প্রবাস-চিত্র/উত্তর কাশী
উত্তর কাশী।
ভারতবর্ষে বারাণসী হিন্দুর প্রধান তীর্থ। কতদিন এই তীর্থের প্রতিষ্ঠা হইয়াছে, কেহ বলিতে পারে না। পুরাণ ভাবলম্বন করিলে বলিতে হয়, মানব-সৃষ্টির পূর্ব্ব হইতেই ইহা বর্ত্তমান। যুগান্তর কাল হইতে পৃথিবীর বক্ষ দিয়া বহু পরিবর্তন চলিয়া গিয়াছে, কিন্তু কাশীর মহিমা এ হিন্দুর দেশে অটল অচলের ন্যায় স্থির, এবং প্রভাত-সূর্য্যের কিরণ-প্রদীপ্ত তুষার-মণ্ডিত গিরিশৃঙ্গের ন্যায় সমুজ্জল। এখনও সহস্র সহস্র ব্রাহ্মণ ও পণ্ডিত, ভক্ত ও সাধক, প্রতিদিন অরুণোদয়ের সঙ্গে পূতসলিলা ভাগীরথীর জলে অবগাহনপূর্ব্বক যুক্তকরে ও একান্তচিত্তে বিশ্বেশ্বরের চরণ-বন্দনা করেন। আবার সন্ধ্যাকালে যখন ধরাতল ধীরে ধীরে অন্ধকারে আবৃত হয়, পশ্চিম আকাশের লোহিত রাগ মলিন হইয়া যায়, এবং জাহ্নবীর শান্ত বক্ষে সান্ধ্য-তারকার স্নান-জ্যোতি ফুটিয়া উঠে, তখন শঙ্খ, ঘণ্টা ও দামামা-ধ্বনিতে সমস্ত কাশী জাগত হইয়া উঠে, ধুপ-ধুনা এবং পুষ্পরাশির সুগন্ধে মন্দির-প্রাঙ্গণ পরিপূর্ণ হয়, এবং সহস্র সহস্র ভক্তের সুবিমল ভক্তি ও প্রীতির কুসুমাঞ্জলি দেবদের বিশ্বেশ্বরের মহিমা-দীপ্ত অভয় চরণোদ্দেশে বর্ষিত হয়; তখন বোধ হয়, কোন ভক্তের একবারও মনে হয় না যে, আর একটি দ্বিতীয় কাশী এই পুণ্যভূমি ভারতবর্ষের এক প্রান্তে হিমালয়ের সুগভীর প্রশান্ত ক্রোড়ে লুক্কায়িত আছে, এবং সেখানেও বিশ্বেশ্বর এক প্রকাণ্ড পাষাণমন্দিরে স্বমহিমায় জাগ্রতভাবে অবস্থান করিতেছেন।
এই কাশীর নাম উত্তর কাশী। স্বনামপ্রসিদ্ধ কাশীর সহিত স্বাতন্ত্র্যরক্ষার জন্য ইহার নাম উত্তর কাশী, কি কাশীর। বহু উত্তরে উত্তরাখণ্ডে অবস্থিত বলিয়া উত্তর-কাশী, তাহা নিঃসন্দেহে বলা যায় না। কাহার গৌরব অধিক, তাহাও নির্দ্দেশ করা কঠিন। তবে ইহা নিশ্চিত যে, বিশ্বেশ্বরের প্রিয় পীঠস্থান বলিয়া যদি কাশীর গৌরব হয়, ভগবতী অন্নপূর্ণার লীলাক্ষেত্র অথবা অন্নক্ষেত্র বলিয়া যদি কাশী সম্মানিত হইতে পারে, তবে উত্তর-কাশীও আপনার গৌরব ও সম্মান রক্ষা করিবার উপযুক্ত। উত্তর-কাশী জননী প্রকৃতির স্বহস্তনির্ম্মিত চারু উপবন, শান্তি ও পবিত্রতার স্নিগ্ধ নিকুঞ্জ। হিমালয়ের কোন্ অজ্ঞাত অংশে কৈলাসধাম সংগুপ্ত রহিয়াছে, কে বলিবে?-কিন্তু কৈলাসনাথের সেই আনন্দ-নিকেতন হইতে উত্তরকাশী কোনও অংশে ন্যূন নহে।
