বিষয়বস্তুতে চলুন

পেশবাদিগের রাজ্যশাসন-পদ্ধতি (১৯৩০)/বিচার-বিভাগ

উইকিসংকলন থেকে

বিচার বিভাগ

 ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে শেষ পেশবা দ্বিতীয় বাজীরাও রাজ্যভ্রষ্ট হইয়া ব্রহ্মাবর্ত্তে নির্ব্বাসিত হন। পেশাবাদিগের রাজ্যচ্যুতির সময় হইতে সাতারার ছত্রপতি প্রতাপসিংহ মহারাজ ইংরেজ সরকারের সামন্ত-নৃপতিরূপে পরিগণিত হইয়াছিলেন। ছত্রপতি প্রতাপসিংহ নিজের ক্ষুদ্ররাজ্যের শাসন-পদ্ধতিকে একটা সুনির্দ্দিষ্ট আকার দিবার জন্য একখানি “য়াদী” সঙ্কলন করেন। এই “য়াদীতে” মারাঠা সাম্রাজ্যের শাসন পদ্ধতি-বিষয়ক যাবতীয় নিয়ম লিপিবদ্ধ করা হইয়াছিল। শ্রীযুক্ত ভাস্কর বামন ভট মহাশয় এই য়াদীখানি সংগ্রহ করিয়া পুণার “ভারত-ইতিহাস-সংশোধক মণ্ডলের তৃতীয় সম্মিলন বৃত্তে ছাপিয়া দিয়াছেন। এই য়াদীর ন্যায়াধীশ-প্রকরণ হইতে মারাঠা সাম্রাজ্যের বিচার বিভাগ সম্বন্ধে একটা সুস্পষ্ট ধারণা করা যাইতে পারে।

 ছত্রপতি প্রতাপসিংহ ন্যায়াধীশ-প্রকরণে বলিতেছেন,—“প্রতিবেশীদিগের চেষ্টায় সকল বিবাদের আপোষে মীমাংসাই হইতেছে এই রাজ্যের প্রাচীন প্রথা। আপোষে মীমাংসা না হইলে তখন পঞ্চায়েত ডাকিবে।” তিনি তাঁহার রাজ্যের পাটীল, মালদার ও শেটে মহাজনদিগকে ছোট-বড় সকল মোকদ্দমারই আপোষ-মীমাংসার চেষ্টা করিতে উপদেশ দিয়াছেন। পক্ষগণকে তিনি ভরসা দিয়াছেন যে, আপোষ মীমাংসা হইলে আর তাহাদিগকে রাজসরকারে “হরকী” বা বিচার-খরচা যোগাইতে হইবে না। তিনি আরও বলিতেছেন যে, সরকারের এই আর্থিক লোকসানের জন্য সালিশদিগের ভীত হইবার কারণ নাই। তাঁহারা নির্ভয়ে তাঁহাদিগের প্রতিবেশীদিগের বিবাদের সালিশী করিবেন।

 আপোষ-মীমাংসার চেষ্টা ব্যর্থ হইলে, তখন অবশ্য সরকারী আদালতের আশ্রয় লইতে হইবে। গ্রামের পাটীলই সেখানকার বিচার-বিভাগের প্রধান কর্ম্মচারী। তাহার উপর মাম্‌লত্‌দার তাহার উপর সরসুভেদার; এবং বিচার-বিভাগের একেবারে শীর্ষস্থানে রাজা অথবা তাঁহার প্রতিনিধি পেশবা। পেশবার এত কাজ যে, তিনি বিচার-কার্য্যের দিকে দৃষ্টি দিতে পারিতেন না। তাঁহার পক্ষে বিচার সম্পর্কীয় যাবতীয় কায করিতেন পুণার প্রধান ন্যায়াধীশ বা মারাঠা সাম্রাজ্যের সর্ব্বপ্রধান বিচারপতি। বাছিয়া বাছিয়া ন্যায়নিষ্ঠ শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতগণকে ন্যায়াধীশের পদে নিযুক্ত করা হইত। প্রথম মাধবরাওয়ের ন্যায়াধীশ রামশাস্ত্রীর তেজস্বীতা ও ন্যায়নিষ্ঠার কাহিনী রবীন্দ্রনাথের তুলিকায় অমরতা লাভ করিয়াছে। কিন্তু রামশাস্ত্রীই মারাঠাসাম্রাজ্যের একমাত্র ন্যায়নিষ্ঠ বিচারপতি নহেন। তাঁহার গৌরবের প্রখর জ্যোতিঃতে অপর সকলের গৌরব ম্লান হইলেও, তাঁহারা পাণ্ডিত্যে ও অপক্ষপাত বিচারে কাহারও অপেক্ষা কম যোগ্য ছিলেন না। রামশাস্ত্রী হইতে মারাঠা সাম্রাজ্যের শেষ বিচারপতি বালকৃষ্ণশাস্ত্রী টোকের পর্য্যন্ত সকলেই পণ্ডিত, সকলেই ন্যায় বিচারক।

 প্রধান বিচারপতি ব্যতীত আরও কতকগুলি ন্যায়াধীশ ছিলেন—তাঁহাদের বিচারালয় ছিল বড় বড় নগরে। ইঁহারাও সকলেই পণ্ডিত এবং ব্রাহ্মণ। শাস্ত্রজ্ঞান ব্যতীত তখনকার দিনে কেহ ভাল বিচারক হইতে পারিত না; কারণ, মারাঠা রাজপুরুষগণ এখনকার মত ধারাবদ্ধ ভাবে (codified) দেশের আইন সঙ্কলন করিবার প্রয়োজন অনুভব করেন নাই। বিচার হইত মনু, যাজ্ঞবল্ক্য, বশিষ্ঠ, বৃহস্পতি, গৌতম, বৌধায়নের বিধান অনুসারে, অথবা দেশের আবহমানকাল হইতে প্রচলিত প্রাচীন প্রথা অনুসারে। এই সম্পর্কে আর একটি কথা প্রণিধানযোগ্য। পাটীল হইতে পেশবা পর্য্যন্ত কেহই খাঁটি আইনজ্ঞ বিচারক নহেন। এখনকার মত বিচার-বিভাগ ও শাসন-বিভাগের পার্থক্য তখনকার দিনে স্বীকৃত হয় নাই। পেশবা-রাজ্যের প্রধান মন্ত্রী প্রধান সেনাপতিত বটেনই; তাহার উপর আবার তিনি প্রধান বিচারপতিও। পাটীল বেচারার ত কাযের অন্ত নাই;—খাজনার হার নির্দ্ধারণ করিবে সে, খাজনা আদায় করিবে সে—গ্রামের পুলিশের কর্ত্তা সে,—গ্রামের স্বাস্থ্যরক্ষার প্রতি দৃষ্টি দিতে হইবে তাহাকে; তদুপরি বোঝার উপর শাকের আঁটি—আবার এই বিচারপতিত্বটুকু। সহরের ন্যায়াধীশরা একেবারে আধুনিক হিসাবেও খাঁটি বিচার-বিভাগের লোক। বিচার ব্যতীত তাঁহাদের অন্য কর্ত্তব্য নাই। শাসন-বিভাগের কোন কাযে তাঁহাদের হাত দিতে হইত না।

 গ্রামের মামলা প্রথমে আসিত পাটীলের নিকটে। পাটীল গ্রামের ম্যাজিষ্টর বটেন এবং এ কালের ম্যাজিষ্টরের মত তাঁহার বিচার করিবার ক্ষমতাও ছিল বটে, কিন্তু তাই বলিয়া কেহই আশা করিত না যে, তিনিই মামলার বিচার করিবেন। মামলার নিষ্পত্তির জন্য চেষ্টা করিয়া তাহা সফল না হইলে, বিচারের জন্য পঞ্চায়েত ডাকিলেই দেওয়ানী মামলায় তাঁহার কর্ত্তব্য শেষ হইল।

