বিষয়বস্তুতে চলুন

পেশবাদিগের রাজ্যশাসন-পদ্ধতি (১৯৩০)/জকাত

উইকিসংকলন থেকে

জকাত

 জকাত পণ্য-শুল্কের সাধারণ নাম। ইহাকে মোটামুটি চারি ভাগ করা যায়। (১) থলভরিত—বোঝাই করিবার জায়গায় দেয় কর। (২) থলমোড়—পণ্য বিক্রয়ের স্থলে দেয় শুল্ক। (৩) ছাপাইবা শীলমোহর করিবার কর। (৪) হাশীল। এতদ্ব্যতীত শিঙ্গ শিঙ্গোটী নামক একটি করও কখন কখনও জকাত হিসাবে আদায় করা হইত।

 প্রত্যেক পরগণায় পৃথক্‌-পৃথক্ ভাবে জকাত আদায় করা হইত। যদি বণিকের পণ্য দশটি বিভিন্ন পরগণার মধ্য দিয়া বহন করিয়া লইতে হইত, তবে তাহাকে দশ দশবার জকাত দিতে হইত; জকাত দিবার জন্য তাহাকে দশ দশটি বিভিন্ন জায়গায় থামিতে হইত। ইহাতে বাণিজ্যের বড়ই অসুবিধা হইত। কিন্তু এই অসুবিধা যে মহারাষ্ট্রেরই বিশেষত্ব, তাহা বলা যায় না। ফরাসী-বিপ্লবের পূর্ব্বে ফ্রান্সে এবং জলভারিণের পূর্ব্বে জার্ম্মাণ দেশেও বণিক্‌দিগকে ঠিক এই একই অসুবিধা ভোগ করিতে হইত। প্রভেদের মধ্যে এই যে, পাশ্চাত্য দেশগুলিতে এই অসুবিধা এড়াইবার উপায় ছিল না,—মহারাষ্ট্রে ছিল। এল্‌ফিন্‌ষ্টোন্ বলেন যে, “এই অসুবিধা দূরীকরণের নিমিত্ত সহরে ‘হুণ্ডিকরী’ নামে এক শ্রেণীর লোক ছিল। ইহারা এক জায়গায় কর দিয়াই পণ্য চালাইয়া দিবার ভার গ্রহণ করিত। জকাতের ইজারাদারগণের সহিত ইহারাই বন্দোবস্ত করিত এবং দেয় করের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করিত।” পেশবা সরকারও এ বিষয়ে উদাসীন ছিলেন না। ১৭৪৫ খৃষ্টাব্দে লিখিত একখানি পত্রে বালাজী বাজীরাও হুকুম দিয়াছিলেন যে, বুরহাণপুর হইতে সিরোজ ও সিরোজ হইতে বুরহাণপুর পর্য্যন্ত যে-সকল মাল চালান হইবে, তাহার জকাত বিভিন্ন স্থানে আদায় না করিয়া, একস্থানে তহশীল করিতে হইবে।

 পেশবা-প্রাধান্যের প্রথম যুগে জকাত আদায়ের ভার ছিল ইজারাদারদিগের হস্তে। ইহারা অগ্রিম টাকা দিয়া জকাতে ইজারা কিনিয়া লইত। ইজারার সর্ত্ত অনুসারে কাহারও উপর জুলুম বা কাহারও নিকট হইতে বে-আইনী কোন টাকা আদায় করিবার অধিকার ইহাদের ছিল না। কিন্তু পেশবা-সরকার যেমন কৃষকদিগকে নানা প্রকারে উৎসাহ দিয়া কৃষি-বিস্তারের চেষ্টা করিতেছিলেন, বণিক্ ও শিল্পীদিগকে নানা প্রকারে উৎসাহিত করিয়া শিল্প ও বাণিজ্যের উৎকর্ষ সাধনের দিকেও তাঁহাদের সেইরূপ দৃষ্টি ছিল। ইজারা প্রথা ইহার প্রতিকূল; এই নিমিত্ত দ্বিতীয় মাধবরাওয়ের শাসনকালে জকাতের হারনির্দ্ধারণ ও তহশীলের জন্য কতকগুলি সরকারী কর্ম্মচারী নিযুক্ত হইয়াছিলেন। ইহারা কখনও কখনও বা ইজারাদারদিগকে উঠাইয়া দিয়া নিজেরাই তহশীল করিতেন, আবার কখন কখনও ইজারাদারদিগের কার্য্যের তত্ত্বাবধান করিতেন। জকাতের তহশীলদারেরাও কামাবিশ্ পদ্ধতি অনুসারে কার্য্য করিতেন। ইহাদিগকেও কতকগুলি জমিদার ও দরকদারের সহযোগিতা গ্রহণ করিতে হইত। ইঁহাদের হিসাবও কামাবিশ্‌দারের হিসাবের মত দুই তিনজন বিভিন্ন দরকদারের হাত দিয়া যাইত। ইঁহাদের আদেশ-পত্রও কামাবিশ্‌দারের আদেশ-পত্রের ন্যায় বিভিন্ন লোকে সহি ও মোহর করিত। এই প্রথার দোষ-গুণ ও সুবিধা-অসুবিধার বিস্তৃত আলোচনা পূর্ব্বে করা হইয়াছে, এখানে তাহার পুনরাবৃত্তি অনাবশ্যক।

 অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি হইলে কৃষির উন্নতির জন্য মারাঠা কৃষক সরকারী খাজনা রেহাই পাইত। বাণিজ্যের প্রয়োজনে মারাঠা বণিকও যে জকাত হইতে অব্যাহতি না পাইত, এমন নহে। ১৭৬৩-৬৪ সালে ঘি, তৈল, গুড় ও হলুদের আমদানী বাড়াইবার জন্য পেশবাসরকার জকাতের হার অর্দ্ধেক কমাইয়া দিয়াছিলেন। ১৭৭০ সালে বণিকদিগের অসুবিধার নিমিত্ত পুণা সহরে নবপ্রবর্ত্তিত তাগ নামক একটি কর রহিত করা হয়। কিন্তু পেশবাসরকারের মনোযোগ কেবল বণিক্‌দিগের সুবিধার দিকেই নিবন্ধ ছিল না। সাধারণ লোকের সুবিধা অসুবিধাও তাঁহারা জকাত নির্দ্ধারণের সময়ে বিশেষরূপে বিবেচনা করিতেন। ১৭৬৩ খৃষ্টাব্দে ইহাদেরই প্রয়োজনের অনুরোধে, পেশবাসরকার পুণা ও জুন্নরের জকাত কামাবিশ্‌দারের নিকটে লিখিয়াছিলেন—

 ১। কোঙ্কণ হইতে সমাগত চাউল, লবণ ও মসলার নিমিত্ত জকাত গ্রহণ করিও না।

 ২। ভূসারী শস্যের (ডাল) নিমিত্ত কখনও জকাত লওয়া হইবে না।

 ৩। পুণা হইতে যে সকল কৃষক শস্য ও লবণ লইয়া যাইতেছে, তাহাদিগকেও জকাত দিতে হইবে না; কারণ, সম্প্রতি যুদ্ধে তাহাদের সম্পত্তি-নাশ হইয়াছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম চারি দশকে ইংরেজ রাজনীতিবিদেরা দুর্ভিক্ষ দমনের জন্য কেবল শস্যের আমদানী-কর বাজার দরের অনুপাতে হ্রাস-বৃদ্ধি করিতেন; কিন্তু পেশবা-সরকার দুর্ভিক্ষের কালে আমদানী-কর একেবারে রহিত করিয়া দিতেন। তথাপি পেশবা-যুগে সময়ে-সময়ে মহারাষ্ট্রের কোন-কোন অংশে ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়াছে; তাহার সাক্ষ্য পেশবা-যুগের অসংখ্য দলিল-পত্রে বর্ত্তমান। ইহার একমাত্র কারণ এই যে, মহারাষ্ট্রে তখন রাস্তা-ঘাটের অবস্থা বিশেষ ভাল ছিল না;—অল্প সময়ের মধ্যে দুর্ভিক্ষ-পীড়িত প্রদেশে খাদ্য আমদানী করিবার উপায় ছিল না। খেয়া নৌকা, খেয়া ঘাট ও রাস্তা নির্ম্মাণ করিয়া পেশবাসরকার এই অসুবিধা দূরীকরণের প্রয়াস পাইয়াছিলেন। তাঁহাদের নির্ম্মিত পথঘাটের অবস্থাও যে একেবারে মন্দ ছিল না, তাহার সাক্ষ্য ইংরেজ সেনাপতি স্যার আর্থার ওয়েলেস্‌লির (পরে ডিউক অব্ ওয়েলিংটন) ডেস্প্যাচে পাওয়া যায়। কিন্তু তখনকার ভাল এখনকার মন্দের সহিতও তুলনীয় নহে। আর কেবল রাস্তা থাকিলেই হইল না;―দ্রুতগামী যানের তখন একেবারেই অভাব ছিল। এই নিমিত্তই পেশবা-সরকার প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াও, দুর্ভিক্ষের ক্লেশ হইতে প্রজাদিগকে একেবারে মুক্তি দিতে পারেন নাই।