আমাদের দেশের অতি অল্প লোকই এই কাশীর নাম অবগত আছেন; কারণ, পুরাণ ইতিহাস প্রভৃতি গ্রন্থে এই কাশীর উল্লেখ নাই বলিলেই চলে। তাহার পর ভারতবর্ষের এক প্রান্তে অতি দুর্গম প্রদেশে এই তীর্থের অবস্থান; সুতরাং নিতান্ত অল্পসংখ্যক লোকের এই পুণ্যভূমিতে উপস্থিত হইবার সৌভাগ্য ঘটে। যে সকল গৃহী বিশেষ কষ্ট স্বীকার করিয়া ভারতবর্ষের অধিকাংশ তীর্থই দর্শন করিয়াছেন, তাঁহাদের প্রায় সকলকে এখানে আসিবার আশা ত্যাগ করিতে হয়। হিমাচলের পাদদেশে গাড়োয়াল রাজ্য অবস্থিত; তাহার রাজধানী শ্রীনগর হইতে, পাঁচ দিন, সুদীর্ঘ বিপদসঙ্কুল বন্ধুর পার্বত্য পথ অতিক্রমপূর্ব্বক অক্লান্তভাবে পর্ব্বত হইতে পর্ব্বতান্তরে আরোহণ ও অধিরোহণ করিয়া অবশেষে উত্তরকাশীতে উপস্থিত হওয়া যায়। না দেখিলে এই পথের ভীষণতা হৃদয়ঙ্গম করা যায় না। পর্ব্বতের উপর দিয়াও সর্ব্বত্র পথ নাই;—কোন স্থানে বৃক্ষ অবলম্বন করিয়া উপত্যকার এক অংশ হইতে নিম্নতম অংশে অধিরোহণ করিতে হয়, কোথাও পার্ব্বত্য যষ্টির সহায়তার গভীর অধিত্যকা হইতে উচ্চতর স্থানে উঠিতে হয়, কিঞ্চিন্মাত্র অসতর্ক হইলেই ঘোরতর অন্ধকারাচ্ছন্ন গিরি-গহ্বরে, কোন অতলস্পর্শে পড়িয়া জীবন্তে সমাহিত হইবার সম্ভাবনা। অতএব গৃহী দূরের কথা, অনেক সংসারবিরাগী সন্ন্যাসীও সেখানে উপস্থিত হইতে অসমর্থ। শুষ্ক বৈরাগ্য অবলম্বন করিলেই সেখানে যাওয়া যায় না; প্রাণের একান্ত আগ্রহের সঙ্গে দুইখানি সুদৃঢ় পদ, একটি সবল দেহ এবং উপযুক্ত আহার সামগ্রী সঙ্গে লইয়া এই মহাতীর্থদর্শনের কঠোর ব্রত গ্রহণ করিতে হয়। এই জন্যই বদরী-নারায়ণ ও কেদারনাথ-দর্শনার্থী সাধু সন্ন্যাসিগণের অনেকেই গঙ্গোত্রীর পথে আসিতে ভীত ও চিন্তিত হইয়া থাকেন।
উত্তর-কাশী হিমালয়ের নিভৃত-বক্ষে ভাগীরথী-তীরে অবস্থিত। এখানে আসিবার পূর্ব্বে মনে হয়, বুঝি বারাণসীর আর একটি অভিনব দৃশ্যপট এখানে উন্মুক্ত হইবে। সেই পাষাণসোপান-বদ্ধ ভাগীরথীরতীর ও তরণী-শোভিত তটিনী-বক্ষ, সহস্র সহস্র নরনারী-সঙ্কুল বায়ুপ্রবাহ-হীন প্রস্তরগৃহ, আবর্জনা-দূষিত পণ্যবীথিকা-পূর্ণ সঙ্কীর্ণ রাজপথ, এবং বৃষভাবরুদ্ধ সঙ্কীর্ণতর দুর্গন্ধময় শাখাপথ-সমূহ সেইরূপই ইতস্ততঃ প্রসারিত রহিয়াছে;-বুঝি এখানেও কাঁসর-ঘণ্টামুখরিত অসংখ্য দেবালয় ও দেবপ্রতিমা, সাধু ও অসাধু, মুমুক্ষ ও অর্থলিপ্সু, সাধ্বী ও পতিতার তেমনি বিচিত্র সম্মিলন।
