পেশবাদিগের রাজ্যশাসন-পদ্ধতি (১৯৩০)/শাসন-তন্ত্র
পেশবাদিগের রাজ্যশাসন-পদ্ধতি
শাসন-তন্ত্র
বাল্যকালে স্কুলপাঠ্য ইতিহাসে পড়িয়াছি, মারাঠারা দস্যুর জাতি। তাহাদের সাম্রাজ্যের ভিত্তি লুণ্ঠন, তাহাদের যুদ্ধনীতির একমাত্র ভিত্তি লুণ্ঠন;—লুণ্ঠনই তাহাদের জাতীয় জীবনের একমাত্র অবলম্বন, জাতীয় নীতির একমাত্র চরম লক্ষ্য। বহু কষ্টে, বহু পরিশ্রমে ইংরেজ ঐতিহাসিকের এই সিদ্ধান্ত মুখস্থ করিয়াছিলাম। কিন্তু বাল্য অতিক্রম করিবার পর, আর মনে-মনে ইহা সত্য বলিয়া গ্রহণ করিতে পারি নাই। কেমন যেন মনে খট্কা লাগিয়াছে,—কেবল লুঠ-তরাজের উপর যে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত, তাহা দীর্ঘ দেড় শতাব্দীকাল টিকিয়া গেল কেন,—কেমন করিয়া? গ্রাণ্ট ডফের গ্রন্থ যত্নসহকারে পাঠ করিলাম। উত্তর মিলিয়া গেল, মারাঠা সাম্রাজ্য স্থাপয়িতাগণ কেবল যোদ্ধা বা দস্যু ছিলেন না। প্রথম মাধব রাওয়ের মত দূরদর্শী নৃপতির চিত্ত কেবল দিগ্বিজয়ে নিবদ্ধ ছিল না, বিজিত রাজ্যের সুশাসনের প্রতিও তাঁহাদের যথেষ্ট মনোযোগ ছিল। কিন্তু তাঁহাদের রাজ্য কেমন করিয়া, কোন্ নীতি অনুসারে শাসিত হইত, তাহার বিশেষ সন্ধান গ্রাণ্ট ডফের ইতিহাসে পাইলাম না। তিনি লিখিয়া গিয়াছেন, মারাঠাজাতির রাজনৈতিক ইতিহাস। এই গ্রন্থে তিনি অপূর্ব্ব ধৈর্য্য ও পাণ্ডিত্য সহকারে তারিখের পর তারিখ মিলাইয়া, ঘটনার পর ঘটনা সাজাইয়া গিয়াছেন। মারাঠাদিগের শাসনপদ্ধতির ইতিহাস তিনি রচনা করেন নাই। সে সময়ে বোধ হয় তাহার যথেষ্ট উপাদানও ছিল না।
গত চল্লিশ বৎসর কালের মধ্যে ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের প্রতি বহু অনুসন্ধিৎসু ছাত্রের ও পণ্ডিতের দৃষ্টি আকৃষ্ট হইয়াছে। যে সমস্ত পণ্ডিত প্রাচীন ভারতের ইতিহাস আলোচনা করিয়া খ্যাতি অর্জ্জন করিয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে ইংরেজ, ফরাসী, জার্ম্মাণ ও মার্কিনের সংখ্যাই বেশী। গত ত্রিশ বৎসরের মধ্যে একদল তীক্ষ্ণবুদ্ধি ভারতীয় পণ্ডিতও প্রাচীন ভারতের ইতিহাস চর্চ্চায় প্রবৃত্ত হইয়াছেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নব-প্রবর্ত্তিত শিক্ষানীতির ফলে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় বহু বাঙ্গালী ছাত্রও আজকাল ভারত ইতিহাসের প্রাচীন যুগের তত্ত্বানুসন্ধানে অনুরাগ প্রদর্শন করিতেছেন। বাঙ্গালা মাসিক পত্রের পৃষ্ঠায়ও ইহার বহু নিদর্শন পাওয়া যাইবে। মারাঠা পণ্ডিতগণের মধ্যে স্যার রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে গবেষণা করিয়া বিশ্ববিশ্রুত কীর্ত্তি লাভ করিয়াছেন। কিন্তু ঠিক এই সময়ের মধ্যেই একদল মারাঠা ঐতিহাসিক অদ্ভুত আত্মত্যাগ, অপূর্ব্ব অধ্যবসায়ের সহিত মহারাষ্ট্রের লুপ্ত ইতিহাস উদ্ধার করিবার চেষ্টায় প্রবৃত্ত হইয়াছেন। ইঁহাদের মধ্যে পরলোকগত বিচারপতি মহাদেব গোবিন্দ রাণাডের নাম বাঙ্গালীর নিকট অপরিচিত নহে, কারণ রাণাডের ঐতিহাসিক প্রবন্ধগুলি ইংরাজীতে লিখিত। রাণাডেই তাঁহার “মারাঠা শক্তির উত্থান” নামক গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে সর্ব্বপ্রথম ইঙ্গিত করেন যে, মারাঠা জাতির উত্থান একেবারে আকস্মিক নহে; এবং মারাঠা জাতীয় জীবনের জনক শিবাজী কেবল মাত্র যোদ্ধা বা লুণ্ঠন-নিরত দস্যু ছিলেন না। রাণাডের গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হইবার পূর্ব্বে, পরলোকগত রাও বাহাদুর গণেশ চিমনাজী বাড সঙ্কলিত পেশবা দপ্তরের কত্তকগুলি মূল্যবান্ প্রাচীন ঐতিহাসিক দলিল প্রকাশিত হয়। এই দলিলগুলি ভাল করিয়া পড়িয়া দেখিবার জন্য বিচারপতি রাণাডে তাঁহার গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের প্রকাশ স্থগিত রাখেন। কিন্তু নিতান্ত দুঃখের বিষয়, আরব্ধ কার্য্য সমাপ্ত হইবার পূর্ব্বেই পণ্ডিতপ্রবর সাধনোচিত ধামে প্রস্থান করেন। তাহার পর “পেশবা-দপ্তরের দলিলসংগ্রহ” নয় খণ্ডে প্রকাশিত হইয়াছে। শ্রীযুক্ত বিশ্বনাথ কাশিনাথ রাজবাডের বিপুল চেষ্টায় বহু সহস্র প্রাচীন দলিল ও লিপি প্রায় ২২ খণ্ডে মুদ্রিত হইয়াছে। রাজবাডে বলেন যে, আরও শতাধিক খণ্ডের অপ্রকাশিত উপাদান তাঁহার নিকটে আছে। রাজবাডের “মারাঠা ইতিহাসের উপাদান” পাণ্ডিত্য ও স্বদেশ-প্রেমের নিদর্শন স্বরূপ চিরদিন সম্মানিত হইবে। দক্ষিণ-মহারাষ্ট্রের পটবর্ধনপরিবারের কাগজপত্র, শ্রীযুত রাসুদেব বামন শাস্ত্রী খরে “ঐতিহাসিক লেখ-সংগ্রহ” নাম দিয়া বার খণ্ডে প্রকাশ করিয়াছেন। এই বিরাট গ্রন্থ প্রকাশের বিপুল ব্যয়-নির্ব্বাহের জন্য খরে মহাশয় ঘর-বাড়ী সমস্ত বিক্রয় করিয়া সর্ববস্বান্ত হইয়াছেন। এতদ্ব্যতীত রাও বাহাদুর দত্তাত্রের বলবন্ত পারসনীম সম্পাদিত “ইতিহাস-সংগ্রহ” নামক মাসিক পত্রে, রাজবাডে সম্পাদিত “ইতিহাস ও ঐতিহাসিকে” “রামদাস ও রামদাসীতে” এবং বহু প্রাচীন দলিল ও চিঠি-পত্র সংগৃহীত হইয়াছে। রাও বাহাদুর কাশিনাথ নারায়ণ সানে, রাজবাডে ও পারসনীসেরও পূর্বের “কাব্যেতিহাস সংগ্রহে” কতকগুলি মারাঠী বখর ও চিঠিপত্র বিশেষ পাণ্ডিত্য সহকারে সম্পাদন করিয়া, টীকাটীপ্পনী সহ, মুদ্রিত করিয়াছেন। কয়েক বৎসর হইল, প্রধানতঃ রাজবাডের চেষ্টায় মারাঠা ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রকাশের জন্য, “ভারত-ইতিহাস-সংশোধকমণ্ডল” নামক একটি সঙ্ঘ গঠিত হইয়াছে। মণ্ডলের সম্পাদক সর্দ্দার মেহেন্দলে ও শ্রীযুক্ত পোতদারের অক্লান্ত পরিশ্রমে মারাঠা ইতিহাসের বহু উপাদান সংগৃহীত ও প্রকাশিত হইয়াছে। মগুলের সদস্যগণ ইংরাজী প্রবন্ধ প্রকাশের বিরোধী। তাঁহাদের গবেষণার ফল মারাঠী ভাষায়ই লিপিবদ্ধ ও প্রচারিত হয়। সুতরাং মহারাষ্ট্রে জাতীয় ইতিহাস সঙ্কলনের এই বিরাট চেষ্টার কথা বঙ্গদেশে এখনও অবিদিত রহিয়া গিয়াছে। বাঙ্গালায় এবম্বিধ চেষ্টা বিরল না হইলেও, মাৱাঠা পণ্ডিতগণের বিরাট আত্মত্যাগ এ প্রদেশে মোটেই সুলভ নহে। বিশ্বনাথ রাজবাডে ইতিহাসের সাধনার জন্য কুমারজীবন যাপন করিতেছেন। তাঁহার মাসিক ব্যয় আট টাকার অধিক নহে। ভূমিতলে কম্বল পাতিয়া তিনি আপনার সুখশয়ন রচনা করেন। দেশ-ভ্রমণে তাঁহার চরণ-যুগলই সকল প্রকার যান-বাহনের প্রয়োজন সাধন করে। মহারাষ্ট্রের এই আত্মত্যাগ বঙ্গের একান্ত অনুকরণীয়। রাজবাডের মত বিদ্যানুরাগী সন্ন্যাসীর অধ্যবসায়ে পেশবাদিগের শাসনপদ্ধতির বিবরণ সঙ্কলন করিবার সময় এখন আসিয়াছে।
(২)
পেশবাগণ মারাঠা—সাম্রাজ্যের নায়ক ছিলেন, কিন্তু সম্রাট্ ছিলেন না। তাঁহাদের বিরাট বাহিনী ভারতবর্ষের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্য্যন্ত মহারাষ্ট্রের “ভগবাঝেণ্ডা” বা জাতীয় পতাকা বহন করিয়াছে,—মহারাষ্ট্রের পার্ব্বত্য অশ্ব আটকে সিন্ধু নদের জল পান করিয়াছে,—কিন্তু পেশবাগণ কখনও স্বাধীন নৃপতি বলিয়া পরিগণিত হন নাই। শাহুর জীবিত কালে বালাজী বিশ্বনাথ যেমন তাঁহার “মুখ্য প্রধান” মাত্র ছিলেন, তাঁহার বংশধর দ্বিতীয় বাজীরাও তেমনই নামে অন্ততঃ শাহুর বংশধর সাতারার বন্দী ছত্রপতি প্রতাপ সিংহের “মূখ্য প্রধান” ছিলেন। মারাঠা ছত্রপতি আবার কার্য্যতঃ ছিলেন তাঁহারই কর্ম্মচারী পেশবার বৃত্তিভোগী বন্দী, আর নামে ছিলেন মোগল বাদশাহের করদ সামন্ত। মোগল বাদশাহ, কেবল মাত্র নামে হইলেও, ভারতবর্ষের একছত্র সম্রাট্ বলিয়া সম্মানিত হইতেন। সুপ্রসিদ্ধ নানা ফড়্নবীস আপনার আত্মজীবনীতে দিল্লীর বাদশাহকে পৃথ্বিপতি বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। গণেশকৃষ্ণ নামক মারাঠা কর্ম্মচারী ১৭৫৪ খৃষ্টাব্দেও তাঁহার একখানি পত্রে দিল্লীর নাম-শেষ বাদশাহকে “সার্ব্বভৌম” বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ছত্রপতি সাম্ভাজীর বিধবা য়েসুবাঈএর একখানি পত্রেও দিল্লীর বাদশাহ সম্বন্ধে এই “সার্ব্বভৌম” শব্দটি প্রয়োগ করা হইয়াছিল। আর মারাঠা সাম্রাজ্যের পতনের ২৫ বৎসর পূর্ব্বে খর্ডার যুদ্ধগাথার অজ্ঞাত-নামা কবি মনে করিয়াছিলেন—দৌলত রাও সিন্ধিয়া দিল্লীশ্বরের আদেশেই হিন্দুস্থান ও গুজরাট্ ছাড়িয়া দক্ষিণে আসিয়াছেন।
হিন্দুস্থান আণি গুজরাথ সোডুণ শিন্দে দক্ষণেত আলা। হুকুম কেলা বাদশাহানী ত্যালা॥
মারাঠা সাম্রাজ্যের শেষ দূরদর্শী রাজনীতিজ্ঞ মহাদজী সন্ধিয়া যখন অন্ধ ও অক্ষম দ্বিতীয় শাহ আলমের নিকট হইতে, পেশবা মাধবরাও নারায়ণের নিমিত্ত “বকীল-ই-মুতলুকে”র সনন্দ গ্রহণ করেন, তখন তিনি এই সনাতন মারাঠা নীতির ও মারাঠা বিশ্বাসেরই অনুসরণ করিয়াছেন, কোন নবীন নীতির প্রবর্ত্তন করেন নাই।
এইখানেই শিবাজী ও তাঁহার পৌত্র শাহুর মধ্যে বিশেষ প্রভেদ লক্ষিত হয়। শিবাজী স্বাধীন হিন্দু-সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁহার গুরু রামদাসের নীতি—"যত মারাঠা, সকলকে এক পতাকা-মূলে মিলিত কর, মহারাষ্ট্র ধর্ম্মের বৃদ্ধি সাধন কর।” শিবাজী কেবল মাত্র “ছত্রপতি” উপাধি ধারণ করেন নাই, তিনি “গো-ব্রাহ্মণ-প্রতিপালক” বলিয়া সম্মানিত হইতেন। মুসলমান সাম্রাজ্যের ধ্বংস ও তাহার স্থানে হিন্দু রাজ্যের প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁহার জীবনের ব্রত। এই জন্য তিনি সাধ্য-পক্ষে মুসলমানের প্রাধান্য স্বীকার করেন নাই। শাহু বাল্যকালে মোগল বাদশাহের অন্তঃপুরে প্রতিপালিত। তাঁহার পিতামহের মত কষ্ট-সহিষ্ণুতা তাঁহাতে আশা করাই অন্যায়। বাল্যে হয় ত তাঁহার মোগল-শিক্ষকের নিকট শুনিয়া থাকিবেন যে, তাঁহার পিতামহ শিবাজী পার্ব্বত্য দস্যু ব্যতীত আর কিছুই ছিলেন না। রাজভক্তির পাঠটা তিনি খুব ভাল করিয়া পড়িয়াছিলেন। তাই স্বদেশে প্রত্যাবর্ত্তনের পর, যখন মোগল-সাম্রাজ্য পতনোন্মুখ, তখনও দক্ষিণে স্বীয় স্বাধীনতা প্রচার না করিয়া, শাহু দুর্ব্বল ফিরকসিয়রের আনুগত্য স্বীকার করিয়া, দশ-হাজারী মন্সব গ্রহণ করিলেন। পরলোকগত অধ্যাপক হরিগোবিন্দ লীময়ের নিকট শুনিয়াছি যে, শাহু মহারাজ পুণার দিল্লী দরোয়াজা নির্ম্মণের বিরোধী ছিলেন— কারণ উত্তরের দিকে তোরণ ও দরোয়াজা নির্মাণ করিলে সম্রাটের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা হইবে। শাহু সত্য-সত্যই দিল্লীর সম্রাটের প্রাধান্য ন্যায়সম্মত বলিয়া বিশ্বাস করিতেন। আর পেশবাগণ এই বিশ্বাস অনুসারে কার্য করিতেন সুবিধার অনুরোধে। তাঁহারা মালব বিজয় করিলেন বাহুবলে, কিন্তু তার পর দখলী-সত্ত্বটা আইন অনুসারে পাকা করিবার জন্য আবার একটা বাদশাহী পরোয়ানা যোগাড় করিলেন। তখনকার দিনে কেহই ইহা অস্বাভাবিক বা অনাবশ্যক মনে করেন নাই। এমন কি ইংরেজ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী যখন সম্রাট্ দ্বিতীয় শাহ আলমের নিকট হইতে বঙ্গ বিহার উড়িষ্যার দেওয়ানী সনন্দ গ্রহণ করেন, তখন তিনি স্বীয় রাজধানী হইতে পলাতক, পরানুগ্রহজীবী।
