প্রবাসী/ষট্‌ত্রিংশ ভাগ/প্রথম খণ্ড/পাল-সাম্রাজ্যের শাসন-প্রণালী

উইকিসংকলন থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান



 

পাল-সাম্রাজ্যের শাসন-প্রণালী

ডক্টর শ্রীরাধাগোবিন্দ বসাক, এম-এ, পিএইচ-ডি

পাল-বংশের প্রথম নরপাল গোপালদেব প্রকৃতিপুঞ্জকে মাৎস্য-ন্যায় বা অরাজকতার সর্ব্বনাশকারী উপদ্রব হইতে রক্ষা করিবার সামর্থ্য ধারণ করিতেন বলিয়া তাহাদের দ্বারা রাজপদে নির্ব্বাচিত হইয়া সমগ্র উত্তরাপথের পূর্ব্বাঞ্চলে অষ্টম শতাব্দীর প্রথমার্দ্ধে সাম্রাজ্য-প্রতিষ্ঠার ভিত্তিপত্তন করিতে পারিয়াছিলেন। এই সাম্রাজ্য অপ্রতিহতভাবে অনেক বৎসর চলিতে থাকিয়া মধ্যে মধ্যে ভাগ্যপরিবর্ত্তন দর্শন করিয়াছিল। পুনরায় ইহা পূর্ব্ব-সমৃদ্ধি লাভ করিয়া প্রায় দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথম পাদ পর্য্যন্ত একরূপ অক্ষুণ্ণ রহিয়াছিল। এই পাল-বংশের রাজত্ব-সময়ে নরপালেরা কিরূপ প্রণালী অবলম্বন করিয়া রাজ্যশাসন করিতেন, তাঁহাদের এ-যাবৎ আবিষ্কৃত তাম্রশাসন হইতে সংগৃহীত উপাদান অবলম্বন করিয়াই আমি তাহা বুঝাইতে চেষ্টা করিব। অতি সংক্ষেপে এই স্থানেই পাল-রাজগণের পৌর্ব্বাপর্য্য একটু জানিয়া লওয়া উচিত। পাল-সাম্রাজ্যের যুগকে নিম্নলিখিত ভাবে বিভক্ত মনে করা যাইতে পারে। এই বংশের প্রথম রাজা প্রথম-গোপাল, তংপুত্র প্রবলপরাক্রান্ত ধর্ম্মপাল ও তৎপুত্র দেবপাল ও তৎপুত্র প্রথম-বিগ্রহপাল এবং তাঁহার পুত্র নারায়ণপাল—এই পঞ্চ ভূপালের যুগকে এই সাম্রাজ্যের প্রথম সমৃদ্ধির যুগ বলিয়া ধরা যাইতে পারে। তৎপর নারায়ণপালের পুত্র রাজ্যপাল, তৎপুত্র দ্বিতীয়-গোপাল ও তংপুত্র দ্বিতীয়-বিগ্রহপালের যুগকে একটি বিপ্লবের যুগ বলিয়া মনে করা যায়—কারণ, এই সময়েই অনধিকারী কাম্বোজ-বংশীয় কোন নরপতি পাল-রাজগণের রাজ্য আক্রমণ করিয়া গৌড়দেশে অনেক অনর্থ উৎপাদন করেন। ইহার পরযুগেই দ্বিতীয়-বিগ্রহপালের উপযুক্ত পুত্র ইতিহাস-বিখ্যাত প্রথম-মহীপাল পৈতৃক রাজ্যের পুনরুদ্ধার সাধন করিয়া তৎপুত্র নয়পাল ও তৎপুত্র তৃতীয়-বিগ্রহপাল-দেবকে রাজত্বসুখরূপ ফল ভোগ করিবার পথ পরিষ্কার করিয়া দেন। তার পরে যে-যুগ উপস্থিত হয় তাহা বৈদেশিক কোন বংশ বা রাজার উৎপাত হইতে সম্ভূত বিপ্লবের যুগ নহে, কিন্তু তৃতীয়-বিগ্রহপালের জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিতীয়-মহীপাল অনীতিপরায়ণ হইয়া রাজ্যশাসন করিতে আরম্ভ করিলে পর, গৌড়ের প্রজাপুঞ্জ লোকনায়ক কৈবর্ত্তপতি দিব্য বা দিব্বোকের অধিনায়কত্বে বিদ্রোহী হইয়া মহীপালকে বধ করিয়াছিলেন, এই নিমিত্ত ইহাকে প্রজাবিদ্রোহের যুগ বলা যাইতে পারে। একাদশ শতাব্দীর এই সময়ে পুনরায় বরেন্দ্রীমণ্ডলে মাৎস্য-ন্যায় প্রবর্ত্তিত হইতে দেখা গেল। এই বিদ্রোহের সময়ে অত্যাচারী রাজা দ্বিতীয়-মহীপাল তদীয় উপযুক্ত কনিষ্ঠ ভ্রাতা শূরপাল ও রামপালকে কারারুদ্ধ করিয়া রাথিয়াছিলেন। ক্রমে রামপাল কোনও প্রকারে কারামুক্ত হইয়া বিশাল গৌড়রাজ্যের নানা প্রদেশ হইতে সামন্তচক্র সম্মিলিত করিয়া প্রথমতঃ দিব্যের অধিকৃত, পরে তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা রূদোকের পুত্র রাজা ভীমের দ্বারা কিয়ৎকালের জন্য শাসিত, রাজ্য পুনরায় স্বহস্তগত করেন। ‘জনকভূ’ বরেন্দ্রীর পুনরুদ্ধার সাধন করিতে গিয়া রামপালকে যে কিরূপ ক্লেশ-স্বীকার ও কৌশল অবলম্বন করিতে হইয়াছিল তাহা, যাঁহারা সন্ধ্যাকর-নন্দীর ‘রামচরিত’ পাঠ করিবার সুযোগ পাইয়াছেন, তাঁহারাই অবগত আছেন। প্রকৃতিপুঞ্জের নির্ব্বাচনে যে রাজবংশের প্রথম প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল—এবং এখন আবার প্রজাপুঞ্জের অসন্তোষে যাহার ভিত্তিকম্পন উপস্থিত হইল, সেই বংশের ভবিষ্যৎ আর বড় উজ্জ্বল থাকিতে পারে নাই। তথাপি পরবর্ত্তী বা শেষ যুগের তিন নরপতি, অর্থাং রামপালের উপযুক্ত পুত্র কুমারপাল ও তৎপুত্র শিশু-নরপতি তৃতীয়-গোপাল ও রামপালের কনিষ্ঠ পুত্র মদনপাল সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি পুনরায় বাড়াইয়া লইতে পারিলেও, মোটের উপর এই সপ্তদশ পাল-নরপালের রাজ্যভোগের পরেই পাল-সাম্রাজ্যের অধঃপতনের যুগ আপতিত হইয়াছিল। কি প্রকারে তাঁহাদের শাসন-শৃঙ্খলা ছিঁড়িয়া গেল তাহা এই প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য নহে।

 অতি প্রাচীন কাল হইতেই ভারতবর্ষ বহুসংখ্যক খণ্ড রাজ্যে বিভক্ত ছিল। বিভিন্ন যুগে প্রদেশ-ভেদে বিভিন্ন প্রকারের রাজতন্ত্রও প্রতিষ্ঠিত ছিল বলিয়া জানা যায়। কোথাও রাজতন্ত্র রাজ্য, কোথাও বা গণতন্ত্র, আবার কোথাও অল্পজনতন্ত্র অবলম্বিত হইত। কিন্তু উত্তরাপথের প্রদেশসমূহে রাজতন্ত্র রাজ্যেরই (monarchical form of Government) সমধিক প্রচলনের কথা ইতিহাস-পাঠে অবগত হওয়া যায়।