কিন্তু এখানে উপস্থিত হইলে, তাহার কিছুই দৃষ্টিগোচর হয় না। একটি সুন্দর, অপাপ-বিদ্ধ পুণ্যতীর্থ স্নিগ্ধতা ও প্রসন্নতায় পরিপূর্ণ হইয়া নয়ন-সমক্ষে উদ্ভাসিত হয়। চতুর্দিকে সমুন্নত গিরিশৃঙ্গ, মধ্যে অনতি-বিস্তীর্ণ সমতল ক্ষেত্রে উত্তর-কাশী প্রতিষ্ঠিত। সেই পবিত্র পীঠতল প্রক্ষালনপূর্ব্বক প্রসন্ন-সলিলা কলনাদিনী ভাগীরথীর পুণ্য-প্রবাহ অসংখ্য উপলখণ্ডে প্রতিহত হইয়া দ্রুত প্রবাহিত হইতেছে। চির-তুষারমণ্ডিত শুভ্র গিরিশৃঙ্গগুলি যেন মস্তকে শ্বেত-শিরস্ত্রাণ পরিধানপূর্ব্বক শ্যামল তরুরাজিতে মধ্যদেশ আবৃত করিয়া কোন মহাপুরুষের অলঙ্ঘ্য ইঙ্গিত অনুসারে এক স্মরণাতীত যুগ হইতে বিশ্বস্ত প্রহরীর ন্যায় এই দেবভূমিকে রক্ষা করিতেছে। নিদাঘের খর-রৌদ্রাদ্ভাসিত উজ্জ্বল মধ্যাহ্ন এবং শীতের তুষার-সমাচ্ছন্ন-কুজ্ঝটিকাময়ী হিমযামিনী—সর্ব্বকালেই মধুর প্রশান্তিতে এই পুণ্যভূমি পরিব্যাপ্ত থাকে।
উত্তর-কাশী নগর নহে। নাগরিক জীবনের ঐশ্বর্য্য, কর্মময় ভাব, আশা-নিরাশা ও সাফল্যনিষ্ফলতার সংঘর্ষণে উৎপন্ন ঘোর আন্দোলন, আর্ত ও পীড়িতের হৃদয়ভেদী ক্ষুব্ধ ক্রন্দনোচ্ছ্বাস, পুরুষকারের বিজয়গর্ব, জেতার দম্ভ এবং আভিজাত্যের অভিমান এখানে দেখিতে পাওয়া যায় না। সংসারের ক্ষুধিত-তৃষিত কোলাহল, কঠিন পর্ব্বতাবরণ ভেদ করিয়া এই শান্তিধামে প্রবেশ করিতে সক্ষম নহে; নীচতার ধূলি এবং হিংসা-দ্বেষ ও ক্রোধ লোভের জালাময় বায়ুপ্রবাহ এই পবিত্র তীর্থ কলঙ্কিত করে নাই; বিলাস-প্রিয়তা এবং পার্থিব লালসার এখানে সম্পূর্ণ অভাব। এখানে উপস্থিত হইলে শুধু বহু প্রাচীন, নিষ্কলঙ্ক, মঙ্গল-কিরণানুরঞ্জিত শান্ত আর্য্য-জীবনের একটি সুকোমল পবিত্র স্মৃতি হৃদয়ে প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে।