 পক্ষদিগকে তখন একটা রাজীনামা সহি করিতে হইত যে, পঞ্চায়েতের বিচার তাঁহারা বিনা আপত্তিতে মানিয়া লইবেন, তারপরে পঞ্চায়েত মহাশয়েরা বিচার আরম্ভ করিতেন, সাক্ষ্য লইতেন, উভয় পক্ষের জবানবন্দীর একটা সংক্ষিপ্ত-সার সঙ্কলন করিতেন; তারপর রায় দিতেন। রায়টা অবশ্য মামলতদারের সমর্থন ব্যতীত আইনত পাকা হইত না। পঞ্চায়েতেরা উৎকোচ গ্রহণ করিয়াছেন, অথবা কোন পক্ষের প্রতি পক্ষপাত বা বিদ্বেষবশতঃ অন্যায় বিচার করিয়াছেন, এরূপ কোন অভিযোগ না হইলে, অবশ্য মাম্‌লত্দার বা পেশবা-সরকারকে পঞ্চায়েতের রায় পাকা করিয়া দিতেই হইত। এইরূপ অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হইলে কিন্তু আবার নূতন পঞ্চায়েত নিযুক্ত হইত, নূতন রাজীনামা সহি করিতে হইত; আবার নূতন করিয়া সাক্ষ্য-সাবুদ লইয়া নূতন বিচার হইত। প্রশ্ন হইতে পারে যে, পাটীল যদি পঞ্চায়েত না ডাকেন, তবে মামলার কি হইবে? সে ক্ষেত্রে বাদী মাম্‌লত্দারের নিকটে আবেদন করিতে পারিতেন এবং মাম্‌লত্দার পাটীলকে জানাইয়া পঞ্চায়েত নিয়োগ করিয়া দিতে পারিতেন। পক্ষগণ নিজ গ্রামের পঞ্চায়েতে আপত্তি করিলে, ভিন্ন গ্রাম হইতেও পঞ্চায়েত ডাকা হইত। মোট কথা, দেওয়ানী মামলার বিচার পঞ্চায়েত দ্বারাই হইত; এবং পঞ্চায়েত না ডাকিয়া কোন পাটীল বা মাম্‌লত্‌দার ছোট বড় কোন মামলার বিচার করিলে সে বিচার কতকটা বেআইনি বলিয়াই পরিগণিত হইত; এবং উৎকোচের অভিযোগ ব্যতীত পঞ্চায়েতের রায় রদ হইত না।

 পঞ্চায়েতের বিচার কতকটা জুরির বিচারের মত; কিন্তু সম্পূর্ণ নহে। এখনকার জুরিদিগের সহিত একজন জজ থাকেন—তিনি জুরিদিগকে মামলা বুঝাইয়া দেন—আইন বুঝাইয়া দেন। মামলা সম্বন্ধে আগে হইতে একটা ধারণা লইয়া আসিলে, তাঁহাকে আর জজের আসনের যোগ্য বলিয়া বিবেচনা করা হয় না, সেকালের মহারাষ্ট্র পঞ্চায়েতেরা ছিলেন বাদী প্রতিবাদিগণেরই স্বগ্রামবাসী। সুতরাং মামলার সকল কথা স্বভাবতঃই তাঁহাদের জানা থাকিত। তদুপরি আবার কোন কোন ক্ষেত্রে এমনও হইত যে, তাঁহারা একালের সালিশদিগের মত পক্ষগণের দ্বারাই মনোনীত হইতেন। তখন তাঁহারা যে একটু পক্ষপাতিত্ব, একটু ওকালতি না করিতেন, এমন নহে। সুতরাং দেখা যাইতেছে যে, সেকালের পঞ্চায়েতেরা জজ, জুরি ও উকিল এই তিন জনেরই কাজ করিতেন।

 প্রাচীন এথেন্সের নাগরিকেরাও বিচারকের কার্য করিতেন। তাঁহারা এই কাজের জন্য দৈনিক পারিশ্রমিক পাইতেন। মারাঠা পঞ্চায়েতেরা তাঁহাদের বিচার সম্পর্কীয় কার্য্যের জন্য কোন পারিশ্রমিক পাইতেন কিনা সন্দেহ। এল্‌ফিন্‌ষ্টোন্ বলেন যে, কোন মামলা দীর্ঘকাল চলিলে, পঞ্চায়েতরা পক্ষগণের নিকট হইতে কিছু পারিশ্রমিক পাইতেন কিন্তু প্রতাপসিংহ মহারাজ তাহার ন্যায়াধীশ প্রকরণে পঞ্চায়েতদিগকে কাহারও নিকট হইতে কোন প্রকারের পারিতোষিক বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করিতে অতি সুস্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন যে, পঞ্চায়েতগণকে টাকায় বা অন্য কোন প্রকারে পারিশ্রমিক দিলে, দাতা ও গৃহীতা উভয়েই দণ্ডনীয় হইবে।

 পঞ্চায়েতরা বিচারও করিতেন, রায়ও দিতেন, সাক্ষীও ডাকিতেন; কিন্তু গ্রামবাসিগণকে তাঁহাদের আদেশ প্রতিপালনে বাধ্য করিবার ক্ষমতা তাঁহাদের নিজেদের ছিল না। অথচ, কোন পক্ষের অসাক্ষাতে বিচার হইলে, সে বিচার আইনতঃ শুদ্ধ বলিয়া বিবেচিত হইত না। এইজন্য পক্ষগণকেও সাক্ষীদিগকে হাজির করিবার জন্য মালদার পঞ্চায়েতদিগকে একজন পেয়াদা দিতেন। অনুপস্থিত পক্ষের অত্মীয়বর্গের উপরেও মাঝে মাঝে জুলুম করা না হইত, এমন নহে। কিন্তু তথাপি সকল সময়ে পক্ষদিগকে হাজির করা যাইত না। বিচার শেষ হইলে, পরাজিত পক্ষকে একখানি “য়েজিত পত্র” বা “জয় পত্র” লিখিয়া বিবাদী সম্পত্তির উপর সকল দাবী ত্যাগ করিতে হইত। আর বিজয়ী ঐ সম্পত্তির মূল্যের চতুর্থাংশ রাজসরকারে “শেরণী” অথবা “হরকী” স্বরূপ দিতেন। মনে রাখিতে হইবে যে, এখনকার মত তখনকার দিনে মামলা করিবার জন্য গ্রাম হইতে সহরে ছুটিতে হইত না; মামলার তদ্বির করিবার জন্য উকিল-মোক্তারকে টাকা দিতে হইত না; প্রত্যেক দরখাস্ত ও এফিডেভিটের জন্য ষ্ট্যাম্পের খরচা ছিল না। এতদ্ব্যতীত, আদালতের ছোট বড় কর্ম্মচারীদের জানা ও অজানা “উপরি পাওনার” থলিও পক্ষদিগকে পূর্ণ করিতে হইত না। সুতরাং বিবাদীর সম্পত্তির মুল্যের এক চতুর্থাংশ রাজসরকারে দিতে হইলেও, মামলার খরচ একালের চেয়ে সেকালে মোটের উপর কমই ছিল বলিতে হইবে। কিন্তু সকল ক্ষেত্রে মূল্যের চতুর্থাংশ রাজ-সরকারে দিতে হইত না। পেশবা-সরকারের রাজস্ব-নীতির আলোচনা কালে আমরা দেখিয়াছি যে, খাজনার হার নির্দ্ধারিত হইত প্রজার আর্থিক অবস্থার কথা বিবেচনা করিয়া। এ ক্ষেত্রেও ঐ নীতিরই অনুসরণ করা হইত। সাধারণ নিয়ম ছিল যে, “শেরণী” বা “হরকীর” পরিমাণ হইবে বিবাদী সম্পত্তির মূল্যের এক চতুর্থের সমান। কিন্তু জেতাপক্ষের আর্থিক স্বচ্ছলতা না হইলে, সরকার হইতে তাহার সাধ্যানুরূপ “শেরণী” বা “হরকী” গ্রহণ করা হইত। উৎকোচের অজুহাতে পঞ্চায়েতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা চলিত, ইহা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। কিন্তু আপিলে হারিলে আপিলকারীকে “গুহ্নাগারী” বা জরিমানা দিতে হইত। গুহ্নাগারীর পরিমাণও “শেরণী” বা “হরকীর” মত আপিলকারীর আর্থিক অবস্থানুসারে স্থির করা হইত। পঞ্চায়েতেরা পক্ষদিগের স্বগ্রামবাসী ও প্রতিবেশী; সুতরাং তাহাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনয়ন করিলে জন-সমাজে নিন্দনীয় হইবার আশঙ্কাও ছিল। পঞ্চায়েত-আদালতের রায় মানিয়া চলিবার সর্ত্তে, মামলার আরম্ভেই, উভয় পক্ষকেই জামিন দিতে হইল।