 রাজতন্ত্র রাজ্যের নরপতি যখনই নিজের বাহুবল, মন্ত্রিগণের সূক্ষ্মবুদ্ধি ও প্রজাপুঞ্জের অনুরাগ,—এই তিন বস্তুর উপর যথাযথ ভাবে নির্ভর করিয়া প্রকৃত-দণ্ডধর রূপে খগুরাজ্যগুলিকে ঐক্য-সূত্রে বন্ধনপূর্ব্বক নিজের সার্ব্বভৌম রাজত্বের শাসনাধীন করিয়া রাখিতে পারিয়াছিলেন, তখনই তিনি সাম্রাজ্য গঠন করিয়া লইতে পারিয়াছেন। মৌর্য্য-বংশীয় চন্দ্রগুপ্ত, গুপ্ত-বংশীয় সমুদ্রগুপ্ত ও বর্দ্ধন-বংশীয় হর্ষবর্দ্ধন প্রভৃতি মহাশক্তিশালী নরপালগণ মিত্ররাজগণকে নিজ শক্তির অধীন রাখিয়া তাঁহাদিগকে সামন্তরাজরূপে স্ব-স্ব রাজ্য শাসন করিতে দিয়াছিলেন, এবং শত্রু নরপতিগণের উচ্ছেদ সাধন করিয়া তাঁহাদের রাজ্যগুলিকে আপন শাসনগণ্ডীর অন্তর্ভুক্ত করিয়াছিলেন। এই ভাবে তাঁহারা এক-একবার উত্তর-ভারতে বৃহৎ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন সত্য, কিন্তু পরে নানা কারণে যখনই তৎ-তৎ সাম্রাজ্যের শেষ নরপতি নিজ সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ণ রাখিতে অসমর্থ হইয়াছেন, তখনই শাসন-শৃঙ্খল শিথিল হইয়া দেশকে পুনরায় স্ব-স্ব-প্রধান অসংখ্য ক্ষুদ্রায়তন রাজতন্ত্র-পদ্ধতিতে শাসিত খণ্ড খণ্ড রাজ্যে পরিণত করিতে সহায়তা করিয়াছে। তখন দেশে সর্ব্বতোভাবে বিপ্লব, বিগ্রহ ও অরাজকতা উপস্থিত হইয়া সমাজকে মাৎস্য-ন্যায়ের বশবর্ত্তী করিয়া তুলিয়াছে। তখন সমাজে দুর্ব্বলেরা সবলের কবলে পতিত হইয়া নানারূপ কষ্ট পাইয়াছে—তখন প্রভাব-উৎসাহ-মন্ত্রণা-শক্তিসম্পন্ন সার্ব্বভৌম নরপতির পদমর্য্যাদা লাভের উপযুক্ত পাত্র দেশে না থাকায় দণ্ডনীতি-শাস্ত্রের প্রধান প্রতিপাদ্য ‘দণ্ড’ বা শাসন অপ্রণীত থাকিয়া গিয়াছে।

 ভারতবর্ষের পূর্ব্বাঞ্চলে সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগে হর্ষবর্দ্ধনের তিরোভাবের সঙ্গে সঙ্গে যখন ‘অর্ব্বাচীন’ গুপ্ত-বংশীয় নরপতিগণের রাজ্যও ক্রমশঃ মগধ দেশে বিলুপ্ত হইয়া পড়ে, তখনই গৌড়দেশে প্রায় সর্ব্বত্র মাৎস্যন্যায়-যুগ দেখা দেয়। সেই কালের বিপ্লব-যুগের অন্ধকার ভেদ করিয়া পাল-কুল-রবি গোপালদেব ‘প্রকৃতি’পুঞ্জের নির্ব্বাচনে রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া পাল-সাম্রাজ্যের অভ্যুত্থানের হেতু-স্বরূপ ভারতের পূর্ব্বদিকে উদিত হন।