অধিবাসীর সংখ্যা এখানে নিতান্ত অল্প,—এক শত ঘরের কিছু অধিক হইবে। নর নারী সকলের প্রকৃতিই অতি মহৎ ও সরল; ইহাদের মধ্যে অবরোধপ্রথা প্রচলিত নাই। অতিথির প্রতি ইহাদের অসাধারণ যত্ন ও অনুরাগ দেখিতে পাওয়া যায়। ইহাদের সম্বল অতি সামান্য;-কিঞ্চিৎ অনুর্ব্বর ভূমিখণ্ড ও অল্পসংখ্যক গবাদি পশু। কিন্তু বিশ্বেশ্বরের কৃপায় নির্ভর করিয়া ইহারা নিশ্চিন্তভাবে দিনপাত করে। এমন পরিশ্রমী, সহজ-সন্তুষ্ট, শান্তিপ্রিয় জাতি বর্ত্তমান কালে অতি বিরল। পরিশ্রম-বলে ইহারা এই কঠিন পার্বত্য-মৃত্তিকাতে শস্যাদির উৎপাদন করে, এবং তাহাতেই তাহাদের জীবিকানির্ব্বাহ হয়।
এখানকার অধিবাসীবর্গ সকলেই ব্রাহ্মণ; ইহাদের চরিত্র নিষ্কলঙ্ক, প্রকৃতি শান্ত, এবং ব্যবহার অতি মধুর। অধিকাংশ লোকই দেবভাষার সহিত সুপরিচিত। ইহারা গৌরবর্ণ। মধ্যাহ্নে যাঁহারা হলচালন করেন, প্রভাত ও সন্ধ্যাকালে তাঁহারাই স্থিরগম্ভীরস্বরে বেদমন্ত্রের উচ্চারণ ও মহিন্নঃস্তব পাঠ করিয়া থাকেন। দেববালার ন্যায় সুন্দরী, সুকেশী আরক্তগণ্ডা, সুলোচনা বালিকাগণ আদিম আর্য্যকন্যার অনুরূপ এখনও গো দোহন করে, এবং কোমলহৃদয়া স্নেহময়ী রমণীগণ পরম উৎসাহের সহিত সহধর্মিণীর ন্যায় প্রত্যেক কার্য্যে স্ব স্ব স্বামীর সহায়তা করেন। প্রাচীন কালের এই সকল মোহন দৃশ্য নয়ন সমক্ষে বিমুক্ত দেখিয়া শুধু বিস্ময়-বিমুগ্ধনেত্রে চাহিয়া থাকিতে হয়। মনে হয়, ইহা কি ঊনবিংশ শতাব্দী, এবং পাশ্চাত্যসভ্যতাপ্লাবিত ইংরেজের শাসিত ভারতবর্ষ? অথবা বহু শত বৎসর পূর্ব্বের বৈদিক যুগের এক সুমধুর, প্রীতি-প্রফুল্ল দৃশ্য, সরস্বতী ও দৃষদ্বতীর তটভূমি হইতে সঞ্চয় করিয়া কোন ঐন্দ্রজালিক, তাহার মোহিনীমায়ার আশ্চর্য্য প্রভাবে, হিমাচলের এই গোপন অন্তরালে সংগুপ্ত রাখিয়াছে, এবং বর্তমান শতাব্দীর সুসভ্য পরিব্রাজকের কৌতূহল-বৃষ্টির সম্মুখে একটি অমল সুন্দর বিভ্রম অতীতের একটি ছায়াসুপ্ত মায়াপুরীর রচনা করিতেছে।
এখানে ইষ্টকনির্ম্মিত অট্টালিকা কিংবা পাষাণময় গৃহ একখানিও নাই। গৃহগুলি সমস্তই পর্ণকুটীর,—যেন আদিকালের সেই সকল শান্ত ও সুপরিচ্ছন্ন তপোবন! চতুর্দিকে দুই চারিটি অনুচ্চ দেবমন্দির; মধ্যে জাহ্নবীকুলে একটি বহু-পুরাতন, দৃঢ়কায়, সমুন্নত পাষাণমন্দির মন্দির, কালের সহিত সংগ্রাম করিয়া, এবং শত ঝড় ও ঝঞ্ঝাবাত তুচ্ছজ্ঞান