 আমরা পূর্ব্বে দেখিয়াছি যে, পেশবা-সরকার কৃষির উন্নতির নিমিত্ত কৃষকদিগকে কৌল দিতেন। এই নীতিরই অনুসরণ করিয়া, তাঁহারা নূতন বাজার স্থাপন, এবং পুরাতন বাজারের উৎকর্ষ সাধনের নিমিত্ত, বণিক্‌দিগকে নানা প্রকারের কর হইতে অব্যাহতির কৌল দিতেন। ১৭৫০ খৃঃ কসবা মুসখেড়ের পুরাতন বাজারের উন্নতির নিমিত্ত শেটে মহাজন ও দোকানদারেরা এইরূপ কৌল পাইয়াছিলেন; এই কৌল অনুসারে মুসখেড়ের পুরাতন অধিবাসীরা তিন বৎসরের নিমিত্ত আমদানী ও রপ্তানী কর হইতে অব্যাহতি পাইয়াছিল। ইহাদিগকে কেবল মাত্র ঘরের খাজনা দিতে হইত। আর, নবাগত দোকানীরা পাঁচ বৎসরের জন্য আমদানী ও রপ্তানী কর এবং তিন বৎসরের জন্য ঘরের খাজনা রেহাই পাইয়াছিল। ১৭৪৮ সালে কসবা বরসীর নিকটে একটি নূতন বাজার স্থাপনের নিমিত্ত দোকানদার ও মহাজনদিগকে সাত বৎসরের জন্য সর্ব্ব প্রকারের কর হইতে অব্যাহতি দিয়া কৌল দেওয়া হইয়াছিল। ১৭৭৭ খৃষ্টাব্দে বুরহাণপুরের হবিলদাস গুলাবদাস নামক একজন ব্যবসায়ী একখানি নূতন কাপড়ের দোকান খুলিবার জন্য অর্দ্ধেক হাশীল রেহাই পাইয়াছিল। বড়-বড় সওদাগরগণ পেশবার রাজ্যে বাস করিতে আসিলে, তাহাদিগকে বিশেষ ভাবে সম্মানিত করা হইত। বিঠোজী কৃষ্ণ কামত নামক একজন শেনবী বণিক্ পাঁচখানি বাণিজ্যপোত লইয়া, বেসিন বন্দরে বাণিজ্যের নিমিত্ত বসতি করিতে আসিয়া, পেশবা-সরকারের নিকট হইতে পাল্‌কী ও পোষাক পাইয়াছিলেন। কৃষকদিগের ন্যায় বণিকেরাও উত্তমর্ণদিগের দ্বারা উৎপীড়িত হইলে, পেশবা-সরকার তাহার প্রতিকারে যত্নবান্ হইতেন।

 নূতন বাজার স্থাপন করিবার ভার পড়িত, একজন উদ্যোগী মহাজনের উপর। বাজার স্থাপিত হইলে, গ্রামের পাটীলের মত, ইনিই সেখানকার কর্ত্তা হইতেন; এবং সরকার হইতে শেটেপণের বতন পুরস্কার পাইতেন। ইঁহার কর্ত্তব্য এবং পাওনা অনেকটা পাটীলের কর্ত্তব্য এবং পাওনার অনুরূপ। বাজারের দোকানদারেরা আপদ-বিপদে ইহারই দ্বারস্থ হইত। রাজসরকারে তাহাদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা শেটে মহাজনই করিতেন; সুতরাং দোকানদারেরা তাঁহার পাওনাটা বিনা আপত্তিতে সন্তুষ্ট চিত্তে প্রদান করিত, সন্দেহ নাই। নিম্নে পাটীলের পাওনার সহিত তুলনার জন্য শেটে মহাজনের পাওনার একটি তালিকা দেওয়া গেল।

 ১। প্রত্যেক হাটবারে প্রতি বাণিয়া দোকান হইতে একটি সুপারী।

 ২। পানের দোকান হইতে প্রতি দিন পাঁচটি পান।

 ৩। প্রত্যেক তৈলের দোকান হইতে প্রতি সপ্তাহে ৯টাক তৈল।

 ৪। বিক্রীত ছালা প্রতি আধসের ছোলা।

 ৫। বিক্রীত ছালা প্রতি এক পোয়া মসলা।

 ৬। তরকারির দোকান প্রতি এক মুষ্টি তরকারী।

 ৭। প্রত্যেক তন্তুবায়ের নিকট হইতে প্রতি বৎসর একখানি পাসোডি (এক প্রকারের মোটা কাপড়)।

