প্রবাস-চিত্র/গুরুদ্বার
গুরুদ্বার।
আজ একটি ঐতিহাসিক কাহিনীর উল্লেখ করিব। আমাদের দেশে ইতিহাসপাঠের দুর্দ্দশা অসাধারণ। অনেকে বলেন, উপযুক্ত ইতিহাসের অভাবই ইহার কারণ; কিন্তু অনেকে এরূপ মতও ব্যক্ত করিয়া থাকেন যে, ইতিহাসপাঠে লোকের তেমন স্পৃহা নাই, তাই এদেশে উৎকৃষ্ট ইতিহাসের অভাব। কোন্ কথাটি সত্য, তাহা সমালোচকগণ আলোচনা দ্বারা অবধারণ করিয়া ভারতের ভবিষ্যৎবংশীয়দিগকে এক একটা “হেরোডোটস্” করিয়া তুলিবার পথ পরিষ্কার করুন। “টেক্স্টবুক কমিটী”র মনোনীত পুস্তকের নির্দ্দিষ্ট পৃষ্ঠার মধ্যে যতটুকু তত্ত্ব সংগ্রহ করিতে পারা যায়, বর্ত্তমানে আমরা শিক্ষক ও নোটের সাহায্যে ততটুকুমাত্র অতি কটু পদার্থের ন্যায় গলাধঃকরণ করি। কিন্তু বলা বাহুল্য, ইহাতে ফলও সেইরূপ হইয়া থাকে; অর্থাৎ “পাশ” বা “ফেলের” সঙ্গে সঙ্গেই সেই সকল বরণীয় কীর্ত্তির স্মৃতি আমাদের হৃদয় হইতে মুছিয়া যায়। ইহার পর কোনও কথা প্রসঙ্গে কোনও ঐতিহাসিক তত্ত্বের কথা উঠিলে, বা কোনও বীরশ্রেষ্ঠের চরিত্রসম্বন্ধে কিছু আলোচনা উত্থাপিত হইলে, আমরা তামাক টানিতে টানিতে “হাঁ, হাঁ, এমনিতর কি যেন একটা ব্যাপারের কথা ছেলেবেলার পড়া গিয়াছিল” বলিয়া, মুরুব্বিয়ানার পরিচয় দিই; যেন সে কথাগুলি বাল্যকালেই ভাল সাজিত, এখন আর তাহা লইয়া আলোচনা করা ভাল দেখার না; বরং তাহা অপেক্ষা তামাক টানিতে টানিতে বন্ধুবান্ধবগণের সঙ্গে দুদণ্ড রসালাপ করা উত্তম বলিয়া বোধ হয়। সকলের না হউক, আমাদের অধিকাংশ শিক্ষিতের এইরূপ গতি!
বিদেশের, রোম গ্রীসের ইতিহাস দূরে থাকুক, আমাদের গৃহপ্রান্তে, আমাদের নয়নসমক্ষে অবস্থিত যে একটা মহাপরাক্রান্ত জাতির অতুলকীর্ত্তির দুই একটি সামান্য কথা মাত্র “টেক্সটবুকে’র সাহায্যে আমরা অবগত হই, সেই অমিতবলশালী, প্রচণ্ডতেজা শিখজাতির ইতিহাসের সহিত আমরা কতটুকু পরিচিত? ইংরাজীতে “কে” সাহেব যাহা লিখিয়াছেন, নানা কারণে তাহা নির্দ্দোষ নহে; হুইলারের গ্রন্থ পাঠ করিয়া যাঁহারা ঐতিহাসিক, তাঁহাদের বিড়ম্বনা ততোধিক। বাল্যকালে বিদ্যালয়পাঠ্য ক্ষুদ্র ইতিহাসে যাহা লিখিত দেখিতাম, তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকিতাম। অবশেষে পণ্ডিতবর শ্রীযুক্ত রজনীকান্ত গুপ্ত প্রণীত “সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস” ও ‘শিখ’ নামক সুন্দর প্রবন্ধে শিখজাতির বীরত্ব ও মহত্ত্বের অনেক বিবরণ পাঠকসাধারণের গোচর হইয়াছে। রামনগর ও চিলিয়ানওয়ালার গৌরবময় সংগ্রামক্ষেত্রে যে ভীষণ সমরানল প্রজ্বলিত হইয়া তাহার উজ্জ্বল আলোকে সমগ্র ভারত আভাময় করিয়া তুলিয়াছিল, অপক্ষপাত লেখকের লেখনীমুখে তাহার বর্ণনা পাঠ করিয়া, আমাদের এই দুর্ব্বল অসাড় হৃদয়ে মৃদু কম্পন উপস্থিত হয় বটে, কিন্তু প্রতীচ্য ভূখণ্ডের স্বাধীনতার গৌরব স্বরূপ “মারাথান” ও “থর্ম্মপালী” স্বাধীন য়ুরোপীর জাতিগণের হৃদয়ে যে বরণীয় আসন লাভ করিয়াছে, স্বাধীনতার যেরূপ মহাতীর্থরূপে পরিগণিত রহিয়াছে, আমাদের দেশের মারাখান ও থর্ম্মপালী, আমাদের সুপবিত্র পুণ্যতীর্থ হলদীঘাট, রামনগর ও চিলিয়ানওয়ালাকে আমরা এখনও সেরূপভাবে গ্রহণ করিতে পারি নাই।
