প্রবাস-চিত্র/কলুঙ্গার যুদ্ধ
কলুঙ্গার যুদ্ধ।
পূর্ব প্রবন্ধের উপসংহারে উল্লেখ করিয়াছি যে, গত শতাব্দীর প্রথমে এখানে এক ভীষণ সমরানল প্রজ্বলিত হইয়াছিল, ভারতের ইতিহাস-প্রণেতৃগণ এই যুদ্ধ সম্বন্ধে কোনও কথার উল্লেখ করেন নাই; কিন্তু ঐতিহাসিকের উচ্চ সিংহাসনের প্রতি বর্ত্তমান লেখকের লোভ না থাকিলেও, এই প্রবন্ধে সেই যুদ্ধ ব্যাপারের একটি বিবরণ প্রকাশ করা, বোধ করি, বাহুল্য বলিয়া বিবেচিত হইবে না।
কি কারণে ইংরেজদিগের সহিত গুর্খা জাতির বিবাদের সূত্রপাত হয়, তাহা এখানে সবিস্তারে বর্ণনা করা অনাবশ্যক; কারণ যাঁহাদের অবগতির জন্য এ প্রস্তাব লিখিত হইতেছে, তাঁহারা নেপালের ইতিহাস এবং নেপালযুদ্ধের বিবরণ সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ নহেন। সংক্ষেপে ইহা বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, পূর্ণিয়া, ত্রিহুত, সারণ, গোরক্ষপুর এবং বেরিলি জেলার উত্তর সীমান্ত প্রদেশে, এবং শতদ্রু ও যমুনা নদীর মধ্যবর্ত্তী রক্ষণাধীন রাজ্যসমূহে, গুর্খাগণ প্রায় সর্ব্বদাই অত্যাচার করিত; এই সকল অত্যাচারনিবারণই গুর্খা যুদ্ধের উদ্দেশ্য, ইহার মুখ্য কারণ; তবে গৌণ কারণও যে কিছু ছিল না, এমন নহে।
অনেকেই কলিকাতা সহরে নেপালী গুহা দেখিয়াছেন; ইংরাজদিগের কয়েকটি গুর্খা রেজিমেণ্টও আছে। ইহারা বলিষ্ঠ, খর্ব্বাকার, স্থুলদেহ এবং অত্যন্ত কার্য্যকুশল; অসভ্য হইলেও ইহারা সত্য ও বীরত্বের সম্মান রক্ষা করিতে জানে। এমন বিশ্বস্ত বন্ধু, অথবা প্রবল শত্রু অন্য জাতির মধ্যে কদাচ “দেখা যায়। ইহারা তরবারি লইয়া যুদ্ধ করিতে ভালবাসে, কিন্তু “খুক্রী” ইহাদের জাতীয় অস্ত্র; খুক্রীর গঠন ছোরার ন্যায়; দেখিতে ক্ষুদ্র হইলেও খুক্রীগুলি এমন তীক্ষ্ণধার, এবং খুক্রীধারী এমন ক্ষিপ্রহস্ত যে, চক্ষুর নিমেষেই এক আঘাতে তাহারা শত্রুশির দ্বিখণ্ডিত করিয়া ফেলে। ইহাদের মধ্যে পূর্ব্বে ধনুর্ব্বাণেরও প্রচলন ছিল।
১৮১৪ খৃষ্টাব্দে ইংরাজ ও গুরখা জাতির মধ্যে বিবাদ আরম্ভ হইবার সময়ে, নেপালের সৈন্যসংখ্যা ত্রিশ পঁয়ত্রিশ হাজার ছিল; সৈন্যগণ য়ুরোপীয় প্রথায় শিক্ষিত হইতেছিল, এবং তাহাদের নায়ক্গণও “কর্ণেল”, “মেজর”, “ক্যাপ্টেন্” প্রভৃতি নামে অভিহিত হইত।
গুর্খা যুদ্ধের অব্যবহিত কারণ অনেক পাঠকের অজ্ঞাত থাকিতে পারে; অতএব এ সম্বন্ধে দুই একটি কথা বলা আবশ্যক। ১৮১৪ খৃষ্টাব্দের ২৯শে মে. হঠাৎ এক দল গুর্খাসৈন্য ইংরাজদিগের ভুতোয়ালের থানা আক্রমণ করে। এই দলের অধিনায়কের নাম মানরাজ ফৌজদার। থানার ১৮ জন কনেষ্টবল হত এবং ছয় জন আহত হয়। থানার দারোগাকেও কৌজদারের সম্মুখে নৃশংসরূপে নিহত করা হয়।
উদ্ধত এবং অশিক্ষিত গুর্খা সৈন্যগণের দ্বারা এরূপ হত্যাকাণ্ড হওয়া নূতন কিম্বা আশ্চর্য্য নহে। কোষে তরবারি বন্ধ রাখিয়া ধীরভাবে ডাল রুটির শ্রাদ্ধ করা আমাদের চক্ষে অতি আরামজনক বলিয়া বিবেচিত হইলেও, এই যুদ্ধপ্রিয় জাতি এরূপ নির্ব্বিরোধ-জীবন বহন করা অতি বিড়ম্বনাপূর্ণ বলিয়া মনে করে; শুধু গুর্খা বলিয়া নহে, পঞ্জাব রাজ্যের পতনের ইহাই প্রধান কারণ। যতদিন একচক্ষু, রাজনীতিকুশল পঞ্জাবকেশরী রণজিৎ সিংহ জীবিত ছিলেন, তত দিন তিনি দুর্দ্দান্ত খাল্সা সৈন্যগণকে প্রণমিত রাখিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। তাঁহার মৃত্যুর পর আর কেহ তাহাদের উপযুক্ত নেতা ছিল না; এ দিকে অবিরাম শান্তি উপভোগে তাহাদের যুদ্ধ-পিপাসা বৃদ্ধি পাইতেছিল— শতদ্রু পার হইয়া তাহারা ইংরেজের ধনধান্যপূর্ণ লোহিত সীমা আক্রমণ করিল। অবিলম্বে নেতৃহীন বিশাল খাদাবাহিনী প্রবল বায়ুপ্রবাহে তৃণের ন্য়ায় উড়িয়া গেল, পঞ্জাবের সৌধ-চূড়ায় বৃটিশ পতাকা উড্ডীন হইল।
