প্রবাস-চিত্র/অতিপ্রকৃত কথা
অতিপ্রকৃত কথা।
কেহ পর্য্যটনের উদ্দেশ্যে দেশভ্রমণে বাহির হয়, কেহ জ্ঞান লাভের উদ্দেশে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে। কিন্তু পৃথিবীর সকলে সমান নয়; এমনও দেখা গিয়াছে, কেহ কেহ তহবিল তছরুপাত করিয়া, কেহ বা নরশোণিতে হস্ত কলঙ্কিত করিয়া দেশভ্রমণে বাহির হইয়াছে। কিন্তু এ সকল ভিন্ন এমনও দুই এক জন হতভাগ্য লোকের অভাব নাই, যাহারা শ্মশানক্ষেত্রে জীবনের যথাসর্ব্বস্ব বিসর্জ্জন দিয়া, উদাসহৃদয়ে, ব্যাকুল অন্তরে, লক্ষ্যহারা ধূমকেতুর ন্যায়, এক অনির্দ্দিষ্ট পথে অগ্রসর হইয়াছে। সেই রমণীয় নেপথ্য তরুচ্ছায়াসমাচ্ছন্ন, কুসুমসুরিভিপরিব্যাপ্ত, সুমধুর সমীরণ হিল্লোলিত এবং বিহঙ্গ কলকাকলীমুখরিত বাহ্যপ্রকৃতির স্নিগ্ধ সৌন্দর্য্যে সজ্জিত থাকিতে পারে, কিন্তু তাহার হৃদয় সে সৌন্দর্য্যগ্রহণের অধিকারী নহে, সমগ্র পৃথিবীর বিচিত্র শোভা সন্দর্শন করিয়া আসিলেও তাহার মুখ হইতে তৎসম্বন্ধে কোনও বিশেষ কথা বাহির হইবার সম্ভাবনা নাই। উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে ভ্রমণ করিয়া যাহা দেখিয়াছি, অনেকেই তাহা দেখিবার সুযোগ পান নাই; কিন্তু সেই সমস্ত মহান সুন্দর দৃশ্য, প্রকৃতির সেই বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যক্ত সৌন্দর্য্য প্রাণ দিয়া উপভোগ করিতে পাই নাই; কিন্তু তথাপি দেশে দেশে ঘুরিয়াছি। জীবনে কখনও কবিতার সেবা করি নাই, এভাত-বায়ুর মৃদুমন্দ সঞ্চালন, প্রস্ফুটিত কুসুমের স্নিগ্ধ শোভা কখনও আমাকে ব্যাকুল করে নাই। বজ্রকঠোর হৃদয় লইয়া সংসারের সহিত সংগ্রাম করিতে করিতে জীবনপথে অগ্রসর হইতেছিলাম, হঠাৎ এক দিন কেন্দ্রভ্রষ্ট হইয়া পড়ায় যে দিকে দুই চক্ষু গেল, সেই দিকে চলিলাম। ইহাই আমার ভ্রমণের ইতিহাস। ইহাতে এমন কিছু নাই, যাহাতে অপরের কৌতূহল উদ্দীপ্ত হইতে পারে; কিন্তু হিমালয়প্রদেশে ভ্রমণ করিতে করিতে এমন দুই একটি ব্যাপার আমার প্রত্যক্ষ হইয়াছে, যাহা আমার নিকট নিতান্ত দৈবঘটনা ভিন্ন আর কিছু বলিরাই মনে হয় না। কিন্তু বর্ত্তমান যুগে “অতিপ্রকৃতে” বিশ্বাস করিলে হৃদয়ের দুর্ব্বলতা প্রকাশ পায়। যাহা হউক, আজ একটি ঘটনার উল্লেখ করিতেছি; ইহা বৈজ্ঞানিক পাঠকের মনে যে সিদ্ধান্তই উপস্থিত করুক, অনেকের নিকট ইহা রহস্যাবৃত একটি জটিল তত্ত্ব ভিন্ন অন্য কিছু বোধ হইবে না। আমি কিন্তু এ পর্য্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তেই উপস্থিত হইতে পারি নাই।
একবার আমি গাড়োয়ালরাজ্যের রাজধানী শ্রীনগর হইতে তিহরী হইয়া গঙ্গোত্রীর পথে অগ্রসর হইতেছিলাম। আমরা যে পর্ব্বতের মধ্যে যাইতেছিলাম, তাহা ইংরেজসীমার বাহিরে অবস্থিত; তিহরী রাজার রাজ্য, অর্দ্ধ স্বাধীন হিন্দুরাজ্য। পর্ব্বতের মধ্যে পথের অবস্থা বড় ভাল নহে, বিশেষ আমরা যে পথে যাইতেছিলাম, সে পথ অত্যন্ত দুরারোহ এবং সঙ্কটপূর্ণ বলিয়া তীর্থযাত্রী এবং অন্যান্য পথিকগণ সাধারণতঃ এ পথে ভ্রমণ করে না; কেবল কষ্টসহ সাধু সন্ন্যাসীর দল পথ সংক্ষিপ্ত করিবার জন্য এই পথে গমন করেন। লোকযাতায়াতের অল্পতাহেতু অনেক অনিমন্ত্রিত কণ্টকলতা রাস্তায় অনধিকার প্রবেশ করিয়া স্থানে স্থানে পুঞ্জীভূতভাবে অবস্থান করিতেছে, এবং পরিব্রাজকবর্গের কঠিন পাদচর্ম্মের সহিত কোমলসম্বন্ধস্থাপনের জন্য উদ্গ্রীব রহিয়াছে। আমরা অবিশ্রান্ত সেই তীক্ষ্ণ কণ্টকাঘাত সহ্য করিতে করিতে চলিলাম; পদাহত হইয়া শুধু যে তাহারাই ক্ষেপিয়া উঠিল, তাহা নহে, তাহাদের প্রজাবৃন্দও নিজেদের অস্ত্র শস্ত্র বাহির করিয়া আমাদিগকে আক্রমণ করিল। ক্ষুদ্র মধুমক্ষিকাকুলের তাড়নায় আমরা বিব্রত হইয়া পড়িলাম। ক্ষুদ্র বটে, কিন্তু দলবদ্ধ হইয়া যখন তাহারা বিপক্ষকে আক্রমণ করে, তখন বড় বড় বীরপুরুষকেও আত্মরক্ষার জন্য ব্যস্ত হইতে হয়।