 সকলেই জানেন যে প্রাচীন নীতিশাস্ত্রবিদ্‌গণের মতে রাজতন্ত্র রাজ্য ‘সপ্তাঙ্গ’ বা ‘সপ্তপ্রকৃতিক’ বলিয়া অভিহিত। এই সাতটি অঙ্গ বা প্রকৃতির নাম, যথা (১) স্বামী (বা রাজা), (২) অমাত্য (অর্থাৎ মন্ত্রী, সচিববর্গ, অধ্যক্ষবৃন্দ ও অন্যান্য রাজপাদোপজীবী কর্ম্মচারিগণ), (৩) সুহৃৎ (বা মিত্ররাজগণ), (৪) কোষ (রাজার কোষগৃহে সঞ্চিত ধনরত্নাদি ও নানারূপ আয়), (৫) রাষ্ট্র (বা জনপদস্থিত প্রজাসম্পৎ), (৬) দুর্গ (নগর ও দুর্গনিবাসী পৌরবর্গ), ও (৭) বল (বা দণ্ড অর্থাৎ চতুরঙ্গ সৈন্যবিভাগ)। রাজ্যের এই সাতটি অঙ্গের প্রত্যেকটি সুস্থ বা অবিকল না থাকিলে দেশের কল্যাণ নাই, কিন্তু তন্মধ্যে স্বামী বা রাজাকেই অন্যান্য অঙ্গ বা প্রকৃতির মূল স্বরূপ মনে করা হইত; অন্যান্য ছয়টি অঙ্গ বা প্রকৃতি সুসমৃদ্ধ থাকিলেও যদি ইহারা অস্বামিক থাকে, তাহা হইলে ইহাদের কার্য্যনিস্তার অসম্ভব হইয়া উঠে। বর্ত্তমান কালের আমলাতন্ত্র রাজ্যশাসনের ন্যায় অতি প্রাচীন কালেও নানা শ্রেণীর উচ্চ নীচ রাজকর্ম্মচারী দ্বারা নানাবিধ রাজকার্য্যের সম্পাদনবিধি প্রবর্ত্তিত ছিল। রাজতন্ত্র রাজ্যের কেন্দ্র হইলেন রাজা, কিন্তু তাহা হইলেও কৌটিল্য প্রভৃতি নীতিশাস্ত্রবিশারদগণ মনে করিতেন যে ‘রাজত্ব সহায়সাধ্য’। রাজার পক্ষে একাকী রাজ্যপরিচালন কোন প্রকারেই সম্ভাবিত নহে। কারণ, চক্রান্তর-সহায়-নিরপক্ষ কোন শকটাদি এক চক্রের বলে চলে না। কাজেই রাজাকে কর্ম্মসচিব ও মতিসচিবাদি নিযুক্ত করিতে হয়। মন্ত্রীদের মন্ত্রণ যে নরপতি শ্রবণ না করিয়া স্বমতেই অবস্থিত থাকেন, তাঁহাকে ভিন্নরাষ্ট্র হইতে হয়—তাই, কৌটিল্য লিখিয়াছেন—“সহায়সাধ্যং রাজত্বং চক্রমেকং ন বর্ত্ততে। কুর্ব্বীত সচিবাংস্তস্মাৎ তেষাং চ শৃণুয়ান্মতম্‌।” রাজার পক্ষে স্বাতন্ত্র্য অবলম্বন করিলে রাজ্যে অনর্থ উপস্থিত হয়—“প্রভুঃ স্বাতন্ত্র্যমাপন্নো হ্যনর্থায়ৈব কল্পতে”—শুক্রাচার্য্যের এই মহানীতিবাক্য পাল-রাজারা যেন সর্ব্বদাই স্মরণ রাখিয়া চলিয়াছিলেন, বিশেষতঃ তাঁহাদের রাজ্যের প্রথম পঞ্চনরপালের যুগে। কারণ, তাঁহার নিজেরা সৌগত বা বৌদ্ধ হইলেও কুলক্রমাগত ব্রাহ্মণ-বংশীয় মন্ত্রিগণের মন্ত্রণাবলেই রাজ্য শাসন করিতেন, এই ঐতিহাসিক তথ্য আমরা ভট্টগুরব মিশ্রের বাদলস্তম্ভলিপি হইতে বিশেষ ভাবে জানিতে পারি। যদিও রাজতন্ত্র রাজ্যে প্রায় সর্ব্বপ্রকার শাসন সম্বন্ধে রাজাই একরূপ সর্ব্বময় কর্ত্তা ছিলেন, তথাপি তিনি এই গুরুতর কার্য্যে স্বাতন্ত্র্য-বশে কখনই স্বমতাবলম্বী হইয়া চলিতেন না। প্রাচীন ভারতে মন্ত্রী ও অন্যান্য সচিবেরাই যেন রাজার মন্ত্রীপরিষদে প্রজাপক্ষের অনির্ব্বাচিত প্রতিনিধি হইয়া রাজকার্য্য করিতেন। রাজারা তাই প্রজাশক্তি স্মরণ রাখিয়া মন্ত্রীদিগকে সম্মানের চক্ষুতে দেখিতেন। মন্ত্রী ও অন্যান্য অমাত্য নির্ব্বাচন সম্বন্ধে পালরাজারা জাতিকুল গণনা না করিয়া গুণগণনার উপরই নির্ভর করিতেন। তাই ধর্ম্মপাল প্রভৃতি প্রথম যুগের নরপাল-পঞ্চক শাণ্ডিল্য-বংশের কুলক্রমাগত মন্ত্রী গর্গ, দর্ভপাণি, কেদারমিশ্র ও ভট্টগুরবকে প্রধান মন্ত্রীর পদে অভিষিক্ত করিয়া রাজ্য শাসন করিয়াছিলেন। এই মন্ত্রীরা নীতিশাস্ত্রজ্ঞ অমাত্য-গুণ-সম্পদে আঢ্য ছিলেন বলিয়া ধর্ম্মপাল ও দেবপালের মত রাজগুণসম্পন্ন নরপতিদিগেরও অতি শ্রদ্ধার পাত্র হইয়াছিলেন। দেবমন্ত্রী বৃহস্পতি ইন্দ্রকে কেবল পূর্ব্বদিকের অধিপতি করিতে পারিয়াছিলেন, কিন্তু গর্গের বুদ্ধি এতখানি তীক্ষ্ণ ছিল যে তিনি ধর্ম্মপালকে অখিল-দিগের ‘স্বামী’ করিয়া দিতে সমর্থ হইয়াছিলেন বলিয়া বৃহস্পতিকে উপহাস করিতে পারিতেন। কান্যকুব্জাধিপতি ইন্দ্রায়ুধকে পরাভূত করিয়া ধর্ম্মপাল চক্রায়ুধকে কান্যকুব্জের সিংহাসনে বসাইয়াছিলেন এবং তাঁহার এই বিজয়বার্ত্তায় ভোজ, মৎস্য, মদ্র, কুরু, যদু, যবন, অবন্তী, গন্ধার এবং কীর প্রভৃতি বিভিন্ন প্রদেশের রাজগণ প্রণতি-পরায়ণ মস্তকে তাঁহাকে সাধুবাদ প্রদান করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। কিন্তু এই সমস্ত গৌরবময় ক্রিয়ার জন্য ধর্ম্মপাল নিশ্চিতই মন্ত্রী গর্গের মন্ত্রণ-কৌশলের উপর নির্ভর করিতেন। যাঁহার নীতির বলে দেবপাল প্রায় সমগ্র উত্তরাপথকে ‘করদ’ ভূমিতে পরিণত করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন (“নীত্যা যস্য ভুবং চকার করদাং শ্রীদেবপালো নৃপঃ”), যাঁহার দ্বারদেশে রাজা স্বয়ং অবসরের অপেক্ষায় দণ্ডায়মান থাকিতেন এবং যাঁহাকে অগ্রে আসন প্রদান করিয়া পরে তিনি নিজে সচকিতভাবে সিংহাসনে উপবেশন করিতেন—সেই নীতিবিৎ মন্ত্রীর নাম দর্ভপাণি। চতুর্বিদ্যাবিশারদ্ মন্ত্রী কেদারমিশ্রের বুদ্ধির উপাসনা করিয়াই গৌড়েশ্বর উৎকলে, হূণ-রাজ্যে এবং দ্রাবিড় ও গুর্জ্জর প্রদেশে স্বশক্তি জ্ঞাপিত করিতে পারিয়াছিলেন। এই বৃহস্পতি-প্রতিকৃতি কেদারমিশ্রের যজ্ঞস্থলে, রাজা শূরপাল বৌদ্ধ হইয়াও স্বয়ং উপস্থিত হইয়া রাজ্যের কল্যাণ-কামনায় মন্ত্রীর যঞ্জীয় শান্তি-জল সশ্রদ্ধভাবে স্বমস্তকে গ্রহণ করিতে দ্বিধাবোধ করিতেন না। আবার নারায়ণপালের বহুমানের আস্পদ ছিলেন তদীয় নীতিপরায়ণ মন্ত্রী গুরবমিশ্র—এই মন্ত্রীতে লক্ষ্মী ও সরস্বতী যেন নিজ নিজ নৈসর্গিক বৈরভাব পরিত্যাগ করিয়া একত্র বাস করিতেন। আরও আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে, এই মন্ত্রী যেমন বিদ্বানদিগের সভাতে নিজের বিদ্যাবলে প্রতিপক্ষবাদীর মদগর্ব্ব খর্ব্ব করিতে পারিতেন, তেমনই আবার যুদ্ধক্ষেত্রে স্বপরাক্রমে প্রতিপক্ষ ভট্টগণের অভিমানও দূর করিতে পারিতেন। ব্রাহ্মণমন্ত্রীর যুদ্ধক্ষেত্রে পরাক্রম-প্রদর্শনের কথা অসত্য বলিয়া গৃহীত হওয়ার যোগ্য নহে, কারণ এই পাল-বংশের পঞ্চদশ নরপতি কুমারপালদেবের ব্রাহ্মণ-মন্ত্রী বৈদ্যদেব যে রাজার পক্ষ হইতে অগ্রসর হইয়া কামরূপের বিকৃতিপরায়ণ নরপতিকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়া পাল-নৃপতি কর্ত্তৃক তত্রত্য রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিলেন, ইহা বৈদ্যদেবের কমৌলিতে প্রাপ্ত তাম্রশাসন হইতে লব্ধ একটি ঐতিহাসিক তথ্য। সেই লিপিতে বর্ণিত হইয়াছে যে গৌড়াধিপ কুমারপালের ‘সপ্তাঙ্গ ক্ষিতিপাধিপত্ব’-সম্বন্ধে সর্ব্বদাই চিন্তা করিতেন বলিয়া গুণিগণাগ্রণী ‘উগ্রধী’ তদীয় সচিব বৈদ্যদেব রাজার নিকট তাঁহার প্রাণাপেক্ষাও প্রিয়তর বন্ধু ছিলেন (“সপ্তাঙ্গক্ষিতিপাধিপত্বমভিতঃ সংচিন্তয়নুগ্রধীঃ প্রাণেভ্যোপাতিবন্ধুরস্য সচিবঃ সোঽভূদ্‌গুণিগ্রামনীঃ”)। পাল-রাজ্য শাসনে মন্ত্রীদের স্থান অত্যন্ত গৌরবময় ও উচ্চ ছিল বলিয়া এস্থানে তাঁহাদের সম্বন্ধে এতখানি বলা হইল। রাজতন্ত্র রাজ্যের অমাত্য ও কর্ম্মচারী বা আমলাগণ যুগে যুগে নাম ও কর্ত্তব্য সম্বন্ধে কি প্রকার পরিবর্ত্তন লাভ করিয়াছে তাহা এখানে বলা সম্ভব নহে। সুতরাং আমি এখন শাসনকার্য্যের বিভিন্নতা অনুসরণ করিয়া পাল-সাম্রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন রাজপাদোপজীবিগণের নাম ও তাহাদের রাজ্যশাসনকার্য্যে করণীয় সম্বন্ধে কিছু কিছু নিবেদন করিতে ইচ্ছা করি। কর বা রাজস্ব বিভাগ, সৈন্য বিভাগ, পুলিস ও দেওয়ানী বিভাগ ও সঙ্কীর্ণ বিভাগেই আমরা পাল-রাজগণের তাম্রশাসনাদি হইতে প্রাপ্ত রাজপাদোপজীবীদিগকে সম্প্রতি অন্তর্ভুক্ত করিয়া তাহাদের কার্য্য বা ব্যাপার বর্ণনা করিব।

 গুপ্ত-সাম্রাজ্যের ন্যায় পাল-সাম্রাজ্যের জনপদসমূহ শাসন-সৌকর্য্যার্থে নানা প্রকার বিভাগে বিভক্ত ছিল। রাজ্যের বড় বিভাগের নাম ছিল ‘ভুক্তি’—যথা, শ্রীনগরভুক্তি, তীরভুক্তি, পুণ্ড্রবর্দ্ধনভুক্তি ইত্যাদি। একটা ভুক্তিতে অনেকগুলি ‘মণ্ডল’ থাকিত, যথা ব্যাঘ্রতটীমণ্ডল, গোকলিকা, আম্রষণ্ডিকা, হলাবর্ত্ত প্রভৃতি। একটি মণ্ডলে অনেকগুলি ‘বিষয়’ (বা district) অন্তর্ভুক্ত থাকিত, যথা কোটিবর্ষ, মহান্তাপ্রকাশ, স্থালীক্কট, ক্রিমিলাবিষয়, কক্ষবিষয় ইত্যাদি। আবার একটি বিষয়ে বহু ‘গ্রাম’ সন্নিবিষ্ট থাকিত। সুতরাং দেখা যাইতেছে যে ভুক্তি, মণ্ডল, বিষয় ও গ্রাম—এই সংজ্ঞাগুলি পাল-যুগের জনপদাংশবাচী। গুপ্ত-যুগে ভুক্তিপতিগণ সম্রাট্ কর্ত্তৃক রাজধানী হইতে নিযুক্ত হইয়া শাসকরূপে তৎ-তৎ ভুক্তিতে গিয়া রাজ্যশাসন করিতেন। তাঁহাদের উপাধি থাকিত ‘উপরিক-মহারাজ’। তাঁহারা আবার ‘কুমারামাত্য’-উপাধিসমন্বিত বিষয়পতিদিগকে নিযুক্ত করিতে পারিতেন। দেবপালদেবের সময়ে ব্যাঘ্রতটীমণ্ডলের অধিপতি ছিলেন রাজার দক্ষিণভুজরূপী শ্রীবলবর্ম্মা। তিনিই নালন্দা তাম্রশাসন-সম্পাদন সময়ে দূত্যবিধান বা দূতকের কাজ করিয়াছিলেন।

কর বা রাজস্ব বিভাগ

 ভোগপতি—যাহার নাম ভোগপতি তিনি কি ভুক্তিপতি? তাহা হইলে তিনি বিষয়পতি হইতে অধিকতর উচ্চস্থ রাজকর্ম্মচারী—আর যদি তিনি ‘ভোগ’-নাম রাজাদের করবিশেষের সংগ্রহকারী হইয়া থাকেন, তাহা হইলে তিনি রাজস্ব-বিভাগের কর্ম্মচারী। অর্থশাস্ত্রের গণিকাধ্যক্ষপ্রচারেও ‘ভোগ’ শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়—গণিকাদের অর্জ্জিত অর্থের নাম ‘ভোগ’—যিনি ‘ভোগ-কর’ সংগ্রহকারী তিনিই কি ভোগপতি?