ইতিহাসে এক ব্যাপার অনেক বার পুনরাবৃত্ত হয়। অন্ধকূপ হত্যাকাণ্ড ভীষণ ও রোমাঞ্চকর বটে, নেকলে সাহেবও ক্লাইবের জীবনীতে তাহার সহিত কাহারও তুলনা হইতে পারে না বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন, কিন্তু এই অন্ধকূপহত্যা অপেক্ষাও ভয়ানক ব্যাপার গুর্খাদিগের দ্বারা সম্পন্ন হইয়াছে। নেপালরাজ পৃথ্বীনারায়ণের ভ্রাতা, স্বরূপরতন একবার কীর্ত্তিপুর নামক গ্রাম আক্রমণ করেন। গ্রামবাসিগণ বিশেষ বীত্ব প্রকাশ পূর্ব্বক কিছু দিন আত্মরক্ষা করে; অবশেষে তাহারা স্বরূপরতনের নিকট আত্মসমর্পণ করিতে প্রতিশ্রুত হয়; কিন্তু স্বরূপরতনকে প্রতিজ্ঞা করিতে হইল যে, তিনি তাহাদের জীবনের উপর হস্তক্ষেপ করিবেন না। কিন্তু স্বরূপরতন অবশেষে প্রতিজ্ঞাপালন করিলেন না; গ্রামের প্রধান প্রধান ব্যক্তিগণের প্রাণদণ্ডের বিধান হইল, এবং গ্রামবাসী বালক বৃদ্ধ ও স্ত্রীলোক সকলেরই নাসিকা ও জিহ্বা কর্ত্তন করিবার আদেশ প্রদত্ত হইল। এই কর্ত্তিত জিহ্বা ও নাসিকা দ্বারা গ্রামের লোকসংখ্যা স্থির করা হইয়াছিল, এবং এই বীর-গৌরব চিরস্মরণীয় করিবার জন্য, গ্রামের পূর্ব্ব নামের পরিবর্ত্তন করিয়া “নাসকাটাপুর” এই নাম প্রদত্ত হইল। ভূতোয়ালের থানাধ্বংসের কাহিনী বা দারোগার হত্যাকাণ্ড, এই প্রকার পৈশাচিক ব্যাপারের সহিত তুলনায় অতি সামান্য।
ভূতোয়ালের থানা বিদ্ধস্ত হইলে, ইংরেজগণ ইহার প্রতিবিধানে সহসা অগ্রসর না হওয়ায়, ইহারা আর একটি থানা আক্রমণ করিয়া, আরও অনেকগুলি লোককে নিহত করিল। এ সময়ে ইংরাজগণ এই অত্যাচারের প্রতিশোধ দিতে উৎসুক হইলেও, বর্ষাকাল আসিয়া পড়ায়, তাঁহারা কার্য্যতঃ কোন উপায়ই অবলম্বন করিতে পারিলেন না। যাহা হউক, এ সমস্ত কথা উত্থাপন করিয়া, ভারতবর্ষের তদানীন্তন রাজপ্রতিনিধি লর্ড ময়রা, নেপালরাজকে একখানি পত্র লিখিয়াছিলেন, কিন্তু তদুত্তরে নেপালরাজ বৃটিশ সিংহকে এমন উদ্ধত উত্তর প্রেরণ করিয়াছিলেন যে, ১৮১৪ খৃষ্টাব্দে প্রকাশ্য যুদ্ধঘোষণা করা হইল।
দানাপুর, বারাণসী, মিরট ও লুধিয়ানা হইতে চারি দল সৈন্য সজ্জিত হইল; মেজর জেনারল জিলেস্পাই মিরট হইতে সজ্জিত সৈন্য দলের অধিনায়ক হইলেন। প্রথমে এই দলে সর্ব্বসমেত ৩৫১৩ জন সৈন্য ও ১৮টি কামান ছিল, কিন্তু অবশেষে এই দলের আরও বলবৃদ্ধি হইয়াছিল।
স্থির হইল, জিলেস্পাই-এর সৈন্যশ্রেণী প্রথমে শিভালিক পর্ব্বত অতিক্রম পূর্ব্বক দেরাদুনে উপস্থিত হইবে, তাহার পর বিরোধিগণের বল অবস্থা অনুসারে, হয় শ্রীনগরে অমরসিংহের থানার বিরুদ্ধে যাত্রা করিতে হইবে, নয় লুধিয়ানা হইতে জেনারেল অক্টারলোনী যে সেনাদল লইয়া অগ্রসর হইতেছিলেন, সেই দলের সহিত সম্মিলিত হইয়া নাহানে অমরসিংহের পুত্ত্র রণজয় সিংহকে আক্রমণ করিতে হইবে।
এ দিকে রাজপ্রতিনিধি তদানীন্তন দিল্লীর রেসিডেণ্ট মেটকাফ সাহেবকে গড়োয়ালের নির্ব্বাসিত রাজা সুদর্শন শার কার্য্যকলাপ পর্য্যবেক্ষণ করিতে অনুমতি করিলেন। তদনুসারে রেসিডেণ্টের সহকারী ফ্রেসার সাহেব হরিদ্বার প্রভৃতি স্থান অতিক্রম করিয়া দেরাদুনে তৃতীয় সৈন্যদলে (মিরটের দলে) যোগ দিলেন। এই দল সাহারাণপুর হইতে বাহির হইয়া মোহন-পাশের ভিতর দিয়া দেরাদুনে আসিয়া উপস্থিত হইল। সে সময়ে পথ কদর্য্য ছিল যে, খিরির সহৃদয় জমিদারগণ বিশেষ সাহায্য না করিলে বৃটিশ সৈন্যগণকে অনেক কষ্ট স্বীকার করিতে হইত। দেশীয় রাজন্যবর্গের সাহায্যে ইংরেজগণ এইরূপ অনেকবারই আশাতীত ফল লাভ করিয়াছেন; অনেক যুদ্ধে গবর্মেণ্ট জানিতে পারিয়াছেন, দেশীয় রাজগণ প্রাণপণে তাঁহাদের সাহায্য করেন, এবং সন্তুষ্ট চিত্তে তাঁহারা সকল অসুবিধা সহ্য করেন, কিন্তু কৃতজ্ঞ গবর্মেণ্ট এজন্য অনেক দিন হইতেই দেশীয়দিগকে রাজভক্তিহীন বলিয়া মনে করিয়া আসিতেছেন।
যাহা হউক, অনেক কষ্ট সহ্য করিয়া, ২৪শে অক্টোবর ইহারা দেরাদুনে উপস্থিত হইল। শীতকাল, প্রকৃতিদেবী তখন হিমালয়ের পাষাণ দেহে স্তরে স্তরে তুষাররাশি ঢালিয়া রাখিয়াছিলেন; প্রচণ্ড শীতে এবং উপযুক্ত খাদ্যদ্রব্যের অভাবে সৈন্যদলের বিশেষ কষ্ট হইতেছিল; কিন্তু এই কষ্ট সহ্য করিয়া থাকা ভিন্ন তাহাদের উপায় ছিল না। এই সময়ে রাজপুরের দক্ষিণ পূর্ব্বে,—দেরাদূনের ঠিক উত্তর পূর্ব্বে সাড়ে তিন মাইলের মধ্যে নালাপানির পাহাড়ের উপর অমরসিংহের ভ্রাতুষ্পুত্ত্র বলভদ্র সিংহ সামান্য একটি দুর্গ নির্ম্মাণ করিয়া বাস করিতেছিলেন। তাঁহার সঙ্গে অধিক লোক ছিল না; এই দুর্গের প্রতি বৃটিশ সেনানায়কের দৃষ্টি পতিত হইল।
