সম্পত্তি তিনি একেবারেই গ্ৰাহ্য করেন না। আমার নিশ্চয় বিশ্বাস হইয়াছিল যে, তিনি আসিবেন না। সেজন্য এবারও আমি তাঁহাকে পত্র লিখিলাম যে, আপনার ভ্রাতৃজায়ার বয়ঃক্রম শীঘ্রই পঞ্চাশ বৎসর পূর্ণ হইবে। তিনি উইল করবেন। সে সময় আপনি উপস্থিত থাকেন, ইহাই তাঁহার ইচ্ছা। বিজয়বাবু নিজে না আসিয়া একজন উকীল পাঠাইয়া দিলেন। আমার গৃহিণী সমুদয় শরীর চাকিয়া রোগিণী সাজিয়া ঐ খাটে শয়ন করিলেন; রায়মহাশয় ও রায়-গৃহিণীর আজ্ঞায়, সুবালা দিদির মঙ্গল-কামনায়, আমরা এই উইল প্ৰস্তুত করিলাম।” বড়ই কাঁদিতে লাগিলেন। তাঁহাকে অন্যমনস্ক করিবার নিমিত্ত বড়ালমহাশয়কে বিনয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “সে ডাক্তারকে কত টাকা দিতে হইয়াছিল?” বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন,- “অধিক নহে। রায়-গৃহিণী নিজে তাঁহাকে আড়াই শত টাকা দিয়াছিলেন। তাহার পর আমি তাঁহাকে আর আড়াই শত টাকা দিয়াছিলাম। খাতায় চিকিৎসা খরচ বলিয়া তাহা লেখা আছে।” পাপের পরিণাময় sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro Ao A তাহার পর সুবালার দিকে দৃষ্টি করিয়া বড়ালমহাশয় পুনরায় বলিলেন,- “সুবালা দিদি! বৃথা রোদন করিও না। তোমার দিদিমণির প্রাণরক্ষা করিতে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছিলাম। তাঁহার সেবা-শুশ্ৰষা সম্বন্ধেও কিছুমাত্র ক্রটি হয় নাই। সকলেই আমরা প্ৰাণপণে তাহার সেবা করিয়াছিলাম। কয়দিন তাঁহাকে বরফে রাখিতে হইয়াছিল সত্য, কিন্তু নিরুপায় হইয়া আমাদিগকে এ কাজ করিতে হইয়াছিল।” বিনয় বলিলেন,- “তাঁহাতে আর দোষ কি? বশিষ্ঠ মুনি মহারাজ দশরথের মৃতদেহকে কিরূপে রাখিয়াছিলেন, তাহা একবার স্মরণ করিয়া দেখ।” সুবালা একটু স্থির হইলে, বড়ালমহাশয় পুনরায় বলিলেন,- “এ সমুদয় কথা আমার বোধ হয় কিছুতেই প্ৰকাশ হইত না। ডাক্তারের উপদেশে সমুদয় কাৰ্য হইয়াছিল। তিনি প্ৰকাশ করবেন। না। ভয় কেবল ধনুকধারীকে। আমি বিলক্ষণ জানি যে, সে ভাল লোক নহে। কিন্তু ধনুকধারীও এ কাৰ্য্যে সম্পূর্ণ লিপ্ত ছিল। আদালতে দণ্ডের ভয়ে সেও বােধ হয় এ কথা প্ৰকাশ করিবে না। উকীল দুইজন কখনও রায়-গৃহিণীকে দর্শন করেন নাই। তাঁহারা কিছু বুঝিতে পারেন নাই। বাকী আমরা দুইজন। তোমরা যদি আমাদিগকে উৎপীড়িত না করিতে, তাহা হইলে আমরা কখনও এ সম্বন্ধে একটিও কথা মুখ দিয়া বাহির করিতাম না। সকল বিবরণ এক্ষণে শ্রবণ করিলে; কিন্তু তাঁহাতে তোমাদের কি লাভ হইল, তাহা আমি বুঝিতে পারি না। এক্ষণে আমার অনুরোধ এই যে, এ কথা আর কেহ যেন না জানিতে পারে। সুবালা দিদি সম্পত্তির অধিকারিণী হইয়াছেন। অগ্রহায়ণ মাস আসিলে তুমিও ইহার হইবে। সে সম্বন্ধেও রায়-গৃহিণী আমাকে বার বার সত্যে আবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। নিকট কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি যে, তােমরা দুইজনে সুখে-স্বচ্ছন্দে এই সম্পূঞ্জভোগ করতে থাক। বিনয়বাবু! এই উইলে তোমার সম্পূর্ণ স্বাৰ্থ রহিয়াছে। দেখিও, যেন আর অধিক প্ৰকাশ হয় না।” টাকা দিবার নিমিত্ত রায়মহাশয় করিয়াছিলেন। যে রাত্রিতে কালা-বাবার নাসিক ছেদন হয়, সেই রাত্রিতে রাজাবাবুও আমাকে এক হাজার টাকা দিবেন বলিয়াছিলেন। অন্ততঃ এক হাজার টাকা মূল্যের একখানি সোনার ইট দিতে তিনি প্রতিশ্রুত হইয়াছিলেন।” আশ্চৰ্য্য হইয়া কিছু উচ্চৈঃস্বরে বিনয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “সোনার ইট! সে আবার কি?” আর চুপি চুপি কথা না কহিয়া, বড়ালমহাশয়ও সহজ স্বরে উত্তর করিলেন,- “রাজাবাবু সকল বিষয়ে বুদ্ধিমান লোক ছিলেন। কিন্তু টাকা-কড়ি সম্বন্ধে তাঁহার ভাব অনেকটা সেকালের লোকের ন্যায় ছিল। একবার তাঁহার অনেকগুলি মূল্যবান নোট ও খানকয়েক কোম্পানীর কাগজ উইপোকায় নষ্ট করিয়াছিল। সেই অবধি তিনি নোট অথবা কোম্পানীর কাগজ ক্রিয় করিতেন না। লম্বা লম্বা ছোট সোনার ইট গড়াইয়া তিনি রাখিয়া দিতেন। চৌকোণা কাষ্ঠখণ্ড দেখিয়াছ? ইটগুলির আকৃতি ঠিক সেইরূপ ছিল। অথবা কাপড় কাচা বিলাতি সাবান—যাহাকে বার-সোপ বলে, ইটগুলি সেইরূপ ছিল; তবে তাহা অপেক্ষা অনেক ছোট ছিল। এইরূপ অনেক টাকার ইট তিনি প্ৰস্তুত করিয়াছিলেন। হাজার টাকার সেইরূপ একখানি ইট তিনি আমাকে দিবেন। বলিয়াছিলেন।” বিনয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “যখন এ বাটী পরিত্যাগ করিয়া তিনি বিদেশে গমন করিলেন, তখন সেই ইট তিনি সঙ্গে লইয়া গিয়াছিলেন?” ԳoԵr fi:Ilă zi, o ga se - www.amarboi conf** বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন,- “না, সে ইট এই বাড়ীতে কোন স্থানে লুক্কায়িত আছে। পূৰ্ব্বে বলিয়াছি যে, টাকা-কড়ি সম্বন্ধে তাঁহার ভাব অনেকটা সেকালের লোকের মত ছিল। বোধ হয়, কোন স্থানে সেই সমুদয় ইট তিনি পুঁতিয়া রাখিয়াছেন, অথবা কোনরূপ নূতন উপায় অবলম্বন করিয়া তিনি তাহা লুক্কায়িত রাখিয়াছেন। সুবালা দিদি রাগ করিও না। আমি ভাবিলাম যে, এ কথা যদি প্ৰকাশ করি, তাহা হইলে রায়মহাশয়ের আজ্ঞায় সকলে এ বাড়ী তন্ন তন্ন করিয়া অনুসন্ধান করিবে। একটি পয়সাও আমি পাইব না। সেজন্য আমি নিজেই চুপি চুপি অনুসন্ধানে প্ৰবৃত্ত হইলাম। মনে করিলাম যে, যদি পাই তাহা হইলে একখানি রাখিয়া বাকীগুলি দেয়াল ভাঙ্গিয়া দেখিয়াছি, বাগানে অনেক অনুসন্ধান করিয়াছি; ফলকথা খুঁজিতে আমি কিছু বাকী রাখি নাই, কিন্তু সেইটের আমি সন্ধান পাই নাই। যাহা হউক, এতদিন পরে এ কথা আজ আমি প্ৰকাশ করিলাম। এক্ষণে প্ৰকাশ্যভাবে পুনরায় অনুসন্ধান করিব।” অন্ধকার ঘর হইতে খোেনা স্বরে শব্দ আসিল, — “সে সোনার ইট আমার। রাজাবাবু আমাকে দিয়াছেন।” চমকিত হইয়া বড়ালমহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, — “ও কে?” একটু হাসিয়া বিনয় উত্তর করিলেন,- “খীদা ভুত।” ঘোরতর বিস্মিত ও ভীত হইয়া বড়ালমহাশয় বলিলেন,- “খাদা ভূত! দিনের বেলা খাদা ভূত!” বিনয় হাসিতে লাগিলেন। সুবালার মুখে হাসি দেখা দিল। বড়ালিনী ভয়ে কাপিতে লাগিলেন । ○ মাঝের দ্বার খুলিয়া বিনয় বললেন,—“ড্ৰািঞ্ছত। এই স্থানে এস।” খাদা ভূত আসিয়া সকলের সম্মুখে আিদ । বড়ালমহাশয় একদৃষ্টিতে তাহাকে দেখিতে লাগিলেন, সে-ও তাহার মুখের দিকে ঝুঁহিয়া রহিল। অবশেষে বড়ালমহাশয় জিজ্ঞাসা —“জীয়ন্ত মানুষ, না ভূত?” বিনয় উত্তর করিলেন,- “জীয়ন্ত মানুষ। কালা-বালা মনে নাই, ইনিই সেই কালা-বাবা।” বিনয়ের দিকে চাহিয়া বড়ালনী বলিলেন, — “বটে! আমি মনে করিয়াছিলাম, তুমি অতি ভাল মানুষ; মিছামিছি ভয় দেখাইতেছিলে!” বিনয় ঈষৎ হাস্য করিলেন । বড়ালমহাশয় খাদা ভুতকে বলিলেন,- “কি মনে করিয়া পুনরায় আসিয়াছ, বাপু? রাজাবাবুর সংসার ছারেখারে দিয়াছ। রায়মহাশয়ের সর্বনাশ করিয়াছ। আবার কি মনে করিয়া আসিয়াছ, বাপু?” খাদা ভুত উত্তর করিল,— “রাজাবাবু সম্বন্ধে আমাকে দোষী বলিলেও বলিতে পার; কিন্তু রায়মহাশয়ের আমি কি করিয়াছি? শুনিয়াছি যে, কে একজন রায়মহাশয় আসিয়া এই বিষয়ের অধিকারী হইয়াছিলেন। আরও শুনিয়াছি যে, কয়েক বৎসরের ভিতর তাঁহার পরিবারের অনেকগুলি লোক মারা গিয়াছে। কিন্তু তাঁহাতে আমার দোষ কি? যাহাদের কােল পূর্ণ হইয়াছিল, তাহারা মরিয়া গিয়াছে।” বড়ালমহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “শাকচুন্নি আনিয়া এ গ্রামে ছাড়িয়াছিলে কেন?” খাদা ভূত উত্তর করিল,— “শাকচুন্নি!! আমি শাকচুন্নি কোথায় পাইব?” বড়ালমহাশয় পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, —“গরীব চপলাকে তুমি খাইয়াছ কেন?”

                • দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ Roy বিস্মিত হইয়া খাদা ভূত উত্তর করিল,— “চপলা! কে?” বড়ালমহাশয় ভাবিলেন, সত্য বটে। এ যদি জীবিত মানুষ, ভূত নহে, তাহা হইলে চপলাকে ও কি করিয়া ভক্ষণ করিবে? সেজন্য সে প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়া তিনি অন্য কথা জিজ্ঞাসা করিলেন,- “তুমি এইমাত্র বলিলে যে, রাজাবাবু তোমকে সোনার ইটগুলি দিয়াছেন, রাজাবাবুর সহিত তোমার কোথায় সাক্ষাৎ হইয়াছিল?”

সহিত সাক্ষাৎ হইয়াছিল।” বড়ালমহাশয় বলিলেন, — “তাঁহার ভূতের সহিত সাক্ষাৎ হইয়াছিল। সে কিরূপ কথা?” খাদা ভুত উত্তর করিল,- “সে অনেক কথা। যদি শুনিতে ইচ্ছা করেন, তাহা হইলে গোড়া হইতে সকল বিবরণ আপনাদিগকে আমি প্ৰদান করি।” সপ্তম অধ্যায় খাদা ভূতের কাহিনী বলিলেন। উপবেশন করিয়া সে আপনার বৃত্তান্ত প বৰ্ণনা করিতে আরম্ভ করিল - খাদা ভূত বলিল,— “বড়ালমহাশয়! এ স্থানে প্রথম আমি আগমন করি, তাহা তুমি অবগত আছ। আমরা নানা দেশে আমরা ভ্ৰমণ করি । এই গ্রামের কিছু উপরে ডোঙ্গা উল্টাইয়া পড়িল তখন বান আসিয়াছিল। প্ৰবল স্রোতে ভাসাইয়া তোমাদের বাগানের নিম্নে আমাকে 'ফেলিয়া দিল। তখন আমার জ্ঞান ছিল না, কিন্তু আমি জীবিত ছিলাম। আমরা সন্ন্যাসী, দেবতাগণ দ্বারা রক্ষিত, সহজে আমাদের মৃত্যু হয় না। অরক্ষিতং তিষ্ঠতি দৈবরক্ষিতং সুরক্ষিতংদৈবহতং বিনশ্যতি।। জীবত্যনাথোহপি বনে বিসজ্জিতঃ, কৃতপ্রযত্নোহপি গৃহে বিনশ্যতি৷ অর্থাৎ দেবতা দ্বারা রক্ষিত হইলে নিঃসহায় লোকও রক্ষা পায়। দেবতা দ্বারা হত হইলে সুরক্ষিত লোকও বিনাশ পায়। বনে বিসজ্জিত অনাথও জীবিত থাকে, কিন্তু অনেক যত্ন সত্ত্বেও মানুষ গৃহে বিনষ্ট হয়। যাহা হউক, রাজাবাবুর গৃহে আমি বাস করিতে লাগিলাম। দেখিলাম যে, তাঁহার পত্নী জপতপরতা ধৰ্ম্মপরায়ণা স্ত্রীলোক। কিন্তু তাঁহার ভাগ্যে সদৃগুরু লাভ হয় নাই। সেজন্য আমি তাহাকে শিক্ষা দিতে লাগিলাম। ক্রমে যখন তাহার জ্ঞানের উদয় হইল, তখন শক্তিরূপে আমি তাহাকে বরণ করিলাম। কারণ শাস্ত্ৰে বলিয়াছে— শক্তিঃ শিবঃ শিবঃ শক্তিঃ শক্তি ব্ৰহ্মা জনাৰ্দনঃ। শক্তিরিদ্রো রবিঃ শক্তি শক্তিশ্চন্দ্ৰো গ্ৰহা ধ্রুবং। eyo দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com/f4ঙ্গাকনাথ রচনা সংগ্ৰহ কিন্তু রাজাবাবু তাহা বুঝিতে পারিলাম না। ইহাতে যে কত পুণ্য হয়, বড়ালমহাশয়, তুমিও তাহা বুঝিতে পার নাই। আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হইয়া রাজাবাবু আমাকে বাড়ী হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দিলেন। নদীকূলে শিব-মন্দিরে গিয়া আমি বাস করিতে লাগিলাম। ধৰ্ম্মশিক্ষার জন্য রাত্রিকালে প্রচ্ছন্নভাবে সোনা-বীে সে স্থানে গমন করিতেন। আমিও এ বাড়ীতে আসিতাম। রাজাবাবু তাহা জানিতে পারিলেন। এ দিকে ক্ৰমে আমার চক্ষুও প্রস্ফুটিত হইল। প্রস্ফুটিত জ্ঞানচক্ষু দ্বারা আমি দর্শন করিলাম যে, রাজাবাবু দেবীর ভক্ষ্য, তাঁহাকে বলি দেওয়া কৰ্ত্তব্য।” বড়ালমহাশয় বলিলেন,- “নরাধম! পাষণ্ড!” খাদা ভূত বলিল,— “আমি ভাবিলাম যে, এ গ্রামে রাজাবাবুর জ্ঞাতি-গোত্র কেহ নাই। বলিরূপে তাঁহাকে দেবীপদে অৰ্পণ করিলে সোনা-বীে সমুদয় সম্পত্তির অধিকারিণী হইবেন। তখন তাহার দ্বারা অনেক সৎকাৰ্য সাধিত হইবে। দেবীও এই বলিয়া লাভ করিয়া পরম সন্তুষ্ট হইবেন । কারণ, শাস্ত্ৰে উক্ত হইয়াছে— "ছাগে দত্তে ভবেদ্বাণী মেষে দত্তে কবির্ভবেৎ।। মহিষে ধন্যবৃদ্ধিঃ স্যানুগে মোক্ষফলং লভেৎ। পক্ষিন্দানে সমৃদ্ধিঃ স্যাপেগাধিকায়াং মহাফলং। নরে দত্তে মহদ্ধিঃ স্যাদষ্টসিদ্ধিরনুত্তমা৷” ছাগদানে বাগী, মেষদানে কবি, মহিষাদানে ধনসমৃদ্ধি সম্পন্ন, মৃগদানে মোক্ষ-ফল-ভোগী, পক্ষিদানে ধনবান, গোধিকাদানে মহাফল-ভোগী এবং কুরবাল প্রদানে মহাসমৃদ্ধি সম্পন্ন ও অষ্টসিদ্ধির অধিকারী হয়। (O) কিরূপ প্রকরণ অবলম্বন করিয়া তাহাকে বা ক্রুপ্তেপ্রদান করি? এক্ষণে সেই চিন্তা আমার মনে করিলাম। চমৎকার তীক্ষ্ণ, উজ্জ্বল ও ক্ষুদ্র একটি শূল নিৰ্ম্মাণ করাইলাম। সে শূলের সৌন্দৰ্য অবলোকন করিলে, বড়ালমহাশয়! তুমিও বোধ হয় তাহা গ্ৰহণ করিয়া স্বৰ্গে যাইতে বাসনা করিতে।” বড়ালমহাশয় বলিলেন,- “পাপিষ্ঠ!” খাদা ভূত বলিল,— “হা, আমিও ভাবিলাম যে, সকলের প্রকৃতি সমান নহে। চাকচিক্যশালী সুন্দর শূল দেখিয়া রাজাবাবু হয়ত মুগ্ধ হইবেন না। আপনি যেরূপ এখন বলিলেন, তিনিও হয়ত সেইরূপ শূলে যাইতে আপত্তি করিবেন। এ সজন্য প্রথম তাঁহাকে অজ্ঞান করিবার ব্যবস্থা করিলাম। সোনা-বীে আপত্তি করিলেন। রাজাবাবু মুক্ত হইবেন, সোনাবীে মুক্ত হইবেন, আমি মুক্ত হইব,-শাস্ত্রের বচন উদ্ধৃত করিয়া তাঁহাকে বুঝাইলাম। তাঁহাকে আরও বলিলাম যে, “শিবে রুদ্ষ্টে গুরুস্ত্ৰাতা, গুরেী রুদ্ষ্টে ন কশ্চন। অর্থাৎ শিব রুষ্ট হইলে গুরু রক্ষা করিতে পারেন , কিন্তু গুরু রুষ্ট হইলে কেহই রক্ষা করিতে পারে না । পুনশ্চ-“গুরোহিতং। প্ৰকৰ্ত্তব্যং বাজমনঃকায়কৰ্ম্মভিঃ। অর্থাৎ বাক্য, মন, শরীর ও কৰ্ম্ম দ্বারা গুরুর হিতসাধন করিবে। পূজার দিনস্থির হইল। রাত্রি দুই প্ৰহরের সময় নিঃশব্দে আমরা রাজাবাবুর শয়নাগারে অর্থাৎ ইহার পাশের ঘরে প্রবেশ করিলাম। ঔষধ প্ৰয়োগে তাঁহাকে অজ্ঞান করিলাম। যথাবিধি মন্ত্র পাঠ করিয়া শূলিনী দেবীর অৰ্চনা আরম্ভ করিলাম।--জ্বল জ্বল শূলিনী দুষ্টগ্ৰহ ই ফটু স্বাহা । শূলিনি দুর্গে ই ফটু স্বাহা। শূলিনি বরদে ত্ৰাসয় হুঁ ফটু স্বাহা। শূলিনী বিন্ধ্যবাসিনি ই ফট sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro R עןzard #if:3riת? স্বাহা। শূলিনী অসুরমর্দিােন যুদ্ধপ্রিয়ে ত্ৰাসয় ইফট স্বাহা। শূলিনি দেবসিদ্ধপ্ৰপূজিতে নন্দিনি রক্ষ রক্ষ মহাযোগেশ্বরি ইফট স্বাহা ইত্যাদি। কিন্তু সোন-বীেয়ের দোষে সমুদয় পরিশ্রম বিফল হইল । বীরু আসিয়া আমাকে ধরিয়া ফেলিল। তুমি দৌড়িয়া আসিলে। আমাকে তোমরা বাধিয়া ফেলিলে। রাজাবাবুকে সচেতন করিলে। তোমরা পশু, নিষ্ঠুর, ধৰ্ম্মাধৰ্ম্ম-জ্ঞানশূন্য। তোমরা বুঝিলে না যে, আমি সাক্ষাৎশিব। “শৃদ্ৰো বা যদি বান্যোহপি চণ্ডালোহপি জটাধৱঃ। দীক্ষিতঃ শিবমন্ত্রেণ, সি ভস্মাঙ্গী শিবো ভবেৎ৷” তোমরা আমার নাসিকা ছেদন করিলে । রক্তাক্ত কলেবারে আমি শিবমন্দিরে প্রত্যাগমন করিলাম। দেখিলাম যে, সে স্থানে সোনা-বীে গিয়া ভূমিতে শয়ন করিয়া রোদন করিতেছেন। তুমি, বড়ালমহাশয়, বলিয়া দিয়াছিলে যে,-এ গ্রামে পুনরায় আমাকে দেখিলে, অথবা আদালতে আমি কোনরূপ অভিযোগ উপস্থিত করিলে, তোমরা আমার প্রাণবধ করিবে। আমি বিদেশী, সহায়হীন, নিধন। তাহার পর সোনা-বীে তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে স্বীকৃতা হইলেন না। নিরুপায় হইয়া প্রাণভয়ে আমি পলায়ন করিলাম। সোনা-বীে আর কোথায় যাইবেন, তিনিও আমার সঙ্গে গমন করিলেন। প্রথম আমরা কাশী যাইলাম। সে স্থানে রাজাবাবু গিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহার ভয়ে কাশী হইতে বেরেলি নামক স্থানে আমরা পলায়ন করিলাম। সে স্থান হইতে আলমোড়া ও তাহারােধর টেহরি গমন করিলাম। নানা দেশ ভ্ৰমণ করিয়া অবশেষে আমরা জলন্দর নামক য়া উপস্থিত হইলাম। রাজাবাবু আর আমাদের সন্ধান পাইলেন না । 9. সোনা-বৌয়ের সহিত রাত্রিদিন আমার ভক্তি একেবারে লোপ হইল। চুকচি হইতে লাগিল। আমার প্রতি তাহার র ভৎসনায় জীবন আমার অসহ্য উঠিল। আমি শুনিলাম যে, কাঙ্গাড়া নামক স্থানে র চিকিৎসক আছে। রণজিৎ সিংহের রাজত্বকালে রাজদণ্ডে অনেকের নাসিকা কর্তিত । চিকিৎসকগণ ললাটের চৰ্ম্মখণ্ড লইয়া নূতন নাসিকা প্ৰস্তুত করিয়া দিত। নূতন নাসিকা লাভ কামনায় সোনা-বীেয়ের গহনাগুলি লইয়া একখানি এক্কা ভাড়া করিয়া কাঙ্গাড়া অভিমুখে আমি যাত্ৰা করিলাম। পথে এক্কাওয়ালা সমুদয় গহনাগুলি কাড়িয়া লইল ও গুরুতর প্রহারে মৃত্যুবৎ করিয়া এক নিৰ্জ্জন স্থানে আমাকে ফেলিয়া গেল। সংজ্ঞােলাভ করিয়া আমি গ্রামের ভিতর প্রবেশ করিলাম। ঘোর কৃষ্ণকায় নাসিকা-বিহীন ব্যক্তিকে দেখিয়া গ্রামের কুকুরগণ। আমাকে তাড়া করিল, বালকগণ ঢ়িল বর্ষণ করিতে লাগিল, গৃহস্থগণ দূর দূর করিয়া আমাকে তাড়াইয়া দিল। কেহই আমাকে ভিক্ষা প্ৰদান করিল না। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় জৰ্জরীভূত হইয়া আমি জ্বালামুখী গিয়া পৌছিলাম। সে স্থানে একদল সন্ন্যাসী আমার প্রতি কৃপা করিয়া আশ্রয় প্রদান করিলেন। তাঁহাদের সহিত আমি তীৰ্থপৰ্যটনে প্ৰবৃত্ত হইলাম । যয়োরেব সমং বিত্তং যয়োরেব সমং কুলম। তয়োর্মৈগ্ৰী বিবাহশ্চ ন তু পুষ্টবিপুষ্টয়োঃ৷ এইরূপে কিছুকাল কাটিয়া গেল। ভাদ্র মাস। রাত্রিকাল। দক্ষিণদেশে এক ধৰ্ম্মশালায় আমি শয়ন করিয়া আছি। সহসা আমার নিদ্ৰাভঙ্গ হইল। আমি উঠিয়া বসিলাম। সম্মুখে দেখিলাম যে, রাজাবাবু দণ্ডায়মান আছেন। আমি অতিশয় ভীত হইলাম। কিন্তু রাজাবাবু আমাকে আশ্বাস RSSR află cios (gs se - www.amarboicom** এইরূপে এক বৎসর কাটিয়া গেল। পুনরায় ভাদ্র মাস আসিলে। পুনরায় ঘোর নিশীথে রাজাবাবু আসিয়া আমার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন ও সোনার ইট লইবার জন্য আমাকে উত্তেজিত করিতে লাগিলেন। পুনরায় আমি ক্ষিপ্ত হইলাম। পুনরায় আমি লাফালাফি, ছুটাছুটি করিয়া ও বঙ্গদেশ-অভিমুখে অগ্রসর হইয়া রাত্রিযাপন করিতে লাগিলাম। দিনের বেলা সুস্থ হইয়া কোন স্থানে পড়িয়া থাকিতাম। সাত-আট দিন পরে পূৰ্ব্বরূপ সেই ভয়াবহ অনিবাৰ্য্য হুহুঙ্কার শব্দ আমার মুখ দিয়া নিৰ্গত হইল। তাহার পর পুনরায় আমি সহজ অবস্থা প্ৰাপ্ত হইলাম।” অষ্টম অধ্যায় খাদা ভূতের প্রার্থনা খাদা ভূত বলিতেছে,- “প্রতি বৎসর ভদ্র মাসে আমি এইরূপ ক্ষিপ্ত হইতে লাগিলাম। সেই সময় রাজাবাবুর উত্তেজনায় বঙ্গদেশের দিকে আসিতে লাগিলাম। ঠিক বলিতে পারি না, বোধহয়, সাত-আট বৎসর পরে ক্ষিপ্ত অবস্থায় এই গ্রামের য়া পৌছিলাম। এ স্থান হইতে দুই ক্রোশ দূরে এক পরিত্যক্ত পুরাতন নীলকুঠি আছে। এখন মানুষের যাতায়াত নাই। দিনের বেলা আমি সেই নীলকুঠিতে লুকাইয়াকূৰ্হিলাম। রাত্রিকালে সম্পূর্ণ উন্মত্ত অবস্থায় আমি এই গ্রামে প্রবেশ করিলাম। গাছে এবং ভোির্কর চালে বসিয়া এই গ্রাম সম্বন্ধে নানা সংবাদ সংগ্ৰহ করিলাম। লােকের কথােপকথন্তের্ভুঝিতে পারিলাম যে, রায়মহাশয় নামে কােন ব্যক্তি ঈহাঁর গৃহে বাস করিতেছেন। তাঁহার বাড়ীতে গিয়া সোনার ইট লাইতে রাজাবাবু ক্ৰমাগত আমাকে উত্তেজিত করিতেছিলেন। আমি তাঁহার বাটীর ভিতর প্রবেশ করিলাম। কিন্তু সে সোনার ইট কোথায় তিনি লুক্কায়িত রাখিয়াছেন, রাজাবাবু সেকথা আমাকে প্রকাশ করিয়া বলিলেন না। তিনি কেবল বলিতে ছিলেন,- “যাও, যাও, সোনার ইট লও।” বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিয়া এ-দিক ও-দিক ঘুরিয়াফিরিয়া কৰ্ত্তার শয়নাগারের সম্মুখে বারেণ্ডায় গিয়া দাড়াইলাম। কাচের জানালায় উকি মারিয়া তাঁহাকে দেখিলাম। মনে করিলাম,- ইনিই রায়মহাশয়। জাগরিত হইয়া তিনি আমাকে তাড়া করিলেন। আমি সত্ত্বর পলায়ন করিলাম। প্রথম বৎসর কয়দিন আমি এরূপে কাটাইলাম। দিনের বেলা নীলকুঠিতে থাকিতাম। ক্রমে গ্রামের কয়জনের সহিত আমার সাক্ষাৎ হইল। ‘ভূত! ভূত!’ বলিয়া তাহারা পলায়ন করিল। গ্রামের লোক আমার নাম খাদা ভূত রাখিল। কিন্তু এই খাদা ভূত যে সেই কালা-বাবা, তাহা কেহ জানিতে পারিল না।” বড়ালমহাশয় বলিলেন, — “সে বৎসর না হউক পরে আমি বুঝিয়াছিলাম যে, তুমিই খাদা छूऊ।” খাদা ভূত উত্তর করিল,— “নাসিক ছেদনের গোসাঞি তুমি, তুমি বুঝিতে পরিবে না কেন?” Ay8 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.confািলকানাথ রচনাসংগ্ৰহ গোপনে একটি খন্তা আনিয়া ঐ অন্ধকার ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলাম। দিয়া সলাইয়ের কাঠি জুলাইয়া দেখিলাম যে, ইহার সেই পুরাতন মেজে নাই, নূতন মেজে হইয়াছে। একবার ভাবিলাম যে, যে লোক মেজে খনন করিয়াছিল, লুক্কায়িত অর্থ হয় তো তাহার হস্তগত হইয়াছে। আবার ভাবিলাম যে, না-তাহা হইলে রাজাবাবু আমাকে সোনার ইট লইতে অনুরোধ করিতেন না। প্রাচীরের অনেকটা আমি খনন করিলাম। কিন্তু কিছুই পাইলাম না। কয় বৎসর এইরূপে কাটিয়া গেল।” বড়ালমহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, — “রায়মহাশয়ের ঘরে ঢ়িল ফেলিয়াছিলে কেন? জান যে, তাহাই তাঁহার মৃত্যুর কারণ হইয়াছিল!” খাদা ভূত উত্তর করিল,— “তাহা আমি জানি না। প্রতি বৎসর বাড়ীর ভিতর বারেণ্ডায় দাঁড়াইয়া ঘরে উকি মারা আমার অভ্যাস হইয়াছিল। সে বৎসর সে দিকের জানােলা তিনি বন্ধ রাখিয়াছিলেন। সে দিক দিয়া তাহাকে দেখিতে না পাইয়া আমি সেই ঘরের পার্শ্বে বাগানে গিয়া দাঁড়াইলাম। সে দিকের জানােলা উন্মুক্ত ছিল। সেই দিক দিয়া তাহার ঘরে দুই তিনটি ঢ়িল নিক্ষেপ করিলাম। কেন চিল ফেলিলাম, তাহা আমি জানি না। তখন আমার ক্ষিপ্ত অবস্থা। উন্মাদ দ্বারা অনুষ্ঠিত সকল কাৰ্য্যের কারণ থাকে না। তোমরা বলিবে যে, যখন সে সময়ের সমস্ত ঘটনা তোমার স্মরণ রহিয়াছে, তখন তুমি উন্মাদ কি করিয়া? সত্য বটে! সে বিষয়ে চিন্তা করিয়া আমিও আশ্চৰ্য্যান্বিত হই। ক্ষিপ্ত দশায় আমার জ্ঞান থাকে; কিন্তু মনের উপরে, শরীরের উপরে, কাৰ্য্যের উপরে আমার কিছুমাত্ৰ প্ৰভুত্ব থাকে না। আমি মনে করি যে, কেন আমি বৃক্ষে আরোহণ করি, কেন আমি লম্বফঝম্বফ করি, রু দণ্ড দিতেছেন, কেন আমি তাহার কথা শুনিয়া তাহার বাটীতে গমন করি, কেন করি, কেন আমি আমার কণ্ঠ হইতে ভয়াবহ হুহুঙ্কার শব্দ নিঃসারিত হইতে দিই। মনে মনে এইরূপ বিচার করিয়াও আমি আপনাকে ঠিক রাখিতে পারি না। কে করে ।” বিনয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “গত পাঁচ-ছয় বৎসর কোথায় ছিলে?” খাদা ভূত উত্তর করিল,— “শেষ বৎসর এ স্থান হইতে গিয়া একদিন ক্ষুধায় বড়ই পীড়িত হইয়াছিলাম। “বুভুক্ষিতঃ কিং ন করোপিত পাপং, ক্ষীণা জনা নিষ্করুণা ভবান্তি।” ক্ষুধাৰ্ত্ত লোক না করিতে পারে এমন কাজ নাই। কোন এক গ্রামের নির্জন পথে নানা অলঙ্কারে বিভূষিত এক বণিকপুত্ৰকে দেখিয়া তাহার গহনা কড়িয়া লইতে চেষ্টা করিয়াছিলাম। গ্রামের লোকে আমাকে ধরিয়া ফেলিল। চৌৰ্য্য ও নরহত্য-চেষ্টার অপরাধে অভিযুক্ত হইয়া আমার পাঁচ বৎসর কারাবাসের দণ্ড হইল। যখন ভদ্র মাস আসিল, তখন কারাবাসের কর্তৃপক্ষগণ জানিতে পারিল যে, আমি ক্ষিপ্ত। তাহারা আমাকে পাগলা-গারদে প্রেরণ করিল। সে স্থানে লোকে একবার, দিন কয়েকের জন্য আমি ক্ষিপ্ত হই ও সে সময় কাহারও কোনরূপ অনিষ্ট করি না । যে কারণেই হউক, পাঁচ বৎসর পরে আমাকে মুক্ত করিয়া দিল। তাহারা আমার জটা কাটিয়া দিয়াছিল।” বড়ালমহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “এখন কি তোমার ক্ষিপ্ত অবস্থা?” খাদা ভূত উত্তর করিল,—“না, এখন আমার সহজ অবস্থা। কিন্তু ক্ষিপ্ত-কাল আগতগ্ৰায়।” বড়ালমহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “এখন তবে কি জন্য আসিয়াছ?” খাদা ভূত উত্তর করিল,- “কারাগারে ও পাগলা-গারদে বাসের সময় যখন ক্ষিপ্ত হইতাম, ANVI দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.com/f46লাক্যনাথ রচনাসংগ্ৰহ তখন রাজাবাবু সৰ্ব্বদাই আমার নিকট আসিতেন। দক্ষিণা গ্রহণের নিমিত্ত এই বাড়ীতে আসিতে ক্রমাগত তিনি আমাকে বলিতেন। গুপ্তস্থান নির্দেশ করিয়া দিবার নিমিত্ত তিনি অঙ্গীকার করিয়াছেন। কিন্তু বার বার বিফলমনোরথ হইয়া আমি হতাশ হইয়া পড়িয়াছি। আমি ভাবিলাম যে, রাজাবাবু স্থান দেখাইয়া দিলেও গৃহস্বামীর সহায়তা ব্যতীত আমি কিছুতেই এ অর্থ লাভ করিতে পারিব না। সেজন্য আমি স্থির করিলাম যে, এবার সুস্থ অবস্থায় গিয়া তাহাকে সকল কথা প্ৰকাশ করিয়া বলিব। রাজাবাবু সমস্ত ধন আমাকে দিয়াছেন সত্য কিন্তু আমি ভাবিলাম যে, বৰ্ত্তমান গৃহস্বামী তাহা আমাকে দিবেন না। সমুদয় অর্থ না হউক, অন্ততঃ তাহার কিয়দংশ তিনি আমাকে প্ৰদান করিবেন, তাহা লইয়া হিমালয় পৰ্ব্বতের কোন নিৰ্জ্জন প্রদেশে অবস্থান করিয়া আমি অবশিষ্ট জীবন তপস্যায় অতিবাহিত করিব। এই মানসে- ” বড়ালমহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, — “তবে তোমার নাকের জন্য এ স্থানে তুমি আগমন কর নাই?” দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া খাদা ভূত জিজ্ঞাসা করিল,- “কোথায়? কোথায়? কোথায়?” কৰ্ত্তিত নাসিকার জন্য তাহের মনের আবেগ ও কাতরভাব দেখিয়া সকলে বিস্মিত হইলেন । খাদা ভূত খেদ করিয়া বলিতে লাগিল,— “হায়, আমার নাক! ক্ষিপ্ত অবস্থায় নাকের শোকে আমার হৃদয় যে কিরূপ সন্তপ্ত হয়, তাহা আর তােমাদিগকে কি বলিব! গঙ্গামূত্তিকা দিয়া লোকে যেরূপ শিবলিঙ্গ গড়িয়া পূজা করে ও তাহার পর জলে নিক্ষেপ করে, আমিও সেইরূপ নদীকূলে বসিয়া বার বার স্মৃত্তিকা দ্বারা নাসিকা নিৰ্মাণ কৰুি, পরিধান করিয়া জলে তাহা নিক্ষেপ করি। কোথায় আমার নাকি? সে কৰ্ত্তিত খেলিত শুষ্ক নাসিকা পাইলেও আমি অনেকটা শান্তিলাভ করি ।” তাহার ভাবভঙ্গী দেখিয়া সকলে ভ যে, খাদা ভূতের এইবার বুঝি ক্ষিপ্তদশা উপস্থিত হইল । সেজন্য অন্যপ্ৰসঙ্গ উত্থাপিতৃৎক্ষরিয়া বড়ালমহাশয় নাকের কথা চাপা দিতে চেষ্টা করিলেন । বড়ালমহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, “সোনার ইট সম্বন্ধে এক্ষণে তোমার মানস কি? খাদা ভূত উত্তর করিল,- “এখন ভাদ্র মাসের শেষ ভাগ। এবার নিশ্চয় ক্ষিপ্ত হইব। রাজাবাবু সেই সময় আমার সহিত সাক্ষাৎ করবেন ও কোন স্থানে সোনার ইট লুক্কায়িত আছে, তাহা তিনি আমাকে দেখাইয়া দিবেন। তোমাদের সহায়তায় আমি তাহা বাহির করিব। তাহার কিয়দংশ তোমরা আমাকে প্ৰদান করিবে। তাহা লইয়া আমি প্ৰস্থান করিব। আর কখনও এ গ্রামে আসিব না। আমার আর একটি নিবেদন এই যে, গ্রামবাসীদিগের সহিত আমি সাক্ষাৎ করিতে ইচ্ছা করি না। কালা-বাবা বলিয়া একদিন তাহারা আমাকে পূজা করিত। পূজনীয় সেই কালা-বাবা নাসিকা-বিহীন খাদা ভূত হইয়া আমাদিগকে উৎপীড়িত করিয়াছিল, তাহা জানিতে পারিলে সকলে আমাকে অতিশয় ঘূণা করিবে। আমার প্রার্থনা এই যে, ভদ্র মাসের অবশিষ্ট কয়টা দিন আমাকে তোমরা এ অন্ধকার ঘরে লুক্কায়িত থাকিবার নিমিত্ত অনুমতি প্ৰদান কর। লুক্কায়িত ধন বাহির হইলে, ক্ষিপ্ত অবস্থা গত হইলে, আমি এ স্থান হইতে চলিয়া যাইব ।” সুবালা ও বিনয়কে সঙ্গে লইয়া বড়ালমহাশয় বারেণ্ডায় গমন করিলেন। সে স্থানে চুপি চুপি তাহারা পরামর্শ করিতে লাগিলেন। বড়ালমহাশয় বলিলেন, — “রাজাবাবুর পিতা ও তিনি নিজে অনেক অর্থ সঞ্চয় করিয়াছিলেন। সেই ধন এই বাড়ীতে কোন স্থানে লুক্কায়িত আছে। পাপের পরিণাম sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro aya আমার সমুদয় অনুসন্ধান বৃথা হইয়াছে। এই অর্থ পাইলে অনেক উপকার হইবে। নদীকূলে বঁধে বাধিয়া দিলে বানে আর গ্রামের লোকের অনিষ্ট হইবে না। অতএব খাদা ভূতের প্রস্তাবে আমাদের সম্মত হওয়া উচিত।” বিনয়ও সেইরূপ মত প্ৰকাশ করিলেন। সুবালা চুপ করিয়া রহিলেন । সকলে পুনরায় ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলেন। খাদা ভুতকে সম্বোধন করিয়া বড়ালমহাশয় বলিলেন,- “এ কয়দিন তোমাকে আমরা ঐ চোর-কুঠরিতে বাস করিতে দিব। কিন্তু ঘরের দুই দ্বারে তালা দিয়া আমি বন্ধ করিয়া রাখিব। কেবল সন্ধ্যার পর একবার তোমাকে আমি ছাড়িয়া দিব। ক্ষিপ্ত অবস্থায় যদি তুমি অধিক উপদ্রব কর তাহা হইলে তোমাকে আমি বঁধিয়া রাখিব। যদি গুপ্তধন তুমি বাহির করিয়া দিতে পাের, তাহা হইলে তাহার এক অংশ তোমাকে আমরা প্ৰদান করিব।” খাদা ভূত উত্তর করিল,- “আমারও সেইরূপ ইচ্ছা। ক্ষিপ্ত হইয়া যদি আমি পূৰ্ব্বরূপ দৌড়াদৌড়ি করি, তাহা হইলে সকলেই জানিতে পরিবে। অতএব সেই সময় আমাকে বাধিয়া রাখাই উচিত। যে সময় রাজাবাবু আসিয়া লুক্কায়িত ধন আমাকে দেখাইয়া দিবেন, সেই সময় যেরূপ কৰ্ত্তব্য, তাহা তোমরা করিবে।” বড়ালমহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “আর একটি কথা আমি জিজ্ঞাসা করি। এ বাটীর সদর ও খিড়কি দ্বার বন্ধ থাকিত। কিরূপে তুমি বাটীর ভিতরে প্রবেশ করিতে, কিরূপেই বা তুমি বাহির হইয়া পলায়ন করিতে।” খাদা ভূত উত্তর করিল,- “তুমি কি তাহা ? এই ঘরের নিম্নে যে ঘর,-যাহার ভিতর তোমাদের কাঠ, যুঁটে, পাতা প্রভৃতি থার্ক্সেষ্ট সেই ঘরের পূৰ্ব্বধারে বাগানের দিকে কাষ্ঠনিৰ্ম্মিত গৱাদ-সম্বলিত দুইটি জানালুক্কুছি। একটি জানালীর দুইটি কাঠের গুরাদ অনায়াসে খুলিতে ও পুনরায় যথাস্থানে স্থািখশিত করিতে পারা যায়। আমি সেই পথ দিয়া এই বাটীর ভিতর প্রবেশ করিতাম তুণ্ডই পথ দিয়া বহির্গত হইতাম। কল্য রাত্রিতেও সেই পথ দিয়া এই বাটীর ভিতর আসিয়াছিলাম। তাহার পর সামান্য একটি লৌহশালাকার সহায়তায় ঐ অন্ধকার ঘরের তালা খুলিয়াছিলাম। আমি ভাবিয়াছিলাম যে, এই গমনাগমনের পথ বড়ালমহাশয় তুমি অবগত আছ। কারণ, একদিন রাত্রিকালে সেই ঘরের পার্শ্বে ঠিক জানালার নিকট বাগানের ভিতর তুমি বসিয়াছিলে। সে স্থানে একাকী বসিয়া তুমি কি করিতেছিলে। জানালা-পথে বাটীর ভিতর প্রবেশ করিব, এই মানসে আমি আসিয়াছিলাম। কিন্তু তখনও রাত্রি অধিক হয় নাই, সেজন্য ইতস্ততঃ করিতেছিলাম। জানালার নিকট আসিয়া দেখিলাম যে, কে একটা লোক সেই স্থানে বসিয়া একবার এদিকে, একবােরর সেদিকে হাত নাড়িতেছে। আমার ভয় হইল। অন্ধকার রাত্রি। প্রথম তোমাকে আমি চিনিতে পারি নাই। মনে করিলাম, এ একটা ভূত, কি পাগল! তাহার পর দেখিলাম যে, তুমি। সেই মুহুৰ্ত্তে তােমার দৃষ্টিও আমার উপর পড়িল। তুমি ভয়ে দ্রুতপদে পলায়ন করিলে। আমিও সে রাত্রি এ বাটীতে প্রবেশ করিতে সাহস করিলাম না। আমি পলায়ন করিতে উদ্যত হইলাম। বাগানের অতি অল্পদূর অগ্রসর হইয়াছি, এমন সময় আমার সম্মুখ দিকে কে একজন মা গো!’ বলিয়া চীৎকার করিল। সেই মুহুৰ্ত্তে আমার পশ্চাদিকে, ঠিক যে স্থানে তুমি বসিয়াছিলে, সেই স্থানে আর একজন কে মা গো!’ বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। আমার বড় ভয় হইল। বাগানের ভিতর এক বৃক্ষে আরোহণ করিয়া আমি লুক্কায়িত রহিলাম। কিছুক্ষণ পরে আমার হুহুঙ্কার আসিয়া গেল। তাহার পর আমি সুস্থ বোধ করিলাম। এ গ্রাম হইতে পলায়ন করিলাম। সে স্থানে বসিয়া তুমি কি Str fi:Ilă zi, o ga se - www.amarboicom** করিতেছিলে?” বড়ালমহাশয় সে প্রশ্নের কোন উত্তর প্রদান করিলেন না। একটু চিন্তা করিয়া কেবল বলিলেন, — “বটে।” অন্ধকার ঘরে গোপনভাবে খাদা ভূতের বাসের জন্য যথাপ্রয়োজন দ্রব্যাদির তিনি আয়োজন করিয়া দিলেন। খাদা ভূত অন্ধকার ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল। বড়ালমহাশয় দুই দ্বারে তালা বন্ধ করিয়া দিলেন। তাহার পর সকলে স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন। প্রস্থান করিবার পূৰ্ব্বে য় বিনয় ও সুবালাকে চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করিলেন,- “শাকচুনির হাড় কখনও দেখিয়াছ?” বিনয় হাসিয়া উত্তর করলেন, —“শীকচুন্নির হাড়। সে আবার কি?” বড়ালমহাশয় বলিলেন,- “আজ নয়। কাল প্ৰাতঃকালে সকল কথা বলিব। বোধ হয় শাকচুনির হাড়ও দেখাইতে পারিব।” নবম অধ্যায় ভারতের বুশিডো (Bushido) সন্ধ্যা হইতে তখনও বিলম্ব ছিল। ফুলগাছগুলি দ্বিনিমন্ত সুবালা তাড়াতাড়ি বাগানে গমন করিলেন। দূরে পুষ্করিণীর ঘাটে দাঁড়ায়ু, গলী পালিত মৎস্যদিগকে আহার প্রদান করিতেছিল। তাহাকে দেখিয়া চপলার কর্কুটুম্বালার মনে পড়িল। বৃক্ষের শুষ্ক কষ্ঠের উপর তিনি বসিয়া পড়িলেন। সে স্থানে বৃষ্ট্রিী। তিনি ভাবিতে লাগিলেন,- “উইলের প্রকৃত তত্ত্ব এখন অবগত হইলাম। খাদা ভূত যে’ভূত নহে-মানুষ, তাহাও এখন বুঝিলাম। কিন্তু চপলা, কোথায় গেল?” ধীরে ধীরে বিনয় সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। কাষ্ঠের অপর পার্শ্বে তিনিও উপবেশন করিলেন। বিনয় বলিলেন, — “চিন্তার বিষয় বটে! আশ্চৰ্য্য কথা আজ আমরা শুনিলাম। এরূপ ঘটনা উপন্যাস-পুস্তকেই কল্পিত হয়। গৃহস্থের সংসারে এইরূপ ঘটনা সত্য সত্য প্ৰায় ঘটে না ।” সুবালা বলিলেন,- “চপলার কথা আমি ভাবিতেছি। চপলা কোথায় গেল? যে রাত্রিতে চপলা অন্তৰ্হিত হয়, সে রাত্রির সেই মা গো” চীৎকার খাদা ভুতও শুনিয়াছিল।” বিনয় বলিলেন— “যথাকলে এ সমস্যারও বোধ হয় মীমাংসা হইবে। কিন্তু এখন তোমাকে জিজ্ঞাসা করি এ সম্পত্তি সম্বন্ধে তোমার অভিপ্ৰায় কি?” সুবালা উত্তর করিলেন,- “বিজয়বাবুকে কল্য আমি পত্র লিখিব। দাদামহাশয়ের বাক্সর ভিতর একখানা কাগজে তাঁহার ঠিকানা ছিল, তাহা আমি পাইয়াছি।” সুবালা উত্তর করিলেন,- “তাঁহাকে লিখিব যে, এ বিষয় আমার নহে, এ বিষয় আপনার । আপনি আপনার সম্পত্তি বুঝিয়া লউন।” বিনয় বলিলেন, “এত গোলমালো আবশ্যক কি? বড়ালমহাশয় সত্য বলিয়াছেন যে, উইল 1775 Pięcia sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro RSS সম্বন্ধে এ প্রতারণা কেহ জানিতে পরিবে না। তুমি কেন প্ৰকাশ করিবে?” সুবালা উত্তর করিলেন, — “আমি বুঝিয়াছি, কেন তুমি আমাকে এরূপ পরামর্শ দিতেছ। হায়রে টাকা! উন্নতচিত্ত লোকেরাও ইহার জন্য বিপথগামী হয়!” একটু হাসিয়া বিনয় পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “নগদ টাকা ও কোম্পানীর কাগজ কি করিবে?” সুবালা উত্তর করিলেন,- “কড়ায়-গণ্ডায় তাহাকে বুঝাইয়া দিব।” বিনয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “তুমি পথের ভিখারিণী হইবে?” সুবালা উত্তর করিলেন,- “হাঁ।” বিনয় বলিলেন,- “দরিদ্রের কোন স্থানে সম্মান নাই। তোমাকে সকলে অশ্রদ্ধা করিবে।” সুবালা বলিলেন, — “তাহা আমি জানি। ধনীর মাথায় ধরা ছাতি, নির্ধনের মাথায় মারো লাথি, পৃথিবীর নিয়মই এই। তা বলিয়া পরের দ্রব্য আমি অপহরণ করিতে পারি না। কেহ। আমাকে কিছু প্ৰদান করুক,—এরূপ কামনাও কখন আমি করি না। নীচপ্রবৃত্তিবিশিষ্ট লোকেরাই ইচ্ছা করে যে, অমুক আমাকে কিছু প্ৰদান করুক। আমার পিতা গরীব ছিলেন। কিন্তু তিনি অসত্যবাদী, প্রতারক, ভিক্ষুক অথবা চোর ছিলেন না। নিতান্ত আত্মীয় লোকও তাহাকে কিছু দিলে তিনি বিরক্ত হইতেন। মা বলিতেন যে, “যাহারা অন্য লোকের নিকট হইতে কিছু পাইব,-এরূপ প্রত্যাশা করে, ভগবান চিরকাল তাহাদিগকে পরপ্রত্যাশী করিয়া রাখেন।’ আমি তাহদের কন্যা।” পুনরায় ঈষৎ হাসিয়া বিনয় বললেন—“আজকন্তর্জাির্ক খরচ না করিলে কন্যার বিবাহ হয় না । তোমাকে যদি কেহ বিবাহ না করে?” 9 সুবালার মুখ রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল। অন্তৰ্ভুবনত গােড়া ঘন ঘন খুঁড়তে লাগিলেন। কিছুক্ষণুগুল্পী এই প্ৰথম ঝগড়া হইল । বিনয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “তোমার ভরণ-পোষণ কিরূপে হইবে?” সুবালা উত্তর করিলেন, — “পিসীমাকে আমার কােকা মহাশয় চিরকাল প্ৰতিপালন করিয়াছেন। একমুষ্টি ভাত আমাকেও তিনি দিবেন। তাঁহার বাড়ীতে না হয় আমি দাসী হইয়া থাকিব ।” কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থাকিয়া বিনয় বলিলেন, — “রাগিলে মানুষকে যে এত সুন্দর দেখায়, তাহা আমি জানিতাম না। রক্তবর্ণ কাগজ-নিৰ্ম্মিত চীনদেশীয় লণ্ঠনের ভিতর হইতে যেরূপ আলোক নিৰ্গত হয়, তোমার কোপাবিষ্ট মুখমণ্ডল হইতে সৌন্দৰ্য্যের জ্যোতি সেইরূপ বাহির হইতেছিল। সত্যপথ হইতে বিচলিত করিবার বাসনায় তোমাকে আমি এত কথা বলি নাই। চপলার সমস্যা ব্যতীত এই সমুদয় অদ্ভুত ঘটনার ভিতর আরও একটি রহস্য আছে। তাহাও একদিন প্রকাশিত হইবে। যখন তাহা প্ৰকাশিত হইবে, তখন তুমি বুঝিতে পরিবে যে, তোমার এই সামান্য সম্পত্তি একদিন আমি লাভ করিব, সে লোভ আমি কখন করি নাই। তাঁহাদের আমি একমাত্র পুত্ৰ। তোমার সম্পত্তির আকাজক্ষা তাঁহারা করেন না। তোমার তুলনায় পৃথিবীর যাবতীয় ধনরত্নকে আমি কাষ্ঠ লোষ্ট্রের ন্যায় জ্ঞান করি । তোমার নিকট, সুবালা, আমার এই মিনতি যে, তুমি আমাকে নরাধম জ্ঞান করিও না।” दनिनन-"जाभि दिवाश्ॉनल्ड प्रश्ना র ঝগড়া হইয়াছিল। বড় হইয়া দুইজনে আজ ԳՀo দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comাির্ড”******** পূৰ্ব্বাপেক্ষা একটু ধীরে ধীরে সুবালা এখন মৃত্তিকা খনন করিতে লাগিলেন। বাষ্পজলে তাহার চক্ষু দুইটি পরিপূরিত হইল। কতক মূছিয়া ফেলিলেন, কতক গোপন করিলেন, কতক নিবারণ করিলেন। কিছুক্ষণ পরে সজল নয়নে প্ৰফুল্ল বদনে বিনয়ের দিকে একবার চাহিয়া পুনরায় তিনি মস্তক অবনত করিলেন। সুবালা বলিলেন, — “টাকা থাকিলে অনেকের উপকার করিতে পারা যায়, সেজন্য টাকাকে আমি তুচ্ছ জ্ঞান করি না। কিন্তু টাকায় সুখ হয় না। দাদামহাশয় ও দিদিমণির অর্থ ছিল। কিন্তু অর্থবলে তাহারা শরীরের স্বচ্ছন্দতা অথবা মনের শান্তি লাভ করিতে পারেন নাই। নিদারুণ শোকে তাহারা সন্তপ্ত হইয়াছিলেন। প্রিয়জনের প্রাণবিয়োগজনিত শোক হইতে মানুষ নিস্কৃতি পায়,- তাহার কি কোন উপায় নাই?” বিনয় উত্তর করিলেন,- “আজ তুমি খাদা ভূতকে বলিয়াছিলে যে, ‘সকল দুঃখের মূল পাপ। পূৰ্ব্বকৃত পাপের ফলে মানুষ শোক-তাপে সন্তাপিত হয়। পূৰ্ব্বসঞ্চিত পাপ যদি অতি গুরুতর হয়, তাহা হইলে তাহার হাত হইতে নিভৃতি লাভ করা বড়ই কঠিন কথা।” কিন্তু ঔষধের সহায়তায় মানুষ যেরূপ অনেক সময়ে বিষপান করিয়া পরিত্রাণ পায়, সেইরূপ সৎকৰ্ম্মের অনুষ্ঠানে মানুষ অনেক সময়ে পূৰ্ব্বসঞ্চিত পাপ হইতে মুক্তিলাভ করে, অকালমৃত্যুজনিত শোক হইতে তাহারা নিষ্কৃতি পায়।” বিনয় উত্তর করিলেন,- “আমি বীর, এই কথা খাদা ভূত আজ গৰ্ব্ব করিতেছিল। কিন্তু আমিও বীর দেখিয়াছি। তাঁহাদের সহিতও O র সহিত আকাশ-পাতাল পার্থক্য । সেই বীরদিগের মধ্যে এক মহাত্মা কৃপা করিয়া আত্মকে অনেক উপদেশ দিয়াছেন। পূৰ্ব্বসঞ্চিত পাপ যদি নিতান্ত গুরুতর হয়, তাহা হইলে তেঁস্বতন্ত্র কথা। কিন্তু তিনি আমাকে বলিয়াছিলেন ক্ট>পানি না, তাঁহাদের কখন অন্ন-বন্ত্রের কষ্ট হয় না।” ৗসী যাহাতে দৃঢ়ীভূত হয়, সেজন্য ভূয়ােভয়ঃ প্রত্যক্ষ ኟት |SK|| সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন, — “এই বীরধৰ্ম্ম কি আমাদের স্বধৰ্ম্ম?” বিনয় উত্তর করিলেন,— “চরাচর জগতে গুরু শ্ৰীশ্ৰীমহাদেব কর্তৃক ইহা প্ৰবৰ্ত্তিত হইয়াছে। ইহার অপর নাম কুলাচার। এই ধৰ্ম্মে দীক্ষিত লোকদিগকে কুলাচারী, কৌলিক, কৌল বা বীর বলে। ইহার ধৰ্ম্মশাস্ত্ৰসমূহকে আগম বা তন্ত্র বলে। ভগবতী কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হইয়া মহাদেব যে সমুদয় উপদেশ প্ৰদান করিয়াছেন, তাহাকেই আগম বা তন্ত্র শাস্ত্ৰ বলে। ইহা দুই প্রকার। মহাভারতের সময় অসংখ্য দানব মুনষ্য আকারে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়াছিল। তাঁহাদের বংশ এখনও পৃথিবীতে বৰ্ত্তমান আছে! মনুষ্যশরীরধারী দানবদিগকে ধ্বংস করিবার নিমিত্ত, মহাদেব পূৰ্ব্বকালে অনেকগুলি তন্ত্র প্রচার করিয়াছিলেন। শেষে দেবপ্রকৃতিবিশিষ্ট মানবদিগের হিতার্থে সকল শাস্ত্রের সার সংগ্ৰহ করিয়া তিনি নূতন একটি তন্ত্র প্রচার করেন। আমি তোমাকে এই শেষোক্ত তন্ত্রের কথাই বলিতেছি। ইহার উপদেশ অনুসারে যাহারা জীবনযাত্ৰা নিৰ্ব্বাহ করেন, তাঁহারাই প্রকৃত বীর। তাঁহারাই দারিদ্র্যদুঃখ ও অকালমৃত্যুজনিত শোক হইতে নিস্কৃতি লাভ করেন। ইহার মতে যাহারা কাৰ্য না করে, মহাদেব তাহাদিগকে পশু নামে অভিহিত করিয়াছেন। শেষোক্ত এই মন্ত্ৰই এখন একমাত্র আগম শাস্ত্ৰ। ইহা দ্বারা পূৰ্ব্বকথিত সমুদয় ধৰ্ম্মশাস্ত্ৰ নিম্প্রয়োজনীয় হইয়াছে। ইহা বিনা মানুষের আর অন্য উপায় নাই।

