বিষয়বস্তুতে চলুন

পূর্ব পাকিস্তানে বেতার

উইকিসংকলন থেকে

অজ্ঞাত লেখক
পূর্ব পাকিস্তানে বেতার


ঢাকা বেতার কেন্দ্র।

ঢাকার নতুন ১০০
কিলোওয়াট মধ্য-
তরঙ্গ ধ্বনিবিস্তার
কেন্দ্র।

পূর্ব পাকিস্তানে বেতার


 আজাদী লাভের সময় পাকিস্তানের ভাগে পড়ে তিনটি বেতার কেন্দ্র। দুটো পশ্চিম পাকিস্তানে, একটা পূর্ব পাকিস্তানে। সেই একটি কেন্দ্রেরও অবস্থা ছিল শোচনীয়। নামে মাত্র বেতার কেন্দ্র ও তার সাজ-সরঞ্জাম, আবাসিক অবস্থা, ধ্বনিবিস্তার ক্ষমতা, শিল্পী ও কর্মচারী সংখ্যা, পরিচালন ব্যবস্থা—সবই ছিল ন্যূন, অত্যন্ত সীমাবদ্ধ।

 আজাদী পরবর্তী কয়েক বছর এই নিয়েই কাজ করতে হয় পূর্ব পাকিস্তানের এই একমাত্র বেতার কেন্দ্রটিকে।

 দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় পূর্ব পাকিস্তানে বেতার উন্নয়নের ওপর বিশেষ ভাবে জোর দেয়া হয়। এখানকার বেতার কেন্দ্রের মান ও সংখ্যা বৃদ্ধির প্রতি সরকার সবিশেষ মনোযোগ দেন। আজ ১৯৬৩-তে আমরা তার ফল লাভের জন্য প্রস্তুত হয়েছি। পাকিস্তানের প্রথম ক্ষুদ্রতরঙ্গের ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র ঢাকায় স্থাপিত হয়েছে; শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিকতম ষ্টুডিও কক্ষ সম্বলিত নয়া বেতার ভবন প্রথম নির্মিত হয়েছে ঢাকায়; মধ্যতরঙ্গের সর্বাপেক্ষা অধিক শক্তিশালী ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্রও স্থাপিত হয়েছে ঢাকায়।

 ভবিষ্যতের জন্যও সকল বেতার উন্নয়নের পরিকল্পনায় পূর্ব পাকিস্তানের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দান করা হয়েছে। প্রতিটি কার্য সমাধানের তারিখ নির্দিষ্ট করা হয়েছে সাধ্যমত নিকটে। অতীতের অবহেলায় যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে যেন পূর্ব পাকিস্তান তাকে অতিক্রম করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে সব সময় সে কথা স্মরণ রাখা হয়েছে।


নূতন ১০০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার

 সম্প্রতি ঢাকায় মধ্যতরঙ্গের একশত কিলোওয়াট শক্তি বিশিষ্ট নূতন ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। এই ট্রান্সমিটারের বদৌলতে রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠান এখন টেকনাফ থেকে নিলফামারী, নবাবগঞ্জ থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ, গলাচিপা থেকে হালুয়াঘাট পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সকল অঞ্চলের মানুষই স্পষ্ট শুনতে পাবেন।


আগের অবস্থা

 বরাবর আমাদের অবস্থা এরকম ছিল না। যখন আজাদী লাভ করি তখন পূর্ব পাকিস্তানে রেডিও ষ্টেশন ছিল মাত্র একটি। পুরোনো শহরের এক ভাড়াটে বাড়ীতে, জোড়াতালি দিয়ে তিনটে কামরাকে ষ্টুডিও বানিয়ে কোনরকমে কাজ চালানে হোতো। এই ভাবে ষ্টেশন চালু করা হয়েছিল আজাদী পূর্বকালে ১৯৩৯ সালে। এর ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্রের (ট্রান্সমিটার) শক্তি ছিল মাত্র পাঁচ কিলোওয়াট, মধ্যতরঙ্গ। ধ্বনিগ্রহণ কেন্দ্রের (রিসিভিং সেণ্টার) মুখ ছিল ভারতের দিকে ঘোরান। প্রচারিত অনুষ্ঠান পঞ্চাশ মাইলের বেশী দূরে শোনা যেত না। আর ক্ষুদ্রতরঙ্গের কোনরকম ধ্বনিবিস্তার ব্যবস্থা না থাকায় পশ্চিম পাকিস্তানের সংগে বেতার অনুষ্ঠানের মারফৎ যোগাযোগ রক্ষা করা আদৌ সম্ভব ছিল না।

 এক কথায় বলা চলে বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে পূর্ব পাকিস্তানে আগাগোড়া সবকিছুই একরকম নূতন করে গড়ে নিতে হয়েছে।