কিন্তু এই দুর্গ জয় করা সহজ নহে; দুর্গ যে অজেয় এবং দুর্ভেদ্য, তাহা নহে; কিন্তু এই দুর্গের নিকটবর্ত্তী হওয়া—বিশেষতঃ সেই শীতকালে, ভয়ানক দুঃসাধ্য ব্যাপার। পাহাড় এমন সোজা যে, তাহার গাত্র বহিয়া অতি কষ্টে পথ করিয়া লওরা যাইতে পারে; কিন্তু সে পথে এককালে অধিক লোক উঠবার সম্ভাবনা নাই। ইহার উপর দুর্গপ্রান্ত হইতে নিম্নের সমতলভূমি পর্য্যন্ত ভয়ানক জঙ্গল এবং কণ্টকের অরণ্য,—ইহারা দুর্গবাসীর প্রহরীর ন্যায় কার্য্য করিত। আমি যখন দেখিয়াছি, সে সময় সেখানে দুর্গম অরণ্য ছিল না, এবং পর্ব্বতে উঠিবার পথ ভাল না হইলেও দুরারোহ ছিল না। কিন্তু এখানে দেখিবার আর কিছুই নাই। এমন কি, দুর্গের ভগ্নাবশেষও আর দেখিতে পাওয়া যায় না; সেগুলি কালক্রমে পাহাড়ের অঙ্গে মিশিয়া গিয়াছে, এবং তাহা নিবিড় জঙ্গলে সমাচ্ছন্ন; তাহা দেখিয়া কে বলিতে পারে, এক দিন এই শৈল-শিখরে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধানল প্রজ্বলিত হইয়াছিল? যতই ক্ষুদ্র হউক, যে কয়টি স্বাধীনতা-প্রিয় মানব-সন্তান এখানে আপনাদিগের হৃদয়শোণিত নিঃসারিত করিয়াছেন জগতের বীরত্বের ইতিহাসে তাঁহাদের নাম সন্নিবদ্ধ হইবার যোগ্য। কিন্তু সে কাহিনী এখন স্বপ্নপ্রায়,— গৌরবের সেই শ্মশান এখন অরণ্যে সমাচ্ছন্ন। হায়, মানব-গৌরব! দুই দিনেই তাহা এইরূপে অন্ধকারে বিলীন হইয়া যায়।
এই স্থানে দুর্গ সম্বন্ধে দুই একটি কথা বলা আবশ্যক। দুর্গ বলিলে অনেকের মনে কলিকাতার কিংবা দিল্লী ও আগ্রার দুর্ভেদ্য, সুকৌশলনির্ম্মিত, সমুন্নত দুর্গশ্রেণীর কথা উদিত হইবে। নালাপানি, বা ইতিহাসে যাহাকে কলুঙ্গা বলে, সে স্থানে যে দুর্গ স্থাপিত ছিল, তাহাকে এ হিসাবে “দুর্গ” আখ্যা দেওয়া যাইতে পারে না। দুর্গ বলিলে পাঠকের মানস পটে যে সকল চিত্র ফুটিয়া উঠে—নালাপানিতে তাহার কিছুই ছিল না। হিমালয়ের অগণ্য, প্রস্তরখণ্ড চারিদিকে বিক্ষিপ্ত হইয়া রহিয়াছে, চতুর্দ্দিকে প্রকাণ্ড শালবৃক্ষসমূহ যুগাতীত কাল হইতে অটলভাবে সমুন্নত মস্তকে অবস্থিত রহিয়াছে। এই প্রস্তরখণ্ড এবং এই শালবৃক্ষশ্রেণী, এই উভয় উপাদানে এই দুর্গ নির্ম্মিত। শালবৃক্ষের বেষ্টনী—আর তাহার পার্শ্বে বৃহৎ প্রস্তরখণ্ড দ্বারা প্রকাণ্ড প্রাচীর নির্ম্মিত হইয়াছে। এই প্রাচীর পরিবেষ্টিত স্থানের মধ্যে বীর বলভদ্র সিংহ ইংরাজের সহিত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইয়া বসিয়াছিলেন।
২৪শে অক্টোবর জিলেস্পাইর সৈন্যদল দেরাদুনে পৌঁছে; তিনি সে সময় স্বয়ং উপস্থিত হইতে পারেন নাই, সৈন্য পরিচালনের ভার কর্ণেল মৌলি সাহেবের উপর প্রদত্ত হইয়াছিল। শীত ক্রমেই বর্দ্ধিত হইয়াছিল; এবং খাদ্যদ্রব্যও তেমন সহজ প্রাপ্য ছিল না—সুতরাং শীতে সৈন্যগণকে অবসন্ন না করিয়া, প্রথম উদ্যমেই তিনি যুদ্ধ ব্যাপার শেষ করিবেন, স্থির করিলেন, বিশেষতঃ একটি অসভ্য, পার্ব্বত্য পল্লীর ভূস্বামীকে পরাস্ত করিবার জন্য এতখানি আয়োজন, সেই সৈনিক পুরুষের নিকট কিঞ্চিৎ বাহুল্য বলিয়া বোধ হইয়াছিল। অতএব সেই রাত্রেই কর্ণেল সাহেব বলভদ্রের নিকট দূত প্রেরণ করিলেন, এবং তাহার সঙ্গে এই মর্ম্মে এক পত্র লিখিলেন যে, যদি পরদিন প্রত্যূষে বলভদ্র আত্মসমর্পণ না করে, তাহা হইলে তাহার মঙ্গল নাই; তোপমুখে তাহার আরণ্যদুর্গ উড়াইয়া দেওয়া হইবে। কর্ণেল মৌলি পর্ব্বতের নিম্নদেশ হইতে এই দুর্গ দেখিয়া মনে করিয়াছিলেন, সামান্য ভয় প্রদর্শনমাত্রেই কার্য্যসিদ্ধি হইবে।
কিন্তু সেই অসভ্য দুর্গস্বামী অটল ছিল; স্বাধীনতার অমৃতময় রসে তাহার বীরজীবন পুষ্ট হইয়াছে, মৃত্যুভয়ে সে ভীত হইল না; ইংরেজ-বীরের সদর্প ভ্রুভঙ্গি উপেক্ষা করিল। নিয়মিত সময়ে দূত প্রত্যাগমন করিয়া সবিনয়ে নিবেদন করিল, বলভদ্র সিং ঘোর অবজ্ঞাভরে পত্রখানি ছিঁড়িয়া ফেলিয়াছে এবং বলিয়া দিয়াছে, ইচ্ছা হইলে ইংরাজ সেনাপতি তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে পারেন, সে জন্য সে ভীত বা পশ্চাৎপদ নহে। সেই সামান্য দুর্গের ক্ষুদ্র অধিস্বামী বৃটিশ সিংহকে এমন কথা বলিবে, ইহা কাহারও মনে হয় নাই; বিশেষতঃ দেরাদুনেই যে গুর্খারদিগের সহিত ইংরেজ সৈন্যের যুদ্ধ বাধিতে পারে, জিলেস্পাইর এ কথা একবারও মনে হয় নাই; সেইজন্য তিনি ধীরে ধীরে পশ্চাতে আসিতেছিলেন।