করিয়া, একটি ক্ষুদ্র গিরিশৃঙ্গের ন্যায় এই পর্ব্বতোপত্যকায় দণ্ডায়মান রহিয়াছে,—অভ্যন্তরে বিশ্বেশ্বরের পাষাণমূর্ত্তি। এই মন্দির ও অভ্যন্তরস্থ প্রতিমা নিরীক্ষণ করিলে একবার কাশীর সেই মন্দির ও তাহার দেবতার কথা মনে হয়। কে শ্রেষ্ঠ এবং অধিক প্রাচীন, বলা যায় না। কাশীর সেই মন্দিরে বাদ্যোদ্যমের তুমুল কলরব, যাজ্ঞিক ও পুরোহিতবর্গের মন্ত্রোচ্চারণ-শব্দ, সমস্ত একত্রিত হইয়া যে মিশ্রিতধ্বনির উৎপাদন করে, তাহা শুনিলে মনে হয়, বিশ্বেশ্বর নিখিলের ভক্তি ও প্রীতি আকর্ষণপূর্ব্বক, রাজেন্দ্রের ন্যায়, তাঁহার মহা সিংহাসনে বিরাজ করিতেছেন; অনুভব হয়, কুবের তাঁহার ধনাধ্যক্ষ, মৃত্যু তাঁহার কিঙ্কর, মাতা অন্নপূর্ণা তাঁহার অঙ্কলক্ষ্মী;— তিনি প্রার্থীকে ধন দিতেছেন, স্বাস্থ্য দিতেছেন, ভীত ব্যক্তি তাঁহার নিকট অভয় প্রাপ্ত হইতেছে, অশান্ত-হৃদয় শান্তিধারা লাভ করিয়া পূর্ণপ্রাণে প্রস্থান করিতেছে; এবং সকলে “জয় বিশ্বেশ্বর” বলিয়া প্রাণ খুলিয়া তাঁহার অভিবাদন করিতেছে। সেই জয়নাদ, নেই প্রীতি ও ভক্তির বিমল উচ্ছ্বাস, সমগ্র ভারতবর্ষে বিকীর্ণ হয়, এবং কাশ্মীর হইতে কুমারী পর্যন্ত সমগ্র ভারতের ভক্তগণ অধিক আশ্বস্ত হৃদয়ে, অধিক আগ্রসহকারে, এই দেবাদিদেবের চরণমূলে আপনাদিগের কাতর-প্রার্থনা নিবেদন করিবার জন্য বারাণসীধামে উপস্থিত হয়।
কিন্তু উত্তর-কাশীর বিশ্বেশ্বর ভিখারী। তাঁহার দর্শকসংখ্যাও নিতান্ত অল্প; স্থানীয় অধিবাসীবৃন্দ ভিন্ন আর যাহারা তাঁহার দর্শন-কামনায় এই পবিত্র পীঠতলে সমাগত হয়, তাহারা ভিখারী সন্ন্যাসী মাত্র। তাঁহার পূজার জন্য সুবর্ণনির্মিত বিল্বপত্র তাহারা কোথায় পাইবে? সুবর্ণ-কলসে তাঁহার মন্দিরচূড়া বিমণ্ডিত করিবার অর্থ তাহাদের কাহারও নাই; কিন্তু সেই অল্পসংখ্যক ভক্তের অকৃত্রিম ভক্তি তাঁহার পাষাণ-মন্দির পরিবেষ্টন করিয়া রহিয়াছে, এবং সেই ভক্তিই যেন দেব-চরণ হইতে সুপবিত্র সুধৌত-বেশে প্রত্যাবর্ত্তনপূর্ব্বক তদীয় ভক্তের হৃদয়ে বল, সাহস ও মনুষ্যত্বের সঞ্চার করিতেছে। অর্থগৌরবে কাশীর বিশ্বেশ্বর শ্রেষ্ঠ, সন্দেহ নাই; কিন্তু উত্তর-কাশীর বিশ্বেশ্বরের দরিদ্র ভক্ত-বৃন্দকে ভক্তিতে কে পরাস্ত করিবে?
