পাশ্চাত্যধর্ম্ম ও বর্ত্তমান সভ্যতা/প্রথম পরিচ্ছেদ
পাশ্চাত্যধর্ম্ম ও বর্ত্তমান সভ্যতা।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
সুদূর ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে যে সকল মহানুভব পাদ্রিগণ পাপী মানবের উদ্ধার ব্রত নিয়ে ভারতের উত্তপ্ত প্রান্তরে আসেন এবং এ দেশে এসে ঐ মহৎ কাজে জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁদের কি অলৌকিক ত্যাগ স্বীকার। তাঁদের ধর্ম্মপুস্তকে খ্রীষ্টান-ধর্ম প্রচার করা একটা বিশেষ পুণ্য কার্য্য বলে নির্দ্দিষ্ট হয়েচে একথা সত্য এবং এটাও সত্য যে স্বয়ং যীশু প্রচারকদের বিবিধ রকম দৈবশক্তি প্রাপ্তির আশা দিয়ে বিশেষ রকমে উৎসাহিত করেচেন।[১] কিন্তু কেবল মধুর ধর্ম্মবাণী শুনে আপন আত্মীয় স্বজনের মায়া কাটিয়ে ভিন্ন দেশে ভিন্ন জাতীয় লোকের মুক্তির জন্য চেষ্টা করা কি সামান্য গুণের কথা? নিজ দেশে কত সহস্র আত্মা পাপে ডুবে আছে তাদের দিকে একবার দৃকপাৎ না করে যাঁরা দূরদেশের অধম হিদেন জাতির মুক্তির জন্য এতটা ত্যাগ স্বীকার করেন তাঁদের অনেক সময়ে স্বদেশীয়দের কাছে গঞ্জনাভোগ করতে হয় বটে[২] কিন্তু আমরা তাঁদের প্রশংসা না করে থাক্তে পারি না। এরূপ মহাত্মাদের উপদেশ বিশেষ প্রনিধান করে শোনা আবশ্যক এবং যদি তাঁদের কথা যুক্তি সঙ্গত হয় তাহ’লে তাহা সাদরে গ্রহণ করা কর্ত্তব্য।
ভক্তিমন্ত্রই পাদ্রি সাহেবদের প্রধান সম্বল। তাঁরা প্রকারান্তরে বলেন:—“স্বর্গের প্রকৃত পথের সন্ধান আমরা পেয়েছি, আর কেহ পায়নি। এসো ভক্তিভাবে চোখ বুজে আমাদের পশ্চাদগামী হও; তাহলেই স্বর্গ রাজ্য পাবে, উদ্ধার হয়ে যাবে। নচেৎ, অনন্ত নরক ভোগ ছাড়া তোমাদের গতি নাই”।[৩] কতক লোকে এ কথা সহজেই মেনে নেবে কিন্তু শিক্ষিত লোকে অনেক স্থলে যুক্তি সঙ্গত না হলে ভক্তি-মন্ত্র নিতে অনিচ্ছুক। তাই আজ কাল অশিক্ষিত ও অসভ্য লোকে যত সহজে খ্রীষ্টান-ধর্ম্ম গ্রহণ করে শিক্ষিত লোকে সেরূপ করে না। ভক্তি-মার্গের গুণগান সকল ধর্ম্মেই করে থাকে। বৌদ্ধ, মুসলমান ও হিন্দু প্রত্যেকেই আপন আপন ধর্ম্মকে ভক্তিভাবে একমাত্র সত্য ধর্ম্ম বলে প্রচার করে। আমরা যদি তাদের কথা নাও মানি তাহ’লে পাদ্রি সাহেবকে জিজ্ঞাসা করতে হয়:—“আমরা কোন্ ধর্ম্মে মুক্তি পাবো, রোমান কাথলিক চর্চ আমাদের মুক্তি দেবে না প্রটেষ্টাণ্ট চর্চ?” রোমান কাথলিক বলবেন:— “আমরাই আদি ও প্রকৃত খ্রীষ্টান প্রভূ যীশু স্বহস্তে তাঁর প্রিয় শিষ্য পীতরের হাতে স্বর্গ দ্বারের চাবি দিয়ে গেছেন। সেই চাবি রোমের পোপেরা যত্নে রক্ষা করে আসচেন। রোমান কাথলিক চার্চ ছাড়া আর কোথাও মুক্তি পাবে না।”[৪] এরূপ অবস্থায় বেচারা হিদেন কোথায় দাড়াবে?