বলভদ্র সিংহের অবজ্ঞাপূর্ণ উত্তর পাইয়া কর্ণেল মৌলি ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিলেন; জিলেস্পাইএর অপেক্ষা না করিয়া পরদিন প্রভাতেই তিনি সমস্ত পথ ঘাট স্বচক্ষে পর্য্যবেক্ষণ করিয়া আসিলেন, এবং তাহার পর হস্তীপৃষ্ঠে কয়েকটি ক্ষুদ্রায়তন কামান রাখিয়া কিছু দূর অগ্রসর হইলেন এবং “ফায়ার” করিতে অনুমতি দিলেন। তিনি মনে করিরাছিলেন চারি বার কামান গর্জ্জন শুনিয়াই পার্ব্বত্য মূষিকগণ ইংরাজের অমোঘ শক্তি বুঝিতে পারিবে, এবং পার্ব্বত্য বিবরে প্রবেশ করিবে, প্রকৃত যুদ্ধ বিগ্রহের আবশ্যক হইবে না। পূর্ব্ব হইতেই কর্ণেল সাহেবের এ ধারণা ছিল; কিন্তু দুর্গবাসিগণ ভয়ের অতি সামান্য চিহ্নও প্রকাশ করিল না। গম্ভীর তোপধ্বনি নিস্তব্ধ গিরি-উপত্যকায় পুনঃ পুনঃ প্রতিধ্বনিত ইইয়া শূন্যে মিশাইয়া গেল, দুই একটি বৃক্ষপত্র কম্পিত হইল, তরুশাখাসীন পক্ষিকুল এই অনভ্যস্ত শব্দে ভীত হইয়া উচ্চতর প্রদেশের অরণ্য মধ্যে আশ্রয় লইল। একখানি প্রস্তরখণ্ডও স্বস্থানচ্যুত হইল না; কামাননিক্ষিপ্ত গোলা দুর্গপ্রান্তস্থ শালব্যুহের সামান্য অংশও ভেদ করিতে পারিল না। কর্ণেল সাহেব এ সংবাদ তৎক্ষণাৎ সাহরানপুরে জিলেস্পাই সাহেবের নিকট প্রেরণ করিলেন; পর দিন ২৬শে অক্টোবর প্রাতঃকালে জিলেস্পাই যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হইলেন।
জিলেস্পাই সাহেব একবার চতুর্দ্দিক দেখিয়া আসিলেন। অনন্তর দুর্গ আক্রমণের বন্দোবস্ত হইল। এই বন্দোবন্তে আরও দুই তিন দিন কাটিয়া গেল। নালাপানি দুর্গের সম্মুখে প্রায় পাঁচশত গজ দূরে একটা সমভূমির উপর কামানশ্রেণী সজ্জিত করা হইল, এবং সৈন্যদল চারি ভাগে বিভক্ত হইল; কর্ণেল কার্পেণ্টার, কাপ্তেন ফাষ্ট, মেজর কেলি এবং কাপ্তেন ক্যাম্বেল্—এই চারিজন সেনানায়কের অধীনে চতুর্দ্দিকে সৈন্য সন্নিবিষ্ট হইল। এই চারি দলে সৈন্যসংখ্যা আট শত; এতদ্ভিন্ন মেজর লড্লর অধীনে ৯৩৫ জন “রিজার্ভ” রহিল। স্থির হইল, এই চারি দিক হইতে একই সময়ে নালাপানি আক্রমণ করিবে, তাহা হইলে শত্রুপক্ষ কোন্ দিক রক্ষা করিবে বুঝিতে না পারিয়া হতবুদ্ধি হইয়া পড়িবে।
কিন্তু নিজের বুদ্ধি দ্বারা অন্যের বুদ্ধি আয়ত্ত করিতে যাওয়া, বিশেষতঃ আয়ত্ত করিয়াছি, এই সিদ্ধান্তে “লঙ্কাভাগ” করা সর্ব্বত্র নিরাপদ নহে। উপস্থিত ব্যাপারেও তাহাই হইয়াছিল। কিঞ্চিৎ বিবেচনার সহিত অনুধাবন করিলে জিলেস্পাই সাহেব বুঝিতে পারিতেন, এই কয় দিনের যুদ্ধায়োজনের মধ্যেও বলভদ্র সিংহ যে নির্ভীক ও সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন, তাহার নিশ্চয়ই একটা কারণ আছে, এবং দুর্গ আক্রমণ তিনি যেরূপ সহজ মনে করিয়াছিলেন, ইহা সেরূপ সহজ নহে। পথ দুরারোহ, কণ্টকারণ্যে সমাকীর্ণ; তাহার উপর দুই এক স্থানে প্রস্তরশ্রেণী এরূপ সুকৌশলে সজ্জিত ছিল। যে, তাহার উপর দিয়া অগ্রসর হইতে কিছুমাত্র সন্দেহ হয় না, কিন্তু পদসঞ্চারমাত্রেই তাহা গড়াইতে গড়াইতে বহু নিম্নে পতিত হয়। সৈন্যদলের সুশিক্ষিত পদচালনা, অসীম সাহস ও বল, এবং অব্যর্থ অস্ত্রকৌশল কোনও ক্রমেই সে পতন হইতে তাহাদিগের রক্ষা করিতে পারে না। উদ্ধত বীর জিলেস্পাই হয় ত এত কথা বিবেচনার অবসর পান নাই; পাইলে সহসা চারিদিক হইতে দুর্গ আক্রমণ করিয়া মুহূর্ত্তে তাহা জয় করিবার আশা তাঁহার নিকট অসম্ভব বোধ হইত; হয় ত এই ভ্রম না হইলে অকালে তাঁহাকে জীবন বিসর্জ্জন করিতে হইত না।
এ দিকে বলভদ্র সিংহের দুর্গ এমন সুকৌশলে নির্ম্মিত যে, সিঁড়ি ব্যতীত ভিতরে প্রবেশ করিবার উপায় ছিল না; চারি দিকে দুর্ভেদ্য পর্ব্বত যেন তাহার পাষাণদেহ বিস্তৃত করিয়া এই কয়টি স্বাধীনতাপ্রিয় মানবকে অক্ষয় কবচের ন্যায় রক্ষা করিতেছিল। এক দিকে একটি ক্ষুদ্র দ্বার ছিল বটে, কিন্তু সেই দিক সর্ব্বাপেক্ষা দুরারোহ; গগনস্পর্শী বিরাট শৈলশৃঙ্গ সে দিকে সরলভাবে উন্নতমস্তকে দণ্ডায়মান; মনুষ্যনির্মিত আগ্নেয়াস্ত্র তাহা বিদীর্ণ করিতে সক্ষম নহে; মনুষ্যের দুর্দ্দম স্পৃহা এবং দাম্ভিক বল-দর্প তাহাতে আহত হইয়া চূর্ণ হইয়া যায়।
জিলেস্পাই সাহেব কতকগুলি সৈন্য লইয়া কিয়দ্দূর অগ্রসর হইলেন, এবং কামান ছুঁড়িতে আদেশ করিলেন। কামানে ক্রমাগত অগ্নি উদগীরণ হইতে লাগিল; জ্বলন্ত, অগ্নিময় গোলকসমূহ মুহুর্মুহু বলভদ্র সিংহের দুর্গপ্রান্তে আসিয়া পড়িতে লাগিল, কিন্তু সেই প্রকাণ্ড বৃক্ষশ্রেণী এবং তাহার গাত্রস্থিত প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড প্রস্তরের একখানিও স্থানচ্যুত কিম্বা ভিন্ন হইল না; দুই এক খানির কোনও কোনও অংশ ভাঙ্গিল মাত্র।