প্রাতঃকালে যাত্রা করিয়া এই প্রকার কষ্ট সহ্য করিতে করিতে বেলা প্রায় ১১ টার সময় এক সন্ন্যাসীর কুটীরে উপস্থিত হইলাম। চলিতে আরম্ভ করিয়া লোকালয়ের চিহ্নমাত্র পাই নাই; এমন কি কোনও দিকে সামান্য পর্ণকুটীর পর্য্যন্ত দৃষ্টিপথে পতিত হয় নাই। চতুর্দ্দিকে কেবল প্রকাণ্ডকায় বৃক্ষশ্রেণী, শাখাপল্লব বিস্তারপূর্ব্বক সেই নির্জ্জন প্রদেশের নীরবতা শতগুণে বৃদ্ধি করিয়া, কত কাল হইতে উন্নত মস্তকে দণ্ডায়মান রহিয়াছে। যোগনিমগ্ন যোগীর ন্যায় কত কাল হইতে তাহারা সমাধিমগ্ন! নিম্নে পাষাণস্তূপ কোমল লতাপল্লবে সমাচ্ছন্ন, এবং চতুর্দ্দিক নির্ম্মলসলিলা নির্ঝরিণীর অবিরাম ঝর্ঝর্ শব্দ! এখানে লোকালয় নাই, পার্ব্বত্য অসভ্যগণও এত দূরে আসিয়া বাস করিতে চাহে না। যদি সূর্য্যকিরণোদ্ভাসিত পর্ব্বতের অনুর্ব্বর গাত্রে, কিম্বা বায়ুতাড়িত শরশরকম্পিত বৃক্ষপত্রে দৃষ্টি সম্বন্ধ করিয়া রাখিলে ক্ষুধার লাঘব হইত, তাহা হইলে এই স্থানে লোকে গৃহ নির্ম্মাণ করিয়া বাস করিত, কিন্তু এখানে জীবনসংগ্রামোপযোগী কিছু আয়োজন না থাকায়, লোকের বসবাসের কোনও সম্ভাবনা ছিল না। এই বিজন প্রদেশের গভীর অরণ্যে যদি কাহারও বাসের আবশ্যক কিম্বা ইচ্ছা হয়, তাহা হইলে সে ব্যক্তিকে ‘অতিমানুষ’ বা ‘অমানুষ’ বলা যাইতে পারে। হয় সে মানুষের ভয়ে এরূপ হলে লুক্কায়িত থাকে, না হয় সে মনুষ্যসমাজ হইতে অনেক উচ্চে উঠিয়া এইরূপ নির্জ্জন প্রদেশই আপনার সধনার উদ্যাপনক্ষেত্রে পরিণত করে।
উপরে যে সন্ন্যাসীর কথা বলিয়াছি, তিনি যে শেষোক্ত শ্রেণীর ব্যক্তি, তাহা তাঁহার আকার প্রকার দেখিয়া পরিচয় হইবার পূর্ব্বেই বুঝিয়াছিলাম। কথোপকথনে জানিতে পারিলাম, তিনি পরম জ্ঞানী; তাঁহার সম্বন্ধে কোনও কথা বলিবার পূর্ব্বে, তাঁহার আশ্রমের কিঞ্চিৎ বর্ণনা করিলে, বোধ হয়, নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক হইবে না।
আশ্রমের কথা শুনিলে দুইটি বিভিন্ন চিত্র মনে উদিত হইয়া থাকে। একটি চিত্র আর্য্যঋষিগণের অনুপম, উজ্জ্বল, পবিত্রতাপূর্ণ, পরমশান্তিরসাস্পদ পুণ্যতপোবনের,—যাহার অমর মহিমা কীর্ত্তন করিতে কালিদাসের সকল প্রতিভা ব্যয়িত হইয়াছিল, এবং যাহার মাধুর্য্য এই জনকোলাহলসংক্ষুব্ধ রৌদ্রোত্তপ্ত ধূলিময় সংগ্রামক্ষেত্রেও কোনও যুগান্তর হইতে স্মৃতির সুমন্দ-হিল্লোল প্রবাহিত হইয়া তাপক্লিষ্ট হৃদয়ে বিপুল আনন্দ প্রদান করিতেছে। আর একটি চিত্র,— স্থূলোদর, মুক্তকচ্ছ, শিখাকৌপীনসমন্বিত বৈরাগীবৃন্দের বৈষ্ণবীপরিবেষ্টিত আখড়ার। কিন্তু এই সন্ন্যাসীর ‘আশ্রম’ এই উভয় প্রকার আশ্রম হইতে সম্পূর্ণ বিভিন্ন। সন্ন্যাসী বাস করিতেছেন বলিয়াই ইহাকে আশ্রম বলিলাম, নতুবা ইহা এক খানি ক্ষুদ্র পর্ণকুটীর ভিন্ন আর কিছুই নহে। কুটীরের কিছুমাত্র পারিপাট্য নাই, সপ্তাহের মধ্যে এক দিনও কুটীরপ্রাঙ্গণস্থ স্তূপাকার বৃক্ষপত্রগুলি অপসারিত হয় কি না সন্দেহ, হইলেও দুই দিনের মধ্যেই প্রাঙ্গণ আবার পূর্ণ হইয়া যায়। কুটীরের বাহিরের অবস্থা এইরূপ, ভিতরের অবস্থা ততোধিক সুন্দর। হয় ত সন্ন্যাসীঠাকুর বহুদিন পূর্ব্বে কুটীরে অগ্নি জ্বালিয়াছিলেন, এখনও অর্দ্ধদগ্ধ কাষ্ঠখণ্ড ও শুষ্ক পত্র কুটীরের ভিতর পড়িয়া রহিয়াছে; আবার