মন্দিরে কোন প্রকার কারু-কার্য্য নাই। মন্দিরটি কত কালের তাহারও নিরূপণ করা অসম্ভব। হিন্দুধর্ম্মের প্রথম অভ্যুত্থানকালে এই মন্দির নির্ম্মিত হইয়াছিল, এরূপ অনুমান করা অসঙ্গত নহে। কাশীর সম্বন্ধে অনেক প্রবাদ, অনেক প্রকার উক্তি আছে; বিশ্বেশ্বরের মন্দির ও তাঁহার অবস্থান সম্বন্ধেও নানা অলৌকিক আখ্যায়িকার অভাব নাই কিন্তু উত্তর-কাশীর উৎপত্তি, এই বিশ্বেশ্বর-নন্দির ও দেবতার অবস্থিতি সম্বন্ধে কোন কাহিনী শুনিতে পাওয়া যায় না। যে সকল ভক্ত-অধিবাসী ও পাণ্ডার হস্তে এই মন্দিরের ভার ন্যস্ত আছে, তাঁহারা মন্দিরের গৌরববৃদ্ধির জন্য এ পর্যন্ত স্বকপোল-কল্পিত কোন গল্পের সৃষ্টি করেন নাই। ইতিহাস তাঁহাদের নিকট মূক, পুরাণের সহিতও তাঁহাদের অধিক পরিচয় নাই, পরিস্ফুট সত্যের ন্যায় এই মন্দির ও তাহার দেবতা তাঁহাদের সম্মুখে বর্তমান; যাঁহার ইচ্ছামাত্রেই নিখিল ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি ও লয় অবশ্যম্ভাবী, সেই ইচ্ছাময়ের আবির্ভাব ও অবস্থান সম্বন্ধে কোনও প্রকার প্রশ্ন-কৌতূহল তাহাদের মনে স্থান পায় না।
শুনিতে পাওয়া যায়, বিশ্বেশ্বরের মন্দির ভিন্ন উত্তরকাশীতে আরও কতকগুলি বৃহৎ মন্দির ছিল, এবং কাশীর ন্যায় পাষাণবন্ধ ঘাটেরও অভাব ছিল না; কিন্তু সে সমস্তই ভাগীরথীর কুক্ষিগত হইয়াছে। মন্দিরের পূজকগণের অবস্থা অতি হীন, কিন্তু তাঁহারা নির্লোভ,—যাত্রিগণের নিকট তাঁহারা কিছুই প্রার্থনা করেন না; যাত্রিগণ স্বেচ্ছাক্রমে যাহা দান করে, তাঁহারা তাহাতেই সন্তুষ্ট। এখানে পাণ্ডাদিগের কোন প্রকার উপদ্রব নাই। প্রায় অধিকাংশ তীর্থেই দেখা যায়, পাণ্ডাগণ দু’ পাঁচটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিগ্রহ প্রতিষ্ঠাপূর্ব্বক তাঁহাদের পূজা অর্চ্চনার জন্য যাত্রীদিগের অর্থের উপর আধিপত্য বিস্তার করে, এখানে সেরূপ কোন উপসর্গ দেখা যায় না। এখানে দুই চারিটি অন্য দেবতার মন্দির থাকিলেও সেই সকল দেবতার পূজা অতি সংক্ষিপ্ত উপায়ে সম্পন্ন হইয়া থাকে। পূজার প্রধান উপকরণ ভক্তি ও প্রীতি, বিল্বপত্র, পুষ্প, চন্দন; মন এবং বন হইতেই তাহা সংগৃহীত হয়, অর্থব্যয় অবশ্য প্রয়োজন নহে।
এখানে দুই একখানি দোকান আছে, তাহাতে আটা, ডাইল, লবণ এবং লঙ্কা ভিন্ন অন্য কিছু পাওয়া যায় না। ছাগলের পৃষ্ঠে বোঝাই দিয়া দূরবর্ত্তী স্থান হইতে ইহারা পণ্যদ্রব্যের সংগ্রহ করে, কিন্তু শীতকালে অত্যন্ত শীতে ও তুষারপাতে ইহাদের ব্যবসায় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে।