কামান ব্যর্থ দেখিয়া জিলেস্পাই সাহেব একেবারে অধীর হইয়া পড়িলেন, এবং নির্দ্দিষ্ট সময়ের পূর্ব্বেই আক্রমণ করিবার জন্য সঙ্কেত তোপধ্বনি করিলেন। কিন্তু দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ দল, হয় সেই সঙ্কেতধ্বনি শুনিতে পায় নাই, নয় নির্দ্দিষ্ট সময়ের পূর্ব্বে সেই শব্দ শুনিয়া তাহারা সঙ্কেতধ্বনি বলিয়া বুঝিতে পারে নাই, সুতরাং তাহারা অগ্রসর হইল না। কেবল কর্ণেল কার্পেণ্টারের সৈন্যদল ও রিজার্ভ ফৌজ বেলা নয়টার সময় অগ্রসর হইল। এতক্ষণ ইংরাজসৈন্য যে স্থান হইতে গোলা বর্ষণ করিতেছিল, সে স্থান এত দুর্গম বা দুরারোহ ছিল না; কিন্তু এইবার তাহাদের অধিকতর ভয়ানক পথে অগ্রসর হইতে হইল। জিলেস্পাই এবার কিঞ্চিৎ বুঝিতে পারিলেন যে, এই কার্য্য তিনি পূর্ব্বে যত সহজ মনে করিয়াছিলেন, ইহা তত সহজ নহে; আজ যুদ্ধ জয় করিতে অনেক সাহসী বীরের প্রাণ উৎসর্গ করিতে হইবে। তাহাও উত্তম, বলভদ্রের পার্ব্বত্য অধিকার আজ হস্তগত করিতেই হইবে; তাহার দুর্গে বৃটীশকেতন উড়াইতে না পারিলে বৃটীশ নামের গৌরব বিনষ্ট হইবে; সাহস ও উৎসাহের সহিত জিলেস্পাই অগ্রসর হইতে লাগিলেন। তাঁহার দৃষ্টান্তে উৎসাহিত সৈন্যগণ সমস্ত কষ্ট তুচ্ছ জ্ঞান করিয়া বীর দর্পে অগ্রসর হইতে লাগিল।
কিন্তু বিপদের উপর বিপদ। কিয়দ্দূর অগ্রসর হইলে দুর্গ হইতে বৃষ্টিধারার ন্যায় অবিশ্রান্ত গুলি বর্ষণ হইতে লাগিল। এই অচিন্ত্যপূর্ব্ব বিপদে সৈন্যগণ মুহূর্ত্তের জন্য কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িল, কিন্তু পশ্চাৎপদ হইল না। তিনি তাহাদের অধিনায়ক,—ভয় কাহাকে বলে, তাহা তিনি জানিতেন না; সৈন্যগণও সেরূপে শিক্ষিত হইয়াছিল। মুহূর্ত্তের জন্য তাহারা নিশ্চল হইল বটে, কিন্তু পশ্চাৎপদ হইল না। সেনাপতি নিষ্কাশিত অসি হস্তে তাহাদিগকে উৎসাহিত করিয়া অগ্রসর হইতে লাগিলেন; ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি আসিয়া পড়িতে লাগিল, দলে দলে ইংরাজ সৈন্য হত ও আহত হইতে লাগিল; কিন্তু হতাবশিষ্ট দল হটিল না, সমান বীরদর্পে দুর্গপ্রাকারের নিকটবর্ত্তী হইল।
সিঁড়ি ভিন্ন দুর্গে উঠিবার উপায় নাই। সঙ্গের সিঁড়ি তখন পশ্চাতে। অল্পক্ষণ পরে লেপ্টেনাণ্ট এলিস্ সিঁড়ি লইয়া সেখানে উপস্থিত হইলেন, এবং সিঁড়ি বাহিয়া তিনিই সর্ব্বাগ্রে উপরে উঠিলেন। কিন্তু উপরে উঠিয়া তাঁহাকে আর দুর্গের ভিতরে অগ্রসর হইতে হইল না; বিপক্ষের বন্দুকের গুলি তাঁহার ললাটদেশ বিদ্ধ করিল। মুহূর্ত্ত মধ্যে তাঁহার প্রাণহীন দেহ দুর্গমূলে পতিত হইল। যাহারা দুর্গপ্রাচীরের সমীপবর্ত্তী হইয়াছিল, তাহারা একটু হটিয়া আসিল।
কিন্তু জিলেস্পাই সাহেব “মন্ত্রের সাধন কিয়া শরীর পতন” এই মূলমন্ত্র হৃদয়ে ধারণ পূর্ব্বক এই যুদ্ধে অগ্রসর হইয়াছিলেন; লেপ্টেনাণ্ট এলিসের মৃতদেহ তখনও তাঁহার সম্মুখে; দেহ হইতে প্রাণবায়ু বহির্গত হইয়াছে বটে, কিন্তু হৃদয়শোণিত তখনও শীতল হয় নাই। সেই চিরনিদ্রিত বীরের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করিলেন, তাঁহার আত্মার সদ্গতির জন্য একবারে প্রার্থনা করিলেন, তাহার পর আহত সিংহের ন্যায় আবার অগ্রসর হইলেন। প্রতিহিংসার যে অগ্নি তাঁহার হৃদয়ে প্রজ্জ্বলিত হইয়াছিল, এই ক্ষুদ্র গিরিদুর্গকে দগ্ধ না করিয়া যেন তাহা নির্ব্বাপিত হইবে না।
জিলেস্পাই দুর্গের অতি নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। দুর্গ হইতে অধিকতর বেগে গুলি বর্ষিত হইতে লাগিল; সাহসী সৈন্যগণের অগ্রসর হইতে আপত্তি নাই, কিন্তু আর অগ্রসর হওয়া অসম্ভব। দণ্ডায়মান হইয়া বীরের ন্যায় প্রাণ বিসর্জ্জন করিলে যদি কার্য্যোদ্ধার হইত, তাহা হইলে তাহারা কৃতকার্য্য হইতে পারিত। কিন্তু প্রাণ পণ করিয়াও সর্ব্বদা কৃতকার্য্য হওয়া যায় না। প্রতি মুহূর্ত্তে ইংরাজ সেনা ক্ষীণ হইতে লাগিল, হত আহত সৈনিকের স্তূপে সে স্থান পরিপূর্ণ হইয়া গেল। জয়লক্ষ্মী আজ ইংরাজের প্রতি অপ্রসন্ন।
কিন্তু জিলেস্পাই আজ দুর্জয় পণ করিয়া যুদ্ধ যাত্রা করিয়াছিলেন। ক্রমাগত সৈন্যধ্বংস হইতে দেখিয়াও তিনি নিরাশ হইলেন না; আজ তিনি জয় অথবা মৃত্যু, এই উভয় কাম্যের অন্যতরের জন্য কৃতসংকল্প। তিনি পুনর্ব্বার তরবারি হস্তে হতাবশিষ্ট সৈন্যগণকে উৎসাহিত করিয়া সকলের অগ্রে চলিতে লাগিলেন। সহসা একটি জ্বলন্ত গোলা আসিয়া তাঁহার বক্ষে পতিত হইল, তৎক্ষণাৎ তিনি পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইলেন। রিজার্ভ দলের অধিকাংশ সৈন্যই জীবন বিসর্জ্জন করিল। ইংরাজ সৈন্য সম্পূর্ণ পরাস্ত হইয়া দেরাদুনে প্রত্যাগমন করিল। অসহিষ্ণু জিলেস্পাই তাঁহার অবিবেচনার প্রতিফল পাইলেন। বহুসংখ্যক নির্ভীক বীর অকারণে তাহাদের হৃদয়শোণিতে এই পাষাণময় গিরিতল অভিষিক্ত করিল।