 বিষয়পতি—ভুক্তিপতি ও মণ্ডলপতির নীচের কর্ম্মচারী হইলেন বিষয়পতি। তিনি এখনকার দিনের জেলা-ম্যাজিষ্ট্রেটের সঙ্গে কতকাংশে তুলিত হওয়ার যোগ্য। গুপ্ত-যুগে বিষয়পতিগণের নিজ নিজ অধিষ্ঠান (head-quarters town) থাকিত ইহা জানা গিয়াছে। তাহার নাম হইত বিষয়াধিকরণাধিষ্ঠান। তখন তাঁহারা নগরশ্রেষ্ঠী, প্রথম-সার্থবাহ, প্রথম-কুলিক ও প্রথম-কায়স্থ—এই চারি জন তৎ তৎ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি লইয়া রচিত বিষয়-শাসন পরিষদের সাহায্যে বিষয় শাসন করিতেন। মনে হয়, পরবর্ত্তীকালে পাল-রাজগণের শাসন-সময়েও সেই প্রকার শাসনপদ্ধতি প্রচলিত রহিয়াছিল।

 গ্রামপতি—গ্রামপতি, ‘গ্রামপ’ বা ‘গ্রামনেতা’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি বিষয়পতির তত্ত্বাবধানে থাকিয়া কার্য্য করিতেন। প্রজারা যাহাতে দস্যুচৌরাদি ও রাজার অন্যান্য অধিকারিবর্গের অত্যাচার হইতে রক্ষা লাভ করে তৎপ্রতি লক্ষ্য রাখাই তাঁহার প্রধান কার্য্য ছিল। শুক্রাচার্য্যের মতে প্রত্যেক গ্রামে ‘সাহসাধিপতি’, ‘ভাগহার’, ‘লেখক’, ‘শুল্কগ্রাহ’ ও ‘প্রতিহার’—এই পাঁচ প্রকার রাজকর্ম্মচারী গ্রামপতির অধীন থাকিয়া রাজকার্য্য সম্পাদন করিতেন।

 দাশগ্রামিক—কৌটিল্যের মতে শাসনের সুবিধার জন্য অষ্ট শত গ্রামের মধ্যে যে (district townএর মত) নগর সংস্থাপিত ছিল তাহার নাম ছিল ‘স্থানীয়’। চারি শত গ্রামের মধ্যে (sub-divisional townএর মত) যে ছোট নগর সংস্থাপিত হইত, তাহার নাম ছিল ‘দ্রোণমুখ’, দুই শত গ্রামের মধ্যে (থানা-সদৃশ) ছোট স্থানের নাম ছিল ‘কার্বটিক’ বা ‘খার্ব্বটিক’ এবং দশ গ্রামের সমষ্টি দ্বারা গ্রামের যে স্থানকে লক্ষিত করা হইত, তাহার নাম ছিল ‘সংগ্রহণ’৷ মনে হয় এই ‘দশগ্রামী’র উপর যিনি শাসনকার্য্য পরিচালন করিতেন তিনিই ‘দাশগ্রামিক’ বলিয়া অভিহিত। মনুসংহিতাতেও ‘গ্রামাধিপতি’, ‘দশগ্রামপতি’, ‘বিংশতিশ’, ‘শতেশ’ ও ‘সহস্রপতি’ নামে পরিচিত, যথাক্রমে এক, দশ, বিংশতি, শত ও সহস্র সংখ্যক গ্রামের অধিপগণের নাম ও ব্যাপার বর্ণিত আছে। গ্রামপতি প্রতিদিন গ্রামবাসিগণ হইতে রাজার প্রাপ্য অন্ন, পান ও ইন্ধনাদি স্ববৃত্তির জন্য নিজে ভোগ করিতে পাইতেন।

 ষষ্ঠাধিকৃত—যাঁহারা রাজপ্রাপ্য ধান্যাদির ষষ্ঠ ভাগের আহরণ বা আদায় করিতেন সেই ‘ভাগহার’দিগের নায়ক যিনি, তিনি যষ্ঠাধিকৃত পুরুষ।

 জ্যেষ্ঠকায়স্থ—মনে হয় রাজাধিকরণে যিনি লেখকশ্রেষ্ঠ তিনিই ‘জ্যেষ্ঠকায়স্থ’ বা ‘প্রথম কায়স্থ’ বলিয়া পরিজ্ঞাত ছিলেন। তিনি সম্ভবতঃ বর্ত্তমান চীফ সেক্রেটারীর মত পদধারী ছিলেন।

 মহত্তর ও মহামহত্তর—গ্রামে যাহারা সমৃদ্ধ অবস্থার লোক ও সমাজে যাহাদের বেশ প্রতিপত্তি এবং গ্রামের ও নগরের লোকজন যাঁহার কথার বাধ্য—সম্ভবতঃ তাহারাই ‘মহত্তর’ (মাতব্বর) বলিয়া খ্যাত। তন্মধ্যে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ যিনি তিনিই ‘মহামত্তর’ ও ‘মহত্তমোত্তম’। শেষোক্ত লোকদিগের সাহায্য লইয়া বিষয়পতিগণ বিষয়ের শাসনকার্য্য সম্পাদন করিতেন এই জন্য তাঁহারা ‘বিষয়-ব্যবহারী’ বলিয়াও তাম্রশাসনে উল্লিখিত হইয়াছেন।

 ক্ষেত্রপ—রাষ্ট্রে যাহারা ক্ষেত্রকর—তাহাদের মধ্যে কাহার কিয়ৎ-পরিমাণ ক্ষেত্রভূমি রহিয়াছে সে-বিষয়ে যিনি রাজাধিকরণে হিসাবরক্ষক, তিনি ‘ক্ষেত্রপ’ রাজপুরুষ।

 খণ্ডরক্ষ—রাজনিকেতন ও অন্যান্য রাজকীয় প্রাসাদ ও কর্ম্মান্ত-প্রদেশের এবং রাজ্যস্থিত মন্দির ও বিহারাদির খণ্ডস্ফুটিত-সমাধানে ও জীর্ণোদ্ধারকার্য্যে যিনি ব্যাপৃত থাকতেন, সেই রাজপুরুষের নাম ‘খণ্ডরক্ষ’ হইয়া থাকিবে। তিনি আজকালকার P.W.D. engineer প্রভৃতির সহিত তুলিত হইতে পারেন বলিয়া মনে হয়।

 দাশাপরাধিক—গ্রামবাগিগণের মধ্যে যাহারা শাস্ত্রোক্ত দশ প্রকার উৎকট দোষ বা অপরাধ করিত তাহাদের সেই অপরাধের শাস্তির জন্য রাজার যে ‘দণ্ড’ বা জরিমানারূপ অর্থ প্রাপ্য হইত, তাহার নামই ‘দশাপরাধ’ ‘দশাপচার’ দণ্ড। এই ‘দণ্ড’ বিধান, অথবা, এই টাকা-সংগ্রহ-কার্য্য যে রাজপুরুষের উপর ন্যস্ত থাকিত তিনিই ছিলেন ‘দাশাপরাধিক’।