কোনও দিন অগ্নি জ্বালিবার প্রয়োজন হইলে সেগুলি কাজে লাগিতে পারে। গৃহের সাজসজ্জার মধ্যে একখানি জীর্ণ চর্ম্ম; কিন্তু তাহা কোনও ব্যাঘ্রের দেহের শোভা বৃদ্ধি করিয়াছিল, অথবা কোনও দুর্ব্বলহৃদয় মৃগের দেহাবরণ ছিল, আমি ত দূরের কথা, প্রসিদ্ধ প্রাণিতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতগণও তাহার নিরূপণ করিতে পারেন কি না, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। চর্ম্মখানি যে কত কালের পুরাতন, তাহাও স্থির করা দুরূহ; ক্রমাগত ব্যবহারে তাহা সম্পূর্ণরূপে নির্লোম হইয়া গিয়াছে। এই আসনে সন্ন্যাসীর কি অভিপ্রায় সিদ্ধ হইত, তাহা বুঝিতে পারিলাম না, কারণ ইহা শত শত ছিত্রে পরিশোভিত, এবং ইহার যে অংশে ছিদ্রসংখ্যা কিছু কম ছিল, তাহা মৃত্তিকানুলিপ্ত; কিন্তু তথাপি সন্ন্যাসী ঠাকুর এই আসনের মায়া কাটাইতে পারেন নাই; সংসারে এরূপ মায়ার দৃষ্টান্ত বিরল নহে। শুনিয়াছি, শুকদেব গোস্বামীও একবার তাঁহার অদ্বিতীয় সম্বল কৌপীনখানিকে অগ্নিমুখে পতিত দেখিয়া ক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছিলেন।
যাহা হউক, এই নিভৃত পত্রকুটীরে জীর্ণ আসনে উপবেশন করিয়া সন্ন্যাসী কাম্যফললাভের আশায়,—চিরবাঞ্ছিতের উদ্বোধনে দিনের পর দিন অতিবাহিত করিতেছেন; শ্রান্তি নাই, বিরক্তি নাই, উৎসাহের অভাব নাই। প্রাবৃটের প্রচণ্ড বর্ষণ, ঝড় ও ঝঞ্ঝাবাত তুচ্ছ জ্ঞান করিয়া ইনি নিবিষ্টচিত্তে কালযাপন করিতেছেন; দেখিয়া, মনে এক অপূর্ব্ব ভাবের উদয় হইল। আমরা বিলাসসাগরে মগ্ন থাকিয়া অনেক সময় মনে করি—পারত্রিক ফললাভের জন্য দেহের নির্য্যাতন মূঢ়তা মাত্র; এ কথা কতদূর যুক্তিযুক্ত, বলা যায় না; কিন্তু কঠোরতা ভিন্ন কোনও কালে কোনও দেশে সিদ্ধিলাভ হয় নাই, এ কালেও হইবার সম্ভাবনা নাই। অতএব কঠোরতা বা ত্যাগস্বীকার আবশ্যক। এই সন্ন্যাসীকে দেখিয়া আমার একবারও মনে হয় নাই যে, নিদারুণ কঠোরতায় তাঁহার দেহ ভগ্ন, মন অপ্রসন্ন বা আনন্দশূন্য হইয়াছে, হয় ত তিনি সচ্চিদানন্দের চিরপ্রসন্নভাব বিন্দুমাত্রও লাভ করিতে সক্ষম হইয়াছেন, তাই তাঁহার এত আনন্দ।
কুটীরে কয়েকখানি অতি প্রাচীন হস্তলিখিত পুঁথির ধ্বংসাবশেষ দেখিতে পাইলাম। পুঁথিগুলির মৃত্তিকায় পরিণত হইবার আর অধিক বিলম্ব নাই; কিন্তু সে জন্য সন্ন্যাসীর কিঞ্চিৎমাত্রও উদ্বেগের লক্ষণ দেখা গেল না। পুঁথিগুলি পড়িবারও কোনও উপায় দেখিলাম না; অক্ষর গুলি অনেক দিন বিদায় গ্রহণ করিয়াছে। সন্ন্যাসীর কুটীরে আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হইল না। এমন কি, একটি লোটা কি কমণ্ডলু পর্য্যন্তও নাই।
কুটীরের পার্শ্বেই একটি ঝরণা; অবিশ্রাম ঝর্ ঝর্ করিয়া জল ঝরিতেছে। এই শব্দ এবং সঙ্গে সঙ্গে বৃক্ষপত্রের শর্শর্ কম্পন, আর চতুর্দ্দিকের মহান গম্ভীর দৃশ্য আমার চঞ্চল হৃদয়েও এক অভিনব স্বর্গের সুরম্য কল্পনা জাগ্রত করিল। হায়, পার্থিব সুখ ও শান্তি, উপভোগ ও বিরাম কি আবিলতাপূর্ণ! কিন্তু তাহাতেই আমরা মুগ্ধ। এই নির্ঝরিণীর কলতানের সহিত হৃদয় মিশাইয়া—তদ্গতচিত্তে যখন সন্ন্যাসী অভীষ্ট দেবতার ধ্যানে মগ্ন হন, তখন তাঁহার হৃদয়ের রুদ্ধ উপকূল এক অনাবিল আনন্দের বিপুল উচ্ছাসে প্লাবিত হইয়া যায়, তাহা অনুভব করিতে আমরা সম্পূর্ণ অশক্ত।