আমি ইতিহাসের পাঠক নহি; যতক্ষণ ইতিহাস পড়িব, ততক্ষণ ঘুরিয়া বেড়াইলে আমার লাভ আছে; কিন্তু আমি যেখানে থাকিতাম, পাঠ না করিলেও সেখানে অনেক ঐতিহাসিক ব্যাপার নয়নগোচর হইত; এবং সেই সকল ব্যাপার একত্র লিপিবদ্ধ করিলে, একখানি সুবৃহৎ সুন্দর ইতিহাস প্রস্তুত হইতে পারে। প্রতিদিন যে সকল কীর্ত্তিচিহ্ন আমার নয়নপথে পতিত হইত, আমি তাহা উপেক্ষা করিতে পারিতাম না; “ওটা কি একটা ছিল” এই টুকু মাত্র বলিয়াই অনেকের কৌতুহলবৃত্তির পরিতৃপ্তি হইতে দেখিয়াছি; কিন্তু এই বীরভূমির লুপ্তগৌরবের নীরব শ্মশানে দাঁড়াইয়া আর শুধু “ওটা কি একটা ছিল” বলিয়া নিবৃত্তি হওয়া যায় না, ঘুরিয়া ঘুরিয়া তন্নতন্ন করিয়া সমস্ত দেখিতে ইচ্ছা হয়; এবং সমস্ত দেখা শেষ হইলে একটা উচ্চ দীর্ঘশ্বাস ধীরে ধীরে হৃদয়ের নিভৃত প্রদেশ হইতে বহির্গত হইয়া শূন্যে মিশাইরা যায়, চক্ষুপ্রান্ত আর্দ্র হইয়া আসে। পঞ্চনদের প্রাচীন গৌরব অধিক নাই; এই বিস্তীর্ণ প্রদেশের উপর যে যুগব্যাপী অন্ধকারপূর্ণ রাত্রি আধিপত্য করিতেছিল, মধ্যযুগের শেষ প্রান্তে তাহার অবসান হয়, এবং ধর্ম্মবীর নানক তাহার শুকতারা। দেখিতে দেখিতে যেন ঐন্দ্রজালিকের মন্ত্রবলে চতুর্দ্দিক আলোকপূর্ণ হইয়া উঠিল, এবং পঞ্চনদবাসিগণ দীর্ঘনিদ্রার পর জাগ্রত হইয়া কঠোর কর্ম্মক্ষেত্রে প্রবেশ করিল। সে আজ কয় দিনের কথা। কিন্তু অতি অল্প কালের মধ্যেই সে সূর্য্য অস্তমিত হইল; শুধু একটা সুখের স্মৃতি, এবং অতীত গৌরবের চিহ্ন চতুর্দ্দিকে পড়িয়া রহিয়াছে; তাহা দেখিলে হৃদয় ব্যথিত হয়।
কিন্তু আমি যে ক্ষুদ্র কাহিনী বলিতে যাইতেছি, ইতিহাসের বিষয় হইলেও, প্রচলিত ছাপার বহিতে সে সম্বন্ধে অধিক কথা দেখা যায় না। মনে হয়, একখানিমাত্র পুস্তকে এ সম্বন্ধে সামান্য উল্লেখ দেখিয়াছিলাম; সুতরাং বিষয়টী অধিকাংশ পাঠকের নিকট কিঞ্চিৎ চিন্তাকর্ষক হইবে, এরূপ আশা বোধ করি দুরাশা নহে।
দেরাদুন সহরে ভ্রমণ করিতে বাহির হইলেই বাজারের নিকট একটা সুবৃহৎ মন্দির সর্ব্বপ্রথমে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একটা মন্দির বলিলে ঠিক পরিচয় দেওয়া হয় না, এবং হঠাৎ দেখিলে ইহাকে মন্দির বলিয়া মনে না হইয়া মুসলমান বাদসাহদিগের সমাধিমঞ্চ বলিয়া বোধ হয়। মনোহরকারুকার্য্যময় উচ্চপ্রাচীর পরিবেষ্টিত একটি স্থান; প্রাচীরের চারি কোণে চারিটি উচ্চ মনুমেণ্টের মত মিনার, এবং পশ্চিমদিকে একটি প্রকাণ্ড সিংহদ্বার,—তাহাতে লৌহ কবাট শোভা পাইতেছে; যেন কত দিনের পুঞ্জীকৃত রহস্য এই কপাটের অন্তরালে গুপ্ত রহিয়াছে। এই মন্দিরের অপর তিন দিকে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রায়তন আরও তিনটি দ্বার রহিয়াছে; সেগুলি এই লৌহদ্বারের ন্যায় ‘সদর দরজা’ নহে।
লৌহনির্ম্মিত সিংহদ্বার অতিক্রম করিয়া একটা প্রশস্ত প্রাঙ্গনে উপস্থিত হইতে পারা যায়; এই প্রাঙ্গণটি প্রস্তরমণ্ডিত এবং অত্যন্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন; মানবের মলিন পদস্পর্শে সেই পরিচ্ছন্নতার ঈষৎ হানি হইতে পারে, এমন সম্ভাবনাও বোধ করি ক্ষণকালের জন্য ইহার নির্ম্মাণকারীর মনে স্থান পায় নাই। প্রাঙ্গণের ঠিক মধ্যস্থলে একটি প্রকাণ্ড মন্দির; মন্দিরের উপর উঠিতে হইলে সিঁড়ি বহিয়া উঠিতে হয়, এবং এই জন্য মন্দিরের চারি দিকে সিঁড়ি চিত্রে ভূষিত; ইহার অভ্যন্তরে