তা ছাড়া যে সব গুরুতর সমস্যা আছে তার মধ্যে দুই একটি মাত্র উল্লেখ করা যেতে পারে। ঈশ্বর একজন না ত্রিরূপী তিন জন! যদি এক হন্ তা’হলে নিশ্চয় অনন্ত কাল থেকেই তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম্। পূর্ব্বে একজন ছিলেন পরে বিভক্ত হয়ে গিয়ে তিন জন হয়েছেন—পিতৃ-ঈশ্বর, পুত্র-ঈশ্বর এবং পবিত্র-প্রেতাত্মা ঈশ্বর—এটা সম্ভব হতে পারে না। বাইবলে লিখিত আছে যে জেহোবা মূসাকে সাক্ষাৎসম্বন্ধে ঈশ্বরতত্ত্ব ও জগতের উৎপত্তি স্থিতি লয় সম্বন্ধে যাবতীয় বিষয় সম্পূর্ণ ভাবে প্রকাশ করে গেছেন। তিনি একে-শ্বরের কথাই বলেছেন। বর্ত্তমান খ্রীষ্টীয় জগতে যে ত্রিত্ত্ববাদ প্রচলিত দেখি তার কোনই উল্লেখ করেন নাই। কেহ কেহ বলেন চতুর্থ শতাব্দীকে St. Athanasius নামক Alexandriaর বিশপ প্রথমে ত্রিত্ত্ববাদ জারি করেন, আবার কেহ কেহ সে কথা প্রতিবাদ করে পঞ্চম শতাব্দীর বিশপ Hilaryকে ইহার প্রবর্তক বলে উল্লেখ করেন। সে যাই হ’ক, আমরা ধরে নেবো যে জেহোবা এরূপ গুরুতর বিষয়ে মুসাকে ভূল বা অসম্পূর্ণ উপদেশ দিয়েছিলেন—না আমরা বুঝবো যে ত্রিত্ত্ববাদটা তার অনেক পরে মানুষের মাথা থেকে উৎপন্ন হয়েছে? স্পষ্ট দেখা যাচ্চে যে কালক্রমে এক ঈশ্বরকে বিভক্ত করে তিন অংশ করা হয়েচে, কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে ভগবানের অমৃতময় মাতৃভাবটাই ধারণা করা হয়নি। রোমন কাথলিকরা যীশু-জননী মেরীকে পূজা করেন বটে, কিন্তু তাঁদের মতে যীশুর মাতা বলেই মেরীর মহত্ত্ব; অর্থাৎ যীশু হইতেই তাঁর মহত্ত্বের উৎপত্তি। মেরী প্রকৃত পক্ষে জগজ্জননীর স্থান অধিকার করেন না। বাইবলের নূতন খণ্ডে বর্ণিত আছে যে জোসেফ নামক জনৈক সূত্রধর মেরীকে বিবাহ করে কিন্তু সে ব্যক্তি স্ত্রীসহবাস করিবার পূর্ব্বেই প্রকাশ হয় যে পবিত্র প্রেতাত্মার ঔরসে মেরীর গর্ভসঞ্চার হয়েছিল। মেরীর সেই গর্ভজাত সন্তান প্রভু যীশুখ্রীষ্ট যিনি প্রথম মানবী হেবাকৃত পাপের প্রতিকার হেতু জগতে আবির্ভাব হয়েছিলেন। ইউরোপ এবং আমেরিকায় অনেক ব্যক্তি ও সম্প্রদায় বিশেষ এই জন্ম-বৃত্তান্ত নিতান্ত অলীক বিবেচনা করেন।[৫] এরূপ স্থলে হিদেন কি কর্বে?