অগ্রগতির পদক্ষেপ

 ১৯৪৯ সালে ক্ষুদ্রতরঙ্গের সাত দশমিক পাঁচ কিলোওয়াট ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র স্থাপন আমাদের অগ্রগতির প্রথম পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বেতার-সংযোগ ঘনিষ্ঠতর হোলে। প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেতার অনুষ্ঠানের প্রচার আরো শক্তিশালী করে তুলবার জন্য ১৯৫৯-এ আরো একটি ক্ষুদ্রতরঙ্গের ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র স্থাপিত হোলো। ১৯৬০-এ নির্মিত হয় ঢাকা নয়া বেতার ভবন। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে স্থাপিত এই সুদৃশ্য অট্টালিকার নয়টি ষ্টুডিও কক্ষই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। শব্দগ্রহণ কক্ষটি (রেকর্ডিং রুম) সর্বাধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন সাধনের উপযুক্ত করে বিশেষভাবে পরিকল্পিত হয়েছে। অনুষ্ঠান প্রচারের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা রয়েছে ঘরে ঘরে। এই বেতার কেন্দ্রে ধ্বনি-নিয়ন্ত্রণ প্রকোষ্ঠ (কণ্ট্রোল রুম) রয়েছে পাঁচটি। এই পাঁচটিকে পরিচালিত করবার জন্য আবার একটি প্রধান ধ্বনিনিয়ন্ত্রণ প্রকোষ্ঠ (মাষ্টার কণ্ট্রোল রুম) রয়েছে।

 পুরাতন ধ্বনিগ্রহণ কেন্দ্রটির অবস্থা মোটেই উন্নত ছিল না। ১৯৩৯ সালের সেই প্রাচীন যন্ত্রটির দ্বারা নিরুপদ্রবে অনুষ্ঠান পুনঃপ্রচার করা দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছিল। নূতন ধ্বনিগ্রহণ কেন্দ্র স্থাপিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান বৎসরের মার্চ মাস থেকে এই দুরবস্থার অবসান ঘটে। আগাগোড়া আনকোরা নূতন যে আকাশ-তারের (এরিয়েল) জাল গেঁথে তোলা হয়েছে তার ধ্বনিগ্রহণ ক্ষমতা অসাধারণ।


ক্রমবর্ধমান প্রয়োজন

 গত কয়েক বৎসরের মধ্যে ঢাকার গুরুত্ব নানা কারণে অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। কেবল প্রাদেশিক সরকারের আবাসস্থল হিসাবেই নয়, কর্মচঞ্চল নাগরিক জীবনের সর্বাত্মক বিকাশের দিক থেকেও ঢাকার প্রয়োজন অগ্রাধিকার দাবী করেছে। কিন্তু তাই বলে প্রদেশের সাংস্কৃতিক জীবনে অন্যান্য জেলার গৌরবময় ভূমিকা অস্বীকার করবে কে; পরিবর্তন সব জেলাতেই এসেছে। কলকারখানা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নূতন জোয়ার এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির দ্রুত বিস্তারের ফলে সকল জেলাতেই রেডিও ষ্টেশন স্থাপনের আবশ্যকতা বৃদ্ধি পেয়েছে।


চট্টগ্রাম বেতার-কেন্দ্র

 এই পটভূমি স্মরণ রেখে সরকার ১৯৫৪ সালে চট্টগ্রামে বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজে হাত দেন। মধ্যতরঙ্গের একটি এক কিলোওয়াট শক্তির ধ্বনিবিস্তার ব্যবস্থার সাহায্যে ঢাকা কেন্দ্রের কোনো কোনে অনুষ্ঠান এখান থেকে পুনঃপ্রচারিত হতে থাকে। ১৯৬২ সালে দশগুণ অতিরিক্ত শক্তিসম্পন্ন আরো একটি মধ্যতরঙ্গের ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র চালু করা হয়। ইতিমধ্যে চট্টগ্রামের রেডিও ষ্টেশনের নয়া ভবন পর্যন্ত তৈরী হয়ে গেছে এবং সেখান থেকে ঢাকার অনুষ্ঠান পুনঃপ্রচার ছাড়াও আংশিক নিজস্ব অনুষ্ঠান চালু হয়েছে। আশা করা যায় যে শীগগীরই চট্টগ্রামে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বেতার কেন্দ্র হিসাবে কাজ করতে শুরু করবে।


রাজশাহী বেতার-কেন্দ্র

 অনুষ্ঠান পুনঃপ্রচারের জন্য ১৯৫৪ সালে রাজশাহীতেও অনুরূপ একটি নিম্নশক্তির মধ্যতরঙ্গ ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। পুরোদস্তুর বেতার-কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে এই ধ্বনিবিস্তার ব্যবস্থাকেই ১৯৬২ সালে বাড়িয়ে দশ কিলোওয়াট শক্তিতে পরিণত করা হয়। রাজশাহীতেও নূতন বেতার ভবন নির্মিত হয়েছে এবং বর্তমানে সরাসরি অনুষ্ঠান প্রচারের উপযুক্ত করে ষ্টুডিওগুলোকে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে প্রস্তুত করা হচ্ছে। এখান থেকেও ঢাকার অনুষ্ঠান পুনঃপ্রচার এবং আংশিক নিজস্ব অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়েছে।