কোনও দেবদেবী প্রতিষ্ঠিত নাই; মুসলমানেরা উপাসনা করিবার জন্য যেরূপ মসজিদ প্রস্তুত করেন, ইহাও অনেকটা সেই প্রকার। এই মন্দির শিখগুরু রামরায়ের সমাধিমন্দির, আর এই প্রাঙ্গণের চতুষ্কোণে যে চারিটি মনুমেণ্টের ন্যায় মঞ্চ আছে, তাহা রামরায়ের চারি স্ত্রীর সমাধিস্থান। এই মন্দিরের নাম অনুসারে স্থানের নাম হইয়াছে,—“গুরুদ্বার” বা “গুরুদেরা”। মন্দিরসম্বন্ধে অন্যান্য কথা বলিবার পূর্ব্বে রামরায় সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না।
যাঁহারা ভারতবর্ষের ক্ষুদ্র একখানি ইতিহাস পাঠ করিয়াছেন, তাঁহারাও অবগত আছেন, কি জন্য ধর্ম্মবীর, সাধুশ্রেষ্ট মহাত্মা নানকের মন্ত্রশিষ্যেরা কর্ম্মবীর, মহাপরাক্রান্ত দুর্জ্জেয় যোদ্ধৃজাতিতে পরিণত হইয়াছিল, এবং একটা সংসারবিরাগী, ধর্ম্মপরায়ণ, নির্ব্বিরোধ সম্প্রদায় কি রূপে কয়েক জন অবিমৃষ্যকারী মুসলমান সম্রাটের অমানুষ অত্যাচার ও পাশবিক কঠোরতায় উৎপীড়িত হইয়া সাম্প্রদায়িক ঔদাসীন্য পরিত্যাগ পূর্ব্বক, এক সুবিখ্যাত রাজনৈতিক জাতিতে অভ্যুত্থান লাভ করিল। শিখজাতির ক্রমপরিবর্ত্তনের সেই ধারাবাহিক বিবরণ ইতিহাসে আলোচিত হইয়াছে; আমরা এখানে কেবল শিখসম্প্রদায়ের আদিগুরু নানকের তেজস্বী বংশতরুর একটী শাখার ইতিহাস বর্ণন করিব।
রামরায় শিখগুরু, ইনি গুরু হরগোবিন্দ সিংহের প্রপৌত্র। যে সময়ে ভারতের অতুল ঐশ্বর্য্য এবং প্রভূত ক্ষমতার পীঠস্থান দিল্লীর রত্নসিংহাসন লইয়া, দারা, সুজা, আরঞ্জেব ও মুরাদ, পবিত্র ভ্রাতৃত্ববন্ধনের মস্তকে পদাঘাত পূর্ব্বক পিশাচের ন্যায় পরস্পরের বক্ষে তীক্ষ্ণ ছুরিকা প্রবেশ করাইবার অবসর অন্বেষণ করিতেছিল, এবং রোগক্লিষ্ট অক্ষম বৃদ্ধ সম্রাট অন্ধকারময় কারাগারের বিষাদময় কক্ষে উপবেশন পূর্ব্বক অনুতপ্তহৃদয়ে প্রতিদিন মৃত্যুকামনা করিতেছিলেন, সেই অরাজক সময়ে যিনি শিখসম্প্রদায়ের নেতা ছিলেন, তাঁহার নাম গুরু হররায়; ইনিই রামরায়ের পিতা। গুরু হররায়, বাদশাহ-পুত্রগণের ভ্রাতৃবিরোধে যোগদান করেন, এবং সাজাহানের জ্যেষ্ঠ পুত্র “দারাশেকো”র সহায় হন। যাহা হউক, এই ভ্রাতৃবিরোধের যে পরিণাম হইয়াছিল, তাহা সকলেই অবগত আছেন; আরঞ্জেব ধুর্ত্ততাপ্রভাবে সিংহাসন লাভ করিয়া বিদ্রোহাপরাধে গুরু হররায়কে সপরিবারে দিল্লীতে আবদ্ধ রাখেন। গুরু হররায় কারারুদ্ধ হন নাই বটে, কিন্তু সম্রাটের অনুমতি ব্যতীত দিল্লী ত্যাগ করা তাঁহার পক্ষে নিষিদ্ধ ছিল। এই সময় গুরু রামরায়ের জন্ম হয়, এবং এই দিল্লী নগরেই ১৬৬১ খৃষ্টাব্দে পঞ্চদশ বৎসর বয়সে তিনি পিতৃহীন হন। সিংহশাবক পিঞ্জর মধ্যে আজন্ম প্রতিপালিত; যে স্বাধীনতার উষ্ণ শোণিতস্রোত তাঁহার গৌরবান্বিত পিতৃপুরুষদিগের ধমনীতে প্রবাহিত ছিল, গুরু রামরায় জীবনে এক দিনের জন্যও সে স্বাধীনতার মাধুর্য্য আস্বাদনের অবসর পান নাই; দিল্লী তখন প্রাচ্য ভূখণ্ডে বিলাসিতার সর্ব্বশ্রেষ্ঠ মহাসমৃদ্ধিশালিনী নগরশ্রেণীর মধ্যে রাজেন্দ্রাণীর ন্যায় বিরাজিত ছিল, মোগলসাম্রাজ্য তখন উন্নতির সর্ব্বোচ্চ শিখরে সমারূঢ়, এবং তাহার বিশাল বীর্য্য, অখণ্ড প্রতাপ, অসীম অর্থগৌরব, এবং অনিয়ন্ত্রিত আনন্দোৎসব ও উচ্ছসিত হর্ষকোলাহল, সেই জনাকীর্ণ বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য্যবহুল