খ্রীষ্টান ধর্ম্মের মূল শিক্ষা এই যে মানবের আদি পুরুষ আদমের সহধর্ম্মিণী হেবা জেহোবার নিষেধ আজ্ঞা অমান্য করায় সমগ্র মানবজাতি তাঁর অভিসম্পাতে চিরকালের জন্য পাপগ্রস্থ হয়ে পড়ে। এই দূর্ঘটনার বহু সহস্র বৎসর পরে জেহোবার মনে দয়ার উদয় হয় এবং তিনি তাঁর একমাত্র পুত্র যীশুকে মনুষ্যরূপে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। যীশুদেব ক্রুশে আত্মবিসর্জ্জন করে’ মানবজাতির মুক্তির উপায় করে দিলেন। কেনই বা এক জনের (অর্থাৎ হেবার) অপরাধে অপরে (অর্থাৎ সমগ্র মানব) পাপ বিদ্ধ হয় এবং কেনই বা জেহোবা এত বিলম্বে মুক্তির উপায় করে দিলেন এবং সেই বিলম্বের ফলে কেন যে ক্রুশের ঘটনার পূর্ব্বে যে সকল লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানব জন্মেছিল তাদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হয়নি এসকল প্রশ্নের যুক্তি সঙ্গত উত্তর নাই। যে জিনিষ যুক্তির অগোচর তা’ ভক্তিদ্বারা সকলে গ্রহণ করতে পারেন না। বাইবলের উক্তি:—“আমরা চোখে দেখে চলি না, ভক্তির উপর নির্ভর করে চলি।”[৬] কিন্তু একথা সর্ব্ববাদী সম্মত নয়।[৭]
ভক্তিহীন কঠিন হৃদয় হিদেন পাদ্রিসাহেবের উদার উপদেশ বাক্য যখন গ্রহণ না করে তখন তিনি জলদগম্ভীর স্বরে বলেন: “তোমরা চক্ষু উন্মীলন করে দেখ। বর্ত্তমান যুগে পৃথিবীতে কোন্ জাতীর প্রাধান্য বিরাজ করছে। দেখ্বে খ্রীষ্টান্ জাতি সর্ব্বত্র সর্ব্বে সর্ব্বা। যে সকল বিদ্যা ও বিজ্ঞানের বলে ইউরোপ ও আমেরিকা জগতে এই শীর্ষ স্থান অধিকার করেচে সে সমস্তই খ্রীষ্টান ধর্ম্মের প্রভাবে। একথা তোমাদের স্বীকার কর্ত্তেই হবে যে আমাদের ধর্ম্মের বলেই আমরা এই শ্রেষ্ঠতা লাভ করেচি। আমাদের ধর্ম্মপুস্তকের বচন[৮] তোমরা যদি না ও মান তবু এই একটা কথাদ্বারাই আমাদের জাতীয় প্রাধান্য মেনে নিতে হবে।”
জগতের শিল্প ও বিজ্ঞান কি বস্তুত পক্ষে খ্রীষ্টীয় ধর্ম্ম থেকে উৎপন্ন হয়েছে এবং ঐ ধর্ম্মের সাহায্যে বা প্রভাবেই কি তাদের উন্নতি সাধন হয়েছে? যদি তাই হয়, তাহলে এটাকে খ্রীষ্টীয় ধর্ম্মের শ্রেষ্ঠতার একটা অকাট্য প্রমান বলে আমাদের মেনে নিতেই হবে। অতএব এবিষয়ে সবিশেষ আলোচনার দ্বারা মীমাংসা করা নিতান্ত কর্ত্তব্য। বাইবেলের আদি খণ্ডে বর্ণিত আছে যে জুডিয়া (বর্ত্তমান পালেষ্টাইন) দেশবাসী ইহুদিরা ঈশ্বরের খাসজাতী (chosen people) জুডিয়া দেশ গোড়া থেকেই তাদের জন্য (land of promise) বিশেষ ভাবে নির্দ্দিষ্ট হয়েছিল। মুসার সহিত ত ঈশ্বরের কথাবার্ত্তা চলিত, কিন্তু নম্বর্স পুস্তকের ৩১ অধ্যায় পাঠ করতে গেলে প্রাণ শিউরে ওঠে। ওরূপ নিষ্ঠুর আচরণ আজ পর্য্যন্ত কোন বব্বর জাতির দ্বারাও সাধিত হয়নি। তবে শুনা যায় যে বর্ত্তমান যুদ্ধে খ্রীষ্টান ধর্ম্মাবলম্বী জার্ম্মনরা ঐ প্রকার কাজ করেছেন। মূসা ইহুদীদের বলে গেছেন যে তারা যে পর্য্যন্ত পৌত্তলিক আচরণ করে’ ধর্ম্মচ্যুত না হয় ঈশ্বর তাঁদের ভুলবেন না, তাঁদের ধ্বংস করবেন না এবং তাদের পূর্ব্বপুরুষের সঙ্গে শপথ করে যে অঙ্গীকার (covenant) বদ্ধ হয়েছেন সে অঙ্গীকার ভূলবেন না।[৯] ইহুদীদের ডেভিড ঈশ্বরের বিশেষ প্রিয় পাত্র (a man after his own heart) ছিলেন। কিন্তু সেই ডেভিডের কীর্ত্তি যা বাইবলে বর্ণিত আছে তা নিতান্ত অসন্তোষ জনক।[১০]