 শৌল্মিক—শৌল্মিক বা শুল্কাধ্যক্ষ প্রাচীন রাজনীতি-শাস্ত্রে বর্ণিত এক জন প্রধান রাজপুরুষ। রাষ্ট্রের সর্ব্বত্র যাহারা পণ্যবাহী বণিক্‌গণ হইতে রাজার প্রাপ্য শুল্ক (customs ও tolls) আদায় করে—তাহাদের উপর অধ্যক্ষতার কাজ যিনি করেন, তিনিই শৌল্মিক। কোন্ পণ্য সশুল্ক রাজ্যসীমান্ত পার হয়—কোন্ পণ্য উচ্ছুল্ক হইয়া চলে—তদ্বিষয়ে সব বিধান তিনিই করিতেন। কোন্ দ্রব্যের উপর কত হারে শুল্ক বসিবে তাহাও নির্দ্ধারণ করিবার ভার থাকিত এই রাজকর্ম্মচারীর উপর। ইঁহার তত্ত্বাবধানেই রাষ্ট্রের পীড়াকর ভাণ্ড কখনই রাজ্যে প্রবেশ লাভ করিতে দেওয়া হইত না এবং মহোপকারী দ্রব্য উচ্ছুল্ক হইয়া প্রবেশলাভ করিতে পারিত। নিষ্ক্রাম্য শুল্ক (export duty) ও প্রবেশ শুল্ক (import duty) ও অন্যান্য বাহ্য আভ্যন্তর ও আতিথ্য নামক শুল্ক প্রভৃতির ব্যবহার এই রাজপুরুষের আয়ত্ত ছিল। শুল্কদানে ত্রুটি হইলে যে ‘অত্যয়’ বা জরিমানা হইত ইহার প্রত্যবেক্ষণও এই কর্ম্মচারীই করিতেন।

 চৌরোদ্ধরণিক—‘চোররজ্জু’ বা ‘চৌরদ্ধরণ’ নামে যে চৌকীদারী কর তৎকালে প্রচলিত ছিল, তৎসংগ্রহকারীদিগের ঊর্দ্ধতন রাজপুরুষের নাম ‘চৌরোদ্ধরণিক’। কেহ কেহ এই কর্ম্মচারীকে পুলিস বিভাগের রাজপুরুষ-বিশেষ মনে করেন, কিন্তু ইহা সঙ্গত মনে হয় না।

 মহাক্ষপটলিক—রাজকীয় ‘অক্ষপটল’ বা মহাপেজখানার যিনি অধ্যক্ষ পূর্ব্বে তাঁহার নাম ছিল ‘অক্ষপটলাধ্যক্ষ’। এই রাজকর্ম্মচারীর কার্য্যসদনে সর্ব্বপ্রকার নিবন্ধ পুস্তক (ledgers) থাকিত। গণনকার্য্যে নিযুক্ত ‘গাণনিক’ নামে আখ্যাত কর্ম্মচারীরা এই প্রধান রাজপুরুষের অধীন হইয়া কার্য্য করিত। গুপ্ত-যুগে যাহাদিগকে ‘পুস্তপাল’ নামে পরিচিত দেখিতে পাওয়া যায়, তাহারাও এই শ্রেণীর কর্ম্মচারী। রাজার সর্ব্বপ্রকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব এই ব্যক্তির কার্য্যাগারে বা আপিসে রক্ষিত হইত। এখানে যাঁহারা ছোট ছোট কাজ করিতেন তাঁহাদের কাহারও নাম ছিল ‘কার্ম্মিক’ ও কাহারও নাম ছিল ‘কারণিক’। এই রাজপুরুষের ব্যাপার বর্ত্তমান সময়ের একাউনটেন্ট-জেনার‍্যালের কর্ত্তব্যের সহিত তুলনীয়।

সৈন্য বিভাগ

 সেনাপতি—তিনি চতুরঙ্গ সেনার, অর্থাৎ হস্তী, অশ্ব, রথ ও পদাতির নায়করূপে কার্য্য করেন। হস্ত্যধ্যক্ষ বা হস্তিব্যাপৃতক, অশ্বব্যাপৃতক, পত্তিব্যাপৃতক প্রভৃতির অবেক্ষণ কার্য্যের ভার এই মহামাত্যের বা মহামাত্রের উপর ন্যস্ত থাকিত। এই সেনাপতিকে সর্ব্বপ্রকার যুদ্ধবিদ্যা ও প্রহরণবিদ্যায় শিক্ষিত হইতে হইত। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে লিখিত আছে যে পত্তির অধ্যক্ষকে নিম্নযুদ্ধ, স্থলযুদ্ধ, প্রকাশযুদ্ধ, কূটযুদ্ধ, খনকযুদ্ধ (ট্রেঞ্চ কাটিয়া যুদ্ধ), আকাশযুদ্ধ, দিবাযুদ্ধ, রাত্রিযুদ্ধ প্রভৃতির জন্য ব্যায়াম (বা manœuvres) শিক্ষা করিতে হইত। সেনার ব্যায়ামের ভূমি, যুদ্ধের উপযুক্ত কাল, শত্রুসেনা অভিন্ন থাকিলে ভিন্ন করা, ভিন্ন স্বসৈন্যকে সংহত করা, সংহত সেনাকে ভিন্ন করা, বিঘটিত সেনার বধ, দুর্গ ধ্বংস, সেনার যাত্রাকাল প্রভৃতি বিষয়ে এই অমাত্যের সম্যক্ জ্ঞান থাকা চাই। সেনা-বিভাগের অত্যুচ্চ রাজপুরুষকেই সেনাপতি বা মহাসনাপতি বলা হইত।

 প্রান্তপাল—রাজ্যের প্রান্ত বা অন্ত (Frontier) প্রদেশ যাহার অবেক্ষণে থাকিত, সেই রাজপুরুষের নাম প্রান্তপাল। প্রাচীন কালে এই কর্ম্মচারীও অষ্টাদশ মহামাত্র বা তীর্থের অন্যতম বলিয়া গৃহীত হইত। তাঁহার করণীয়ের মধ্যে প্রধান এক কার্য্য এই ছিল যে, প্রান্তপ্রদেশ পার হইয়া সার্থবাহগণ যে যে দ্রব্য বাণিজ্যার্থ রাজার দেশে লইয়া আসিত তজ্জন্য ‘বর্ত্তনী’ নামক শুল্ক গ্রহণ করিয়া তাহাদিগের মালপত্রে অভিজ্ঞান বা চিহ্ন (স্বহস্তলেখ) ও মালের মুদ্রা বা পাস দিয়া শুল্কাধ্যক্ষ বা শৌল্কিকের নিকট পাঠাইয়া দেওয়া। শত্রুদিগের কার্য্যাবলীর সংবাদ গুপ্তচর দ্বারা সংগ্রহ করাও তদীয় অন্য কর্ত্তব্য ছিল।

 কোট্টপাল—যিনি কোট্টপাল নামে অভিহিত, তিনি পূর্ব্বে দুর্গপাল নামেও পরিজ্ঞাত ছিলেন। কি প্রকারে দুর্গনিবেশ ও দুর্গরক্ষা প্রভৃতি কার্য্য করিতে হয় তদ্বিষয়ে তিনি অভিজ্ঞ।

 গৌল্মিক—‘গুল্ম’ নামক পুলিস আউটপোষ্টের রক্ষিবর্গের প্রধান কর্ম্মচারী। মহাভারতে উক্ত আছে (শান্তিপর্ব্ব ৬৯ অধ্যায়ের ৭৷৮ শ্লোকে) রাজাকে দুর্গে, সীমান্তে, নগরোপবনে, পুরোদ্যানে, কোষ্ঠপালদির উপবেশস্থানে, এবং রাজনিবেশনে ‘গুল্ম’ নিবেশ করিতে হইবে। কিন্তু অমরকোষের মতে ৯টি হস্তী, ৯টি রথ, ২৭টি অশ্ব ও ৪৫টি পদাতি লইয়া একটি ‘গুল্ম’ সংগঠিত হয়। তবে কি তিনি এই প্রকার সেনামণ্ডলীর অধিনায়ক?

 বলাধ্যক্ষ—বলাধ্যক্ষ সম্ভবতঃ কৌটিল্যের ‘পত্তধক্ষে’র পর্য্যায়ভুক্ত শব্দ। সেনা-বিভাগের যে প্রধান কর্ম্মচারীকে মৌল, ভূত, শ্রেণী, মিত্র, অমিত্র ও আটবিক—এই ছয় প্রকার বল বা সৈন্যের উপর কর্ত্তৃত্ব করিতে হইত, তিনিই বলাধ্যক্ষ।

 মহাসান্ধিবিগ্রহিক বা মহাসন্ধিবিগ্রহিক—ষাড়্‌গুণ্যবিৎ যে প্রধান অমাত্য কোন্ রাজার সহিত সন্ধি এবং কোন্ রাজার সহিত বিগ্রহ বা যুদ্ধ করিতে হইবে বিশেষতঃ এই ব্যাপারে অধিকৃত থাকিয়া রাজাকে সর্ব্বদা উপদেশ প্রদান করেন এবং প্রয়োজনবোধে রাজার আদেশে যুদ্ধাদি ঘোষণা করেন তিনিই এই আখ্যাধারী রাজপুরুষ। হর্ষবর্দ্ধনের অবন্তি নামক অমাত্যই সন্ধিবিগ্রহাধিকৃত ছিলেন বলিয়া আমরা হর্ষচরিতে (ষষ্ঠ উচ্ছ্বাসে) উল্লিখিত দেখিতে পাই। পালবংশের সপ্তদশ নরপাল মদনপালদেবের সন্ধিবিগ্রহিকের নাম ছিল ভীমদেব। সন্ধ্যাকর নন্দীর পিতা প্রজাপতি নন্দীও পাল-রাজের এক জন সন্ধিবিগ্রহিক ছিলেন বলিয়া ‘রামচরিতে’ আভাস পাওয়া যায়।