মারাঠা সাম্রাজ্যে দিল্লীর সম্রাটের নীচেই সাতারার ছত্রপতি মহারাজার স্থান। পেশবা, প্রতিনিধি, সচিব প্রভৃতি তাঁহারই কর্ম্মচারী; তিনিই তাঁহাদিগকে নিযুক্ত করিতেন। যখন সাতারার রাজা সকল ক্ষমতা হইতে বঞ্চিত, তখনও সাম্রাজ্যের প্রধান-প্রধান নায়কগণ তাঁহাদের পিতৃপদে অধিষ্ঠিত হইতেন তাঁহারই নিয়োগ-পত্রের বলে। মারাঠা সাম্রাজ্যের পতনের পূর্ব্বদিন পর্য্যন্তও এই প্রথার কখনও ব্যত্যয় হয় নাই। এমন কি, যে বাজীরাও রঘুনাথ আপনার সামন্তদিগের অধিকারর সর্ব্বপ্রকারে ক্ষুণ্ণ করিবার চেষ্টা করিতে ইতস্ততঃ করেন নাই, তাঁহার সময়েও শিবাজীর বংশধরের এই ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ ছিল। তিনি স্বীয় পদের নিয়োগপত্র ও বস্ত্রের নিমিত্ত আবাজী কৃষ্ণ শেলুকর নামক একজন কর্ম্মচারীকে সাতারার দরবারে পাঠাইয়া ছিলেন। ছত্রপতি মহারাজের নিকট হইতে নিয়োগপত্র সংগ্রহ করা কিন্তু মোটেই কঠিন ছিল না। নানা ফড়্নবীস ও পরশুরাম ভাউ পটবর্ধন যখন ষড়যন্ত্র করিয়া রঘুনাথ রাওয়ের কনিষ্ঠ পুত্র চিমনাজীকে বলপূর্ব্বক দ্বিতীয় মাধবরাও এর বালিকা- পত্নী যশোদা বাঈয়ের অঙ্কে দত্তক পুত্র স্বরূপে স্থাপিত করিয়া, সাতারায় নিয়োগপত্রের জন্য আবেদন করেন, তখন তাঁহারা বিফল—মনোরথ হয়েন নাই। আবার রঘুনাথ রাওয়ের দত্তক পুত্র অমৃতরাও যখন যশোবন্ত রাও হোলকরের প্ররোচনায়, ভ্রাতাকে পদচ্যুত করিয়া স্বীয় পুত্র বিনায়ক রাওকে পেশবাদিগের মসনদে প্রতিষ্ঠিত করিতে উদ্যোগী হইয়াছিলেন, তখনও সাতারা হইতে নিয়োগপত্র ও বস্ত্রালঙ্কার সংগ্রহ করা তাঁহার পক্ষে কঠিন হয় নাই। হোলি রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাটগণের পক্ষে রোমে অভিষেক যেমন আবশ্যক বলিয়া বিবেচিত হইত, পেশবাদিগের পক্ষে ও সাতারার ছত্রপতি মহারাজের সনন্দ সেইরূপ প্রয়োজনীয় বলিয়া পরিগণিত হইত। তফাতের মধ্যে এই যে,মধ্যে মধ্যে রোমের পোপ কোন-কোন—সম্রাটের অভিষেকেও আপত্তি করিতেন, আর শিবাজীর অযোগ্য বংশধরের সে শক্তি বা সাহস কিছুই ছিল না। তাঁহারা দুর্দ্দশার এত নিম্নস্তরে পৌঁছিয়াছিলেন যে, নজরের কয়েকটি টাকা পাইবার জন্য সকল প্রকার সনন্দ ও নিয়োগপত্রেই স্বাক্ষর করিতে প্রস্তুত ছিলেন।
পেশরাগণ নিয়োগপত্র সংগ্রহ করিতেন ছত্রপতি মহারাজের নিকট হইতে; অন্যান্য সামস্তগণ নিয়োগপত্রের নিমিত্ত আবেদন করিতেন পেশবার নিকট। পেশবা তাঁহাদের হইয়া ছত্রপতির দরবারে তদ্বির করিতেন। ১৭৬২-৬৩ খৃষ্টাব্দে প্রথম মাধবরাও অচ্যুতরাও নামক এক ব্যক্তির নিকট লিখিয়াছিলেন যে, প্রতিনিধির পদে পূর্ব্ববৎ শ্রীনিবাস পণ্ডিতকে বাহাল করা গেল,—তাঁহাকে ঐ পদে নিয়োগসময়োচিত-বস্ত্রের নিমিত্ত সাতারায় পাঠান গেল। শ্রীনিবাসের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র পরশুরামের নিমিত্ত মাধবরাও সাতারা হইতে নিয়োগপত্র আনাইয়াছিলেন। আবার ১৭৮৫ খৃষ্টাব্দে দ্বিতীয় মাধবরাওই জীবনরাও বিঠ্ঠলের সুমন্ত পদের সনন্দের নিমিত্ত বাবুরাও কৃষ্ণের নিকট অনুরোধ—পত্র লিখিয়াছিলেন। এই বাবুরাও কৃষ্ণ ছিলেন পেশবারই কর্ম্মচারী। তিনি নামে ছিলেন সাতারার দুর্গাধ্যক্ষ; কার্য্যতঃ তিনি সাতারার বন্দী মহারাজের কারা-রক্ষক।
সাতারার মহারাজ সাম্রাজ্যের সকল সামন্তকে সনন্দ দান করিতেন বটে, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা তাঁহার কিছুই ছিল না। সাতারার দুর্গে তিনি বন্দী ছিলেন। একজন সামান্য ভৃত্য নিযুক্ত করিবার ক্ষমতাও তাঁহার ছিল না। তাঁহার খিদ্মতগার আসিত পুণা হইতে। তাহারা বেতন বৃদ্ধির জন্য আবেদন করিত পেশবার নিকট। একবার সাতারার দুর্গে দাঙ্গা করিবার অপরাধে ছত্রপতি মহারাজ কয়েকজন কর্ম্মচারীকে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করিয়াছিলেন, কিন্তু তৎকালীন পেশবার আদেশে এই দণ্ড একেবারে রহিত হইয়াছিল।
সাতারার রাজার সহিত বোধ হয় মারাঠা সাম্রাজ্যের নিম্নতম সেনানায়কও অবস্থা—পরিবর্ত্তন করিতে সম্মত হইত না। একে তিনি সমস্ত ক্ষমতা-বঞ্চিত বন্দী, তাহাতে আবার তাঁহার আর্থিক দুরবস্থার সীমা ছিল না। একখানি মারাঠী পত্রে প্রকাশ যে, ছত্রপতি মহারাজের শাক উৎপাদন করিবার বাগান নাই,—পেশবা দয়াপরবশ হইয়া তাঁহাকে তদুপযোগী একখণ্ড ভূমি দান করিলেন। আর একখানি পত্রে প্রকাশ যে, যবতেশ্বরের শৈল হইতে সাতারার প্রাসাদে জলবাহী নল খারাপ হইয়াছিল বলিয়া পেশবার কর্ম্মচারী মেরামতের নিমিত্ত ৪০০০৲ টাকা চাহিয়াছিলেন—কিন্তু পেশবা সরকার ৮০০৲ টাকার অধিক মঞ্জুর করেন নাই। ছত্রপতি মহারাজকে সাধারণ গৃহস্থেরাও অনেক সময় তুচ্ছ করিত। সদাশিব মাবলঙ্গকর নামক এক ব্যক্তি সত্যসত্যই ছত্রপতি মহারাজের পূর্বপুরুষ সম্ভাজী মহারাজের একটি প্রাসাদের ভিত্তির উপর গৃহ নির্ম্মাণ করিয়াছিলেন। প্রথম মাধব রাওয়ের অনুগ্রহে সাতারার বন্দী নৃপতির অবস্থার কিছু পরিবর্ত্তন হইয়াছিল। কিন্তু পেশবাদিগের পতনের পূর্ব্বে তিনি কখনও স্বাধীনতা লাভ করিতে পারেন নাই।