কুটীরের প্রতি সন্ন্যাসীর যত্নের অভাব হইলেও দেখিলাম—এই নির্ঝরিণীর প্রতি তাঁহার অসীম অনুরাগ। কুটীরে কিয়ৎকাল বিশ্রাম করিবার পর তিনি আমাদিগকে হস্তমুখাদি প্রক্ষালন করিতে অনুমতি প্রদান করিলেন। ঝরণার কাছে যাইবার জন্য আমরা বিশেষ ব্যস্ত হইয়াছিলাম; বেলা ১১ টা পর্য্যন্ত পার্ব্বত্য পথে ভ্রমণ করিয়া শরীর যেরূপ অবসন্ন ও নিস্তেজ হইয়া পড়ে, তাহা ভুক্তভোগী ভিন্ন অন্য কেহ অনুমান করিতে পারিবেন না। সন্ন্যাসীর অনুমতিমাত্রেই আমি ও আমার সহচর সন্ন্যাসী নির্ঝরের ধারে উপস্থিত হইলাম। দেখিলাম, কতকগুলি প্রস্তরখণ্ড সজ্জিত করিয়া আবক্ষ-উচ্চ চক্রকার বেদী নির্ম্মিত হইয়াছে, সেই বেদীতে উঠিবার জন্য আল্গা পাথর স্তূপাকারে রাখিয়া সিঁড়ি প্রস্তুত করা হইয়াছে। তাহার পরই ঝরণার নিকট উপস্থিত হইবার জন্য সুদৃশ্য ঘাট কিন্তু এ সমস্তই আল্গা পাথর সুন্দররূপে বিন্যস্ত করিয়া নির্ম্মাণ করা হইয়াছে। এই ঘাটের শোভা অতি রমণীয়; যেখানে যে পাথর স্থাপন করিলে শোভা বৃদ্ধি হয়, সেইরূপ করিয়া সন্ন্যাসী ঘাট সাজাইয়াছেন। কোনও স্থানে কাল পাথর,—ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, আবলুস বিনিন্দিত; কোথাও তুষারধবল শ্বেত প্রস্তর; কোথাও অত্যুজ্জ্বল লোহিতপ্রস্তর। এইরূপ নানা আকার ও নানা বর্ণের প্রস্তরখণ্ড দ্বারা এমন সুন্দর লতা পাতা ও ফুল অঙ্কিত করা হইয়াছে যে, দেখিলে কখনই মনে হয় না,—এই সন্ন্যাসীর সুদীর্ঘ জীবন কেবলমাত্র তপশ্চর্য্যাতেই অতিবাহিত হইয়াছে। তাজমহলের মধ্যে বহুমূল্য প্রস্তরখণ্ড দ্বারা যে লতা ও পুষ্প অঙ্কিত আছে, সন্ন্যাসী এই নির্জ্জন পর্ব্বতের একটি রমণীয় উপত্যকায় তাহারই অনুকরণে এ সকল প্রস্তুত করিয়াছেন। নির্ঝরিণীর অতি নিকটে একটি সুদীর্ঘ বৃক্ষ; তাহার তলদেশ প্রস্তরবদ্ধ। এই বৃক্ষের ত্বক্ অত্যন্ত মলিন, সন্ন্যাসী বহু দিন ধরিয়া বোধ হয় এই বৃক্ষে হেলান দিয়া কালাতিপাত করিয়াছেন। ঘাটের নিকট ক্ষুদ্র ও বৃহৎ বৃক্ষের শ্রেণী দেখিতে পাওয়া গেল;—সন্ন্যাসীর তপোবলে কি হস্তকৌশলে, কি উপায়ে জানি না,—বৃক্ষগুলি এমন সুন্দরভাবে সজ্জিত যে, তাঁহার সৌন্দর্য্যদৃষ্টির প্রশংসা না করিয়া থাকা যায় না। সমস্ত দেখিয়া বুঝিলাম, সন্ন্যাসী এই রমণীয় নির্ঝরিণীর তীর, দীর্ঘপত্রপরিশোভিত সমুচ্চ বৃক্ষশ্রেণীর সুস্নিগ্ধ ছায়াতল, আর স্বহস্তরচিত রম্য প্রস্তরবেদীকেই আপনার বাসস্থানে পরিণত করিয়াছেন; ইহাই তাঁহার বিরাম-কুঞ্জ; কুটীর উপলক্ষমাত্র।
বৈশাখ মাসের দিন, মধ্যাহ্ণ কাল; রৌদ্র অত্যন্ত প্রখর। রাত্রে অত্যন্ত শীত পড়ে বটে, কিন্তু দিবসের সমুজ্জ্বল সূর্য্যকিরণে পর্ব্বত ভয়ানক উত্তপ্ত হইয়াছে। আমি এখনও কম্বলধারী সন্ন্যাসী সাজিয়া উঠিতে পারি নাই, অতএব গাত্রবস্ত্রাদি পরিত্যাগ করিয়া স্নান করিতে আরম্ভ করিলাম। আমার সঙ্গী সন্ন্যাসী তাঁহার স্বশ্রেণীতে একজন প্রধান ব্যক্তি, অতএব তিনি স্নান করা বাহুল্য বোধ করিলেন। এ পর্য্যন্ত আমি তাঁহাকে এক দিনও স্নান করিতে দেখি নাই; সুতরাং এই অস্বাভাবিক কার্য্যে প্রবৃত্ত হইবার জন্য আর তাঁহাকে অনুরোধ করিলাম না।
সন্ন্যাসী কোন্ সময় বৃক্ষমূলে আসিয়া বসিয়াছিলেন, তাহা জানিতে পারি নাই; অত্যন্ত উৎসাহের সহিত দীর্ঘকাল ধরিয়া আমাকে সেই সুশীতল নির্ঝরিণী প্রবাহে স্নান করিতে দেখিয়া পলিতকেশ, শ্বেতশ্মশ্রু, অশীতিপর বৃদ্ধ আমাকে ডাকিয়া স্নেহগম্ভীরস্বরে বলিলেন, “এত্না ঘড়ি ঠাণ্ডা পানিয়ে মৎ রহে না।” তাঁহার কথা শুনিয়া আমি তাড়াতাড়ি উপরে উঠিতে আরম্ভ করিলাম; কিন্তু উঠিতে উঠিতেও অঞ্জলি করিয়া জল লইয়া মাথায় দিতে লাগিলাম। মনে হইল, সেই নির্ম্মল পূত নির্ঝরিণীসলিলে আজন্মসঞ্চিত পাপরাশি ধৌত হইয়া গেল; হৃদয়ের তাপও যদি এমনি করিয়া ধুইয়া যাইত!