      • firls six g3 881 - www.amarboicom a ԳՀS শ্ৰীশ্ৰীসদাশিব নিজে বলিয়াছেন—

সত্যং সত্যং পুনঃ সত্যং সত্যং সত্যং ময়োচ্যতে। বিনা হ্যাগমমার্গেণা কলীে নান্তি গতিঃ প্রিয়ে৷ হে প্ৰিয়ে! আমি সত্য সত্য পুনঃ সত্য বলিতেছি যে, কলিকালে আগমোক্ত পথ ব্যতিরেকে গতি নাই। শিবের বাক্য শুনিলে শরীর রোমাঞ্চিত হয়। সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন,- “এ ধৰ্ম্মের বিশেষ উপদেশ কি?” বিনয় উত্তর করিলেন, — “পরব্রহ্মে ভক্তি ও পরোপকার তো বটেই, কিন্তু তাহা ব্যতীত ইহার ভিত্তি সত্যের উপর সংস্থাপিত। সত্য হইতে কেহ যেন কখন বিচলিত না হয়, সে সম্বন্ধে মহাদেব বার বার সকলকে সাবধান করিয়াছেন। একস্থানে তিনি বলিয়াছেন— প্রকটেহত্র কলীে দেবী সৰ্ব্বে ধৰ্ম্মশ্চ দুৰ্ব্বলঃ। স্থাসৰ্বত্যেকং সত্যমাত্ৰং তস্মাৎ সত্যময়ো ভবেৎ৷ সত্যধৰ্ম্মং সমাশ্রিত্য যৎ কৰ্ম্ম কুরুতে নরঃ। তদেব সফলং কৰ্ম্ম সত্যং জানীহি সুব্ৰতে৷ ন হি সত্যং পরো ধৰ্ম্মে ন পাপমন্বিত্যাৎ পরম। ९नश्॥ि হে দেবী ! কলি প্ৰবল হইলে সকল দুৰ্ব্বল হইবে। কেবল একমাত্র সত্যই থাকিবে; অতএব সত্যময় হওয়া সকলেরই সত্যধৰ্ম্ম আশ্রয় করিয়া মানুষ যে কাজ করিবে, হে সুব্ৰত্যে! নিশ্চয় জানিও, সে কাজ হইবে । সত্য অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্ম নাই, মিথ্যা অপেক্ষা জঘন্য পাপ নাই। সেজন্য সকল অবস্থাতেই একমাত্র সত্যকে অবলম্বন করা মানুষের কৰ্ত্তব্য। সত্যহীন পূজা বৃথা, সত্যহীন জপ বৃথা। যেরূপ ঊষর ভূমিতে বীজ বপন করিলে বৃথা হয়,সেইরূপ সত্যহীন তপস্যাও বৃথা হয়। সত্যরূপই পরম ব্ৰহ্ম, সত্যই পরম তপস্যা। সকল ক্রিয়ার মূল সত্য; সত্য অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কিছুই নাই।” সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন,- “জাপানীরা নানা দেশে গিয়া বিদ্যা ও জ্ঞান উপাৰ্জ্জন করিয়া স্বজাতির উন্নতিসাধন করিয়াছে। বীরধৰ্ম্মে সে সম্বন্ধে কোনরূপ উপদেশ আছে?” বিনয় উত্তর করিলেন,- “সদাশিব আদেশ করিয়াছেন— “বিত্তার্থ মানবো দেশানখিলান গন্তুমৰ্হতি । নিষিদ্ধকৌলিকাচাৱং দেশাং শাস্ত্ৰমপি ত্যজেৎ৷ পচ্ছংস্তু স্বেচ্ছয়া দেশে নিষিদ্ধকুলবর্তুনি। কুলধৰ্ম্মাৎ পতে্যুদৃভূয়ঃ শুধ্যেৎ পূর্ণাভিষেকতঃ৷” “বিত্তীর্থ মানবগণ সকল দেশেই গমন করিতে পরিবে। কিন্তু যে দেশে বা শাস্ত্ৰে বীরধৰ্ম্ম নিষিদ্ধ, সেই দেশ ও সেই শাস্ত্ৰ পরিত্যাগ করবে। যে দেশে বীরমার্গ নিষিদ্ধ, সে দেশে কেহ স্বেচ্ছাক্রমে গমন করিলে বীরধৰ্ম্ম হইতে পতিত হইবে, কিন্তু পুনরায় পূর্ণাভিষেক দ্বারা শুদ্ধ হইতে পরিবে।” ՂՀՀ দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comাির্ডাকনাথ রচনা সংগ্ৰহ সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন,- “কন্যার বিবাহ সম্বন্ধে শিবের আজ্ঞা কিরূপ?” বিনয় উত্তর করিলেন,- “র্তাহার আজ্ঞা এই যে, মাতা-পিতা পুত্রের ন্যায় তাহাকেও শিক্ষা প্ৰদান করিবেন। যতদিন না পতিমৰ্যাদা ও ধৰ্ম্মশাসনে তাহার জ্ঞান জন্মে, ততদিন তাহার বিবাহ দিবেন না।” সুবালা বলিলেন,- “পুস্তকে ও সংবাদপত্রে আমি পাঠ করিয়াছি যে, জাপানীরা পিতৃগণকে পূজা করে। তাঁহাদের প্রাচীন শিন্টো ধৰ্ম্মে ইহার ব্যবস্থা আছে। সামুদ্রিক যুদ্ধে বিজয়ী হইয়া রণার্ণবপোতগতি টগো বলিয়াছিলেন যে,- “যুদ্ধের সময় পিতৃগণকে আমি সাগর মধ্যে যেন প্ৰত্যক্ষ দেখিতেছিলাম। তাহদের সহায়তাতেই আমি রণে বিজয়ী হইয়াছি।” শিবপ্রোক্ত বীরধৰ্ম্মে পিতৃগণ সম্বন্ধে কিরূপ ব্যবস্থা আছে?” বিনয় উত্তর করিলেন,— “পিতৃগণের তৃপ্তার্থে আমরাও শ্রাদ্ধ-তৰ্পণাদি করিয়া থাকি। পিতৃলোক হইতে পিতৃগণের রশ্মি সৰ্ব্বদাই আমাদের উপর পতিত হইতেছে। তাঁহাদের বংশধরগণ সৎকৰ্ম্ম করিলে তাঁহারা পরম পরিতোষ লাভ করেন। তাঁহাদের বংশসস্তৃত কেহ যদি বীরধৰ্ম্ম অবলম্বন করিয়া ব্ৰহ্মমন্ত্রে দীক্ষিত হন, তাহা হইলে তাঁহাদের আনন্দের সীমা থাকে না। তাহার পিতৃগণ সন্তুষ্ট হইয়া দেবগণের সহিত আনন্দ অনুভব করিতে থাকেন এবং তাঁহারা পুলকিত হৃদয়ে এই গাথা গান করেন,- ‘অম্মৎকুলে কুলশ্রেষ্ঠা জাতো ব্ৰহ্মোপদেশিকঃ। কিমৰ্ম্মাকং গিয়াপিণ্ডৈঃ কিং তীর্থশ্ৰাদ্ধতৰ্পণৈঃ। কিং দানৈঃ কিংপৈহােঁমৈঃ আমাদের কুলে ব্ৰহ্ম-উপাসক উৎপন্ন নিমিত্ত গয়াতে পিণ্ডদান, তীর্থে শ্ৰাদ্ধ ও তত্বৰ্গী, দান, জপ, হােম, অথবা অন্য সাধনে আবশ্যক কি? আমাদের সৎপুত্রর সাধনে অ রূঞ্জীয় তৃপ্তি লাভ করলাম। জাপানীরা যেরূপ পিতৃগণের নিকট আপনাদের মঙ্গল প্রার্থনা করে, শিবােক্ত এই বীরধৰ্ম্মেও তাহার বিধি আছে। শ্ৰাদ্ধক্রিয়া সম্পন্ন করিয়া তাহাদিগের নিকট এইরূপে আশীৰ্ব্বাদ প্রার্থনা করিতে হয়— “আশিসো মে প্ৰদীয়ন্তাং পিতরঃ করুণাময়াঃ । বেদাঃ সন্ততয়ো নিত্যং বৰ্দ্ধন্তাং বান্ধবা মম৷ দাতায়ো মে বিবৰ্দ্ধন্তাং বহুন্যান্নানি সন্তু মে। যাচিতারঃ সদা সন্তু মা চ যাচামি কাঞ্চনা৷” হে করুণাময় পিতৃগণ! আমাকে আপনারা আশীৰ্ব্বাদ প্ৰদান করুন। আমার বিদ্যা, সন্তান ও বান্ধবগণ নিত্য বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হউক। আমার অনেক অন্ন হউক। আমার নিকট সৰ্ব্বদা লোক যজ্ঞঞা করুক, কিন্তু আমাকে যেন কাহারও নিকট যাঞা করিতে না হয়।” সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন, — “ইহা যদি বীরের ধৰ্ম্ম, তবে ইহাতে সৎসাহস অবশ্য প্ৰশংসিত হইয়াছে?” বিনয় উত্তর করিলেন,- মহাদেব বলিয়াছেন— ‘ন বিভেতি রণাদৃ যো বৈ সংগ্রামেহপ্যপরাজমুখঃ। ধৰ্ম্মযুদ্ধে মৃতো বাপি তেন লোকত্ৰয়ং জিতামৃ৷

                • দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ ԳՀՏ) যে রণ ভীত হয় না ও রণ হইতে পরাজমুখ হয় না এবং যে ব্যক্তি ধৰ্ম্মযুদ্ধে মৃত হওয়াও শ্ৰেয়ঃ জ্ঞান করে, সেই ব্যক্তি কর্তৃক ত্রিভুবন জিত হইয়া থাকে।

ফলকথা, এই বীরধৰ্ম্ম অবলম্বনে লোক মহাবলপরাক্রমশালী হয়,-“যেন লোকা ভবিষ্যন্তি মহাবলপরাক্রমঃ।” তাহার পর পূর্বেই বলিয়াছি যে, ইহার প্রভাবে লোক শোকতাপ হইতে নিস্তার পায়, অনুবান্ত্রের কষ্ট পায় না, অবশেষে পরলোকে “ব্রহ্মসাযুজ্য লাভ করে!” বিনয় পুনরায় বলিলেন,- “সংক্ষেপে তোমাকে এই বীরধৰ্ম্মের কথা বলিলাম। এ ধৰ্ম্ম অবলম্বন করিলে প্ৰথমেই সত্যের আশ্রয় লইতে হয়। কথায়-বাৰ্ত্তয়, আচার-ব্যবহারে সকল বিষয়ে সত্য। সত্য, সত্য, সত্য ভিন্ন আর অন্য উপায় নাই। যতদিন না বাঙ্গালী সত্যের আশ্রয় লয়, ততদিন দেশের উন্নতি হইবে না। মহাদেব বলিয়াছেন যে—“আমার প্রবৰ্ত্তিত এই ধৰ্ম্মের নিয়মাদি সুখে-স্বচ্ছন্দে ও বিনা আয়াসে লোক প্রতিপালন করিতে পরিবে। ভবিষ্যতে মানুষের অবস্থা কিরূপ হইবে, তাহা বুঝিয়া তাহাদের উন্নতি ও পরিত্রাণের নিমিত্ত আমি এই সমুদয় উপদেশ প্ৰদান করিলাম।” অন্যান্য ধৰ্ম্মের নিয়ম অতি কঠোর। একগালে চড় মারিলে কয়জন লোক অন্য গাল বাড়াইয়া দিতে পারে? যে স্থলে জীবহিংসা দূরে থাকুক, কাটা’ শব্দ উচ্চারণ করিলেও দোষ হয়, সে স্থলে গাভীবৎসকে বঞ্চনা করিয়া দুগ্ধ কিরূপে পান করিতে পারা যায়? চাউল ভক্ষণ করিয়া কিরূপে প্ৰাণধারণা করিতে পারা যায়? কারণ, ধান্যের গাছ তাহার শিশু সন্তানদিগের জন্য যে আহার সঞ্চয় করিয়া রাখে, তাহাকেই চাউল বলে, তাহাই অপহরণ করিয়া আমরা ভক্ষণ করি। ধৰ্ম্মের কঠোর নিয়ম প্রতিপালন করিতে না পারিয়া মানুষ কপটাচারী হইয়া, পর সত্যপথ হইতে ভ্ৰষ্ট হয়। ”সত্যকে পরিত্যাগ করিলেই বিপদ । সেজন্য কৃপা করিয়া মহাদেব মানুষকে এই বীর্যপূৰ্বপ্রদান করিয়াছেন।” সুবালা বলিলে,-“মৃত্যুকালে মা আয়ুৰ্ব্বেগুটিকয়েক উপদেশ দিয়াছিলেন। তখন তাহা আমি ভালরূপ বুঝিতে পারি নাই। গুঞ্জগুলি কিন্তু আমি মনে গাঁথিয়া রাখিয়াছি। মা বলিয়াছিলেন,— সুবালা! কখন অসুৰ্জক্টথাি বলিও না, অসত্য আচরণ করিও না, নিষ্ঠুরতা ও নীচতা সৰ্ব্বদা পরিত্যাগ করবে।” অসত্য কথা কাহাকে বলে, তাহা আমি জানি। পরদ্রবে: অপহরণ, প্রতারণা প্রভৃতি অপরাধকে বােধ হয় অসত্য আচরণ বলে। জীবকে কষ্ট দেওয়াকে নিষ্ঠুরতা বলে। আমি তােমাকে সেই চড়ুই পক্ষীর গল্প করিয়াছি। পাখীটিকে ধরিয়া তাহার পায়ে সূতা বঁধিয়া আমি খেলা করিতেছিলাম। মা বলিলেন, ‘এরূপ কাজকে নিষ্ঠুরতা বলে,” তৎক্ষণাৎ আমি সে চড়ুই পক্ষী ছাড়িয়া দিলাম। সেই অবধি কোন পক্ষী আমি পিঞ্জরে আবদ্ধ করিয়া রাখি নাই। কিন্তু তবু দেখ, কত পক্ষী আমার মাথায়, আমার স্কন্ধে বসিয়া আমাকে আদর করে। আহা! আমার শালিক পাখীটিকে এখনও ভুলিতে পারি নাই। নিষ্ঠুরতা কাহাকে বলে, তাহা একপ্রকার বুঝিয়াছি। নীচলোকের ন্যায় কুভাষা ব্যবহার করা, উপায় সত্ত্বেও তাহাদের ন্যায় ময়লা অবস্থায় দিন যাপন করা,-- ইহাকেই বোধ হয় নীচতা বলে । কিন্তু মায়ের উপদেশ এখনও যে আমি ভালরূপে বুঝিয়াছি, তাহা বোধ হয় না।” ԳՀ8 fi:Ilă zi, o ga se - www.amarboi conf** দশম অধ্যায় পুণ্ডরীক-সং বিনয় বলিলেন,- “কলিকাতায় আমাদের পাড়ায় পুণ্ডরীকাক্ষ বিদ্যার্ণব নামে একটি লোক আছেন। সকলে তাঁহাকে পুণ্ডৱীক ভট্টাচাৰ্য অথবা ভট্টাচাৰ্য মহাশয় বলিয়া ডাকে। নানা জাতির পুরোহিতাগিরি করিয়া তিনি অর্থে পাৰ্জন করিয়াছেন। তাঁহার একখানি সোনা-রূপার দোকানও আছে। তাহা হইতেও তিনি যথেষ্ট অর্থলাভ করেন। জাতি সম্বন্ধে গোল বাধাইয়াও লোকের নিকট হইতে তিনি টাকা লইতেন। এখন তিনি বৃদ্ধ ও অন্ধ হইয়াছেন। কিন্তু এক সময় আমাদের পাড়ায় তাহার বিলক্ষণ আধিপত্য ছিল। সমাজপতি বলিয়া সকলেই তাঁহাকে মান্য ও ভয় করিত। কথায় কথায় তিনি লোককে জাতিচু্যত করিতেন। অন্যান্য লোক মেষপালের ন্যায় তাহার অনুসরণ করিত। তাহার কারণ এই যে, তিনি নিতান্ত শুদ্ধাচারী ব্ৰাহ্মণ ছিলেন। সকলে বলিত যে, এরূপ সাত্ত্বিক পুরুষ পৃথিবীতে অতি বিরল। বাজারের মিষ্টান্ন কখন তিনি ঘরে আনিতে দিতেন না। কলের জল কখন তিনি ব্যবহার করিতেন না । গঙ্গাজলে তাহার রন্ধন হইত, গঙ্গাজল তিনি পান করিতেন। এখনও তিনি সেইরূপ শুদ্ধাচারী আছেন বটে; কিন্তু তাঁহার মানসন্ত্রম অনেক কমিয়া গিয়াছে। পুণ্ডরীকের গুটিকত গল্প আমি করিব। সেই গল্প শুনিলেই মিথ্যাচরণ, নীচতা ও নিষ্ঠুরতা কাহাকে বলে তাহা তুমি বুঝিতে পরিবে। কলিকাতার নিকট একখানি গ্রামে পুণ্ডরীকের বাস। ফেঁই গ্রামে এক দুঃখিনী অনাথিনী বিধবা ব্ৰাহ্মণী একটি কন্যা লইয়া বাস করিতেন। ব্ৰাহ্মণী তাহার বিবাহ দিতে পারিতেছিলেন না। গ্রামের লোক চাঁদা করিলা169* পুণ্ডরীককে সকলে বিলক্ষণ জনিত হুই”কেমলমাত্র একটি টাকা সকলে তাঁহার নামে ফেলিয়াছিল। এক টাকার অধিক কেহঁইটীহার নিকট প্রার্থনা করে নাই। পুণ্ডৱীকের তাহাতে রাগ হইল। তিনি বলিলেন,- “কি আঁীমার নামে এক টাকা! সামান্য গৃহস্থ লোকেরা যখন কেহ দশ টাকা, কেহ পাঁচ টাকা দিতেছে, তখন আমার নামে কেবল এক টাকা। কন্যাটিকে আমি দুইগাছি সোনার বালা দিব। বরযাত্রীদিগের ভোজনের নিমিত্ত আমি একমণ সন্দেশ দিব।” ব্ৰাহ্মণীর আনন্দের আর সীমা রহিল না। গ্রামের লোক বলিল,— ‘ভট্টাচাৰ্য মহাশয়কে আমরা চিনিতে পারি নাই। বাহিরে উনি কিছু কৃপণ বটেন, কিন্তু ভিতরে উহার দয়া আছে।’ ফলকথা, সকলেই পুণ্ডরীককে ধন্য ধন্য করিতে লাগিল। গ্রামের ময়রাকে ব্ৰাহ্মণী একমণ সন্দেশের আজ্ঞা করিলেন। যথাসময়ে পুণ্ডরীক' তাহাকে দুইগাছি সোনার বালা আনিয়া দিলেন। বিবাহের পরম পরিতোষ লাভ করিল। বরকর্তা বারোয়ারি প্রভৃতির টাকা তাঁহার হস্তে অর্পণ করিলেন। পরদিন পুণ্ডৱীক কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিলেন। পুণ্ডৱীক এখন বৃদ্ধ হইয়াছেন। বারোয়ারি প্রভৃতির টাকা আজ পৰ্যন্ত গ্রামের লোক তাঁহার নিকট হইতে আদায় করিতে পারে নাই। কিছুদিন পরে প্রকাশ হইল যে, কন্যাকে তিনি যে সোনার বালা প্ৰদান করিয়াছিলেন, তাহা প্ৰকৃত সোনার নহে, গিল্টির বালা। যাহা হউক বরকর্তা ভদ্রলোক। দুঃখিনী বিধবা ব্ৰাহ্মণীকে আর পীড়ন করিলেন না। সন্দেশের মূল্য পুণ্ডরীক ময়রাকে দিলেন না। তিনি নিজে ময়রাকে আজ্ঞা করেন নাই, তাহার কথামত ব্ৰাহ্মণী আজ্ঞা করিয়াছিলেন। সেজন্য ময়রা পুণ্ডৱীককে ধরিতে পারিল না। গরীব ব্ৰাহ্মণী সেই টাকা অতিকষ্টে ক্রমে ক্রমে পরিশোধ করিলেন। পাপের পরিণাময় ԳՀն: sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro পুণ্ডৱীকের এইরূপ অনেক কীৰ্ত্তি আছে। সেসব কথা বর্ণনা করিতে গেলে একখানি পুস্তক হইয়া পড়ে। তাহার তিন পুত্র ছিল। জ্যেষ্ঠপুত্রকে ঘরে পড়াইবার নিমিত্ত একজন শিক্ষক ছিলেন। এক বৎসর পুত্র পরীক্ষায় ভালরূপ উত্তীর্ণ হইয়াছিল। শিক্ষক কোনরূপ পুরস্কার প্রার্থনা করেন নাই, প্রত্যাশাও করেন নাই; কিন্তু মনের আনন্দে পুণ্ডরীক পুরস্কারস্বরূপ একটি আংটি দিলেন; বলিলেন যে,- “ইহা আসল হীরার আংটি ইহার মূল্য একশত টাকা।” কিছুদিন পরে শিক্ষকের টাকার প্রয়োজন হইল। পুণ্ডরীকের কথার উপর নির্ভর করিয়া সেই অঙ্গুরী। তিনি কোন লোককে পঞ্চাশ টাকায় বিক্রয় করিলেন। কিছুদিন পরে ক্রেতার মনে সন্দেহ হইল। আংটি যাচাই করিবার নিমিত্ত তিনি বাজারে গমন করিলেন। যে দোকান হইতে পুণ্ডৱীক অঙ্গুরী ক্রিয় করিয়াছিলেন, দৈবক্রমে তিনি সেই দোকানে গমন করিলেন। দোকানদার বলিল যে,- 'এ অঙ্গুরীয় আমিই এক ব্ৰাহ্মণকে বিক্রয় করিয়াছিলাম। ইহা প্রকৃত হীরক নহে, ইহা কাচ। আড়াই টাকা মূল্যে আমি ব্ৰাহ্মণকে বিক্রয় করিয়াছিলাম। শিক্ষকের নিকট ক্রেতা টাকা ফিরিয়া চাহিলেন। শিক্ষক টাকা খরচ করিয়া ফেলিয়াছেন, ফিরিয়া দিতে পারিলেন না। জুয়াচুরির অভিযোগ উপস্থিত করিয়া ক্রেতা শিক্ষকের নামে আদালতে নালিশ করিলেন। কয়দিন হাজতে বাস করিয়া, অনেক টাকা খরচ করিয়া, বহু কষ্ট শিক্ষক সে বিপদ হইতে পরিত্রাণ পাইলেন; কিন্তু মোকদ্দমার খরচের নিমিত্ত পিতা-পিতামহের যাহা কিছু ভূমি-সম্পত্তি ছিল, সে সমুদয় তিনি বিক্রয় করিতে বাধ্য হইলেন। গরীব শিক্ষক সৰ্ব্বস্বাঢ়ন্ত হইলেন।” রূপ কীৰ্ত্তি করিয়াছিলেন। এত রৌপ্যনিৰ্ম্মিত দানসামগ্ৰী তিনি দিয়াছিলেন যে, কি বরযাত্রী, কি কন্যাযাত্রী, সকলেই আশ্চৰ্য্যান্বিত হইয়াছিল। সকলেই বলিল যে, রাজারাজড়াও এরূপ দানসামগ্ৰী দিতে পারে না । পুণ্ডরীকের মানসন্ত্রম যার-পর-নাই বৃদ্ধি হইল। কিন্তু সে দুইদিনের জন্য। তাঁহার জামাতার পিতা দুই-একটি বাসন হাতে করিয়াই জানিতে পারিলেন যে, সে রূপার বাসন নহে। তাহার পর পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন যে, দানসামগ্ৰী বার আনা কলাই করা তাম্রনিৰ্ম্মিত বাসন। তিনি ভদ্রলোক, এ কথা লইয়া আর গোলমাল করিলেন না। নূতন বৈবাহিকের গুণ তিনি ঢাকিয়া লইলেন। লোকের নিকট তিনি বলিলেন যে,~— ‘ভট্টাচাৰ্য মহাশয় ব্ৰাহ্মণপণ্ডিত লোক, বাসন-বিক্রেতা তাঁহাকে ঠকাইয়া রূপার বাসনে পরিবৰ্ত্তে কলাই করা তামার বাসন দিয়াছে।” কিন্তু বন্ধুদিগের নিকট তিনি অপেক্ষ করিয়া বলিলেন,-ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ের নিকট আমি এত রূপার বাসন প্রার্থনা করি নাই। তবে মিছামিছি কেন তিনি এরূপ প্ৰবঞ্চনা করিয়াছে? ইহার পরিবৰ্ত্তে যদি তিনি পিতল-কাসার বাসন দিতেন, তাহা হইলে আমার কাজে লাগিতা। কলাই করা তামার বাসন লইয়া আমি কি করিব? একটু চুপ করিয়া বিনয় পুনরায় বলিতে লাগিলেন— “স্পষ্টভাবে তিনি কখনও কাহাকেও প্ৰবঞ্চনা করিয়াছিলেন কি না, তাহা আমি জানি না। তবে একজন গোয়ালাকে তিনি একবার অতি সামান্য বিষয়ে ফাঁসি দিয়াছিলেন। গোয়ালা ঘোল বেচিতে আসিয়াছিল। তাহার নিকট ԳՀՆ afraig -iibg gis so - www.amarboi.comf'37********* হইতে পুণ্ডৱীক পূর্ণ একটি ঘোল লইলেন। ঘটিটি বাড়ীর ভিতর লইয়া গেলেন। অন্য পাত্রে ঘোলটি ঢালিয়া ঘটিটি তিনি জলে পূর্ণ করিলেন। তাহার পর সেই একঘটি জল আনিয়া গোয়ালার হাঁড়িতে ঢালিয়া দিলেন। আশ্চৰ্য্যান্বিত হইয়া গোয়ালা জিজ্ঞাসা করিল,-“ও কি করিলেন মহাশয়?” পুণ্ডরীক উত্তর করিলেন,- “যা বেটা, এখন চলিয়া যা।” গোয়ালা জিজ্ঞাসা করিল,- “আমার পয়সা?” পুণ্ডৱীক উত্তর করিলেন, — ‘পয়সা ! পয়সা আবার কি? তোর তো যেমন ছিল, তেমনি হইল। তোর তো ঢককে ঢক্‌ বজায় হইল। পয়সা আবার কিসের?" এই বলিয়া তিনি তাহাকে বাড়ী হইতে দূর করিয়া দিলেন।” সুবালা হাসি সংবরণ করিতে পারিলেন না । হাসিতে হাসিতে তিনি বলিলেন,- “কি আশ্চৰ্য্য! পৃথিবীতে এমন লোকও থাকে!” বিনয় বলিলেন,- “আরও দুই একটি পুণ্ডরীক-কাহিনী তোমাকে বলিতেছি। পুণ্ডরীকের জামাতা একবার শ্বশুরবাড়ী আসিয়াছিলেন। জ্যেষ্ঠ শ্যালক অর্থাৎ পুণ্ডৱীকের জ্যেষ্ঠ পুত্রের সহিত তিনি পুষ্করিণীতে স্নান করিতে গিয়াছিলেন। দৈবক্রমে পুণ্ডৱীকের পুত্ৰ গভীর জলে গিয়া পড়িল। সে সীতার জানিত না, সেই জন্য হাবুডুবু খাইতে লাগিল। জামাতা তাহার প্রাণরক্ষা করিতে গেলেন। ভগিনীপতিকে সে জড়াইয়া ধরিল। উভয়ে জলমগ্ন হইলেন। শক্রিয় বাগদী নামে একজন লোক নিকটে ছিল । পুণ্ডরীকের জামাতা ও পুত্রের প্রাণরক্ষা করিবার নিমিত্ত সে জলে গিয়া পড়িল। এই কাৰ্য্যে কিছুক্ষণের নিমিত্ত তাহার নিজেরও প্রাণসংশয় হইল। যাহা হউক অতি কষ্টে সে দুইজনের জীবনরক্ষা করিল। বাগদীর একপাল ছেলেপুলে। ঘোরতর পরিশ্রম করিয়াও সে তাহাদিগকে উদর য়া অন্ন দিতে পারিত না। সে ভাবিল,—নিজের প্রাণ সংশয় করিয়া আমি এই র জীবনরক্ষা করিলাম, নিশ্চয় ভালরূপ পুরস্কার পাইব ।” তাহার। আশা নিতান্ত ভি ছিল না। কারণ, জামাতা তাহার পিতাকে লিখিয়া দশটি টাকা আনাইলেন। য়কে তিনি বলিলেন— “শক্রিয় বাগদী আমার প্রাণরক্ষা করিয়াছে, তাহাকে পু করিবার নিমিত্ত আমার পিতা দশ টাকা প্রেরণ করিয়াছেন।” পুণ্ডরীক উত্তর — “আমার পুত্রেরও সে প্রাণরক্ষা করিয়াছে। আমি তাহাকে ভালরূপে পুরস্কার করিব। ও দশ টাকা আমাকে এখন দাও, তোমার ও আমার টাকা একসঙ্গে তাঁহাকে দিব।' জামাতা শ্বশুরের হাতে দশ টাকা অৰ্পণ করিলেন; কিন্তু সেই অবধি শক্রিয় বাগদী একটি পয়সাও পাইল না।” সুবালা বলিলেন,- “ছি ছি! কি জঘন্য লোক! কি নীচতা!” বিনয় উত্তর করিলেন,- “হ্যা, ইহাকে নীচতা বলে । সামান্য প্ৰবঞ্চনা ইহা নহে।” বিনয় পুনরায় বলিলেন,- “একবার পুণ্ডরীক আপনার গ্রামে গিয়াছিলেন। গিয়া দেখিলেন যে, তাহার ভ্রাতুষ্পপুত্ৰ-সাত বৎসরের বালক-বন হইতে একটি খরগোসের ছানা ধরিয়াছিল। শশক-শাবকটিকে সে বড় ভালবাসিত, সৰ্ব্বদা তাহাকে বুকে করিয়া রাখিত। নবীন শ্যামল দূৰ্ব্বাদল ও কোমল নবপল্লব সংগ্ৰহ করিয়া অতি যত্নে তাহাকে প্রতিপালন করিত। শশকশাবকটি দেখিয়া পুণ্ডরীকের লোভ হইল। তাঁহার কনিষ্ঠ পুত্র তখন বালক ছিল। নিজের পুত্রের নিমিত্ত তিনি খরগোস-ছানাটি লাইতে ইচ্ছা করিলেন। ভ্রাতুষ্পপুত্রের নিকট তিনি তাহা চাহিলেন। বালক বলিল— ‘‘না জ্যোঠামহাশয়! খরগোস ছানাটি আমি আপনাকে দিতে পারি না। অতি কষ্টে আমি ইহাকে ধরিয়াছি। ইহাকে ধরিতে আমার পায়ে কত কাটা ফুটিয়াছিল, কাঁটা লাগিয়া ফালা ফালা হইয়া আমার কাপড় ছিড়িয়া গিয়াছিল।” পুণ্ডৱীক সাতিশয় রাগান্বিত হইলেন।