 আপীলের বিচারও হইত পঞ্চায়েতের দ্বারা। মামলতদার বা পেশবা-সরকারের অন্য কোন ঊর্দ্ধতন কর্ম্মচারী বিনা পঞ্চায়েতে আপীলের মামলার বিচার করিতে পারিতেন বটে; কিন্তু তাহা অন্যায় বলিয়া বিবেচিত হইত। এল্‌ফিন্‌ষ্টোন্ বলেন,—“Though it rested with him to decide whether or not the case required a Panchayet, yet it was reckoned gross injustice to refuse one on a question at all doubtfull, and it was always reckoned as sufficient for ordering a new investigation when there had been no Panchayet.” অর্থাৎ কোন মামলার জন্য পঞ্চায়েত ডাকা কর্ত্তব্য কিনা, তাহা স্থির করিবার ক্ষমতা যদিও রাজকর্ম্মচারীর ছিল, তথাপি সন্দেহ স্থলে পঞ্চায়েত না ডাকা নিতান্ত অবিচারের কার্য্য বলিয়া পরিগণিত হইত এবং ইহাই পুনর্বিচারের জন্য পর্য্যাপ্ত কারণ বলিয়া বিবেচিত হইত।

 পঞ্চায়েত-প্রথার জন-সমাজে এই আদর দেখিয়া মনে হয় যে, সাধারণতঃ এই অব্যবসায়ী বিচারকদিগের হাতে বিচারবিভ্রাট বড় হইত না। তাঁহারা সাধারণতঃ আইনের খুঁটিনাটির প্রতি দৃষ্টি দিতেন না, তাঁহাদের চেষ্টা ছিল, একটা স্থায়ী মীমাংসার জন্য; এবং পক্ষদিগের মধ্যে পুনরায় যাহাতে বাদ-বিসংবাদ না হয়, তাহার দিকেও তাঁহাদের দৃষ্টি থাকিত। এই নিমিত্ত তাঁহারা কখনও কখনও মামলা হারিবার পরও বাদী বা প্রতিবাদীকে দুই এক টুকরা জমি দিয়া দিতেন। দৃষ্টান্ত স্বরূপ মালোজী বিন সাহাজী ভাঙ্গা বাদী, হিরোজী বিন নরমোজি ভাঙ্গা বিবাদী নামক একটী মামলার উল্লেখ করা যাইতে পারে। এই মামলাটী হইয়াছিল একটী পাটীলকিবতনের স্বত্বাধিকার লইয়া। প্রতিবাদী হিরোজী নিজের দাবী প্রমাণ করিতে অসমর্থ হইলেও, ভবিষ্যৎ শান্তির জন্য, পঞ্চায়েতদিগের অনুরোধে বাদী মালোজী তাহাকে ৩০ বিঘা জমি ছাড়িয়া দিয়াছিল।

 ইহা হইতে মনে হয় যে, পঞ্চায়েতগণ বোধ হয় সাধারণতঃ উৎকোচ গ্রহণ করিতেন না। এল্‌ফিন্‌ষ্টোন্ কিন্তু অন্যরূপ বলেন। তাঁহার মতে, পঞ্চায়েতরা উৎকোচ গ্রহণ এবং অন্যায় পক্ষপাত এই উভয় দোষে দোষী ছিলেন,—“The Panchayets themselves were open to corrupion and to partiality.” এল্‌ফিন্‌ষ্টোন্ যে সময়ের কথা তাঁহার রিপোর্টে আলোচনা করিয়াছেন, তখন মারাঠা সাম্রাজ্যের অন্তিম দশা উপস্থিত, দেশ অরাজক। তৎপূর্ব্বেই দুর্ব্বুদ্ধি বাজীরাও রঘুনাথের উৎপাতে মারাঠা দেশের অমন সুন্দর পল্লীসমাজ বিধ্বস্ত হইয়া গিয়াছিল। সুতরাং তখনকার কথা মারাঠা সুখ-সমৃদ্ধির দিনের প্রতি প্রযোজ্য নাও হইতে পারে। বিশেষতঃ, এল্‌ফিন্‌ষ্টোন্ সাহেব তাঁহার রিপোর্টে, পেশবার নিকট হইতে বিজিত দেশের শাসন-পদ্ধতির সহিত ইষ্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানীর শাসন পদ্ধতি তুলনা করিয়াছেন। এই তুলনায় ইষ্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানীর শাসন-প্রথার উৎকর্ষই প্রায় সর্ব্বদা প্রমাণিত হইয়াছে। সুতরাং, বিজিত দেশের শাসন-প্রথার রীতি-নীতির অপকর্ষ প্রমাণ করিবার ইচ্ছা দ্বারাও তিনি কখনও জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে পরিচালিত হইয়াছিলেন, ইহা মনে করা অনুচিত বা অসঙ্গত নহে। মারাঠা বাদী-প্রতিবাদী পঞ্চায়েতদিগকে “তুহ্মী পঞ্চমায়বাপ” বলিয়া সম্বোধন করিত। সাধারণের ভাষায় পঞ্চায়েতরা ছিলেন, “পঞ্চ পরমেশ্বর”। তাঁহাদের অপক্ষপাত বিচারে বিশ্বাস না থাকিলে, তাঁহাদের ন্যায়পরায়ণতায় বিশ্বাস না থাকিলে, তাঁহাদের সততায় বিশ্বাস না থাকিলে, মহারাষ্ট্রের পল্লীবাসিগণ পঞ্চায়েতদিগকে মাতাপিতা বলিয়া সম্বোধন করিবে কেন? পরমেশ্বরের আসনে বসাইবে কেন? তাঁহাদের বিচার পরমেশ্বরের বিচার বলিয়া মানিবে কেন?