রাজশাহী বেতার-কেন্দ্র।


রাজশাহী বেতারের ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র।


সিলেট বেতার কেন্দ্র।

সিলেট বেতার-কেন্দ্রের
কণ্ট্রোল রুম।
সিলেট

 সিলেটে মধ্যতরঙ্গের দুই কিলোওয়াট শক্তির যে ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্রটি ১৯৬১ সালে স্থাপিত হয় তার সাহায্যে ঢাকার অনুষ্ঠান নিয়মিত পুনঃপ্রচারিত হচ্ছে। সিলেটের ষ্টুডিওতে অনুষ্ঠান রেকর্ড করাবারও সুব্যবস্থা রয়েছে বলে স্থানীয় শিল্পীদের কথা ও গান সহজে সমগ্র দেশের জন্য প্রচারিত হতে পারছে। হযরত শাহজালালের ওরসের বিবরণ কিম্বা নৌকা বাইচের উৎসবের কথাও সরাসরি ঘটনাস্থল থেকে রেকর্ড করে নেয়া হয়।


রংপুর

 মধ্যতরঙ্গের দশ কিলোওয়াট শক্তির আরেকটি ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র রংপুরে স্থাপিত হতে চলেছে। এখান থেকে দৈনিক দু’ঘণ্টার অনুষ্ঠান পুনঃপ্রচারিত হতে পারবে। ক্রমে এই কেন্দ্রটিকেও উন্নত করে এর কর্মসূচীর সম্প্রসারণ করা হবে। তার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের উত্তর প্রত্যন্ত অঞ্চল নিজস্ব সংস্কৃতি প্রচার-কেন্দ্র লাভে সক্ষম হবে।


বেতার প্রতিষ্ঠানের কর্মতৎপরতা

 আজাদী লাভের আগে এবং পরে স্থানীয় বেতার কেন্দ্রকে হরেক রকম বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে। অব্যবস্থা, অভাব এবং অসুবিধা ছিল এর নিত্য সহচর। কিন্তু সকল প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও রেডিও পাকিস্তান যে কখনও পিছিয়ে পড়েনি, হতাশা ও পরাজয়কে বরণ করে নেয়নি, সেটাই হোলো সবচেয়ে বড় গৌরবের বিষয়। জাতীয় জীবনে বা স্থানীয় পরিবেশে কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা অনুষ্ঠিত হলে বেতার-কেন্দ্র বরাবরই তার প্রচারের সুব্যবস্থা করতে সমর্থ হয়েছে। পরিষদ সদস্যদের বিতর্ক-বক্তৃতা, খেলাধুলা, সৈন্যবাহিনীর কুচকাওয়াজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশন, জাতীয় দিবস, উৎসব ও ঘটনা, খ্যাতনামা ব্যক্তিদের সফর, সভা-সম্মেলন, মেলা-প্রদশর্নী—দেশবাসীকে জ্ঞান ও আনন্দ বিতরণের জন্য বেতার-কেন্দ্র একেবারে ঘটনাস্থল থেকে এগুলোর প্রত্যক্ষ বিবরণ প্রচার করেছে। খোলা মাঠ, নদীর পাড় কিম্বা তাঁবুর নীচে থেকে সুচারুরূপে অনুষ্ঠান প্রচার করা সহজ কাজ নয়। আমাদের বেতার-কেন্দ্রের কুশলী কর্মীরা প্রশংসনীয় পরিচালন-ক্ষমতা ও কারিগরি দক্ষতার সঙ্গে এইসব অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে ঘটনাস্থল থেকে প্রচার করে অগণিত শ্রোতার মনোরঞ্জন ও প্রশংসা অর্জন করেছেন। যাতে ভবিষ্যতে এই শ্রেণীর প্রচেষ্টা অধিকতর তৎপরতার সংগে সাফল্য অর্জন করতে পারে সেজন্য অল্পকাল মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রদ্বয় দু’টো ভ্রাম্যমান শব্দগ্রহণ যান (মোবাইল রেকডিং রুম) লাভ করবেন। ১৯৬৪ সালের মধ্যে রাজশাহী বেতার কেন্দ্রকেও একটি ভ্রাম্যমান শব্দগ্রহণ যান সরবরাহ করা হবে।