 নাবাধ্যক্ষ—“নৌসাধনোদ্যত” বাঙালীদিগের রাজ্যশাসনে নাবাধ্যক্ষ বা ‘নৌবল-ব্যাপৃতক’ কর্ম্মচারী থাকিবে ইহা আশ্চর্য্যের বিষয় নহে। পাল-রাজগণের জয়স্কন্ধাবারে হস্তী, অশ্ব, পদাতির ন্যায় নৌবল বা নৌবাট (নৌবাহিনী) শব্দ ব্যবহৃত দেখিতে পাওয়া যায়। মুসলমান আমলে এই নৌবাটই ‘নওয়ারা’ নামে পরিচিত ছিল। যে রাজকর্ম্মচারী নৌসেনার ঊর্দ্ধতম কর্ম্মচারী, তিনিই ‘নৌবল-ব্যাপৃতক’। কমৌলি লিপিতে পালশাসন-যুগের এক নৌযুদ্ধের বর্ণনা পাওয়া যায়। সুবর্ণভূমি ও যবদ্বীপ প্রভৃতিতে অবস্থিত রাজ্যের সহিত গৌড়রাজ্যের রাজকর্ম্মচারীদিগের যে নৌ-যোগে যাতায়াতের ব্যবস্থা ছিল, তাহা দেবপালদেবের নালন্দা-লিপি হইতে বেশ বুঝা যায়। কিন্তু যিনি ‘নাবাধ্যক্ষ’ বলিয়া পরিচিত তাঁহার করণীয়সমূহের মধ্যে প্রধান কার্য্য ছিল এই যে, তিনি সমুদ্রযায়ী নৌসমূহের যাতায়াত এবং নদীমুখে ও নদীর অন্যান্য তরণ স্থানে বণিকেরা রাজাদেয় শুল্কাদি দেয় কি না, সেই কার্য্যের অবেক্ষণ করা।

 তরপতি বা তরিক—রাজার নৌকা বিভাগ হইতে সাধারণে নৌকাভাড়া লইয়া কার্য্য করিতে পারিতেন। আমার মনে হয় ‘তরপতি’ বা ‘তরিক’ বলিয়া যাহাদের আখ্যা ছিল, তাহার নাবাধ্যক্ষের নিম্নতম কর্ম্মচারী—তাহারা নদীপ্রভৃতির তরণস্থানে তর-শুল্ক (ferry) সম্বন্ধীয় কার্য্যে ব্যাপৃত থাকিতেন। প্রাচীনকালে পোর্ট কমিশনারদিগের কর্ত্তার ন্যায় ‘পত্তনাধ্যক্ষ’-নামে এক রাজকর্ম্মচারী ছিলেন বলিয়া জান। গিয়াছে।

 হস্তিব্যাপৃতক—প্রাচীন ভারতে রাজার সৈন্য-বিভাগে হস্তীর ব্যবহার বড় আদরণীয় ও প্রয়োজনীয় ছিল। ভারতবর্ষে সর্ব্বত্রই হস্তিযুদ্ধের প্রবর্ত্তন বেশী ছিল। রাজাদিগের বিজয় নির্ভর করিত হস্তিসেনার উপর। [“জয়ো ধ্রুবং নাগবতাং বলানাম্”—কামন্দকীয়] কামন্দক এমনও বলিয়াছেন যে “গজেষু নীলাভ্রসম-প্রভেষু রাজ্যং নিবদ্ধং পৃথিবী-পতীনাম্”—কাল হাতীর উপর নরপতিগণের রাজ্যস্থিতি নির্ভর করে। সংক্ষেপে এই বলা যায় যে, ‘হস্তিব্যাপৃতক’ বা ‘হস্ত্যধ্যক্ষকে’ রাজার হস্তিশালার সর্ব্বপ্রকার কার্য্যের অবেক্ষণ করিতে হইত। হস্তীবলরক্ষার ব্যবস্থা তদীয় প্রধান কার্য্য। রাজার হস্তিশালাতে অবস্থিত হস্তীর জন্য ‘বিধা’ বা আহার, শয়ন, খাদ্যশস্যাদির প্রমাণ, কার্য্যে নিয়োগ, বন্ধনের উপকরণ এবং বর্ম্মাদি সাংগ্রামিক অলঙ্কারাদির ব্যবস্থা সম্বন্ধেও অবেক্ষণ তদীয় করণীয়ের মধ্যে ছিল। হর্ষচরিতে পাঠ করা যায় যে স্কন্দগুপ্ত নামক রাজপুরুষ হর্ষের অশেষ গজ-সাধনাধিকৃত ছিলেন।

 অশ্বব্যাপৃতক—এই কর্ম্মচারীর অন্য নাম ছিল অশ্বাধ্যক্ষ। রাজমন্দুরার অশ্বসমৃদ্ধি রাজার প্রধান বল। হস্ত্যধ্যক্ষের ন্যায় অশ্বব্যাপৃতকের কার্য্যও বহুল প্রকারের ছিল। অশ্বশালার অশ্বসমূহের বর্গীকরণ (classification) অশ্বের কুল, বয়স, বর্ণ, চিহ্ন ও কর্ম্ম বিষয়ে সম্যক্ জ্ঞান এই কর্ম্মচারীর থাকা চাই। পাল-রাজগণ নিজ নিজ অশ্বশালার জন্য পারসীক কাম্বোজ প্রভৃতি দেশে উৎপন্ন অশ্বসমূহের আমদানী করিতেন বলিয়া জানা যায়।

 উষ্ট্রব্যাপৃতক—পাল-রাজগণের পশুশালাতে উষ্ট্রেরও স্থান ছিল। যে কর্ম্মচারী উষ্ট্ররক্ষাদির অবেক্ষণ কার্য্য করিতেন, তাহাকেই উষ্ট্রব্যাপৃতক বলা হইত। সেনার রসদ-বহনে উষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা বিশেষ ভাবে উপলব্ধ হইত।

 শরভঙ্গ—এই নাম যে কোন্ রাজপুরুষকে বুঝাইতে প্রযুক্ত হইত, তাহা জানা যায় না। তিনি সম্ভবতঃ যুদ্ধ-বিভাগের কোন কর্ম্মচারী হইয়া থাকিবেন। তীর ধনু লইয়া যাহারা যুদ্ধাদি করিত তাহাদের কোন ঊর্দ্ধতন কর্ম্মচারী হইবেন কি?

 কিশোর-বড়বা—গো-মহিষাধিকৃত, গো-মহিষাজাবিকাধ্যক্ষ—যাঁহারা ‘কিশোর’ অশ্ব (অর্থাৎ ৬ মাস হইতে ২৷৷ বৎসর বয়স্ক অশ্ব) সমূহের ও ‘বড়বা’ ঘোটকী প্রভৃতির প্রত্যবেক্ষণে নিযুক্ত থাকিতেন তাঁহারাই ‘কিশোরাধিকৃত’ ও ‘বড়বাধিকৃত’ বলিয়া অভিহিত হইতেন। সেকালে বার্ত্তা-বিদ্যার অন্তর্ভুক্ত ‘পাশুপাল্য’ বা পশুপালন যে সমাজে কত দূর আদরের বস্তু ছিল, রাজসরকারে গবাধ্যক্ষ, মহিষাধ্যক্ষ, অজাধ্যক্ষ (ছাগাধ্যক্ষ) অবিকাধ্যক্ষ (মেষাধ্যক্ষ) প্রভৃতি নানা প্রকার পশুর অধ্যক্ষ নিয়োগ হইতেই তাহা প্রতীয়মান হয়। রাজপশুশালায় প্রত্যেক জাতীয় বহুসংখ্যক গৃহপশু রক্ষিত হইত এবং তাহাদের ক্রয়বিক্রয় এবং তজ্জাত দ্রব্যাদিদ্বারা বাণিজ্য করা হইত।

পুলিস বিভাগ

 মহাপ্রতীহার—রাজসদনে যত দ্বাররক্ষকগণ বা যামিকগণ (প্রহরিগণ) রক্ষাকার্য্যে নিযুক্ত থাকিয়া পুলিসের কার্য্য করিয়া থাকে তাহাদের ঊর্দ্ধতন রাজপুরুষের নাম ‘মহাপ্রতীহার’। তিনি প্রাচীনকালে উচ্চশ্রেণীর অমাত্যবর্গের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