সম্রাট্ ও ছত্রপতির নীচেই পেশবার স্থান। মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রকৃত নায়ক তিনিই। কিন্তু হইলে কি হয়, আইনের হিসাবে তিনি অষ্ট-প্রধানের একজন মাত্র। শিবাজীর সময় আবার প্রধানগণকে সময়-সময় এক পদ হইতে অপর পদে বদলী করা হইত;—যেমন এখন শিক্ষাসচিবকে রাজস্বসচিবের পদে বদলী করিয়া দেওয়া যায়। শিবাজীর সময় আবার কোন পদেই কাহারও উত্তরাধিকারের দাবী থাকিত না। ভটবংশের প্রথম পেশবা বালাজী বিশ্বনাথের পূর্ব্বে আরও ছয়জন পেশবার কার্য্য করিয়াছিলেন। ইহাদের মধ্যে কেবল নীলকণ্ঠ মোরেশ্বর পিতা মোরো ত্রিম্বকের পরিত্যক্ত পেশবা পদে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। ভটবংশের অভ্যুত্থানের পূর্বে পেশবা পদে কোন বংশবিশেষের বা ব্যক্তিবিশেষের বিশেষ কোন দাবী ছিল না। সুতরাং সচিব, সুমন্ত, সেনাপতি প্রভৃতি অপরাপর প্রধানেরা আপনাদিগকে পেশবার সমকক্ষ বলিয়াই মনে করিতেন।
বেতন, ক্ষমতা ও সম্মানের হিসাবে পেশবা কিন্তু পুরাতন মারাঠা-রাজ্যের সর্ব্বপ্রধান ছিলেন না। সে হিসাবে প্রতিনিধির স্থান তাঁহার অনেক উপরে। পেশবার বেতন ছিল বার্ষিক ১৩,০০০ হোন (১ হোন=৩—৪ টাকা) আর প্রতিনিধি পাইতেন বার্ষিক ১৫০০০ হোন। শিবাজী ও সাম্ভাজীর সময়ে প্রতিনিধি বলিয়া কোন কর্ম্মচারী ছিল না। সাম্ভাজীর প্রাণদণ্ডের পরে, যখন মহারাষ্ট্রের প্রায় সকল পর্ব্বত-দুর্গ একেএকে মোগলের হস্তগত হইল, তখন নিরুপায় রাজারাম পৈতৃক বাসভূমি ত্যাগ করিয়া দক্ষিণে জিঞ্জী দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। মোগলে ও মারাঠায় তখন জীবন-মরণের সংগ্রাম চলিতেছে,
* (১) শামরাজ নীলকণ্ঠ রোজেকর (২) মোরো ত্রিম্বক পিঙ্গলে (৩) নীলকণ্ঠ মোরেশ্বর পিঙ্গলে (8) পরশুরাম ত্রিম্বক (৫) বহিরো মোরেশ্বর পিঙ্গলে (৬) বালকৃষ্ণ বাসুদেব। তখন মারাঠাদিগের একজন যোগ্য নেতার বিশেষ প্রয়োজন হইয়াছিল। এই প্রয়োজনের অনুরোধে রাজারাম জিঞ্জীদুর্গে প্রহ্লাদ নিরাজী নামক একজন ব্রাহ্মণ রাজ-নীতিজ্ঞকে প্রতিনিধি পদে নিয়োগ করেন। প্রহ্লাদ্ তরুণ বয়সেই প্রতিভার পরিচয় দিয়াছিলেন; সভাসদ্ বলেন যে, শিবাজী মৃত্যুকালে ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন যে মারাঠা জাতির সঙ্কট-কালে প্রহ্লাদই তাহাদিগকে আসন্ন বিনাশ হইতে রক্ষা করিবেন। এই ভবিষ্যদ্বাণী সার্থক হইয়াছিল। প্রহ্লাদ নিরাজী সত্যসত্যই রাজ-প্রতিনিধি ছিলেন। তাঁহার পদসৃষ্টি হইয়াছিল মারাঠা জাতির বিপদের দিনে, সেই বিপদ কাটিয়া গেলেও প্রতিনিধির পদ ও অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকিয়া গেল। কিন্তু ভটবংশের অভ্যুত্থানের সঙ্গে-সঙ্গে মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রকৃত নেতৃত্ব প্রতিনিধির হস্ত হইতে পেশবার হস্তে চলিয়া গেল।
বালাজী বিশ্বনাথ বুদ্ধি-কৌশলে পেশবার পদে স্বীয় বংশের স্থায়ী অধিকার স্থাপন করিয়াছিলেন; কিন্তু পেশাবাদিগের প্রাধান্য স্থায়িভাবে স্থাপিত হয় ভটবংশের দ্বিতীয় পেশবা রাজীরাওয়ের সময়। শাহুর রাজত্ব—কালে মারাঠা সাম্রাজ্যের উত্তরদিকে প্রভূত প্রসার হইয়াছিল, বাজীরাও ছিলেন উত্তর বিজয়ের নীতির পক্ষপাতী। আর তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিনিধি চাহিয়াছিলেন, দক্ষিণে কুমারিকা পর্য্যন্ত মারাঠা—শক্তি সুপ্রষ্ঠিত করিতে। সাম্রাজ্যবাদী বাজীরাওয়ের সঙ্গে প্রতিনিধির এই বিষয় লইয়া অনেক বাদ-প্রতিবাদ হয়, বাজীরাও বলেন যে ভারত-সাম্রাজ্যের মূল দিল্লীতে,—মূলে আঘাত করিলেই সাম্রাজ্য-তরু পত্র-পুষ্প শাখা-প্রশাখাসহ মারাঠার করতলগত হইবে। শাখা-প্রশাখা এক-একখানি করিয়া ছেদন করিবার প্রয়োজন হইবে না। রাজমণ্ডলের এক বিশেষ অধিবেশনে মারাঠা সাম্রাজ্যের পররাষ্ট্র-নীতির এই প্রশ্নের বিশেষ আলোচনার পরে বাজীরাওয়ের মত গৃহীত হয়। প্রতিনিধির নীতি প্রত্যাখ্যাত হইলে, তাঁহার ক্ষমতা ও প্রভাব একেবারে তিরোহিত হইল।
আর শিবাজীর বংশধরগণ সাতারা দুর্গে বন্দী হইলেন ঘটনা-চক্রে। ছত্রপতি শাহু মৃত্যুকালে এক সনন্দ দ্বারা ভটবংশের তৃতীয় পেশবা বালাজী বাজীরাওকে রাজ্যশাসন করিবার স্বাধীন ক্ষমতা দিয়া যান। কিন্তু ঐ সনন্দের সর্ত্ত অনুসারে পেশবাকে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র সম্বন্ধীয় সকল কার্য্যই ছত্রপতি মহারাজের নামে করিতে হইত। শাহুর নিজের কোন সন্তান ছিল না। তাঁহার নিকটতম আত্মীয় কোহলাপুরের রাজার সহিত তাহার মোটেই সম্প্রীতি ছিল না। কোহলাপুরের রাজাকে দত্তক—গ্রহণ করিলে ছত্রপতির অধিকার লইয়া বিবাদের অবসান হইত বটে, কিন্তু পেশবার প্রভাবও বোধ হয় অনেকটা ক্ষুণ্ণ হইত। এই অবস্থায় স্বার্থের খাতিরে রাজারামের বিধবা পত্নী তারাবাঈ ও পেশবা বালাজী বাজীরাও এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। তারাবাঈ পেশবার প্রাধান্যের মোটেই পক্ষপাতিনী ছিলেন না। কিন্তু তখনকার কোহলাপুরের রাজা তাঁহার সপত্নী-পুত্র। তেজস্বিনী তারাবাঈ চাহিতেন ক্ষমতা। স্বামী ও পুত্রের রাজত্ব কালে তিনিই প্রকৃত রাজক্ষমতার অধিকারিণী ছিলেন। তাঁহার পুত্রের মৃত্যুকালে পুত্রবধূ গর্ভবতী ছিলেন, সেই গর্ভের সন্তানের যে কি