রাজধানী পরিপূর্ণ করিয়া রাখিয়াছিল। এই উৎসবময় নাট্যশালায় উপবিষ্ট হইয়া বিস্মিত প্রায় দর্শকের ন্যায় গুরু রামরায় কিছুতেই বুঝিতে পারেন নাই, কর্ম্মস্রোত কি গভীর গর্জ্জনে তাঁহার পিতৃভূমি পঞ্চনদের পুণ্যপ্রদেশে প্রবাহিত হইতেছে। ইহার উপর কূটবুদ্ধি সম্রাট আরঞ্জেবের স্নেহ ও যত্ন তাঁহার পিতৃস্নেহের স্থান পূর্ণ করিল; তাঁহার আদর ও সম্ভ্রম বাদশাহপুত্ত্রগণ অপেক্ষা ন্যূন রহিল না, সুতরাং বালক দিল্লীশ্বরের সুবর্ণশৃঙ্খলে দৃঢ়রূপে আবদ্ধ হইলেন। কিন্তু এক দিন এ জন্য তাঁহাকে অনুতাপ করিতে হইয়াছিল; এক দিন তিনি এ শৃঙ্খল ছিন্ন করিয়া অভীষ্টপথে অগ্রসর হইয়াছিলেন, কিন্তু তখন আর সময় ছিল না। শিখজাতির হৃদয় হইতে, বিশ্বাস ও ভক্তি হইতে তখন তিনি সম্পূর্ণ নির্ব্বাসিত; তাই রাজপ্রাসাদের সুখ ও ঐশ্বর্য্য তাঁহাকে পরিতৃপ্ত রাখিতে পারে নাই। অবশেষে তিনি বিলাসের কাম্যকানন দিল্লী পরিত্যাগ করিয়া স্বদেশের একটী নির্জ্জন নেপথ্যে উপস্থিত হইয়া উদাসভাবে জীবনযাপন করাই বাঞ্ছনীয় মনে করিলেন।
আরঞ্জেব যতই কূটবুদ্ধি ও ধূর্ত্ত হউন, তথাপি তিনি মানব; মানবসুলভ ভ্রমজাল হইতে মুক্ত থাকা তাঁহার সাধ্যায়ত্ত নয়। যে অভিপ্রায়ে তিনি রামরায়ের প্রতি পুত্ত্রাধিক স্নেহ প্রদর্শন করিতেন, যাঁহারা সেই সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাস অবগত আছেন, তাঁহাদের নিকট ক্রূরচেতা আরঞ্জেবের সেই অভিপ্রায় সুস্পষ্ট প্রকাশিত। স্নেহের অনুরোধে স্নেহ করা, কর্ত্তব্যের অনুরোধে যত্ন বা আদর করা, আরঞ্জেবের স্বভাবে বা কার্য্যে কখনও দেখা যাইত না, স্নেহ, মমতা, দয়া, সহানুভূতি প্রভৃতি হৃদয়ের কোমল উৎকষ্ট বৃত্তিগুলি তাঁহার শঠতাময় অভিপ্রায়সিদ্ধির প্রধান সহায় ছিল; সুবিধা বুঝিয়া তিনি অপরকে যত্ন করিতেন, উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য তিনি পরের দুঃখে অশ্রুবর্ষণ করিতেন। তাহার পর কার্য্য সফল হইলে, সেই হতভাগ্যদিগকে কীটের ন্যায় পদতলে দলিত করিতে বিন্দু মাত্রও দ্বিধা বোধ করিতেন না।
আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি, সে সময়ে দিল্লীর বাহ্যদৃশ্য যতই উজ্জ্বল ও উৎসবপূর্ণ থাক, এবং দিল্লীর পুষ্পসমাচ্ছন্না রত্নরাজিপরিশোভিত রাজপ্রাসাদে ঐ অপ্সরোসদৃশী সুন্দরীবৃন্দের মধুর কণ্ঠের সঙ্গীতোচ্ছাসে যতই হর্ষ ক্ষরিত হউক, সম্রাট আরঞ্জেবের হৃদয় চিন্তা কিম্বা ভয়শূন্য ছিল। না। দক্ষিণে মহারাষ্ট্র, রাজস্থানে রাজপুত জাতি যে অগ্নি প্রজ্বলিত করিয়াছিল, তাহা ক্রমে বিস্তৃততর হইয়া বিপুল মোগল সম্রাজ্য স্পর্শ করিয়াছিল; তাহার উপর যদি পঞ্চনদের এই যুদ্ধকুশল পরাক্রান্ত বীরজাতি মোগলসাম্রাজ্যের ধ্বংসসাধনে যত্নবান হয়, তাহা হইলে পতন অনিবার্য্য, এই মনে করিয়াই ক্রূরচেতা সম্রাট আরঞ্জের রামরায়ের প্রতি সদয় ব্যবহার করিয়াছিলেন।