এমন সৌভাগ্যমন্ত জাতি যারা স্বয়ং ঈশ্বরের বরপুত্র কর্ম্ম ফলে কি ভয়ানক দুর্দশাগ্রস্থ হয়েছে! মহাত্মা যীশু যখন জন্মগ্রহণ করেন আমরা দেখ্তে পাই তখন ইহুদী দেশ পেগান রোমের করতলগ্রন্থ। সে সময়ে রোমের অসীম প্রতাপ। রোমের কলাবিদ্যা ও বিজ্ঞান পৃথিবীতে তখন সর্ব্ব শ্রেষ্ঠ। ঈশ্বরের এত অনুগ্রহ সত্ত্বেও ইহুদিরা রোমের অনেক পিছনে পড়েছিল। রোমের পূর্ব্বে গ্রীসও সভ্যতায় আশ্চর্য্য রকম উন্নতি করেছিল। রোমের সভ্যতা গ্রীস সভ্যতার উপর প্রতিষ্ঠিত। ভারতবর্ষ[১১] চীন প্রভৃতির কথা উত্থাপন না করাই ভাল কারণ পাদ্রী সাহেবরা ঐসকল দেশের প্রাচীনতা ও শ্রেষ্ঠতা স্বীকার করতে কুণ্ঠিত। রোম ও গ্রীসের ইতিহাস তাঁরা সর্ব্বতো ভাবে মানেন বলেই তার উল্লেখ করা গেল। তাঁদের একথা মেনে নিতেই হবে যে বর্ত্তমান সভ্যতা পেগান রোমের সভ্যতার উপর প্রতিষ্ঠিত। খ্রীষ্টান ধর্ম্ম থেকে তার উৎপত্তি হয়নি। জগৎ বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক Huxley সে বিষয় এইরূপ অভিপ্রায় প্রকাশ করেছেন ও বলেছেন যে খ্রীষ্টীয় ধর্ম্ম বিজ্ঞানকে যথেষ্ট বাধা দিয়েছে।[১২] পাদ্রী সাহেবরা বলেন যে যীশুর আবির্ভাবের পর এবং তার প্রচারিত ধর্ম্মের ফলে ও বলে জগতে যা কিছু জ্ঞানের উন্নতি হয়েছে। এই কথাটি কতদূর প্রকৃত তাই দেখা যাক।
এ বিষয়ে ইউরোপের ইতিহাস পাঠ করলে আমরা অনেক তত্ত্ব, জানতে পারি অপর কোথাও অন্বেষণ করবার আবশ্যক হয় না। ৩২৮ খ্রীষ্টাব্দে কনষ্টানটিনোপল নগরে খ্রীষ্টান জগতের রাজধানী স্থাপিত হয়। তুর্কীদের দ্বারা ঐ নগর ১৪৫৩ সালে অধিকৃত হওয়া পর্য্যন্ত ঐখানেই রাজধানী ছিল। এই এগার শত বৎসর ইউরোপের অবস্থা কেমন ছিল এবং খ্রীষ্টান ধর্ম্মের গুণে ইউরোপীয় লোকেরা জ্ঞান ও সভ্যতায় কতদূর উন্নতি লাভ করেছিল সেটা প্রণিধান করে দেখা কর্ত্তব্য। এই সময়ে ইউরোপে অনবরত রক্ত-স্রোত বহে গিয়েছিল এবং এতদূর অজ্ঞতা পেগান রোমের আমলে কখনই ছিল না।[১৩] গ্রীক ও লাটিন সাহিত্যের অমূল্য রত্ন খ্রীষ্টানদের হাতে পড়ে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল।[১৪]
দু’তিন বৎসর আগে জার্ম্মানরা যে লুভ্যাঁর বিশ্ববিদ্যালয় ও পুস্তকাগার ধ্বংস করেছিল সেটা অভিনব ব্যাপার নয়। পূর্ব্বতন খ্রীষ্টানদের অনুকরণ মাত্র। পূর্ব্বতন গ্রীক ও রোমানেরা শিক্ষার উন্নতি সম্বন্ধে বিশেষ যত্নবান ছিলেন। কিন্তু তাঁদের পরবর্ত্তী খ্রীষ্টানেরা রাষ্ট্রীয় অধিকার পেয়েই এথেন্স নগরের বিশ্ববিদ্যালয় উঠিয়ে দিলেন। Gibbon বলেন, খ্রীষ্টানেরা এতদূর কুসংস্কারের বশীভূত হয়েছিলেন, যে তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিও জ্ঞানের আদৌ বিকাশ পায়নি।