আমার সঙ্গী সন্ন্যাসীর সঙ্গে এই সন্ন্যাসীর ইতিমধ্যেই বেশ আলাপ হইয়া গিয়াছে; উভয়ের বয়ঃক্রম প্রায় সমান, এবং যোগমার্গেও হয় ত উভয়েই সমান অগ্রসর হইয়াছেন। সঙ্গী সন্ন্যাসীকে আমি কুড়াইয়া পাইয়াছিলাম; দরিদ্র যেমন পথিমধ্যে রত্ন কুড়াইয়া পায়, আমি সেইরূপ অগণ্য সাধারণ সন্ন্যাসীর জনতার মধ্য হইতে তাঁহাকে কুড়াইয়া পাইয়াছিলাম। কিন্তু দরিদ্র রত্নের আদর জানে না, অকিঞ্চিৎকর প্রস্তর ভাবিয়া তাহা দূরে নিক্ষেপ করে, আমিও আমার এই সঙ্গী সন্ন্যাসীকে অধিক দিন বাঁধিয়া রাখিতে পারি নাই। যদি তাঁহার সঙ্গী হইবার উপযুক্ত হইতাম, তাহা হইলে হয় ত পুনর্ব্বার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সুখ দুঃখ এবং নিরাশা ও আশায় সদা-উদ্বেলিত দুর্ব্বল হৃদয় লইয়া এই দুঃখশোকময় সংসারের ভগ্ন নাট্যশালার শুষ্ক কুসুমদাম ও নির্ব্বাণপ্রায় দীপালোকের মধ্যে নিক্ষিপ্ত যবনিকা পুনরুত্তোলন পূর্ব্বক অভিনয়কার্য্য আরম্ভ করিতে হইত না।
উপরে উঠিয়া বস্ত্রপরিবর্ত্তনপূর্ব্বক সন্ন্যাসীর সমীপস্থ হইয়া দেখিলাম, তাঁহার নিকটে কয়েকটি মূল রহিয়াছে; দেখিতে প্রায় মানকচুর মত, কিন্তু তত মোটা নহে; অনুমান করিলাম, আমি স্নান করিতে নামিলে অতিথিসৎকারের জন্য সন্ন্যাসী অরণ্য হইতে এই কচু সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছেন। যাহা হউক, অতিথিসৎকারকার্য্য কিরূপ সম্পন্ন হইবে, ক্ষুধার আধিক্যবশতঃ যখন আমি মনে মনে সেই কথার আন্দোলন করিতেছিলাম, সেই সময়ে সন্ন্যাসী সহাস্যবদনে বলিলেন, “বাচ্চা, তুম্হারা খানে কি ওয়াস্তে ইয়ে মূল লায়া।” এই ভীষণদর্শন কচু কিরূপে খাইব, এই চিন্তাতেই আমি অস্থির হইয়া পড়িলাম। বহুদূর পর্য্যটন ও পরিপাকশক্তির বাহুল্যবশতঃ ক্ষুধার অপ্রতুল ছিল না; কিন্তু সেই দারুণ ক্ষুধানালের যে ইন্ধন সংগ্রহ হইল, তাহা অত্যন্ত অসাধারণ। বুঝিলাম, “যেমন বাঘা ওল, তেমনই বুনো তেঁতুল”-এই বঙ্গীয় গ্রাম্য প্রবচন সর্ব্বত্র নিঃসঙ্কোচে ব্যবহার করা যায় না। আমি নির্ব্বাক হইয়া সন্ন্যাসীর কাণ্ড দেখিতে লাগিলাম। নিকটে যে সকল শুষ্ক কাষ্ঠ পড়িয়াছিল, তাহাই সংগ্রহ করিয়া তিনি অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিলেন এবং সেই অগ্নিতে তাঁহার সংগৃহীত উক্ত কচুজাতীয় উদ্ভিদমূল নিক্ষেপ করিলেন; বুঝিলাম, ব্যাপার আরও গুরুতর হইয়া পড়িল। দেশে আত্মীয় স্বজনের নিকট বহু দিন পূর্ব্বে যে নিরাকার আহারের ব্যবস্থা পাওয়া গিয়াছিল, এতদিন পরে এই বিদেশে সন্ন্যাসীর কৃপায় তাহা সাকার দেহ ধারণপূর্ব্বক আমার দগ্ধোদরপরিতৃপ্তির উপায় হইয়া দাঁড়াইল। এ পর্য্যন্ত অনেক দুরারোহ, বিপদসঙ্কুল স্থানে ভ্রমণ করিয়াছি, আহার্য্য সামগ্রীর অভাবে ক্রমাগত দুই তিন দিন সামান্য বিল্বপত্রমাত্র চর্ব্বণ করিয়া ক্ষুৎপিপাসার প্রশমন করিতে হইয়াছে, কিন্তু এ দগ্ধভাগ্যে ইতিপূর্ব্বে কোনও দিনই এমন কচুপোড়া জুটিয়া উঠে নাই। আমি বিস্ময়বিহ্বলনেত্রে সন্ন্যাসীর কার্য্য নিরীক্ষণ করিতেছি, এমন সময়ে সেই সন্ন্যাসী অর্দ্ধদগ্ধ কচু অগ্নি হইতে তুলিয়া তাহার উপরের খোসা ছাড়াইয়া ফেলিলেন; ফিতরে যে সুসিদ্ধ শ্বেত পদার্থ পাওয়া গেল, সন্ন্যাসী তাহাই আমাকে খাইতে দিলেন; আমার সঙ্গী সন্ন্যাসীকেও কিয়দংশ দান করিয়াছিলেন, কিন্তু তিনি আহার করিলেন না। খাওয়া উচিত কি না, এবং খাইলে মুখের কিরূপ শোচনীয় অবস্থা হওয়া সম্ভব, এই সম্বন্ধে মনের