      • firls six g3 881 - www.amarboicom a ASRA “যেমন করিয়া পারি, খরগোস-ছানাটি আমি লইব”—মনে মনে তিনি এইরূপ সঙ্কল্প করিলেন । বালক তাহার মনের ভাব বুঝিয়া খরগোস-ছােনাটি লুকাইয়া রাখিল। পরদিন প্ৰাতঃকালে পুণ্ডরীক চাদর লইয়া চলিয়া গেলেন। বালক মনে করিল যে, তিনি কলিকাতায় প্রতি গমন করিলেন। তখন সে লুক্কায়িত স্থান হইতে খরগোস-ছানাটিকে বাহির করিয়া কচি কচি পাতা তাহাকে খাইতে দিল। তাহার পর বুকে লইয়া তাহাকে আদর করিতে লাগিল। এমন সময় সহসা পুণ্ডৱীক আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বালকের নিকট হইতে বলপূৰ্ব্বক তিনি খরগোসছানাটি কাড়িয়া লইলেন। বালক তাহার পায়ে পড়িয়া উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিতে লাগিল,- “ও জ্যোঠামহাশয়! আমার খরগোসটি লাইবেন না। ও জ্যোঠামহাশয়! বড় কষ্টে আমি ইহাকে ধরিয়াছি। এই দেখুন, কাঁটা লাগিয়া আমার হাত কত ছড়িয়া গিয়াছে। এই দেখুন, আমার হাতে এখনও ঘা রহিয়াছে। ছানাটি ধরিতে আমার কাপড় ছিড়িয়া গিয়াছিল, বাবা তাহার জন্য আমাকে কত মারিয়াছিলেন। আপনার পায়ে পড়ি, জ্যোঠামহাশয়! আমার খরগোস-ছােনাটি আপনি লইয়া যাইবেন না।’ এইরূপ খেদ করিয়া কাঁদিতে কঁদিতে বালক পুণ্ডৱীকের পায়ে আছাড়ি-পিছাড়ি খাইতে লাগিল। তাঁহার পা দুই হাতে ধরিয়া চক্ষুর জলে ভাসাইয়া দিল। কিন্তু পুণ্ডৱীকের কিছুমাত্র দয়া হইল না। বালকের পিতা নিকটে দাড়াইয়াছিলেন। শিশুপুত্রের মৰ্ম্মভেদী কাতরোক্তি শুনিয়া তাহার বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল। কিন্তু জ্যেষ্ঠ ধনবান, তিনি গরীব। ভয়ে তিনি কিছু বলিতে পারিলেন না। বালকের মাতা ঘোমটা দিয়া সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। মাটিতে পড়িয়া ধূলায় ধূসরিত হুইয়া শিশুপুত্ৰ গড়াগড়ি দিতেছিল। তাড়াতাড়ি পুত্রকে তিনি কোলে লইলেন। ম &স্থলে মস্তক রাখিয়া বালক নীরবে: কঁদিতে লাগিল। মাতার দুই চক্ষু দিয়া অশ্রুধার্যঞ্জক্কুহিঁত হইতে লাগিল। দুইজনের চক্ষু-জলে কছুৰ্ম্মফ্ৰ’দয়া হইল না। নিজের পুত্রের নিমিত্ত শশকয়া গ্নেতুলন।”

SK *P, *r** কুঁৱৰ্লন না। বালক যেরূপ কঁদিতেছিল, যুঁপিয়া ফুপিয়া তিনিও সেইরূপ কঁদিতে লাগিলেন, আঁর আঁচল দিয়া ক্রমাগত চক্ষু মুছিতে লাগিলেন। তাহার কান্না দেখিয়া বিনয়ও চক্ষুর জল নিবারণ করিতে পারিলেন না। তাঁহার নেত্রদ্বয় ছলছল করিতে লাগিল। দুই-একটি অশ্রুবিন্দু তীহার চক্ষু হইতে ভূতলে পতিত হইল। বিনয় বলিলেন,-“সুবালা কঁদিও না। যে স্থানে এই নৃশংস ব্যাপার সংঘটিত হয়, আমি তখন সেই স্থানে উপস্থিত ছিলাম। আমি তখন বালক ছিলাম, সেই বালকের সহিত অনেক কাঁদিয়াছিলাম। সে নিষ্ঠুর ব্যাপার দেখিয়া পাড়ার লোক সকলেই কঁদিয়াছিল। যাহা হউক, সে বালকের দুঃখ নিবারণ করিতে আমি সমর্থ হইয়াছিলাম। কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিয়া পিতাকে আমি সকল কথা বলিলাম। আমার বাবা সেই বালককে চমৎকার একজোড়া বিলাতি সাদা খরগোস কিনিয়া দিলেন, তাহা পাইয়া বালকের আর আনন্দের পরিসীমা রহিল না। এত কাণ্ড করিয়া শশক-শাবক আনিয়া পুণ্ডৱীক নিজের পুত্রকে দিলেন বটে, কিন্তু তাহা ভোগ হইল না। তিনদিন পরে ছানাটি মরিয়া গেল।” ԳՀԵr află cios (gs se - www.amarboicom** একাদশ অধ্যায়। বৃদ্ধ বৈবাহিক সুবালা বলিলেন,- “পাপকৰ্ম্ম করিলে এইরূপ ফলই হয়।” বিনয় বলিলেন;- “আর অধিক বলিব না। পুণ্ডরীক সম্বন্ধে কেবল আর একটি গল্প বলিব। হাটখোলায় এক বৃদ্ধ ব্ৰাহ্মণ ছিলেন। দােকানে সামান্য মুহুরিগরি করিয়া তিনি দিনপাত করতেন। একটি শিশুকন্যা রাখিয়া তাঁহার পত্নীর পরলোক হইয়াছিল। অতি যত্নে বৃদ্ধ সেই কন্যাটিকে প্রতিপালন করিতেছিলেন । প্ৰাণ অপেক্ষা কন্যাটিকে তিনি ভালবাসিতেন ! তাহার বিৰাহকাল উপস্থিত হইল rপুণ্ডরীকের কনিষ্ঠ পুত্রের সহিত ঘটকে সম্বন্ধ করিল। বৃদ্ধ ব্ৰাহ্মণের অল্প শুচিবাই ছিল ; তিনি ভাবিলেন যে,— ‘বরের পিতা ভট্টাচাৰ্য ব্ৰাহ্মণ, পৌরোহিত্য ব্যবসা! তাহার ঘরে অখাদ্য-কুখাদ্য যায় না। এরূপ ঘরে পড়িলে কন্যা আমার শুদ্ধাচারে থাকিবে। ভট্টাচাৰ্য মহাশয় ধনবান লোক। কন্যা সুখেও থাকিবো।” কিন্তু ব্ৰাহ্মণ যদি একটু তদন্ত করিয়া দেখিতেন, তাহা হইলে পূৰ্ব্বে দুই বৈবাহিকের সহিত তিনি কিরূপ ব্যবহার করিয়াছেন, তাহা জানিতে পারিতেন। বৃদ্ধ ব্ৰাহ্মণ হাবা-গোবা লোক ছিলেন। ঘটকেরা যাহা বলিল, তাহাই তিনি বিশ্বাস করিলেন। কন্যা সুখে থাকিবে,—এই প্রতাশ্যায় পুণ্ডৱীক যাহা বলিলেন, বৃদ্ধ তাঁহাই দিতে স্বীকৃত হইলেন। কিন্তু সেই সমুদয় গহনা, দান-সামগ্ৰী প্রভৃতি আহরণ করিতে ব্ৰাহ্মণ সৰ্ব্বস্বান্ত হইলেন। এমন কি, তাঁহাকে ঘটি-বাটি বিক্রয় করিতে হইয়াছিল । পুরাতন একজোড়া শাল ছিল, তাহা পৰ্যন্ত ব্ৰাহ্মণকে বিক্ৰয়(ক্টািরতে হইয়াছিল। যাহা হউক, বিবাহ হইয়া গেল। প্ৰাতঃকালে) ধর-কন্যা লইয়া বরযাত্ৰিগণ চলিয়া গেল । ব্ৰাহ্মণ মনে করিলেন যে,- “কন্যাদায় হইসে আমি উদ্ধার পাইলাম, এখন হইতে আমি নিশ্চিন্ত হইলাম। কিন্তু একঘণ্টা *్వణి লোক দৌড়িয়া আসিয়া বলিল যে,-“পুঞ্জয়ীক ভট্টাচাৰ্য মহাশয় নব-পুত্রবধূকে ঘৰ্বোিচতুলিতেছেন না, কি গোল হইয়াছে। শীঘ্র আপনি চলুন ! গাড়ীর ভিতৱ আঁহার কন্যা বসিয়া আছে; প্রতিবেশীর যে চাকরাণী তাহার সঙ্গে আসিয়াছিল, সে তাহার নিকটে আছে। বাটীর ভিতর প্রবেশ করিয়া দেখিলেন যে, পুণ্ডৱীক কোলের নিকট বাক্স রাখিয়া আছেন। কন্যাকে বৃদ্ধ যে গহনাগুলি দিয়াছিলেন, পুণ্ডৱীক নিক্তিতে সেইগুলি বার বার ওজন করিয়া দেখিতেছেন ও কষ্টিপাথরে ঘসিয়া তাহার সোনা পরীক্ষা করিতেছেন । বৈবাহিককে দেখিয়া তিনি বলিলেন যে,- “ওজনে ঠিক আছে, কিন্তু সোনা ঠিক নহে! এ গিনি সোনা অপেক্ষ নিকৃষ্ট সোনা। আপনি আমাকে গিনি সোনার অলঙ্কার দিতে অস্বীকৃত श्याश्टुिलन।' বৃদ্ধ ব্ৰাহ্মণ উত্তর করিলেন,- “সে কথা সত্য। পরে তাহার মীমাংসা হইবে; কিন্তু আপাততঃ আ-ধনার পুত্রবধু দ্বারে গাড়ীতে বসিয়া আছে। তাহাকে বাটীর ভিতর আনয়ন করুন। যথারীতি বল্পণাদি করিতে স্ত্রীলোকদিগকে আজ্ঞা করুন।” পুণ্ডরীক উত্তর করিলেন,- “এ কথার মীমাংসা না হইলে আপনার কন্যা আমি ঘরে লাইব না। ইচ্ছা হয় আপনার কন্যাকে আপনি লইয়া যাউন। পুত্রের আমি পুনৰ্ব্বার বিবাহ দিব। এরূপ শঠ। জুয়াচোরের কন্যাকে আমার প্রয়োজন নাই।’ বৃদ্ধ ব্ৰাহ্মণ উত্তর করিলেন– “আমি শঠ। জুয়াচাের নই। গিনি সোনা দিয়া গহনা গািড়তে "*" frts via gas xel - www.amarboicom a GSRS স্বর্ণকারকে আমি আজ্ঞা করিয়াছিলাম। গিনি সোনার মূল্যও আমি তাহাকে দিয়াছি। স্বর্ণকার যদি কোনরূপ প্ৰবঞ্চনা করিয়া থাকে, তাহা হইলে সে দোষ আমার নাহে।” পুণ্ডরীক উত্তর করিলেন- ‘দোষ কাহার, তাহা আমি জানি না, জানিতে ইচ্ছাও করি না । আমি এইমাত্র জানি যে, যদি স্বর্ণ রৌপ্যের ব্যবসা না করিতাম, যদি স্বর্ণ-রৌপ্য পরীক্ষা করিতে না জানিতাম, তাহা হইলে আজ আপনি আমাকে বিলক্ষণ ঠকাইতেন। আমি ক্ষতিগ্ৰস্ত হইতে পারি না। আপনার কন্যা আপনি ঘরে ফিরিয়া লইয়া যাউনা।” ব্ৰাহ্মণ আর তর্ক করিলেন না। পুণ্ডৱীকের পা দুইটি ধরিয়া অনুনয় বিনয় করিতে লাগিলেন। কিন্তু পুণ্ডরীকের পাষাণসদৃশ কঠিন হৃদয় ব্ৰাহ্মণের দুঃখে অণুমাত্র ব্যথিত হইল না। পাড়ার দুই-চারিজন ভদ্রলোক, পুণ্ডরীকের দুইতিনজন কুটুম্ব সেই স্থানে বসিয়াছিলেন। ব্ৰাহ্মণের দুঃখ দেখিয়া তাঁহারা দুঃখিত হইলেন। তাঁহারা পুণ্ডরীককে বলিলেন, — ‘পুত্রবধূ ঘরে লাইবেন না, সে কেমন কথা! পিতৃবংশের সহিত কন্যার এখন আর কোন সম্বন্ধ নাই। সে এখন আপনার বংশভুক্ত হইয়াছে। আপনার গোত্র প্রাপ্ত হইয়াছে। আপনার অশৌচ এখন তাহার অশৌচ ৷ তাহার কোনরূপ আখ্যাতি হইলে আপনার অখ্যাতি । তাহা হইলে কি করিয়া। আপনি পাঁচজনকে মুখ দেখাইবেন?” এই সমুদয় কথা শুনিয়া পুণ্ডৱীক কিয়ৎ পরিমাণে ভীত হইলেন। বৈবাহিকের নিকট হইতে একশত টাকার খৎ লইয়া পুত্রবধূকে তিনি ঘরে তুলিলেন। “তোমার কন্যাকে আর আমি তােমার নিকট পাঠাইব না। তুমি শঠ। জুয়াচাের। কনুকে তুমি কুশিক্ষা প্ৰদান করিবে”— এইরূপ কতকগুলি মধুর বাক্যদ্বারা নব বৈবাহিকরূেক্টেরিতোষ করিয়া তিনি তাঁহাকে বিদায় করিলেন । SN পুণ্ডরীক ও তাঁহার স্ত্রী ভাবিতেন যে, পুত্রুেঠিবাহ দিয়া বৈবাহিকের উপর। সৰ্ব্বদাই চক্ষু রাঙ্গা করিয়া থাকিতে হয়, সৰ্ব্বদাই তাহাকে দিয়া থেৎলাইতে হয়। কয়েক মাস পরে সেই একশত টাকার জন্য তাগাদা আরম্ভ । “আমি সৰ্ব্বস্বান্ত হইয়াছি, আমার আর কিছু নাই, একেবারে একশত টাকা প্ৰদান করি, সে ক্ষমতা আমার নাই; ক্রমে ক্রমে পরিশোধ করিব।”—এইরূপ মিনতি করিয়া বৃদ্ধ ব্ৰাহ্মণ সময় প্রার্থনা করিলেন। পুণ্ডৱীক সে প্রস্তাবে সম্মত হইলেন না। ব্ৰাহ্মণের নামে তিনি নালিশ করিলেন, ডিক্রি করিলেন, ডিক্রি জারি করিলেন । কিন্তু বেচিয়া কিনিয়া লইবেন, ব্ৰাহ্মণের এরূপ কোন সম্পত্তি ছিল না। ডিক্রির টাকা আদায় হইল না। ব্ৰাহ্মণকে পুণ্ডরীক কারাবাসে পাঠাইলেন। দুই মাস তিনি কারাগারে আবদ্ধ রহিলেন। অবশেষে একজন জ্ঞাতি পুণ্ডরীকের ঋণ পরিশোধ করিয়া বৃদ্ধ ব্ৰাহ্মণকে খালাস করিয়া আনিলেন; নিজের বাটীতে তাঁহাকে আশ্রয় প্রদান করিলেন। লজ্জায়, ঘূণায়, মনােদুঃখে ব্ৰাহ্মণের শরীর জীর্ণ শীর্ণ হইয়াছিল। অল্পদিন পরেই তিনি নিদারুণ রোগ দ্বারা আক্রান্ত হইলেন । তাহার আসন্নকাল উপস্থিত হইল। কন্যা ললিতাকে তিনি একবার দেখিতে চাহিলেন। পুণ্ডরীক পাঠাইলেন না। তিনি বলিলেন যে— ‘ও পাপিষ্ঠ প্ৰতারকের নিকট আমি আমার পুত্রবধূকে পাঠাইব না। মৃত্যুকালে কন্যাকে সে কুশিক্ষা দিয়া যাইবে।” বৈবাহিকের নিষ্ঠুর বাক্য শ্রবণ করিয়াও কন্যাকে একবার দেখিবার বাসনা বৃদ্ধ পরিত্যাগ করিতে পারিলেন না। জ্ঞাতি এবং অন্যান্য লোকদিগকে কাকুতি-মিনতি করিয়া ক্রমাগত তিনি বলিতে লাগিলেন, — ‘ও’ গো! তোমরা একবার আমার ললিতাকে আনিয়া দাও। একবার তাহার qS0o দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~) www.amarboi.com"র্ভ","র্থী রাষ্ট”সখিৰ মুখখানি আমি দেখি। একবার তাহার দুই-একটি কথা শ্ৰবণ করি। যখন সে নিতান্ত শিশু ছিল, তখন আমার পত্নীর পরলোক হইয়াছিল। মাতার ন্যায় আমি কন্যাটিকে অতিযত্নে প্রতিপালন করিয়াছিলাম। আমি তাহাকে কখন কুশিক্ষা প্ৰদান করি নাই। পিতা হইয়া কন্যাকে কেহ কখন কি কুশিক্ষা প্ৰদান করে? জানিয়া শুনিয়া আমি বৈবাহিককে প্রতারণা করি নাই। আমি গিনি সোনার মূল্য দিয়াছিলাম। স্বর্ণকার যদি কোনরূপ বঞ্চনা করিয়া থাকে, তাহা হইলে আমি কি করিব? আমি বৃদ্ধ আমি পীড়িত। ও গো! একবার তোমরা আমার ললিতাকে আনিয়া দাও। মৃত্যুশয্যায় শায়িত দীন ক্ষীণ ব্ৰাহ্মণের কাতরোক্তি শুনিয়া সকলের হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইতে লাগিল। পুণ্ডৱীকের নিকট বার বার তাঁহারা লোক পাঠাইলেন। অবশেষে সেই সমৃদ্ধিশালী জ্ঞাতি নিজে পৰ্যন্ত গমন করিলেন । পুণ্ডৱীক কিছুতেই বৃদ্ধের কন্যাকে পাঠাইলেন না। শেষ অবস্থায় বৃদ্ধ জ্ঞানশূন্য হইলেন। বিকারের প্রলাপে ললিতার জন্য তিনি অবিরত বিলাপ ব্লতে লাগিলেন। — 'ললিতা আসিয়াছ! এস মা! এস। এত দিন তুমি আস নাই কেন মা? তুমি তো জান মা! যে, তোমাকে একদণ্ড না দেখিয়া আমি থাকিতে পারি না। তুমি তো জান মা! যে সন্ধ্যাবেলা দোকান হইতে আসিয়া আগে তোমাকে কোলে করিতাম। পায়ের নিকট বসিালে কেন মা? আমার এই হাতের নিকট ঠিক সম্মুখে এস। চক্ষুতে আর আমি ভাল দেখিতে পাই না। সব যেন অন্ধকার দেখিতেছি। সেইজন্য কাছে আসিতে বলিতেছি। তোমার মুখ আজ এত মলিন কেন মা? তোমার কাপড়খানি এত ময়লা কেন? তুমি বড় রোগ হইয়া গিয়াছ!” এই কথা বলিতে বলিতে বৃদ্ধ একবার চমকিয়া । তাহার পর তিনি বলিলেন,- 'না, কই ললিতা তো আসে নাই! তাহার শ্বশুর-খাগুড়ী তাহাকে তো পাঠান নাই। হয়, হায়! পৃথিবীতে এমন নিষ্ঠুর লোকও থাকে। তা! শেষকালে তোমাকে একবার দেখিতে পাইলাম না!:--” বিনয় বুলিলেন,— “এইরূপ বিলু করিতে বৃদ্ধের প্রাণত্যাগ হইল। সেই জ্ঞাতির নিকট আমি এই সকল কথা শুনিয় । এখন দেখ, সুবালা! চড়ুই পাখীর পায়ে সূতা বঁাধিয়া খেলা করা একরূপ নিষ্ঠুরতা, আর এ একরূপ নিষ্ঠুরতা। বালকের শাক-শাবক বলপূৰ্ব্বক কাড়িয়া লওয়া, বৃদ্ধ ব্ৰাহ্মণকে কারাবাসে প্রেরণ করা, শেষকালে তাহার কন্যাকে একবার দেখিতে না দেওয়া, –এরূপ বিবরণ শ্রবণ করিলে সৰ্ব্বশরীর শিহরিয়া উঠে । তুমি বোধ হয় জান, সুবালা! যে, দানা দৈত্য ভূত প্ৰেত পিশাচগণ কখন কখন মানুষের দেহ ধারণ করিয়া পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে! তাহারাই এইরূপ কাৰ্য্য করিতে পারে। যাহারা প্রকৃত মানুষ, তাহারা এরূপ কাৰ্য্য করিতে পারে না । চুপ কর সুবালা! আর কাদিও না। একদিকে যেরূপ পুণ্ডরীকের ন্যায় পাপিষ্ঠদিগের নিষ্ঠুতায় ধরণী তাপিত হইয়া পড়েন, সেইরূপ অপর দিকে পরদুঃখ-শ্রবণজনিত তোমার মত লোকের চক্ষুজলস্বরূপ পুণ্যসলিলে সিক্ত ও সুশীতল হইয়া তিনি শান্তিলাভ করেন। আমার বয়স অধিক হয় নাই সত্য; কিন্তু পিতা আমাকে অনেক উপদেশ দিয়াছেন। একবার পুণ্ডৱীক সম্বন্ধে কি কথা হইতেছিল। পুণ্ডৱীককে লক্ষ্য করিয়া পিতা আমাকে বলিলেন, “দেখ, বিনয়! পুণ্ডরীকের মত লোক কখনও সুখী হয় না। তাহার মন যদি উদঘাটিত করিয়া নিরীক্ষণ কর, তাহা হইলে বুঝিবে যে, তাহার অন্তঃকরণ অশান্তিতে জৰ্জ্জৱীভূত হইয়া আছে। যতই ধন হউক না। কেন, ধনের লালসা কখনই পরিতৃপ্ত হয় না। পুণ্ডৱীক ধনবানু হইয়াছে সত্য, কিন্তু ধনলালসা পাপের পরিণাম। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro Av5S তাহার মন হইতে এখনও দূর হয় নাই। ধন দিয়া পুণ্ডৱীক অনেক বস্তু ক্ৰয় করিতে পারে, কিন্তু পুত্ৰ-কন্যা প্রভৃতি প্রিয়জনের পরমায়ুকে ক্রয় করিতে পারে না। আমি নিশ্চয় বলিতেছি। যে, যেদিন তাহার পাপবৃক্ষ পরিবদ্ধিত হইয়া ফল উৎপাদনা করিবে, যেদিন সেই ফল পরিপুষ্ট হইবে, সেইদিন পুণ্ডরীককে যমযন্ত্রণায় ছটফটু করিতে হইবে।” “বাস্তবিক তাহাই হইয়াছে। পুণ্ডরীকের সে তিন পুত্র ও তিন পুত্রবধু এখন কোথায়? যেমন পুণ্ডরীক, তেমনি তাহার পত্নী। তিনিও অতি শুদ্ধাচারিণী। তিনিও সৰ্ব্বদা জপ৷ করেন। যখন পুত্রবধূ ঘরে ছিল, তখন তিনি জপ করিতেন ও ভাবিতেন,— “কিরূপে বৈবাহিকের নিকট হইতে কিছু আদায় করিব, কিরূপ গালি দিয়া পুত্রবধূকে তাড়না করিব।” তিনি বলিতেন,- “বেটার বিবাহ দিয়াছি; বৈবাহিককে যেন-তেন-প্রকারেণ দুহিয়া লইব না?” আহা! সে যেটার গৌরব এখন তাহার কোথায়? বড় বৈবাহিক যথেষ্ট টাকা ও জিনিসপত্র দিয়াছিলেন। কিন্তু কিছুতেই পুণ্ডৱীক ও তাঁহার পত্নীকে সন্তুষ্ট করিতে পারেন নাই। বড় পুত্রবধূকে রাত্রিদিন তাহারা যন্ত্রণা ও গঞ্জনা দিতেন। পুণ্ডৱীকের মধ্যম পুত্র তাহার সহিত অযথা তামাসা করিত। পুত্ৰবধু কাঁদিয়া শ্বশুর-শাশুড়ীর নিকট নালিশ করিলে তাঁহারা কিছু বলিতেন না, বরং এই কাৰ্য্যে মধ্যম পুত্রকে উৎসাহ প্ৰদান করিতেন। কিছুদিন পরে তাহারা পুত্রবধূর নামে কলঙ্ক রটাইলেন। জ্বালা, যন্ত্রণা, গঞ্জনা, তাহার উপর নিন্দা অপবাদ! বড় পুত্রবধূ তাহা সহ্য করিতে না পারিয়া অবশেষে সে হতভাগিনী গলায় দড়ি দিয়া মরিল। ༩༽ মধ্যম বৈবাহিকের সহিত প্ৰথম হইতেই পুঙ্গুস্তক্টর মুখ দেখাদেখি ছিল না। পাড়া হইল। পুণ্ডরীক মধ্যম পুত্রবধূকে ঘরে ংগু না। কিছুকাল পিত্ৰালয়ে বাস করিয়া সে এক্ষণে খৃষ্টীয় সম্প্রদায়ের আশ্রয় হইতে চলিয়া গিয়াছে। কনিষ্ঠ পুত্রবধূ অর্থাৎ হাটখোলার “সেই বৃদ্ধ ব্ৰাহ্মণের কন্যা ললিতা রোগে মারা গিয়াছে। পুণ্ডৱীকের কন্যাও মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে। হইয়াছে। মধ্যম পুত্র টাকা-কড়ি সম্বন্ধে পিতার সহিত বিবাদ করিয়া আফিম খাইয়া মরিয়াছে। কনিষ্ঠ পুত্র রোগাক্রান্ত হইয়া অকালে কালগ্ৰাসে পতিত হইয়াছে। মানুষের দেহ অতি ক্ষণভঙ্গুর। পুণ্ডরীক-পত্নীর ন্যায় বেটার অহঙ্কার করিতে নাই। পুণ্ডরীক ও তাঁহার স্ত্রী ব্যতীত তাঁহার সংসারে এখন আর কেহ নাই। পুণ্ডৱীক নিজেও অন্ধ হইয়া আছেন। এরূপ অবস্থা প্রাপ্ত হইয়াও টাকার মায়া তিনি পরিত্যাগ করতে পারেন নাই। যতই বৃদ্ধ হইতেছেন, ততই যেন ধনলালসা তাঁহার বৃদ্ধি হইতেছে। তাঁহার টাকা কে ভোগ করিবে, তাহার ঠিক নাই; কিন্তু তিনি এখন ভয়ানক কৃপণ হইয়াছেন। পয়সা খরচ করিতে তাহার বুক যেন ফাটিয়া যায়। তাঁহার গৃহিণী ভাল মাছ, ভাল তরকারী, ভাল জলখাবার গোপনে আনাইয়া ভোজন করেন; কিন্তু পুণ্ডরীক' তাহা জানিতে পারিলে অনৰ্থ করেন। সেজন্য ঘরে থাকিলেও তাঁহার স্ত্রী কোন ভাল দ্রব্য তাঁহাকে দিতে সাহস করেন না। একদিন তাহার স্ত্রী গলদা চিংড়ী মাছের ঝোল করিয়া আহার করিতেছিলেন। ঝোল মাখিয়া ভাত খাইবার সময় সমান্য একটু সপৃ সম্প্র শব্দ হইয়াছিল। কোথায় কি হয়, কে কি খায়, সেজন্য অন্ধ সৰ্ব্বদাই ԳՏՀ YifnRIlg{ °ii%<5 q<5 zR8! ~y www.amarboi.comñ?5°tr°V°l7° *P""PR*** কান পাতিয়া থাকেন। অন্ধের কানে সেই সপ্ত সাপ্ত শব্দ প্রবেশ করিল। হুলস্থূল পড়িয়া গেল। অন্ধ বলিলেন, — “আমার সর্বনাশ হইল! আমি পথের ভিখারী হইলাম! তুমি দেখিতেছি, আজ ডাল রাধিয়াছ, তুমি আমার সর্বনাশ করিলে। ডাল রান্না! এত খরচ করিলে কুবেবের ধনাগারও শূন্য হইয়া যায়।” শঙ্কিত হইয়া স্ত্রী বলিলেন, — ‘না, গো, না! আমি ডাল রন্ধন করি নাই। ভাত শুষ্ক হইয়া গিয়াছিল। একটু ফেন মাখিয়া খাইতেছি। সেইজন্য সপৃ সপৃ শব্দ হইতেছে।” সন্তুষ্ট হইয়া অন্ধ বলিলেন,- “বেশ! বেশী।” তবেই দেখ সুবালা! ঘরে ভাল দ্রব্য রন্ধন হইলেও স্ত্রী তাঁহাকে দিতে সাহস করেন না। একটু আলু ভাতে, কি একটু কাঁচকলা ভাতে দিয়া প্রতিদিন তাঁহাকে ভাত দিতে হয়। প্রচুর পরিমাণে ডাল থাকিলেও ভাত মাখিবার নিমিত্ত তাঁহাকে একটু ফেন দিতে হয়।” সুবালা বলিলেন,- “কি অধৰ্ম্মের ভোগ!” বিনয় উত্তর করিলেন,- “হাঁ সুবালা! পৃথিবীর রহস্য কিছু বুঝিতে পারা যায় না। তবে এইমাত্র বলিতে পারা যায় যে, কৰ্ম্মের ফল নিশ্চয়ই ভোগ করিতে হয়। আর একটি আশ্চৰ্য্য বিষয় এই যে পুণ্ডৱীক ও তাঁহার পত্নীর মত লোকেরা নিজের দোষ দেখিতে পায় না। তাহারা মনে করে যে, আমরা যাহা করিতেছি, ইহা ধৰ্ম্মসঙ্গত ভাল কাজ। পুণ্ডরীক-পত্নী মনে করিতেন। যে,- “আমি বেটার মা, পুত্রবধূগণ আমার বঁাদী। দিবারাত্রি তাহাদিগকে তাড়না করিব না। কেন? আমি বেটার মা, বেহাইকে দুহিয়া লইব না কেন? বেহাই দিবে না কেন? যত দোষ 3) সুবালা বলিলেন,- “মৃত্যুকালে মাতা যাহা যাহা বলিয়াছিলেন, তাহার অর্থ এখন আমি অনেকটা বুঝিতে পারিলাম।” छ्या उ६J! শাকচুনির হাড় বিনয় পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, — “তবে বিজয়বাবুকে নিতান্তই তুমি পত্র লিখিবো?” সুবালা উত্তর করিলেন, — “নিশ্চয় কল্য আমি তাঁহাকে পত্র লিখিব; কিন্তু একথা এক্ষণে তুমি কাহারও নিকট প্রকাশ করিও না। কাকামহাশয়, পিসীমা অথবা বড়ালমহাশয় একথা শুনিলে আমাকে পাগল মনে করিবেন, আর বড়ই গোলযোগ করবেন। সেজন্য কাকামহাশয় এ স্থানে না আসিতে আসিতে বিজয়বাবুকে আমি পত্ৰ লিখিব।” বিনয় সে স্থান হইতে প্ৰস্থান করিলেন; সুবালাও নানা কথা ভাবিতে ভাবিতে ধীরে ধীরে গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন। পরদিন প্ৰাতঃকালে সুবালা বিজয়বাবুকে পত্ৰ লিখিলেন, — “আপনার জ্যেষ্ঠভ্ৰাতা কিরূপ পাপের পরিণাম। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro ఇ উইল করিয়াছিলেন, তাহা আপনি অবগত আছেন। তাহার পর কি হইয়াছে, তাহাও আপনি জানেন। কিন্তু এখন আমি বুঝিয়াছি যে, এই সম্পত্তি আপনার, আমার নহে। অতএব আপনি আসিয়া আপনার সম্পত্তির ভার গ্ৰহণ করুন। আমি আমার কাকামহাশয়ের বাড়ীতে চলিয়া যাই । আপনি এ স্থানে আগমন করিলে সকল কথা পরিষ্কার করিয়া বলিব। আমি সামান্য বালিকা আমার প্রতি অনুগ্রহ করিয়া শীঘ আসিবেন।” কিছুক্ষণ পরে বিনয়কে সঙ্গে লইয়া বড়ালমহাশয় সুবালার নিকট আগমন করিলেন। তিনি বলিলেন,- “গতকল্য খাদা ভূত আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল,— একদিন রাত্রিতে বাগানে বসিয়া তুমি কি করিতেছিলে? তখন আমি কোন উত্তর প্রদান করি নাই। এস, আজ আমি তাহার উত্তর দিব। দুইটা শাকচুন্নি ও চপলার সমস্যা বোধ হয় তাহাতে মীমাংসা হইবে।” বিনয় ও সুবালাকে সঙ্গে লইয়া বড়ালমহাশয় প্রথম নিম্নতলার পূর্বদিকে যে ঘরে ঘুটে ও কাষ্ঠ থাকে ও যে ঘরের জানালার গরাদ খুলিয়া খাদা ভূত বাটীর ভিতর আসিত, সেই ঘরে গমন করিলেন। বড়ালমহাশয় জানালার দুইটি কাষ্ঠনিৰ্ম্মিত গরাদ ধরিয়া টানিলেন। গরাদ দুইটি অনায়াসে তিনি খুলিতে পারিলেন। সেই পথে বাহির হইয়া তিনজনে বাগানে গিয়া উপস্থিত হইলেন। বড়ালমহাশয় পুনৰ্ব্ববার গরাদ দুইটি জানালাতে দিয়া দিলেন। জানালা হইতে প্ৰায় দশহাত দূরে দুইজন মালী ও একজন গ্রামবাসী দাঁড়াইয়াছিল। স্থান নির্দেশ করিয়া বড়ালমহাশয় তাহাদিগকে খনন করিতে বলিলেন। প্রথম সে স্থানের মৃত্তিকা খনন করিয়া তাহারা সরাইয়া ফেলিল। সুবালা ও বিনয় হইয়া দেখিলেন যে, মৃত্তিকার নিম্নে অনেকগুলি ইট পাশাপাশি সজ্জিত রহিয়াছে মালী ইটগুলি সরাইয়া ফেলিল। বড়ালমহাশয় বলিলেন, — “তোমাদিগকে এক্ষণে কিছু পূৰ্ব্ব-বৃত্তান্ত বলিব, তবে তোমরা বুঝিতে পরিবে। এই বাটী ও এই সম্পত্তি রাজাবাবুর পিতৃ-পিতামহের নহে। ইহা আর একজনের ছিল—তাহার বংশ এক্ষণে লোপ হইয়াছে। রাজাবাবুর পিতা পূৰ্ব্বদেশের লোক । তিনি এই সম্পত্তি ক্ৰয় করেন। সম্পত্তি ক্ৰয় করিয়া এই গ্রামে আসিয়া তিনি বাস করিলেন। সে জন্য এ স্থানে রাজাবাবুর জ্ঞাতি-গোত্র, আত্মীয়-স্বজন কেহ নাই। পূৰ্ব্বদেশে থাকিলেও থাকিতে পারে। তাহা আমি জানি না। রাজাবাবুও বোধ হয় জানিতেন না। যাহারা এই বাটী নিৰ্ম্মাণ করাইয়াছিলেন ও এই বৃহৎ বাগানের পত্তন করিয়াছিলেন, তাহারাই এই কূপ খনন করাইয়াছিলেন। গ্ৰীষ্মকালে নদী শুষ্ক হইলে পুষ্করিণীর জল শুষিয়া লয়। বাগানের গাছ যখন ছোট ছিল, তখন তাঁহাতে জলসেচনের নিমিত্ত বোধ হয় ভূস্বামী এই কূপ খনন করাইয়াছিলেন। রাজাবাবুর সময়ে বৃক্ষসকল বড় হইয়াছিল, জলসেচনের আবশ্যকতা ছিল না। মানুষ কি গরু-বাছুর পাছে পড়িয়া যায়, সেজন্য কূপের চারিধাের আমরা কাঠ দিয়া ঘিরিয়া রাখিতাম। রাজাবাবু একবার আমাকে বলিলেন,- “ও কৃপটা আর কেন? কৃপটা মাটি ফেলিয়া বুঝাইয়া দাও।” আমি ভাবিলাম, কৃপটা একেবারে নষ্ট করিয়া ফেলিব না। সেজন্য রাজাবাবুর অনুমতি লইয়া চতুষ্কোণ তক্তার পাট প্রস্তুত করিলাম ও তাঁহা দিয়া কূপের মুখ চাপা দিলাম। তক্তা শীঘ ԳՖ8 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comপূির্ডািস্টন/******** পচিয়া যাইবে না, এই উদ্দেশ্য তাহার উপর ইট বিছাইয়া দিলাম, তাহার উপর মাটি দিয়া বাগানের ভূমির সহিত সমান করিয়া দিলাম। চারিদিকে খনন করিয়া ও গাছ কাটিয়া যখন আমি সোনার ইটের অন্বেষণ করিতেছিলাম, তখন একদিন কৃপের কথা আমার স্মরণ হইল। আমি ভাবিলাম যে, কৃপের মুখ গোপনে খুলিয়া রাজাবাবু হয়তো তাহার ভিতর সোনার ইট লুক্কায়িত রাখিয়াছেন। কৃপের ভিতর সোনার ইট রাখিতে হইলে বাক্সর ভিতর বন্ধ করিয়া রাখিতে হইবে। কৃপের ভিতর ঘটি পড়িয়া গেলে বঁড়শীর ন্যায় বড় বড় লৌহ-কণ্টকের সহায়তায় লোক উপর হইতে উত্তোলন করে। দীর্ঘরজ্জ্বসংযুক্ত একগুচ্ছ সেইরূপ লৌহ-কণ্টক আমি সংগ্ৰহ করিলাম। একদিন রাত্রি দশটায় সময় চুপি চুপি আসিয়া আমি কূপের মুখ হইতে মৃত্তিকা, ইট ও তক্তা সরাইয়া ফেলিলাম। তাহার পর রজ্জ্বর একদিক ধরিয়া বঁড়শীগুলি জলে নামাইয়া দিলাম। কাঁটাগুলি কৃপের নিম্নে যখন মাটি স্পর্শ করিল, তখন তাহাদিগকে চারিদিকে ঘুরাইয়া-ফিরাইয়া দেখিতে লাগিলাম যে, কৃপের ভিতর বাক্স অথবা অন্য কোন দ্রব্য পড়িয়া আছে কি না। রজ্জ্ব ধরিয়া নাড়িতেচাড়িতেছি, এমন সময় আমার দক্ষিণ দিকে একবার চাহিয়া দেখিলাম। সৰ্ব্বনাশ! দেখিলাম অতি অল্পদূরে খাদা ভূত দাঁড়াইয়া আছে। বলা বাহুল্য যে, আমি ঘোরতর ভীত হইলাম। দড়িটি আমার হাত হইতে জ্বলিত হইয়া কূপের ভিতর পতিত হইল। কৃপের মুখ সেইরূপ খোলা অবস্থায় রাখিয়া আমি রুদ্ধশ্বাসে পলায়ন করিলাম। তাহার পর অতি প্ৰত্যুষে আসিয়া কৃপের মুখ। যেমন বন্ধ ছিল, সেইরূপ বন্ধ করিয়া । পাছে কেহ জানিতে পারে যে, এ স্থানের মৃত্তিকা কে খনন করিয়াছিল, সেজন্য তাহারােষ্ট্রগুঞ্জ শুষ্ক পত্ৰাদি ছাড়াইয়া দিলাম। দিনের বেলায় পাগলী আসিয়া বাগানে দি এবং চািপলা দোতলার জানালার ধারে দাড়াইয়া তাহাকে দেখা দিত, - একথা । কিন্তু গতকল্য খাদা ভূত যখন জানালার গরীদের কথা বলিল, তখন সৃষষ্ঠ মনে সন্দেহ হইল।” সুবালা উত্তর করিলেন,- “হা, ও মনে একটা সন্দেহ জানিয়াছিল!” বড়ালমহাশয় বলিলেন, — “তাহার পর ঘরে গিয়া বড়ালিনী যখন শাকচুন্নিৱ কথা উত্থাপন করিলেন, তখন আমার আরও সন্দেহ হইল। আমি ভাবিলাম যে, ত্ৰিলোচন ও শঙ্করা যে একজোড়া শাকচুন্নি দেখিয়াছিল ও কল্পনাবলে তাহাদের অদ্ভুত আকৃতির পরিচয় দিয়াদিল এবং যাহাদের ভয়ে গ্রামবাসিগণ কিছুদিন সাতিশয় ভীত হইয়াছিল, সে জোড়া শাকচুন্নি পাগলী ও চপলা ব্যতীত আর কেহ নাহে।” সুবালা বলিলেন, — “আমার মনে সন্দেহ হইয়াছিল যে, খাদা ভূতের সম্মুখ দিকে যে মা গো” শব্দ হইয়াছিল, সে শব্দ পাগলী করিয়াছিল। কারণ, তাহার অল্পক্ষণ পরেই পাগলী ভয় পাইয়া বাড়ী গিয়া অজ্ঞান হইয়া পড়িয়াছিল।” বিনয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “পাগলী একটা; অন্য শাকচুন্নিটা কে?” বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন,- “অন্য শাকচুন্নি আমার বোধ হয়। চপলা।” সুবালা বিস্মিত হইয়া বলিলেন— “চপলা! কি আশ্চৰ্য্য!” বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন, — “নিশ্চয় বলিতে পারি না, কিন্তু আমার বােধ হয় যে, সে চপলা। আমার অনুমান ঠিক কি না, এখনই জানিতে পারা যাইবে। তাহার মা বলিয়াছিল। যে,- ‘পাগলী কেবল দিনের বেলা বাগানে আসিয়া দাড়াইত। দূর হইতে ভগিনীকে দেখিয়া সে চলিয়া যাইত।” কিন্তু আমার বোধ হয়, সে রাত্রিকালেও চপলার সহিত সাক্ষাৎ করিতে AX পাপের পরিণাম। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro ԳԾ@ আসিত। তখন চপলা গৃহ হইতে বাহির হইয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিত। দুই ভগিনীতে কিছুক্ষণ কথোপকথন করিয়া স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিত। ঐ ঘরের জানালার গরাদ যে সহজে খুলিতে পারা যায়, চপলা কোনরূপে সে সন্ধান পাইয়াছিল। পাগলী বাগানে আসিয়া দাড়াইলে চপলা দোতলা হইতে তাহাকে দেখিতে পাইত। তাহার পর নীচে নামিয়া কাঠ ও ঘুটের ঘরের জানালার গরাদ খুলিয়া বাটী হইতে সে বাহির হইত। ঘর হইতে বাহির হইয়া পুনরায় গরাদ দুইটি যথাস্থানে সন্নিবেশিত করিয়া দিত। দুই ভগিনী কিছুক্ষণ বাগানে দাঁড়াইয়া কথোপকথন করিত; লোকে মনে করিত যে, তাহারা শাকচুন্নি। ভয়ে কেহ তাহাদিগের নিকটে যাইত না। সেজন্য কেহ তাহাদিগকে চিনিতে পারে নাই।” বিনয় বলিলেন, — “আপনার অনুমান সত্য বলিয়া আমার বোধ হইতেছে।” বড়ালমহাশয় বলিলেন,- “কৃপের মুখ খুলিয়া তাহার ভিতর কাটা ফেলিয়া আমি অনুসন্ধান করিতেছিলাম। বাটীর ভিতর প্রবেশ করিবার মানসে খাদা ভূত সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইল। সে দেখিল, একটা মানুষ বসিয়া কিম্বুত কদাকারভারে হাত-পা নাড়িতেছে! এটা মানুষ কি ভূত, এইরূপ সন্দেহ করিয়া খাদা ভূত সেই স্থানে দাঁড়াইয়া দেখিতে লাগিল। আমার দৃষ্টি তাহার উপর পড়ল। কুপের মুখ খোলা রাখিয়া ভয়ে আমি পলায়ন করিলাম। খাদা ভূত আর অগ্রসর হইল না। আমাকে দেখিয়া তাহারও ভয় হইল। সে রাত্রি সে আর বাটীর ভিতর প্রবেশ করিল না। বাগানের পূৰ্ব্বদিকে সে ফিরিয়া গেল। ভগিনীর সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত সেই সময় পাগলী আসিয়াছিল। উপর হইতে চািপলা তাহার সাদা কাপড় দেখিতে পাইয়াছিল। তাহার সহিত সাক্ষাৎ 'ব দণ্ডদুইটি খুলিল, গরান্দ দুইটি পুনরায় যথাস্থানে পরাইয়া দিল, অবশেষে ভগিনীর সহিত সঙ্কািষ্টকরবার নিমিত্ত দ্রুতবেগে দীেড়িল। এদিকে পাগলী খাদা ভুতকে সহসা সম্মুখে >মা গো’ বলিয়া পলায়ন করিল! ওদিকে চপলাও ওঁ সেই সময় মা গাে' বলিয়া চীৎকার করল। অতি প্রত্যুষে আসিয়া চুপি চুপি আমি কূপের মুখ বন্ধ করিয়া দিলাম। তাহার ভিতরে পড়িয়া, জলে ডুবিয়া, চপলা যে মরিয়া গিয়াছে, সেকথা আমি কিরূপে জানিব? জানালার গরাদ যে খোলা যায়, তাহা দিয়া লোক যে যাতায়াত করিতে পারে, চপলা যে সে পথ দিয়া বাহির হয়, এ সমুদয় কথার বিন্দুবিসর্গ তখন আমি জানিতাম না! পাগলী যদি সকল বিষয় প্রকাশ করিয়া বলিতে পারিত, তাহা হইলে বোধ হয় কতকটা সন্দেহ হইত। যাহা হউক, এক্ষণে আমার অনুমান ঠিক কি না, তাহা দেখিতে হইবে।” দুইজন মালী ব্যতীত যে তৃতীয় ব্যক্তি উপস্থিত ছিল বড়ালমহাশয় তাহাকে কূপের ভিতর নামিতে বলিলেন। কিন্তু বিনয় তাহাকে নামিতে দিলেন না। বিনয় বলিলেন যে,- “এই পুরাতন কূপের বায়ু প্ৰথমে পরীক্ষা করিয়া দেখিতে হইবে। ইহার ভিতর দূষিত বায়ু থাকিলে, যে নামিবে সে মরিয়া যাইবে।” কৃপের ভিতর বিনয় একটি জ্বলন্ত বাতি নামাইয়া দিলেন। বাতি নিবিয়া গেল না, জুলিতে লাগিল। তখন বিনয় সে লোকটিকে কূপের ভিতর নামিতে দিলেন। সে লোক উত্তমরূপ জলে ডুব দিতে পারিত, সেজন্য বড়ালমহাশয় তাহাকে আনিয়াছিলেন। কূপে সে অবতরণ করিল। জলে ডুব দিয়া পুনরায় জলরে উপর মাথা তুলিয়া সে বলিল,- “কৃপের ভিতর কি আছে। একটা লম্বা দড়ি নামাইয়া দাও, তাহার অপর দিক তোমরা ধরিয়া থাক।” ANC) fi:Ilă zi, o ga se - www.amarboi conf** মালী উপর হইতে একগাছি দড়ি নীচে নামাইয়া দিল, অপর দিক সে ধরিয়া রহিল। দড়ি ধরিয়া সে লোক পুনরায় ডুব দিল। কূপের ভিতর যাহা তাহার হাতে ঠেকিয়াছিল, তাহাতে সে দড়ি বঁধিয়া দিল। পুনরায় জল হইতে মাথা তুলিয়া উপরের লোককে সেই দড়ি টানিতে বলিল। নয় দশ বৎসরের বালিকার কঙ্কাল। সমস্ত না হউক, অনেকটা উপরে আসিয়া উঠিল। হাতের অস্থিতে এখনও গাছ কয়েক কাচের চুড়ি ছিল। চপলার হাতে সেই চুড়ি ছিল। সুবালা তাহা চিনিতে পারিলেন। সে সমুদয় যে চপলার অস্থি, সে বিষয়ে আর কোন সন্দেহ রহিল না। কঙ্কাল হইতে যে হাড়গুলি বিচ্ছিন্ন হইয়াছিল, ক্রমে সেগুলি উপরে উঠিল। যে লীেহ-কন্টকের গুচ্ছ বড়ালমহাশয়ের হাত হইতে পড়িয়া গিয়াছিল, তাহাও উপরে উঠিল। কূপের ভিতর আর কিছু ছিল না। সমুদয় অনুসন্ধান করিয়া কূপের ভিতর যে নামিয়াছিল, সে উপরে আসিয়া গ্রামে হুলস্থূল পড়িয়া গেল। এই আশ্চৰ্য্য ব্যাপার দেখিবার নিমিত্ত গ্রামের লোক ভাঙ্গিয়া পড়িল। চপলার মাতা দৌড়িয়া আসিল । ছাদের উপর পাগলী পায়রাদিগকে খাবার দিতেছিল। মায়ের ক্ৰন্দন শুনিয়া সেও দৌড়িয়া আসিল । হাতের অস্থিতে কাচের চুড়ি যে চপলার গোয়ালিনীও তাঁহা চিনিতে পারিল। বলা বাহুল্য যে, চপলার মাতা কূপের ধারে বসিয়া কঁদিতে লাগিল। বড়ালমহাশয়ের আজ্ঞায় কৃপটি এবার মাটি ফেলিয়া ভরাট করা হইল। চপলা যে দৈবের ঘটনায় কূপে পড়িয়া প্ৰাণ হারাইয়াছে, একথা বিশ্বাস করিতে গ্রামের লোকের প্রবৃত্তি হইল না। খাদা ভূত যে তাহাকে এ বিশ্বাস তাঁহাদের মন হইতে দূর হইল না। গ্রামের একজন প্ৰধান বিজ্ঞলোক গম্ভীর — “ভুত হাওয়া ব্যতীত আর কিছুই নহে। মৃত্তিকা, ইট, তক্তা প্রভৃতি ভেদ অনায়াসে তাহারা কূপের ভিতর প্রবেশ করিতে পারে। উপরে বন্ধ থাকিলে কি হয় শরীরের সমস্ত মাংস ভক্ষণ করিয়াছিল। কেবল মোটা মোটা হাড় ক’খানা নাই বলিয়া কূপের ভিতর ফেলিয়া গিয়াছিল। কাটা বাছিয়া তোমরা কইমাছ কি কৰেিখও নাই? হাড় বাছিয়া খাদা ভূত সেইরূপে চপলাকে খাইয়াছিল। তোমরা যেমন কড়াই ভাজা খাও, ছোট ছোট হাড়গুড়ি সেইরূপ সে কুডু কুড় করিয়া খাইয়াছিল।” এ সঙ্গত কথা বটে। বড়ালমহাশয়ের অনুমান নিতান্ত অসঙ্গত! সেজন্য খাদা ভূত যে চপলাকে খাইয়াছে—সকলের মনে সেই বিশ্বাস বদ্ধমূল রহিল। জীয়ন্ত মানুষ খাদা ভূত বাড়ীর ভিতর চের-কুঠুরীতে যে বসিয়া আছে, গ্রামের লোক তাহার কিছুই জানে না। সুবালা বড়ালমহাশয়কে জিজ্ঞাসা করিলেন, — “খাদা ভূত ও শাকচুন্নির সমস্যা মীমাংসা হইল। কিন্তু শুনিয়াছি যে, দিদিমণির পীড়ার সময় দিনকত গ্রামে ঘোরতর তুকতাকের উৎপাত হইয়াছিল। তুকের ভয়ে গ্রামের লোক গ্রাম ছাড়িয়া পলাইবার উপক্ৰম করিয়াছিল। সে কে করিয়াছিল? সকলে বলে যে, আপনার আজ্ঞায় সে সব কাজ হইয়াছিল।” বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন,- “তুকতাক গুণ-গান আমরা জানি না। গ্রামের লোককে ভয় দেখাইবার জন্য ধনুকধারী তামাসা করিয়া নেকড়ার পুঁটুলি প্রভৃতি পথে ফেলিত। তাহা আগে আমি জানিতাম না। পরে জানিতে পারিয়া ধনুকধারীকে অনেক ভৎসনা করিয়াছিলাম। গীেরবিনী তিওরিণীর যখন উপাৰ্জ্জন কমিয়া আসিল, তখন সেও অন্য গ্রামের এই কাজ করিয়া আসিত ।” izejag ifşeify sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro e\9e এয়োদশ অধ্যায় বিজয়বাবু অপরাহে সুবালাকে বিনয় বলিলেন, — “বাড়ী হইতে আমি মাতুলালয়ে আসিয়াছিলাম। সে স্থানে তোমার পত্ৰ পাইলাম। আমার মাতাপিতা জানেন না যে, আমি এখানে আসিয়াছি। তাঁহাদের দুর্ভাবনা হইতে পারে। সেজন্য বাড়ী যাইব মনে করিয়াছিলাম। কিন্তু এরূপ গোলযোগের ভিতর তোমাকে রাখিয়া কি করিয়া আমি যাই?” সুবালা বলিলেন,- “যে পৰ্যন্ত বিজয়বাবু আসিয়া আপনার সম্পত্তি বুঝিয়া না লন, সে পৰ্যন্ত যদি থাকিতে পাের, তাহা হইলে ভাল হয়। তুমি এখন যে জামা পরিয়া আছ, ইহার কাপড় অতি চমৎকার। ইহার কি মূল্য অধিক?” বিনয় উত্তর করিলেন,- “ইহার মূল্য কি, তাহা আমি জানি না। কোনরূপ ভাল কাপড় দেখিলেই বাবা আমার জন্য ক্রয় করেন। সৰ্ব্বদা আমি ভাল কাপড়-চোপড় পরিয়া থাকিলে আমার মাতাপিতার আহাদ হয়। সেজন্য বাড়ীতেও আমি মূল্যবান পরিচ্ছদ পরিধান করিয়া থাকি। বিজয়বাবু আসিলে খাদা ভূত সম্বন্ধে তুমি কি করিবে?” সুবালা বলিলেন,- “সে সোনার ইট এক্ষণে বিজয়বাবুর। খাদা ভূতের সহিত বড়ালমহাশয় যেরূপ নিয়ম করিয়াছেন, তাহা আমি তাহাকে বলিব । তিনি কি সে নিয়ম প্রতিপালন করবেন না?” Ś বিনয় উত্তর করিলেন,— “নিশ্চয় করবেন। ৱির্ভয়বাবু আসিলে আমি লুক্কায়িত থাকিব। তাহার সম্মুখে আমি বাহির হইব না। তোমাদের সম্পত্তি সম্বন্ধে কথাবাৰ্ত্ত হইবে। আমি কে যে সে স্থানে উপস্থিত থাকিব। কোথায় হাঁকে স্থান দিবে? ভিতর-বাড়ীতে, না বাহিরदांछोऊ?” (్స সুবালা উত্তর করিলেন,- “এ বাড়ী পারেন। তিনি আমার দাদামহাশয়ের ভ্রাতা। ভিতরে-বাড়ীতে দাদামহাশয়ের ঘর তাহার জন্য আমি সজ্জিত করিতেছি।” বিনয় বলিলেন, — “বেশ কথা! আমি বাহির-বাড়ীতে লুক্কায়িত থাকিব। সে স্থানে দুটি দুটি ভাত আমার জন্য পাঠাইয়া দিবে, তাহার পর তোমাদের একটা ঠিক হইয়া গেলে আমি এস্থান হইতে প্ৰস্থান করিব।” কূপের ধারে ভগিনীর হাড় দেখিয়া পাগলীর পীড়া বৃদ্ধি হইয়াছিল। মাঝে মাঝে সে মূচ্ছিত হইতেছিল। দুইদিন সে পশুপক্ষীদিগকে আহার দিতে আসে নাই। বাগানে আতা পাকিয়াছিল। তৃতীয় দিনে তাহাকে গুটিকত আতা দিবার নিমিত্ত সুবালা প্ৰাতঃকালে গ্রামের ভিতর গমন করিয়াছিলেন। আতা দিয়া ফিরিয়া আসিতেছেন, এমন সময় একবার পশ্চাৎ দিকে তিনি চাহিয়া দেখিলেন। দেখিলেন যে, একজন বিদেশী ভদ্রলোক কিছু দূরে তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিতেছেন। পালকি হইতে নামিয়া তিনি পদব্ৰজে আসিতেছিলেন। তাঁহার পশ্চাতে আরও কতকটা দূরে বেহারীগণ ধীরে ধীরে খালি পালকি আনিতেছিল। “ইনি কি বিজয়বাবু?”— এই চিন্তা সুবালার মনে একবার উদয় হইল। আর একবার সুবালা ফিরিয়া দেখিলেন। না, ইনি বিজয়বাবু নহেন। বিভীষণ, কুম্ভকৰ্ণ, ԳՖԵ uskla »ižo 333) a www.amarboi.comio ბარწi>iგუiდ. ভগদত্তর হাতী প্রভৃতির লক্ষণ বিন্দুমাত্র তাঁহাতে ছিল না। দিদিমণি বলিয়াছিলেন যে, তাহার দেবরের অতি ভয়ানক আকৃতি। ইহার আকৃতি সেরূপ নহে। ক্ষণমাত্ৰ দেখিয়া সুবালা স্থির করিলেন যে, ইনি বিজয়বাবু নহেন। পথের পার্থে একটি টগরফুলের গাছ ছিল। শুভ্ৰবর্ণের ফুলে তাহার শাখা-প্ৰশাখা পরিপূণ হইয়াছিল। বিদেশী লোক আগে চলিয়া যাউক,- এইরূপ ভাবিয়া সুবালা সেই গাছের নিকট গিয়া মনোনিবেশ করিয়া ফুলগুলি দেখিতে লাগিলেন। বিদেশী লোক নিকটে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,- “হাঁ গো মা-লক্ষ্মী! রায়মহাশয়ের বাড়ী কি এইদিক দিয়া যাইতে হয়? অনেক দিন পূৰ্ব্বে একবার আমি এই গ্রামে আসিয়াছিলাম। পথ ভুলিয়া গিয়াছি।” সুবালা উত্তর করিলেন,- “হী। একটু আগে গেলেই তাহার বাড়ী দেখিতে পাইবেন।” তিনি বলিলেন,- “তুমিও না। এইদিকে যাইতেছিলে?” সুবালা উত্তর করিলেন, — “হী। আমিও রায়মহাশয়ের বাড়ীতে যাইতেছিলাম।” বিদেশী বলিলেন,- “তবে চল, আমাকে দেখিয়া দাঁড়াইলে কেন?” সুবালা বলিলেন, — “আপনি চলুন। আপনার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আমি যাইতেছি।” আগে বিদেশী, পশ্চাতে সুবালা, রায়মহাশয়ের বাটী অভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। সুবালা ভাবিলেন যে,- “বিজয়বাবু নিজে না আসিয়া, বিষয় বুঝিয়া লইবার নিমিত্ত হয়তো এই লোকটিকে পাঠাইয়া দিয়াছেন।” দুই-চারি পা গিয়া বিদেশী একটু হাসিয়া তুমিই সেই পাগলী?” সুবালা উত্তর করিলেন, — “না, আমি পা । পাগলীর অসুখ হইয়াছে। তিনদিন সে আমাদের বাটীতে আসে নাই। তাহার মায়ের কাছে সে আছে, তাহাকেই আতা দিতে আমি গিয়াছিলাম।” আছে, তাহা আমি জানি না। যে পাগলী সুবালা তাহার মুখপানে চাহিয়া রহিলেন । “তবে ইনিই বিজয়বাবু! কি আশ্চৰ্য্য! দিদিমণি ইহার আকৃতি-প্রকৃতির যেরূপ বিষয়ণ প্ৰদান করিয়াছিলেন, তাহার সহিত কিছুমাত্র সাদৃশ্য নাই। কিন্তুতকদাকার দূরে থাকুক, ইনি সুপুরুষ! বয়ঃক্রম চল্লিশ অথবা কিছু অধিক হইবে। কথাগুলি অতি সুমিষ্ট, আর হাসিটি কি মধুর! ইহার কথা উত্থাপনে পাপ আছে, - এমন কথা দিদিমণি কি করিয়া বলিয়াছিলেন!! নিশ্চয় ইনি দেবতার তুল্য লোক। কেমন স্নেহের সহিত ইনি আমাকে পাগলী বলিলেন!” মনে মনে সুবালা এইরূপ চিন্তা করিলেন। তাহার পর ধীরে ধীরে তিনি বলিলেন,-“হঁ, আমিই সুবালা, আমিই আপনাকে পত্ৰ লিখিয়াছিলাম।” বিজয়বাবু বলিলেন,- “কি করিয়া তুমি আমাকে লিখিলে যে, বিষয় আমার নহে, আপনার?” সুবালা উত্তর করিলেন,- “এখন বাড়ী চলুন। সে সকল কথা পরে বলিব ।” অন্যান্য কথাবাৰ্ত্তায় দুইজনে বাড়ী গিয়া উপস্থিত হইলেন। “রায়মহাশয়ের ভাই আসিয়াছেন!! রায়মহাশয়ের ভাই আসিয়াছেন!” বলিয়া একটা হুলুস্থল পড়িয়া গেল। পুরাপের পরিণাম। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro ANC) বড়ালমহাশয় তখন বাড়ী ছিলেন না। অন্যান্য লোকে তাঁহাকে যথেষ্ট সমাদর করিল। সুবালা তাহাকে উত্তরদিকে সেই রায়মহাশয়ের ঘরে লইয়া গেলেন। কুটুম্বকে ভালরূপে ভোজন কেহ বুঝিতে পারিল না। আহারাদির পর সুবালা বলিলেন, — “আপনি এখন তবে একটু বিশ্রাম করুন। বড়ালমহাশয় আমাদের কৰ্ম্মচারী— ” বিজয়বাবু বলিলেন,— “বড়ালমহাশয়কে আমি জানি। বহুকাল পূৰ্ব্বে একবার তাঁহার সহিত আমার সাক্ষাৎ হইয়াছিল। তখন তিনি এই বাড়ীর মেজে খুঁড়িতেছিলেন।” সুবালা হাসিয়া বলিলেন,- “হাঁ, সে সম্বন্ধে একটা কথা আছে, তাহাও আপনাকে পরে বলিব। আপাততঃ বড়ালমহাশয়কে কাগজপত্র প্রস্তুত করিতে বলি। বৈকালবেলা আমার কাকামহাশয়ের বাড়ীতে আমি গমন করিব।” বিজয়বাবু বলিলেন,- “দিনের বেলা আমি শয়ন করি না। ব্যাপার কি বল দেখি?” সুবালা উত্তর করিলেন, — “বৃত্তান্ত কি, তাহা বলিবার পূৰ্ব্বে আপনার নিকট আমার একটি নিবেদন আছে। আমার দুইটি অভিভাবক, —বাল্যকাল হইতে পিতৃমাতৃহীন এই বালিকাকে যাহারা প্ৰতিপালন করিয়াছেন,-আমার স্নেহে তাহারা মুগ্ধ হইয়া, আমার মঙ্গল কামনায় তাহারা একটি কাজ করিয়াছেন। কাজ যে নিতান্ত অন্যায়, তাহা তাহারা বুঝিতে পারেন নাই। যাহারা এ কাজে লিপ্ত ছিলেন, তাহাদিগকে ক্ষমা করিত্যুে হইবে। আপনার পায়ে ধরিয়া আমি এই ভিক্ষা প্রার্থনা করিতেছি।” (C) এই বলিয়া সুবালা মাটিতে বসিয়া বিজয়ব বিজয়বাবু তাঁহার হাত ধরিয়া তুলিলেন। তিনিগুলিলেন,—“না, মা! তুমি আমার পায়ে পড়িও না। দাদার সম্পর্কে তোমাকে আমার উচিত। কিন্তু কি জানি কেন, প্রথম হইতেই তোমাকে আমার মা বলিতে ইচ্ছা! । যেই তোমাকে প্রথম দেখিলাম, আর সেই শব্দ আমার মুখ দিয়া আপনা-আপনি বাহির হইয়া পড়িল! এত সম্পত্তির মোহ যে পরিত্যাগ করিতে পারে, সে দেবতা। তুমি মা লক্ষ্মীস্বরূপ!! পৃথিবীতে এমন কি বস্তু আছে, যাহা তোমাকে আমি দিতে না পারি? তোমার র্যাহারা মঙ্গল কামনা করিয়াছেন, তুমি না বলিলেও তাঁহাদিগকে ক্ষমা করিলাম। কেমন? এখন সন্তুষ্ট হইলে তো?” সুবালা একটু হাসিয়া বলিলেন, — “তবে যাই, বড়ালমহাশয়কে ডাকিয়া আনি। এ সম্পত্তির আমি কিছুই জানি না। তিনি জানেন, আর কােকা মহাশয় জানেন। বড়ালমহাশয় সমস্ত বিষয় আপনাকে বুঝাইয়া দিবেন। যাই, তাঁহাকে ডাকিয়া আনি।” বিজয়বাবু বলিলেন, — “এত ব্যস্ত হইও না। এই খাটের উপর আমার পার্শ্বে উপবেশন কর। এস। দুইজনে গল্প করি। আমার জ্যেষ্ঠ—তোমার দাদামহাশয়ের শেষকালে কি বড় কষ্ট ਏ?" সুবালা উত্তর করিলেন, — “তিনি পক্ষাঘাত রোগ দ্বারা আক্রান্ত হইয়াছিলেন। উঠিতেবসিতে পারিতেন না। সেজন্য অতিশয় ক্লেশ হইয়াছিল।” বিজয়বাবু বলিলেন,- “তুমি বোধ হয় জান যে, বড়ভাইয়ের ও তাঁহার পত্নীর সহিত আমার সদ্ভাব ছিল না। কেন, তাহা তোমার শুনিবার আবশ্যক নাই। কিন্তু আমার মনে কোন বিদ্বেষভাব ছিল না। যদি বল যে, তবে তুমি এখানে আসিতে না কেন? পীড়িত হইলে 8d দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comf"ঙলাকনাথ ********* তাহাদিগকে একবার দেখা নাই কেন? তাহার উপর এই যে, আমি তাঁহাদের কোন উপকার করিতে পারিতাম না। তাহার উপর আমাকে তাহারা বিষ-নয়নে দেখিতেন। আমি আসিলে তাহারা সন্তুষ্ট হইতেন না, বরং অসতুষ্ট হইতেন। কিন্তু আমি তাঁহাদের সংবাদ লইতাম। সেই সূত্রে তোমার কথাও আমি কিছু কিছু শুনিয়াছিলাম। বড়বীে তোমার দিদিমণি বৃদ্ধা হইয়াছিলেন?” সুবালা উত্তর করিলেন,- “র্তাহার চুল পাকিয়াছিল। তবে খুব যে তিনি বৃদ্ধ হইয়াছিলেন, তাহা বোধ হয় না। তাঁহার একখানি ছবি আছে—দেখিবেন?” বিজয়বাবু বলিলেন,- “কোথায় আছে? চল যাই, দেখি!” পূৰ্ব্বদিকের ঘরে যে স্থানে ছবি আছে, সেই দিকে দুইজনে বারাণ্ডা দিয়া গমন করিতে লাগিলেন। বিজয়বাবুর আগমনসংবাদ বিনয় পাইয়াছিলেন। সম্পত্তি সম্বন্ধে তিনি কি করেন, তাহা জানিবার নিমিত্ত বিনয় অতিশয় উৎসুক হইয়াছিলেন। তিনি ভাবিলেন,- “পূৰ্ব্বদিকের সিঁড়ি দিয়া গোপনে উপরে বসিয়া থাকি। কোন লোকের দ্বারা সুবালার নিকট সংবাদ পাঠাইব । সুবালা আসিলে তাঁহার প্রমুখাৎ সকল কথা অবগত হইব। খাদা ভূত এখন কি করিতেছে, তাহাও গিয়া দেখিব।” এইরূপ স্থির করিয়া বড়ালমহাশয়ের নিকট হইতে অন্ধকার ঘরের চাবি লইয়া তিনি চুপি-চুপি পূৰ্ব্বদিকের সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিলেন ও যে গৃহে রায়-গৃহিণীর মৃত্যু হইয়াছিল, সেই ঘরের খাটে গিয়া বসিলেন। সেদিকে চাকর-চাকরাণী কেহ আসিলে, তাহা দ্বারা সুবালাকে সংবাদ দিবেন, সেই প্ৰতীক্ষা করিয়া ৰু । কিন্তু অল্পক্ষিণ পরেই বিজয়বাবু ও সুবালার কণ্ঠস্বর তিনি শুনিতে পাইলেন। য়া তাহারা সেই ঘরের দিকে আসিতেছিলেন। মাঝের দ্বারের তালা খুলিয়া বিনয় অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করিলেন । মাদুরের উপর খাদা ভূত শুইয়াছিল। বিনয় — “সুবালা ও আর একজন ভদ্রলোক পাশের ঘরে আসিতেছেন । নিঃশব্দে , কথা কহিও না।” বিনয় ও খাদা ভুত চুপ করিয়া সেই ঘরে বসিয়া রহিলেন। বিজয়বাবু ও সুবালা পার্শ্বের ঘরে "আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ইহার দক্ষিণ গায়ে চােরকুঠরী বা অন্ধকার ঘর,-যে স্থানে খাদা ভূতের সহিত বিনয় বসিয়া আছেন। ইহার উত্তর গায়ে আর একটি শয়নাগার,-যে স্থানে পূর্বে রাজাবাবু শয়ন করিতেন ও যে স্থানে পরে সুবালার মাতা বাস করিতেন। রায়মহাশয় ও রায়-গৃহিণীর সম্বন্ধে নানা কথা হইতে লাগিল। বিজয়বাবু বলিলেন,- “আমি শুনিলাম যে, তোমার এখনও বিবাহ হয় নাই। সুবালা! সেই অবধি আমার মনে বড় আক্ষেপ হইতেছে। আমার এক পুত্ৰ আছে, একমাত্র পুত্র। অনেক দিন হইতে আমার গৃহিণী তাহার বিবাহের সম্বন্ধ স্থির করিয়া রাখিয়াছেন। আমি কথা দিয়াছি। সে কথার কিছুতেই আর অন্যথা হইতে পারে না । আহা সুবালা! দুই বৎসর আগে যদি তোমায় দেখিতাম। কন্যা বলিয়া তোমাকে কোলে লইতে আমার বড়ই সাধ হইতেছে। প্ৰাণ ভরিয়া তোমাকে মা-জননী বলিয়া ডাকিয়া ঘরে লাইতে বড়ই আমার বাসনা হইতেছে; কিন্তু মা কি করিব? কোন উপায় নাই!” সুবালা মস্তক অবনত করিয়া রহিলেন। কোন উত্তর করিলেন না। কিছুক্ষণ পরে তিনি বলিলেন, — “বড়ালমহাশয়কে বলিয়া আসি না কেন? কাগজপত্ৰ প্ৰস্তুত করিতে বিলম্ব হইবে।” বিজয়বাবু বলিলেন, — “পাগলি! আমি এ বিষয় লইব না। এ বিষয় তোমারই থাকিবে।”