[১৫] আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে তৎকালে ইস্লাম সম্প্রদায় জ্ঞানোন্নতির বিষয়ে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। Gorham সাহেব ইতিহাসের উল্লেখ করে বলেন:—“যৎকালে খ্রীষ্টীয় ধর্ম্মাবলম্বী দেশের অধিকাংশ স্থানে অন্ধবিশ্বাস তিমিরে সামচ্ছন্ন ছিল সেই সময়ে ঐ ধর্ম্মের প্রতিদ্বন্দ্বী মহম্মদীয় ধর্ম্ম কি করছিল? খ্রীষ্টীয় ৮ম শতাব্দীতে মূরগণ (মুসলমান) স্পেন রাজ্য অধিকার করে। তারপর ঠিক যেন মন্ত্রবলে স্পেনে অতি মনোহর সভ্যতার আবির্ভাব হল। বাণিজ্যের বহু বিস্তার এবং শ্রমশীলতার প্রভাবে দেশে এতই ধনসঞ্চার হতে লাগল যে খ্রীষ্টানগণ তা দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন। অবস্থানুরূপ আইনকানুন লিপিবদ্ধ করে কৃষিকার্য্যের নিপুণতা বেড়েছিল। মূরগণ গোমেষ ও অশ্বাদি পালন দেশে আরম্ভ করে দিয়েছিলেন। তারাই ইউরোপে রেশমের উৎকর্ষ সাধন করে এবং চাউল, চিনি, তুলা এবং বহুবিধ কলের আমদানি আরম্ভ করেন। তাঁরাই তাঁতের বস্ত্রাদির মাটির বাসন লোহার ইস্পাতের ও চামড়ার জিনিষ প্রস্তুত সম্বন্ধে যত্নবান হন। যে সময়ে খ্রীষ্টানরা ঈশ্বরের দোহাই দিয়া পরস্পরের গলায় ছুরী বসাতে ব্যস্ত ছিলেন সে সময়ে মূরগণ ব্যাবসা বাণিজ্যের তত্ত্ব সম্বন্ধে গভীর গবেষণায় নিমগ্ন ছিল।[১৬] একজন খ্রীষ্টান রোগাক্রান্ত হলে সিদ্ধ পুরুষ রোজা বা দৈবচিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হতেন। কিন্তু সে স্থলে মূরগণ চিকিৎসকের বা অস্ত্রচিকিৎসকের সাহায্য নিত। তৎকালে খ্রীষ্টান ধর্ম্মের দুইটি কেন্দ্র স্থান ছিল রোমনগর এবং কনষ্টাণ্টিনোপল। এই দুই স্থানের কর্ত্তারা যে সময়ে পৃথিবী সমতল ভূমি এই বলিয়া শিক্ষা দিতেছিলেন সেই সময়ে স্পেন দেশীয় আরবগণ সাধারণ বিদ্যালয়ে কাষ্টময় গোলক দ্বারা শিশুদের ভূতত্ত্ব শেখাতে নিযুক্ত ছিল। ব্যবহারিক বিজ্ঞান বিশেষতঃ জ্যোতিষ, উদ্ভিদবিজ্ঞান, আলোক বিজ্ঞান, অস্ত্রচিকিৎসা এবং সাধারণ চিকিৎসাশাস্ত্র সম্বন্ধে তারা যে পরিমাণ জ্ঞান লাভ করেছিল, তা’ তো সেকালের খ্রীষ্টানদের পক্ষে অনুকরণ করা দুঃসাধ্য ছিলই, তাঁদের বোধগম্য হওয়াও দুষ্কর ছিল। মুরগণ বীজগণিত ও অঙ্কশাস্ত্র বিশেষ ভাবে অনুশীলন করেছিল।
- ↑ “Go ye into all the world, and preach the gospel to every creature. He that believeth and is baptised shall be saved; but he that believeth not shall be damned. And these signs shall follow them that belive; in my name shall they cast out devils; they shall speak with new tongues; they shall take up serpents; and if they drink any deadly thing, it shall not hurt them; they shall lay hands on the sick, and they shall recover.”—Mark xvi, 15—18.