 এখন দেখা যাউক, ‘পঞ্চায়েত’ নির্ব্বাচিত হইত কাহারা। এই প্রবন্ধে ভাঙ্গা বনাম ভাঙ্গা নামক একটা মামলার উল্লেখ করিয়াছি। এই মামলার বিচার করিয়াছিলেন—দেশমুখ, দেশপাণ্ডে এবং ‘গোত’গণ। “গোত” বলিতে স্বজাতি অথবা কুটুম্বদলের সমষ্টি বুঝায়। এল্‌ফিন্‌স্টোন্ বলেন যে, সীমানার মামলায় পাটীল, দেশমুখ, দেশপাণ্ডে ও মহারদিগকে লইয়া পঞ্চায়েত গঠিত হইত। অন্যান্য মামলার সারাংশ পড়িয়া মনে হয় যে, বতনের মামলায় নিকটস্থ পল্লীর পাটীলগণ ও পরগণার জমিদারেরাও পঞ্চায়েতে আসন পাইতেন। অর্থাৎ এমন সকল লোককে বিচার করিতে ডাকা হইত, যাঁহারা দেশের নিয়ম-পদ্ধতি, প্রাচীন প্রথা প্রভৃতির কথা ভাল করিয়া জানিতেন। রাও বাহাদুর চিম্‌নাজি বাড্ সঙ্কলিত ‘সনদ ও পত্র’ নামক গ্রন্থে একটী ‘মজলিস্’ সম্পর্কীয় দলিল ছাপা হইয়াছে। ঐ দলিলে মজলিসের সভ্যদিগকে বৃত্তিধারী এবং সম্পত্তি ও তৎসম্পর্কীয় আইনের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ জ্ঞানবিশিষ্ট বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। এই রীতি অনুসারেই পৌরহিত্য সম্পর্কীয় একটি মামলার (অপাণা ভট বনাম শ্রীপত ভট) বিচারের ভার পড়িয়াছিল কাহাভের ব্রাহ্মণ সমাজের উপর এবং সাক্ষ্য দিতে ডাকা হইয়াছিল, যোশী বা পৌরহিত্য ব্যবসায়ী ব্রাহ্মণদিগকে।

 দেওয়ানী মামলায় মৌখিক সাক্ষ্যও গ্রহণ করা হইত, আবার দলিল-দস্তাবেজও পরীক্ষা করা হইত। এতদ্ব্যতীত, প্রাচীন হিন্দুবিধি অনুসারে অগ্নিদিব্য, তুল্যদিব্য প্রভৃতি ক্রিয়ার সাহায্যেও বিচার চলিত। অধুনা লুপ্ত অগ্নিদিব্য প্রভৃতির আলোচনা পরে করা যাইবে। এখন দেখা যাউক, মৌখিক সাক্ষ্য দিতে ডাকা হইত কাহাদিগকে। সে কালের পল্লীসমাজের কোনও লিখিত ইতিহাস ছিল না। কিন্তু পেশবা -দপ্তরে রক্ষিত মামলা-মোকর্দ্দমার সারাংশ পড়িলে দেখিয়া আশ্চর্য্য হইতে হয় যে, মারাঠা পল্লীসমাজের পল্লীর প্রত্যেক বতনের প্রাচীন ইতিহাস কিরূপ সতর্কতার সহিত রক্ষিত হইয়াছিল। প্রত্যেক পল্লীবৃদ্ধ, পল্লীসমাজের প্রত্যেক কর্ম্মচারী এই ইতিহাস জানিতেন। বাল্যে তাঁহারা তাঁহাদের জ্যেষ্ঠগণের নিকটে এই ইতিহাস শুনিয়াছিলেন। ঐ জ্যেষ্ঠগণ আবার তাঁহাদের বাল্যে তাঁহাদের জ্যেষ্ঠগণের নিকট পল্লী-ইতিহাস শ্রবণ করিয়াছিলেন। এইরূপে প্রত্যেক মারাঠা পল্লীর বিভিন্ন পরিবারের সুখ-দুঃখের, উত্থান-পতনের বিচিত্র কাহিনী, দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষের করুণ ইতিহাস, অজন্মা, অনাবৃষ্টি, অরাজকতা, অত্যাচার, যুদ্ধবিগ্রহ, অগ্নিদাহ, লুণ্ঠন ও মড়কের কথা অলিখিত থাকিয়াও লুপ্ত হইয়া যায় নাই। এই জন্য প্রত্যেক বতনের মামলায়, স্বত্বসাব্যস্তের মামলায় এই সকল পল্লীবৃদ্ধ ও পল্লীসমাজের কর্ম্মচারী পাটীল, কুলকর্ণী, আলুতা ও বলুতাগণ সাক্ষ্য দিতে আহূত হইতেন। এই সাক্ষীদিগের মধ্যে সংখ্যায় বেশী থাকিত বলুতাগণ। প্রাচীন দলিল হইতে তিনটী তালিকা উদ্ধৃত করিয়া ইহার প্রমাণ উপস্থিত করিতেছি।

 ১৭৫০ খৃষ্টাব্দে সুপা পরগণার অন্তঃপাতী জালগাঁওয়ের যোশী ও কুলকর্ণী স্বত্বাধিকার লইয়া মামলা হয়। প্রতিবাদী দাদো শিবদের গ্রামবাসিগণের বিচারে সম্মত হইয়া রাজিনামা লিখিয়া দেন। তদনুসারে নিম্নলিখিত “পণ্ঢর” বা গ্রামবাসিগণ সাক্ষ্য দিতে আহূত হইয়াছিলেন।

 ১। সুলতানজী বিন দরিয়াজী পাটীল

 ২। লিম্বাজী বিন মানকোজী পাটীল

 ৩। সুভানজী বিন বাপোজী পাটীল

 ৪। শেট্যাজী বিন রায়াজা পাটীল

 ৫। পিরাজী বিন শান্তাজী জবিব চৌগুলা

 বলুতা—

 ১। বালু বিন মানকোজী সুতার

 ২। সূর্য্যাজী বিন উদাজী লোহার

 ৩। সুভানজী বিন নাজী কুম্ভার

 ৪। উদাজী বিন মানকোজী চাম্ভার

 ৫। সুভানজী বিন জীরাজী গুরব

 ৬। বাঘোজী বিন লিম্বাজী কোলী

 ৭। মলহারজী বিন রাজুহ্নাভী (নাপিত)

 ৮। মাণিকনাক বিন রাজনাক মহার
 ৯। য়েশনাক বিন নিম্বনাক

 ১০। সমনাক বিন আজনাক  অঙ্গ

 ১৭৪১ খৃষ্টাব্দে জাউগাঁওয়ের পাটীলকি বতনের মামলায় গ্রামবাসিগণের সাক্ষ্যে খুব অমিল হয়। এক এক দল এক এক রকম সাক্ষ্য দিয়াছিল। এইজন্য তাহাদের নামের তালিকা সাক্ষ্যের তারতম্য অনুসারে ৬ ভাগে বিভাগ করা হইয়াছে।

(১)

 ১। বুদ মালী ২। শিবাজী বিন কোণ্ডাজী হ্নাতী

 ৩। বজাজী বিন বড়গোজী পরীট (ধুপী)

 ৪। রায়নাক বিন সয়নাক মহার

 ৫। হাসা বিন চাঁদনাক মহার

(২)

 ১। নিম্বাজী বিন জনোজী সুতার

 ২। বদজী বিন বহিরা চাম্ভার

(৩)

 ১। সুখমালী শম্ভুমালী

 ৭৫ বৎসরের এই বৃদ্ধ অন্য সকলের অপেক্ষা গ্রামের প্রাচীন কথা ভাল জানিত বলিয়া বোধ হয়।

(8)

 নিকটস্থ গ্রামসমূহের পাটীল—

 ১। কবজী বিন মালজী পাটীল (আম্বেগাঁও বুদ্রুক)

 ২। রকমাজী বিন মালজী মাটে পাটীল (কডক বসলে)

 ৩। হেমাজী পাটীল পোলা (ধায়তী)

 ৪। য়েসজী বিন গোপজী পাটীল বোরটে (বরজে)

 ৫। য়েসজী বিন য়েলবোজী পাটীল (নর্হে)

 ৬। অমাই বোরটী পাটলীন। (হিঙ্গণে বুদ্রুক)

(৫)

 ১। হরা মহার।

 ২। লিঙ্গনাক বিন পদমনাক। (নাম হইতেই বুঝা যাইতেছে যে, এই ব্যক্তি জাতিতে মহার)

 ৩। রায়া মহার।

 ৪। তবা মহার।

(৬)

 ১। মোরো নরহর কুলকর্ণী।

 ২। হরমালী বিন মন্তমালী।

 ৩। সন্তমালী বিন রাজমালী।

 ৪। শিবমবলা বিন রাউমবলা।

 ৫। দজ বরতা।

 ৬। রায়া বিন রামনাক।

 ৭। তহনাক বিন সন্তনাক।

 বোধ হয় গ্রামের পাটীলকি বতনের পূর্ব্ব ইতিহাস ইহাদের সকলের সমান জানা ছিল না; তাই ইহাদের সাক্ষ্যে এইরূপ অমিল হইয়াছিল।