সে দিনের মত যুদ্ধ বন্ধ হইল। কর্ণেল মৌলি “সিনিয়ার অফিসার”, সুতরাং তিনিই সৈন্যাধ্যক্ষের পদে অভিষিক্ত হইলেন। কিন্তু তিনি বুঝিলেন, এই মুষ্টিমেয় সৈন্য লইয়া পুনর্ব্বার এই দুর্গজয়ে অগ্রসর হওয়া বাতুলতা মাত্র। অতএব দলপুষ্টি না করিয়া আর এ কাজে হস্তক্ষেপ করা তিনি কর্ত্তব্য বোধ করিলেন না। Battering train এবং আরও অধিকসংখ্যক সৈন্যের জন্য তিনি দেরা হইতে দিল্লীতে পত্র লিখিলেন, এবং তাহাদের অপেক্ষায় বসিয়া রহিলেন। এই ভাবে এক মাস কাটিয়া গেল। এদিকে বলভদ্র সিংহ বুঝিয়াছিলেন, সিংহ প্রতিশোধকামনায় সুযোগের অপেক্ষা করিতেছে; তিনিও দুর্গের দৃঢ়তা বৃদ্ধি করিতে ও রসদ সংগ্রহে মনোযোগী হইলেন।
২৪ এ নভেম্বর দিল্লী হইতে Battering train আসিয়া উপস্থিত হইল। কালবিলম্ব না করিয়া তাহার পরদিনই ইংরাজ সৈন্য পুনর্ব্বার অগ্রসর হইল। দুর্গ হইতে ৬ শত হস্ত দূরে একটা সমতল স্থানে কামান স্থাপন করিয়া শত্রুদুর্গের দিকে ক্রমাগত গোলা বর্ষিত হইতে লাগিল। ২৬ এ দেখা গেল যে, দুর্গের সেই অংশটি ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। তখন দুর্গ আক্রমণের আদেশ প্রদত্ত হইল। এবারেও উভয় পক্ষে ভয়ানক যুদ্ধ চলিল; উভয়ই নির্ভীক এবং শিক্ষিত; একদলের চেষ্টা এই অসভ্য পার্ব্বত্য জাতিকে বিধ্বস্ত ও তাহাদের গিরিচূর্গ সমভূমি করিতে হইবে; অপরের চেষ্টা, প্রাণ যায়, তাহাও স্বীকার, শেষ মুহূর্ত্ত পর্য্যন্ত দুর্গ রক্ষা করিতে হইবে। এই যুদ্ধে এই দিনও তিন চারি জন ইংরাজ সেনানায়ক কর্ণেল প্রাণত্যাগ করিলেন। অনেক কষ্টে এবং বহুসংখ্যক ইংরেজ সৈন্য হত আহত হওয়ার পর, ইংরেজ সৈন্যের এক অংশ দুর্গতলে উপস্থিত হইল। কিন্তু ইংরেজের গোলায় দুর্গের যে অংশ ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল, সেই স্থান দিয়া দুর্গে প্রবেশ করা অসম্ভব। গিরিগুহার দ্বারে সিংহ অবস্থান করিলে, সেই গুহায় প্রবেশ করা যেমন অসম্ভব, গুর্খাবীরগণের দ্বারা সযত্নে রক্ষিত এই ভগ্নস্থান দিয়া দুর্গ প্রবেশও ইংরাজ সৈন্যের পক্ষে তদ্রূপ অসম্ভব হইয়া উঠিল। এই সকল গুর্খাবীরের সহিত ইংরেজগণের অনেকক্ষণ ধরিয়া যুদ্ধা চলিল। গুর্খা অসভ্য হউক, কিন্তু তাহাদের আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষমতা অল্প নহে; ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি পড়িতে লাগিল, প্রতিবারই দশ পনের জন ইংরেজ সৈন্য হত বা আহত হইয়া পড়িতে লাগিল; এবং শীঘ্রই তাহারা বুঝিতে পারিল এই ভয়ানক স্থানে অগ্রসর হওয়া সহজ নহে। বৃথা প্রাণদানে অস্বীকার করিয়া তাহারা হটিয়া আসিল। মুষ্টিমেয় পার্ব্বত্য গুর্খা একবার নয়—দুই দুই বার শিক্ষিত ইংরেজ সৈন্যকে বিমুখ করিল। ইংরেজের অব্যর্থ সন্ধান অসভ্য গুর্খার বল ও সাহসের সম্মুখে ব্যর্থ হইয়া গেল। ভারতের ইতিহাসে এরূপ ঘটনা অধিক ঘটে নাই, এবং যাহা ঘটিয়াছে ইতিহাস-প্রণেতৃগণ তাহারও বড় উল্লেখ করেন নাই। মানুষ চিত্রকরা তাই সিংহ মানবহস্তে পরাভূতরূপে চিত্রিত হয়, ইহা কোনও বিখ্যাত শ্রদ্ধেয় লেখকের উক্তি;—কিন্তু চিরকালই কি এ নিয়ম থাকিবে? ইহাতে মনুষ্যের বল এবং কৌশল প্রমাণিত হউক, কিন্তু মহত্ত্ব প্রমাণিত হয় কি না সন্দেহ।
যুদ্ধ-পিপাসা প্রশমিত হইল না; দুর্গজয়ের আশাও ইংরেজগণ ত্যাগ করিতে পারিলেন না। দুর্গ আক্রমণের জন্য আবার আয়োজন চলিতে লাগিল। ৫৩ সংখ্যক সৈন্যদল পূর্ব্বে দুইবার অসীম সাহসে যুদ্ধ করিয়াছিল; কিন্তু এবার তাহারা ক্লান্ত ও ভগ্নোৎসাহ হইয়া পড়িল; তাহারা যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন করিতে চাহে না, যুদ্ধক্ষেত্রে দণ্ডায়মান হইয়া নির্ভীকভাবে প্রাণত্যাগ করিতেও তাহারা প্রস্তুত; কিন্তু তাহারা বৃথা অগ্রসর হইতে প্রস্তুত নহে।