বৈশাখ মাসই এখানে আসিবার প্রশস্ত সময়। বর্ষাকালে এ পথে পর্যটন করা অসম্ভব; তখন গলিত তুষারধারায় পার্ব্বত্য অধিত্যকা সর্ব্বত্রই জলাকীর্ণ হইয়া যায়, প্রস্রবণসমূহ হইতে প্রবলধারায় জলরাশি নিঃসৃত হইতে থাকে, কঠিন পর্ব্বতগাত্র পিচ্ছিল হওয়াতে তাহা অত্যন্ত দুরারোহ হইয়া উঠে। তাহার পরই দুরন্ত শীতকাল এই গিরিরাজ্য আক্রমণ করে; শুভ্র তুষাররাশিতে সমস্ত প্রদেশ আচ্ছন্ন হইয়া যায়, এবং তদ্দেশীয় অধিবাসিগণকে কুটীরের মধ্যে দিবারাত্রি অগ্নি প্রজ্বলিত করিয়া অতি কষ্টে দিনপাত করিতে হয়।
কিন্তু বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে এই পার্ব্বত্য প্রদেশের শোভা অতি মনোহর। এই সময়েও এখানে শীত অতি প্রবল, কিন্তু তাহা অসহ্য নহে; বৈশাখ জ্যৈষ্ঠই এখানকার বসন্তকাল। বৃক্ষে বৃক্ষে বিবিধ পার্বত্য কুসুমস্তবক বিকসিত হইয়া উঠে, পার্ব্বত্য লতাপুঞ্জে বিচিত্র বর্ণের পুষ্পরাশি প্রস্ফুটিত হইয়া সৌরভভার ঢালিয়া দেয়, এবং পর্ব্বতের অন্তরাল হইতে প্রদীপ্ত সূর্য্যের শুভ্র কিরণ এই সমতল ক্ষেত্রে পতিত হইয়া ভাগীরথী প্রবাহে, প্রস্রবণসলিলে, এবং পুষ্পদলে অনুপম সৌন্দর্য্য ফুটাইয়া তুলে; মনে হয়, কঠিন গিরিশৃঙ্গ হইতে উর্দ্ধে উন্মুক্ত, নীল, আলোকচ্ছুরিত আকাশ পর্যন্ত বিশ্বেশ্বরের বিপুল মহিমায় উদ্ভাসিত!
উত্তর-কাশীর বিশ্বেশ্বরের মন্দিরের একটি সান্ধ্য আরতির বর্ণনা দিয় আমরা এই প্রবন্ধের উপসংহার করিব।
জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রায় অবসানকাল। সূর্য্য অনেকক্ষণ অস্ত গিয়াছেন, অন্ধকার গাঢ় হইয়া আসিয়াছে। পার্বত্য কৃষককুটীরে ধীরে ধীরে সন্ধ্যাদীপ প্রগুলিত হইয়া উঠিল। বিশ্বেশ্বরের মন্দিরের অদূরে নদীতীরে বৃক্ষশ্রেণী; অনেকগুলি সাধু, সন্ন্যাসী ও অবধূত সেই শালবৃক্ষতলে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন;—সন্ধ্যা সমাগম দেখিয়া তাঁহারা অগ্নিকুণ্ড প্রজ্বলিত করিয়া সান্ধ্য উপাসনা আরম্ভ করিলেন।
ক্রমে বিশ্বেশ্বরের মন্দিরে শঙ্খ, ঘণ্টা ও কাঁসর বাজিয়া উঠিল। নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় সেই গভীর শব্দ দূর হইতে দূরান্তরে পর্ব্বতের শিখরে শিখরে ধ্বনিত হইতে লাগিল। ভক্তবৃন্দ ধীরে ধীরে মন্দিরপ্রাঙ্গণে সমবেত হইলেন। স্ত্রী পুরুষ অনেককেই সেখানে সম্মিলিত দেখা গেল। সমবেত নরনারীর সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশৎ;—সেই ক্ষুদ্র মন্দিরপ্রাঙ্গণ তাহাতেই পরিপূর্ণপ্রায়।