 আমাদের তৃতীয় তালিকা একটি মামলার সারাংশ হইতে সঙ্কলিত। তরফ নারায়ণ গাঁওয়ের অন্তঃপাতী খোদদ গ্রামের লোহারকী ও সুতার কী বতনের স্বত্ত্ব ল‍ইয়া শিবাজী বিন তাহ্নাজী গংর সহিত সটবাজীর মামলা হয়। উভয় পক্ষই গ্রামবাসিগণকে সাক্ষী মানিয়া রাজিনামা দস্তখত করে ও জামিন দেয়। তদনুসারে নিম্নলিখিত ব্যক্তিগণের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। বতনের পূর্ব্ব ইতিহাস সম্পর্কীয় জ্ঞানের তারতম্য অনুসারে ইহাদিগকে দুইটি দলে ভাগ করা হইয়াছে। এই তালিকায় প্রত্যেক সাক্ষীর বয়সও লেখা আছে। তালিকাটি পড়িলেই দেখা যাইবে যে, সাক্ষীদিগের মধ্যে বলুতাগণই সংখ্যায় বেশী।

(১)

১। খাণ্ডাজী বলদ সুভানজী গাইকবাড বয়স ৪৫
২। বহিরজী বলদ বনোজী কুচিলা বয়স ৩৪
৩। রামজী বলদ পদজী ঘরমলা বয়স ৬০
৪। কচু বলদ খণ্ডোজী গাইকবাড বয়স ৩৫
৫। মহাদজী বলদ হরজী য়েবণ্ডা বয়স ৫০
৬। গোণ্ডজী বলদ রণোজী রাউত বয়স ৫৫
৭। নিম্বাজী বলদ য়েসাজী কুম্ভার বয়স ৬০
৮। মলহারজা বলদ উমাজী কোলী বয়স ৩৫
৯। হরি বলদ গঙ্গাজী ডবরা বয়স ৬০
১০। লোখা বলদ অমাজী চাম্ভার বয়স ৫০
১১। য়েসজী বলদ তাহ্নাজী মহার বয়স ৬০
১২। উমা বলদ পঙ্গনাক মহার বয়স ৩৫
১৩। পেমনাক বলদ য়েসনাক মহার বয়স ৬০
১৪। জবজ্যা বলদ সটব্যা মহার বয়স ২৫
১৫। লুমা বলদ হেরণা মহার বয়স ৬০

(২)

১। জাবজী বলদ গঙ্গাজী পাটীল মোরাট বয়স ৩৪
২। সখোজী বলদ সটবাজী মূলে বয়স ৩৪
৩। খণ্ডোজী বলদ শেট্যাজী মূলে বয়স ৬০
৪। গুণ্ডাজী বলদ পিলাজী পার্টীল ধেটে বয়স ৩৫
৫। হঙ্গোজী বলদ মালজী ধঙ্গলে বয়স ৭০
৬। চবু বলদ মহাদজী পরীট বয়স ৩৫
৭। অমন বলদ লক্ষ্মন মালী বয়স ৫৫
৮। নাগোজী বলদ মুকলজী মূলে বয়স ৩৫
৯। জর‍্যা বলদ নামা মঙ্গ বয়স ২৫
১০। নিম্বাজী পনমন বয়স ২০ এবং তাহার মাতা রখমাই, বয়স ৬৫।

 প্রসঙ্গ-ক্রমে উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, এই মামলায় বিজয়ী পক্ষ রাজ-সরকারে “হরকী” স্বরূপ ২০০ টাকা দিয়াছিল।

 বিচার আরম্ভ হইবার পূর্ব্বেই, উভয় পক্ষকেই একখানা রাজিনামা লিখিয়া দিতে হইত যে, তাহারা পঞ্চায়েতের বিচার বিনা ওজরে মানিয়া লইবে। কিন্তু মনের মত রায় না পাইলে, কোন পক্ষেরই ওজর-আপত্তির অসদ্ভাব দেখা যাইত না। পঞ্চায়েতের বিচার না মানিয়া, তখন তাহারা ‘দিব্যে’র (ইংরেজীতে যাহাকে ordeal বলে) দাবী করিত। আর এই ‘দিব্যে’র দাবীও দুই-একবারে মিটিত না। পরাজিত পক্ষ যত বার, যত রকমের ‘দিব্য’-পরীক্ষার দাবী করিত, ততবার দিব্যের ব্যবস্থা করিয়া, তাহার আবদার রক্ষা করিতে হইত। উদ্দেশ্য বোধ হয় এই ছিল যে,—তাহার মনে কোন প্রকার ক্ষোভেরই কারণ না থাকে। শ্রীযুত ভাস্কর বামন ভট এই দিব্যের বিচার সম্বন্ধীয় কয়েকখানি দলীল, ভারত-ইতিহাসমণ্ডলের তৃতীয় সম্মেলন বৃত্তে প্রকাশিত করিয়াছেন। এই একখানা দলীল হইতেই বুঝা যাইবে যে, মামলা হারিয়া মারাঠা বাদী বা বিবাদী কিরূপে বারবার বিভিন্ন প্রকারের দিব্যের দাবী করিতে পারিত। সমগ্র দলীলখানি উদ্ধৃত করিবার আবশ্যক নাই,—মাত্র একটি অংশ তুলিয়া দিতেছি—“তার পরদিন সোমাজী গোতের বিচারে গররাজী হইয়া বলিল যে, নদী হইতে গ্রামবাসীরা যাহার হাত ধরিয়া তুলিবে, তাহার দাবীই গ্রাহ্য। তখন তুমি বাবাজী এই ব্যবস্থায় সম্মত আছ কি না জিজ্ঞাসা করায়, তুমি তোমার সম্মতি জানাইলে। তার পরদিন সোমাজী এই ‘ক্রিয়ায়’ গররাজী হইয়া রঙ্গনগাঁওয়ের মসজিদের দিব্যের কথা প্রস্তাব করিল। তৃতীয় দিবস মসজিদের দিব্য না-কবুল করিয়া সে আবার প্রস্তাব করিল যে, বাদী-প্রতিবাদী পরস্পরের হাতে জল-ঢালাঢালি করিয়া স্থির করিবে, কাহার দাবী ঠিক। তারপর সোমাজী এই প্রস্তাবেও গররাজি হইয়া ‘অগ্নিদিব্য’ প্রার্থনা করিল।”