লক্ষ্য ও লক্ষ্য অর্জনের সহায়ক ব্যবস্থা

 পাকিস্তানে বেতার জাতীয় উদ্দীপনের মহৎ লক্ষ্যের অভিসারী। জাতীয় জীবনের চিত্র তুলে ধরা তার অন্যতম লক্ষ্য। দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্খা, তার শিক্ষাসংস্কৃতি, তার শিল্প-সাহিত্য—তার জীবনাচরণের বিচিত্র ঐশ্বর্যকে বেতার কেন্দ্র সুরে সংগীতে কথায় ধ্বনিময় করে তুলতে চায়। সাংস্কৃতিক জীবনে নেতৃত্ব প্রদান তার দায়িত্ব, জাতীয় জীবনে ঐক্যবিধান তার দিবারাত্রির সাধনা। প্রতি অঞ্চলের স্বকীয় সংস্কৃতির আত্মবিকাশে সে সহায়তা করে, এবং সকল বিভিন্নতার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে জাতীয় সংস্কৃতির অখণ্ড পরিচয়কে প্রদীপ্ত করে তোলে। বেতার জাতীয় আদর্শের প্রতি দেশবাসীদের চিত্ত আকর্ষণ করতে সর্বদা সচেষ্ট। সেই জন্যই আবশ্যকীয় তথ্য ও সংবাদ পরিবেশনে বেতার পরিচালকবৃন্দ এত সতর্ক, শ্রোতৃমণ্ডলীকে সুস্থ আনন্দ দান করায় তাঁদের এত আগ্রহ। সেজন্য সরকারের প্রধান চেষ্টা হলো অঞ্চলে অঞ্চলে শক্তিশালী মধ্যতরঙ্গের ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র স্থাপন করা যাতে পাশাপাশি এলাকার সকল লোক প্রতিটি প্রচারিত অনুষ্ঠান ও ঘোষণা অবাধে শুনতে পায়।


শক্তিশালী ক্ষুদ্রতরঙ্গের ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র

 আবার পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বেতার-বন্ধন দৃঢ়তর করে তোলার জন্য, কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সংবাদ এবং জাতীয় অনুষ্ঠানের সুষ্ঠু পুনঃপ্রচারের জন্য উভয় অংশে শক্তিশালী ক্ষুদ্রতরঙ্গের ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র চাই। এই কথা মনে রেখেই আগামী আর্থিক বছরের মধ্যে ঢাকায় একটি উচ্চ শক্তি বিশিষ্ট ক্ষুদ্রতরঙ্গের ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর এই লক্ষ্য ও প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতেই এ বছর ঢাকার মধ্যতরদের একশত কিলোওয়াট শক্তির ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র স্থাপিত হোলো।


ঢাকা বেতারের বিভিন্ন কর্মসূচীঃ

 লোক রঞ্জন, লোক শিক্ষা, জাতি গঠন, সংস্কৃতি চর্চা প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে ঢাকা বেতারের বহুমুখী অনুষ্ঠানসূচী রয়েছে। নীচে তার কয়েকটির পরিচয় দেওয়া গেল।


ধর্মীয় অনুষ্ঠান

 ধর্মভাব ও নৈতিক-বোধের জাগরণ মানুষের সকল সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টার সার কথা। শান্তি ও কল্যাণের পথ পরিচর্যার এ এক অপরিহার্য শর্ত। ঢাকা বেতার তাই নিয়মিত প্রাত্যহিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রচার ছাড়াও বিশেষ বিশেষ ধর্মীয় উৎসবে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা করে থাকে। পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু মুসলিম সমাজ ছাড়াও সংখ্যালঘু হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্যও এখান থেকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়।


বুনিয়াদী গণতন্ত্রের আসর

 পল্লীবাসীদের জন্য প্রচারিত বিশেষ অনুষ্ঠান বুনিয়াদী গণতন্ত্রের অসির। দূর গ্রামাঞ্চলের শ্রোতাদের জন্য পরিবেশিত এই অনুষ্ঠান সর্বশ্রেণীর শ্রোতাই বিশেষ আগ্রহের সঙ্গে শুনে থাকেন। ফসল ও কৃষির নানা সংবাদ, জমি চাষের আধুনিক প্রণালী ও যন্ত্রপাতির কথা, পশুপালন ও সার উৎপাদন পদ্ধতি সম্পর্কে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য এই অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয়।

 এই অনুষ্ঠানের কিছু সভ্যদের উদ্দেশ্যে প্রচারিত। আরো উন্নত ও আনন্দময় করে কিছু দিক রয়েছে যা বিশেষভাবে বুনিয়াদী গণতন্ত্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টার দ্বারা সামাজিক জীবনের মান কি করে তোলা যায়, ইউনিয়ন কাউন্সিল কি করে গ্রামে গ্রামে মানুষের প্রাণ নতুন আশা, উৎসাহ ও আশ্বাসে ভরে তুলতে পারেন তার ইংগিত দান করা এই আসরের অন্যতম লক্ষ্য।


স্কুলের ছেলেমেয়েদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান

 প্রতি শুক্রবার স্কুলের ছেলেমেয়েদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। পাঠ্যপুস্তক জ্ঞান বিতরণ করে নিতান্ত নিরস ও বিশুষ্কভাবে; এই অনুষ্ঠান জানার কথা ছেলেমেয়েদের হৃদয়ে হৃদয়ে পৌঁছে দেয় সরা ও আনন্দপূর্ণ করে। এতে যেমন ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য উপযুক্ত কথিকা, নাটিকা ও গান পরিবেশিত হয়, তেমনি তাদেরও সুযোগ দেওয়া হয় নিজেদের লেখা পড়তে, আবৃত্তি করতে ও কণ্ঠ ও যন্ত্রসংগীতে অংশ গ্রহণ করতে।