- ↑ See Note I.
- ↑ “Faith is the cry of all theologians; believe with us and you will be saved; refuse to believe and you are lost. Yet they know nothing of what belief means. They dogmatize, but they fail to persuade......”—Froude's Short Studies on Great Subjects.
- ↑ Matt. xvi—19.
“This true Catholic faith out of which no one can be saved.” (Creed of Pope Pius IV). See also the seventeenth article of the Syllabus of Errors published by Pope Pius IX in the nineteenth century. - ↑ See Note II.
- ↑ “We walk by faith, not by sight.”-2 Cor. v—7.
- ↑ “You assert that the human race merited eternal reprobation because their common father had transgressed the divine command and that the crucifixions of the Son of God was the only sacrifice or sufficient efficacy to satisfy eternal justice. But it is no less inconsistent with justice and subversive of morality that millions should be responsible for a crime which they had no share in committing, than that, if they had really committed it, the crucifixion of an innocent being could absolve them from moral turpitude. Ferrente ulla civitas latorem istiusmodi legis, ut condemnaretur filius, aut nepos si pater, aut avus deliquisset? Certainly this is a mode of legislation peculiar to a state of savageness and anarchy; this is the irrefragable logic of tyranny and imposture.”—A Refutation of Deism. (Shelley).”
- ↑ বাইবল ধর্ম্মপুস্তকে ইউরোপীয়দের শ্রেষ্ঠতা স্বয়ং ঈশ্বর (জেহোবা) কর্ত্তৃক নির্দ্দিষ্ট হয়েছে। বর্ণিত আছে যে জলপ্লাবনের পর পৃথিবী দ্বিতীয়বার জীবজন্তুর আবাসভূমি হয়। তখন নোয়া থেকেই বর্ত্তমান মানবজাতির উৎপত্তি হল। জেনেসিস পুস্তকের নবম অধ্যায়ে লেখা আছে যে নোয়ার তিন পুত্র ছিল—শেম, হ্যাম ও জাফেথ। একদিন নোয়া সুরা পানে উন্মত্ত হয়ে বিবস্ত্র ভাবে নিজ শিবিরে শুয়ে আছেন এমন সময়ে হ্যাম হঠাৎ সেখানে যায় ও তাঁর সেই অবস্থা দেখে ফেলে। হ্যাম তার দুই ভাইকে সে কথা জানালে শেম ও জাফেথ একটা কাপড় নিয়ে মুখ ফিরিয়ে সেখানে যায় আর নোয়াকে সেই কাপড় দিয়ে ঢেকে তাঁর উলঙ্গমূর্ত্তি না দেখে চলে আসে। নোয়া জেগে উঠে বুঝতে পারলেন যে হ্যাম তাঁর দিগম্বর মূর্ত্তি দেখেছে। ক্রোধান্ধ হয়ে তিনি হ্যামের পুত্র কেনানকে এই বোলে অভিশাপ কল্লেন যে তাকে চিরকাল শেম ও জাফেথের সন্তানদের দাস হয়ে কালযাপন করতে হবে। সেই সঙ্গে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে শেম ও জাফেথকে আশীর্ব্বাদ করে তাদের কেনানের সেবা পাবার অধিকার দান করলেন। এই অদ্ভুত বিচারতত্ত্বের বিচার অনাবশ্যক। মোট কথা জাফেথ হলেন ইউরোপীয়দের আদি পুরুষ; শেম হলেন ইহুদীদের আদি পুরুষ এবং হ্যাম হলেন আফ্রিকাবাসীদের আদিপুরুষ। বাইবেল-লেখকের ভূগোল জ্ঞান সীমাবদ্ধ থাকায় আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া এবং এসিয়ার ইহুদী ভিন্ন অপরাপর জাতীয় কুলজী এই মহাপুস্তকে স্থান পায় নি। ফলতঃ উপরোক্ত প্রবচন অবলম্বন করে আমেরিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশীরা আফ্রিকাবাসীদের বহুকাল দাসত্ব-শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছিল এবং ইউরোপবাসীদের আত্মগৌরবের এই একটা মূল কারণ।
- ↑ Deut iv-3I,
- ↑ II Sam xi অপর জাতিদের ইহুদিরা কিরূপ পীড়ন করতো এবং তাহাদের ঐসব নিষ্ঠুর আচরণে ঈশ্বর তাহাদের কিরূপ সহায়তা করতেন আদি খণ্ডে তার বিস্তর প্রমাণ পাওয়া যায়। Exod. xxxii; Num. xxxi; Deut. iii; Joshua. x ইত্যাদি দ্রষ্টব্য। Nobel Prize প্রাপ্ত ফরাসী সাহিত্যিক Romaine Rolland john Christopher নামক পুস্তকে লিখেছেন:―
“The God of the Bible is an old Jew, a maniac, a monomaniac, a raging madman, who spend his time in growling and hurling threats and howling like an angry wolf, raving to himself in the confinement of that cloud of his. I do'nt understand him; his perpetual curses make my head ache, and his savagery fills me with horror.”