 উপরে উল্লিখিত ‘দিব্যগুলি’র মধ্যে একটিতেও কিন্তু দৈববিচারের গন্ধও ছিল না। উভয় পক্ষ কোন পুণ্য-তিথিতে, কোন পবিত্র নদীতটে অথবা কোন পবিত্র স্রোত-সঙ্গমে সমবেত হইত। সেইখানে সমস্ত গ্রামবাসী কোন শুভ মুহূর্ত্তে স্নান করিয়া নদীর তীরে উঠিয়া দাঁড়াইত। বাদী-প্রতিবাদী তখনও নদীগর্ভে দণ্ডায়মান থাকিত। তখন হয় পাটীল অথবা কোন পল্লীবৃদ্ধ সমবেত পল্লীবাসিগণের অনুজ্ঞা অনুসারে বিবাদীয় সম্পত্তির ন্যায্য অধিকারীকে নদী হইতে হাত ধরিয়া তুলিত। নামে দিব্য হইলেও, ইহা কার্য্যতঃ জুরির বিচার বলিয়াই পরিগণিত হইতে পারে। সেকালে লোকের কুসংস্কার ও ধর্ম্ম-বিশ্বাস যেরূপ প্রবল ছিল, তাহাতে এই প্রথায় অবিচার হইবার আশঙ্কা একরূপ ছিল না বলিলেই হয়। পুণ্য তিথিতে কৃষ্ণা অথবা গোদাবরীর পবিত্র সলিলে দাঁড়াইয়া, সমবেত গ্রামবাসীদের সম্মুখে দেব-ব্রাহ্মণ সাক্ষী করিয়া, মিথ্যা আচরণ করিবার সাহস তখনকার দিনে অতি অল্প লোকেই করিতে পারিত। আর তেমন লোকের উপর এমন বিচারের ভার গ্রামবাসিগণ দিবেই বা কেন? যে আবাল্য সকলের বিশ্বাসভাজন, সে বার্দ্ধক্য অবস্থায় পরলোকের প্রান্তে দাঁড়াইয়া কেন এমন কাজ করিবে, যাহার ফল ইহকালে লোকনিন্দা ও পরকালে অনন্ত নরক? পুণা পরগণার অন্তর্গত ফরসঙ্গ গ্রামের পাটীলকী বতনের বিবাদের মীমাংসা এই প্রথায় হইয়াছিল। সমবেত গ্রামবাসী শুচি-স্নাত হইয়া,—কৃষ্ণার সৈকতে দাঁড়াইয়া, একনাক নামক এক মহার বৃদ্ধকে ‘বতনের’ প্রকৃত অধীকারীর হাত ধরিয়া উচ্চৈঃস্বরে আপনার অভিপ্রায় ব্যক্ত করিতে আদেশ করিয়াছিল।

 তখনকার মারাঠা পল্লীতে বহু প্রকারের দিব্য প্রচলিত ছিল। সে সকল আলোচনার সময়ও নাই, স্থানও নাই, কেবল যে দুইটীর উল্লেখ সর্ব্বাপেক্ষা অধিক সংখ্যক দলীলে পাওয়া যায়—তাহারই বিস্তৃত বিবরণ এখানে দেওয়া যাইতেছে। ইহার একটির নাম ‘রবা’। দ্বিতীয়টির নাম ‘অগ্নিদিব্য’। ফুটন্ত তৈলপূর্ণ পাত্রের মধ্য হইতে উত্তপ্ত ধাতুখণ্ড বাহির করিয়া আনিবার নাম―‘রবা কাঢ়ণে’। বাদী ও প্রতিবাদী উভয়ের সম্মতি লইয়া এই দিব্যের ব্যবস্থা হইত। দিব্যের স্থান নির্দ্দিষ্ট হইত—কোন জাগ্রত দেবতার পবিত্র মন্দিরে। সরকার হইতে পাঁজি-পুঁথির সাহায্যে শুভ মুহূর্ত্ত স্থির করিয়া, এই ‘দিব্যে’র সময় নির্দেশ করা হইত। আর বাদী-প্রতিবাদীর সঙ্গে থাকিত তাহাদের গ্রামবাসিগণ ও একজন সরকারী কর্ম্মচারী। একখানি মারাঠী দলীল হইতে ‘রবার’ সমসাময়িক বিবরণ তুলিয়া দিতেছি। মামলাটি চলিতেছিল কোন গ্রামের ‘পাটীলকী’ লইয়া। বাদী ও প্রতিবাদীর নাম দেবজী ও শঙ্ক্রাজী ডাঙ্গট। সরকারী রায়ে লেখা আছে—“তারপর রাজশ্রী আপাজী হনমন্ত সুভেদার, বালাজী দাদাজী এবং বাঘোজী রাউতের সঙ্গে পালীতে অগ্নি-দিব্যের জন্য তোমাদিগকে পাঠান হইল। সেই গ্রামের গোত তথাকার মন্দিরে সমবেত হইয়া অগ্নি জ্বালিয়া ঘি ও তৈল উত্তপ্ত করিল। তুমি স্নান করিয়া, নিজের দাবী যথারীতি জানাইয়া, সকলের সম্মুখে সেই তপ্ত তৈলের ভিতর হইতে দুইখণ্ড ধাতু বাহির করিলে। তার পর তোমার হাত বাঁধিয়া রাখিয়া তাহার উপর শিলমোহর করা হইল। পরদিন উপরিউক্ত দুই পক্ষকেই মহলের আমলারা হুজুরে লইয়া আসিল। তৃতীয় দিনে মজলিসের সম্মুখে শিলমোহর ভাঙ্গিয়া হাত খোলা হইল। তোমার হাতে আগেকার দাগ ভিন্ন আর কোন নূতন দাগ দেখা গেল না। তুমি এই দিব্যে জয়ী হইলে।”[]

 অগ্নি-দিব্যের ব্যবস্থা ইহা হইতে একটু বিভিন্ন। বিচারপ্রার্থীর হাতখানিতে প্রথমে অশ্বত্থ পত্রের আবরণ নূতন সূতায় ভাল করিয়া বাঁধিয়া, সেই পত্রাবৃত হস্তে একটি উত্তপ্ত লৌহ গোলক দেওয়া হইত। সেই তপ্ত ধাতু-গোলক হাতে লইয়া, মৃত্তিকায় অঙ্কিত সাতটি বৃত্তের প্রান্তে উপনীত হইয়া, বিচারপ্রার্থী শুকনা তুষের উপর হাতের গোলা ফেলিয়া দিত। তুষগুলি জ্বলিয়া উঠিলেই বুঝা যাইত যে, লোহার গোলাটি ভাল করিয়াই গরম করা হইয়াছে, কোন প্রকার প্রতারণা করা হয় নাই। তারপর যথারীতি বিচার-প্রার্থীর হাত পরীক্ষা করা হইত। কোন প্রকারের নূতন ক্ষতচিহ্ন না থাকিলেই, দিব্যে তাহার জয় হইত। বলা বাহুল্য, এই সকল দিব্যের বিচার বহু প্রাচীন কাল হইতেই ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। এমন কি, বৃহস্পতির গ্রন্থে অগ্নি-দিব্যের যে ব্যবস্থা আছে, তাহার সহিত মারাঠা দলীলের অগ্নি-দিব্যের বিবরণের সম্পূর্ণ ঐক্য দেখা যায়। মনু, যাজ্ঞবল্ক্য, নারদ ও শুক্র প্রভৃতি প্রাচীন নীতিবিদ্‌গণও এই প্রকার বিচারের অনুমোদন করিয়াছেন। চৈনিক পরিব্রাজক হুয়েন্থসঙ্গ ও মুসলমান পণ্ডিত আবু রিহান অল বিরুনির সাক্ষ্য হইতে জানা যায় যে, শাস্ত্রকারগণের এই ব্যবস্থা কার্য্যতঃ ভারতবর্ষে বিভিন্ন যুগে প্রতিপালিত হইত। ভিন্সেণ্ট স্মিথ বলেন যে, মুঘল সম্রাট্ আকবরের কালেও দিব্যের বিচার প্রচলিত ছিল। ভিনিসীয় পরিব্রাজক নিকোলা মেনুসী ঔরংজীবের রাজত্ব সময়ে দক্ষিণভারতে ‘দিব্যের’ প্রচলন লক্ষ্য করিয়াছেন; এবং ইংরেজ কর্ম্মচারী কর্ণেল ড্ররী বলেন যে, ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকেও ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যে এই প্রকারের বিচার প্রচলিত ছিল। সুতরাং মারাঠা রাজ্যেও যে পেশবাদিগের শাসন-কালে এই অদ্ভুত বিচার-পদ্ধতির প্রচলন দেখা যাইবে তাহাতে বিস্ময়ের কারণ নাই। কিন্তু এই সকল বিচারের ফলে যে সকল ক্ষেত্রে সত্যের জয় নাও হইতে পারে, তাহা তৎকালীন মারাঠা বিচারকগণ একেবারে অনবগত ছিলেন না। তাই সাধারণ মামলায় প্রায়ই অগ্নি-দিব্যের ব্যবস্থা হইত না। আর অন্য প্রকারের সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে, কখন কখনও অগ্নিদিব্যের ব্যবস্থায় তখনকার বিচারকেরাও বিরোধী হইতেন। একজন ‘সভানায়ক’ বা ‘পঞ্চায়েতের সভাপতি’ একবার সাক্ষ্য প্রামাণ থাকায়, রবা দিব্যের দাবী অগ্রাহ্য করিয়া, প্রচলিত প্রবাদ-বাক্যের আবৃত্তি করিয়া বলিয়াছিলেন—