 ৮। চামারদিগের নিকট হইতে বৎসর প্রতি দুই জোড়া জুতা।

 ৯। দশরা, দেওয়ালী, শিমগা (হোলি) ও বর্ষ প্রতিপদ উপলক্ষে প্রত্যেক দোকান হইতে এক পোয়া আটা অথবা চাউল।

 ১০। শেটের পালা দিয়া ওজন করা প্রত্যেক ছালা প্রতি এক মুষ্টি শস্য।

 ১১। কসাই এবং জেলেরা বাজারে শুট্‌কি মাছ এবং মাংস বিক্রয় করিতে আসিলে, তাহার কিছু কিছু শেটে মহাজনের পাওনা।

 ১২। বাজারের প্রত্যেক বিবাহ উপলক্ষে আধখানি নারিকেল।

 ১৩। শেটে মহাজনকে ঘরের খাজনা দিতে হইত না।

 আজকাল য়ুরোপের বিভিন্ন দেশের সরকার শিল্পীদিগের কার্য্যে হস্তক্ষেপ করা অনুচিত বিবেচনা করিয়া, উদাসীন-নীতি অবলম্বন করিয়াছেন। পেশবাসরকার কিন্তু এই বিষয়ে একেবারে উদাসীন ছিলেন না। তাঁহাদের দস্তখত ব্যতীত কোন বাণিজ্য পোত বন্দরে প্রবেশ করিতে অথবা বন্দর ত্যাগ করিতে পারিত না। তাঁহারা বাটখারা ও ওজন পরীক্ষা করিয়া শীলমোহর করিয়া দিতেন। সরকারী ছাপ না থাকিলে কোন বাজারে কাপড় বিক্রয় হইত না। পাগ্‌ড়ীর কাপড় ১৫ হাত কি ত্রিশ হাত হইবে, জরি কেমন ধাতু দিয়া প্রস্তুত করিতে হইবে, রেশমের সহিত কোন্ জাতীয় ক্ষার ব্যবহার করিতে হইবে, তাহাও পেশবা নির্দ্দেশ করিয়া দিতেন; এবং শিল্পীকে এই নির্দ্দেশ মানিয়াচলিতে হইত। কখন কখনও পেশবা-সরকার অনেক নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষের বাজারদর বাঁধিয়া দিতেন। বর্ত্তমান কালের অর্থনীতিবিদের চক্ষে অবশ্য পেশবা-সরকারের শিল্পবাণিজ্যে এবম্বিধ হস্তক্ষেপ নিতান্তই বিসদৃশ ঠেকিবে। কিন্তু মনে রাখিতে হইবে যে, য়ুরোপেও তখনও উদাসীন-নীতির উদ্ভব হয় নাই, অবাধ-বাণিজ্য-নীতির ভবিষ্যৎ জন্মভূমি ইংলণ্ডে তখনও রক্ষা-শুল্কের অবাধ প্রচলন। আরও মনে রাখিতে হইবে যে, পেশবা-সরকারের বাণিজ্য-নীতির ফল একেবারে মন্দ হয় নাই। বিদেশেও তাঁহাদের বাণিজ্য বিস্তৃতি লাভ করিয়াছিল। মারাঠা বণিক্ তখন আরবের উপকূলে মস্কট বন্দরে পণ্যশালা নির্ম্মাণ করিয়াছিল, মারাঠা বাণিজ্য-পোত তখন বিবিধ পণ্য বহিয়া চীন ও য়ুরোপের বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করিত।

 আবকারী বিভাগ হইতে আয়ের উল্লেখ না করিলেও চলে। ব্রাহ্মণ পেশবাগণ মদ্য বিক্রয় ও মদ্য প্রস্তুতের বিরোধী ছিলেন। ব্রাহ্মণের নিকটে মদ বিক্রয় করিলে গুরুতর দণ্ড পাইতে হইত। কিন্তু নিম্ন শ্রেণীর অনেক হিন্দু ও পেশবার পর্ত্তুগীজ এবং খৃষ্টান সৈনিকেরা মদ্যপান করিত বলিয়া, মহারাষ্ট্রের মদ্যব্যবসায়ীরা অল্প পরিমাণে মদ্য প্রস্তুত করিবার অনুমতি পাইয়াছিল।

 পেশবা-সরকারের আয় কত ছিল, তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা যায় না। স্কট ওয়ারিং অনুমান করেন যে, পেশবার ভাণ্ডারে রাজস্ব হইতে প্রতি বৎসর ১৯০, ৬৭৯, ৩৯৮ টাকা আসিত। এই অনুমানের ভিত্তি কি, তাহা আমরা জানি না; সুতরাং ইহা কত দূর বিশ্বাসযোগ্য, তাহাও বলিবার উপায় নাই।