হইয়াছিল তাহা জানিবার উপায় ছিল না। কোহলাপুরের সাম্ভাজীর প্রতি শাহুর বিদ্বেষের কথা তারাবাঈ ও বালাজী উভয়েই অবগত ছিলেন। সাম্ভাজী শাহুর উত্তরাধিকারী বলিয়া গৃহীত হইলে তাঁহাদের উভয়েরই স্বার্থহানি;— তাই তারাবাঈ ও বালাজী বাজীরাও পরামর্শ করিয়া এতকাল পরে, তারাবাঈয়ের লুক্কায়িত পৌত্র দ্বিতীয় রাজারামকে তাহার অজ্ঞাতবাস হইতে বাহির করিলেন। শাহুর পরে রাজারাম সাতারার সিংহাসনে আরোহণ করিলেন বটে, কিন্তু, এই হইতে তাঁহার দুর্ভাগ্যের সূচনা হইল। তারাবাঈ চাহিতেন ক্ষমতা, পেশবারও লক্ষ্য তাহাই। কাযেই তাঁহাদের ঐক্য স্থায়ী হইবার সম্ভাবনা ছিল না। পেশবা দিগ্বিজয়ে বাহির হইলেই, তারাবাঈ তাঁহার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইলেন। বরোদার গাইকবার সসৈন্যে তারাবাঈর সহায়তা করিতে অগ্রসর হইলেন, কিন্তু শিবাজীর অযোগ্য বংশধর দ্বিতীয় রাজারাম পিতামহীর সঙ্গে যোগ দিতে সাহসী হইলেন না। নীচজাতির গৃহে প্রতিপালিত রাজারাম রাজনীতি বা প্রভুত্বের অনুরাগী ছিলেন না, তিনি চাহিতেন আরাম! কিন্তু এতদূর অগ্রসর হইয়া, এত সহজে পশ্চাৎপদ হইবার পাত্রী তারাবাঈ নহেন। তিনি রাজারামকে কারাগারে নিক্ষেপ করিয়া সাতারার সেনাগণের নেতৃত্ব গ্রহণ করিলেন। তার পর গাইকবারের পরাজয় হইল, তারাবাঈর সহিত সন্ধি হইল, পেশবার প্রভুত্ব পুনঃ-প্রতিষ্ঠিত হইল, কিন্তু রাজারাম যে বন্দী ছিলেন, সেই বন্দীই রহিয়া গেলেন।
এইরূপে ছত্রপতির অন্যতম মন্ত্রী পেশবা ছত্রপতির প্রভু হইয়া বসিলেন। এই প্রভুত্ব কিন্তু, এত নীরবে, এত সন্তর্পণে, এত ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল যে, তখনকার লোক বুঝিতেই পারে নাই যে তাহাদের চক্ষুর উপর এতবড় একটা রাজ-নৈতিক বিপ্লব ঘটিয়া যাইতেছে। ইংরেজ ঐতিহাসিক স্কট-ওয়ারিং লিখিয়াছেন—The usurpation of the Peshwas neither attracted observation nor excited surprise; indeed the transition was easy, natural and progressive. পেশবাদিগের প্রভুত্ব লাভ কাহারও দৃষ্টি আকর্ষণ বা বিস্ময়ের উদ্রেক করে নাই। এই পরিবর্ত্তন বাস্তবিকই সহজ, স্বাভাবিক ও ক্রমসম্পন্ন।
শাহুর রাজত্বকালেই পেশবাদিগের প্রভুত্বের সূত্রপাত, প্রতিষ্ঠা ও পূর্ণ-পরিণতি হইয়াছিল রলিয়া, কেহ-কেহ মনে করেন যে শাহু ভট পেশবাদিগের হস্তে ক্রীড়নক মাত্র ছিলেন, তিনি নামে মাত্র রাজা ছিলেন, প্রকৃত ক্ষমতা তাঁহার কিছুই ছিল না। কথাটা একেবারেই ঠিক নহে। মোগল অন্তঃপুরে প্রতিপালিত শাহুর নিকট তাঁহার পিতামহের সংযম ও কষ্টসহিষ্ণুতা বা তাঁহার অসংযত পিতার দর্দ্দমনীয় সাহস প্রত্যাশা করিতে পারি না। শিবাজীর শাসন-পটুতা ও রাজনৈতিক গুণের কিয়দংশ শাহু উত্তরাধিকার সূত্রে পাইয়াছিলেন। তাঁহার জীবিতকালে তিনি নামে এবং কার্য্যেও রাজ্য শাসন করিয়া গিয়াছেন। রাণাডে বলেন যে যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য পরিচালনা না করিলেও, শাহুই তাঁহার সেনানায়কগণকে অভিযানে পাঠাইতেন; আবার তাঁহারই আদেশে বিজয়ী মারাঠা সেনাপতিগণ দেশে ফিরিয়া আসিতেন। ডাভইর যুদ্ধের পর তাঁহারই চেষ্টায়, পেশবা গাইকবারের মধ্যে গুজরাট বিভাগ হয়। যখন বালাজী বাজীরাও রঘুজী ভোঁসলার প্রতি শত্রুতাপরবশ হইয়া বঙ্গদেশ আক্রমণ করিতে উদ্যত হন, তখন রঘুজী ছত্রপতি শাহুরই রাজশক্তির শরণ লইয়াছিলেন, আর বিজয়দৃপ্ত বালাজীকে শাহুর আদেশেই দক্ষিণে ফিরিয়া আসিতে হইয়াছিল। ইংলণ্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের মত শাহুর প্রতিও পরবর্ত্তী যুগের ঐতিহাসিকগণ বড় অবিচার করিয়াছেন।
কেন যে শাহু মহারাজ নিজের উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করিয়া পেশবাকে সকল ক্ষমতার অধিকারী করিয়া গেলেন, তাহা বলা কঠিন। কিন্তু কোহলাপুরের রাজা শম্ভুজী ছিলেন তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী। আর রাজারামের বংশধরেরাই যে তাঁহার সিংহাসনের পথে বাধা দিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন, তাহা ভুলিয়া যাওয়া সহজ ছিল না। নিজের সন্তান থাকিলে তিনি তাহার জন্য রাজকীয় তাবৎ ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখিতে যে পরিমাণে যত্নবান ও আগ্রহশীল হইতেন, খুল্লতাত বংশের জ্ঞাতি-শত্রুর জন্য তাঁহার ততটা যত্ন বা আগ্রহ হইবে কেন? পরিশেষে যাঁহাকে তিনি দত্তক গ্রহণ করিলেন, তিনিও রাজারামেরই বংশধর। তাঁহার জন্মকাহিনী, তাঁহার বাল্যের কথা রহস্যজাল-সমাবৃত। এমন কি শহুর জীবিত কালেই পেশবা ও তারাবাঈর বিপক্ষ—পক্ষ, খুব প্রকাশ্যে না হইলেও, দ্বিতীয় রাজারাম প্রথম রাজারামের পৌত্র কি না সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ করিত। কে বলিবে শাহুর চিত্তেও সে সন্দেহের উদয় হয় নাই। কুম্ভকার গৃহে প্রতিপালিত এই রাজকুমারটির বিরাট মারাঠাবাহিনীর পরিচালনার অথবা ভারতব্যাপী সাম্রাজ্যের শাসনদণ্ড গ্রহণের যোগ্যতা আছে কি না, সে বিষয়েও বৃদ্ধ শাহুর যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। কিন্তু পেশাবাগণকে তিনি ভাল করিয়াই জানিতেন। বালাজী বিশ্বনাথ হইতে বালাজী বাজীরাও পর্য্যন্ত তিন পুরুষকাল তাঁহারা বিশ্বস্তভাবে ছত্রপতি সরকারের