কিন্তু তাঁহার উদ্দেশ্য বৃথা হইয়াছিল। শিখেরা রামরায়কে গুরুপদের সম্পূর্ণ অযোগ্য মনে করিলেন; শিখ সম্প্রদায় এখন মুসলমান সম্রাটের শত্রু, সুতরাং গুরুপুত্র হইলেও আরঞ্জেবের বন্ধুকে তাঁহারা শুরু বলিয়া গ্রহণ করিলেন। সত্য বটে, এক দিন তাঁহারা ধর্ম্মপ্রাণ, বিনীত সাধুসম্প্রদায় ছিলেন, কিন্তু এখন তাঁহারা কর্ম্মপ্রাণ, মহাযোদ্ধা, অমিততেজা বীরজাতি; শান্তস্বভাব ধার্ম্মিক রামরায়কে অগ্রাহ্য করিয়া, তাঁহার অন্যতম ভ্রাতা হরিকিষণকে গুরুপদে বরণ করিলেন। এই শিশু ১৩৬৪ খৃষ্টাব্দে প্রাণত্যাগ করায়, রামরায় শিখসম্প্রদায়ের গুরুপদলাভ করিবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিলেন, কিন্তু তাঁহার শিখসমাজে প্রবেশদ্বার চিরকালের জন্য অবরুদ্ধ হইয়াছিল। হরিকিষণের মৃত্যুর পর শিখেরা একমত হইয়া গুরু হরগোবিন্দের পুত্র, মহাতেজস্বী, স্বনামপ্রসিদ্ধ মহাবীর তেগবাহাদুরকে গুরুর পদে প্রতিষ্ঠিত করিলেন। তেগবাহাদুর সম্বন্ধে ইহা বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, এই শিখগুরুর খ্যাতি শিখ পরাক্রমের প্রতিষ্ঠাতা গুরুগোবিন্দ সিংহ ভিন্ন সকলের অপেক্ষাই অধিক। ১৬৭৫ খৃষ্টাব্দে মুসলমানের তীক্ষ্ণ তরবারীতে তেগবাহাদুরের ছিন্ন শির ধূলিলুণ্ঠিত হয়। কিন্তু সেই শোণিতস্রোত বৃথা প্রবাহিত হয় নাই; তাহা শিখ জাতির দুর্দ্দমনীয় প্রতিহিংসা-অনলে আহুতি স্বরূপ হইল। অবশেষে তেগবাহাদুরের উপযুক্ত পুত্র গোবিন্দ সিংহ শিখ জাতির হৃদয়ে যে অভিনব শক্তি সঞ্চারিত করিলেন, তাহা মোগল সাম্রাজ্য বিধ্বস্ত করিয়া ফেলিল।
তেগবাহাদুরের প্রাণদণ্ডের পর গুরু রামরায় আর একবার গুরুপদপ্রাপ্তির চেষ্টা করিয়াছিলেন, ইহা তাঁহার তৃতীয় উদ্যম। ক্রমাগত তিন বার চেষ্টা করিয়া অকৃতকার্য্য হওয়াতে তিনি হতাশ হইয়া পড়িলেন, শিখেরা এবারও পূর্ব্ববারের ন্যায় তাঁহাকে অগ্রাহ্য করিয়া গোবিন্দ সিংহকে গুরুপদে প্রতিষ্ঠিত করিলেন। গোবিন্দ সিংহের ন্যায় কয় জন লোক এ পর্য্যন্ত ভারতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন? পৌরাণিক ভারতের কথা ছাড়িয়া দেওয়া যাউক, আধুনিক ভারতের চারি জন মহাপুরুষকে স্বদেশহিতৈষী বীরের শ্রেষ্ঠ আসন দেওয়া যাইতে পারে; এই চারি জন—প্রতাপসিংহ, শিবাজী, গুরুগোবিন্দ এবং রণজিৎ সিংহ।
গোবিন্দ সিংহ শিখ গুরুর পদে অধিষ্ঠিত হইলে রামরায়ের সমস্ত আশা বিদুরিত হইল; তিনি বুঝিলেন, এই নবদীক্ষিত যুদ্ধনিরত জাতির গুরুগিরি করা তাঁহার ন্যায় শান্ত প্রকৃতি উদাসীনের কর্ম্ম নহে। তিনি স্বদেশ হইতে বিদায় গ্রহণ করিলেন, এবং গুরু নানকের নামে ধর্ম্মসম্প্রদায়ের অধিনায়কত্ব করিবার ব্রত গ্রহণ করিলেন। লোকালয়ের বিচিত্র কোলাহলের মধ্যে দীর্ঘকাল বাস করিয়া তিনি বিরক্ত হইয়াছিলেন; তাই নির্জ্জনবাসে জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলি শান্তিসুখে অতিবাহিত করিবার অভিপ্রায়ে, দিল্লীশ্বরের নিকট হইতে গাড়োয়াল রাজ্যের রাজার নামে একখানি অনুরোধপত্র লইয়া, ১৬৯৯ খৃষ্টাব্দে সেই পার্ব্বত্য প্রদেশে উপস্থিত হইলেন। গাড়োয়ালরাজ তাঁহাকে সশিষ্যে দেরাদুনে বাস করিবার অনুমতি প্রদান করিলেন। তদনুসারে তিনি প্রথমে টনস্ নদীর তীরে ‘কাণ্ডলী’ নামক একটি নির্জ্জন স্থানে কিছু দিন বাস করেন। এই স্থানে অনেক দিন পর্য্যন্ত একটী কাঁঠাল গাছ ছিল, (এখন আর নাই, অতি অল্প দিন হইল, বিনষ্ট হইয়াছে।) জনরব, তিনি স্বহস্তে এই বৃক্ষ রোপণ করিয়াছিলেন। অধিক দিন এখানে বাস করা তাঁহার অনভিপ্রেত হওয়ায়, ‘ধামুওয়ালা’তে তিনি এই বর্ত্তমান মন্দির নির্ম্মাণ করেন; ‘ধামুওয়ালা’ এখন দেরাদুন নগরের মধ্যে পড়িয়াছে।
