পোকা-মাকড়/চতুর্থ শাখার প্রাণী/স্নায়ুমণ্ডলী

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


স্নায়ুমণ্ডলী

 প্রাণীদের মৃতদেহ কাটিয়া পরীক্ষা করিলে, তাহার সকল অংশে খুব সরু সূতার জালের মত একটি জিনিষ দেখা যায়। বড় বড় প্রাণীদেরও শরীর এই সূতার জালে আচ্ছন্ন থাকে। এই জালকে স্নায়ুমণ্ডলী বলে। চোখ দিয়া আমরা দেখি, কান দিয়া আমরা শুনি, নাক দিয়া আমরা গন্ধ পাই, জিভ দিয়া স্বাদ পাই, গায়ে চিম্‌টি কাটিলে বেদনা পাই—এই সকল বোধ স্নায়ুমণ্ডলীই উৎপন্ন করে। বড় প্রাণীদের মাথার ভিতরে যে মগজ অর্থাৎ মস্তিষ্ক আছে, শরীরের সকল স্নায়ুই সেই মস্তিষ্কের সঙ্গে যুক্ত থাকে। শরীরের কোনো অংশে কোনো রকমে আঘাত লাগিলে সেই আঘাতের উত্তেজনা স্নায়ুর সূতা বহিয়া মস্তিষ্কে পৌঁছে এবং ইহাতে সেই আঘাত প্রাণীরা বুঝিতে পারে।

 মনে কর, তোমার পায়ের এক জায়গায় আস্তে চিম্‌টি কাটা গেল এবং ইহাতে একটু বেদনা বোধ করিলে। কি রকমে এই বেদনার সৃষ্টি হইল, তাহা খোঁজ করিলে দেখা যায়—চিম্‌টির আঘাত পাইলেই আহত জায়গার স্নায়ুগুলি উত্তেজিত হইয়া উঠে এবং আঘাতের উত্তেজনাটা মস্তিষ্কে বহিয়া লইয়া যায়। তার পরে মস্তিষ্কই তোমাকে চিম্‌টির বেদনা জানাইয়া দেয়। কেবল চিম্‌টির বেদনা বহন করা স্নায়ুর কাজ নয়। ভালো রসগোল্লা খাইলে তোমরা যে সুস্বাদ পাও, নাকের কাছে ফুল বা অপর জিনিস রাখিলে যে গন্ধ পাও, গায়ে হাত বুলাইলে যে আরাম পাও, ছেলেরা চীৎকার করিলে যে শব্দ শুনিতে পাও,—তাহাদের প্রত্যেকটি স্নায়ুই তোমাদের জানাইয়া দেয়। স্নায়ুর সূতাগুলি যেন টেলিগ্রাফের তার। এগুলি ঠিক টেলিগ্রাফের তারের মতই শরীরের এক জায়গার খবর আর এক জায়গায় বহিয়া লইয়া যায়। তার ছিঁড়িলে টেলিগ্রাফের খবর চলে না, সেই রকম স্নায়ুমণ্ডলী কোনো প্রকারে খারাপ হইয়া গেলে, মস্তিষ্কে খবর যায় না। পা চাপিয়া অনেকক্ষণ এক জায়গায় বসিয়া থাকিলে, পায়ে ঝিঁ ঝিঁ ধরে। তখন পা-খানা যেন অসাড় হইয়া পড়ে, পায়ে জোরে চিম্‌টি কাটিলে ব্যথা লাগে না; পায়ে হাত বুলাইয়া দিলেও সাড়া পাওয়া যায় না। পায়ের স্নায়ু কিছুকালের জন্য বিগ্‌ড়াইয়া যায় বলিয়াই এই সকল ব্যাপার হয়। এই অবস্থায় পায়ের স্নায়ু চিম্‌টির উত্তেজনা বা হাতের স্পর্শ মস্তিষ্কে বহিয়া আনিতে পারে না; কাজেই তখন আমরা চিম্‌টীর বেদনা বা হাতের স্পর্শ জানিতে পারি না। পক্ষাঘাত প্রভৃতি অনেক রোগে শরীরের স্নায়ু বিগ্‌ড়াইয়া যায়, তখন গায়ে হাত দিলে বা চিম্‌টি কাটিলে রোগীর কিছুই বুঝিতে পারে না।

 কেবল এইগুলিই যে স্নায়ুর কাজ তাহা নয়। তোমার স্মৃতিশক্তি, তোমার স্নেহভক্তি দয়ামমতা, সকলি স্নায়ুমণ্ডলী তোমার মনে জাগাইয়া রাখে। তুমি কোনো খারাপ লোককে দেখিলে যে ঘৃণা কর, ভালো কথা শুনিলে যে আনন্দ পাও, অন্ধকারে সাপ বা বিছে দেখিলে যে ভয় পাও,—তাহাও স্নায়ুর কাজ।