পূজা শেষ হইলে দেবতার আরতি হইল। ত্রয়োদশ কি চতুর্দ্দশ বর্ষ বয়স্ক একটি অজাতশ্মশ্রু বালক দীপাধার হস্তে লইয়া আরতি আরম্ভ করিল। বালকের আকৃতি এবং প্রকৃতি অতি সুন্দর। মুখমণ্ডল প্রশান্ত, চক্ষু উজ্জল, কার্য্যে দৃঢ়তা ও নিষ্ঠা প্রতিফলিত। এত অল্প বয়সে এমন গাম্ভীর্য্য ও ধীরতা শুধু সেই জাতির মধ্যেই সম্ভব, যাহাদের জীবনের চরম উদ্দেশ্য ভক্তি ও সংযম।
ধূপ দীপ হস্তে আরতি করিতে করিতে বালক যে পবিত্র সামগাথা গান করিতেছিল, সেই গানের ও গায়কের কণ্ঠস্বরের মাধুর্য্য দর্শকবৃন্দের শ্রবণপথে সুধাবৃষ্টি করিতেছিল। সামগান সাধারণতঃই মধুর ও গম্ভীর,-বালকের কোমল কণ্ঠে কোমলতা প্রাপ্ত হইয়া তাহা অনির্ব্বচনীয়; শুধু অনুভবের যোগ্য, যাহারা সেই দেব-সঙ্গীত বুঝিতে পারিল, তাহাদের চক্ষুঃপ্রান্ত আর্দ্র হইয়া উঠিল; যাহারা বুঝিতে পারিল না, তাহারা ছল ছল নেত্রে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল। সেই অমর-গাথা,—প্রাচীন ঋষি-হৃদয়ের সেই অপার্থিব ভক্তি-ইতিহাস শুনিতে শুনিতে পৃথিবীর কথা ভুলিয়া যাইতে হয়, এবং অনন্তসুন্দরের দিব্য প্রসন্নতায় বক্ষ ভরিয়া উঠে।
আরতি শেষ হইলে, সকলে অবনত-মস্তকে, ভক্তিপূর্ণ-হৃদয়ে বিশ্বেশ্বরের চরণে প্রণাম করিয়া ধীরে ধীরে গৃহে প্রবাস-চিত্র প্রত্যাগমন করিল। অধিক রাত্রে চন্দ্র মধ্যাকাশে আসিলে, তাঁহার বিমলকিরণ-ধারায় ভাগীরথী-জল, নদীতীরস্থ বৃক্ষরাজি, সুবৃহৎ মন্দির ও প্রত্যেক ক্ষুদ্র পর্ণকুটীর স্নাত হইতে লাগিল। এই সময়ে নদীতীরে প্রস্তর-খণ্ডে উপবেশন করিলে দেখা যায়, বৃক্ষরাজির ঘুমন্ত ছায়া প্রবাহিনীর নির্মল জলে ভাসমান রহিয়াছে; কখন বা মৃদু নৈশ বায়ুর হিল্লোলে একটি শুল্ক পত্র নদীবক্ষে পড়িয়া স্রোতে ভাসিয়া যাইতেছে; নদীতীরস্থ নানাবর্ণের উপলখণ্ডে প্রতিফলিত চন্দ্ররশ্মি ভাগীরথীতীরকে মন্দাকিনীর মরকত-দীপ্ত উপকূল বলিয়া বিভ্রম উৎপাদন করিতেছে, এবং বিবিধ পুষ্পের সুবাস বায়ুস্রোতে ভাসিয়া এই ক্ষুদ্র নিভৃত উপত্যকাটিকে আচ্ছন্ন করিয়াছে; বোধ হয়, ঐ সুদূর চন্দ্রলোকের সঙ্গে এই মৃদুগন্ধ ভাসিয়া আসিতেছে, যেন বিশ্বেশ্বরের পূজার জন্য ইহা প্রকৃতি-হস্ত-প্রেরিত অপার্থিব প্রীতি উপহার। ক্রমে রাত্রি যত অধিক হয়, চতুর্দিক্ ততই স্তব্ধ ও গম্ভীরভাব ধারণ করে; পর্বতশ্রেণীকেও নিদ্রিতের ন্যায় বোধ হয়,— শুধু সেই শুভ্র জ্যোৎস্নালোকে, হিমাচলের সেই স্নেহালিঙ্গন পাশে, উন্মুক্ত, প্রশান্ত নীলাম্বরতলে একটি উন্নত মন্দির বৃক্ষলতা সমাচ্ছন্ন একটি গিরি-তরঙ্গিণী, নীহারসিক্ত পুষ্পবন, কতকগুলি ক্ষুদ্র পর্ণকুটীর ও অনুচ্চ দেবালয়, একখানি সুচারু দৃশ্য পটের ন্যায় বিস্তীর্ণ থাকে। নিদ্রালস-নেত্রে তাহার দিকে চাহিলে মনে হয়, এ কি স্বপ্নদৃশ্য,—না, সত্য সত্যই প্রকৃতি দেবীর সযত্ন-অঙ্কিত চিত্রকৌশল?
সমাপ্ত।