এই স্থানে মন্দির স্থাপিত হইলে, নানাদিগ্দেশ হইতে দলে দলে সাধু সন্ন্যাসী আসিয়া তাঁহার শিষ্য হইতে লাগিল। শোকতাপে জর্জ্জরিত, ব্যথিত হৃদয় নরনারীগণ তাঁহার পবিত্র উপদেশে হৃদয় সংযত করিবার জন্য তাঁহার চরণোপান্তে উপনীত হইল, এবং ধীরে ধীরে দেরাদুন সহর সংস্থাপিত হইল। প্রথমে ইহার নাম ছিল ‘গুরুদ্বার’ বা ‘গুরুদেরা,’ ক্রমে ক্রমে ‘গুরু’ লোপ পাইয়া, ইহা ‘দেরা’ নামেই প্রসিদ্ধ হইল, ও ‘দুন’ প্রদেশে অবস্থানের জন্য ‘দেরাদুন’ এই পূর্ণ নাম গ্রহণ করিল। কিন্তু ‘দেরাদুন’ নাম এইরূপে উৎপন্ন হইলেও, ইহার উৎপত্তিসম্বন্ধে একটা পৌরাণিক কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। সাধারণ লোকে এই স্থানকে ‘দ্রোণকা ডেরা’ অর্থাৎ কুরুপাণ্ডবের আচার্য্য দ্রোণের ‘দেরা’ বা বাসস্থান বলিয়া নির্দ্দেশ করে; এবং তাহাদের মতে এই জন্যই এ প্রদেশের নাম ‘দুন’ হইয়াছে। এই উভয় মতের মধ্যে কোন্ মতটি যথার্থ, ঠিক বলা কঠিন, তবে যাঁহারা মহাভারতোক্ত ঘটনাকে একটা রূপক জ্ঞান করিয়া কুরুপাণ্ডবের অস্ত্রশিক্ষক সেই বৃদ্ধ গুরুটিকে উড়াইয়া দিতে চাহেন, বলা বাহুল্য, তাঁহাদের নিকট প্রথমোক্ত মতই আদরণীয় ও বিশ্বাসযোগ্য।
দেরাদূনে প্রতিষ্ঠা লাভ করিবার পর, রামরায় আর কখনও শিখ সম্প্রদায়ের গুরুপদলাভের চেষ্টা করেন নাই। তাঁহার শিষ্যশ্রেণী ‘উদাসী সাধু’ নামে প্রসিদ্ধ। গুরু নানকের নামে তিনি যে সাধুসম্প্রদায়ের সৃষ্টি করিলেন, পঞ্জাবে তাহাদের সংখ্যা নিতান্ত অল্প নহে, এবং তাহাদের মধ্যে অনেক সম্মানিত লোকও দেখা যায়।
গাড়োয়ালের রাজা ফতে শা এই মন্দিরের ব্যয়নির্ব্বাহার্থ সেই সময় চারিখানি গ্রাম দান করেন। প্রথমে এই গ্রাম কয়েকগ্গানি হইতে যে আয় হইত, তাহা অধিক ছিল না; কিন্তু এখন তাহার যথেষ্ট আয় হইয়াছে। গুরুদ্বারের মোহন্তই এখন দেরাদুনের মধ্যে সর্ব্বপ্রধান ধনী ও পদস্থ ব্যক্তি। অনেক দিন পূর্ব্বে ইংরাজ গবর্মেণ্ট ইঁহাদিগকে সাতখানি গ্রাম নিষ্কর দান করিয়াছেন। এতদ্ভিন্ন তিহরীর রাজার নিকটও তাঁহারা ছয়খানি গ্রাম লাভ করিয়াছেন।
অনেক দিন হইল, এই মন্দির নির্ম্মিত হইয়াছে; কিন্তু এখনও তাহার সৌন্দর্য্য অক্ষুণ্ণ রহিয়াছে; এবং তাহার কোনও প্রকার অবস্থান্তর ঘটে নাই। আর যদি কখনও ইহার জীর্ণসংস্কারের প্রয়োজন হয়, তবে পুরুষোত্তমে জগন্নাথ দেবের মন্দিরসংস্কারের জন্য যেরূপ ভিক্ষাপাত্র হস্তে লইতে হইয়াছে, সেরূপ ভিক্ষাবৃত্তির আবশ্যক হইবে না। গুরুদ্বারের অর্থগৌরব এবং সম্পত্তির ইয়ত্তা নাই; তবুও ইহা পরিমিত সংখ্যক শিখ ও উদাসী সন্ন্যাসিগণের পুণ্যতীর্থ মাত্র। আর আমাদের পুরুষোত্তম আট কোটী বঙ্গবাসীর এক মহাতীর্থ; শুধু বঙ্গবাসী কেন, উৎকল, বিহার, উত্তর-পশ্চিম, ভারতের সকল প্রদেশ হইতেই অগণ্য ভক্ত, অসংখ্য পাপী তাপী প্রতি বৎসর জনস্রোতের ন্যায়, শত শত ক্রোশ বিস্তৃত দুরতিক্রমণীয় পথ অক্লান্তভাবে অতিক্রম করিয়া, বঙ্গসাগরোপকূলবর্ত্তী এই মহাতীর্থে সমাগত হইয়া, জগন্নাথের প্রসন্নবদন নিরীক্ষণ পূর্ব্বক জীবন পবিত্র করিয়া লয়! বিধাতার বিড়ম্বনা! আজ সভাস্থলে ক্ষীণকণ্ঠে সেই জগন্নাথদেবের প্রাচীন মন্দিরের গৌরবকাহিনী ঘোষণাপূর্ব্বক মন্দির সংস্কারের জন্য অর্থসংগ্রহের চেষ্টা হইতেছে!