তিন দিন পরে সমস্ত ইংরেজসৈন্য একযোগে দুর্গ আক্রমণ করিল। সমস্ত ইংরেজ সৈন্যের প্রতিহিংসা, ক্রোধ এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞা অগ্নির ন্যায় গুর্খাদিগকে দগ্ধ করিবার জন্য, তাহাদিগের বিরুদ্ধে প্রধাবিত হইল। ক্রমাগত গোলাবর্ষণে দুর্গের পাঁচ ছয়টি স্থান ভাঙ্গিয়া গেল। তখন সেই মুষ্টিমের দুর্গবাসীগণের দ্বারা দুর্গ রক্ষা করা অসম্ভব হইয়া উঠিল। বীর বলভদ্র দেখিলেন, আর দুর্গ রক্ষা করা যায় না; এখনই ইংরেজসৈন্য ক্ষুধিত ব্যাঘ্রের ন্যায় তাহাদের উপর আসিয়া পড়িবে! যদি মরিতে হয়, তবে বীরের মত মরাই বিধেয়। ইংরেজ যোদ্ধাগণকে তাহাদের ভুজবীর্য্য দেখাইতে কৃতসঙ্কল্প হইয়া বীর বলভদ্র হতাবশিষ্ট সত্তর জন সহচর সমভিব্যাহারে, দুর্গ ত্যাগ করিলেন। সেই সত্তর জন বীর নিষ্কাশিত অসিহস্তে আপনাদের পথ পরিষ্কার করিয়া ইংরেজসৈন্যরেখার অভ্যন্তর দিয়া আপনাদের অভীষ্ট স্থানে চলিয়া গেল।
এখানে একটি কথা বলা আবশ্যক। বলভদ্র সিংহের পার্ব্বত্য দুর্গে পানীর জলের কোনও প্রকার বন্দোবস্ত ছিল না। এক নালাপানি ভিন্ন নিকটে অন্য কোনও নির্ঝরও ছিল না; কিন্তু নালাপানিতে ইংরেজ সৈন্যের ছাউনি। সেখান হইতে জল আনিয়া তাহা পান করা অসম্ভব। উষ্ণপ্রধান প্রদেশ হইলে হয় ত তাহারা একদিনও সহ্য করিতে পারিত না, কিন্তু হিমালয়ের ক্রোড়ে শৈত্যের মধ্যে পিপাসার প্রাবল্য অধিক নহে। গুর্খা সৈন্যদল কয়েক দিন জল পান না করিয়াও অতিবাহিত করিয়াছিল। কিন্তু যুদ্ধে তাহারা ক্রমেই ক্লান্ত হইতে লাগিল; পিপাসা ক্রমেই বৃদ্ধি পাইরা তাহাদিগকে অধীর করিয়া তুলিল; আহারসামগ্রী ফুরাইয়া আসিল; এবং ইংরেজ সৈন্যের অক্লান্ত আক্রমণে তাহাদের বল ক্ষীণতর হইতেছিল। ইহার উপর দুর্গপ্রাচীর ভগ্ন হইল, সুতরাং এখন দুর্গত্যাগ ভিন্ন আর কি উপায় থাকিতে পারে? তাই তাহারা জীবনের আশায় জলাঞ্জলি দিয়া, প্রাণপণ শক্তিতে ইংরেজসৈন্য ভেদ করিয়া অগ্রসর হইল।
নালাপানি তাহাদের লক্ষ্যস্থান হইয়াছিল। ইংরেজ সৈন্য কোন ক্রমেই তাহাদিগকে প্রতিহত করিতে পারিল না; ইংরেজ সৈন্যরেখা বিদীর্ণ করিলে, কতকগুলি ইংরেজ সৈন্য তাহাদিগের পশ্চাদ্ধাবন করিল। কিন্তু সেই বীর গুর্খাগণ হিমাচলের প্রিয় সন্তান; তাহারা যে পথে যেরূপে অক্লেশে অথচ দ্রুতগতিতে চলিয়া গেল, শিক্ষিত ইংরেজসৈন্য তাহাদিগের অনুসরণে কোনক্রমেই সফলকাম হইল না। তাহারা প্রাণ ভরিয়া নালাপানির নির্ম্মল জল পান করিল। এই জল দুর্গমধ্যে পাইলে তাহাদিগকে এমন অবস্থায় কখন এখানে, আসিতে হইত না। যে সকল সৈন্য পলায়ন করিয়াছিল, তাহারা রণজিৎসিংহের সৈন্যদলে যোগ দান করিয়াছিল।
বিজয়ী ইংরেজ সৈন্য, বলভদ্র সিংহের পরিত্যক্ত কলুঙ্গা দুর্গে প্রবেশ করিল। যাহা দেখিল, তাহাতে বিস্মিত হইয়া গেল। দেখিল, দুর্গমধ্যে হত ও আহতের সংখ্যা পঞ্চাশ জনের অধিক হইবে না। এত সামান্যসংখ্যক সহচরের সহায়তায়, বলভদ্র সুশিক্ষিত ইংরেজ সৈন্যকে এতদিন বিফলপ্রযত্ন করিয়াছিলেন। পানীয় জলের অভাব না হইলে দুর্গরক্ষায় তাহারা কৃতকার্য্য হইত না, কে বলিবে? দুর্গ-প্রাচীরের মধ্যে কোনও গৃহাদি ছিল না। উন্মুক্ত শূন্য আকাশ তাহাদের চন্দ্রাতপ এবং বিশাল শালবৃক্ষ তাহাদের পর্ণকুটীরের অভাব বিদূরিত করিয়াছিল। হিমমণ্ডিত, মুক্ত গিরির অন্তরালে বসিয়া একটি স্বাধীনতাপ্রিয় জাতি তাহাদের স্বাধীনতা রক্ষা করিতেছিল। স্বাধীনতার প্রিয় সন্তানবর্গের দুর্ভেদ্য বলিয়া, ইংরেজ সৈন্যগণ লোলুপ দৃষ্টিতে ইহার দিকে চাহিয়াছিলেন। অন্যান্য দুর্গের ন্যায় ইহারও একটা মোহকর আকর্ষণ ছিল; কিন্তু দুর্গবাসীগণের দুর্গ—ত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে সেই মোহিনীশক্তিও যেন বিদূরিত হইল। দুর্গে ধনসম্পত্তির নামমাত্র নাই। আহার্য্যদ্রব্য যৎকিঞ্চিৎ পড়িয়া আছে, হত ও আহতগণে দুর্গ পরিপূর্ণ, দুর্গন্ধে তিষ্ঠান কঠিন।
ইংরেজগণ কলুঙ্গার দুর্গ সমভূমি করিয়া ফেলিল, এবং একটি বীরজাতি যেখানে একদিন স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রাণপণে সংগ্রাম করিয়াছিল, সে কথাটা যেন পৃথিবী হইতে লুপ্ত করিবার জন্যই প্রকৃতি লতাপল্লবে এই পাষাণ গিরিঅন্তরাল আবৃত করিয়া রাখিয়াছেন। কলুঙ্গাযুদ্ধ সাধারণ পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য কোনও ঐতিহাসিক কর্ত্তৃক উজ্জ্বল ভাষায় বর্ণিত না হইলেও, উদার ইংরেজলেখক এ বিষয়ে কৃপণতা করেন নাই। দেরাদুনের ইতিহাসলেখক R. C. Williams B. A., C. S. এই যুদ্ধের উল্লেখকালে নির্ভীক বীর বলভদ্রের প্রশংসা করিয়া উপসংহারে লিখিয়াছেন, “Such was the conclusion of the defence of Kalunga a feet of arms worthy of the best of chivalry, conducted with a heroism almost sufficient to palliate the disgrace of our own reserves.”