 পূর্ব পাকিস্তানের প্রখ্যাত কবি ফররুখ আহমদ এই অনুষ্ঠান পরিচালনা করে থাকেন।


খেলাঘর

 একেবারে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য খেলাঘর।

 প্রতি রবিবার সকাল নয়টায় এই অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। ছেলেমেয়েরাই এই আসরের আসল শিল্পী। তারা এই আসরে কখনও জ্ঞানের কথায় মেতে ওঠে, কখনও কল্পনার রাজ্যে ডুবে যায়, ইতিহাসের গল্প বা নয়া আবিষ্কারের কাহিনী শোনে।


নাটক

 প্রতি সোমবার রাত পৌনে দশটায় বাংলা নাটক প্রচারিত হয়। এসব নাটকে থাকে সমকালীন জীবনের সূক্ষ্ম জটিল গভীর রূপায়ণ—কখনও সুখের, কখনও দুঃখের; থাকে ইতিহাসের পুনঃসৃষ্টি, লোকজীবনের সরল গাথার নাট্যরূপ।

বিভিন্ন অনুষ্ঠান নাটক অনুষ্ঠান।
জীবন্তিকা
সঙ্গীতানুষ্ঠান
ঢাকা কেন্দ্রে বুনিয়াদী
গণতন্ত্রের আসর।
ঢাকা কেন্দ্রে পল্লী যন্ত্র-
সঙ্গীতের অর্কেষ্ট্রা।

বাম থেকে ডাইনে : (১ম) ফরিদা ইয়াসমীন, (৩য়) আবদুল আলীম,
(৪র্থ) ওস্তাদ আয়েত আলী খান, (৫ম) মুস্তাফা আলী খান, (৬ষ্ঠ)
ইউসুফ খান কৌরাইশী।

পূর্ব পাকিস্তানের কেয়কজন বিশিষ্ট বেতার-শিল্পী।


লায়লা আর্জুমন্দ বানু
ফেরদৌসীবেগম

ঢাকা বেতার কেন্দ্রের
মহিলা মহফিল।
কিশোর মজলিস।
খেলাঘর
মহিলা মহফিল

 মহিলা মহফিল বসে প্রতি শুক্রবার দুপুর আড়াইটায়। বিশেষ করে মহিলাদের দুনিয়া প্রতিফলিত করা এই অনুষ্ঠানের লক্ষ্য। এতে থাকে ঘরসংসারের কথা। সেলাই ও রান্নার আলোচনা, গৃহ সজ্জার ও নিজেদের রূপসজ্জার অনেক মূল্যবান পরামর্শ। এ ছাড়া এই আসর থেকে মহিলাদের গল্প, নাটক, কথিকা, গান নিয়মিত প্রচারিত হয়ে থাকে।


‘ইসরাফিল’ অনুষ্ঠান

 দেশপ্রেম ও জাতিগঠনের অনুপ্রেরণা সৃষ্টির লক্ষ্য সামনে রেখে সপ্তাহে চার দিন ‘ইসরাফিল’ অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। আলোচনা, কথিকা, নাটিকা ও জীবন্তিকা প্রভৃতি বিভিন্ন আঙ্গিকে পরিবেশিত হয় কখনো সমকালীন ঘটনার তাৎপর্য, কখনো ঐতিহাসিক ঘটনার ইঙ্গিত, কখনো গঠনমূলক কাজের প্রেরণা।


লোক-সংগীত

 গ্রামে পূর্ব পাকিস্তানের লোক-সংগীতের খ্যাতি সারা দুনিয়া জোড়া। এখানকার আপামর সাধারণ গান বড় ভালবাসে। আর এই গানের মুগ্ধ শ্রোতা সমগ্র দেশ। একজন সুর করে পুঁথি পড়ে, দশজন তা কান পেতে শোনে। দশজনে মিলে যাত্রাভিণয় করে, কবিগান, জারিগান, গাজীর গানের আসর জমায়। আর দশগ্রামের লোক রাত জেগে সেই আনন্দের অংশীদার হয়। ভাটিয়ালী, মারফতী, মুর্শিদী, ভাওয়াইয়া মিলে পূর্ব পাকিস্তানের লোক-সংগীতের সুর ও ভাবের বৈচিত্র্য বিস্ময়কর। নিয়মিতভাবে এর সবই আমাদের বেতার-কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়।