দিবস অসতা দিবা নাহী।
গোহী অসতা রবা নাহী

 বলা বাহুল্য যে, এই সকল দিব্যের ব্যবস্থা হইয়াছিল সত্যস্রষ্টা দেবতাদিগের সাক্ষ্য বা বিচার পাইবার আশায়। এই আশায়ই বাদী-প্রতিবাদিগণ কখন-কখনও দেব-মন্দিরে বা মসজিদে উপস্থিত হইয়া, নিজ নিজ দাবীর সমর্থনে শপথ উচ্চারণ করিত। দেবতার বিচার প্রতীক্ষায় কখন কখনও সপ্তাহ, পক্ষ, মাস, বা ততোধিক কাল অপেক্ষা করা হ‍ইত। যদি এই সময়ের মধ্যে শপথকারীর বা তাহার কোন নিকট আত্মীয়ের কোন শারীরিক বা আর্থিক হানি না হইত, তাহা হইলে ধরিয়া লওয়া হইত যে, দেবতার বিচারে তাহারই জর হইয়াছে। আর নির্দ্দিষ্ট কালের মধ্যে ঐরূপ কোন বিপদ ঘটিলে, তাহা মিথ্যাবাদীর প্রতি দেব-কোপের চিহ্ন বলিয়া গৃহীত হইত। একবার একজন লোক তাহার দাবীর সমর্থনে ভূদেব রাজার (শাহু ছত্রপতির) চরণ স্পর্শ করিয়া শপথ বাক্য উচ্চারণ করিয়াছিল। তাহার পর দুইএক দিনের মধ্যেই তাহার উদরাময় হয়। পীড়িত অবস্থায় বলদের পিঠে করিয়া তাহাকে গ্রামে ফিরাইয়া আনা হয়। কিন্তু তাহার প্রতিপক্ষ বলিতেছে, মিথ্যা শপথের ফলে সেই রোগ হইতে সে আর মুক্তি পায় নাই। মাস অতীত হইতে না হইতেই, মিথ্যা দাবীর অপরাধের জবাব দিতে সে আর এক লোকে চলিয়া যায়। গ্রামে গ্রামে সীমানা লইয়া বিবাদ বাধিলে, তাহারও বিচার হইত ঐ ‘দিব্যের’ রীতিতে। এক জন পাটিল গোচর্ম্ম মাথায় লইয়া তাহার বিশ্বাস-মত সীমানার পথে চলিয়া যাইত। নির্দ্দিষ্ট কাল মধ্যে তাহার কোন বিপদ না ঘটিলে, সেই সীমানাই খাঁটি সীমানা বলিয়া গৃহীত হইত। এরূপ ক্ষেত্রে একবার কিন্তু একজন পাটিলকে গোচর্ম্ম বহনের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইয়াছিল।

 বিচার শেষে বিজয়ী পক্ষ পেশবা সরকার হইতে একখানি ‘বতন পত্র’ বা ‘নিবাড়া পত্র’ পাইত; কারণ, বিচার-কার্য্য সকল ক্ষেত্রে সকল সময়েই পেশবার নামে করা হইত। বিজয়ী পক্ষ আসল দলীলখানি লইয়া যাইত; আর তাহার একপ্রন্থ নকল পেশবার দপ্তরে রক্ষিত হইত। সময়ে-সময়ে এই সকল প্রাচীন দলীলের নকল অনেক কাজে লাগিত। মূল দলীল হারাইয়া গেলে, এই নকলের সাহায্যেই স্বত্বের মামলার বিচার হইত! আবার ১৭৯২ খৃষ্টাব্দে একটি দেশমুখী বতনের মামলায়, একখানি অতি প্রাচীন দলীলের প্রামাণিকতায় সন্দেহ হইলে, সমান প্রাচীন অপর কয়েকখানি দলীল বাহির করিয়া, তাহার সহিত লেখার প্রণালী ও মোহরের তুলনা করিয়া, তবে ঠিক করা হয় যে, দলীলখানি সত্য-সত্যই বিশ্বাসযোগ্য,—জাল নহে।

 খতের নালিশে বাদীকে সরকারে দাবীর টাকার একচতুর্থাংশ দিতে হইত। এই প্রথাটি খুব সম্ভব মুসলমান রাজাদিগের নিকট হইতে ধার করা। মনে রাখিতে হইবে তখনকার দিনে আদালতে উকিল, মোক্তার, টাউট, এজেণ্টের উৎপাত ছিল না; ষ্ট্যাম্প ও কোর্টফিও দিতে হইত না; সুতরাং সে হিসাবে দাবীর টাকার এক-চতুর্থাংশ খুব বেশী খরচ বলিয়া বোধ হয় না। বিশেষতঃ, পাওনা আদায় করিতে যখন আদালতের সাহায্য গ্রহণের প্রয়োজন সাধারণতঃ হ‍ইতই না। সেকালের পাওনাদার দেনদারের দরজায় ধরণায় বসিত। দেনদার যত বড় ব্যক্তিই হউন না কেন, দাবীর টাকা না মিটাইয়া দিলে, অথবা ‘ধরণাদাতা’ অন্নজল গ্রহণ না করিলে, তাঁহারও অন্নজল গ্রহণ করিবার উপায় ছিল না। পেশরার দুয়ারে ধরণা দিয়েও সেকালের মারাঠা পাওনাদার ইতস্ততঃ করিত না। ব্রুটন বলিয়াছেন যে, কতকগুলি মুসলমান সিপাহী বকেয়া বেতনের জন্য দৌলতরাও সিন্ধিয়ার দুয়ারে ধরণা দিয়াছিল। সুতরাং তাগাদায় ও ধরণায় যে টাকা আদায় হইত না, কেবল সেই টাকাটার জন্যই তখনকার পাওনাদার আদালতের দ্বারস্থ হইত। আর এই জাতীয় পাওনা উশুলের আশা তাহারা এক প্রকার ছাড়িয়াই দিত। কাজেই, দাবীর টাকার সিকি পরিমাণ সরকারে দিয়াও, বাকী বারোআনা পাইলেই যে তাহারা সন্তুষ্ট হইবে, তাহাতে আর সন্দেহ কি?