জিলেস্স্পাই সাহেবের মৃতদেহ মিরটে সমাহিত করা হইয়াছিল; সেখানে আজও সমাধিস্তম্ভ আছে। সুদৃশ্য মারবেল স্তম্ভ এখনও নিম্নলিখিত কথা কয়েকটি বক্ষে ধারণপূর্ব্বক পর্ব্বতের স্তব্ধ প্রান্তে অক্ষুণ্ণ ভাবে দণ্ডায়মান রহিয়াছে:—
Vellore Cornellis Palsnbang. Sir R. R. Gillespie, D. Joejocarta.- 31st October 1814,—Kalunga.
আর, As a tribute of respect for our gallant Adversary Bulbhudder.”—দেরাদুনের জঙ্গলে রিচপানা নদীর তীরে নির্জ্জন প্রদেশে সেই ক্ষুদ্র মনুমেণ্ট। ক্ষুদ্র হইলেও ইহা বীর প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতি প্রদর্শিত প্রকাশ্য সম্মান, এবং যতই সামান্য হউক, বীর ইংরাজজাতি বীরের সম্মান রক্ষা করিয়া আপনাকে সম্মানিত করিয়াছেন।
এই যুদ্ধের সময় একটি ঘটনা ঘটিয়াছিল, তাহার উল্লেখ করা কর্ত্তব্য বোধ করিতেছি; কারণ ইহা দ্বারা গুর্খা জাতির চরিত্র সম্বন্ধে অনেক কথা পাঠকের মনে পরিস্ফুটরূপে উদিত হইতে পারে। যে গুণ প্রাচীন হিন্দু বীরগণের মধ্যে অসাধারণ ছিল না, ভারতের রাজস্থানের ইতিহাস এবং প্রতীচ্য ভূমণ্ডলে গ্রীস ও রোমের ইতিহাসে যে গুণ প্রায় প্রত্যেক বীরের জীবনে অভিব্যক্ত হইয়াছিল, এই অসভ্য গুর্খা জাতির মধ্যেও সেই গুণের অভাব ছিল না; তাহা বিশ্বস্ততা এবং স্বজাতিপ্রেম।
দ্বিতীয় বার আক্রমণের সময় হঠাৎ একজন গুরখা সৈনিকপুরুষ দুর্গ হইতে বাহির হইয়া ইংরাজসৈন্যের রেখা অভিমুখে দ্রুতবেগে অগ্রসর হইতে লাগিল। সে বামহস্তে তাহার মুখ আবৃত করিয়া দক্ষিণ হস্তের সঙ্কেতে তাহার প্রতি গুলিবর্ষণ নিষেধ পূর্ব্বক অগ্রসর হইতেছে দেখিয়া, বিস্মিত ইংরাজসৈন্য সেই মুহূর্ত্তেই গোলাবর্ষণ বন্ধ করিয়া তাহার অভিপ্রায় অবগত হইবার জন্য কুতুহলীভাবে অবস্থান করিতে লাগিল। সেই গুরখাসৈন্য ইংরাজসৈন্যশ্রেণীতে উপস্থিত হইলে দেখা গেল, ইংরাজনিক্ষিপ্ত গুলিতে তাহার নীচের দন্তপাটী ভাঙ্গিয়া কোথায় অন্তর্হিত হইয়াছে, এবং ওষ্ঠদ্বয়েরও অভাব হইয়াছে। মৃত্যুভয়ে তাহার কাতরতা ছিল না, কিন্তু অকর্ম্মণ্যভাবে অবশিষ্ট জীবন অতিবাহিত করা মৃত্যু অপেক্ষা সহস্র গুণে অধিক কষ্টকর মনে করিয়া, সে চিকিৎসার জন্য ইংরাজ ডাক্তারের নিকট আসিয়াছিল। ইংরেজ সেনানায়ক তরবারির এক আঘাতে সেই দন্তহীন যন্ত্রণাটাকে ইহলোকের পরপ্রান্তে প্রেরণ না করিয়া চিকিৎসালয়ে প্রেরণ করিলেন, এবং তাহার সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন। কিছুদিন চিকিৎসার পর সে আরোগ্যলাভ করিল। তখন তাহাকে ইংরাজসেনাদলে কাজ করিবার জন্য অনুরোধ করা হইল; কারণ ইংরাজ সেনাপতির বিশ্বাস হইয়াছিল, এত দিন সেবা শুশ্রূষায় তাহার বীরহৃদয় যে পরিমাণে অধিকার করা হইয়াছে, তাহাতে সেই বিশ্বাস গুরখা সৈনিকপুরুষ ইংরাজের একজন অনুরক্ত ও বিশ্বস্ত অনুচর হইবে। কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয়, সে বিনয়ের সহিত এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিল এবং পুনর্ব্বার ইংরাজের সহিত যুদ্ধ করিবার জন্য স্বীয় সৈনাদলে যাইবার অনুমতি প্রার্থনা করিল। যদিও সেই অসভ্য পরিস্ফুট ভাবেকোনও কথা বলে নাই, তথাপি সে সংক্ষেপে এমন একটি ভাব প্রকাশ করিয়াছিল যে, যতদিন জান বাঁচিবে, ততদিন সে স্বদেশ ও স্বজাতির জন্যই তাহার বন্দুক ও খুকরী ধরিবে, এবং স্বদেশের জন্য সম্মুখযুদ্ধে বীরের ন্যায় পতন ভিন্ন তাহার অন্য উচ্চাশা নাই। তাহার পুণ্যকথা শুনিয়া এই গানটা আমার মনে জাগিয়া উঠিয়াছিল:—
“তোমারই তরে মা সঁপিনু বীণা,
তোমারই তরে না সঁপিনু প্রাণ
তোমারই তরে এ আঁখি বরষিবে,
তোমারই তরে মা গাহিব গান।”