মধ্যে প্রবল আন্দোলন চলিতেছিল, এমন সময় সন্ন্যাসী তাহা খাইবার জন্য পুনর্ব্বার আমাকে অনুরোধ করিলেন। তাঁহার অনুরোধ আর উপেক্ষা করা উচিত নহে, এই মনে করিয়া, আমি সসঙ্কোচে সেই কচুপোড়ায় দন্তসংযোগ করিয়া তাহার আস্বাদগ্রহণের দুঃসাহস প্রকাশ করিলাম; কিন্তু কি আশ্চর্য্য! কচুপোড়ায় অমৃতের আস্বাদন অনুভব করিলাম। এমন সুস্বাদু, মিষ্ট রুচিকর দ্রব্য আর কখন খাইয়াছি বলিয়া মনে হইল না; নবনীর ন্যায় সুকোমল, কিন্তু যেন মিছরী-মাখানো, অথচ সেই মিষ্টতায় উগ্রতা নাই। কাহার সহিত তাহার তুলনা করা যাইতে পারে, আজও তাহা ঠিক করিয়া উঠিতে পারি নাই; তেমন দ্রব্য আর কখনও খাই নাই, সুতরাং তাহার সহিত কাহারও তুলনা করিতে পারিলাম না। শুনিয়াছি, কলিকাতায় উৎকৃষ্ট আম্র ও সন্দেশ দ্বারা উত্তম জলযোগ হইতে পারে, যদি কোনও পাঠক অনুগ্রহপূর্ব্বক কোনও দিন আমার প্রতি সেইরূপ জলযোগের ব্যবস্থা করেন, তাহা হইলে সেই পরমরমণীয় কচুপোড়ার সহিত তাহার এক দিন তুলনা করিয়া দেখি। দুইটি কচুপোড়া (আধসেরেরও অধিক হইবে) ভক্ষণপূর্ব্বক গণ্ডূষে করিয়া নির্ঝরিণীর জল পান করিলাম। মনে হইল, জীবনে আর কখনও এমন তৃপ্তি লাভ করি নাই; এখন মনে হইতেছে, আমার সহৃদয় পাঠকগণকে যদি এই কচুপোড়ার অংশ দিতে পারিতাম, তাহা হইলে অধিকতর পরিতৃপ্ত হইতাম!
সেই বৃক্ষতলে বসিয়া সন্ন্যাসী সন্ন্যাসীতে কত কথাই হইতে লাগিল। নির্জ্জন মধ্যাহ্ণ এবং চতুর্দ্দিক অত্যন্ত স্তব্ধ; শুধু মধ্যাকাশ হইতে এই নিদাঘের মার্ত্তণ্ড ধুসর পর্ব্বতগাত্রে অগ্নিকণার ন্যায় তীক্ষ্ণ কিরণ বর্ষণ করিতেছে, এবং উত্তপ্ত বায়ুর উচ্ছৃঙ্খল হিল্লোল বৃক্ষপত্র কম্পিত করিয়া প্রবাহিত হইতেছে। আমি গৃহীও নহি, সন্ন্যাসীও নহি, এবং ধর্ম্মের কোনও নিগূঢ় তত্ত্বও অবগত নহি, অতএব সসম্ভ্রমে কিঞ্চিৎ দূরে বসিয়া তাঁহাদের ধর্মালোচনা শুনিতে লাগিলাম। কথা কহিতে কহিতে যখন তাঁহারা একটু চুপ করিলেন, তখন আমার মনে গান গাহিবার প্রবৃত্তি বড়ই প্রবল হইয়া উঠিল, আমি সেই মধ্যাহ্নের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া গাহিতে লাগিলাম,—
“কবে সমাধি হ’বে শ্যামাচরণে”—
গান শেষ হইলে আমি উঠিয়া কিয়ৎক্ষণ ইতস্ততঃ ঘুরিয়া বেড়াইলাম, এবং অল্পকাল পরে যাত্রা করিবার জন্য প্রস্তুত হইলাম। সন্ন্যাসী ঠাকুর বলিলেন, এই প্রখর রৌদ্রে বাহির হইবার কোনও আবশ্যক নাই, বিশেষ এখান হইতে একটি ৪ মাইল দীর্ঘ বাঁক আছে; এই পথের মধ্যে একটিমাত্রও বৃক্ষ কিংবা নির্ঝর নাই, সুতরাং যে সকল সাধু সন্ন্যাসী এই পথে বিচরণ করেন, তাঁহারা হয় অত্যন্ত প্রত্যূষে, না হয় অপরাহ্নে, এই পথে বাহির হয়। কিন্তু গন্তব্য পথের মধ্যে বসিয়া থাকা আমার নিকট বিষম বিরক্তিকর; অতএব সন্ন্যাসীর নিষেধসত্ত্বেও আমি রওনা হইলাম; সঙ্গী সন্ন্যাসী বলিলেন, তিনি অপরাহ্নে যাত্রা করিবেন। আমি আর দ্বিরুক্তি না করিয়া বাহির হইলাম।
আমি একটি পর্ব্বতের পশ্চিম গা বহিয়া নামিতেছিলাম সুতরাং পশ্চিম আকাশের সূর্য্য আমার উপর প্রখর কিরণ বর্ষণ করিতে লাগিল। অল্প দূর অগ্রসর হইয়াই সন্ন্যাসিকথিত সেই প্রকাণ্ড বাঁক দেখিতে পাইলাম—জ্যাপথে অর্দ্ধ মাইলের অধিক নহে বটে, কিন্তু মনুষ্যের পক্ষে সে পথে যাওয়া অসম্ভব, অতএর পরিধি বেষ্টন করিয়াই যাইতে হইবে। রাস্তার এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্য্যন্ত সমস্তই দেখিতে পাওয়া গেল। রাস্তা যদিও ৪ মাইল কিন্তু দৃষ্টিরোধ করিবার কিছুই ছিল না, বিশেষ পথটি বৃত্তাকারে ঘুরিয়া আসাতে তাহার দূরত্ব অধিক বলিয়া বোধ হয় নাই।