 মনে কর, তোমার মুখের উপরে একটী মাছি বসিয়া মনের আনন্দে একবার নাকের ডগায়, একবার ওষ্ঠের উপরে এবং একবার চোখের পাতায় বেড়াইতেছে। এই অবস্থায় তুমি কি হাত গুটাইয়া চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতে পার? কখনই পার না। তোমার হাত আপনা হইতে মাছির কাছে যায় এবং তুমি হাত দিয়া তাহাকে তাড়াইয়া দাও। ইহাও স্নায়ুর আর এক রকম কাজ। মাছির উৎপাতের খবর, মুখের স্নায়ুজাল মস্তিষ্কে বহিয়া লইয়া যায়। তার পরে মস্তিষ্ক সেই খবর আর এক রকম স্নায়ু দিয়া হাতের পেশীর উপরে চালান করে। হাতের পেশী মস্তিষ্কের হুকুম অমান্য করিতে পারে না; কাজেই সব কাজ ফেলিয়া সে মাছি তাড়াইতে আরম্ভ করে।

 কোনো দুর্গন্ধ পাইলে তোমরা নাকে কাপড় দাও। এখানেও স্নায়ুর কাজ দেখিতে পাওয়া যায়। খারাপ গন্ধ প্রথমে নাকের স্নায়ু উত্তেজিত করে এবং স্নায়ু সেই উত্তেজনা মস্তিষ্কে বহিয়া লইয়া যায়। কিন্তু মস্তিস্ক এই খবর পাইয়া নিশ্চিন্ত থাকিতে পারে না; সে নাকে কাপড় গুঁজিবার জন্য নিকটের এক প্রকার স্নায়ুকে হুকুম করে। এই হুকুম হাতের মাংসপেশীতে পৌঁছিলে, তুমি নাকে কাপড় গুঁজিতে আরম্ভ কর। মজার গল্প শুনিলে আমরা হাসিয়া গড়াগড়ি দিই; হাতে আগুন ঠেকিলে হাতখানা সরাইয়া লই। আমাদের এই রকম সকল কাজই শরীরের দুই রকম স্নায়ু এবং মস্তিষ্কের সাহায্যে চলে।

 যাহা হউক স্নায়ুসম্বন্ধে আমরা এ-পর্য্যন্ত যে-সকল কথা বলিলাম, তাহা হইতে বোধ হয় তোমরা বুঝিতে পারিতেছ,—স্নায়ুই প্রাণীকে সজাগ ও বুদ্ধিমান্ করে। আমিবা, স্পঞ্জ্ বা প্রবাল-প্রাণীর দেহে স্নায়ু নাই, এইজন্য, তাহারা জড়ের মত পড়িয়া থাকে; যদি খাবার কাছে আসে তবেই খায়, নচেৎ ক্ষুধায় মরিয়া যায়। গায়ের কোনো অংশ কাটিয়া ফেলিলেও তাহারা সাড়া দেয় না। কিন্তু যে তারা-মাছদের কথা বলিয়াছি, তাহারা এই-রকম নয়। ইহাদের গায়ের চামড়ার নীচে অল্প পরিমাণে স্নায়ু দেখা যায়; তাই বড় বড় প্রাণীর মত ইহারা চলা-ফেরা করিতে পারে এবং নিজের বিপদ-আপদ বুঝিতে পারে।

 তারা-মাছদের মত আরো কয়েক জাতির প্রাণী চতুর্থ শাখায় আছে। ইহাদের মধ্যে কাহারো দেহ গোলাকার, তাহা খোলা ও কাঁটা দিয়া ঢাকা থাকে, কেছ লম্বা দেহ লইয়া গুঁড়ি মারিয়া জলের তলায় চলে। ইহাদের সকলেরি শরীরের কাজ তারা-মাছদের মতই দেখা যায়। কিন্তু সমুদ্রের তলায় খোঁজ না করিলে এই সকল প্রাণীর সন্ধান মেলে না। তোমাদের মধ্যে হয় ত অনেকেই সমুদ্র দেখ নাই, কাজের এই সকল প্রাণীর কোনো কথা তোমাদিগকে বলিব না। যদি কখনো কলিকাতায় যাদুঘর দেখিতে যাও, তাহা হইলে সেখানে বোতলের ভিতরে তারা-মাছ এবং এই শাখার অন্য প্রাণীদিগের আকৃতি দেখিতে পাইবে। সেখানে এই রকম আরো অনেক মরা-প্রাণীর দেহ বোতলের ভিতরে আারক দিয়া রাখা হইয়াছে এবং বোতলের পাশে সেই সকল প্রাণীর ভালো ছবিও আছে।