 যদি দেশের শান্তি ও অশান্তি, চুরি-ডাকাতির সংখ্যা প্রভৃতি দ্বারা ফৌজদারী আদালতের কার্য্যকুশলতার বিচার করিতে হয়, তবে মারাঠা ফৌজদারী হাকিমেরা তাহাদের কর্ত্তব্য খুব নিপুণতার সহিতই সুসম্পন্ন করিতেন বলিতে হইবে। এল্‌ফিন্‌ষ্টোন্ লিখিয়াছেন—“The country is peculiarly free from crimes. Gang robberies have never, since I have been in the country, reached to such a pitch as to bear a moment’s comparison with Bengal, described in the paper laid before the Parliament”. ইহাও হইতে পারে যে, বাঙ্গালায় যে শ্রেণীর বলিষ্ঠ লোক ডাকাতি করিয়া বলবীর্য্যের পরিচয় দিত, মহারাষ্ট্রে সেই সেই শ্রেণীর লোক সেনাদলে প্রবেশ করিয়া যুদ্ধ-বিগ্রহে সামরিক যশ অর্জ্জন ও জন্য প্রদেশে নিজেদের লুণ্ঠন প্রবৃত্তি চরিতার্থ করিতে পারিত বলিয়াই, মারাঠা দেশে চুরি-ডাকাতির সংখ্যা এলফিন্‌ষ্টোনের সময় পর্য্যন্ত বাঙ্গালা দেশ অপেক্ষা অনেক কম হইত। ফৌজদারী মামলার বিচার হইত গ্রামে পাটীলের ও জিলায় কামাবিস্‌দার বা মামলদারের নিকটে। প্রান্তের শাসনকর্ত্তা সরসুভাদারের নিকটে আপীলের শুনানি হইত; আর প্রত্যেক মামলারই শেষ আপীল ও চূড়ান্ত বিচার হইত পুণার ন্যায়াধীশের আদালতে। দেওয়ানী মামলার মত ফৌজদারী মামলার বিচারে পঞ্চায়েত ডাকার নিয়ম ছিল না। তবে মাঝে মাঝে দুই-একটা খুনী মামলার বিচারেও যে পঞ্চায়েতের সাহায্য লওয়া হইত, তাহার প্রমাণ মারাঠা কাগজপত্রে পাওয়া যায়। শাহু ছত্রপতি ও বালাজী বাজীরাও পেশবার আমলে কোন অপরাধেই সাধারণতঃ প্রাণদণ্ড দেওয়া হইত না। নরহত্যারও শাস্তি ছিল, অর্থদণ্ড, কারাদণ্ড এবং বিত্ত গ্রহণ। সেকালে অর্থদণ্ডের পরিমাণ অপরাধের গুরুত্ব হিসাবে না হইয়া, দণ্ডিত ব্যক্তির আয়ের অনুপাতে হইত। সমান অপরাধে ধনী ও নির্ধনের অর্থদণ্ডের যথেষ্ট তারতম্য হইত। দণ্ডিত অপরাধীরাও অনেক সময়ে সরকারে আবেদন করিত যে, তাহাদের সম্পত্তির অনুপাতে (জীবন মাফক) অর্থদণ্ডের পরিমাণ নির্দ্দেশ করা হউক। বালাজী বাজীরাওয়ের আমলে রামা নামক এক নরসুন্দর-নন্দনের মিথ্যা অভিযোগের অপরাধে ৪০ টাকা অর্থদণ্ড হয়। ঠিক ঐ পেশবারই শাসনসময়ে প্রতিনিধির ভ্রাতা হনমন্ত ভটের ১০০০ টাকা জরিমানা হইয়াছিল মিথ্যা সাক্ষের জন্য। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে এই তারতম্যের কারণ অনুমান করা কিন্তু কঠিন নহে। শাস্তি দণ্ডিত ব্যক্তির চরিত্র সংশোধনের জন্য। সুতরাং যে পরিমাণে অর্থদণ্ড করিলে একজন দরিদ্র ব্যক্তির মনে ভয়ের সঞ্চার হইতে পারে, অপেক্ষাকৃত বিত্তশালী ব্যক্তি তাহাতে ভীত হইবে না। এই জন্যই প্রায় সমান অপরাধে এক গ্রাম্য নাপিতের জরিমানা হইল ৪০; আর প্রতিনিধির মত একজন প্রবল ও প্রভাবশালী সামন্তের নিকটতম আত্মীয়ের দণ্ড হইল তাহার পঁচিশ গুণ। এই প্রসঙ্গে আরও একটা কথা বলিয়া রাখা আবশ্যক। ফৌজদারী আদালতের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হইলে দণ্ড হইত; কিন্তু নির্দোষী প্রমাণিত হইলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি বিনা দণ্ডে অব্যাহতি পাইত না। তবে দণ্ডিত ব্যক্তির জরিমানার নাম ‘গুহ্নাগারী’; আর নির্দোষ ব্যক্তির নিকট হইতে যে অর্থ গ্রহণ করা হইত, তাহার নাম ছিল ‘হরকী’। বোধ হয় মতলব এই যে, নির্দ্দোষ ব্যক্তিরা এক আধটু শাস্তি পাইলেও, দোষী যেন শাস্তি পায়।

 মারাঠা আমলে প্রাণদণ্ড খুব বিরল হইলেও, পেশবা মাধবরাও ও নানাফড্‌নবীশের শাসন সময়ে অপরাধীকে বিকলাঙ্গ করিয়া দেওয়া মোটেই অসাধারণ ঘটনা বলিয়া বিবেচিত হইত না। হিন্দুশাস্ত্রের ব্যবস্থায়ও, যে অঙ্গ দ্বারা অপরাধ করা হইয়াছে সেই অঙ্গ ছেদন করা অপরাধীর যোগ্য শাস্তি বলিয়া বিবেচিত হইত। ভিনিসীয় পরিব্রাজক নিকোলাস্ মেনুসী লিখিয়াছেন যে, মুঘল সম্রাট্ ঔরংজীব মদ্য-বিক্রেতাদিগের হস্ত ছেদনের হুকুম দিয়াছিলেন। জাহাঙ্গীরের আত্ম-চরিতেও এই প্রকার শাস্তির উল্লেখ আছে। কনিষ্ঠ মাধব রাওয়ের রোজনিশীতে চুরি ও অন্য অপরাধে বিভিন্ন প্রকারে দণ্ডিত ব্যক্তির ও দণ্ডের তালিকা আছে। চৌর্য্যাপরাধে দণ্ডিতদের একটা তালিকার সারমর্ম্ম নিলে দেওয়া গেল—

 প্রাণদণ্ড—২০জন

 দক্ষিণ হস্ত ও বাম পদ ছেদন—১৩ জন

 দক্ষিণ হস্ত ছেদন—১৮ জন

 দক্ষিণ হস্ত ও একখানি কর্ণ ছেদন—৪ জন

 দক্ষিণ হস্ত ও দক্ষিণ পদ ছেদন—১ জন

 একখানি কর্ণ ছেদন—১ জন

 একজন লোককে অদ্ভুত সাজে সহরের সর্ব্বত্র ঘুরাইয়া, পরে পেরেক বিদ্ধ করিয়া মারিবার হুকুম হইয়াছিল।

 এই তালিকার উল্লিখিত দণ্ডগুলি নিশ্চয়ই অমানুষিক বলিয়া বিবেচিত হইবে, সন্দেহ নাই। কিন্তু সভ্যতা বিস্তারের সহিত ক্রমশঃ লোকের মনের সুকুমার বৃত্তিগুলিরও উৎকর্ষ হইতেছে। সেইজন্য এখন আমাদের নিকট যাহা বর্ব্বরোচিত অমানুষিকতা বালয়া বোধ হয়, সেকালের লোক বোধ হয় তাহা নিতান্তই স্বাভাবিক এবং ন্যায়সঙ্গত বলিয়া মনে করিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ও ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে ইংলণ্ডে চুরির জন্য প্রাণদণ্ড হইত। অনেক সামান্য সামান্য অপরাধের শাস্তিও তখনকার বিলাতী আইনে ছিল প্রাণদণ্ড। নন্দকুমারের বিচারেই বাঙ্গালী তখনকার বিলাতী ব্যবস্থার কঠোরতার কিছু কিছু পরিচয় পাইয়াছিল। বিলাতের তুলনায় তখনকার মহারাষ্ট্রের প্রচলিত দণ্ড বহু পরিমাণে লঘু ছিল বলিতে হইবে। মারাঠা দেশে কিন্তু একের অপরাধে অন্যেরও শাস্তি হইত। চোরের সহিত তাহার পুত্র পরিবারও কারাগারে নিক্ষিপ্ত হইত। এই ব্যবস্থাটি প্রাচীন হিন্দুশাস্ত্র-সম্মত। ইহার আলোচনা অন্যত্র করিয়াছি; অতএব এখানে তাহার পুনরাবৃত্তি করিব না।

  1. এই দুইখানি দলীলের ভাগবত অনুবাদ দিয়াছি।