সেবা করিয়াছেন। তাঁহাদেরই নায়কতায় মারাঠার দিগ্বিজয়ী বাহিনী উত্তর ভারত পর্য্যন্ত মারাঠার বিজয়-বৈজয়ন্তী উড়াইয়া আসিয়াছে। সুতরাং পেশবাগণের সুযোগ্য হস্তে রাজ্যভার ন্যস্ত করিলে, রাজ্যের যে কোন অনিষ্ট হইবে না এ বিষয়ে শাহুর কোন সন্দেহ ছিল না। অপর পক্ষে তাঁহার অজ্ঞাত বাল্য উত্তরাধিকারীর উপর ততখানি আস্থা স্থাপন করিবার ভরসা তাঁহার হয় নাই। বোধ করি এই কারণেই, দীর্ঘকাল বিশ্বস্ত সেবার পুরস্কার স্বরূপ তিনি ভট পেশবাগণের হাতে সকল ক্ষমতা প্রদান করিয়াছিলেন। ইহার ফলে শিবাঙ্গীর বংশধরগণ যেমন একদিকে সকল ক্ষমতা হইতে বঞ্চিত হইয়াছিলেন, তেমনই অপরদিকে আবার মারাঠা সাম্রাজ্যের স্থিতিকাল পর্য্যন্ত তাঁহারা ঐ সাম্রাজ্যের অধীশ্বরের প্রাপ্য সম্মান হইতে বঞ্চিত হন নাই। যদি শাহুর সনদের বলে পেশবাগণ মারাঠা জাতির নেতৃত্ব গ্রহণ না করিতেন, তাহা হইলেও শিবাজীর অযোগ্য বংশধরগণ বেশী দিন সাম্রাজ্য ভোগ করিতে পারিতেন না। শাহুর বন্দোবস্তে মোটের উপর যে তাঁহাদের কেবল লোকসানই হইয়াছে, এমন কথা বলা চলে না। জাপানের ইতিহাসেও আমরা ঠিক এই রকমের একটা দৃষ্টান্ত পাই। মিকাডোর সহিত ছত্রপতির এবং শোগুণের সহিত পেশবার তুলনা করা যাইতে পারে। যদি মিকাডোগণ শোগুণের ক্রীড়নক মাত্র থাকিতে নারাজ হইতেন, তবে বোধ হয় প্রাকৃতিক নির্ব্বাচনে, জীবন মরণের সংগ্রামে, তাঁহারা টিকিয়া থাকিতে পারিতেন না।
এইখানে আর একটা কথা বলিয়া রাখা আবশ্যক মনে করি। ছত্রপতি মহারাজ যে কেবল রাজ্যের শাসনকর্ত্তা ছিলেন তাহা নহে, ধর্ম্ম সম্বন্ধীয় ও সামাজিক সকল প্রকার প্রশ্নের মীমাংসা করিবার একমাত্র অধিকারীও ছিলেন। পরে পেশরাগণও এই অধিকার অনুসারে বহু সামাজিক বাদবিতণ্ডার মীমাংসা করিয়াছেন। কিন্তু পেশবাগণ ব্রাহ্মণ ছিলেন বলিয়া, আপাত—দৃষ্টিতে মনে হইতে পারে যে, এই অধিকারটি তাঁহাদের জন্মগত ব্রাহ্মণ্য-লব্ধ। কিন্তু বাস্তবিক মারাঠা দেশে একটা নব হিন্দুভাবের আবির্ভাব হইয়াছিল। এই ভাবের প্রবর্ত্তকদিগের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন অব্রাহ্মণ[১]। এই নব হিন্দু ভাবের অন্যতম প্রচারক রামদাস ছিলেন শিবাজীর গুরু ও হিতাকাঙ্ক্ষী। শিবাজী নিজেও তখনকার উদার ভাবের ভাবুক ছিলেন, সাম্প্রদায়িকতা বা গোঁড়ামি তাঁহাতে ছিল না। এই উদার নরপতি হিন্দু শাস্ত্রের নির্দ্দেশ অনুসারে সমাজেরও নেতা হইলেন। তাঁহার “গোব্রাহ্মণ-প্রতিপালক” উপাধি ইংলণ্ডরাজের “Defender of the Faith” উপাধির অনুরূপ। তবে য়ুরোপে যেমন রাষ্ট্র ও সংঘের (State এবং Church) বিরোধ হইয়াছে, এদেশে কখনও তাহা হয় নাই; কারণ প্রাচীন অথবা আধুনিক সকল হিন্দু রাজ্যেই রাজা সংঘের উপরও কতকটা কর্ত্তৃত্ব করিয়া আসিয়াছেন। ধর্ম্ম সম্বন্ধীয় ও সামাজিক প্রশ্নের মীমাংসা শিবাজী একজন শাস্ত্রবিদ্ ব্রাহ্মণ কর্ম্মচারীর (পণ্ডিতরাও) পরামর্শ লইয়া করিতেন। রাজার অনুমোদন ব্যতিরেকে কি ধর্ম্ম সম্বন্ধীয় কি সামাজিক কোন বিষয়েই কোন ব্যবস্থা দিবার অধিকার ছিল না। পণ্ডিতপ্রবর বিশ্বনাথ কাশিনাথ রাজবাড়ে তাঁহার মারাঠ্যাঁচে ইতিহাসাঁচা সাধনেঁ নামক গ্রন্থের অষ্টম খণ্ডে সাম্ভাজীর রাজত্ব কালের একটি ঘটনা বিবৃত করিয়াছেন, যাহার উল্লেখ এই প্রসঙ্গে অসমীচীন হইবে না। গঙ্গাধর রঘুনাথ কুলকর্ণী নামক এক ব্রাহ্মণ মুসলমান হস্তে বন্দী হন। বন্দী অবস্থায় নিরুপায় হইয়া ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিনি মুসলমান ধর্ম্মে দীক্ষিত হন। তারপর অবস্থা বিপাকে মুসলমানের অন্ন ব্যবহারও তাঁহাকে করিতে হইয়াছিল। বৎসরাধিক অনিচ্ছাকৃত মুসলমান সংসর্গের পর গঙ্গাধর সুযোগ পাইয়া পলায়ন করিয়া দেশে আসিলেন, এবং জাতিতে উঠিবার জন্য আবেদন করিলেন। শাস্ত্রবিদ্ ব্রাহ্মণেরা তাঁহার আবেদনের সপক্ষে মত প্রকাশ করিলে, ছন্দোগ্যামাত্য এই ঘটনা সাম্ভাজী মহারাজের গোচর করিলেন। তিনি গঙ্গাধরের প্রতি কৃপাপরবশ হইয়া, প্রায়শ্চিত্ত করিয়া জাতে উঠিতে অনুমতি দিলেন। এই প্রায়শ্চিত্তের বিধান করিলেন অব্রাহ্মণ রাজা, ব্রাহ্মণ ছন্দোগ্যামাত্য নহেন। ভারত-ইতিহাস-সংশোধক-মণ্ডলের সংগৃহীত একখানি দলিল হইতে জানা যায় যে, ছত্রপতি মহারাজের অন্যতম সামন্ত ক্ষত্রিয় আংগ্রিয়াগণও সামাজিক ব্যাপারের মীমাংসা করিবার অধিকার পরিচালনা করিতেন। অনেক সময় তাঁহারা এই সকল ব্যাপারে ব্রাহ্মণদিগের উপর হুকুমজারী করিতেন, তাঁহাদিগের শাস্ত্রার্থ ব্যাখ্যার অপেক্ষা করিতেন না। সুতরাং এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যাইতে পারে যে, ব্রাহ্মণ পেশবাগণ অব্রাহ্মণ শাহুর সনদের বলেই মহারাষ্ট্রের তাবৎ সামাজিক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করিবার অধিকার লাভ করিয়াছিলেন।