গুরুদ্বারের মন্দিরের সম্মুখেই একটি প্রকাণ্ড পুষ্করিণী বর্ত্তমান। এদেশে পুষ্করিণী খনন করা বিলক্ষণ কষ্টকর ও অর্থসাধ্য ব্যাপার; এই জন্য এখানে প্রায়ই পুষ্করিণী দেখা যায় না। এই পুষ্করিণীর জল অভ্যন্তরস্থ প্রস্রবণ হইতে সমুদ্ভূত নহে, রাজপুর খাল হইতে এই জল আনয়ন করা হয়। এই পুষ্করিণীতে নানাবিধ মৎস্য আছে।
প্রতি বৎসর ১লা চৈত্র এখানে একটি মেলা হয়, তাহার নাম “ঝাণ্ডার মেলা”। “ঝাণ্ডা” কথাটির অর্থ আগে একটু পরিষ্কার করিয়া বলা আবশ্যক। সন্ন্যাসীদিগের হস্তে একগাছি করিয়া লাঠি থাকে; কোনও স্থানে বাস করিতে হইলে তাহারা প্রথমে সেইখানে লাঠি প্রোথিত করে, এবং তাহার অগ্রভাগে নিশানের মত এক খণ্ড লালকাপড় বাঁধিয়া দেয় তাহার পর সেখানে আসন পাতে। আমাদের দেশেও কোনও কোনও সম্প্রদায়ের ফকিরের মধ্যে এই প্রথা দেখিতে পাওয়া যায়। গুরু রামরায়ও চৈত্র মাসের প্রথম দিনে এখানে আসিয়া অড্ডা করেন ও ঝাণ্ডাস্থাপন করেন। সেই উপলক্ষে এখনও প্রতি বৎসর মেলা বসিয়া থাকে। এখন পঞ্জাব হইতে দলে দলে শিখেরা আসিয়া এই “ঝাণ্ডার মেলা” দেখিয়া ও গুরু রামরায়ের “ঝাণ্ডা” নামাইয়া উঠাইয়া পুণ্য সঞ্চয় করে। রামরায়ের সেই ‘ঝাণ্ডা’ এখন আর ক্ষুদ্র লাঠি নাই, বৃহৎ জাহাজের মাস্তুলের মত একটি প্রকাশু কাঠখণ্ডে পরিণত হইয়াছে; তাহার সর্ব্বশরীর লাল বস্ত্রখণ্ডে মণ্ডিত, শিরোদেশে সমুজ্জল লোহিত নিশান। পূর্ব্বের ন্যায় এখন আর ইহা মৃত্তিকায় প্রোথিত করিবার সুবিধা নাই; সিংহদ্বারের সম্মুখে পুষ্করিণীতীরে প্রায় ১৫।২০ হস্ত উচ্চ স্থান ইষ্টক ও প্রস্তর দ্বারা বাঁধান হইয়াছে; তাহারই ভিতর সেই প্রকাণ্ডকার ‘ঝাণ্ডা’ দণ্ডায়মান থাকে। প্রতি বৎসর তাহার এক পার্শ্বের ইষ্টকস্তূপ ভাঙ্গিয়া ‘ঝাণ্ডা’ নামান হয়, এবং যদি সেই কাষ্ঠদণ্ডের অবস্থা ভাল থাকে, তবে তাহার গাত্রেই নূতন লাল কাপড় জড়াইয়া নূতন নিশান খাটাইয়া ‘ঝাণ্ডা’ উঠান হয়, নতুবা কাষ্ঠদণ্ড বদলাইয়া দিতে হয়। ঝাণ্ডা তুলিবার সময়ের দৃশ্য অতি চমৎকার; আমাদের দেশে এমন উত্তেজনাপূর্ণ কোনও উৎসবই নাই, এবং অতি অল্পসংখ্যক উৎসব উপলক্ষেই বিদেশ হইতে এত জনসমাগম হইয়া থাকে।
১লা চৈত্রের রাত্রি প্রভাত হইতে না হইতে, সহস্র সহস্র নরনারী ঝাণ্ডাতলে সমবেত হইতে আরম্ভ করে; সকলের মুখ প্রফুল্ল, এবং সর্ব্বশরীর অবস্থানুরূপ বেশভূষায় সুসজ্জিত। ক্রমে ঝাণ্ডা তুলিবার সময় হইলে মন্দিরের মহান্ত সেখানে উপস্থিত হন। তাঁহাকে দেখিবামাত্র দর্শকগণ উৎসাহে “জয় গুরুজি কি জয়” শব্দে কর্ণ বধির ও আকাশ বিদীর্ণ করিয়া ঝাণ্ডা নামাইয়া ফেলে। তাহার অল্পক্ষণ পরে সেই সমস্ত লোক পুনর্ব্বার সেই ‘ঝাণ্ডা’ পূর্ব্বস্থানে সংস্থাপিত করে; অনন্তর প্রত্যেকে ‘ঝাণ্ডার’ গাত্রে ‘রাখি’ বাঁধিয়া দেয়। গুরুদ্বারের মহান্ত সেদিন অনাহারে, গলে উত্তরীয় বাঁধিয়া, নগ্নপদে, কৃতাঞ্জলিপুটে, ঝাণ্ডার নিকট দাঁড়াইয়া থাকেন। যে মহান্ত মঠপ্রান্তে পদার্পণ করিতেও অপমান বোধ করেন, যাঁহার মস্তকে ছত্রধারণের জন্য এবং পদতলে পাদুকা প্রদানের নিমিত্ত শত শত ব্যক্তি সদা সন্ত্রস্ত অবস্থায় অবস্থান করে, আজ তিনি সর্ব্বাপেক্ষা দীনবেশে, বিনীত ভাবে, গললগ্নীকৃতবাসে ঝাণ্ডার সম্মুখে দাঁড়াইলেন, আজ জনসাধারণের মধ্যে তিনি সাধারণ ব্যক্তির ন্যায় দণ্ডায়মান। দূরে দাঁড়াইয়া আমি এই দৃশ্য দেখিতেছিলাম। আমার মনে হইল, বিধাতার সিংহাসনের সম্মুখেও বুঝি এই নিয়ম; সমদর্শিতাই বুঝি সেখানকার অলঙ্কার, এবং সেই সুখস্বর্গে অহঙ্কার ও অবিনীত ভাব লইয়া মানবের প্রবেশ করিবার অধিকার নাই। সেই দিনের পবিত্র দৃশ্য চিরকাল আমার মনে থাকিবে।