 দাণ্ডিক—দণ্ডধারী রক্ষি-পুরুষ-শ্রেষ্ঠ পুলিস বিভাগের কোন কর্ম্মচারী (দারোগা) অথবা অপরাধীর দণ্ডবিধানকারী বিচার বিভাগের কোন কর্ম্মচারী তিনি হইয়া থাকিবেন। তিনি পরবর্ত্তীকালে ‘দাণ্ডপাণিক’ বলিয়াও উল্লিখিত হইয়াছেন।

 দাণ্ডপাশিক বা দণ্ডপশিক—বিচারে যে-সকল অপরাধীর প্রতি প্রাণদণ্ডের আদেশ হইয়াছে তাহাদের বধাধিকৃত রাজপুরুষই ‘দাণ্ডপাশিক’ নামে অভিহিত হইত বলিয়া মনে হয়।

 দণ্ডশক্তি—কেবল ধর্ম্মপালদেবের তাম্রশাসনেই এই রাজপাদোপজীবীর নাম পাওয়া যায়। উহার করণীয় কিরূপ ছিল তাহা জান যায় নাই। তবে মনে হয়, তিনিও পুলিস বিভাগের কোন রাজপুরুষ হইয়া থাকিবেন।

দেওয়ানী বিভাগ

 মহাদণ্ডনায়ক—অর্থশাস্ত্রে যাঁহাকে ‘দণ্ডপাল’ আখ্যা দেওয়া হইয়াছে, তিনিই পরবর্ত্তী সময়ে ‘মহাদণ্ডনায়ক’ নামে পরিচিত হইয়া থাকিবেন। গুপ্ত-যুগে এক জন প্রধান অমাত্যকে (হরিষেণের পিতা তিলভট্টককে) সান্ধিবিগ্রহিক ও কুমারামাত্য—এই দুইটি উপাধিসহ মহাদণ্ডনায়ক উপাধি ব্যবহার করিতে দেখা গিয়াছে। মনে হয় যাঁহারা ফৌজদারী বিভাগের আসামীদিগকে শাস্তি বিধান করিতেন, তাঁহাদেরই ঊর্দ্ধতন রাজকর্ম্মচারীর নাম ছিল মহাদণ্ডনায়ক। অনেকে এই শব্দটিকে ‘সেনাপতি’—সমানার্থক মনে করিয়া থাকেন। তাহা হইলে দুইটি শব্দ পৃথগ্‌ভাবে একই তাম্রশাসনের রাজপাদোপজীবিগণের মধ্যে ব্যবহৃত পাওয়া যায় কেন?

 প্রমাতা—এই রাজপুরুষের ব্যাপার অপরিজ্ঞাত। তিনি কি কোন প্রকার বিচারক শ্রেণীর অধিপতি? অথবা ভূমি প্রভৃতির জরীপ বা মাপ সম্বন্ধে কার্য্যকর্ত্তা? তিনি অর্থশাস্ত্রে পৌতবাধ্যক্ষ ও মানাধ্যক্ষ বলিয়া উল্লিখিত কর্ম্মচারীদ্বয়ের শেষোক্ত জন হইবেন কি? মানাধ্যক্ষের কর্ত্তব্য ছিল তুলা (balance) ও নানা প্রকারের মাপের দ্রব্যাদির পরীক্ষা করা (weights and measures-দর্শক)।

 ধর্ম্মাধিকারার্পিত—এই ব্যক্তিই সম্ভবতঃ পূর্ব্বকালে ‘পৌরব্যবহারিক’ ও পরবর্ত্তী কালে ধর্ম্মাধ্যক্ষ বা ‘মহাধর্ম্মাধ্যক্ষ’ নামে অভিহিত হইতেন। দেওয়ানী-বিচারে তিনিই শ্রেষ্ঠ বিচারক। কুমারপালদেবের মহামন্ত্রী বৈদ্যদেব যখন কামরূপাধিপতি নিযুক্ত ছিলেন, তখন তদীয় ‘ধর্ম্মাধিকারার্পিত’ এক রাজপুরুষের নাম ছিল শ্রীগোনন্দন (কমৌলি-লিপি)। পরবর্ত্তী সময়ে বিখ্যাত পণ্ডিত হলায়ুধ ছিলেন লক্ষ্মণসেনের রাজ্যে প্রধান বিচারপতি বা ‘মহাধর্ম্মাধ্যক্ষ’।

সঙ্কীর্ণ বিভাগ (Miscellaneous)

 দূতক—তিনি দূত-নামক বার্ত্তাহর হইতে ভিন্ন প্রকারের কার্য্যকারী। প্রাচীন কালে ব্রাহ্মণাদিকে তাম্রশাসনদ্বারা ভূমি প্রভৃতি দান বা তাহা বিক্রয় করিবার সময়ে, অমাত্য-শ্রেণীভুক্ত যে রাজপাদোপজীবী, প্রতিগ্রহীতা বা ক্রয়কারী ব্যক্তির আবেদন রাজাদের নিকট অনুনয়-সহকারে নিবেদন করিতেন—তাহাকে তাম্রশাসনের ‘দূতক’ বলা হইত। রাজপুত্র বা সান্ধিবিগ্রহিক বা অন্য কোন প্রধান অমাত্য এই কার্য্যে ব্ৰতী হইতে পারিতেন। যুবরাজ ত্রিভুবনপাল ধর্ম্মপালদেবের নিকট, যুবরাজ রাজ্যপাল ও মহামন্ত্রী ভট্টগুরব দেবপালের নিকট, মন্ত্রী ভট্টবামন প্রথম-মহীপালের নিকট এবং সন্ধিবিগ্রহিক ভীমদেব মদনপালদেবের নিকট কোন কোন তাম্রশাসন সম্পাদনকালে দূতকের কার্য্য করিয়াছিলেন বলিয়া ইতিহাস-পাঠে অবগত হওয়া যায়।

 রাণক, রাজন্যক, রাজরাজনক, রাজরাজন্যক—তাম্রশাসনে যাঁহাদের উপাধি ‘রাজন্যক’, ‘রাণক’ কিংবা ‘রাজরাজনক’ অথবা ‘রাজরাজন্যক’—তাঁহারা সামন্তরাজ-শ্রেণীভুক্ত নরপতি বলিয়া প্রতিভাত হয়।

 মহাসামন্ত, মহাসামন্তাধিপতি—আমার মনে হয় যে এই ব্যক্তিকে সামন্তরাজগণের মধ্যে প্রধান নরপতি মনে করা সঙ্গত হইবে না। সামন্তরাজগণ সম্বন্ধে রাজকুলে যে অমাত্য রাজগণকে নানাপ্রকার রাজনীতিবিষয়ক উপদেশাদি দিতে পারিতেন এবং সামন্তগণ সম্বন্ধে যত প্রকার সংবাদ জানিয়া রাখা দরকার তাহা যিনি রাখিতেন তিনিই এই নামে অভিহিত হইতেন। তিনি এক জন বিশিষ্ট রাজকর্ম্মচারী।

 রাজামাত্য—রাষ্ট্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগে রাজাকে উপদেশ ও পরামর্শ যাঁহারা দিতেন সেই সকল কর্ম্মসচিব ও বুদ্ধিসচিব এই শব্দদ্বারা সূচিত হইতেন। তন্মধ্যে পঞ্চাঙ্গমন্ত্রে যিনি সম্যক্ অভিজ্ঞ খাকিয়া রাজার প্রধান মন্ত্রিপদে প্রতিষ্ঠিত থাকিতেন তিনি ছিলেন মহামন্ত্রী।

 রাজস্থানীয়োপরিক—গুপ্ত-যুগে যাঁহারা বড় বড় ভুক্তিতে ‘মহারাজ’ উপাধি-সহকারে সম্রাট্ কর্ত্তৃক নিযুক্ত হইয়া রাজার স্থানভুক্ত বা রাজপ্রতিনিধি (viceroy) ভাবে (বর্ত্তমান গভর্ণরগণের ন্যায়) রাজ্যশাসন করিতেন তাঁহাদের আখ্যা ছিল ‘উপরিক’। মনে হয় পাল-সাম্রাজ্যে সেই প্রকার ভুক্তিশাসকগণই ‘রাজস্থানীয়োপরিক’ বলিয়া পরিচিত ছিলেন।