পেশবাদিগের অভ্যুত্থানের ফলে, মারাঠা ইতিহাসের ধারা দুই প্রকারে পরিবর্ত্তিত হইয়াছিল। এই সময় হইতে রাষ্ট্রের ঐক্য যে ক্ষুণ্ণ হইয়াছিল, মারাঠা সাম্রাজ্যের পতন তাহার অন্যতম ফল। আর এই সময় হইতেই মারাঠাদিগের ভিতর দুই শ্রেণীর অভিজাত সৃষ্টি হইল। প্রথম কথাটা বুঝিতে হইলে মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শিবাজীর নীতির একটু আলোচনা করা দরকার। শিবাজীর সর্ব্বাপেক্ষা সুমহান কীর্ত্তি বোধ হয় এই যে, তিনি যখন মহারাষ্ট্রে জাতীয় ভাবের উদ্বোধন করেন, তখন ভারতবর্ষে কেন য়ুরোপেও জাতীয় ভাবের উম্মেষ ভাল করিয়া হয় নাই। ফরাসী বিপ্লবের যুগে বিপুল রক্ত—প্লাবনে ফরাসী দেশে ও পশ্চিমের অন্যান্য দেশে জাতীয়তার বীজ উপ্ত হইয়াছিল। তাহার বহু পূর্ব্বেই গুরু রামদাস ও শিষ্য শিবাজী জাতীয় ভাবের বিরাট শক্তি উপলব্ধি করিয়াছিলেন। কিন্তু সে কাল জাতীয় ভাবের আদৌ উপযোগী ছিল না, তাই শিবাজী ও রামদাসের সাধনায়ও তখনকার মহারাষ্ট্রে জাতীয় ভাব সম্যক্ স্ফূর্ত্তি লাভ করিতে পারে নাই। মহারাষ্ট্র-চরিত্রের যে প্রধান ত্রুটি জাতীয়তার অন্তরায়, তাহা শিবাজীর শ্যেনদৃষ্টি অতিক্রম করিতে পারে নাই। তিনি বুঝিতে পারিয়াছিলেন যত দিন মহারাষ্ট্রের জায়গীরদার কেবল আপনার ব্যক্তিগত সম্মান, ব্যক্তিগত স্বার্থ অথবা জায়গীরের কথা ভাবিবে, ততদিন মহারাষ্ট্রে জাতীয় ঐক্য সংস্থাপন অসম্ভব। মারাঠা জায়গীরদারগণ দেশের কথা ভাবিত না, তাহারা ভাবিত নিজ নিজ জায়গীর-জমিদারীর কথা। যে কোন উপায়ে পৈতৃক সম্পত্তি, বংশানুগত অধিকার রক্ষা করিতে পারিলেই তাঁহাদের হইল। শিবাজী এই জন্য জায়গীরপ্রথার যথা-সাধ্য বিলোপসাধনের চেষ্টা করিয়াছিলেন। এবং তাহার উদ্যোগ কিয়ৎ পরিমাণে সফলও হইয়াছিল। নূতন জায়গীর তাঁহার আমলে কাহাকেও বড় দেওয়া হইত না। রাজস্ব আদায় করিত রাজকর্ম্মচারিগণ, রাজস্ব তিনি ইজারা দিতেন না। কিন্তু সকল সময় প্রাচীন জায়গীরদারের জায়গীর কাড়িয়া লওয়া তিনি সমীচীন বোধ করেন নাই। শিবাজীর জ্যেষ্ঠ পুত্র সাম্ভাজী নিজের বিলাস—ব্যসন লইয়াই ব্যস্ত ছিলেন, রাজ্যশাসনের ধার তিনি বড় একটা ধারিতেন না। কনিষ্ঠ পুত্র রাজারাম পিতার অনুসৃত নীতির উপযোগিতা উপলব্ধি করিয়াছিলেন, কিন্তু প্রতিকূল ঘটনা—প্রবাহের তাড়নায়, তাঁহাকেই জায়গীর-প্রথার পুনরায় প্রচলন করিতে হইল। সমগ্র দেশ যখন শত্রু করতলে, তখন বহু দুঃসাহসী মারাঠা শিলেদার জায়গীরের লোভে রাজ্য-জয়ে বাহির হইয়াছিলেন। তিনি অনন্যোপায় হইয়া এই জায়গীর-লোলুপ সৈনিকগণের প্রার্থনা পূর্ণ করিলেন। তখনও কিন্তু ছত্রপতির জায়গীরদার ভৃত্যগণ স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষা করে নাই, কিন্তু পেশবার অভ্যুত্থানের পরে, সকল পরাক্রমশালী জায়গীরদারই ভটপরিবারের দৃষ্টান্ত অনুকরণ করিতে প্রয়াসী হইলেন। আংগ্রিয়া, ভোঁস্লা গাইকাবার, সকলেরই একমাত্র কামনার বিষয় হইয়া দাড়াইল, স্বাধীন রাজত্ব। ইহার ফলে মারাঠা সাম্রাজ্যও য়ুরোপের “পবিত্র রোমক সাম্রাজ্যের” মত (Holy Roman Empire) জায়গীরের সমষ্টি মাত্রে পরিণত হইল। এবং ইহার অন্তিম ফল হইল পেশবারই ক্ষমতা হ্রাস।
পেশবাদিগের অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় অনিবার্য্য ফল অভিজাত সম্প্রদায়ে দুইটি শ্রেণীর উদ্ভব। প্রাচীন অভিজাতবর্গের অধিকাংশ রাজমণ্ডলের সদস্য; সুতরাং সর্ব্বপ্রকারে পেশবার সমকক্ষ। তাঁহারা পেশবার আদেশ পালন করিতেন— তিনি ছত্রপতি মহারাজের প্রতিনিধি বলিয়া। আর নবীন অভিজাত সম্প্রদায় সকলেই পেশবার কর্ম্মচারী আজ্ঞাবাহী ভৃত্যমাত্র; যেমন সিন্ধিয়া, হোলকর, বুন্দেলে, পটবর্দ্ধন, বিষ্ণুরকর, ফডকে, ভিডে, রাষ্টিয়া প্রভৃতি। তাঁহারা পেশবাকে অন্নদাতা প্রভু বলিয়া সম্মান করিতেন, তাঁহার সেবা করিতে তাঁহারা ধর্ম্মতঃ বাধ্য ছিলেন। নানা ফডনবীস যখন তাঁহার আত্ম-জীবনীতে লিখিয়াছেন, “তাঁহার অন্ন বহুদিন খাইয়াছি, তিনি আমাদিগকে পুত্রবৎ কৃপা করিয়াছেন, এ শরীর তাঁহারই অন্নের” (বহুত দিবস অন্ন ভক্ষিলে, কৃপা পুত্রবত কেলী, ত্যাঁচেঁ অন্নাচে শরীর—কাশিনাথ নারায়ণ সানে সম্পাদিত পত্রে যাদী বগৈরে দেখুন) তখন তিনি এই দ্বিতীয় শ্রেণীর অভিজাতবর্গের মনোভাবেরই প্রতিধ্বনি করিয়াছিলেন। এই সকল সর্দ্দার প্রথম প্রথম পেশবার আদেশ অকুণ্ঠিত চিত্তে প্রতিপালন করিত। কিন্তু প্রাচীন অভিজাতগণ মনে করিতেন যে, পেশবাকে তাঁহারা যেটুকু সম্মান করেন, তাহা কেবল শিষ্টাচারের খাতিরে। ঠিক ঐ কারণেই তাঁহারাও পেশবার নিকট হইতে অনুরূপ ভদ্র ব্যবহার প্রত্যাশা করিতে পারেন। মারাঠা নৌবাহিনীর অধিনায়ক আংগ্রিয়া যখন পুণায় আসিতেন, তখন পেশবা তাঁহার অভ্যর্থনার জন্য নগর হইতে দুই মাইল অগ্রসর হইতেন। অতিথির দর্শনমাত্র অশ্ব হইতে অবতরণ করিয়া তাঁহাকে সম্ভাষণ করিতেন। তারপর অতিথির সঙ্গে সঙ্গে স্বীয় আবাসগৃহে আসিয়া একই গালিচায় বসিতেন। বলা বাহুল্য যে, আংগ্রিয়া দরবারে আসিলে পেশবা দাঁড়াইয়া তাঁহার অভ্যর্থনা করিতেন। পথে চলিবার সময় তাঁহার বামে চলিতেন[২]। যাধবরাও পুণায় আসিলে তিনিও পেশবার নিকট হইতে এইরূপ অভ্যর্থনা ও সম্মান লাভ করিতেন। অধিকন্তু তাঁহার সম্মানার্থ বহু বন্দীকে কারামুক্ত করা হইত[৩]। পেশবার গৃহে বা দরবারেই যে কেবল এই দুই শ্রেণীর অভিজাতের মধ্যে সমাদর ও সম্মানের তারতম্য ও পার্থক্য হইত তাহা নহে; প্রাচীন সর্দ্দারেরা নবীন সর্দ্দারদিগের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্ব সর্বত্রই দাবী করিতেন। কোন যুদ্ধক্ষেত্রে যদি প্রতিনিধির মত হীনবল প্রাচীন সর্দ্দারও উপস্থিত থাকিতেন, তাহা হইলেও সিন্ধিয়া, হোল্কর প্রভৃতির ন্যায় পরাক্রমশালী আধুনিক সর্দ্দারকে প্রধান সেনাপতির সম্মান তাঁহাকে ছাড়িয়া দিতে হইত। প্রাচীন সর্দ্দারেরা এই সকল সম্মানে তাঁহাদের আইনসঙ্গত অধিকার আছে বলিয়া দাবী করিতেন।