প্রকাশ্য অনষ্ঠান

 রেডিও পাকিস্তান ঢাকার একাধিক কৃতিত্বের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি হোলো প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তা বেতারে প্রচার করা। ঢাকা বেতার ভবনের উন্মুক্ত প্রাংগনে এবং শহরের অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রে বেতারের এরূপ প্রকাশ্য অনুষ্ঠান গত ৩৪ বছরে কয়েকবার আয়োজিত হয়েছে। প্রতিবারই এ সব অনুষ্ঠান শ্রোতৃমহলের অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন করেছে। সাধারণ অবস্থায় বেতারের অদৃশ্য শিল্পী শ্রোতার মনে যে অন্তরাল সৃষ্টি করে রাখে এই সব প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে সেটা কেটে যায়, শ্রোতা বেতার-শিল্পী ও বেতার-প্রতিষ্ঠানের সংগে নিবিড় অন্তরংগতা অনুভব করে। এমনি ভাবে ‘মল্লার’ ‘বসন্ত বাহার’ নজরুল দিবস প্রভৃতি প্রকাশ্য ভাবে বেতার কেন্দ্রের দ্বারা উদ্‌যাপিত হওয়ার ফলে নিষ্প্রাণ বেতার কেন্দ্র যন্ত্রচালিত হয়েও শ্রোতার হৃদয়কে স্পর্শ করার নূতন পথ খুঁজে পেয়েছে। চট্টগ্রাম খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটে যখন এই জাতীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় তখন সে-সব জায়গায় অনেক নূতন গুণী শিল্পীর সন্ধান পাওয়া যায়।


লোক-গীতি উৎসব

 লোক-সংগীতের গীতকার গায়ক বাদক সকলেই স্বভাবতঃ নম্রস্বভাব ও যন্ত্রভীরু। মহানগরের কোলাহলকে তাঁরা এড়িয়ে চলেন, বেতার প্রচারের যান্ত্রিক ব্যবস্থাদির সুযোগ গ্রহণ করতে সহজে উৎসাহিত বোধ করেন না। অথচ বেতারের অগণিত শ্রোতা নিজের দেশের মাটির সবচেয়ে আপন যে সংস্কৃতির ধারা তার প্রচার ব্যাপক ও নিরবচ্ছিন্ন হোক এই কামনাই করে। শিল্পীর সংকোচ ও বেতারের দাবী এই দুইয়ের মধ্যে যে ব্যবধান তার অবসান ঘটে ১৯৬১ সালে, প্রকাশ্য মঞ্চে ঢাকায় অনুষ্ঠিত লোক-গীতির উৎসবে। সমগ্র প্রদেশের প্রতি অঞ্চলের বাছাই করা শতাধিক শিল্পী এতে অংশ গ্রহণ করেন। খোলা আংগিনায় গান হয়: ভাওয়াইয়া ও চটকা, ভাটিয়ালী ও মারফতী, জারী ও মুরশেদী। হয় কবিগান, হাস্যরসাত্মক হাবুগান এবং পুঁথিপাঠ। যাত্রা হয় দুটো, হাতেমতাই ও রূপভান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক বিখ্যাত দল পরিবেশন করেন পুতুল নাচ। ‘কর্ণফুলী’

 ১৯৬০ সালের ২১শে ও ২২শে সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম সেণ্ট গ্লাসিস হলে ঢাকা বেতার কেন্দ্র এক প্রকাশ্য উৎসবের আয়োজন করে। ঢাকার প্রথম শ্রেণীর বেতার শিল্পীরা ছাড়াও চট্টগ্রামের অনেক প্রতিষ্ঠিত ও প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পী এই অনুষ্ঠানে একজোটে অংশ গ্রহণ করেন। বেতার শ্রোতার কানকে পরিতুষ্ট রাখার সংগে সংগে সমবেত দর্শকের চোখের পিপাস। পরিতৃপ্ত করবার জন্য মঞ্চকে মনোরম করে সুসজ্জিত করা হয় এবং প্রচারিত অনুষ্ঠানে গানের সংগে সংগে নাটক ও নৃত্যের ব্যবস্থাও রাখা হয়।

 নাটকের নাম ছিল সাঁকো, গীতিনাট্যের নাম ‘কর্ণফুলী’। নিছক অনিন্দ দান করা ছাড়াও কর্ণফুলীর একটা গভীরতর উদ্দেশ্য ছিল। কর্ণফুলীর নৃত্য গীত ও কাহিনী চট্টগ্রামের প্রাণ ও প্রকৃতির একটা বিশেষ সুষমাকে শিল্পরূপ দান করতে চেষ্টা করেছে।

 এই গীতিময় নৃত্যনাট্য চাকমা উপকথা নির্ভর। অকস্মাৎ এক চামা রাজকুমারীর কুঞ্জে এক বিদেশী রাজকুমারের আবির্ভাব। তাদের প্রেম পরিপূর্ণ হতে পারেনি। রাজকুমারকে বিদায় নিতে হয়। বিদায়কালে রাজকুমার প্রেমিকাকে স্মৃতিচিহ্ন রূপে কর্ণফুল দিল। রাজকন্যা নদীস্নানে সেই কানফুল হারিয়ে ফেলে। এ যেন তার সমস্ত ভবিষ্যতের মৃত্যু। নদীর নাম হ’ল কর্ণফুলী। শিল্পীরা কথার গানে নাচে সেই বেদনাকেই প্রাণময় করে তোলেন।