গাত্রে ভয়ানক রৌদ্র লাগিতে লাগিল; বৃক্ষলতাহীন মরুময়, কঠিন প্রান্তরের উপর দিয়া পথ; রৌদ্রতাপে তাহা অগ্নির ন্যায় উত্তপ্ত হইয়াছে; ইহার উপর স্থানে স্থানে শৈবালের ন্যায় ক্ষুদ্র কণ্টকতরু, এবং ক্রমাগত চড়াই ও উতরাই। কিয়দ্দূর যাইবার পর বুঝিলাম,—বিজ্ঞ, বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর কথা অবহেলা করিয়া ভাল কাজ করি নাই। প্রায় এক মাইল যাইতে না যাইতেই আমার ভয়ানক পিপাসা লাগিল। নিকটে জল পাইবার কোনও উপায়ই নাই। যদি সন্মুখে কোথাও জল পাইবার উপায় থাকে, এই আশার প্রাণপণে চলিতে লাগিলাম। এক একবার অগ্রসর হই, আর পশ্চাতে ও সম্মুখে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চাহিয়া দেখি; কোনও দিকেই জনমানবের সাড়া শব্দ নাই। সম্মুখে বক্র, দীর্ঘ, সংকীর্ণ পার্ব্বত্য পথ, এবং দুই পাশে উচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। নিরুপায় হইয়া প্রাণপণে ছুটিতে লাগিলাম, পিপাসায় গলা শুকাইয়া গেল; মুখে কিছুমাত্র রস নাই, বুকের মধ্যে ভয়ানক যন্ত্রণাবোধ হইতে লাগিল; কিন্তু তখনও চলচ্ছক্তিহীন হইনাই; জীবনের আশা ত্যাগ করিয়া তখনও চলিতেছিলাম। কিন্তু এরূপ অবস্থার আর কতক্ষণ চলিতে পারা যায়? ক্রমে শরীর অবসন্ন হইয়া আসিল, পদদ্বয় শরীরের ভার বহনে সম্পূর্ণ অশক্ত হইয়া পড়িল। আর দাঁড়াইতে পারিলাম না; গাত্রবস্ত্রখানি সেইখানে ফেলিয়া সেই প্রবল রৌদ্রের মধ্যে শুইয়া পড়িলাম; বুঝিতে পারিলাম, আমার জ্ঞান অপহৃত হইতেছে, জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে আর অধিক ব্যবধান নাই।
পাঠক মহাশয় বিশ্বাস করিবেন কি না, জানি না; না করিলেও তাঁহাদের দোষী করিতে পারি না; তাহার পর যাহা হইল, তাহা সময়ে সময়ে আমার নিকটই অবিশ্বাস্য বলিয়া মনে হয়, অন্যের ত দূরের কথা। যখন আমি জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিস্থলে অবস্থিতি করিতেছিলাম, এবং মুহূর্তের পর মুহূর্ত আমার চৈতন্য অপসৃত হইয়া চতুর্দিক অন্ধকার হইয়া আসিতেছিল, সেই সময় সহসা আমার কর্ণমূলে যেন কাহার নিশ্বাসপতনের শব্দ অনুভব করিলাম। বাতাস ভিন্ন তাহা যে আর কিছু হইতে পারে, তখন তাহা মনে হয় নাই, কিন্তু পর মুহূর্তেই কে মধুর কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন, “বাবা, বড়ি পিয়াস লাগা?”—চক্ষুর উপর কুয়াশাজাল বিস্তৃত হইতেছিল, কিন্তু এমন সময়ে কর্ণকে কে প্রব ঞ্চিত করিবে? জনমানবশূন্য এই ভীষণ পথপ্রান্তে এই ভয়ানক রৌদ্রের মধ্যে কাহার ইন্দ্রজালপ্রভাবে আমার রক্ষাকর্তার আবির্ভাব হইবে?—তাহার কিছুমাত্র সম্ভাবনা ছিল না; তথাপি মরণাপন্ন জীবনের প্রাণপণ শক্তিতে রুদ্ধনয়ন ধীরে ধীরে উন্মুক্ত করিলাম; যাহা দেখিলাম, তাহাতে আনন্দ বিস্ময় যুগপৎ আমার হৃদয় অধিকার করিল। দেখিলাম, আমার শিরোদেশে সন্ন্যাসী, হস্তে একটি লাল নূতন কমণ্ডলু। আমার ঠিক তখনকার মনের ভাব এখন বর্ণনা করা অসম্ভব, এবং মৃত্যুমুখে পতিতপ্রায় হইরা তখন কিরূপ ভাবিয়াছিলাম, তাহাও যথাযথ মনে নাই। তবে বোধ হয় সন্ন্যাসীকে দেখিয়া আমার মনে হর্ষ ও বিস্ময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকখানি সন্দেহেরও উদয় হইয়াছিল,—হয় ত মনে হইয়াছিল, আমার কল্পনা আমাকে ছলনা করিয়াই নয়নসমক্ষে এই অসম্ভব