পেশবা-যুগে কি প্রাচীন কি আধুনিক সকল শ্রেণীর সর্দ্দারই স্বীয় জায়গীরের মধ্যে স্বাধীন রাজ-ক্ষমতা পরিচালন করিতেন। পেশরাগণ সিন্ধিয়া, হোলকর, গাইকবর প্রভৃতি উচ্চ শ্রেণীর সর্দ্দারেরও দেওয়ান প্রভৃতি প্রধান প্রধান কর্ম্মচারী নিয়োগ করিয়া দিতেন বটে, কিন্তু তাহাতেও তাঁহাদের স্বাধীন ক্ষমত। বেশী ক্ষুণ্ণ হইত না। ইংরেজ সরকারের ইনাম কমিশন যখন মহারাষ্ট্রের সকল শ্রেণীর সর্দ্দারের সম্পত্তি ও বিবিধ প্রকারের অধিকার সম্বন্ধে তদন্ত করিয়াছিলেন, তখন যাধব রাও তাঁহাদিগকে লিখিয়াছিলেন, “আমাদের বসতি-স্থান, মালেগাঁওএর সর্ব্বপ্রকার শাসন আমরাই করিয়। আসিতেছি। ইহার উপর সরকারের কোন হাত নাই।” (রহন্যাচা গাঁব মালেগাঁব, ত্যাচী বহিবাট মুখত্যারীনে আমচে আহ্মী করত আহো ত্যঁতে সরকারচী দখলগিরী কাহীঁ এক নাহীঁ—পারসনীস ও মাবজী সম্পাদিত কৈফিয়ৎ যাদী)। সুপে-নিবাসী পবার বংশও নিজেদের জায়গীরের ভিতর অপ্রতিহত প্রভুত্ব করিতেন, পেশবাগণ তাহাতে কোন দিন হস্তক্ষেপ করেন নাই। (পারসনীসও মাবজী সম্পাদিত কৈফিয়ৎ যাদী)। ইহার অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যাইতে পারিত, কিন্তু দুইটিই বোধ হয় যথেষ্ট।
এই সকল জায়গীরদারেরা ছিলেন য়ুরোপের মধ্যযুগের বেরণদিগের মত ছোট-ছোট রাজা। একেবারে স্বাধীন না হইলেও আপনাদের প্রজাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্ত্তা, জীবনমরণের বিধাতা। তাঁহাদিগের শাসন মোটের উপর স্বেচ্ছাতন্ত্রেরই অনুরূপ ছিল। কিন্তু যে সকল গ্রামের উপর তাঁহারা প্রভুত্ব করিতেন, সেগুলির শাসন-পদ্ধতি সম্পূর্ণ অন্য ধরণের। মহারাষ্ট্রের প্রাচীর-ঘেরা ছোট-ছোট গ্রামগুলি ছিল ছোট একএকটি রাজ্য,—আর এই সকল রাষ্ট্রখণ্ডের মধ্যে স্বেচ্ছাতন্ত্রের কোন স্থান ছিল না। এই গ্রাম্য সমাজগুলির শাসনে যে সাম্যবাদের প্রভাব দেখিতে পাই, জগতের আর কোথাও তাহার তুলনা পাওয়া যায় না। সেই অজ্ঞাত আদিম যুগে যখন এই গ্রামগুলির প্রথম পত্তন হইয়াছিল, সেই সময় হইতে ব্রিটিশ শাসনের প্রারম্ভ পর্য্যন্ত মহারাষ্ট্রের গ্রামগুলিতে প্রজাতন্ত্র ব্যতীত অপর কোন শাসনতন্ত্রের প্রচলন হয় নাই।
মারাঠা-পল্লীর শাসন-কথা অন্যত্র আলোচনা করা যাইরে। এখানে আমরা মোটামুটি ভাবে সমগ্র মারাঠাসাম্রাজ্যের শাসনতন্ত্রের আকার প্রকার বুঝিয়া লইতে চেষ্টা করিব। মারাঠাসাম্রাজ্যের নায়ক পেশবা, কারণ তিনি সাতারার ছত্রপতি মহারাজের প্রতিনিধি। সে হিসাবে পেশবা সামরিক জায়গীরদার (Feudal Barons) বা সর্দ্দারগণের প্রভু; আবার অন্য হিসাবে তিনি তাঁহাদেরই একজন। এই সকল জায়গীরদার যুদ্ধ-বিগ্রহের সময়ে সৈন্য লইয়া পেশবার সাহায্য করিতেন; এবং তাহার বিনিময়ে জায়গীর বা “সরঞ্জাম” ভোগ করিতেন। নিজ-নিজ জায়গীয়ের মধ্যে তাঁহাদের অপ্রতিহত প্রভুত্ব ছিল;কিন্তু যে গ্রামগুলির উপর তাঁহারা প্রভুত্ব পরিচালন করিতেন, তথায় আদিমকাল হইতে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। গ্রাম্য প্রজাতন্ত্রের কর্ম্মচারীরা জায়গীরদারের কর্ম্মচারীদের তত্ত্বাবধান কার্য্য করিতেন বটে, কিন্তু তাঁহাদিগকে বহাল বা বরতরফ করিবার ক্ষমতা জায়গীরদার ত দূরের কথা, পেশবারও ছিল না। সুতরাং মারাঠাসাম্রাজ্যের শাসন-তন্ত্রে রাজতন্ত্র, স্বেচ্ছাতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র প্রভৃতির অদ্ভুত সমাবেশ দেখিতে পাই। পাশ্চাত্য রাষ্ট্র বিজ্ঞানের কোন একটি সংজ্ঞা দ্বারাই ইহার স্বরূপ প্রকাশ করা যায় না। ইহাকে রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র অথবা অভিজাততন্ত্র বলিতে অক্ষম হইয়া ইংরেজ লেখক টোন (W. H. Tone) ইহার নাম দিয়াছেন সামরিকগণতন্ত্র (Military Republic); কিন্তু সামরিকগণতন্ত্র বলিলেও ইহার স্বরূপ বর্ণনা করা হয় না। সত্য বটে, মারাঠা—সাম্রাজ্যে অতি সাধারণ সৈনিকেরও প্রতিভা বলে প্রথম শ্রেণীর জায়গীরদারের উচ্চ সম্মান লাভ করা অসম্ভব ছিল না; কিন্তু তাহা জটিল মারাঠা শাসনতন্ত্রের একটি প্রকৃতি মাত্র। একটি প্রকৃতির বর্ণনায় সমগ্রের প্রকাশ কেমন করিয়া হইবে? মারাঠা সাম্রাজ্যে বা রাজ্য-সংঘের ভিত্তি আবার পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বিতার উপর প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল,—জাতীয় ঐক্যের উপর নহে। পেশবাগণ শিবাজীর জাতীয় আদর্শ হইতে ভ্রষ্ট হইয়াছিলেন। তাই যখন মারাঠা সাম্রাজ্যের সহিত নবীন জাতীয় ভাবে অনুপ্রাণিত ইংরেজের সংঘর্ষ হইল, তখন মারাঠা সাম্রাজ্য জীর্ণ অট্টালিকার মত অল্প আঘাতেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া গেল।
- ↑ Ranade, Rise of the Maratha Power, vol. 1 দেখুন।
- ↑ পারসনীস ও মাবজী সম্পাদিত কৈফিয়ৎবাদী দেখুন।
- ↑ “শ্রীমন্ত নানা সাহেব পেশবা (বালাজী বাজীরাও) পিলাজী যাধবরাওকে কাকা বলিয়া ডাকিতেন। তিনি সরকার বাড়িতে গেলে তাঁহার সম্মানার্থ সরকারী বন্দীখানা হইতে কয়েদী যুক্ত করা হইত।” পারসনীস মাবজী সম্পাদিত কৈফিয়ৎ বাদী দেখুন।