      • firls six g3, 3e) - www.amarboicom a Գ8ֆ সুবালা বলিলেন, —“উইল প্রকৃত নহে।”

বিজয়বাবু উত্তর করিলেন,- “উইল প্রকৃত কি কৃত্রিম, তাহা আমি শুনিতে ইচ্ছা করি না; তাহা আমি জানিতে ইচ্ছাও করি না; আমি এই জানি যে, আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা এবং আমার ভ্ৰাতৃজায়া তোমাকে এই সম্পত্তি দিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন। তাঁহাই আমার পক্ষে যথেষ্ট।” সুবালা বলিলেন, — “আইন অনুসারে সম্পত্তি যদি আমার না হয়, তাহা হইলে পরের সম্পত্তি আমি লইব কেন?” এমন সময়- (ာ်) “হায়! হায়! হায়! হায়!" (ČS বিজয়বাবু ও সুবালার কর্ণকুহরে। সহসা এই কথা প্ৰবেশ করিল। -পুনরায়—“হা আমি হতভাগিনী! হায় হায়! হায়!” বামা-কণ্ঠস্বর। বারেণ্ডা হইতে নিদারুণ খেদোক্তি । হৃৎপিণ্ড ভেদ করিলে যেরূপ প্রবলবেগে রক্তধারা নিৰ্গত রূপ বক্তার ব্যথিত বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ করিয়া যেন এই বিলাপবাক্যগুলি বাহির হইতেছিল। বিজয়বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, — “ও কে?” সুবালা উত্তর করিলেন, — “জানি না। অপরিচিত লোক। চলুন, গিয়া দেখি।” ঘর হইতে বাহির হইবার সময় সুবালা দেখিলেন যে, অন্ধকার ঘরের দ্বার খোলা রহিয়াছে। দ্বারে তিনি শিকল দিয়া দিলেন। সুতরাং বিনয় সে ঘর হইতে আর বাহির হইতে পারিলেন না। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro ততীয় ভাগ প্ৰথম অধ্যায় সোনা-বীে সুবালা ও বিজয়বাবু বাহির হইয়া দেখিলেন যে, অপর ঘরের নিকট বারাণ্ডায় একজন অতি দীনহীনা মলিনবাসনা ভদ্রমহিলা দাড়াইয়া এইরূপ প্ৰলাপ বকিতেছেন। তাঁহার মুখ মলিন, তাহার। সৰ্ব্বশরীর মলিন,-ধূলায় ধূসরিত হইয়া আছে। তাঁহার বয়স হইয়াছে, তাহার চুল পাকিয়া গিয়াছে, তাহার চক্ষু বসিয়া গিয়াছে, তাহার চৰ্ম্ম কুঞ্চিত হইয়া গিয়াছে। তথাপি তাঁহার শ্বেত-লোহিত-মিশ্ৰিত গীেরবর্ণ, মুখশ্ৰী ও শরীরের গঠন দেখিয়া বোধ হইতেছিল যে, সময়ে তিনি একজন অসামান্য রূপবতী রমণী ছিলেন। ফ্যালফ্যাল করিয়া তিনি সেই ঘরের দিকে চাহিয়া আছেন। ঘরের ভিতর কে যেন আছে, তাহার সহিতই যেন তিনি কথা কহিতেছেন। কিন্তু সে দৃষ্টি অন্তরাত্মানিঃসৃত-প্রভাবিশিষ্ট ছিল ন্যাংরমণীকে দেখিয়াই সকলে বুঝিতে পারিলেন যে, তিনি ক্ষিপ্তা। C) বিজয়বাবু ও সুবালা তাঁহার নিকটে গিয়া দাঁড় । তাঁহাদের প্রতি একবার তিনি চাহিয়া দেখিলেন। অপর দিক হইতে বাড়ীর চাকরাণী, পিসীমা, বড়ালমহাশয়, বড়াল-গৃহিণী প্রভৃতি অনেকে আসিয়া দাঁড়াইলেন। দুই-একবার তিনি দৃষ্টি করিলেন। কিন্তু তাঁহার মন কোন মানুষকে, কোন দ্রব্যকে প্লীহ্য করিল না। বিকৃত মস্তকের বৃথা-কল্পনাগঠিত যে মানুষকে তিনি ঘরের ভিতর তিনি দেখিতেছিলেন, তাহার সহিতই তিনি কথোপকথন করিতেছেন । সুবালা জিজ্ঞাসা করিলেন, — “তুমি কে গা?” সুবালার দিকে তিনি চাহিয়াও দেখিলেন না, কিন্তু তাঁহার প্রশ্নের উত্তর দিলেন,- “আমি কে? শুনিলে রাজাবাবু! আমাকে ইহারা জিজ্ঞাসা করিতেছে—তুমি কে? আমি সব । আমি এ বাড়ীর সৰ্ব্বেসৰ্ব্বা। এ বাড়ী আমার, এ চাকর-বাকর আমার । এ জিনিসপত্র আমার! পাগল! তাই জিজ্ঞাসা করিতেছে যে, তুমি কে? আমি আর কে, আমি সোনা-বীে, আমি আদরের সোনা-বীে, আমি এই বাড়ীর অধীশ্বরী।” সুবালা বিজয়বাবুকে চুপি-চুপি বলিলেন,- “পূৰ্ব্বে এই বাড়ীর যিনি কৰ্ত্তা ছিলেনবেণীবাবু, যাহাকে লোকে রাজাবাবু বলিত, ইনি তাঁহার গৃহিণী।” বিজয়বাবুও চুপি-চুপি বলিলেন,- “আমি জানি। বেণীবাবুর মৃত্যুকালে আমি তাঁহার নিকট ছিলাম। পরে এই সোনা-বীেয়ের কথাও কিছু কিছু শুনিয়াছি। ইনি দেখিতেছি—উন্মাদ श्शाgछम ।" 酸 বড়ালমহাশয়ের আজ্ঞায় চাকর-চাকরাণীগণ সে স্থান হইতে প্ৰস্থান করিল। সে স্থানে পাপের পরিণাম Գ8v3) sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro উপস্থিত রহিলেন কেবল বিজয়বাবু, সুবালা, পিসীমা, বড়ালমহাশয় ও তাঁহার গৃহিণী। সোনা-বীে পুনরায় আপনা-আপনি প্ৰলাপ বকিতে লাগিলেন,- “হায়। আমি একদিন রাজরাণী ছিলাম। কিন্তু আজ আমি কি! হায়, হায়! আজি আমি কি! রাজাবাবু। রাজাবাবু! ওরূপ রুক্ষভাবে আমার উপর কটাক্ষপাত করিও না ।” দর-দর ধারায় সোনা-বীেয়ের দুই চক্ষু দিয়া বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল । চক্ষু মুছিয়া, –“কি বলিলে? রাজাবাবু! তুমি কি বলিলে? আমাকে তুমি ঘরের ভিতর ডাকিতেছ? আমি দাসী, আমাকে তুমি যা বলিবে, তাই করিব। আহা রাজাবাবু! যদি তোমার মুখ হইতে সেকালের মত একটি কথাও শুনিতে পাই, তাহা হইলে আমার জীবন সার্থক হয়। আমার বুকের ভিতর রাত্ৰি-দিন যে দাবানল জুলিতেছে, সে জ্বালা অনেকটা শীতল হয়।” ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়া,- “রাজাবাবু! এই ঘরে আমরা দুইজনে কত হাসি৷ হাসিয়াছিলাম, কত আহাদ-আমোদে কালাতিপাত করিয়াছিলাম। পা ঝুলাইয়া গায়ে-গায়ে দুইজনে খাটের উপর বসিতাম। তুমি বলিতে যে, “সৌন্দৰ্য্য বৃদ্ধি করিবার নিমিত্ত লোকে গহনা ও বস্ত্ৰাদি পরিয়া বেশভূষা করে, কিন্তু তোমার গায়ের বর্ণের নিকট সুবৰ্ণও বিবৰ্ণ হইয়া যায়।’ সেজন্য আদরে তুমি আমাকে সোনা-বীে বলিয়া ডাকিতে। আমার চুলের কোশা হাতে করিয়া তুমি বলিতে যে,-“লোকে আসিয়া আসিয়া দেখুক, আমার সোনা-বীেয়ের কেশগুচ্ছ কৃষ্ণবর্ণেরঞ্জিত বহুমূল্য রেশম অপেক্ষা অনেকগুণে উজ্জ্বল ও কোমল কি না!” নিবিড় হরিৎবর্ণের বনমধ্য দিয়া প্রবাহিত সূক্ষ্ম রাজতরেখা-সদৃশ বর্ষাকালের গিরিনিৰ্ব্বত্ত্বের সহিত তুমি আমার সীথির তুলনা করিতে। তুমি বলিতে,-“সূৰ্য্যালোকে আলোকিত কৃষ্ণহীরক-নিৰ্ম্মিত দুইটি তারা যদি সম্ভব হয়, তাহা হইলে কেবল তাহার তোমার নয়নযুগলের তুলনা হইতে পারে। ঈষৎ রক্তিমআভায় রঞ্জিত তোমার গণ্ডদেশ কবিগণ কখনও দেখিতেন, তাহা হইলে না। কবি বলিয়াছেন যে, তাহার সুন্দরীর আমার সোনা-বীেয়ের ওষ্ঠীদ্বয় ལ་ཀ་མ་ལ་ཤས་ সাগরগর্ভে গিয়া লুক্কায়িত হইয়াছে। মুক্তার লজ্জা আবার তাহা অপেক্ষা অধিক। অতল জলধিতলে গিয়াও তাহারা সুস্থির হয় নাই। তোমার দন্তপাতি দেখিয়া মনের ঘূণায় তাহারা শুক্তিগর্ভে গিয়া আশ্রয় গ্ৰহণ করিয়াছে।” মনে আছে কি, রাজাবাবু! এইরূপ কতপ্রকার উপমা দিয়া তুমি আমার সৌন্দর্ঘ্যের প্রশংসা করিতে?” কপালে করাঘাত করিয়া, সোনা-বীে পুনরায় বলিলেন,-“হায় হায়! আমি কি অভাগিনী যে, সে ভালবাসা হইতে আমি বঞ্চিত হইলাম। তোমার ভালবাসার কথা শুনিব বলিয়া কোন কোন দিন আমি মান করিয়া বসিয়া থাকিতাম। কত সুমিষ্ট সম্ভাষণে তুমি আমার সেই মান ভাঙ্গিতে চেষ্টা করিতে? সেসব কথা শুনিয়া মনে আমার আনন্দ হইত; কিন্তু আরও আদর পাইব বলিয়া আমি মুখ গভীর করিয়া থাকিতাম। যখন দেখিতাম যে, তোমার ঘোরতর ক্লেশ হইতেছে, তখন ভাবিতাম, আর একবার সাধ্যসাধনা করিলেই মান ঘুচাইয়া তোমার সহিত কথা কহিব। কিন্তু যখন পুনরায় সুমিষ্টস্বরে তুমি আমাকে সাধিতে, তখন এই হতভাগিনী অভিমানিনী হইয়া ঘোমটা টানিয়া মুখ আবৃত করিয়া বসিয়া থাকিত। শেষে যখন আমি মান ংবরণ করিতাম, তখন রাজাবাবু! তুমি স্বৰ্গসুখ লাভ করিতে। প্ৰফুল্লবদনে গ্ৰীতিপূর্ণলোচনে তখন যেরূপ আমার প্রতি দৃষ্টি করিতে, আজ একবার—কেবল একবার, নিমেষমাত্রের জন্য,-সেই মধুরভাবাপন্ন কটাক্ষপাত করিয়া এ দুঃখিনীর দুঃখ নিরীক্ষণ করা। যাহার একটু মাথা ধরিলে Գ88 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com/f4র্জািপঠা"ৰ ********* বৃশ্চিক দ্বারা অহরহ দংশিত হইতেছে। ভালবাসা দূরে থাকুক, পীড়িত তাপিতা দীন-দুঃখিনীর প্রতি তুমি যে দয়া করিতে, তোমার আদরের সোনা-বীে আজ সে দয়ারও পাত্রী নহে!” সোনা-বীে মাটিতে বসিয়া পড়িলেন। দুই হাতে চক্ষু আবৃত করিয়া কাঁদিতে লাগিলেন। ফেলিলেন। বলিলেন,- “তুই ছুড়ি কেলা? গেল যা! যাঃ!” বিজয়বাবু সুবালাকে চুপি-চুপি বলিলেন,- “এখন তুমি উহার নিকট যাইও না। শুন, আরও কি বলেন। মনের দুঃখ ব্যক্ত করিলে কথঞ্চিৎ শান্তিলাভ করিবেন।” সোনা-বীে পুনরায় দাড়াইয়া ঘরের একদিকে লক্ষ্য করিয়া বলিতে লাগিলেন,- “রাজাবাবু! একবার তুমি এ দুঃখিনীর প্রতি কৃপা-কটাক্ষ করিলে না? আমি পাপীয়সী, কৃপার পাত্ৰী আমি নই। হায় মা! এ হতভাগিনীকে কেন তুমি স্তনাদুগ্ধে প্রতিপালন করিয়াছিলে? সূতিকাগারে মুখে লবণ দিয়া কেন তুমি তাহার প্রাণবধ করা নাই? মা। আমাকে ডাকিয়া লিও মা! আমি আর এ যন্ত্রণা সহ্য করিতে পারি না। রাজাবাবু! মুখে হাত দিয়া এইমাত্র আমি কত কীদিলাম। আমি আশা করিয়াছিলাম যে, স্নেহের সহিত তুমি আমার হাত টানিয়া লইবে! মধুর বাক্যে তুমি আমাকে সান্তনা করিবে। হায় হায়! পুরাতন কথা যে ভুলিতে পারি না। আমি কি করি । কোথায় যাই! “এই ঘরে আমরা পরমসুখে কালব্যাপন করি ।। গ্রামের লোক আমার নিকট যোড়হাত করিয়া থাকিত। দাস-দাসীগণ আমার পরিচর্য্যা করিত। বহুমূল্য বসন-ভুষণে আমি ভাবছিল না। আমি রাজরাণী ছিলাম। সকল ছলাম। কিন্তু তাহাতেও আমি তৃপ্তিলাভ “ধিক! ধিক আমাকে! ধিক আমার জপে। ধিক আমার তপে! সেই সময় হইতে, রাজাবাবু, তোমার আমাতে ছাড়াছাড়ি আরম্ভ হইল। আহারাদি সম্বন্ধে তোমার আচার-ব্যবহার একরূপ ছিল, আমার অন্যরূপ ছিল। ফুল-বিল্বদল দিয়া আমি ঠাকুরের পূজা করিতাম, তুমি ভগবানের প্রিয় কাৰ্য সাধন করিয়া তাহার উপাসনা করিতে। দুইজনে সেরূপ আর মনের মিল রহিল না। “তাহার পর কালসৰ্পকে তুমি বাড়ীতে আনিলে। সে যে কালসৰ্প, তখন আমি তাহা বুঝিতে পারি নাই। তপস্বীজ্ঞানে তাহাকে আমি পূজা করিতে লাগিলাম। এ বস্তু খাইবে, সে বস্তু খাইবে না,-ইহাই ধৰ্ম্ম। প্রথম প্রথম তিনি দুগ্ধপান করিয়া জীবনধারণ করিতেন। গ্রামের লোক ভাঙ্গিয়া পড়িল। সকলে তাঁহার পূজা করিতে লাগিল। আমিও তাঁহার পূজা করিতে লাগিলাম। ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে তিনি আমাকে উপদেশ দিতে লাগিলেন । তুমি, রাজাবাবু, নানাবস্তু আহার করিবে: তিনি দুগ্ধ খাইয়া থাকিতেন। তাহাতে আমি বুঝিলাম যে, তুমি ঘোর অধাৰ্ম্মিক, তিনি দেবতা। তোমার প্রতি ঘৃণা ও তাঁহার প্রতি ভক্তি দিন দিন আমার বৃদ্ধি হইতে লাগিল। তিনি আমার গুরুদেব হইলেন ।” পাপের পরিণাময় sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro Գ86: দ্বিতীয় অধ্যায়। ঘোর অনুতাপ বিজয়বাবু চুপি-চুপি বড়ালমহাশয়কে জিজ্ঞাসা করিলেন,— “কালা-বাবা? খাদা ভূত? যাহার নাক আমার নিকট আছে?” বড়ালমহাশয় উত্তর করিলেন, — “হী। আমরা ভ্ৰমে পতিত হইয়াছিলাম। সে মনে নাই। এই বাড়ীতে এখন সে লুক্কায়িত আছে। বিধাতার লীলা বুঝিতে পারা যায় না। এতকাল পরে পুনরায় দুইজনকে তিনি একত্র করিয়াছেন।” বিজয়বাবু বলিলেন,- “এই বাড়ীতে সে লুক্কায়িত আছে? আশ্চৰ্য্য! বিধাতা আমাকেও ঠিক এই সময়ে এস্থানে আনিয়াছেন।” সোনা-বীে পুনরায় বলিতে লাগিলেন,— “রাজাবাবু! গুরুদেবকে তুমি বাড়ী হইতে দূর করিয়া দিলে। সে যে কালসৰ্প, তখন আমি বুঝিতে পারি নাই। সেইজন্য গুরুদেব বলিতেছি। নদীকূলে শিবমন্দিরে গিয়া তিনি বাস করিতে লাগিলেন। তখন হইতে, রাজাবাবু, তোমার প্রতি আমার ঘোরতর অভক্তি হইল। তোমার নিকট থাকিতে, তোমার নিকট বসিতে আমি একেবারেই ইচ্ছা করিতাম না। প্রথম তুমি আমাকে অনেক বুঝাইলে, অনেক উপদেশ দিলে। তোমার উপদেশ আমি গ্ৰহণ করিলাম না। তোমার কথা আমার কানে যেন বিষ ঢালিয়া দিল । “নীচের ঘরে যে জানালা আছে, তাহার দুইটি র গর্যাদ গুরুদেব শিথিল করিয়া দিলেন। সেই পথ দিয়া গভীর রাত্ৰিতে গোপনে এই বাটীর ভিতর প্রবেশ করিতেন। কখন বা আমিও তাঁহার নিকট গমন করি তিনি আমাকে শিক্ষা দিলেন যে,-- “দেবীর পূজায় সুরা আবশ্যক। ইহাকে কুৰ্ব্ব আমিও পান করিতে শিক্ষা করিলাম। ফ্ৰান্স এতদূর অভ্যাস হইল যে, সুরাপান না করিয়া আমি থাকিতে পারিতাম না। সে সময় যদি কেহ আমাকে জিজ্ঞাসা করিত যে, তুমি সুরা চাও, কি প্ৰাণ চাও? অকাতরে আমি বলিতে পারিতাম যে, আমি সুরা চাই, প্ৰাণ চাই না। “রাজাবাবু! ধন্য সহ্য তোমার। তুমি সব জানিতে। আমি স্ত্রীলোক, সেজন্য তুমি আমার গায়ে হাত তুলিতে না। কিন্তু আমার প্রতি তােমার ঘোরতর ঘূণা হইয়াছিল। আমাকে উপদেশ প্রদানে তুমি ক্ষান্ত হইলে। বৃক্ষাবলম্বনী বিষময়ী লতাকে ছিড়িয়া বন্যহন্তীক যেরূপ পদদলিত করে, তোমার হৃদয় হইতে আমাকেও সেইরূপ ছিড়িয়া, মনে মনে তুমি পদদলিত করিতে লাগিলে। আমি তখন গর্ভবতী। সেইজন্য তুমি বােধ হয় আমাকে বাড়ী হইতে দূর করিলে না। পাছে তুমি সুরার গন্ধ পাও, সেইজন্য পূৰ্ব্ব হইতেই আমি ঐ পার্থের ঘরে শয়ন করিতেছিলাম। তুমি কিছুমাত্র আপত্তি করিলে না। “আমাদের খুকী হইল। ঐ পার্শ্বের ঘরে খুকীকে লইয়া আমি শয়ন করিতাম। খুকীর। দাই-মন্দাকিনী, নিম্নে মেজেতে শয়ন করিত। খুকী শিশু। পাপ-পুণ্যের বিষয় সে কি জানে! রাজাবাবু, তুমি দয়াময়। সকল জীবের প্রতি তোমার দয়া ও ভালবাসা। নিরীহ খুকীর প্রতি তুমি মন ও প্ৰাণ সমৰ্পণ করিলে। “কিন্তু আমি? আমি পাপিষ্ঠা-খুকীকে গলগ্ৰহ বলিয়া বিবেচনা করিলাম। মাঝে মাঝে মন্দাকিনীকে আমি ছুটি দিতাম। সে আপনার ঘরে চলিয়া যাইত। খুকীকে একেলা ফেলিয়া গভীর রাত্ৰিতে আমি শিবমন্দিরে চলিয়া যাইতাম । B দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comঙিািলকানাথ স্নচ"সংগ্ৰহ “ও-ঘরে যাইতে আজ্ঞা করিতেছ? যেস্থান খুকী একেলা পড়িয়া থাকিত, সেই স্থান পুনরায় আমাকে দেখিতে বলিতেছ? আচ্ছা রাজাবাবু, চল তবে ও-ঘরে যাই।” দুই ঘরের মাঝে দ্বার ছিল। সে দ্বারা দিয়া সোনা-বীে অপর ঘরে প্রবেশ করিলেন। যে ঘরে রায়-গৃহিণীর মৃত্যু হইয়াছিল, এ সেই ঘর। বিজয়বাবু, সুবালা, পিসীমা, বড়ালমহাশয় ও বড়াল-গৃহিণী, সকলেই অবাক হইয়া তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ সেই ঘরে গমন করিলেন। সোনা-বীে বলিলেন, — “এই খাটের উপর আমি শয়ন করিতাম। খুকী আমার কাছে থাকিত। নীচে ঐ স্থানে মন্দাকিনী শুইয়া থাকিত। “খুকী ছয় মাসের হইল। সে হাসিতে শিখিল । তাহার শিশুমুখের হাসি ও তোমার সহাস্যবন্দন একত্র হইয়া কেমন এক অপূৰ্ব্ব শোভা উৎপাদন করিত। কিন্তু তখন আমি অন্ধ ছিলাম। সে শোভা তখন আমার নয়নগোচর হইত না। বরং রাজাবাবু, মনে মনে তোমাকে আমি তখন বিদ্রুপ করিতাম । আমি ভাবিতাম- “এত কেন? কন্যা কি কাহারও হয় না!” “খুকী ছয় মাসের হইল। দীত উঠিবার উপক্রম হইল। সেই সূত্রে তাহার জুর হইল। সমস্ত দিন তুমি তাহাকে বুকে করিয়া রহিলে। রাত্ৰিতে তাহাকে লইয়া আমি শয়ন করিলাম। খুকীর অসুখ; তথাপি মন্দাকিনীকে আমি ছুটি দিলাম। গ্রামের ভিতর আপনার বাড়ী সে চলিয়া গেল। দুই শয়নাগারের মধ্যস্থলের দ্বার তুমি খোলা রাখিয়াছিলে। আস্তে আস্তে আমি বন্ধ করিয়া দিলাম। খুকীর অসুখ । রাক্ষসী মা, আমি তাহাকে ফেলিয়া আমি চলিয়া গেলাম! “শেষ রাত্রিতে বাটীতে ফিরিয়া আসিলাম। দেখ্রিলাম যে, আমার শয়নঘরে আলো জুলিতেছে। তখন আমার শরীরের ও মনের স্থিরতু না। আমার মুখ দিয়া গন্ধ বাহির হইতেছিল । আলো দেখিয়া আমার বিকল বীরুৎসাির্নকটা স্থির হইল। সভায়ে আমি ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম যে, হােমিওপ্যাথি ঔষধের বাক্সটি নিকটে রাখিয়া খুকীর। পার্থে তুমি বসিয়া আছ। একহাতু মুঠুকুঞ্জি খুকী তোমার হাত ধরিয়া আছে। মুখ তুলিয়া একবারমাত্ৰ তুমি আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলে। তাহার পর পুনরায় মস্তক অবনত করিয়া খুকীর মুখপান চাহিয়া রহিলে। ভয়ে ভয়ে আমি খুকীর অপর পার্শ্বে গিয়া বসিলাম। তাহার অন্য হাতটি আমি ধরিলাম। আমার হাত সে মুঠা করিয়া ধরিল না। রাক্ষসী মাতাকে স্পর্শ করিতে যেন তাহার ঘূণা বােধ হইল! “তুমি কোন কথা বলিলে না। একটি কথাও তুমি আমার সহিত কহিলে না। তখনও না, পরেও না। খুকীর তাড়কা হইল। অনেকক্ষণ পরে সেবারের তাড়কা হইতে সে অব্যাহতি পাইল । “প্ৰাতঃকালে ডাক্তার আসিল । কোন ফল হইল না। আরও তিনবার তাড়কা হইল। রাক্ষসী মাকে পরিত্যাগ করিয়া এ পাপ-ইহধাম হইতে খুকী চলিয়া গেল! হায় রাজাবাবু, তোমার সহিত আমার সে সামান্য বন্ধন ছিল, জনমের মত তাহাও ছিন্ন হইয়া গেল।” খাটের উপর উপবেশন করিয়া, দুই হস্ত দ্বারা মুখ ঢাকিয়া সোনা-বীে পুনরায় ক্ৰন্দন করিতে লাগিলেন। কিছুকাল পরে চক্ষু মুছিয়া বলিতে লাগিলেন,- “সেইদিন হইতে আমরা বুঝিলাম যে, আর আমাদের মঙ্গল নাই। আমরা আর কে?— গুরুদেব ও আমি । ধ্যানস্থ হইয়া শুরুদেব দেখিলেন যে, তুমি দেবীর ভক্ষ্য। তোমাকে বলি দিতে পারিলে অক্ষয় পুণ্য লাভ হয়। গুরুদেব পুনরায় ধ্যানস্থ হইয়া দেখিলেন যে, তুমি শূলিনী দেবীর ভক্ষ্য। তোমাকে ভক্ষণ করিবার নিমিত্ত শূলিনী দেবী মুখবাদন করিয়া আছেন।” পাপের পরিণাম দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ Գ8Գ “এ নিষ্ঠুর প্রস্তাবে প্রথম আমি সম্মত হই নাই; কিন্তু গুরুদেব নানা প্রকার শাস্ত্রের বচন বলিয়া আমাকে প্ৰবোধ দিলেন। তিনি বলিলেন,-স্বামী অপেক্ষা স্ত্রীলোকের আর প্রিয়বস্তু নাই। দাতাকৰ্ণ বা কি করিয়াছিলেন। তাহা অপেক্ষা স্বামী-বলি শতগুণ ফলপ্রদ। স্বয়ং ইন্দ্র স্বৰ্গ হইতে পুষ্পক রথ প্রেরণ করবেন। তাহাতে আরোহণ করিয়া আমরা তিনজনে স্বৰ্গে গমন করিব।” “গুরুদেব সকল বস্তুর আয়োজন করিলেন। যে ঔষধ আঘাণ করিলে লোক অচেতন হয়, প্রথম তিনি সেই ঔষধ সংগ্ৰহ করিলেন । শূলিনী দেবীকে বলি প্রদত্ত হইবে, সেজন্য শূলপ্রয়ােগে বধ করিতে হইবে। কাঠের বঁটি-সম্বলিত তীক্ষাগ্ৰ লীেহনিৰ্ম্মিত ছােট একটি শূল। তিনি গড়াইলেন। কাষ্ঠ হইতে প্ৰস্তৃত অনেকগুলি নিধুম কয়লা সংগ্ৰহ করিয়া তিনি এই খাটের নীচে লুক্কায়িত রাখিলেন। তিনি স্থির করিলেন যে, গভীর রাত্রিতে, তুমি রাজাবাবু, যখন নিদ্রিত থাকিবে, তখন ঔষধ আঘাণে তোমাকে অজ্ঞান করা হইবে; তাহার পর আমার এই ঘরে কয়লার আগুন করিয়া সেই অগ্নির উত্তাপে লৌহনিৰ্ম্মিত শূলকে রক্তবর্ণ করিতে হইবে। তিনি দিব। উত্তপ্ত শূল প্রয়োগে শরীরের ভিতর নাড়ীভূড় সমুদয় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ও দগ্ধ হইয়া তৎক্ষণাৎ তােমার মৃত্যু হইবে। শরীরের বাহিরে কোনরূপ চিহ্ন থাকিবে না।” সোনা-বীে কাঁদিতে কাঁদিতে বলিতে লাগিলেন,- “ওঃ! কি নিষ্ঠুরতা! মনে করিতে গেলে আমার শরীর এখনও শিহরিয়া উঠে। রাজাবাবু! আমার ন্যায় পাপীয়সী রাক্ষসী পৃথিবীতে আর কে আছে? আমার মনে হয় যে, আমি মানবী নই, পিশাচী । ক্ষমা?- এ পাপের ক্ষমা নাই। রাজাবাবু। তোমার নিকট ক্ষমা চাইতেও 6वी६ श । "নির্দিষ্ট দিনে সমুদয় আয়ােজন হইল। ঘোর ৱিৰ্নিৰ্তে বাড়ীর লোক সকল যখন সুষুণ্ড হইল, তখন গুরুদেব জানালা-পথে নিঃশব্দে বাড়ীর র প্রবেশ করিলেন। তুমি রাজাবাবু, অঘোর নিদ্রায় অভিভূত হইয়া ছিলে। একখানি ঔষধে সিক্ত করিয়া, তাহা দ্বারা তোমার মুখ ও নাসিকা আমরা চাপা দিলাম। হাত তুমি মুখ হইতে রুমাল দূর করিতে চেষ্টা করিলে। আমরা তোমার হাত ধরিয়া । তুমি পাশ ফিরিতে চেষ্টা করিলে। তাহাও আমরা বলপূৰ্ব্বক নিবারণ করিলাম। অবিলম্বে তুমি অজ্ঞান হইয়া পড়িলে। কয়লার আগুন করিয়া তাহার ভিতর লৌহশূল কিছুক্ষণের নিমিত্ত প্রবিষ্ট করিয়া রাখিলাম। উত্তাপে লোহিতবর্ণ হইয়া শূল গান গন করিতে লাগিল। সে সময় তাহার আকার সাক্ষাৎ যমস্বরূপ অতি ভয়ঙ্কর হইয়া উঠিল। মন্ত্রপূত করিয়া গুরুদেব সেই শূল আমার হস্তে প্ৰদান করিলেন। মন্ত্র দ্বারা শূলিনী দেবীর তিনি আরাধনা করিতে লাগিলেন ও শূলপ্রয়ােগ করিবার নিমিত্ত বার বার তিনি আমাকে আদেশ করিতে লাগিলেন। কিন্তু সে নিষ্ঠুর কাজ করিতে আমি পারিলাম না। আমার হাত-পা কঁাপিতে লাগিল। হস্ত কম্পিত হইয়া রক্তবর্ণ শূল আমার পরিধেয় বস্ত্ৰে লাগিয়া গেল। কাপড় তৎক্ষণাৎ জুলিয়া উঠিল। আমি চীৎকার করিয়া উঠিলাম। সেই জ্বলন্ত কাপড় ও উত্তপ্ত শূল। ঘরের মাঝে ফেলিয়া আমি সে স্থান হইতে পলায়ন করিলাম।” বড়ালমহাশয় বিজয়বাবুকে চুপি চুপি বলিলেন,— “সে শূল আমি দেখিয়াছি। রাজাবাবু যখন বিদেশে গমন করিলেন, তখন তাঁহার চাকর বীরু সেই শূল সঙ্গে লইয়া গিয়াছিল। তা না হইলে আপনাকে আমি দেখাইতে পারিতাম।” সোনা-বেঁী বলিতে লাগিলেন,- “আমার চীৎকার শুনিয়া বীরু দৌড়িয়া আসিল । বড়ালমহাশয় আসিলেন। গুরুদেবকে বীরু ধরিয়া ফেলিল। তোমাকে সচেতন করিল। তাহার Գ8Ե দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.comf"ঙলাকনাথ রচনাসংগ্ৰহ পায় যাহা হইল, তাহা আমি কি বলিব! “পলায়ন করিয়া আমি আমার ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলাম। অন্য একখানি কাপড় পরিধান করিলাম। সম্মুখের টাকা-কড়ি, গহনা-পত্ৰ যাহা কিছু পাইলাম, তাহা লইয়া বাটী হইতে বাহির হইলাম। শিবের মন্দিরে গিয়া মাটিতে পড়িয়া কাঁদিতে লাগিলাম । “কিছুক্ষণ পরে গুরুদেব গিয়া সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন। দেখিলাম যে, তোমরা তাঁহার নাসিকা কৰ্ত্তন করিয়াছ। তাঁহার বক্ষঃস্থল রক্তে ভাসিয়া যাইতেছে। একখানি কাপড় ছিড়িয়া জলে ভিজাইয়া আমি তাঁহার মুখে বঁাধিয়া দিলাম। তিনি নালিশ করিবার প্রস্তাব করিলেন। আমি তাহাতে সম্মত হইলাম না । “প্রাণভয়ে গুরুদেব এ গ্রাম হইতে পলায়ন করিলেন। পিতৃকুলে, মাতুলকুলে, কোন কুলে আমার স্থান ছিল না। আমি তাঁহার সঙ্গে গমন করিলাম। প্ৰথমে আমরা কাশী যাইলাম। ক্রমে হিমালয় পৰ্ব্বতে গিয়া উঠিলাম। সে স্থানে বড় শীত। দূরে আবৃত শ্বেতবর্ণের। পৰ্ব্বতশ্রেণী দেখিতে পাইলাম। তাহার পর পাহাড় হইতে নামিয়া নানাদেশে ভ্ৰমণ করিয়া বৃহৎ একটি নগরে গিয়া পৌছিলাম। “ক্রমে আমার চক্ষু উনীলিত হইল। আমি যে অতি মহাপাতকে পাতাকিনী হইয়াছি, তাহা আমি বুঝিতে পারিলাম। ইহ-জীবনে এ পাপের ক্ষমা নাই, তাহা জানিয়া আমি হতাশ হইয়া পড়িলাম। 'এ জীবনে আমাকে কেহ আর আদর করিবে না। সকলেই আমাকে দূর দূর করিবে।” —এই সমুদয় ভাবিয়া-চিন্তিয়া ঘোর প। আমার হৃদয় দগ্ধ হইল । কালাবাবাকে গুরু বলিতে আর আমার প্রবৃত্তি হইল না। ঘোর শক্ৰ, সে যে আমার সর্বনাশ করিয়াছে তাহা আমি বুঝিতে পারিলাম। রাত্রি দ্বিনির্মামি তাহাকে তিরস্কার করিতে লাগিলাম। আহা! রাজাবাবু, কেন তুমি সে কালসৰ্পকে ঘুরে “সেই পিশাচ, আমার গহনা ও লুক্কুড়ি যাহা ছিল, তাহা লইয়া একদিন গােপনে প্ৰস্থান লোকের কথা আমি বুঝিতে পারি না, তাহারাও আমার কথা বুঝিতে পারে না। সহায়হীনা, অর্থহীনা, অনাথিনী হইয়া আমি পথে পথে ঘুরিতে লাগিলাম। ভাগ্যক্রমে সে দেশের এক ব্ৰাহ্মণী আমার প্রতি কৃপা করিয়া তাঁহার ঘরে স্থান দিলেন। ব্ৰাহ্মণ-ব্ৰাহ্মণী গরীব। তাহারা যেরূপ শুল্ক রুটী আহার করিতেন, আমাকেও তাহা খাইতে দিতেন। কয়েক মাস অতি কষ্টে তাহাদের ঘরে আমি দিনপাত করিলাম।” তৃতীয় অধ্যায় ঝমােঝমির গাছ সোনা-বীে বলিতেছে,- “রাত্রিকাল। এক দিন আমি নিদ্রা যাইতেছি। সহসা আমার নিদ্রা ভঙ্গ হইল। চক্ষু চাহিয়া আমি দেখিলাম যে, রাজাবাবু, তুমি আমার সম্মুখে দণ্ডায়মান রহিয়াছ। তাড়াতাড়ি আমি উঠিয়া বসিলাম। আনন্দের আর সীমা রহিল না। আমি ভাবিলাম যে, তুমি পাপের পরিণাম। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro 8 আমার প্রতি ভালবাসা এখনও ভুলিতে পার নাই। আমার ঘোর দুৰ্গতি দেখিয়া তোমার মনে দয়া হইয়াছে। আমার অপরাধ তুমি ক্ষমা করিয়াছ। অনাথিনী দাদাকে তুমি লইতে আসিয়ােছ। পুনরায় আমি তোমার সোনা-বীে হইব । পুনরায় তুমি আমাকে আদর করিবে । পুনরায় সেই সুখের দিন ফিরিয়া আসিবে। “তোমার পা দুইটি ধরিবার নিমিত্ত দুই হাত বাড়াইয়া, বসিয়া বসিয়াই আমি তোমার দিকে অগ্রসর হইলাম। হায়! ঘোর ঘূণার চক্ষে আমার প্রতি কটাক্ষপাত করিয়া তুমি সরিয়া দীড়াইলে। গলিত পচিত দুৰ্গন্ধযুক্ত অপবিত্র বস্তুর স্পৰ্শভয়ে লোকে যেরূপ সত্বর দূরে গমন করে, সেইরূপ তুমি আমার নিকট হইতে সরিয়া দাঁড়াইলে। হায়, হায়! আমি কি ছিলাম আর কি হইলাম! “তুমি বলিলে,- “সোনা-বীে! বলি দিবার নিমিত্ত তোমরা আমাকে উৎসর্গ করিয়াছিলে। দেবী আমাকে গ্ৰহণ করিয়াছেন। আমার মৃত্যু হইয়াছে। এখন বাড়ী যাও। তোমাদের সুখের পথ হইতে কণ্টক দূর হইয়াছে। কোথায় আমি সব সোনার ইট লুক্কায়িত রাখিয়াছি, তাহা তুমি অবগত আছ। যাও, সেই ধন গিয়া বাহির করা। কালা-বাবাকেও আমি সেই স্থানে যাইতে অনুরোধ করিয়াছি, সেও সেই বাড়ীতে যাইতেছে। তুমিও যাও। সোনার ইট বাহির করিয়া দুইজনে পরম সুখে কালব্যাপন কর।” “আমি বলিতে যাইতেছিলাম যে,-রাজাবাবু! আমি আর দেশে যাইব না, আমি আর সে বাড়ীতে যাইব না। আমি আর কলা-মুখ সন্ন্যাসীর মুখ দেখিব না। তোমার সোনার ইটে আমার প্রয়ােজন নাই। পৃথিবীর ঐশ্বর্ঘ্যে আর আমার নাই। আমি কেবল এই চাই যে, তােমার ঐ পা দুখানি একবার আমার মাথায় উপ্ৰৱঞ্জাখিয়া দাও। “কিন্তু মুখ তুলিয়া যেই চাহিলাম, আর দুৰ্গলাম যে, তুমি সে স্থানে নাই। কি জানি কেন, কিন্তু সেইদিন হইতে সকলে বলিতে যে, ঐ ক্যাঙ্গালিনী ক্ষিপ্ত হইয়া গিয়াছে। তুমি তাহার পর আমার নিকট সৰ্ব্বদা এবং এই বাড়ীতে আসিবার নিমিত্ত সৰ্ব্বদা আমাকে উত্তেজিত করিতে। আমি তোমাকে” দেখিতে পাইতাম, কিন্তু অন্য কেহ তোমাকে দেখিতে পাইত না;—সেই জন্য কি লোকে আমাকে পাগলিনী বলিত? আমি তোমার সহিত কথা কহিতাম, ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া সৰ্ব্বদা আমি রোদন করিতাম, নিজের দুঃখের কাহিনী স্মরণ করিয়া অফুটস্বরে বিলাপ করিতাম;— সেই জন্য কি লোকে বলিত যে, ঐ দেখ, পাগলী প্ৰলাপ বকিতেছে। রুক্ষ কেশ, মলিন বেশ, কাদা ধূলা মাখিয়া থাকিতাম। ব্ৰাহ্মণী দয়া করিয়া আহার দিলে, সে আহার পড়িয়া থাকিত, সেদিকে ফিরিয়াও চাহিতাম না। রাত্রিতে নিদ্রা যাইতাম না, বসিয়া বসিয়া কেবল কাদিতাম,-সেই জন্য কি লোকে বলিত যে ঐ স্ত্রীলোকটা ক্ষিপ্ত হইয়াছে? “কোন মুখে এ বাড়ীতে আমি আসিব? যে স্থানে আমি রাজরাণী ছিলাম, এ পোড়ামুখ সে স্থানে আমি কি করিয়া দেখাইব? বাড়ী আসিতে আমার প্রবৃত্তি হইল না। কিন্তু তুমি আমাকে টানিয়া আনিলে। দিন নাই, রাত্রি নাই, সৰ্ব্বদা তুমি আমার নিকট আসিয়া বলিতে, —“চল, চল, বাড়ী চল। বাড়ী গিয়া সোনার ইট লও।” “ঘোর অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে এইদিকে আসিতে হইল। কলিকাতা কোন দিক দিয়া যাইতে হয়,-“এই কথা লোককে জিজ্ঞাসা করিয়া ধীরে ধীরে আমি বঙ্গদেশের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। কোনদিন আধক্রোশ, কোনদিন একক্রোশ পথ চালিতাম। কখন বা পথ Գ&o দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.comািলকানার্থ রচনা সৎগই চালিতাম। কখন বা পথ চালিতাম না। পথে ঘাটে গাছতলায় পড়িয়া থাকিতাম। কুকুরকে যেরূপ লোকে আহারীয় সামগ্ৰী ফেলিয়া দেয়, সেইভাবে যদি কেহ আমাকে কিছু খাইতে দিত, তবেই আমি খাইতাম, নতুবা অন্যহারে আমি পড়িয়া থাকিতাম। দুৰ্ব্বলতায় তখন আর পথ চলিতে পারিতাম না। মৃত্যুকামনা করিয়া পথের পার্শ্বে অথবা গাছতলায় পড়িয়া থাকিতাম। মুমূর্ষ। অবস্থায় পথে পতিত দেখিয়া কতবার লোকে আমাকে হাসপাতালে লইয়া গিয়াছিল। ইচ্ছায় হউক, অনিচ্ছায় হউক,-তোমার আদেশ প্রতিপালিত হইয়াছে। যে স্থানে পরম সুখ উপভোগ করিয়াছিলাম, যে স্থানে পরে এই মুখ পুড়িয়াছিল, বহুকাল পরে পুনরায় সেইস্থানে আসিয়াছি। “এখন, রাজাবাবু আমাকে ক্ষমা কর। তুমি দয়াময়। ক্ষমার পাত্রী আমি না হইলেও নিজ গুণে তুমি আমাকে ক্ষমা কর। হায়, রাজাবাবু! তোমার কি মনে পড়ে—একবার আমার জুর হইয়াছিল। আহার-নিদ্ৰা পরিত্যাগ করিয়া দুই হাতে আমার একটি হাত ধরিয়া, আমার মুখের দিকে চাহিয়া দিবারাত্ৰি তুমি আমার পার্শ্বে বসিয়াছিলে? হায়! সে একদিন গিয়াছে, আর আজ একদিন । এ সামান্য জুর নয়। ভীষণ দাবানলে আমি দগ্ধ হইতেছি, তথাপি তোমার স্নেহ নাই, তোমার মমতা নাই, তোমার দয়া নাই। কিন্তু তোমার দোষ নাই, রাজাবাবু! কালভুজঙ্গীকে কে দয়া করে? কুল-ভুজঙ্গী অপেক্ষাও আমি অধম। আমি পিশাচী । আর আমার সহ্য হয় না। শরীর দগ্ধ হইতেছে, কিন্তু একবারে ভস্মীভূত হয় না কেন? তোমার জন্য যে শূল আমরা প্রস্তুত সেইরূপ শত শত উত্তপ্ত রক্তবর্ণের শূল দিয়া কে যেন মুহুর্মুহুঃ আমার মস্তিষ্ক বিদীর্ণ করিতেছে ও হৃৎপিণ্ড বিদ্ধ করিতেছে। নিদ্রা? —কতকাল যাই নাই, তাহা বলিতে পারি না। নিদ্ৰা কাহাকে বলে, তাহা ভুলিয়া গিয়াছি। আমি খাটের উপর শয়ন করিলাম । পা আমার মাথার উপরে দাও । পাপের যথেষ্ট প্ৰায়শ্চিত্ত হইয়াছে। এখন য়র একটু ধূলা আমার মাথায় পড়িলেই আমি শান্তিলাভ করি। দাও, একবার তে অনাথিনী দুঃখিনীর মাথায় ভুলিয়া দাও। এই আমি চক্ষু বুজিলাম। একটু পদধূলি দাও, যেন নিদ্রার আবেশে ক্ষণকালের নিমিত্তও এ নিদারুণ যন্ত্রণা বিস্মৃত হই।” সোনা-বীে অল্পকালের নিমিত্ত খাটের উপর শয়ন করিয়া চক্ষু বুঝিয়া রহিলেন। ব্যস্ত হইয়া পুনরায় উঠিয়া তিনি বলিলেন, — “ভগবান আমার পাপ ক্ষমা করিবেন? সোনার ইট বাহির করিয়া দিলে তুমি আমার অপরাধ মাৰ্জনা করিবে? তখন আমি শান্তিলাভ করিব? বেশ, রাজাবাবু! তুমি যাহা আজ্ঞা করিবে, আমি তাঁহাই করিব। তবে ঐ অন্ধকার ঘরে গিয়া সোনার ইট বাহির করি।” মাঝের দ্বারের শৃঙ্খল খুলিয়া সোনা-বীে চাের কুঠুরির ভিতর প্রবেশ করিলেন। এই ঘরের বারেণ্ডার দিকের দ্বার তালা-বদ্ধ ছিল। মাঝের দ্বারে সুবালা শৃঙ্খল দিয়াছিলেন। বিনয় সেজন্য এ ঘর হইতে পলায়ন করিতে পারেন নাই। বিনয় ঘরের এককোণে গিয়া লুক্কায়িত হইলেন। সেই কোণে তাঁহার সম্মুখে খাদা ভূত দাঁড়াইয়া রহিল। সোনা-বীে অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করিলেন। তাঁহার সঙ্গে বড়ালমহাশয়ও সেই ঘরের ভিতর গমন করিলেন। বিজয়বাবু, পিসীমা, সুবালা, বড়াল-গৃহিণী দ্বারের নিকট মাঝের ঘরে দাঁড়াইয়া রহিলেন । এই অবসরে বড়ালমহাশয়ের হাত টিপিয়া বিনয় বলিলেন,- “আমি বিনয় । খাদা ভূত ও আমি যে এ ঘরে লুক্কায়িত আছি, বিজয়বাবু এখন যেন জানিতে না পারেন। তিনি যদি পুরাপের পরিণাম। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro Գ6:S এ ঘরে এখন আসেন, তাহা হইলে আপনি আড়াল করিয়া দাঁড়াইবেন।” সোনা-বীে কিছুক্ষণ ঘরের ছাদের দিকে একদৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন। তাহার পর তিনি বলিলেন, — “বড় অন্ধকার!! ঐ কড়িকাঠের ভিতর সোনার ইট আছে। সেই জন্য দুইটি মোটা মোটা কড়ি অকারণ একস্থানে রহিয়াছে। আমি স্ত্রীলোক । উচ্চ কড়িকাঠের নিকট কি করিয়া আমি উঠিব? অন্ধকারে কি করিয়া আমি দেখিব?” বড়ালমহাশয় তৎক্ষণাৎ বাহিরে আসিয়া বারেণ্ডা হইতে একজন চাকরকে একটা আলো ও একটা বাঁশের ছোট মই বা সিঁড়ি আনিতে বলিলেন। বিজয়বাবু ভাবিতে লাগিলেন,— “কড়িকাঠ! বেণীবাবু মৃত্যুকালে ঝমৃঝমি গাছের কথা বলিয়াছিলেন। সে সময় তাহার ঠিক জ্ঞান ছিল না। দ্রব্যের নাম তিনি ভুলিয়া গিয়াছিলেন। এক দ্রব্যের নাম করিতে অন্য দ্রব্যের নাম করিয়াছিলেন। কড়ি নাড়িলে ঝমৃঝম করিয়া শব্দ হয়। কড়িকাঠ’ নাম তিনি মনে করিতে পারেন নাই। সেজন্য বােধ হয় ঝমৃঝমির গাছ তিনি বলিয়াছিলেন। তাহার পর বালিকাদের সম্বন্ধে উপকথা। এক বাঘের একটি কড়িগাছ ছিল, ফলস্বরূপ কড়ি ফলিয়া গাছটি অবনত হইয়াছিল। কয়েকটি বালিকা সেই কড়ি পাড়িতে গিয়াছিল। একটি বালিকা গাছের উপর উঠিয়াছিল। অপর কয়জন তলায় কড়ি কুড়াইতেছিল। এমন সময় বাঘ আলুম শব্দে আপনার গাছতলায় আসিয়া উপস্থিত হইল। তলায় যে বালিকাকয়জন ছিল, তাহারা দৌড়িয়া পলায়ন করিল, গাছের উপর যে ছিল, সে পলাইতে পারিল না। গাছে বসিয়া সে কাদিতে লাগিল। একফোঁটা চক্ষুর জুল বাঘের গায়ে পড়িল। বাঘ চাটিয়া দেখিল যে, লবণের আস্বাদ!-ইত্যাদি!" ঝমােঝমির তাহা আমাকে বুঝাইবার নিমিত্ত, বেণীবাবু এ গল্পের উল্লেখ করিয়াছিলেন। দেখা ? কি হয়!” চাকর আলো ও ছোট একটি বাঁশের সুই/দিয়া গেল। বিজয়বাবু আলো লইয়া ও বড়ালমহাশয় মই লইয়া অন্ধকার ঘরে রলেন । অন্ধকার ঘর অধিক উচ্চ ছিল না। র। মইও বৃহৎ ছিল না। বড়ালমহাশয়ের হাত হইতে মই লইয়া সোনা-বীে আপনি কড়িকাঠের গায়ে সন্নিবেশিত করিলেন। খাদা ভূত ও বিনয়কে আড়াল করিয়া নিম্নে দাঁড়াইয়া বড়ালমহাশয় মই ধরিয়া রহিলেন । আলো লইয়া বিজয়বাবু তাহার পার্শ্ব দাড়াইয়া রহিলেন। মই দিয়া সোনা-বীে একটি কড়িকাঠ হইতে একখণ্ড ক্ষুদ্র তক্তা সরাইয়া ফেলিলেন। কড়িকাঠের গায়ে সামান্য একটি ছিদ্র বাহির হইয়া পড়িল। ছিদ্রের ভিতর হস্ত প্রবিষ্ট করিয়া সোনা-বীে কড়িকাঠের ভিতর হইতে সোনার ইট বাহির করিতে লাগিলেন। ঠিক ইট নহে, চতুষ্কোণ দীর্ঘ কাঠের ন্যায়!! ইংরাজীতে ইহাকে ‘বাবু’ বলে। বিজয়বাবু চুপি চুপি বড়ালমহাশয়কে বলিলেন,- “ইহাকেই চকচকে কাপড় কাচা সাবান বলে বটে; মনে আছে—বেণীবাবু মৃত্যুকালে আমাকে কি বলিয়াছিলেন?” বড়ালমহাশয় ঘাড় নাড়িয়া প্ৰকাশ করিলেন, — “হাঁ, আমার মনে আছে।” অনেকগুলি সেইরূপ সোনার ইট সোনা-বীে নিম্নে নিক্ষেপ করিলেন, তাহার পর কয়েকটা মাটীতে ফেলিয়া দিলেন। আর কিছু আছে কি না, তাহা দেখিবার নিমিত্ত এদিক ওদিকে হাত দিয়া অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। এই অবসরে বিজয়বাবু পুনরায় বড়ালমহাশয়কে বলিলেন,- “মৃত্যুকালে বেণীবাবু ইহার ছবি আমাকে দিয়াছিলেন। সে ছবি এখনও আমার ዓG S fi:Ilă zi, 3 goi se - www.amarboi conf** কাছে আছে। এক্ষণে ইহার বয়স হইয়াছে, চুল অনেক পাকিয়া গিয়াছে, বর্ণ মলিন হইয়াছে, চক্ষু বসিয়া গিয়াছে, চৰ্ম্ম কুঞ্চিত হইয়াছে। আলোতে এই সমুদয় ব্যতিক্রম স্পষ্ট দৃষ্ট হইতেছিল। কিন্তু এখন সামান্য আলোকে ছবির সহিত ইহার মুখের সাদৃশ্য বিলক্ষণ প্রতীয়মান হইতেছে।” বড়ালমহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “সেই সঙ্গে খাদা ভূতের নাক আপনাকে তিনি দিয়াছিলেন?” বিজয়বাবু উত্তর করিলেন, — “হাঁ।” কাঠের ভিতর আর সোনার ইট অথবা অপর কোন দ্রব্য না পাইয়া সোনা-বেঁী সেই সিড়ির উপর নিস্তব্ধ হইয়া দাড়াইলেন। একটু চিন্তা করিয়া তিনি বলিলেন,- “রাজাবাবু! তোমার আজ্ঞা আমি প্ৰতিপালন করিলাম। এক্ষণে আমার শান্তি প্ৰদান কর । সে পাপিষ্ঠ নিরাধম কলাবাবা দেখা দিলে, তবে তুমি আমাকে শান্তি প্ৰদান করিবে? সে পাপিষ্ঠ কোথায়?” বড়ালমহাশয় বলিলেন, — “আপনি এখন মই হইতে নামিয়া আসুন। যাহার নাম করিলেন, সে কোথায়, আমি আপনাকে বলিব।” সোনা-বীে কোন উত্তর করিলেন না। উচ্চে কড়িকাঠের নিকট মইয়ের উপর দাড়াইয়া তিনি কি ভাবিতে লাগিলেন । বড়ালমহাশয় বিজয়বাবুকে জিজ্ঞাসা করিলেন,- “সে নাক এখন কোথায়?” বিজয়বাবু উত্তর করিলেন,- “বেণীবাবু মৃত্যুকালে বলিয়াছিলেন যে, এই নাক সৰ্ব্বদা তুমি গলায় পড়িয়া থাকিবে। তাহা হইলে র মঙ্গল হইবে। এই দেখুন, সোনার চেনসম্বলিত নাক আমি গলায় পরিয়া আছি।” বড়ালমহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, করিয়াছিলেন?” DBBDBSBB BLBDD DD D LDLLYY পত্নী এই সোনা-বীেকে তিনি নাক দিতে বলিয়া উচ্চ মইয়ের উপর দাড়াইয়া সোনা-বীে চিন্তা করিতেছিলেন, এই কথাগুলি বোধ হয় তাহার কর্ণকুহরে প্রবেশ করিয়াছিল। সহসা তিনি বলিয়া উঠিলেন, — “তবে কই দাও!” বিজয়বাবু বলিলেন,- “আপনি নামিয়া আসুন, নামিয়া আসিলে আপনাকে দিব।” সোনা-বীে কোন উত্তর করিলেন না। মই হইতে তিনি নীচে নামিয়া আসিলেন না । সে স্থানে দাঁড়াইয়া নিম্নদিকে হাত বাড়াইয়া তিনি আর একবার বলিলেন, — “দাও।” বিজয়বাবু আপনার গলদেশ হইতে নাকসম্বলিত হার খুলিয়া তাঁহার হস্তে প্ৰদান করিলেন। সেই মুহূৰ্ত্তে ভূতের ন্যায়। একজন লোক ঘরের কোণ হইতে হু হু হু হু শব্দ করিতে করিতে বাহির হইল। “আমার নাক” এই বলিয়া সে লম্ফ প্ৰদান করিল ও সোনা-বীেয়ের হাত হইতে চেন-সম্বলিত নাক কাড়িয়া লইল । বাঁশের মই তৎক্ষণাৎ কড়িকাঠের গা হইতে স্থলিত হইয়া নিম্নে পড়িয়া গেল। সেই সঙ্গে সোনা-বীে ভূতলে পতিত হইলেন। নাক লইয়া খাদা ভূত মাঝের দ্বার দিয়া অপর ঘরে প্রবেশ করিল। দ্বারের নিকট পিসীমা, বড়ালিনী ও তাঁহাদের পশ্চাতে সুবালা দাঁড়াইয়া ছিলেন। খাদা ভূত তাহাদিগকে ঠেলিয়া ফেলিল। তাহার পর সে বারেণ্ডায় বাহির হইল। সে স্থান হইতে তন্ডু তড় শব্দে পূৰ্ব্বদিকের পুরাপের পরিণাম। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro ዓርv5 সিঁড়ি দিয়া নীচের তলায় নামিল। যে ঘরে কাঠ থাকে, সেই ঘরে প্রবেশ করিয়া, জানালার গরাদ খুলিয়া বাগানে গিয়া উপস্থিত হইল। তাহার পর হু হু শব্দ করিতে করিতে বাগানের ভিতর সে অদৃশ্য হইয়া পড়িল। চতুৰ্থ অধ্যায় শিব-মন্দির বঁশের মই সহিত সোনা-বীে মাটীতে পড়িয়া গেলেন। তিনি উঠিয়া বসিলেন না। তাড়াতাড়ি বড়ালমহাশয় তাহাকে তুলিতে গেলেন। গিয়া দেখিলেন যে, সোনা-বীে অজ্ঞান হইয়া তিনি বলিলেন,- “চলুন, ঐ ঘরে লইয়া যাই।” বিজয়বাবু মাথার দিক ও বড়ালমহাশয় পায়ের দিক ধরিলেন। স্থান সঙ্কীর্ণ। দুই জনের সে মৃতপ্রায় দেহকে বাহিরে লইয়া যাইতে কষ্ট হইতে লাগিল। সেই সময় ঘরের কোণ হইতে আর বিজয়বাবু বিস্মিত হইলেন। কিন্তু কোন কথা ধরাধরি করিয়া তাহারা সোনা-বীেকে অ’ র লইয়া খাটের উপর শয়ন করাইলেন। তাহার দাতে দাত লাগিয়াছিল। অনেক কষ্ট।” তাহার দাত কপাটী ভাঙ্গিলেন। তাহার পর তাহাকে সচেতন করিবার নিমিত্ত বিধিমতে চেষ্টা করিলেন। সোনা-বীেয়ের জ্ঞান হইল। না। অচেতন হইয়া চক্ষু বুজিয়া পড়িয়া রহিলেন । মাঝে মাঝে তাহার। সৰ্ব্বশরীর কাঁপিয়া উঠিতে লাগিল। ঘাড় ঘড় শব্দে নাক দিয়া নিঃশ্বাস প্রবাহিত হইতে লাগিল। সকলে বুঝিলেন, এ পৃথিবীতে এইবার তাঁহার দুঃখের অবসান হইল। বিজয়বাবুর সহিত পরামর্শ করিয়া বড়ালমহাশয় ডাক্তার আনিতে পাঠাইলেন। দুই ক্রোশ দূরে অন্য গ্রামে ডাক্তার বাস করেন। তাঁহাকে আনিতে বিলম্ব হইবে। সেবা-শুশ্রুষা করিবার নিমিত্ত সুবালা রোগিণীর নিকট গমন করিতে ছিলেন। বিজয়বাবু তাঁহাকে নিষেধ করিয়া বলিলেন,- “তুমি নয়। তোমার পিসীমা ও বড়ালমহাশয়েরর স্ত্রী উহার নিকট বসিয়া থাকুন।” নিকটে দাঁড়াইয়া ছিলেন। বিজয়বাবু তাঁহার প্রতি বার বার দৃষ্টি করিতেছিলেন। কিন্তু এতক্ষণ কোন কথা বলেন নাই। সোনা-বীেয়ের ঠিক হইল, তখন বিজয়বাবু সহসা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,- “তুমি এখানে?” মস্তক অবনত করিয়া বিনয় চুপ করিয়া রহিলেন। কোন উত্তর করিলেন না। বড়ালমহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “আপনি ইহাকে জানেন?” মস্তক অবনত করিয়াই বিনয় ঈষৎ হাসিলেন। বিজয়বাবু কোন উত্তর করিলেন না। বিনয়ের एिक लिनि bांशिा इशिलन । ዓóቴ} দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.com/f46লাকনাথ রচনা সংগ্ৰহ বড়ালমহাশয় বলিলেন,- “বিনয়বাবুর সহিত সুবালা-দিদির সম্বন্ধ হইয়াছে।” বিজয়বাবু যার-পর-নাই আশ্চৰ্য্যান্বিত হইলেন, আর কোন কথা তাহার মুখ দিয়া বাহির হইল না। কেবল তিনি বলিলেন,- “কি!” বড়ালমহাশয় পুনরায় বলিলেন, — “আপনার ভ্ৰাতৃজায়া ঠাকুরাণী। এ সম্বন্ধ স্থির করিয়া গিয়াছেন। অগ্রহায়ণ মাসে বিবাহ হইবে । লজ্জায় কোঁচার কাপড় মুখে দিয়া বিনয় মস্তক অবনত করিয়া রহিলেন। সুবালা ঘর হইতে পলায়ন করিবার উপক্ৰম করিতেছিলেন, বিজয়বাবু তাঁহাকে ধরিয়া ফেলিলেন। অতি স্নেহের সহিত একহাতে তাহার ও অপর হাতে বিনয়ের গলা তিনি জড়াইয়া ধরিলেন। বক্ষঃস্থলে দুইপার্শ্বে দুইজনের মস্তক রাখিয়া ধীরে ধীরে তিনি বলিতে লাগিলেন,- “এতক্ষণ ধরিয়া কেবল দুঃখের কাহিনী শুনিতেছিলাম। আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছিল। ভগবান এক্ষণে আমার প্রতি প্ৰসন্ন হইলেন। আমার ব্যথিত হৃদয়ে তিনি অসীম আনন্দ ঢালিয়া দিলেন। মনে আমার বড় সাধ হইয়াছিল যে, তোমাকে মা, আমি পুত্রবধু করি। পরমেশ্বর আমার সে সাধ পূর্ণ করিলেন। কন্যা বলিয়া, সুবালা, তোমাকে ঘরে লাইব, আমার নিজের মা বলিয়া তোমাকে ডাকিব, ইহা অপেক্ষা ভাগ্যের কথা কি আছে। তোমাকে প্রথম দেখিয়াই মালক্ষ্মী বলিয়া আমি ডাকিয়াছিলাম। সত্য সত্য তুমি আমার ঘরের মা-লক্ষ্মী হইবে, তাহা ভাবিয়া আমার আনন্দ রাখিতে আর স্থান হয় না। পরমেশ্বরকে ধন্যবাদ করি। তিনি আমাকে কৃতাৰ্থ করিলেন।” আনন্দে বিজয়বাবুর চক্ষুতে জল আসিয়া গেল, তেঁহীর কণ্ঠ রুদ্ধ হইল, মুখ হইতে আর বাক্য সরিল না। তিনি চুপ করিলেন। পি য়, বড়াল-গৃহিণী, সকলেই আশ্চৰ্যান্বিত হইলেন। বিনয়, বিজয়বাবুর পুত্ৰু, 2 - রায় গৃহিণীর দেবর-পুত্র! অভাবনীয় কথা। একটু স্থির হইয়া বিজয়বাবু পুনরায় — “তবে তুমিই যোগেশের কন্যা? তোমার অনেকবার দেখিয়াছিলেন। তিনি তোমাকে মনোনীত করিলেন। তোমার কাকা আমার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া সম্বন্ধ স্থির করিলেন। দুই বৎসর অপেক্ষা করিবার প্রার্থনা করিলেন। বিনয় বালক । আমি তাহার প্রস্তাবে সম্মত হইলাম। কথাবাৰ্ত্তার সময় তোমার পিতার নাম হইয়াছিল। তোমার পিতাকে আমি জানিতাম। অধিক পরিচয় বা তদন্তের আবশ্যক হইল না। কথাবাৰ্ত্তার সময়, তোমার মায়ের মেসোমহাশয়ের নাম কেহ করে নাই। ইতিপূৰ্ব্বে তোমার নাম কখন আমি শুনি নাই। তবে কি করিয়া আমি জানিব যে, যোগেশের কন্যাও যে, আর আমার ভ্ৰাতাজায়ার প্রতিপালিতা সুবালাও সে!” একমাত্র বিনয় সে কথা জানিতেন। যে বৎসর তিনি ছবি আঁকিতে আসিয়াছিলেন, সেই বৎসর অবগত হইয়াছিলেন যে, রায়-গৃহিণী তাঁহার জ্যেঠাইমাতা। তাঁহার পিতার প্রতি রায়গৃহিণীর ঘোরতর বিদ্বেষ দেখিয়া তাঁহার ভয় হইয়াছিল—পাছে সম্বন্ধ ভাঙ্গিয়া যায়। সেই ভয়ে এ কথা তিনি প্ৰকাশ করেন নাই। সুবালাকে পৰ্যন্ত তিনি বলেন নাই। বিজয়বাবুর কথাবাৰ্ত্তায় পিসীমা ও বড়ালমহাশয় প্রভৃতি সকলেই মুগ্ধ হইয়াছিলেন। তাঁহারা ভাবিলেন যে, বিজয়বাবু কিরূপ লোক, রায়মহাশয় ও রায়া গৃহিণী তাহা বুঝিতে পারেন নাই। পাপের পরিণাম। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro ዓóór রায়মহাশয়ের ভ্রাতুষ্পপুত্রের সহিত সুবালার বিবাহ হইবে, সেজন্য সকলেই আহুদিত হইলেন। সোনার ইট ও অন্যান্য দ্রব্যাদি কুড়াইয়া ফৰ্দ করিবার নিমিত্ত বড়ালমহাশয় অন্ধকারে গমন করিলেন। বিজয়বাবু কে,-সকলকে সে পরিচয় দিবার নিমিত্ত পিসীমা তাড়াতাড়ি নীচে যাইলেন। সুবালা পশ্চিম দিকে আপনার ঘরে পলায়ন করিলেন। বড়াল-গৃহিণী সোনা-বীেয়ের নিকট বসিয়া তাহার মাথায় জল দিতে লাগিলেন। বিজয়বাবু বলিলেন,- “বিনয়! তোমার মামার বাড়ী হইতে তুমি যে এখানে আসিয়াছ, তাহা আমি জানিতাম না। চল, বাগানের দিকে যাই। তোমার সহিত আমার কথা আছে।” বাগানের পূৰ্ব্বপ্রান্তে গিয়া বেড়াইতে বেড়াইতে পিতাপুত্রে কথাবাৰ্ত্ত হইতে লাগিল। সোনা-বীে পুনরায় আসিয়াছেন শুনিয়া গ্রামের দুই চারিজন বয়স্থ স্ত্রীলোক তাঁহাকে দেখিতে আসিল। বিজয়বাবুর পরিচয় পিসীমা তাহাদিগকে প্রদান করিলেন। সম্পর্ক অনুসারে তাহারা সুবালার সহিত রহস্য করিতে লাগিল। চাকরাণীগণ গা-টেপাটেপি করিতে লাগিল। সুবালা হবু-শাশুড়ীর দীত কত বড়, সে সম্বন্ধে পিসীমাও দুই একটা হাসি তোমাসা করিলেন। সুবালার লজ্জা হইল। হাসি-তামাসা এখন তাহার ভাল লাগিল না। তিনি ভাবিলেন যে,- “পৃথিবীতে অনেক লোক বাস করে। তাহাদের জীবনে এরূপ অদ্ভুত ঘটনা ঘটে না। যাহা দেখিলাম ও যাহা শুনিলাম, তাহা যেন ঠিক উপন্যাসের কথা! আমার মন বড়ই চঞ্চল হইয়াছে। সন্ধ্যা হইতে এখনও কিছু বিলম্ব আছে। কোন নিভৃত স্থানে গিয়া কিছুক্ষণ বসিয়া থাকি ৷” একখানি পুস্তক হাতে লইয়া সুবালা বাড়ী র হইলেন। বিজয়বাবু ও বিনয় বাগানের পূর্বপ্রান্তে গিয়াছিলেন। সুবালা বাগানুেৱা দিক দিয়া গমন করিতে লাগিলেন । বাগানের বাহির কতৃকটা নিম্নভূমি ছিল। বৃত্যুে সময় ইহা জলমগ্ন হয়। এখন নদীতে অধিক বান ছিল না। নিম্নভূমিতে এখন জল ভুঞ্জাঁ ইহার পর কুদাড়। নদীর ভাঙ্গনে খালের ন্যায় যে নালা উৎপন্ন হয়, এ স্থানে তাহাৰ্কেণ্ডাির্কাঁদাড় বলে। নদী শিবমন্দিরের উত্তর দিকে। মন্দিরের পশ্চিমে নদী হইতে এই কাঁদড় বাহির হইয়া ইহার দক্ষিণ-পূৰ্ব্ব দিক বেষ্টন করিয়া, পুনরায় নদীতে গিয়া মিলিত হইয়াছে। উত্তরে নদী এবং পশ্চিম, দক্ষিণ ও পূৰ্ব্বদিকে কঁদাড়; সুতরাং দেবালয় একটি দ্বীপের ন্যায় হইয়াছে। পূর্ণ বানের সময় কাদাড়ে পাঁচ ছয় হাত জল হয়, কিন্তু এখন তাহাতে এক হাঁটুর অধিক জল ছিল না। বাগান ও তাহার পর নিম্নভূমি পার হইয়া সুবালা কাদাড়ের ধারে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বাঘা তাঁহার সহিত আসিতেছিল। কাদাড়ে জল দেখিয়া বাঘকে তিনি বাড়ী ফিরাইয়া দিলেন। জল পার হইয়া সুবালা মন্দিরের ভূমিতে গিয়া উঠিলেন। মন্দিরের চারিদিকে একটু বাগানের মত ছিল। তাঁহাতে আম,বেল,অশ্বথ, অৰ্জ্জুন প্রভৃতি গুটিকতক গাছ ছিল। সে সমুদয় পার হইয়া সুবালা মন্দিরের নিকট গিয়া উপস্থিত হইলেন। অনেক কালের প্রাচীন মন্দির। তাহার সম্মুখে একটু রক ছিল। রকের অনেক স্থান ভগ্ন হইয়া গিয়াছিল। সুবালা রকের উপর উঠিলেন। রকের যে অংশ ভগ্ন হয় নাই, সেইরূপ একটি স্থান মনােনীত করিয়ো মন্দিরের প্রাচীর ঠেশ দিয়া সুবালা বসিলেন। ভদ্র মাস; বর্ষার জলে পৃথিবী ধৌত হইয়া গিয়াছিল। গাছ-পালা উজ্জ্বল শ্যামল পত্রে সুশোভিত হইয়াছিল। অপরাহের সূৰ্যকিরণ দ্রবীভূত স্বর্ণের ন্যায় হইয়া বৃক্ষ সকলের অগ্রভাগকে সুবর্ণের বর্ণে রঞ্জিত করিয়াছিল। অল্প অল্প বায়ুহিল্লোলে তাহাদের শাখা-প্ৰশাখা মাঝে মাঝে আলোড়িত Գ6ԻՆ) sig airž3. g3 ze! A www.amarboi.com%"*"*"***"***** হইতেছিল। নিম্নে নবীন দুৰ্ব্বাদলে ভূমি ঘনভাবে আচ্ছাদিত হইয়াছিল। নিকটে নদীর জল সন সন শব্দে প্রবাহিত হইতেছিল, উপরে নিৰ্ম্মল নীলাকাশে তুলার ন্যায় দুই এক খণ্ড শ্বেতবর্ণের মেঘ বায়ুভরে তাড়িত হইয়া নানা আকার ধারণা করিতেছিল। অস্তপ্রায় সূৰ্যকিরণ তাহার উপর পতিত হইয়া রজতানিৰ্ম্মিত অথবা তুষারাবৃত পৰ্ব্বতশৃঙ্গের ন্যায় দৃষ্ট হইতেছিল। দুরে গরুর পালের মধ্যে দুই একটি গাভী নবপ্রসূত চঞ্চল বৎসকে নিকটে না দেখিয়া হাম্বারবে তাহাকে আহবান করিতেছিল। গাছের উপর নিবিড় পত্রিমধ্যে লুক্কায়িত থাকিয়া ঘুঘুপক্ষী ঘু ঘু ঘুরবে: সঙ্গিনীকে ডাকিতেছিল। সুবালা ভাবিলেন,- “হায় রে, এরূপ শান্তিময়ী পৃথিবীকে মানুষ কেন অশান্তি অ্যালয় করে!” বিষয়,--নানা চিন্তা করিতে লাগিলেন। ক্রমে তাহার চক্ষু দুইটি বুজিয়া আসিল। নিদ্রার আবেশ দূর করিতে প্রথম তিনি চেষ্টা করিলেন, কিন্তু সে চেষ্টা বিফল হইল। মন্দিরের প্রাচীর ঠেশ দিয়া অৰ্দ্ধশায়িত অবস্থায় গভীর নিদ্রায় তিনি অভিভূত হইয়া পড়িলেন। উপর-পাহাড়ে অধিক বৃষ্টি হইয়া থাকিবে। সহসা নদীতে বান আসিয়া পড়িল। অতি অল্প সময়ের মধ্যে নদীর গর্ভ জলে পূর্ণ হইল। প্রবল বেগে নদীর জল প্রবাহিত হইতে লাগিল। যে স্থানে এতক্ষণ ঈষৎ কুল কুল শব্দ হইতেছিল, এখন সেই স্থান ঘূর্ণিত জলকল্লোলে পূর্ণ হইল। সুবালা নিদ্রিতা, সুবালা তাহার কিছুই জানেন না। নদীর এ কূল হইতে অপর কূল পৰ্যন্ত জলে পূর্ণ হইল। কাদাড়ে গভীর জলে পূর্ণ হইল। ল। কাদাড় হইতে রায়মহাশয়ের বাগান পৰ্যন্ত যে নিম্নভূমি আছে, তাহাও এখন জালুপ্তপুর্ণ হইল। সুবালা নিদ্রিতা, সুবালা তাহার কিছুই উচ্চ উচ্চ বৃক্ষ আপন আপন ক্রুইফ্ট ত সুবৰ্ণবর্ণ ঝাড়িয়া ফেলিল। পশ্চিমে রজতবর্ণের OX করিল। তাহার ভিতর লুক্কায়িত থাকিয়া সূৰ্যদেব আকাশের নিম্নদেশে গমন করিলেন। তথাপি সুবালার নিদ্রাভঙ্গ হইল না। অল্প অল্প অন্ধকার হইল। আকাশে দুই একটি নক্ষত্ৰ দেখা দিল। তাহাদের প্রতিবিম্ব বায়ুভৱে আলোড়িত নদীজলের ভিতর চিকমিক্‌ করিতে লাগিল। গাছের শাখ-প্ৰশাখার অভ্যন্তর নিবিড় হইতে নিবিড়তর দেখাইতে লাগিল। তথাপি সুবালার নিদ্রাভঙ্গ হইল না। যে স্থানে সুবালা নিদ্রা যাইতেছিলেন, এই সময় সে স্থানে কে একজন আসিয়া রকের নিম্নে দাঁড়াইয়া উকি মারিতে লাগিল। তাহার দুই হাতে দুইটি বোতল ছিল। সুবালাকে মন্দিরে একাকিনী দেখিয়া সে বিস্ময়াপন্ন হইল। সেই নিৰ্জ্জন স্থানে সুবালাকে নিদ্রিতা দেখিয়া সে আরও বিস্মিত হইল । বোতল হাতে করিয়া রকের উপর মাথা বাড়াইয়া বারবার সে উকি মারিতে লাগিল। তাহার পর সে স্থান হইতে সে প্ৰস্থান করিল। অল্পক্ষিণ পরে খালি হাতে সে প্রত্যাগমন করিল। মন্দিরের সম্মুখে একটি আম গাছ ছিল। তাহার উপর উঠিয়া শাখা-পল্লবের ভিতর লুক্কায়িত থাকিয়া একদৃষ্টিতে সে সুবালাকে দেখিতে লাগিল। তখনও সুবালার নিদ্রভঙ্গ হইল না। যে উকি মারিল, সে লোকটি কে? পাপের পরিণাম sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro ዓG*ዓ পঞ্চম অধ্যায় এখানে রায়মহাশয়ের বাটীতে সোনা-বীে মূৰ্ছিত হইয়া পড়িয়া আছেন। পিসীমা ও বড়ালগৃহিণী তাঁহার সেবা-শুশ্রুষা করিতেছেন। তাঁহার নাসিকপথে ঘড়ঘড় শব্দে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসক্রিয়া সম্পাদিত হইতেছে। মাঝে মাঝে তাহার। সৰ্ব্বশরীর কম্পিত হইতেছে। মাঝে মাঝে তাহার দাঁতকপাটি লাগিতেছে। বিজয়বাবু, বড়ালমহাশয় ও অন্যান্যা লোক তাঁহাকে সচেতন করিবার নিমিত্ত নানা উপায় অবলম্বন করিতেছেন। কিছুতেই তাঁহার জ্ঞান হইতেছে না। চক্ষু বুজিয়া তিনি পড়িয়া আছেন। সন্ধ্যার পর ডাক্তার আসিলেন। রোগিণীকে দেখিয়াই তিনি বলিলেন যে, তাহার জীবনের কিছুমাত্র আশা নাই। শীঘ্রই তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হইবেন । তথাপি তিনি ঔষধাদির ব্যবস্থা করিলেন। তিনি যেরূপ উপদেশ প্ৰদান করিলেন, সকলে সেইরূপ কাজ করিতে লাগিলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। রাত্রি হইল। রোগিণীর জ্ঞান হইল না, একেবারও তিনি চক্ষু চাহিয়া দেখিলেন না। মাঝে মাঝে কেবল দুই একটি কথা বিড় বিড় করিয়া তাঁহার মুখ হইতে বাহির হইতে লাগিল। সে কথা কি, ভালরূপ কেহ তাহা বুঝিতে পারিল না। কেবল “রাজাবাবু” এই কথাটি সকলে বুঝিতে পারিল। রাত্রি প্রায় দুই ঘণ্টা হইল। সোনা-বীেয়ের অ দাঁতকপাটি আর কেহ ভাঙ্গিতে পারিল না। ঘন ঘন র কম্পিত হইতেছিল। সে কম্পন ক্রমে । ঘড়ঘড় শব্দে সবলে নিঃশ্বাস-প্ৰশ্বাস ঠুক্রমে উপরে উঠতে লাগিল। নাভি, বক্ষঃস্থল ও ৱিষ্ট ও স্থির হইল। সোনা-বীেয়ের প্রাণবায়ু বাহির হইয়া ଦ୍ବିତ আজ সোনা-বীে শান্তি পাইলেন। তাঁহার তাপিত হৃদয় আজ শীতল হইল। যাহার সুখ ঐশ্বৰ্য দেখিয়া লোকে হিংসা করিত, যিনি এই গ্রামের রাজরাজেশ্বরী ছিলেন, হায়! আজি অনাথিনী পাগলিনী হইয়া তিনি এই বাটীতে প্ৰবেশ করিয়াছিলেন। তাহার মৰ্ম্মভেদিনী খেদোক্তি শুনিয়া আজ সকলের হৃদয় বিদীর্ণ হইয়াছিল। পাপের পরিণাম এইরূপ হয়। মনে যাহা চিন্তা করি—“মনসা বাচা হস্তাভ্যাং পদূভ্যামৃদরেণ-সে সমুদয় বোমে অঙ্কিত হইয়া থাকে। কিছুই বৃথা হয় না। যথাকলে সেই সমুদয় কৰ্ম্ম, সুখ ও দুঃখ উৎপাদন করে। যেমন এক একটি মানুষের, সেইরূপ এক একটি সম্প্রদায়ের, এক একটি জাতির উন্নতি ও অবনতির কারণ তাহারা হয়। হে বাঙ্গালী! একবার তোমার দুৰ্দশার কারণ ভাবিয়া দেখ। তোমার দুৰ্গতির জন্য অন্যের প্রতি দোষারোপ করিও না। একবার নিজের প্রতি চাহিয়া দেখ। মনে করিও না যে, আধুনিক কৰ্ম্মদোষে তোমাদের এই দুৰ্দশা ঘটিয়াছে। শত শত বৎসরের সঞ্চিত পাপে আৰ্যসমাজ গলিত পচিত হইয়াছিল; তবে তো জনকয়েক বিদেশী আসিয়া তোমাদের দেব মন্দির সকল চূৰ্ণ করিতে সমর্থ হইয়াছিল। আজ নূতন নহে, নয় শত বৎসর পূৰ্ব্বে ভারতের গীেরব-রবি অস্তাচলের তিমিরে ডুবিয়া গিয়াছে। হায় হায়! সেই অন্ধকারে এখনও ডুবিয়া আছে, আর উদয় হয় নাই। তাই হে বাঙ্গালী! তোমাকে মিনতি করিয়া বলি,-কখন সত্যপথ হইতে বিচলিত হইও না। কৰ্ত্তব্যসাধনে কখন অবহেলা করিও না । বালক-বালিকাগণ! তোমরা যখন বড় হইবে, তখন ዓGኩr দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboicom';** জগতে যেন এই যশ ঘোষিত হয় যে-বাঙ্গালী মিথ্যাকথা বলিতে জানে না। সোনা-বীেকে লইয়া সকলে এতিক্ষণ ব্যস্ত ছিলেন। অন্যদিকে এতক্ষণ কাহারও মন ছিল। না। সোনা-বীে যখন ইহধাম পরিত্যাগ করিলেন, তাহার সম্বন্ধে যখন সকল গোল মিটিয়া গেল, তখন পিসীমা এ-দিক ও-দিক চাহিয়া ত্ৰস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,- “সুবালাকে অনেকক্ষণ দেখি নাই! সুবালা কোথায়?” সকলে তখন বলিল,- “তই তো! সুবালা দিদিকে আমরা অনেকক্ষণ দেখি নাই!” বারেণ্ডায় দাড়াইয়া পিসীমা দেখিলেন যে, সুবালার ঘরে আলো নাই। সেই স্থানে গিয়া দেখিলেন যে, সুবালা সেই স্থানে নাই। দোতালার যতগুলি ঘর ছিল, তাহার কোনস্থানে সুবালা নাই। ছাদে নাই, নীচের কোন ঘরে নাই, সদরবাটীতে নাই। তন্নতন্ন করিয়া সমস্ত বাটীতে সকলে অন্বেষণ করিল। বাটীতে সুবালা নাই। পিসীমা কাঁদিতে বসিলেন। বড়ালিনী কাঁদিতে লাগিলেন। দাসীগণ কাঁদিতে লাগিল । আলো জুলিয়া সমস্ত বাগান সকলে অন্বেষণ করিল। তাহার পর সমস্ত গ্রামের বাড়ী বাড়ী লোকে খুঁজিয়া দেখিল। সুবালার কোন সন্ধান হইল না। একজন স্ত্রীলোক বলিল যে, সন্ধ্যার পূৰ্ব্বে সুবালাকে সে শিব-মন্দিরের দিকে যাইতে দেখিয়াছিল। তৎক্ষণাৎ কয়েকজন লোক নীেকা ও ডোঙ্গা করিয়া সেই স্থানে গিয়া উপস্থিত হইল। শিবমন্দির ও চতুষ্পার্শ্বস্থ ভূমি তাহারা তন্নতন্ন করিয়া অনুসন্ধান করিল। সুবালার চিহ্নমাত্র তাহারা সেস্থানে দেখিতে পাইল না। গ্রামে হাহাকার পড়িয়া গেল। গ্রামের আবাল- সকলে সুবালার অন্বেষণে বাহির হইল। সন্ধ্যার পূৰ্ব্বে নদীতে সহসা প্রবল বান ।। গ্রামের ভিতর সমুদয় নিম্নভূমি জলে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছিল। অনেক বাড়ী যেন এক একটি দ্বীপের ন্যায় হইয়াছিল। গ্রামের চতুর্দিকের মাঠ বন্যার প্লাবিত হইয়াছিল। কোন স্থানে গভীর জল হইয়াছিল, কোন কোন স্থান দিয়া প্ৰবাহিত হইতেছিল। যখন সমস্ত বাটী, সমস্ত বাগান গ্রাম অনুসন্ধান করিয়া সুবালার কোন সন্ধান হইল। না, তখন বিজয়বাবু, বড়ালমহাশয় ওঁ বিনয়ের ঘোরতর দুর্ভাবনা হইল। তাঁহারা ভাবিলেন যে, চপলার ন্যায় সুবালার কোন বিপদ ঘটিয়াছে। নদীতে সহসা বন্যা আসিয়াছে, কোন গভীর স্থানে পড়িয়া সুবালা জলমগ্ন হইয়াছে। হু হু শব্দ করিতে করিতে খাদা ভূত যখন রায়মহাশয়ের বাটী হইতে বাহির হয় এবং বাগানের উপর দিয়া দ্রুতবেগে মাঠের দিকে যখন সে চলিয়া যায়, তখন গ্রামের কয়েকজন লোক তাহাকে দেখিয়াছিল। রুদ্ধশ্বাসে পলায়ন করিয়া গ্রামে গিয়া তাহারা সংবাদ দিল । গ্রামে হুলস্থূল পড়িয়া গেল যে—খাদা ভূত পুনরায় আসিয়াছে! তাহার পর যখন সুবালাকে কেহ খুঁজিয়া পাইল না, তখন গ্রামের লোকের বুঝিতে। আর বাকী রহিল না। সকলেই ঘাড় নাড়িয়া বলিল যে,“খাদা ভূত যেরূপ চপলাকে খাইয়াছিল, সুবালা দিদিকেও সেইরূপ খাইয়াছে।” কিন্তু এবার সকলের ঘোরতর রাগ হইল। সকলে বলিল,—“আর আমাদের নিস্তার নাই। আজ খাদা ভুত সুবালা দিদিকে খাইল, কাল আমাদের বালক-বালিকাদিগকে খাইবে । সুবালা দিদি আমাদের লক্ষ্মী। তাঁহার জন্য আমরা প্ৰাণ বিসর্জন করিব । যখন সুবালা দিদিকে সে খাইল, তখন আমাদিগকেও সে ভক্ষণ করুক। খাদা ভূতের অনুসন্ধানে আমরা বাহির হইব। যদি তাহাকে দেখিতে পাই, তাহা হইলে দেখিব সে কেমন छूऊ ।” sig fjejzy sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro Գ6 ֆ বিজয়বাবু, বড়ালমহাশয় ও বিনয় পরামর্শ করিয়া স্থির করিলেন যে, সমুদয় গ্রাম ও গ্রামের চারিদিকে নদী, নালা, মাঠ, জলা সকল স্থান তন্ন তন্ন করিয়া সেই রাত্ৰিতে অনুসন্ধান করিতে হইবে। তৎক্ষণাৎ শত শত মশাল প্রস্তুত হইতে লাগিল। পুরাতন কাপড়, নূতন কাপড়, যাহা সম্মুখে পাইলেন, পিসীমা তাহা বাহির করিয়া দিলেন। সেই সমুদয় কাপড় ছিড়িয়া মশাল প্ৰস্তৃত হইল। বাড়ীতে যত তৈল ছিল, পিসীমা তাহা বাহির করিয়া দিলেন। তাহার পর গ্রামে যাহার বাড়ীতে যতটুকু তৈল ছিল, আপনি আপনি ঘর হইতে লোকে তাহা বাহির করিয়া দিল। সে রাত্ৰিতে গ্রামে আর একফোঁটা তৈল রহিল না। গ্রামে যতগুলি নীেকা ও ডোঙা ছিল, তাহতে বসিয়া চারিদিকে লোক ধাবিত হইল। অবশেষে গ্রামে যত কলাগাছ ছিল, সে সমুদয় কাটিয়া লোকে ভেলা প্ৰস্তুত করিল। যাহাদের কদলীবৃক্ষ, তাহারা অণুমাত্র আপত্তি করিল না, বরং আহাদসহকারে আপনি আপনি কলা-গাছ সকলে দেখাইয়া দিতে লাগিল। নীেকায়, ডোঙায় ও কলার ভেলায় বসিয়া জলপথে লোক চারিদিক সুবালার অন্বেষণে দীেড়িল। কে কোন দিকে যাইবে, বড়ালমহাশয় তাহা স্থির করিয়া দিলেন। নীেকা, ডোঙা অথবা ভেলায় যাহাদের স্থান হইল না, তাহারা পদব্ৰজে উচ্চ ভূমিসমূহে অনুসন্ধানে প্ৰবৃত্ত হইল। উত্তর, দক্ষিণ, পূৰ্ব্ব, পশ্চিম, সকল দিকে শত শত লোক প্রেরিত হইল। চারি পাঁচ জন লোকের সহিত বিনয় একখানি নীেকাতে করিয়া শিবমন্দিরের দিকে গমন করিলেন । আর একখানি নীেকাতে কতোগুলি লোকের সহিত বড়ালমহাশয় গ্রামের দক্ষিণ দিকের মাঠে গমন করিলেন। বিজয়বাবু বিদেশী লোক। তিনি পথঘাট জানেন না। স্ত্রীলোকদিগের রক্ষণাবেক্ষণের নিমিত্ত বড়ালমহাশয় তাহাকে বাটীতে রাখিয়া গেলেন। ညှိုးမဲ၊ গ্রামে একজন গুরুঠাকুর আসিয়াছিলেন। ভূর্তের দৌরাত্ম্যের কথা শুনিয়া ক্রোধানলে তাহার। সৰ্ব্বশরীর জুলিয়া উঠিল। ব্ৰাহ্মণ কি হয়, তিনি একালের গুরুঠাকুরসভ্যভব্য নব্য বীরপুরুষ। সে কালের নূতন বিজ্ঞানশাস্ত্ৰ জোড়া দিয়া তিনি গুরুগিরি করেন। টিকিশুন্য মস্তক হইতে ডুৎ-শক্তি বাহির হইয়া যায়, তাহা তিনি বিলক্ষণ অবগত আছেন। গ্রামের লোককে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, — “কুপো আছে?” সকলে জিজ্ঞাসা করিল,— “কুপো কেন?” আরক্তনয়নে নব্য গুরুঠাকুর উত্তর করিলেন,— “কুপো কেন? আমি নৃসিংহমন্ত্র জানি। নৃসিংহ কে তা জােন?” “চত্ত্বারো বাসুদেবাদ্যা নারায়ণ নৃসিংহকীে। হয়গ্ৰীবো বরাহশচব্ৰহ্মা চেতি নবেদিতাঃ৷” নৃসিংহমন্ত্রবলে খাদা ভুতকে ধরিয়া কুপোতে বন্ধ করিয়া আনিব। তখন তোমরা আমার বিক্রম দেখিবে—আমি সাক্ষাৎ জাগ্ৰত গুরু । গুরুকে মানুষ জ্ঞান করিতে নাই কেন, তখন তোমরা বুঝিবে।” গ্রামে কুপো ছিল না। কাজেই একটি বোতল লইতে হইল। খাদা ভুতকে ধরিয়া সেই বোতলে বন্ধ করিয়া তিনি আনিবেন। গুরুঠাকুর বলিলেন,- “নৃসিংহের মন্ত্র পড়ি মারিব জল ঝাঁটি। হুহুঙ্কার শব্দে মোর ব্ৰহ্মাণ্ড যাবে ফাটি৷” খাদা ভূতের উপর তর্জন-গৰ্জ্জন করিতে করিতে গুরুঠাকুর বড়ালমহাশয়ের নীেকায় গিয়া VO দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.comf:লোকনাথ রচনাসংগ্ৰহ বিনয় ও তাঁহার সঙ্গিগণ প্ৰথম শিবমন্দিরের দিকে গমন করিলেন। নীেকা হইতে নামিয়া তাহারা শিবমন্দির ও তাহার চতুষ্পার্শ্বস্থ ভূমি পুনরায় অতি সাবধানে অনুসন্ধান করিলেন। সুবালাকে তাহারা সে স্থানে দেখিতে পাইলেন না। স্রোতে নীেকা অনেক দূর ভাসিয়া গেল। তাহারা দক্ষিণ দিকে আর একটি কাদা বা নালা দেখিতে পাইলেন। ইহাতেও এক্ষণে প্ৰবল স্রোত প্ৰবাহিত হইতেছিল। নদী পরিত্যাগ করিয়া বিনয়ের নীেকা নালার ভিতর প্রবেশ করিল। রায়মহাশয়ের গ্রামের পূর্বদিকে নিম্নভূমির এক বিস্তৃত মােঠ আছে। নালা দিয়া বিনয়ের নীেকা এই মাঠে আসিয়া উপস্থিত হইল। মাঠ এক্ষণে গভীর জলে প্লাবিত হইয়াছে। নদী হইতে স্রোত বাহির হইয়া ইহার ভিতর দিয়া প্ৰবল বেগে চলিতেছে। সমুদয় মাঠ এক্ষণে বৃহৎ একটা বিল বা জলার ন্যায় হইয়াছে। জলপ্লাবিত প্ৰান্তর বিনয় এইরূপ মানস করিলেন। জেলার ভিতর কিছুদূর অগ্রসর হইয়াছেন, এমন সময় বামদিকে, অনেকটা দূরে সহসা অগ্নি জুলিয়া উঠিল। সেই আগুনের আলোকে অনেকদূর পর্য্যন্ত আলোকিত হইল। সেই সঙ্গে খাদা ভূতের ভয়াবহ হুহুঙ্কার শব্দ সকলের কর্ণকুহরে প্রবেশ করিল। যে স্থানে সহসা অগ্নি প্ৰজ্বলিত হইল, সেই স্থান হইতে ভূতের হুহুঙ্কার শব্দ উখিত श्न ।।” এদিকে বড়ালমহাশয়ের নীেকা প্ৰথম গ্রামের দক্ষিণ গমন করিল। সে মাঠও এক্ষণে * : မြို့ ̈L်းပြီး" မျိုး ဖြို “ရှို့ရွီး তাহার নীেকা পূৰ্ব্বদিকে আসিয়া উপস্থিত হইল। জলমগ্ন প্রান্তরের উত্তর স্ট্র য় বিনয়ের নৌকা ও দক্ষিণ সীমায় বড়ালমহাশয়ের নীেকা প্রায় এককালে তুঙ্গুঠিয়া উপস্থিত হইল। বড়ালমহাশয়ের নীেকা উত্তরদিগভিমুখে কিছুদূর অগ্রসর টুইটািমন সময় সেই অগ্নি জুলিয়া উঠিল। অল্পক্ষিণ পরেই খাদা ভূতের ভয়ানক হুহুঙ্কার গুপ্ত উজ্জলপ্লাবিত প্রান্তরে প্রতিধ্বনিত হইল। হু হু, হু হু, হু হু হু । দূরে চারিদিকে উচ্চভূমিসমূহে শৃগালগণ ডাকিয়া উঠিল—হাক্কা হুয়া, হ্যাক্কা হুয়া, হ্যাক্কা হুয়া হু। বৃক্ষসকল হইতে পক্ষিগণ উড়িয়া কলরব করিতে লাগিল। দূরে গ্রামের কুকুরগণ উৰ্দ্ধমুখ হইয়া ক্ৰন্দন করিতে লাগিল। রাত্রিকালে চারিদিকে ভয়ানক কোলাহল পড়িয়া গেল। জনশূন্য জলমগ্ন প্রান্তর মাঝে সহসা দাউ দাউ করিয়া আগুন জুলিয়া উঠিল, তাহার পরীক্ষণেই খাদা ভূতের হুহুঙ্কার রবে চারিদিক্‌ প্ৰতিধ্বনিত হইল। এরূপ অবস্থায় কাহার হৃদয় না। আতঙ্কে কম্পিত হয়? জেলার একপ্রান্তে বিনয়ের নীেকা ও অপর প্রান্তে বড়ালমহাশয়ের নীেকায় যে সমুদয় গ্রামবাসী ছিল, তাহারা ঘোর ভয়ে ভীত হইল ও নীেকা ফিরাইয়া পলায়ন করিতে চেষ্টা করিল। একদিকে বিনয় ও অপর দিকে বড়ালমহাশয় তাহাদিগকে বুঝাইতে লাগিল যে, খাদা ভূত প্রকৃত ভূত নহে, সে জীবিত মানুষ। পূৰ্ব্বে গ্রামে যে কালা বাবা ছিল, এ সেই লোক । বিনয়ের প্রবোধবাক্যে সে নীেকার লোকেরা কথঞ্চিৎ সুস্থির হইল । বড়ালমহাশয়ের সঙ্গিগণও সুস্থির হইত। কিন্তু এই সময় গুরুঠাকুরের ভয় দেখিয়া তাহারা হতবুদ্ধি হইয়া পড়িল । গুরুঠাকুরের সর্বশরীর থর থর কঁাপিতে লাগিল। ভয়ে দাঁতে দাঁতে ঘৰ্ষিত হইয়া কিডুমিড় শব্দ হইতে লাগিল। জ্ঞানহীন বাতুলের ন্যায় তিনি নানারূপ বিলাপ করিতে লাগিলেন ও নীেকা পাপের পরিণাম। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro AVS ফিরাইবার জন্য সকলের পায়ে-হাতে পড়িতে লাগিলেন। গুরুঠাকুর বলিলেন,- “নীেনা ফিরাও! নীেকা ফিরাও! সৰ্ব্বনাশ হইল। কেন মরিতে আস্ফালন করিয়াছিলাম? ভূতে সব জানিতে পারে। আমি তাহাকে ধরিব বলিয়াছিলাম। আমার উপর তাহার। আড়ি হইয়াছে। আমাকে সে এখনি খাইয়া ফেলিবে। হায় হায় দু’পয়সা পাইব বলিয়া এ গ্রামে আসিয়াছিলাম। তাহা না হইয়া প্ৰাণটি হারাইলাম। নীেকা ফিরাও! নীেকা ফিরাও1 ক চ ট ত প। জড় দি গব। হব ঠ।” বড়ালমহাশয় তাঁহাকে অনেক বুঝাইতে লাগিলেন। কিন্তু তিনি বাতুলের ন্যায় হইয়াছিলেন। সেই সমুদয় প্ৰবোধবাক্য তিনি শ্রবণ করিলেন না। আপনার মনে চীৎকার করিয়া তিনি নানারূপ খেদ করিতে লাগিলেন । গুরুঠাকুর বলিলেন, —“ওগো তোমরা ওদিকে আর যাইও না। ওদিকে আর যাইও না। ভোমর! ভোমরা। তোমার কপালে কি এই ছিল? ভোমর!—ওগো ভোমরা আমার ব্ৰাহ্মণীর নাম-তোমাকে নীলাম্বৱী শাড়ী দিব বলিয়াছিলাম। আমি ভূতের পেটে যাইলাম, কে তোমাকে আর নীলাম্বরী শাড়ী দিবে? নিতু! নিতু!—ওগো নিতু আমার ছেলের নাম—কে তোমাকে এখন বিলাতী বিস্কুট কিনিয়া দিবে? মুড়ি তোমার মুখে ভালো লাগে না। সকাল বেলা এখন কি খাইবে? ফুলদার বিলাতী বিস্কুট না হইলে তোমার চলে না, আমি নিজে এখন ভূতের বিলাতী। বিস্কুট হইলাম। প্রথম সে আমার ঘাড়ের রক্ত চুষিয়া খাইবে। তাহার পর আমাকে সে পাতকোর ভিতর লইয়া যাইবে । সেই স্থানে বসিয়া প্রথুম আমার মাংস খাইবে। তাহার পর বিলাতী বিস্কুটের মত কুড় কুড় করিয়া আমার হাড়গু । নীেকা ফিরাও! নীেকা ফিরাও! ক চ ট ত প। জড় দি গব। হব ঠ।” C SNర్ বড়ালমহাশয় কিছু রাগিয়া বলিলেন, র বার আপনাকে বলিতেছি যে, ঐ হুহুঙ্কার শব্দ ভূতের নহে। একজন জীবিত ক্ষিপ্ত ফ্ৰাসী ঐরুপ শব্দ করিতেছে। আর যদি ভূতও হয়, তাহাই ইলেই বা আপনার ভয় কি?ঞ্জ নৃসিংহমন্ত্র জানেন। ভূতকে ধরিয়া বন্ধ করিবেন। বলিয়া সঙ্গে বোতল আনিয়াছেন।” গুরুঠাকুর উত্তর করিলেন,- “ও গো না! ও সামান্য ভূত নয়। ও ব্ৰহ্ম-রাক্ষস । প্ৰবিলতীক্ষ্ণদন্তপঙক্তিরুন্নেতনাসাবংশঃ প্রকটরক্তাক্তনয়ন উপচিত স্নায়ুসন্ততির্ণতগাত্ৰঃ শুষ্ককপোলঃ সুহুতন্ত্তব্যহপিঙ্গলশাশ্রকেশঃ—এই সমুদয় ব্ৰহ্ম-রাক্ষসের লক্ষণ শাস্ত্রে আমি পড়িয়াছি। নীেকা ফিারাও! নীেকা ফিরাও। ক চ ট ত প। জড় দ গাব। হব ঠ।” শেষের কথাগুলি গুরুঠাকুর বিড় বিড় করিয়া উচ্চারণ করিলেন। তাঁহাকে সাহস দিবার জন্য বড়ালমহাশয় পুনরায় বলিলেন,- “এই আমি নীেকার অগ্রভাগে গিয়া দাঁড়াইলাম। ভূত প্ৰথমে আমাকে এখাইবে, আপনাকে খাইবে না।” এমন সময় খাদা ভূতের হুহুঙ্কারে পুনরায় সেই প্রান্তর কম্পিত হইল। হুহু, হুহু, হুহুহু। উক্ত ভূমিসমূহে পুনরায় শৃগালগণ ডাকিয়া উঠিল—হাক্কা হুয়া, হ্যাক্কা হুয়া, হ্যাক্কা হুয়া হু। পক্ষিগণ কলরব করিল। কুকুরগণ উৰ্দ্ধমুখে কাঁদিতে লাগিল। গুরুঠাকুর বলিলেন,- “ঐ শুন গো, ঐ শুনা! ও সামান্য ভূতের ডাক নয়, ও ব্ৰহ্ম-রাক্ষসের ডাক । ব্ৰহ্ম-রাক্ষস তোমার শুষ্ক দড়ি-দাড়ি মাংস ভক্ষণ করিবে না। ছিবড়ে হইবে গো, ছিবড়ে হইবে। বড়ালমহাশয়! তুমি তোমার নিজের শরীর পানে চাহিয়া দেখ। তোমার ও ঔটকো শরীরের চিমড়ে মাংস খাইবে না। আমি শিষ্য-বাড়ী গিয়া দুধ-ঘি খাই। আমার নধর শরীরের RS দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comাির্ডন”।******* নরম মাংস ফেলিয়া তোমার ও ঔটকো মাংস সে খাইবে না। ও গো! ব্ৰহ্ম-রাক্ষস অতি ভয়ানক বস্তু। ছোট হরিদাস ব্ৰহ্ম-রাক্ষস হইয়াছে—এইরূপ মনে করিয়া জগন্নাথে থাকিতে মহাপ্রভুর সঙ্গিগণও ভয়ে জড়সড় হইয়াছিল। এক দিন জগদানন্দ স্বরূপ গোবিন্দ । কাশীশ্বর শঙ্কর দামোদর মুকুন্দ৷ সমুদ্র স্নানে গেলা সবে তবে কথোদূরে। হরিদাস গায়েন যেন ডাকি কণ্ঠস্বরে৷ মনুষ্য না দেখি মধুর গীত মাত্র শুনে। গোবিন্দাদি মিলি সবে কৈল অনুমানে৷ বিষ খাদ্ঞা হরিদাস আত্মহতি কৈল। সেই পাপে জানি ব্ৰহ্ম-রাক্ষস হইল৷” উচ্চৈঃস্বরে গুরুঠাকুর এই কথা বলিয়া ক্ৰন্দন করিতে লাগিলেন। জনশূন্য গভীর জলে নিমগ্ন প্রান্তর মাঝে খাদা ভূত কোথা হইতে আসিল? সুবালা শিব-মন্দিরে নাই। সুবালা তবে কোথায়? সন্ধ্যার সময় শিব-মন্দিরে কে উকিঝুকি মারিয়াছিল? আমগাছে উঠিয়া শাখাপল্লবের ভিতর লুক্কায়িত থাকিয়া একদৃষ্টিতে নিদ্রিতা সুবালার দিকে কে চাহিয়াছিল? সে এখন কোথায়? সুবালা এখন কোথায়? ള് সন্ধ্যার সময় যে উকিঝুকি মারিয়াছিল, তাহার পর আমগাছে উঠিয়া যে সুবালাকে দেখিতেছিল, সে ধনুকধারী; অন্য কেহ নহে। সুবালার ইচ্ছায় বড়ালমহাশয় ধনুকধারীকে কাৰ্যোপলক্ষে অন্য গ্রামে প্রেরণ করিয়াছিলেন। আজ সে বাটী প্রত্যাগমন করিতেছিল। বর্ষাকালে বন্যা আসিলে, এ অঞ্চলের লোক এ গ্রাম হইতে সে গ্রাম, অনেক স্থানে এমন কি, এ বাড়ী হইতে সে বাড়ী, নীেকার সহায়তা ভিন্ন গমনাগমন করিতে পারে। সেজন্য অনেকের বাড়ীতে নীেকা অথবা তালগাছের ডোঙা থাকে এবং সকলেই প্রায় নীেকা পরিচালিত করিতে পারে। সন্ধ্যার পূৰ্ব্বে বান আসিল । কোন লোকের নিকট হইতে ধনুকধারী একখানি নীেক চাহিয়া লইল । যে গ্রামে সে গিয়াছিল, তাহা নদীর উত্তর দিকে ছিল। ধনুকধারী নিজেই নীেকা পরিচালিত করিয়া স্বগ্রাম অভিমুখে আসিতে লাগিল। স্রোতের প্রবলবেগে ভাসিয়া শীঘ্রই সে শিব মন্দিরের নিকট উপস্থিত হইল। দুই বোতল মদ ধনুকধারী সঙ্গে আনিয়াছিল। মদের বোতল সে বাড়ী লইয়া যাইত না। শিবমন্দিরের ভিতর প্রাচীর-গাত্রে একটি গৰ্ত্ত ছিল। প্ৰাচীন ভগ্ন মন্দিরে গহবর আপনি হইয়া ”পের পরিপক্ষ দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ CMS) সন্ধান পাইয়া তাহার ভিতর মদের বোতল লুক্কায়িত রাখিত। আবশ্যক হইলে বাহির করিয়া সে সুরাপান করিত। কিনারায় নীেকা রাখিয়া, মদ দুই বোতল হাতে লইয়া, যথারীতি মন্দিরের ভিতর লুকাইয়া রাখিবার নিমিত্ত সে ভূমির উপর উঠিল। রকের নিম্নে আসিয়া,-আশ্চৰ্য্য! সে দেখিল, সুবালা অঘোর নিদ্রা যাইতেছেন। দুই চারি বার উকিঝুকি মারিয়া নীেকার নিকট সে ফিরিয়া গেল। মদ দুই বোতল নীেকার ভিতর রাখিয়া, মন্দিরের নিকট প্রত্যাগমন করিয়া সে আমগাছের উপর উঠিল। গাছে বসিয়া সে সুবালাকে দেখিতে লাগিল। রাত্রি হইল। চারিদিক অন্ধকার আচ্ছন্ন হইল। চমকিত হইয়া সুবালার নিদ্রাভঙ্গ হইল। “আমি কোথায়?”—প্রথম সেই চিন্তা সুবালার মনে উদয় হইল। নানা বৃক্ষ পরিবেষ্টিত ভগ্নমন্দির দেখিয়া সুবালার স্মরণ হইল। একাকিনী সেই নিৰ্জ্জন স্থানে, —সুবালার বড় ভয় হইল। তাড়াতাড়ি উঠিয়া গৃহাভিমুখে তিনি গমন করিতে লাগিলেন। “রাত্রি হইয়া গিয়াছে, তথাপি আমাকে কেহ খুজিতে আসে নাই কেন!”—তাহা ভাবিয়া সুবালা আশ্চৰ্য্যান্বিতা झंशब्नन् । কাদাড়ের ধারে গিয়া তিনি পৌছিলেন। সৰ্ব্বনাশ! বান আসিয়াছে। কাদাড়ে গভীর জল হইয়াছে। তাহার ওদিকে বাগান পৰ্যন্ত নিম্নভূমি জলে পূর্ণ হইয়াছে। তিনি যেদিকে চাহিলেন, সেই দিকেই দেখিলেন,—জল, জল, দূর পর্যন্ত ধুধু কুৰি । নিকটে কোন লোকের বাড়ী ရွီးနှီးမြို့နှီမွိုမ်ိဳးမ်ိဳးမ်ိဳးမ်ိဳး সুবালা ডাকিলেন, — “ত্রিলোচন! ত্ৰিলোচন! § g” সুবালার উচ্চৈঃস্বরে—কেবল নামে উচ্চকেণ্ঠজে অতি মৃদু শব্দ। সে শব্দ অধিক দূর গেল না । কোন উত্তর তিনি পাইলেন না । ནུའི་ য়া সেই স্থানে তিনি বসিয়া পড়িলেন। তাহার পর ভাবিলেন,- “শীঘ্রই আমার ভুঞ্জির্ষণে লােক বাহির হইবে। আর অধিকক্ষণ এ স্থানে আমাকে বসিয়া থাকিতে হইবে না ।” সেই মুহূৰ্ত্তে তাঁহার দক্ষিণ দিকে তিনি নীেকার শব্দ পাইলেন। সুবালা ডাকিয়া বলিলেন,— “কে গা! নীেকা লইয়া যাও? আমি সুবালা! আমাকে বাড়ী লইয়া চল ।” নীেকা নিকটে আসিয়া কিনারায় লাগিল। নীেকার লোক লাফ দিয়া ভূমির উপর পড়ল। সুবালা তখন তাহাকে চিনিতে পারিলেন। তিনি বলিলেন, — “কে ও, ধনুকধারী?” এই সব বলিয়াই সুবালা ভাবিতে লাগিলেন, — ইহার সহিত যাওয়া উচিত কি না।” পুনরায় তিনি ভাবিলেন,- “সে দিন শেষকালে এ লজ্জিত ও ভীত হইয়া আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিয়াছিল। পুনরায় আমাকে কি ও অযথা কথা বলিতে সাহস করিবে?” তিনি আবার ভাবিলেন, — “এ নির্জন স্থানে ইহার সহিত একাকী থাকা অপেক্ষা বাড়ীর দিকে যাওয়াই ভাল।” এইরূপ চিন্তা করিয়া সুবালা বলিলেন,- “ধনুকধারী!! আমাকে বাড়ী লইয়া চল।” ধনুকধারী কোন উত্তর করিল না। সুবালা নীেকার অগ্রভাগে গিয়া বসিলেন। ধনুকধারী অপর দিকে বসিয়া নীেকা পরিচালিত করিল। অল্পক্ষণের নিমিত্ত সুবালা মস্তক অবনত করিয়া অন্যমনস্কভাবে বসিয়াছিলেন। এখন একবার মুখ তুলিয়া চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিলেন। চমকিত হইয়া তিনি বলিলেন,- RV8 afraig -iibg gis so! - www.amarboi.comf287******* “ধনুকধারী। নদীর মাঝখানে তুমি নীেকা আনিলে কেন?” ধনুকধারী উত্তর করিল,- “স্রোতে ভাসাইয়া আনিল, আমি কি করিব।” সুবালা বলিলেন,- “নীেকা ফিরাও, এখনি নীেকা ফিরাও। যেস্থানে হয়। কিনারায় আমাকে নামাইয়া দাও। যেমন করিয়া পারি, সে স্থান হইতে আমি বাড়ী যাইব ।” ধনুকধারী বলিল,— “বাগানের ও ধারে নীেকা লাগাইব ।” সুবালা বলিলেন,- “না, তাহা হইবে না। কিনারার দিকে তুমি নীেকা লইয়া যাও। আমি নামিয়া যাইব ।” ধনুকধারী কোন উত্তর করিল না। নীেকা ফিরাইল না। কিনারায় দিকে সে লইয়া গেল না। সুবালা একবার মনে করিলেন যে, “জলে ঝাঁপ দিয়া পড়ি।” কিন্তু নীেকা এখন কোথায় আসিয়াছিল এবং কিনারা কতদূর, অন্ধকারে তাহা তিনি বুঝিতে পারিলেন না। সুবালা বলিলেন,- “আজ তুমি পুনরায় মদ খাইয়াছ?” ধনুকধারী উত্তর করিল,- “হাঁ খাইয়াছি। আবার এই দেখ, খাই ।” এই কথা বলিয়া নীেকার ভিতর হইতে সে বোতল বাহির করিল ও ছিপি খুলিয়া কতক মদ হাড়-হড় করিয়া আপনার মুখে ঢালিয়া দিল। সুবালা পুনরায় বলিলেন, — “নীেকা শীঘ কিনারার দিকে লইয়া চল, না লইয়া গেলে টীৎকার করিয়া আমি লোক ডাকিব ।” ধনুকধারী বলিল,— “লোক ডাকিবে? বটে। তবে এখুনই আমি নীেকা ডুবাইয়া দিব।” এই বলিয়া নীেকার একাধারে সে এক পা ও র অপর পা রাখিয়া দোল দিতে লাগিল। নীেকার এ ধার—পুনরায় সে ধার অবুৰন্ত হইয়া জলমগ্ন-প্ৰায় হইতে লাগিল। দোল দিতে দিতে ধনুকধারী এক প্রকার বিকট হাস্ক্রিসিতে লাগিল। সে মনে করিয়াছিল যে, ভয় পাইয়া র নিকট কাকুতি মিনতি করিবেন। কিন্তু সুবালা কিছুই করিলেন না। “এ নরাধাম আর কি বলিব!”-এইরূপ ভাবিয়া সুবালা চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন ও মনে মনে উগবানকে ডাকিতে লাগলেন। কিছুক্ষণ দোল দিয়া ধনুকধারী পুনরায় স্থির হইয়া দাঁড়াইল। বোতলের ছিপি খুলিয়া আর একবার মদ্য পান করিল। পুনরায় সে বলিতে লাগিল,- “কেবল এক অঙ্গুলি থাকিতে ছাড়িলাম। নীেকার পাশ যদি আর এক আঙ্গুল নীচু করিতাম, তাহা হইলে এতক্ষণ বাছা! তোমাকে হাবুডুবু খাইতে হইত। আমার ধৰ্ম্মজ্ঞান আছে, মনে দয়া আছে, তাই এ অকূল পাথরে তোমাকে ভাসাইতে বিলম্ব করিলাম। চীৎকার করিবে? করিয়া দেখ—কে তোমার চীৎকার শুনিতে পাইবে? সুবালা চুপ করিয়া রহিলেন। মনে মনে ভগবানকে ডাকিতে লাগিলেন। নীেকা আরও কিছুদূর স্রোতে ভাসিয়া গেল। নদীর দক্ষিণ পার্শ্বে এক বিস্তৃত নিম্নভূমির মাঠ আছে। নদীতে বান আসিলে ইহা গভীর জলে পূর্ণ হয়। ধনুকধারী নীেকা লইয়া এই মাঠের ভিতর প্রবেশ করিল। সমস্ত নিম্নভূমি এক্ষণে জলপ্লাবিত হইয়াছিল। সমুদ্রের ন্যায় চারিদিকে জল ধুধু করিতেছিল। মাঝে মাঝে এক একটি গাছ দ্বীপের ন্যায় দাড়াইয়াছিল। সম্মুখে একটি তাল গাছ দেখিতে পাইয়া নীেকা লইয়া ধনুকধারী তাহার নিকট গমন করিল। গাছটি অধিক উচ্চ নহে। তাহার কাণ্ডে পাঁচ ছয় হাত জলমগ্ন হইয়াছিল। অবশিষ্ট অংশ পাপের পরিণাম দুনিয়ার পাঠক এক হও! ... www.amarboi.com ~ RG উপরে জাগিয়াছিল। ইহার চারিদিকে অনেকগুলি বৃহৎ ও শুষ্কপত্র নিম্নমুখ হইয়া ঝুলিতেছিল। একটি পুরাতন ও জীর্ণ রজ্জ্ব দ্বারা ধনুকধারী এই তাল গাছে নীেকা বন্ধন করিল। পুনরায় সুরা পান করিয়া সুবালার নিকট সে আসিয়া বসিল। তাহার পর নিজের কথা যথাসাধ্য মিষ্ট করিয়া সে বলিতে লাগিল,— “সুবালা! তোমার মনে আছে, আমি সেদিন কি বলিয়াছিলাম? কি করিব বল, আমার মনকে আমি সুস্থির করিতে পারিতেছি না। তোমাকে যদি না পাই, তাহা হইলে আর কোন বস্তুতেই আমার প্রয়োজন নাই। আমি নিশ্চয় বলিতেছি যে, তোমা ছাড়া হইয়া আমি এ প্রাণ রাখিব না। সেই জন্য আমি ছোরা প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছি। এই দেখ সে ছােরা। সৰ্ব্বদা ইহা আমার বুকের উপর থাকে। কথার কথা নহে। আমি দৃঢ়সঙ্কল্প করিয়াছি, তোমা ছাড়া হইয়া এ ছার প্রাণ আমি রাখিব না। তুমি দয়াময়ী। মানুষ দূরে থাকুক, পশু পক্ষী কীট পতঙ্গ সকল জীবের প্রতি তোমার দয়া অসীম। কিন্তু আমার প্রতি কি তোমার বিন্দুমাত্র দয়া হয় না। ছেলেবেলার কথা স্মরণ করা। চিরকাল আমরা এক সঙ্গে। যখন যাহা বলিয়াছ, তখন তাহা আমি করিয়াছি। আমার প্রতি তখন তোমার কত স্নেহ-মমতা ছিল। সে স্নেহ-মমতা এখন কোথায় গেল। ঝোঁকড়া-চুলো ছোড়া কে যে, আমার কােছ হইতে তোমাকে সে কাড়িয়া লইল? চল সুবালা আমরা কলিকাতা যাই। সে স্থানে গিয়া, চল আমরা অন্য ধৰ্ম্মে দীক্ষিত হই। খৃষ্টীয় ধৰ্ম্ম আছে, ব্ৰাহ্ম-ধৰ্ম্ম আছে, আৰ্য-নামক আর এক প্রকার নূতন ধৰ্ম্মের আবির্ভাব হইয়াছে। এক ঈশ্বরের ভজনা করিতে এই সকল ধৰ্ম্মে উপদেশ প্ৰদান করে। ইহারা নদী নালা, গাছ পালা, নোড়া-নুড়ি, গরু বঁােদর পূজা করিতে বলে নূর। শোকাকুলা মাতা অথবা ভগিনীকে ইহারা জীয়ন্ত ধরিয়া পোড়াইতে বলে না। বলে যে, ভগবানের চক্ষে সকল মানুষ সমান। কিন্তু আমাদের ধৰ্ম্ম দেখা জনকয়েকহঁড়া পৃথিবীর যাবতীয় মানুষকে তুমি ঘূণা করিবে,-আমাদের ধৰ্ম্মে এই রূপ শিক্ষা প্ৰদ । অমুক কায়স্থ, উহাকে অল্প ঘূণা করিবে: অমুক সদৃগােপ, উহাকে তাহা অপেক্ষ ভূধৰ্ক ঘৃণা করিবে; অমুক নীচ জাতি, উহাকে স্পশ পৰ্যন্ত করবে না। নীচ জাতিরা ধৰ্ম্মঞ্জী অধ্যয়ন করিতে পারবে না। সৃষ্টিস্থিতি প্ৰলয়কৰ্ত্তার সজেক্ষপ নাম পৰ্যন্ত ইহারা উচ্চারণ "করিতে পারিবে না। ভগবানকে ইহারা ডাকিতে পরিবে: না। ইহারা পয়সা দিবে, ইহাদের হইয়া আর এক জন ভগবানের পূজা করিবে। ইহারা অন্য জাতির দাসত্ব করিবে। ইহাই আমাদের ধৰ্ম্মের শিক্ষা। কিন্তু আর অধিক দিন লোকে এ দৌরাত্মা সহ্য করবে না। দক্ষিণে পরয়া, তিয়া প্রভৃতি জাতি ক্ষেপিয়া উঠিয়াছে। পূৰ্ব্বদেশে নমঃশূদ্র জাতিরা ক্ষেপিয়াছে। কলিকাতায় আমাদের কায়েতরা ক্ষেপিয়াছে। এখন আর তাহারা ব্ৰাহ্মণ দেখিয়া প্ৰণাম করে না। গলায় একগাছা সূতা পরিয়া, গোপে চাড়া দিয়া আমাদের কায়েতরা এখন তাল ঠুকিয়া বেড়াইতেছে। “মানুষকে ঘৃণা কর,”— বলিতে গেলে ইহাই আমাদের ধৰ্ম্মের সার। কিন্তু প্ৰকৃত ইহা ধৰ্ম্ম নহে, পাপ। এই পাপের ফলে আমাদের কি দুৰ্গতি হইয়াছে, তাহা দেখ। তুমি ভূগোল পড়িয়াছ, ইতিহাস অধ্যয়ন করিয়াছ। বল দেখি, এরূপ জাতি পৃথিবীতে আর কোথায় আছে? সেই জন্য তোমায় বিনয় করিয়া বলি যে, চল সুবালা, আমরা কলিকাতা যাই। সে স্থানে গিয়া আমরা অন্য ধৰ্ম্ম অবলম্বন করি। সেই ধৰ্ম্ম অনুসারে আমরা বিবাহ করিব। তাহার পর আমরা পরম সুখে দিনযাপন করিব। তুমি মিথ্যা কথা বলিতে জান না। আমি নিশ্চয় জানি যে, একবার তুমি হাঁ” বলিলে, সে কথার কখন আর অন্যথা হইবে না। বল, সুবালা, আমার প্রতি দয়া করিয়া বল যে, তুমি এ কাজ করবে। তাহা হইলে মুহূৰ্ত্তে নীেকা লইয়া আমি বাড়ী যাই। তাহার পর কল্য প্ৰাতঃকালে দুই জনে কলিকাতা দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comf"ঙলাকনাথ রচনাসংখ্যক اوماه পলায়ন করিব।” সুবালা উত্তর করিলেন,- “আমি সামান্য বালিকা ধৰ্ম্মের কথা আমি কি জানি? চিরকাল যাহা চলিয়া আসিতেছে, আমি তাঁহাই করি। বাল্যকালের স্নেহ-মমতা আমি ভুলি নাই। তোমাকে আমি বড় ভাই বলিয়া জানি। সেই স্নেহ-মমতা স্মরণ করিয়া তোমাকে আমি কিছু বলিব না। আমার বড় ভাই পাগল হইয়া আমাকে কুকথা বলিয়াছে—এইরূপ বিবেচনা করিয়া তোমাকে আমি ক্ষমা করিব। চল, নীেকা লইয়া বাড়ী চল । কল্য প্ৰাতঃকালে বড়াল মহাশয়কে বলিয়া তোমাকে টাকা দিব। কাশী, বৃন্দাবন প্রভৃতি নানা দেশে ভ্ৰমণ করিলে নানারূপ নূতন নূতন বিষয় দেখিলে তোমার এ ক্ষিপ্ততা দূর হইবে। তখন কোন স্থানে বাস করিয়া তুমি কাজকৰ্ম্ম করিতে পরিবে। কিন্তু এ গ্রামে তুমি আর কখন আসিতে পরিবে না। আমার সহিত আর কখন তুমি সাক্ষাৎ করিতে পরিবে না। আমার আজ্ঞা অমান্য করিলে তোমার অনিষ্ট হইবে। তখন আর আমি তোমাকে ক্ষমা করিব না।” - না? তুমি এখন কোথায় আছ, বাছাধন? চারিদিকে চাহিয়া দেখ। অকূল সমুদ্রের মাঝে সামান্য একখানি নীেকাতে একাকিনী তুমি আমার নিকট বসিয়া আছ। তোমার টাকা এখন কোথায়? এখন আমি তোমার হৰ্ত্তা-কৰ্ত্তা বিধাতা । আমি মনে করিলে তোমার জীবন দিতে পারি। পুনরায় তোমাকে জিজ্ঞাসা করি,- কল্য প্ৰাতঃকালে আমার সহিত কলিকাতা পলায়ন করিয়া, সে স্থানে অন্য কোন ধৰ্ম্মে দীক্ষিত হইয়া, তুমি আমাকে বিবাহ করিবে কি না? বিশেষ বিবেচনা করিয়া উত্তর দিবে। কারণ, যদি বল “হাঁ, তাহা হইলে তোমার প্রাণরক্ষা হইবে। যদি বল “না’, & সুবালা বলিলেন,- “আমার উত্তর চাও? আমার উত্তর এই— না, না, না। আমি মরিতে ভয় করি না। ভগবানের যদি ইচ্ছা হয়, তাহা হইলে মরিব । আমাকে জীবিত রাখিতে যদি তাহার ইচ্ছা হয়, তাহা হইলে এই নিজৰ্জন জলাতে কোন না কোন উপায়ে তিনি আমার প্রাণরক্ষা করিবেন।” ধনুকধারী বলিল,- “বার বার, তিন বার, এই শেষ বার আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা দীক্ষিত হইয়া, তুমি আমাকে বিবাহ করিবে কি না?” সুবালা বলিলেন, — “আমিও এই শেষ বার তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতেছি যে, তোমার প্রস্তাবে সম্মত হওয়া অপেক্ষা মৃত্যু আমার পক্ষে শত সহস্র গুণে শ্ৰেয় । আর আমি তোমার সহিত কথা কহিব না। তুমি অতি পাপিষ্ঠ, তুমি অতি নরাধম, তোমার সহিত কথা কহিলেও পাপ হয়। আমার উত্তর এই — না, না, না।” ধনুকধারী বলিল,— “বটে। তবে দেখ, আমি কি করি।” পাপের পরিণাম। sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro cata এই কথা বলিয়া ধনুকধারী প্রথম নীেকার পশ্চাদৃভাগে গমন করিল! বোতল বাহির করিয়া পুনরায় সুরা পান করিল। তাহার পর টলিতে টলিতে নীেকার মধ্যস্থলে আসিয়া বসিল । বক্ষঃস্থল হইতে ছোরা বাহির করিয়া তাহার আঘাতে তক্তা কাটিয়া নীেকার ঠিক মধ্যস্থলে একটা ছিদ্ৰ করিল। সেই ছিদ্রপথে কল কল শব্দে নীেকার ভিতর জল প্ৰবেশ করিতে লাগিল । তাহার পর সুবালার নিকট পুনরায় সে আসিয়া বসিল। পকেট হইতে সিগারেটের বাক্স ও দিয়াসলাই বাহির করিয়া একটি সিগারেট ধরাইয়া তাহার ধূমপান করিতে লাগিল। সিগারেটের ধূমপান করিতে করিতে ধনুকধারী বলিতে লাগিল,- “ছিদ্ৰ দিয়া যে পরিমাণে জল উঠিতেছে, তাহাতে বোধ হয় যে, আধা ঘণ্টার ভিতর নীেকা জলমগ্ন হইবে। আধা ঘণ্টা মাত্র আমাদের পরমায়ু আছে। আধা ঘণ্টা পরে আমরা দুই জনে পরমেশ্বরের নিকট গিয়া দাঁড়াইব । তিনি বিচার করিবেন। তাঁহার নিকট জাতিবিচার নাই। তোমার প্রতি আমার কিরূপ অসীম ভালবাসা, তাহা তিনি দেখিবেন। কুসংস্কারের বশবৰ্ত্ত হইয়া তুমি আমার এই ভালবাসা তুচ্ছ করিলে। বাল্যকালের বন্ধুকে পরিত্যাগ করিয়া ঝোঁকড়া-চুলোকে তুমি মনােনীত করিলে। এই পাপের জন্য ইহকালে অল্প বয়সে তুমি মৃত্যুমুখে পতিত হইলে। এই হইল তোমার প্রথম দণ্ড। পরকালে কুন্তীপাক, রৌরব প্রভৃতি নরকে তোমাকে নিদারুণ কষ্ট ভোগ করিতে হইবে। সুবালা কোন উত্তর করিলেন না। মনে মনে তিনি কেবল ভগবানকে ডাকিতে লাগিলেন,- “হে জগদীশ্বর! আমি বালিকা। বঁচিয়া থাকিতে আমার বাসনা আছে। কিন্তু আমার পক্ষে কি ভাল, কি মন্দ, তুমি তাহা জািন, আমি জানি না। আজ আমার মৃত্যু হইলে, যদি ভাল হয়, তবে উপায় আসিয়া উপস্থিত হউক। তুমি যাহা করি আমার মঙ্গলের জন্যই করিবে,- সেই বিশ্বাস আমার মনে, হে প্ৰভো! দৃঢ়ীভূতুড়ের্ক। যদি মৃত্যুই আমার পক্ষে শ্ৰেয়ঃ হয়, তাহা হইলে আমার মন হইতে মৃত্যুভয় দূর তোমার প্রতি আমার হৃদয়ে অসীম ভক্তি হউক, মৃত্যুকে তুচ্ছ করিবার নিমিত্ত আমার श्छक।" কল কল শব্দে নীেকার ভিতর জলপ্ৰবেশ করিতে লাগিল । ধনুকধারী নীেকার পশ্চাদৃভাগে গিয়া পুনরায় মদ্য পান করিল। তাহার পর সুবালার নিকট প্রত্যাগমন করিয়া সিগারেটের ধূমপান করিতে করিতে সে বলিতে লাগিল,—“এ প্রাণ রাখিব না বলিয়া ছোরা গড়াইলাম। কিন্তু তখন মনে করিয়াছিলাম যে, আমি একেল মরিব, তোমাকে কিছু বলিব না। ঝোঁকড়া-চুলোর সঙ্গে যে দিন তোমার বিবাহ হইবে, সেই দিন আমি মরিব । এইরূপ মনে মনে সঙ্কল্প করিয়াছিলাম। কিন্তু আজ সন্ধ্যাবেলা মন্দিরের সম্মুখে আমগাছে বসিয়া যখন তোমাকে দেখিতেছিলাম, তখন ভাবিলাম যে,-আমি একেলা মারি কেন? ঝোঁকড়া হইয়াছে, এই নিৰ্জ্জন শিবমন্দিরে কেহ নাই। সুবালাকে ধরিয়া এক সঙ্গে জলে ঝাঁপ দিব। — এইরূপ ভাবিতেছি, এমন সময় তুমি জাগরিত হইয়া কাদাড়ের ধারে গমন করিলে। তাড়াতাড়ি গাছ হইতে নামিয়া, নীেকা লইয়া তোমার নিকট আমি উপস্থিত হইলাম। তুমি আপনি আমার নীেকায় উঠিয়া বসিলে। সমস্ত বিধাতার খেলা।” সুবালা কোন উত্তর করিলেন না। নীরবে বসিয়া তিনি ভগবানকে ধ্যান করিতে লাগিলেন। কল কল শব্দে নীেকার ভিতর জল প্ৰবেশ করিতে লাগিল। নীেকা ক্রমেই জলমগ্ন হইবার উপক্রম হইল। ԳՆԵ দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com4ির্জািকস্তানাথ রচনা সংঘই ধনুকধারী পুনৰ্ব্বার সুরা পান করিতে গমন করিল। পুনরায় সুবালার নিকট আসিয়া বসিল। তাহার পা টিলিতেছিল। তাহার কথায় জড়তা হইয়াছিল। উকি তুলিতে তুলিতে সে বলিতে লাগিল,- “এ ছোরার আর আবশ্যক নাই। ছোরা আমি এই ফেলিয়া দিলাম।” বক্ষঃস্থল হইতে ছােরা বাহির করিয়া ধনুকধারী দূরে জলে ফেলিয়া দিল। তাহার পর পুনরায় বলিতে লাগিল,- “ছোরার সহায়তায় আর আমাকে আত্মহত্যা করিতে হইবে না। এই জলের ভিতর অবিলম্বে আমার প্রাণত্যাগ হইবে। আমি তোমাকে বধ করিব না, তুমি আমার প্রাণবধ করিবে। আমি সীতার জানি, জলে আমার সহজে মৃত্যু হইত না। কিন্তু তুমি আমার মৃত্যুর কারণ হইবে। নীেকা যেই ডুবিবে, আর সেই সঙ্গে আমরাও দুই জনে জলে নিমগ্ন হইব। জলমগ্ন লোকেরা তৃণগাছটি পৰ্যন্ত ধরিতে চেষ্টা করে। আমাকে নিকটে পাইয়া তুমি আমাকে জড়াইয়া ধরিবে। তোমার হাত হইতে আমি আপনাকে ছাড়াইতে চেষ্টা করিব না। সঙ্গে সঙ্গে দুই জনে জলমগ্ন হইব। দুই হাতে তুমি আমাকে আলিঙ্গন করিয়া থাকিবে, সেই অবস্থায় আমার সুখের বিষয় কি আছে। স্ব-ইচ্ছায় তুমি আমার সহিত সহ-মরণে যাইবে। তুমি আমার পতিব্ৰতা সতী হইবে। অরুন্ধতীকে লইয়া বশিষ্ঠ যেরূপ স্বর্গে বাস করিতেছেন, তোমাকে লইয়া সেইরূপ আমিও যুগ যুগান্তর-কত মন্বন্তর-স্বৰ্গধামে বাস করিব। হাঃ হাঃ, সুবালা আমার সহিত সতী হইবে। এ কথা মনে করিলে হাসি পায়, দুঃখ হয় না। সুবালা কোন উত্তর করিলেন না। নীরবে বসিয়া তিনি ভগবানকে ধ্যান করিতে লাগিলেন। কল কল শব্দে নীেকায় ভিতর জল প্ৰবেশ করিতে । জলে পূর্ণ হইতে আর অল্প বাকী রহিল। দিয়াশলাই জ্বালাইয়া ধনুকধারী সুবালাকে । সে বলিল,- “সুবালা! এই দেখ, আর বিলম্ব নাই। নীেকা এখনি জলমগ্ন হইবে দুইজনে আমরা স্বৰ্গে গমন করিব। উরলাম । ইহা অপেক্ষা আর আনন্দের বিষয় কি ধনুকধারী যখন দিয়াশলাই SS সুবালা দেখিলেন যে, সত্য সত্যই আর বিলম্ব নাই, নীেকা প্রায় সম্পূর্ণ জলে পূর্ণ হইয়াছে, অল্পমাত্র জাগিয়া আছে, দুই চারি মিনিটের মধ্যে ইহা ডুবিয়া যাইবে, দুই চারি মিনিটের মধ্যেই তাঁহার মৃত্যু হইবে। সুবালা ভাবিলেন,-পাপিষ্ঠ যাহা মনে করিয়াছে, তাহা আমি কিছুতেই করিব না। পাপিষ্ঠকে কিছুতেই আমি স্পর্শ করিব না। স্রোতো-বলে দূরে ভাসিয়া যাইতে চেষ্টা করিব। হে জগদীশ্বর! তোমার যাহা ইচ্ছা!” ভগবানকে ডাকিবার সময় সুবালা আকাশের দিকে চাহিয়া দেখিলেন। ধনুকধারীর হাতে তখনও দিয়াশলাইয়ের কাটি জুলিতেছে। সুবালার দৃষ্টি তালগাছের উপর পড়ল। শুষ্ক বড় বড় অনেকগুলি পত্র তালগাছকে বেষ্টন করিয়া নিম্নমুখ হইয়া ঝুলিতেছিল। সুবালা তাহা দেখিলেন। সিগারেট ও দিয়াশলাইয়ের বাক্স সেই স্থানে রাখিয়া ধনুকধারী পুনরায় মদ্য পান করিতে গেল। সেই অবসরে সুবালা খপ্‌ করিয়া দিয়াশলাইয়ের বাক্স তুলিয়া লইলেন। পায়ের আঙ্গুলির উপর ভর দিয়া তিনি উচ্চ হইয়া দাঁড়াইলেন, ও দিয়াশলাই জ্বালাইয়া নিম্নমুখ তালপত্রে অগ্নি দিয়া দিলেন। উপর পাহাড়ে বৃষ্টি হইয়াছিল, সেই জন্য নদীতে বান আসিয়াছিল। কিন্তু এ অঞ্চলে কয়েক দিবস বৃষ্টি হয় নাই, সে জন্য তালপত্রগুলি সম্পূর্ণ শুল্ক হইয়া ছিল। দিয়াশলাই উঠিল। চারিদিক বহু দূৱ পৰ্যন্ত আলোকিত হইল। তালগাছের মাথায় কে একজন বসিয়া ছিল। নদীতে বান আসিবার পূৰ্ব্বে সে এই মাঠে