মরীচিকার বিস্তার করিয়াছে। সন্দেহ ও বিশ্বাসে আমি মুখ বাড়াইলাম, তিনি সেই কমণ্ডলু আমার মুখের কাছে ধরিলেন, আমি এক নিশ্বাসে কমণ্ডলুর সমস্ত জল পান করিয়া ফেলিলাম। কিন্তু তখনও আমি কথা কহিতে সম্পূর্ণ অশক্ত, গভীর ক্লান্তি ও অবসাদ এক মুহূর্ত্তে বিদুরিত হয় না। কঠোর পথশ্রম ও ক্লান্তির পর প্রচুর জল পান করায়, আমার শরীরে সর্দ্দিগর্ম্মির লক্ষণ প্রকাশ পাইল, আমি অত্যন্ত অসুস্থ বোধ করিতে লাগিলাম, উঠিবার চেষ্টা করিলাম; কিন্তু উঠিতে পারিলাম না, সর্ব্বাঙ্গ ঘুরিতে লাগিল। রৌদ্রের তেজ অনেক কমিয়া আসিয়াছিল। ধীরে ধীরে শুইয়া পড়িলাম; বোধ হইল, তন্দ্রা আসিতেছে। ক্রমে আমার সুপ্তি বিলুপ্ত হইল।
যখন জাগিয়া উঠিলাম, দেখিলাম, অপরাহ্ন হইয়াছে। সূর্য্য অস্ত গিয়াছে, পশ্চিম আকাশ লোহিতরাগরঞ্জিত, এবং উচ্চ পর্ব্বতশৃঙ্গে অস্তগত সূর্য্যের আরক্তিম কান্তি শোভা পাইতেছে। উঠিয়া বসিয়া চতুর্দিকে চাহিতে লাগিলাম, কোথাও সন্ন্যাসীকে দেখিতে পাইলাম না।
আর অগ্রসর না হইয়া পুনর্ব্বার সন্ন্যাসীর কুটীরে ফিরিয়া আসিলাম। দেখিলাম, আমার সঙ্গী সন্ন্যাসী কুটীরপ্রাঙ্গনে দাঁড়াইয়া আছেন। আমি ব্যগ্রভাবে কুটীরবাসী সন্ন্যাসীর কথা জিজ্ঞাসা করিলাম; সঙ্গী বলিলেন, আমি চলিয়া যাওয়ার পর এতক্ষণ তাঁহারা বৃক্ষমূলে বসিয়া কথাবার্তা কহিতেছিলেন, এইমাত্র তিনি উচ্চ বেদীর পার্শ্বে গিয়াছেন, এবং সন্ন্যাসী কুটীরের দিকে আসিয়াছেন। অধিকতর বিস্মিত হইয়া তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “আমি চলিয়া যাওয়ার পর কুটীরবাসী সন্ন্যাসী আমার পশ্চাদগামী হইয়াছিলেন কি না?” এই বলিয়া তখন আমি সমস্ত কথা তাঁহার নিকটে খুলিয়া বলিলাম; তিনি অল্প হাসিয়া বলিলেন,— “এইসি।”
কুটীরবাসী সন্ন্যাসীকে তখন কোনও কথা জিজ্ঞাসা করিতে সাহসী হই নাই। অল্পক্ষণ পরে কথা প্রসঙ্গে তাঁহাকে এ কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম-কিন্তু তাঁহার নিকট কোনও উত্তর পাই নাই।
আমার পর্যটনকাহিনীপ্রসঙ্গে আমার বঙ্গীয় বন্ধুমহলে একদিন আমি এই ঘটনার উল্লেখ করিয়াছিলাম; বন্ধুবর্গ ইহা শুনিয়া যদিও অনুগ্রহ পূর্ব্বক আমাকে মিথ্যাবাদী বলেন নাই বটে, কিন্তু গল্পটি অসম্ভব বলিয়া উড়াইয়া দিয়াছিলেন। আমি তাহার উত্তরে সংক্ষেপে মন্তব্যস্বরূপ বলিয়াছিলাম— “There are more things in heaven and earth, Horatio,—than are dreamt of in your philosophy.”
আজ অনেক দিন পরে সেই ঘটনা যথাযথ বিবৃত করিলাম। জানি, এ বৈজ্ঞানিক যুগে ইহা এলাপোক্তি বলিয়াই বিবেচিত হইবে; কিন্তু আমাদের চতুর্দিকে প্রত্যহ এমন অসংখ্য ঘটনা সংঘটিত হইতেছে, যাহা বিজ্ঞানের পরীক্ষাসিদ্ধ নিয়মে নিয়ন্ত্রিত নহে, সুতরাং তাহার কার্যকলাপ সম্বন্ধে কিছুমাত্র সিদ্ধান্ত করিতে না পারিয়া কখনও তাহা অবিশ্বাস করি, এবং চক্ষু কর্ণের বিবাদ মিটিলে আশ্চর্য্য হইয়া যাই। তখন সহজেই মনে হয়, আধ্যাত্মিক জগতের বিপুল রহস্য ভেদ করিতে বিজ্ঞানের ক্ষুদ্র ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে অসমর্থ; অসীম বিস্তৃত ছায়াপথের অনন্ত নক্ষত্রমণ্ডলীর ন্যায় যাহা দেশ ও কাল আচ্ছন্ন করিয়া চক্ষুর অগোচর ভাবে অবস্থান করিতৈছে, তাহা নিরীক্ষণ এবং তাহাদের গতির পর্যবেক্ষণ করিতে যে দূরবীক্ষণের প্রয়োজন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিকের দুর্ব্বল কল্পনায় তাহা আয়ত্ত হইবার নহে।