 মঞ্চে পরিবেশিত ও বেতারে প্রচারিত এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের সেরা শিল্পীরা চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেই নিজস্ব ভংগীতে অভিবাদন জানিয়েছেন।


‘সুন্দরী’

 রূপসা নদীর এপারে গ্রাম ওপারে গহন অরণ্য। একটু পরেই মোহনার মুখে সমুদ্র। সমুদ্রের তরঙ্গগর্জন আর অরণ্যের বাঘের হুংকারে অতি বড় সাহসীর বুকও অজানা ভয়ে কাঁপে। তবু গ্রামবাসীরা জংগলে যায়, কাঠ সংগ্রহ করে, ফলমূল কুড়িয়ে আনে। ভরসা বড় গাজী খাঁ। তাঁর নামে শিণি দিয়ে চাষী কাঠুরে সাহসে বুক বাঁধে, নিয়মিত জংগলে এসে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নেয়। শিণি দেয় না শুধু একজন। এক দুঃসাহসী জোয়ান চাষী। সে কোনো কুসংস্কার মানে না। নিজের বাহুবলকে নির্ভর করে নির্ভয়ে অরণ্যে প্রবেশ করে, ফিরে এসে হৃদয় বলে মোহিত করে খোদ বড় গাজী খাঁর কন্যা বনবিবিকে। কন্যা এত সুন্দর যে পিতা আদর করে নাম রেখেছেন সুন্দরী। যেদিন গাজী খাঁ জানলেন যে কন্যা তার প্রাণ মন সঁপেছে এক উদ্ধত অভক্ত জোয়ানকে সেদিন তাঁর ক্রোধের সীমা-পরিসীমা থাকে না। এক ভয়ানক অভিশাপ দিয়ে কন্যাকে পরিণত করলেন বৃক্ষে, যুবককে কাঠুরেতে। তাইত আজও কাঠুরে, সকল বিপদ তুচ্ছ করে, কুমীর ভরা নদী পেরিয়ে, বাঘ-ডাকা অরণ্যে ছুটে যায় সুন্দরী কাঠ আহরণ করবার জন্য।

 লোকপ্রচলিত এই কাহিনী ভিত্তি করে ঢাকা বেতার কেন্দ্র ১৯৬০ সালের ডিসেম্বর মাসে খুলনার এক প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে এক নৃত্যগীত মুখর নক্শা প্রচার করে। খুলনা এবং যশোহরের অনেক নতুন পুরাতন শিল্পী এতে অংশ গ্রহণ করেন। বেতারের জন্য নতুন প্রতিভা অনুসন্ধানের চেষ্টা এইসব অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়েই সফলতা লাভ করে।


‘পদ্মার ঢেউ’

 ১৯৬১ সনের শীতকালে রাজশাহী থেকে যে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় তার নাম ছিল: পদ্মার ঢেউ। নূতন ও পুরাতন শিল্পীর সহযোগিতায় পরিবেশিত এই নৃত্যগীতময় অনুষ্ঠান পূর্ব পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জনজীবনের বিচিত্র প্রবাহকে নানা তরঙ্গে ব্যক্ত করে।

 বিভিন্ন ঋতুতে প্রমত্ত পদ্মার তীরে নরনারীর জীবনে যে হাসি-কান্নার দোলা লাগে পদ্মার ঢেউ তারই চিত্র। পদ্মা জীবনের প্রতীক। তার রুদ্র মূর্তিতে ঘর ভাঙে, কিন্তু নবান্নে সেই ঘর পূর্ণ করে দেয়। মানুষের আনন্দবিরহ, পূর্ণতা ও রিক্ততার সে উৎস, সাক্ষী।
চট্টগ্রাম বেতার-কেন্দ্র।

চট্টগ্রাম বেতার-কেন্দ্রের
কণ্ট্রোল রুম।

চট্টগ্রাম বেতার-কেন্দ্রের শিল্পী ও পরিচালকবৃন্দ।
চট্টগ্রাম বেতার-কেন্দ্রের
স্টুডিওর অভ্যন্তরে
সঙ্গীতের অনুষ্ঠান।
‘সুরমা’

 সুরমা গীতিনৃত্যনাট্য একই সংগে মঞ্চে পরিবেশিত ও বেতারে প্রচারিত হয় ১৯৬২ সালে, সিলেট থেকে।