“He is capricious, revengeful exceedingly ill-tempered; he has fierce wrath and cruelty; he is angry even with the Hebrews and one day says to Moses, ‘take all the heads of the people and hang them up before the Lord against the sun....... He is partial, hates the heathen, takes good care of the Jews, not because they deserve it but because he will not break his covenant.”―Theodore Parker. - ↑ ভারতবর্ষও এককালে কতদূর উন্নত হয়েছিল Sir Hiram Maxim এর কথায় তার খানিক আভাস পাওয়া যায়। “My brother has some time past been studying old Hindoo literature on the subject of steel manufacture, as he knew that some grades of old Indian steel were superior to the best that America and England can produce now-a-days.” (Statement reproduced from the Daily Mail in the Statesman May 14, 1897). চীন সম্বন্ধে Victor Hugo লিখিয়াছেন:―“The Chinese have been before hand with us in all our inventions―printing, artillery, aerostation, chloroform.”
- ↑ “The science, the art, the jurisprudence, the chief political and social theories of the modern world have grown out of those of Greece and Rome―not by favour of, but in the teeth of the fundamental teachings of early Christianity, to which science, art and any serious occupation with the things of this world, were alike despicable.”―Huxley
- ↑ See Note III.
- ↑ “The remains of Greek and Latin literature which the monastaries preserved, in ignorance of their nature, are small compared with the quantity which Christian bigotry destroyed. It was by an orthodox ecclesiastic that the Alexandrian library was pillaged out of existence―Chistianity and Civilisation.
- ↑ “Their credulity debased and vitiated the faculties of the mind; they corrupted the evidences of history, and superstition gradually extinguished the hostile light of philosophy and science.” —Gibbon, ch. xxxvii.
- ↑ “While the greater part of Christendom was steeped in object credulity, what was the rival faith of Mohammed doing? In the eighth century the Moors conquered Spain, and as if by magic, a splendid civilization sprang into being. An extensive commerce and a general love of industry created a wealth that astounded the Christian world. Wise laws developed and regulated an ingenious system of agriculture. The Moors bred cattle, sheep and horses. Civilization owes to them the culture of silk and introduction into Europe of rice, sugar, cotton and many fruits. They fostered the manufacture of textile fabrics, earthenware, iron, steel and leather. While Christians were slaughtering one another for the glory of God, the Spanish Moors were writing treatises on the principles of trades and commerce. A Christian stricken by disease sought the aid of the nearest saint and waited for a miracle; the Moor relied on the prescription of a physician or the skill of a surgeon; Rome and Constantinople were asserting the flatness of the earth, while the Spanish Arabs were using globes in their common schools. In practical science, specially in astronomy, botany, optics, surgery and medicine, their achievements were beyond the immitation or even the comprehension of the rest of Europe for hundreds of years. The study of algebra and mathematics was carefully cultivated by the Moors.”― Christianity and Civilisation,
“The intense poetry of a romantic, oriental race clad Spain in a garb of beauty which still clings to her, in spite of her many vicissitudes, Desertion and desolation have harassed her, but many of the jewels which the Moors―to use a general term―Lestowed upon her during their stay in the land of orange-blossoms, and olive-trees still shine in her tiara.”―The Wonders of the World.