 মহাকুমারামাত্য—গুপ্ত-যুগে ‘কুমারামাত্য’ শব্দটিকে কখনও কখনও সান্ধিবিগ্রহিক, দণ্ডনায়ক, মহামন্ত্রী প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ রাজপুরুষগণও উপাধিরূপে ব্যবহার করিতেন। তখন পুণ্ড্রবর্দ্ধনভুক্তিতে অবস্থিত ‘বিষয়পতি’গণও এই উপাধি ব্যবহার করিতেন। মনে হয়, যাহারা বংশানুক্রমে (নিজদিগের কুমার-অবস্থা হইতে) অমাত্যপদলাঞ্ছিত ছিলেন তাঁহারাই ‘কুমারামাত্য’। কেহ কেহ ব্যাখ্যা করেন, যে যাঁহারা রাজকুমারদিগের অমাত্য-কার্য্য সম্পাদন করিয়া থাকেন, তাঁহারাই এই শব্দদ্বারা সূচিত হইয়া থাকেন।

 মহাকার্ত্তাকৃতিক—এই রাজপুরুষের নিয়োগ সুস্পষ্ট প্রতিভাত হয় না। এই শব্দটি ‘কর্ত্তৃকৃৎ’, অর্থাৎ যিনি কোন কার্য্যবিভাগের কর্ত্তাকে নিযুক্ত করিতে অধিকারী তাঁহাকে বুঝাইবার জন্য ব্যবহৃত হইত কি? যে রাজপুরুষ ‘কর্ত্তৃকৃৎ’ (officer-makers) সমূহের নিয়োগে শ্রেষ্ঠ অধিকারী, তিনি কি এই পদবাচ্য হইয়া থাকিবেন? প্রধান প্রধান আরব্ধ রাজকার্য্যের কতখানি পরিমাণ ‘কৃত’ হইল, বা ‘অকৃত’ রহিল তিনি কি তাহার তত্ত্বাবধানকারী কোন কর্ম্মচারীও হইতে পারেন?

 রাজপুত্র—রাজকুলের যাঁহারা যুবরাজ, বা রাজার অন্যান্য পুত্র কিংবা রাজসম্পর্কীয় অন্যান্য স্ববংশীয়গণ, তাঁহারাই এই শব্দদ্বারা সূচিত হইয়া থাকেন। যুবরাজ যে প্রাচীন রাজনীতিশাস্ত্রে অষ্টাদশ তীর্থের অন্যতম বলিয়া গৃহীত তাহা সুবিদিত। যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হইয়া তিনি পিতার সাহায্যার্থে অনেক রাজকীয় কার্য্য সম্পাদন করিয়া থাকেন। পাল-সাম্রাজ্যে যুবরাজের প্রভাব প্রবল ছিল। কামন্দকনীতিশাস্ত্রে বলা হইয়াছে যে [“অমাত্যো যুবরাজশ্চ ভুজাবেতৌ মহীপতেঃ” (১৮–২৮)] অমাত্য ও যুবরাজ রাজার দুই বাহুসদৃশ্য।

 মহাদৌঃসাধ-সাধনিক, (পরবর্ত্তী কালে) দৌঃসাধনিক বা দৌঃসাধ্যসাধনিক বা দৌঃসাধিক—ষে রাজপুরুষের উপর দ্বারপালগণের অবেক্ষণ কার্য্য অর্পিত, তিনিই কি এই পদবাচ্য? কাহারও মতে তিনি গ্রামপরিদর্শকরূপে রাজকার্য্য করিতেন। আমার মনে হয়—যাহারা রাজাকে ‘বিষ্টি’ বা শ্রমদ্বারা সহায়তা করিত অর্থাৎ রাজকর নগদ বা দ্রব্যদ্বারা দিতে না পারিয়া হাতে খাটিয়া শোধ দিত সেই সমস্ত শ্রমজীবী কর্ম্মকরগণের উপর তত্ত্বাবধান কার্য্যে এই কর্ম্মচারী নিযুক্ত থাকিতেন।

 দূতপ্রৈষণিক (দূতপ্রেষণিক)—যে রাজপুরুষ অন্যান্য রাষ্ট্রে দূতপ্রেরণ-কার্য্যে নিযুক্ত থাকিতেন, তাঁহার নাম ‘দূত-প্রৈষণিক’ ছিল। দূত বিভাগ যে কত বড় প্রয়োজনীয় বিভাগ তাহা প্রাচীন অর্থশাস্ত্র ও নীতিশাস্ত্র হইতে পরিজ্ঞাত হওয়া যায়। পালশাসনযুগে সুদুর সুবর্ণদ্বীপ (সুমাত্রা) ও যবদ্বীপ প্রভৃতি প্রশান্ত-মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত রাজগণের সহিত ভারতের উত্তর-পূর্ব্বাঞ্চলের গৌড়াধিপগণের সহিত দূতযোগে নানা কার্য্যের সম্পাদন হইত। দেবপালের নালন্দালিপি হইতে অবগত হওয়া গিয়াছে যে শৈলেন্দ্র বংশতিলক যবভূমিপাল সমরাগ্রবীরের পুত্র, সুবর্ণদ্বীপাধিপতি মহারাজ বলপুত্র-দেব দূতকমুখে দেবপালের নিকট হইতে পাঁচটি গ্রাম তাম্রশাসনদ্বারা চাহিয়া লইয়া তাহা, নালন্দাতে তিনি যে বুদ্ধভট্টারকের বিহার নির্ম্মাণ করাইয়াছিলেন তাহাতে, সর্ব্বপ্রকার পূজাদি বিধানের জন্য প্রতিপাদন করিয়াছিলেন।

 গমাগমিক ও অভিত্বরমাণ বা অভিত্বরমাণক—মনে হয়, যাহাদিগকে স্বরাষ্ট্রে ও পররাষ্ট্রে সংবাদাদি সংগ্রহ করার জন্য বা কোন দ্রব্যাদি আনা নেওয়ার জন্য পাঠাইতে হইত—তাহাদের কার্য্য প্রত্যবেক্ষণের ভার যে কর্ম্মচারীর উপর ন্যস্ত থাকিত, তিনিই গমাগমিক। এবং 'অভিত্বরমাণ’ শব্দটিও যাহারা রাজকার্য্য সম্পাদনে শীঘ্রগ, তাহাদিগের ঊর্দ্ধতন কর্ম্মচারীকে বুঝাইতে ব্যবহৃত হইয়া থাকিবে।

 তদাযুক্তক ও বিনিযুক্তক—পাল-রাজগণের তাম্রশাসনে এই প্রকার নামধারী রাজপুরুষের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু, তাঁহাদের নিয়োগ সম্বন্ধে আমরা কোন সুস্পষ্ট পরিচয় কোথাও বড় একটা পাইতেছি না। তবে, মনে হয় যে রাজাদিগের কোন প্রয়োজন-বিশেষ উপস্থিত হইলে যদি হঠাৎ নানাশ্রেণীর কর্ম্মচারীর নিয়োগ আবশ্যক হয়, তখন যে কর্ম্মচারীর উপর সেই প্রকার সেবক নিয়োগের প্রধান ভার ন্যস্ত থাকিত, তিনিই সম্ভবতঃ ‘তদাযুক্তক’ নামে আখ্যাত হইতেন। আর বিশেষ বিশেষ কার্য্যে লোক নিযুক্ত করার ভার যাঁহার উপর অর্পিত থাকিত, তিনিই ‘বিনিযুক্তক’ নামে পরিজ্ঞাত রাজপুরুষ হইয়া থাকিবেন।

 উপরি বর্ণিত নানা প্রকার রাজপাদোপজীবিগণের নাম ও তাঁহাদের কার্য্যকলাপ হইতে এই অনুমান সর্ব্বথা সঙ্গত বলিয়াই মনে করা যাইতে পারে যে, পাল-সাম্রাজ্যে যে শাসনপ্রণালী প্রচলিত ছিল, তাহা রাজতন্ত্র-শাসন হইলেও পাল-নরপালগণ তাঁহাদের বিশাল রাজ্যে শাসনের সৌকর্য্যার্থে বর্ত্তমান সময়ের প্রাদেশিক আমলাবর্গের (bureaucracy) ন্যায় নানা বিভাগের অধ্যক্ষাদির সহায়তা লইতেন। মৌর্য্যযুগে, গুপ্তযুগে কিংবা মধ্যযুগে, নরপতিগণ যে প্রায় একই প্রকার শাসন-প্রণালী অবলম্বন করিয়া ভারতের সর্ব্বপ্রদেশে রাজ্যশাসন সম্পাদন করিতেন, তাহাতে কোন সংশয় নাই। তবে যুগে-যুগে রাজপুরুষগণের নাম অনেক সময়ে পরিবর্ত্তিত হইয়া গিয়াছে এবং নূতন নূতন নিয়োগাদিরও যে সৃষ্টি করা হইয়াছে—ইহা ইতিহাস, প্রাচীন সংস্কৃত-সাহিত্য ও তাম্রশাসনাদিরূপ প্রত্ননিদর্শনের আলোচনা হইতে প্রতীয়মান হইয়া থাকে।


 

এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০১৭ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৫৭ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।