 জয়ন্তীয়া পাহাড়ের কোল ঘেঁষে যে খরস্রোতা সুরমা নদী বয়ে গেছে, উপত্যকার উর্বরা শক্তিকে যে নদী কখনও নিস্তেজ হতে দেয় না তার গভীর তলদেশেও হয়ত কোনো করুণ কাহিনী লুকানো আছে। কিম্বদন্তী এই যে, এই নদীতে ঝাঁপ দিয়েই প্রাণের জ্বালা মেটায় পাহাড়ী মেয়ে সুর্মা। এইগুলোর ওপর ভিত্তি করে রচিত নক্শার প্রধান আকর্ষণ ছিল সিলেটের বিচিত্র লোকসংগীতের পরিবেশনা। অনুষ্ঠানটি ঝুমুর, পাহাড়িয়া, মণিপুরী, বেদের গান, এবং সিলেটী মেয়েলী গীত, নৌকা বাইচের গান, হাসান রেজার মারফতী সবই সিলেটের নিজস্ব গীতধারার ঐশ্বর্যকে মনোমুগ্ধকর রূপে প্রকাশ করেছে।


শিল্পীর সম্মান

 বৎসরের কোন প্রধান উৎসবে দেশের সেরা শিল্পীদের পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করা ঢাকা রেডিওর আর একটি প্রশংসনীয় কাজ।

 ১৯৬০ সালের জুলাই মাসে খ্যাতনামা শুদ্ধসংগীতের শিল্পী, সুরবাহার বদ্যিযন্ত্রের সুদক্ষ বদিক, সুরকার, ওস্তাদ আয়েত আলী খানকে পুরস্কৃত করা হয়। দ্বিতীয় বৎসরে, ১৯৬১ সালে সেরা শিল্পীর পুরস্কার লাভ করেন জারি গানের গায়ক ও গীতিকার বরিশাল নিবাসী আবদুল গণি বয়াতি। তৃতীয় বৎসর ১৯৬২ সালে এই সম্মানে ভূষিত হন বেতার অভিনেতা বিনয় ভূষণ বিশ্বাস।

পূর্ব পাকিস্তানের বেতার : এক নজরে অগ্রগতির খতিয়ান

১৯৪৭ ১৯৬৩
ঢাকা ঢাকা
১। পাঁচ কিলোওয়াট শক্তির একটি মধ্যতরঙ্গের ধ্বনি বিস্তার কেন্দ্র। ১। একশত কিলোওয়াট শক্তির একটি মধ্যতরঙ্গের ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র।
২। ছোট একটি ভাড়াটে বাড়ীতে তিনটি স্টুডিও কক্ষ নিয়ে গঠিত বেতার কেন্দ্র। ২। একটি সাত দশমিক পাঁচ কিলোওয়াট শক্তি বিশিষ্ট ক্ষুদ্রতরঙ্গের ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র। (১৯৬৪ সালের মধ্যে এটা একশত কিলোওয়াট শক্তি সম্পন্ন হবে)।
৩। একটি ক্ষুদ্র ধ্বনিগ্রহণ কেন্দ্র বা রিসিভিং সেণ্টার। ৩। একটি দশ কিলোওয়াট শক্তি সম্পন্ন ক্ষুদ্রতরঙ্গের ধ্বনিবিস্তার কেন্দ্র।
৪। বেতার কেন্দ্রের নয়া ভবন। এতে আছে সাতটি সম্পূর্ণরূপে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক স্টুডিও কক্ষ, ঘোষকের জন্য সাতটি স্বতন্ত্র ধ্বনি নিয়ন্ত্রণ প্রকোষ্ঠ, একটি বিশেষভাবে পরিকল্পিত শব্দগ্রহণ কক্ষ বা রেকর্ডিং রুম।
৫। একটি নয়া ধ্বনিগ্রহণ কেন্দ্র বা রিসিভিং সেণ্টার।
চট্টগ্রাম
৬। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ষ্টুডিও কক্ষ সম্বলিত বেতার কেন্দ্রের নিজস্ব ভবন।
৭। দশ কিলোওয়াট শক্তির মধ্যতরংগের ধ্বনি বিস্তার কেন্দ্র।
রাজশাহী
৮। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বেতার ভবন।
৯। দশ কিলোওয়াট শক্তির মধ্যতরংগের ধ্বনি বিস্তার কেন্দ্র।
রংপুর
১০। দশ কিলোওয়াট শক্তির মধ্যতরংগের ধ্বনি বিস্তার কেন্দ্র।
সিলেট
১১। দুই কিলোওয়াট শক্তি বিশিষ্ট মধ্য-তরংগের ধ্বনি বিস্তার কেন্দ্র।

রেডিও পাকিস্তান ঢাকা
কর্তৃক আয়োজিত
লোক-সঙ্গীত সপ্তাহের
একটি নৃত্য-নাটের দৃশ্য।

রাজশাহীতে বেতার-শিল্পীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বামে—রাজশাহীর
শিল্পীগণ সঙ্গীত ও ডাইনে—ঢাকার শিল্পীগণ নৃত্য পরিবেশন করছেন।

রিজিওনাল ইনফরমেশন অফিস,
গভর্ণমেণ্ট অব পাকিস্তান, ঢাকা
কর্তৃক প্রকাশিত।

এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ কপিরাইট আইন, ২০০০ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ, ২০২৬ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।