                  • দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ ԳՆՏ আসিয়া তালগাছের উপর উঠিয়াছিল। তাহার পর যখন সমস্ত মাঠ জলপ্লাবিত হইল, তখন সে আর পলায়ন করিতে পারিল না। গাছের উপর তাহাকে বসিয়া থাকিতে হইল। ধনুকধারী তাহা জানে না, সুবালাও তােহা জানেন না।

তালগাছ দাউ দাউ করিয়া জুলিতে লাগিল। অগ্নির উত্তাপ সে সহ্য করিতে পারিল না, অথবা তাহার ভয় হইল। মৃদুস্বরে হু, হু, হু, হু, শব্দ করিতে করিতে সড় সড় করিয়া সে গাছ হইতে কোনরূপ নামিয়া নীেকার উপর আসিয়া দাঁড়াইল। সুবালা তাহাকে চিনিতে পারিলেন। সুবালা বলিলেন, —“কালা বাবা! কালা বাবা! এই দুরাত্মার হাত হইতে আমাকে রক্ষা কর।” কেন—তােহা বলিতে পারা যায় না, সেই মুহুর্তে খাদা ভূত ধনুকধারীকে জড়াইয়া ধরিল। ধনুকধারী ও খাদা ভুতকে জড়াইয়া ধরিল। খাদা ভূতের এখন ক্ষিপ্ত অবস্থা। সোনা-বীেয়ের নিকট হইতে আপনার নাক লইয়া সে অতি দ্রুতবেগে মাঠ-ঘাট পার হইয়া এই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল। বৃক্ষারোহণ-অভ্যাসের বশবৰ্ত্তী হইয়া সে এই তালগাছের উপর উঠিয়া বসিয়াছিল। পাগলের মার্জি। কেন সে ধনুকধারীকে ধরিল, তাহা বলিতে পারা যায় না। ধনুকধারী বোধ হয়। ভাবিল যে,—‘এই খাদা ভূত চপলাকে যেরূপ খাইয়াছে, সেইরূপ আমাকেও হয় তো খাইবে!” আতঙ্কের বশবৰ্ত্তী হইয়া সে খাদা ভুতকে জড়াইয়া ধরিল। ভীমে ও কীচকের যেরূপ যুদ্ধ হইয়াছিল, মগ্ন প্ৰায় নীেকার উপর দুই জনে সেইরূপ তুমুল সংগ্রাম বাধিয়া গেল। দুই জনে ধরাধরি, জড়ােজড়ি, হুড়াহুড়ি হইতে লাগিল। অজ্ঞান প্ৰায় হইয়া সুবালা নীেকায় একপার্শ্বে বসিয়া এই ভীষণ রণ অল্পক্ষিণ হুটােপুটির পর জলপ্লাবিত প্ৰান্তরের ভয়াবহ হুহুঙ্কার শব্দ নিৰ্গত হইল। অন্য বৎসর মুখ হইতে এই শব্দ নির্গত হইত ও তাহার কারণে তাহার মন উত্তেজিত হইয়াছিল (> পর ধনুকধারীর সহিত এই তুমুল সংগ্রাম। সেইজন্য বোধ হয়। সদ্য সদ্য তাহার য় হুহুঙ্কার শব্দ নিৰ্গত হইল - छ छ. छ इ, छ छ छ ভয়ানক চীৎকারে চারিদিক-পূর্ণ হইল। জলপ্লাবিত প্ৰান্তর মধ্যে চারিটি গাছে যে সমুদয় কাক-পক্ষী বসিয়াছিল, তাহারা সেই ভয়ানক শব্দ শুনিয়া ভীত হইল ও ভয়াৰ্ত্তরবে। চারিদিক পূর্ণ করিয়া এদিক ওদিক উড়িতে লাগিল। আরও দূরে গ্রামের কুকুরগণ উৰ্দ্ধমুখ হইয়া কাঁদিতে লাগিল। छ छ, छ छ, छ छ छ খাদা ভূতের শব্দ। হুয়া হুয়া, হঁ্যাক্কা হুয়া, হুয়া হুয়া হু।-শৃগালের ডাক । তিনবার এইরূপ শব্দে পৃথিবী পরিপূরিত হইল। কল কল শব্দে নীেকায় জল উঠিতে লাগিল। ধরাধরি, জড়ােজড়ি, দুড়োদুড়ি, হুড়োহুড়ি, - দুই জনে যুদ্ধ হইতে লাগিল। প্ৰজ্বলিত তালপত্রে চারিদিক আলোকিত হইল। ঘোর বিপদে পতিত হইয়া সুবালা দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি তীক্ষ হইয়াছিল। দূরে যৎসামান্য আলোক তাঁহার নয়নগোচর হইল। তাহার পর গুরুঠাকুরের প্রতিস্বরে ছোট-হরিদাস সম্বন্ধে ক্ৰন্দন তিনি শুনিতে পাইলেন। দুই দিকে নীেকায় শব্দও অল্প অল্প তাহার কর্ণগোচর হইল। qco afraig -iibg gis so! - www.amarboiconf'3'******* চীৎকার করিয়া সুবালা বলিলেন, —“কে গো! নীেকা লইয়া যাও? আমি সুবালা।” এই কয়টি কথা বলিবামাত্র, বাম দিক হইতে উত্তর আসিল,- যাই, যাই, ভয় নাই।” দক্ষিণ দিক হইতেও সেই মুহূৰ্ত্তে উত্তর আসিল,- “ভয় নাই, ভয় নাই, যাই, যাই।” উত্তর দিকে বিনয়ের ও দক্ষিণ দিকে বড়ালমহাশয়ের কণ্ঠস্বর বলিয়া বোধ হইল। ব্ৰহ্মরােক্ষসের নিষ্ঠুর স্বভাব ও গুরুঠাকুরের নিদারুণ খেদ শুনিয়া গ্রামের লোক নীেকা ফিরাইয়া পলায়ন করিবার উপক্ৰম করিতেছিল। এমন সময় সুবালার কাতর ডাক সকলে শুনিতে পাইল। বড়ালমহাশয় তখন গ্রামবাসীদিগকে ধিক্কার দিয়া ভৎসনা করিতে লাগিলেন। তিনি বলিলেন,- “ঐ শুন, সুবালা দিদির কণ্ঠস্বর। ঘোরতর বিপদে পড়িয়া তিনি আমাদিগকে ডাকিতেছেন। আমি তোমাদিগকে বার বার বলিতেছি যে যাহার হু হু শব্দ শুনিলে, সে ভূত নহে; সে জীয়ন্ত মানুষ, সে ক্ষিপ্ত। উন্মাদের হাতে সুবালা দিদিকে ফেলিয়া তোমরা পলায়ন করিবে? ছি, ছি, ধিক তোমাদিগকে!” গ্রামের লোক লজ্জিত হইয়া নীেকা ফিরাইয়া যেদিকে আগুন জুলিতেছিল, যেদিক হইতে খাদা ভূতের হু হু শব্দ ও সুবালার কণ্ঠস্বর আসিয়াছিল, সেই দিকে দ্রুতবেগে তাহারা ধাবিত হইল । কিন্তু দুৰ্ভাগ্ৰাক্ৰমে বিনয় ও বড়ালমহাশয়ের নীেকা নিকটে পৌঁছিতে না পৌঁছিতে ধনুকধারী ও খাদা ভূত জড়ােজড়ি করিয়া দুইজনে জলে পতিত হইল। জলে পড়িবামাত্র সেই স্থানে ডুবিয়া গেল। তালপাতার আলোকে সুবালা সেই স্থানে কেবলুগুটিকত বুদবুদ দেখিতে পাইলেন। তাহাদের আর কোন চিহ্ন তিনি দেখিতে পাইলেন দেখিবার অবকাশ ছিল না। নীেকাখানি জুহেন্ত খীদা ভূতের ধনুকধারীর হুড়াহুড়িতে সে স্যমুণ্ঠ অংশটি অতি সত্বর পূর্ণ হইয়া গেল। নীেকা জলমগ্ন হইল। যে জীর্ণ ও পুরাতন তালগাছে নীেকা বাধা ছিল, জলের ভারে তাহা ছিড়িয়া গেল। ܠ ܐ সুবালা ডুবিয়া গেল। তিনি অল্প অল্প সীতার জানিতেন। হাত পা নাড়িয়া একবার তিনি ভাসিয়া উঠিলেন। মাথা তুলিয়া কিছুদূরে প্রজুলিত তালগাছ তিনি দেখিতে পাইলেন। কিন্তু স্রোত তাঁহাকে গাছ হইতে দূরে ভাসাইয়া লইয়া চলিল। পূৰ্ব্বাপেক্ষা নিকট হইতে পুনরায় আশ্বাসবােক্য আসিল,- “ভয় নাই, ভয় নাই! যাই, যাই!!!" বিনয়ের নীেকা প্ৰথম আসিয়া তালগাছের নিকট পৌঁছিল। সে স্থানে কাহাকেও না দেখিয়া তিনি আশ্চৰ্য্যানিত হইলেন। তালপাতায় কে আগুন দিল! সুবালার কণ্ঠস্বর তিনি শুনিয়াছিলেন। সুবালা কোথায় গেলেন!। এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে তিনি চারিদিক নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতে লাগিলেন। কিছুদূরে একটা কৃষ্ণবর্ণের গােলাকার পদার্থ সহসা জলের উপর ভাসিয়া উঠিল। দ্রুতবেগে সেই স্থানে বিনয় নীেকা পরিচালিত করিলেন। কৃষ্ণবর্ণের সেই গোলাকার পদার্থ সুবালার মস্তক। হাবুডুবু খাইতে খাইতে সুবালা স্রোতে ভাসিয়া যাইতেছিলেন। তাড়াতাড়ি বিনয় তাঁহাকে নীেকার উপর তুলিয়া ফেলিলেন। নীেকায় উঠিয়া সুবালা কাঁদিতে লাগিলেন। তাঁহার মুখ দিয়া কথা বাহির হইল না। তথাপি অতি কষ্টে তিনি বলিলেন, — ঐ “তালগাছে।-- ধনুকধারী ও কালা-বাবা ডুবিয়াছে?” নীেকা লইয়া বিনয় তালগাছের নিকট ফিরিয়া আসিলেন। সুবালা হাত বাড়াইয়া

                  • দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ AAN দেখাইলে,- “ঐ স্থানে ... ধনুকধারী ও কালা-বাবা।”.

আর তিনি বলিতে পারিলেন না। কঁাপিতে কঁাপিতে অচেতন হইয়া পড়িলেন। বিনয় তাহা জানিতে পারিলেন না। তিনি তৎক্ষাৎ জলে ঝাঁপ দিয়া ডুব দিলেন। অল্পক্ষিণ পরে নিঃশ্বাস লইবার জন্য জলের উপর তিনি মস্তক তুলিলেন। দীর্ঘশ্বাসে বায়ু গ্ৰহণ করিয়া পুনরায় তিনি ডুব দিলেন। অল্পক্ষণ পরে জলের উপর পুনরায় তিনি মস্তক উত্তোলন করিলেন। তাঁহার পরিশ্রম বিফল হইল। ধনুকধারী ও খাদা ভুতকে তিনি খুঁজিয়া পাইলেন না। পুনরায় তিনি ডুব দিবার উপক্ৰম করিতেছেন, এমন সময় একজন গ্রামবাসী বলপূৰ্ব্বক তাহাকে নীেকায় উপর তুলিয়া ফেলিল ও তাঁহাকে ধরিয়া রহিল। সে বলিল,— “আপনার এ কাজ নয়। তাহারা যদি ডুবিয়া থাকে, তাহা হইলে আপনি তাহাদিগকে তুলিতে পরিবেন না। আপনি নিজে মারা পড়িবেন।” এখন বিনয় জানিতে পারিলেন যে, সুবালা অচেতন হইয়াছেন। সুবালার শুশ্রুষায় তিনি এখন নিযুক্ত হইলেন। সুবালাকে সচেতন করিবার নিমিত্ত তিনি চেষ্টা করিতে লাগিলেন। এই সময় বড়ালমহাশয়ের নীেকা সেই স্থানে আসিয়া পৌছিল। বিনয় বলিলেন, — বড়ালমহাশয়! সুবালাকে আমি নীেকায় তুলিয়াছি। সুবালার জন্য কোন ভয় নাই। কিন্তু সুবালা অচেতন হইয়াছে। তাঁহাকে লইয়া আমি বাড়ী চলিলাম। শুনিলাম যে, ধনুকধারী খাদা ভূত এই স্থানে জলমগ্ন হইয়াছে। তাহাদিগকে তুলিতে আপনারা চেষ্টা করুন। সুবালাকে লইয়া আমরা বাড়ী চলিলাম।” বিনয়ের নৌকা গৃহাভিমুখে গমন করিল। ধনুকধর্মী স্থানে ডুবিয়াছে শুনিয়া বড়ালমহাশয় আশ্চৰ্য্যান্বিত হইলেন। জলমগ্ন প্রান্তরমধ্যে ধনুকাধােরক্ট কোথা হইতে আসিলা সুবালাকেই বা সে স্থানে কে আনিল! আশ্চৰ্য্যান্বিত হইয়া বড় হয় এইরূপ চিন্তা করিতে লাগিলেন। সেদিন কূপ হইতে যে লোক চপলারুশুস্থিতুিলিয়াছিল, সে বড়ালমহাশয়ের নীেকাতে ছিল। পুরস্কারের প্রলোভন দেখাইয়া বড়ান্টুইশয় তাহাকে ধনুকধারী ও খাদা ভূতের অনুসন্ধান করিতে আদেশ করিলেন । অষ্টম অধ্যায় বিকৃত মস্তিষ্ক পুরস্কারের লোভে অন্যান্য অনেক লোকও জলে ঝাঁপ দিল। অধিক অনুসন্ধান করিতে হয় নাই। তালগাছ হইতে অল্পদুরে দুইজনকে তাহারা দেখিতে পাইল। দুইজনে পরস্পরে জড়ােজড়ি করিয়া ছিল। খাদা ভূত চেন-সম্বলিত নিজের নাক গলায় পরিধান করিয়াছিল। দুই জনেরই প্ৰাণ বিয়োগ হইয়াছিল। একখানি নীেকাতে দুইটি মৃতদেহ তুলিয়া অন্যান্য লোকের সহিত বড়ালমহাশয় গৃহে প্ৰত্যাগমন করিলেন। অল্পক্ষণ পূৰ্ব্বে সুবালাকে লইয়া বিনয়ও গৃহে প্ৰত্যাগমন করিয়াছিলেন। তাপ-সেক সেবাশুশ্রুষা করিতে করিতে সুবালার জ্ঞান হইল। কিরূপে ধনুকধারী তাঁহাকে সেই জনশূন্য ԳԳՀ দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.comন্মিলোকনাথ রচনা সংগ্ৰহ জলপ্লাবিত মাঠে লইয়া গিয়াছিল এবং সে তাঁহাকে কিরূপ কথা বলিয়াছিল, ধীরে ধীরে সমস্ত পরিচয় বিজয়বাবু প্রভৃতিকে তিনি প্ৰদান করিলেন। ধনুকধারীর কু-ব্যবহার শুনিয়া বিজয়বাবু চুপ করিয়া রহিলেন। লজ্জায় ও ঘূণায় কিছুক্ষণ অধােবদন থাকিয়া বড়ালমহাশয় বলিলেন,— “সুবালা দিদি। পাষণ্ডের সকল কথা তোমাকে আমি বলি নাই। বলিব বা কি করিয়া? কারণ পূৰ্ব্বে আমি এ সব কথা শুনি নাই। যেদিন তোমরা আমাকে উইলের বিষয় জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে, সেই দিন ঘরে গিয়া গৃহিণী আমাকে ধনুকধারীর গুণের পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন। শুনিলাম যে উইল সম্বন্ধে ভয় দেখাইয়া সৰ্ব্বদাই সে তাহার পিসীর নিকট হইতে টাকা-পয়সা লাইত। একদিন টাকা না পাইয়া সে তাঁহাকে মারিতে পৰ্যন্ত গিয়াছিল। যাহা হউক, সব শেষ হইয়া গিয়াছে। এখন দিদি, তুমি তাহাকে ক্ষমা কর।” নিদারুণ ক্লেশ ভোগ করিয়া, ঘোর ভয়ে ভীত হইয়া, অনেকক্ষণ আৰ্দ্ধবস্ত্ৰে থাকিয়া সুবালা সেই রাত্ৰিতে জ্বর দ্বারা আক্রান্ত হইলেন। বিজয়বাবুর আদেশে বড়ালমহাশয় থানায় সংবাদ দিয়াছিলেন। পুলিশের অনুমতি পাইয়া মৃতদেহ দুইটির তিনি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করাইলেন। বিজয়বাবুর আজ্ঞায় চেন-সম্বলিত খাদা ভূতের নাসিকা গঙ্গাজলে নিক্ষিপ্ত হইল। সুবালার জ্বর বৃদ্ধি হইতে লাগিল। ক্রমে বিকারে পরিণত হইল। পীড়া অতিশয় কঠিন হইয়া উঠিল। দুই চারি দিনের জন্য সকলকে তাহার আশা পরিত্যাগ করিতে হইয়াছিল। সপরিবারে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। আত্মীয়-স্থােষ্ট্র ঘিরিয়া রহিল। কায়মনঃপ্ৰাণে সকলে সুবাহুয়ািসব আবাল-বৃদ্ধ নর-নারী সুবালার জন্য ডাকিতে লাগিল । ভগবানের কৃপায় সুবালার রোগ উপশম হইল। ভগবানের কৃপায় তাহার প্রাণরক্ষা হইল । সুবালা তখনও বড় দুৰ্ব্বল। এইরূপ অবস্থায় তিনি বালিশ ঠেস দিয়া বসিয়া আছেন; করিতেছেন। সুবালা তাঁহাদের কথোপকথন শুনিতেছেন। এমন সময় বিনয় তাহার পিতাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, — “বাবা! খাদা ভূত বলিয়াছিল যে, রাজাবাবু ভূত হইয়া তাহার সহিত অনেকবার সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন। সোনা-বীেও সেই কথা বলিয়াছিলেন। রাজাবাবু সত্য কি ভূত হইয়াছেন? ভূত হইয়া সত্যই কি তিনি এই দুই জনের সহিত বার বার সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন?” বিজয়বাবু কি উত্তর প্রদান করেন, তাহা শুনিবার নিমিত্ত সাতিশয় আগ্ৰহসহকারে সকলে কান পাতিয়া রহিলেন। বিজয়বাবু বলিলেন,- “না; রাজাবাবু যে ভূত হইয়াছেন, তাহা আমার বিশ্বাস হয় না। এই পৃথিবীতে অনেক লোক বিকৃতমস্তিষ্কের সহিত জন্মগ্রহণ করে। তাঁহাদের মধ্যে অনেকে বড় হইয়া ধৰ্ম্ম, রাজনীতি, সমাজসংস্কার অথবা অর্থে পাৰ্জ্জন— এই কয় বিষয়ের এক বিষয় লইয়া পাগল হয়। কিন্তু সে সীমা অতিক্ৰম করিলে মানুষকে ক্ষিপ্ত বলিতে পারা যায়, সে সীমা তাহারা অতিক্রম করে না। সেজন্য সহজ মানুষের ন্যায় থাকিয়া তাহারা সংসারযাত্রা নিৰ্ব্বাহ 9zeg elfjei27 sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro cove) করিতে থাকে। কিন্তু দৈবক্রমে কোন একটা প্রলোভনে পড়িয়া অথবা কোন একটা ঘটনা সীমা পার হইয়া ক্ষিপ্তদশায় উপনীত হয় । খাদা ভূত ও সোনা-বীেয়ের ভাগ্যে ইহাই ঘটিয়াছিল। প্রথম তো ইহারা বিকৃতমস্তিষ্ক লইয়া পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়াছিল। একরূপপ্রকৃতিবিশিষ্ট দুইজন লোক ঘটনাক্রমে একত্র হইল। অতি নিষ্ঠুর কাৰ্য্যে ইহারা প্ৰবৃত্ত হইল। ভাগ্যক্রমে সে চেষ্টা সফল হইল না। নিদ্রিত নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করিতে ইহারা উদ্যত হইয়াছিল। সে লোক একজনের স্বামী, অপর জনের প্রাণরক্ষাকৰ্ত্তা। এই দুকৰ্ম্মের চিন্তা সৰ্ব্বদাই তাঁহাদের মনে জাগরিত ছিল। সুতরাং রাজাবাবুর আকৃতি সৰ্ব্বদা তাহারা মানসচক্ষে প্রত্যক্ষ দেখিত। ইহাদের বয়ঃক্রম যতই অধিক হইতে লাগিল, মস্তিষ্কের বিকারও সেই সঙ্গে বৃদ্ধি হইতে লাগিল। অবশেষে দুইজনেই রীতিমত ক্ষিপ্ত হইল। তবে ক্ষিপ্ততা অনেক প্রকার। সচরাচর যাহাকে পাগল বলে, সোনা-বীে তাঁহাই হইয়াছিলেন। খাদা ভূত বৎসরে একবার পাগল হইত এবং সে সময় অনেক পরিমাণে তাহার জ্ঞান থাকিত । বাল্যকালে আমাদের সহিত একটি বালক স্কুলে পড়িত। কিছুদিন তাহার মুখ হইতে হু হু এইরূপ একটি শব্দ নিৰ্গত হইত। সে তাহা নিবারণ করিতে পারিত না। কিন্তু সে বালক ক্ষিপ্ত হয় নাই। খাদা ভূত যথার্থ পাগল হইয়াছিল। সোনা-বীে ও খাদা ভূত রাজাবাবুর ভূতকে দর্শন করে নাই, তাহাদের বিকারপ্রাপ্ত --বনঃসভূত ছায়া দেখিত মাত্র? তবে এ কথা নিশ্চয় জানিও যে, আমরা সৰ্ব্বদা নানাপ্রকার ভৌতিক জীব দ্বারা পরিবৃত হইয়া আছি।” বিনয় জিজ্ঞাসা করিলেন,— “মৃত্যুকালে য় বলিয়াছিলেন যে, খাদা ভূত নদীতীরে বসিয়া কাদা দিয়া আপনার এবং সোনা-বীে উষর প্রান্তরে বৃক্ষতলে বসিয়া কাঁদিতেছে। পরে শু সত্য সত্যই এইরূপ ঘটনা ঘটিয়াছিল। জ্যোঠামহাশয় কি করিয়া তাহা জানিতে পুষ্ট্রি ל" বিজয়বাবু উত্তর করিলেন,- “ শরীর ও মনের অভ্যন্তরে যাহা আছে, তাহাকে লোকে জীবাত্মা বলে। পৃথিবীতে ইন্দ্ৰিয়ের বশীভূত থাকিয়া কাজ করিতে হয়, সেজন্য তাহার শক্তি অল্প। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাহাতে অসীম শক্তি নিহিত আছে। কোন কোন মানুষ সেই শক্তি আপনা। আপনি বিকশিত হয়, কোন কোন মানুষ নিয়মানুসারে যত্ন করিয়া সেই শক্তি বিকশিত করে, কোন কোন মানুষের পীড়িত অবস্থায় অথবা মৃত্যুকালে সেই শক্তি কিয়ৎপরিমাণে বিকশিত হয়। এই শক্তি বিকশিত হইলে মানুষের অনেক প্রকার অদ্ভূত ক্ষমতা হয়। অনেক দূরে কোনরূপ শব্দ হইলে কেহ বা তাহা শুনিতে পায়। ইংরাজীতে ইহাকে ক্লোর-অডিয়েন্স (Clairaudience) বলে। অনেক দূরের ঘটনাসমূহ কেহ বা দেখিতে পায়। ইংরাজীতে ইহাকে ক্লেরভয়ান্স (Clair-voyance) বলে। পাপী ও দানববংশসম্বুত, মনুষ্যজাতির অহিতকারী ব্যক্তিদিগের শরীর হইতে যে একপ্রকার কদাকার নীল আভা বাহির হয়, তাহাও কোন কোন ব্যক্তির দৃষ্টিগোচর হয়, তাহাও তাঁহাদের ঘাণেন্দ্ৰিয় দ্বারা অনুভূত হয়। সকল মানুষ সৰ্ব্বদা যে পায়। এইরূপ শক্তিসম্পন্ন লোকের মধ্যে অনেক মহাত্মা আছেন, যাঁহাদের আশীৰ্ব্বাদে লোকের নিশ্চয় মঙ্গল হয়। তাঁহাদের অভিশাপও অতি ভয়ানক। মৃত্যুকালে আমার দাদামহাশয়ের মানসিক বৃত্তিসমূহ কিয়দংশ উত্তেজিত হইয়াছিল, তাহার প্রভাবেই তিনি খাদা ভূতের নাসিকগঠন ও সোনা-বীেয়ের অরণ্যে রোদন দর্শন করিয়াছিলেন।” “እዓ8 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.comৰূির্ডলাক্যনাথ রচনাসংগ্ৰহ সুবালা সুস্থ ও সবল হইলে একদিন বিজয়বাবু সকলের সাক্ষাতে তাঁহাকে বলিলেন,- “সুবালা! এই সম্পত্তি অতিশয় অমঙ্গলজনক অর্থাৎ অপয়া। পূৰ্ব্বে যাঁহাদের ইহা ছিল, তাহারা নিৰ্ব্বংশ হইয়া গিয়াছেন, তাহদের চিহ্নমাত্র এখন এ গ্রামে নাই। তাহার পর আমার দাদামহাশয় ইহার অধিকারী হইয়াছিলেন। ইহা লাভ করিয়া তাহারও সুখ হয় নাই। অতএব এ সম্পত্তি আমিও লইব না এবং তোমাকেও লাইতে দিব না।” সুবালা সে প্রস্তাবে সন্মত হইলেন। তাহার পর সুবালার কাকমহাশয়ের দিকে চাহিয়া বিজয়বাবু বলিলেন,- “আপনি যদি এ সম্পত্তি লইতে ইচ্ছা করেন, তাহা হইলে আপনাকে ইহা আমি লিখিয়া দিতে পারি।” কাকামহাশয় উত্তর করিলেন,- “না, ভাই! আমার ইহাতে প্রয়োজন নাই। আমি গরীব মানুষ বটে, কিন্তু এ সম্পত্তিতে আমার কোন অধিকার নাই। ইহা লইতে আমারও মঙ্গল হইবে না। আমিও পুত্ৰ-কন্যা লইয়া ঘর করি। তাহাদের প্রাণ বড়, না। টাকা বড়!” বেণীবাবুর কোন আত্মীয় আছেন কি না, বিজয়বাবু এখন সেই অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। বেণীবাবুর পিতা পূৰ্ব্বদেশ হইতে এ অঞ্চলে আসিয়া জেলায় মোক্তারি করিতেন। জেলার কাছারীর কাগজপত্রে অন্বেষণ করিয়া তিনি পূৰ্ব্বদেশে তাঁহার জন্মস্থানের নাম বাহির করিলেন। তাহার পর জানিতে পারিলেন যে, সে গ্রামে তাঁহাদের জ্ঞাতি-গোত্র অনেকেই জীবিত আছেন। সৰ্ব্বাপেক্ষা যিনি নিকট জ্ঞাতি, তাঁহাকে আনাইয়া বিজয়বাবু এই সম্পত্তি তাহার হস্তে সমর্পণ কুঠুইহঁইল। তৃতীয়—নদীর তীরে যে বাঁধ ভাঙ্গিয়া গ্রামের অনিষ্ট হইতেছিল, বিজয়বাবু সে বঁাধ পুনরায় বঁধিয়া দিলেন। চতুৰ্থ-গ্রামে তিনি একটি বিদ্যালয় সংস্থাপিত করিলেন। পঞ্চম-গ্রামের পথ-ঘাট ও জলনিৰ্গমের পথ ভালরূপে প্রস্তুত করিয়া দিলেন। ষষ্ঠ—নিকটস্থ একখানি গ্রামের লোকের জলকষ্ট ছিল, সে স্থানে বিজয়বাবু একটি পুষ্করিণী খননের নিমিত্ত অর্থ প্ৰদান করিলেন। সপ্তম—বড়ালমহাশয় ও বড়াল-গৃহিণী যাহাতে অবশিষ্ট জীবন পরম সুখে যাপন করিতে পারেন, সেজন্য প্রচুর অর্থ তাহাদিগের হস্তে তিনি সমর্পণ করিলেন। অষ্টম-চপলার মাতা ও তাহার ভগিনীর ভরণপোষণের নিমিত্ত বিজয়বাবু ভালরূপ ব্যবস্থা করিলেন। পশুপক্ষীদিগকে আহার দিবার নিমিত্ত পাগলীকে তিনি নিযুক্ত রাখিলেন। বাঘা কুকুরকে সুবালা আপনার সঙ্গে লইয়া গেলেন। সুবালা এ স্থান পরিত্যাগ করিয়া যাইবেন, তাহা শুনিয়া গ্রামে হাহাকার পড়িয়া গেল। সীতাসহিত রাম-লক্ষ্মণ ও দ্ৰৌপদী সহিত পঞ্চ-পাণ্ডব যখন বনে গিয়াছিলেন, তখন প্ৰজাগণ যেরূপ বলিয়াছিল, গ্রামবাসিগণ এখন সেইরূপ বলিতে লাগিল। সকলে বলিল যে,- “সুবালা দিদিকে ছাড়িয়া আমরা এ গ্রামে থাকিতে পারিব না; তিনি যে স্থানে যাইবেন, আমরাও সেই স্থানে যাইব ।” কেহ কেহ বিজয়বাবু ও কাক মহাশয়ের পায়ে পড়িয়া কাঁদিতে লাগিল। অনেক বিলাপ করিয়া তাহারা বলিতে লাগিল,— “আমাদের লক্ষ্মীকে আপনারা লইয়া যাইবেন না। সুবালা দিদি গ্রামের অধিশ্বরী হইয়াছেন, তাহা ভাবিয়া আমাদের মনে বড় ভরসা হইয়াছিল। ভগবানও °"*°”* *f°°"° rifGrRIl5 °ii%35 q<5 zx8! ~ www.amarboi.com ~ “ስማዕ সেইদিন হইতে আমাদের প্রতি সুপ্ৰসন্ন হইয়াছেন। কত বৎসর পরে এ বৎসর সুবৃষ্টি হইয়াছে। এ বৎসর প্রচুর ধান্য জনিবে, তাহার লক্ষণ চারিদিকে প্রতীয়মান হইতেছে। এই সময় জুরের প্রাদুর্ভাব হয়, কিন্তু এ বৎসর তাহা হয় নাই। আমরা পরম সুখে কালযাপন করিতেছি। আমাদিগকে হতাশ করিয়া, পুনরায় আমাদিগকে দুঃখসাগরে ভাসাইয়া, আমাদের লক্ষ্মীকে আপনার লইয়া যাইবেন না।” নবম অধ্যায় শেষ কথা তাহাদের ক্ৰন্দন দেখিয়া সুবালাও সেই সঙ্গে কাঁদিতে লাগিলেন। সুবালা বলিলেন, — “তোমরা ভয় করিও না। আমি তোমাদিগকে কখনও ভুলিব না। সৰ্ব্বদাই তোমাদের তত্ত্ব লাইব । তোমরা যাহাতে সুখে থাক, সৰ্ব্বদাই আমি সে চেষ্টা করিব। বিপদ আপদ হইলে, তোমরা আমাকে সংবাদ দিবে। তোমাদিগকে দায় হইতে উদ্ধার করিতে যথাসাধ্য আমি চেষ্টা করিব।” বিজয়বাবু, বিনয় ও তাঁহার মাতা কলিকাতা গমন করিলেন। খুড়ী-মা ও পিসী-মায়ের সহিত পড়িয়া গেল। স্ত্রী-পুরুষ, বালক-বালিকা, শিশু-বৃদ্ধ৫ষ্টতর-ভদ্র-সকলে আসিয়া তাঁহার পালুকী ঘিরিয়া দাঁড়াইল। অতি কষ্টে তাহাদের নিকুটুম্বইতে সুবালা বিদায় প্রাপ্ত হইলেন। গ্রামের বালক-বালিকাগণ বহুদূর পর্য্যন্ত তাঁহার র সঙ্গে সঙ্গে দৌড়িয়া যাইতে লাগিল। পথে পালুকী থামাইয়া সুবালা তাহাদিগকে স্ট্রিক, দুয়ানি ও পয়সা প্ৰদান করিলেন। এবং অনেক প্ৰবােধ দিয়া তাহাদিগকে বাটী ফিরিয়ট যাইতে আদেশ করিলেন। বড়ালমহাশয় ও বড়াল-গৃহিণী সুবালার সহিত তাঁহার কাকামহাশয়ের গ্রামে গমন করিলেন। “অল্পদিন সে স্থানে থাকিব, তাহার পর ফিরিয়া আসিব”—এইরূপ মনন করিয়া তাহারা গিয়াছিলেন। কিন্তু সুবালা তাঁহাদিগকে ছাড়িলেন না এবং তাঁহারাও সুবালাকে ছাড়িয়া আসিতে পারিলেন না। কয়েক মাস তাহারা সেই গ্রামে রহিলেন, তাহার পর সুবালার সহিত তাহারা কলিকাতা গমন করিলেন। অনেক দিন পরে তবে বিজয়বাবু তাহাদিগকে গ্রামে প্রত্যাগমন করিতে অনুমতি প্ৰদান করিলেন। যথাসময়ে শুভদিনে ও শুভক্ষণে বিনয়ের সহিত সুবালার বিবাহ হইল। বিজয়বাবু ও তাঁহার গৃহিণীর আনন্দের সীমা রহিল না। অতি গৌরবের সহিত তাহারা সকলকে বলিতে লাগিলেন, — “এস! তোমরা আমাদের মা-লক্ষ্মীকে দেখ।” সুবালার দয়া-মায়া ও ধৰ্ম্মপরায়ণতার বিবরণ শ্রবণ করিয়া সকলেই চমৎকৃত হইল ও সকলেই শতমুখে তাঁহার প্রশংসা করিতে লাগিল। পাক-স্পর্শ অর্থাৎ বৌভাতের দিন বিনয়ের অনেকগুলি বন্ধু নববধূকে দেখিবার নিমিত্ত প্রার্থনা করিলেন। বিবাহ প্রভৃতি ক্রিয়া উপলক্ষে বস্ত্ৰাদি প্রদানের প্রথা অনেকের পক্ষে দণ্ডস্বরূপ হইয়াছে। তাহার বাড়ীতে আসিয়া নিমন্ত্রিত ব্যক্তিগণ পাছে সেই দণ্ডে দণ্ডিত হন, সেই নববধূ দেখাইতে বিজয়বাবু প্ৰথম সম্মত হন নাই। কিন্তু বিনয়ের বন্ধুগণের নিতান্ত AA fi:Ilă zi, o go sel - www.amarboi conf** অনুরোধশেষে তাঁহাকে সম্মত হইতে হইল। পাড়ার অল্পবয়স্ক কন্যা ও বধূগণের দ্বারা পরিবৃতা ও একহাত ঘোমটা দ্বারা অবগুষ্ঠিতা হইয়া, সুবালা একটি ঘরে বসিয়াছিলেন। বিনয়কে ও তাঁহার বন্ধুগণকে সঙ্গে লইয়া বিজয়বাবু বিজয়বাবুর আজ্ঞায়—একদিকে বিনয় ও অপরদিকে সুবালা—তাহার দুইপার্শ্বে দুইজন দণ্ডায়মান হইলেন। পাড়ার সেই কন্যা অবগুণ্ঠন খুলিয়া নববধূর মুখ সকলকে দেখাইল । লজ্জায় ও ভয়ে নববধূর পদদ্বয় ঈষৎ কম্পিত হইতেছিল। যথারীতি তিনি নয়নদ্বয় মুদিত করিয়াছিলেন!! ঘোর কৃষ্ণবর্ণের চক্ষুপল্লবগুলি মুদিত নয়নদ্বয়ের উপর পড়িয়া, আহা! কি অপূৰ্ব্ব শোভার আবির্ভাব হইয়াছিল। লোকে—“আহা মরি!' বলে, সুবালা সেরূপ রূপবতী ছিলেন না। তাঁহার সৌন্দৰ্য চাকচিক্যশালী সূৰ্যকিরণ দ্বারা গঠিত হয় নাই। তাঁহার সৌন্দৰ্য শরৎকালের পূর্ণচন্দ্রের মৃদু-মধুর সুশীতল রশ্মি দ্বারা গঠিত হইয়াছিল। সাগর হইতে উঠিয়া হইয়াছিলেন তখন তিনি যেরূপ দেখিতে হইয়াছিলেন, যুবকবৃন্দের সম্মুখে দণ্ডায়মান সুবালাকে আজ সেইরূপ দেখাইতে লাগিল । বিজয়বাবু বলিলেন, — “সুবালা, মা! একবার তুমি চক্ষু উনীলিত করা। তোমার ঐ দয়ামায়া-পূর্ণ মৃদুভাবাপন্ন মৃগনয়ন দুইটি দেখিয়া সকলের আনন্দ হউক। প্ৰসন্নবদনে উপস্থিত যুবকবৃন্দকে সম্বোধন বা সহিত আমার সাক্ষাৎ হয়। অনেকের ব্যবহার দেখিয়া আমি হতাশ হইয়া পড়িয়াছিলাম। আমি ভাবিতাম যে, সত্য, সাধুতা ও কৰ্ত্তব্যপরায়ণতা এ দেশে অতি বিরল। যে দেশে সত্য, সাধুতা ও কৰ্ত্তব্যপরায়ণতা নাই, সে দেশের কিছুতেই মঙ্গল হয় না। আমি ভাবিয়ছিলাম যে, কালক্রমে এই বাঙ্গালী জাতি ধ্বংস হইয়া যাইবে। যাহারা অবশিষ্ট থাকিবে, তাহাদিগকে কুলি-বৃত্তি অবলম্বন করিয়া অতি কষ্টে দিনপাত করিতে হইবে। কিন্তু আমার পুত্রবধূকে দেখিয়া আমার মনে এখন আশার সঞ্চার হইয়াছে। যাহা সত্য, যাহা ধৰ্ম্মসঙ্গত, যাহা কৰ্ত্তব্য, তাহা আমি করিব, এইরূপ সঙ্কল্প করিয়া আমার পুত্ৰবধু কিরূপ মূল্যবান সম্পত্তি ত্যাগ করিতে প্ৰস্তুত হইয়াছিলেন, তাহা তোমরা সকলেই শুনিয়াছ। যে জাতির মধ্যে এরূপ সত্যপরায়ণা বালিকা জানিতে পারে, সে জাতির জন্য ভাবনা নাই। আমার পুত্রবধু যে কেবল একেলা ধৰ্ম্মপরায়ণা, তাহা কখনই নহে। বোধ হয়, দেশে তাঁহার মত শতশত বালক-বালিকা আছে। তাহাদিগকে আমরা জানি না এইমাত্র। তবে আর আমাদের ভাবনা কি? ঈশ্বর বাঙ্গালী জাতিকে যেরূপ প্রখর বুদ্ধি দ্বারা বিভূষিত করিয়াছেন, সেরূপ প্রখর বুদ্ধি অন্য কোন জাতিকে তিনি প্ৰদান করেন নাই। এই প্রখর বুদ্ধি যখন সত্য, সাধুতা ও কৰ্ত্তব্যপরায়ণতা দ্বারা আরও প্রভাবিশিষ্ট হইবে, তখন বাঙ্গালী জাতি পৃথিবীতে শীর্ষস্থান অধিকার করিতে সমর্থ হইবে। পুত্ৰগণ! আমি ও আমার সমসাময়িক ব্যক্তিগণ

                    • দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ ԳԳ Գ ক্ৰমে বৃদ্ধ হইয়া পড়িতেছি। অল্পদিন পরে পৃথিবী পরিত্যাগ করিয়া আমাদিগকে পরলোকগমন করিতে হইবে। তখন বাঙ্গালী জাতির মান-সন্ত্রম ও গৌরব তোমাদের হস্তে ন্যস্ত হইবে। বাঙ্গালী জাতির নানারূপ কলঙ্ক আছে। বাঙ্গালী জাতি ভীরু, বাঙ্গালী সত্যকথা বলে না, প্ৰতিজ্ঞা পালন করে না, কাৰ্য্যের ভার গ্ৰহণ করিয়া সে কাৰ্য সম্পন্ন করে না। সেই জন্য বাঙ্গালী পরস্পরকে বিশ্বাস করে না, আর সেই নিমিত্ত পাঁচজনে মিলিত হইয়া কোন কাজ করিতে পারে না। অন্য জাতির জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত দেখিয়াও বাঙ্গালীর জ্ঞান হয় না। তিনশত বৎসর পূৰ্ব্বে এক ইংরাজ বণিকসম্প্রদায় জনক'ত মুহরিকে এ দেশে প্রেরণ করিলেন। বিলাত হইতে ভারত তখন ছয় মাসের পথ ছিল। তথাপি সেই বণিকসম্প্রদায় ঐ জনকয়েক মুহরির সহায়তায় এই বিশাল ভারত-সাম্রাজ্য সংস্থাপিত করিলেন। এখনও দেখ—বিলাতে থাকেন ধনী, ভারতের পূৰ্ব্বপ্রান্তে আসামের নিবিড় বনে তাহারা সামান্য কৰ্ম্মচারী প্রেরণ করেন। কৰ্ম্মচারী বন কাটিয়া চায়ের ক্ষেত্র করিয়া বিপুল অর্থ উপাৰ্জন করেন। কিন্তু বাঙ্গালী কোন কাৰ্য্যের সূচনা করিয়া, কেবল দুই ক্ৰোশ মাত্র দূরে কৰ্ম্মচারী পাঠাইয়া নিশ্চিন্ত মনে থাকিতে পারে না। বহদিন হইতে এইরূপ নানা প্ৰকার কলঙ্কের পসরা বাঙ্গালী জাতি মাথায় বহন করিয়া আসিতেছে। বৎসগণ! বাঙ্গালী জাতির এই সমুদয় কলঙ্ক তোমাদিগকে দূর করিতে হইবে। প্রধান কথা এই যে,সত্য, সত্য, সত্য ভিন্ন আমাদের অন্য গতি নাই। সৰ্ব্বদা সত্যকথা বলিবে। ভুলিয়াও কখন অসত্য কথা বলিবে না। কখনও সত্যপথ হইতে বিচলিত হইবে না। “অসত্য কথা, অসত্য আচরণ বাঙ্গালী একেবারেই জানে না,”—যখন আমাদের এই যশ জগতে ঘোষিত হইবে, তুৰ্থন বাঙ্গালীর ঘর ধনধান্যে পূর্ণ হইবে, বাঙ্গালীর বিদ্যা, বুদ্ধি ও ধৰ্ম্মপ্রভাবে জগতে নূতন সঞ্চার হইবে, সকল জাতি তখন বাঙ্গালীকে পূজা করবে, বাঙ্গালীর গৌরবে তাঙ্গুৰত্নমূৰ্ত্তি পৃথিবী আলােকিত হইবে। বৎসগণ৷ একমাত্র সত্য, সত্য, সত্য ভিন্ন আর আমাদূেরুজ্জাম্য গতি নাই। পুনরায় বলি,—সত্যপথ হইতে

অঁমার এই একান্ত মিনতি। দুর্ক)ৰ্মামি প্ৰদান করি। অন্যের কােছ হইতে কিছু লইব, অন্য লোক আমাকে দিউক,—কখনও এরূপ কামনা করিবে না। নীচপ্রবৃত্তিবিশিষ্ট লোকেরা এইরূপ কামনা করে। যাহারা অন্য লোকের নিকট হইতে কিছু লইতে চেষ্টা করে, জগদীশ্বর চিরকাল তাহাদিগকে পর-প্রত্যাশী করিয়া রাখেন। আমি এরূপ অনেক লোককে দেখিয়াছি। তাহাদের মনে লজ্জা নাই। কিন্তু সাধারণের নিকট তাহারা যে কিরূপ ঘূণার পাত্র, তাহা তাহারা জানে না। কাহারও নিকট হইতে যেন কিছু লইতে না হয়, অন্য লোককে যেন দিতে পারি, জগদীশ্বরের নিকট ও পিতৃলোকের নিকট সৰ্ব্বদা এইরূপ প্রার্থনা করিবে।” তাহার পর সুবালার দিকে চাহিয়া তিনি বলিলেন,- “মা সুবালা সৰ্ব্বগুণে গুণান্বিতা তুমি, তোমাকে আমি এখন এই আশীৰ্ব্বাদ করি যে, তুমি সত্যবাদী, ধৰ্ম্মপরায়ণ ও কৰ্ত্তব্যপরায়ণ বীরপুত্রদিগের জননী হও।” সুবালাকে লইয়া পাড়ার কন্যাটি পুনরায় ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল। বিনয়ের বন্ধুগণ বাহিরাবাটীতে প্ৰত্যাগমন করিলেন। বিনয়ের মাতা-পিতা-পুত্র ও পুত্রবধু লইয়া— মনের সুখে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন । “ስዓbr দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.comf:লোক্যনাথ রচনাসংগ্ৰহ

এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০১৯ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৫৯ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।