এক বৎসর এমন হইয়াছিল যে, ‘ঝাণ্ডা’ আর কিছুতেই তুলিতে পারা যায় না; যাহারা ইহা তুলিবার জন্য প্রাণপণে টানাটানি করিতেছিল, তাহারা আমাদের মত দুর্ব্বল মহে, এক একটা অসুরের মত বলবান; সহস্র সহস্র লোক প্রাণ পণে চেষ্টা করিয়াও যখন ‘ঝাণ্ডা’ উঠাইতে পারিল না, তখন সেই উৎসবক্ষেত্রে সমাগত ভক্ত নরনারীর মধ্য হইতে একটা ঘোর ক্রন্দনের রোল উত্থিত হইল; এবং এক অদৃষ্টপূর্ব্ব অমঙ্গলের আশঙ্কায় সকলেই ভীত ও অবসন্ন হইয়া পড়িল। স্বয়ং মহান্তজী (বয়স ৩০।৩৫ বৎসর) আকুল হইয়া ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। তাঁহার চক্ষে অশ্রু দেখিয়া সকলে আরও অধিক ভীত হইয়া পড়িল; হাহাকারধ্বনিতে আকাশ বিদীর্ণ হইতে লাগিল; সকলের মুখেই বিষাদকালিমা পরিব্যাপ্ত। এক ঘণ্টা পূর্ব্বে যে উৎসবক্ষেত্র আনন্দ ও উৎসাহে পরিপূর্ণ ছিল, দেখিতে দেখিতে তাহা যেন তরঙ্গায়িত শোকসাগর বলিয়া প্রতীয়মান হইতে লাগিল। সকলেই সকলেই দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিতে লাগিল, “হো গুরুজী, হো গুরুজী!” অর্ণবযান সমুদ্রমধ্যে বিপথগামী হইলে, বা ঝঞ্ঝাবাতে জলমগ্ন হইবার উপক্রম ঘটিলে, যেমন বিপন্ন আরোহিগণ আকুলভাবে পোতচালকের মুখে একটি আশ্বাসবাণী শুনিবার জন্য অস্থির হইয়া উঠে, এবং বিপদ হইতে পরিত্রাণলাভের জন্য তাঁহার মিনতি করে, এই সমাগত দর্শক ও ভক্তগণের অবস্থাও সেইরূপ। কিন্তু কে তাহাদিগকে আশ্বাসবাণী দিবে? মহান্ত নিজে মুহ্যমান।
যাহা হউক, চেষ্টার ত্রুটি হইল না; ক্রমে বেলা তিনটা বাজিয়া গেল; কিন্তু এতগুলি লোক চেষ্টা করিয়াও কিছুতেই ‘ঝাণ্ডা’ উঠাইতে পারিল না। প্রকাও প্রকাণ্ড অতি শক্ত স্থূল কাছি ধরিয়া উন্মত্ত ভক্তগণ টানাটানি করে, আর সেগুলি জীর্ণসূত্রের মত ছিঁড়িয়া যায়। আর উপায় নাই; সকলের বিশ্বাস হইল, গুরুজীর অকৃপা হইয়াছে; নতুবা ‘ঝাণ্ডা’ এমন বিশ্বম্ভর মূর্ত্তি ধারণ করিবে কেন? অনেকে বলিতে লাগিল, হয় ত মহান্ত মহাশয়ের সেবার ত্রুটি হইয়াছে, তাই এ বিপদ। কেহ কেহ মহান্তের উপর ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল, কেহ কেহ বা মহান্তকে তৎক্ষণাৎ পদচ্যুত করিয়া নূতন মহান্ত নিযুক্ত করিবার অভিপ্রায়ও প্রকাশ করিল।
অবশেষে মহান্ত মহাশয় উন্মত্তের মত হইয়া সেই জনতার চতুর্দ্দিকে ছুটিয়া সকলকে উৎসাহিত করিতে লাগিলেন; রৌদ্রে তাঁহার সুগৌর মুখমণ্ডল লোহিতাভ হইয়া উঠিয়াছে, এবং তাহার উপর নিরাশা ও বিষাদের মলিনতা ব্যাপ্ত হইয়াছে। তাঁহার ভাব দেখিয়া অনেকেই সন্তপ্ত হইল, তাঁহার উৎসাহবাক্যে উৎসাহিত হইয়া সকলে আর একবার অগ্রসর হইল, শরীরের সমস্ত বল এবং প্রাণের সমস্ত ভক্তি নিয়োজিত করিয়া স্ত্রীপুরুষ, বালক বৃদ্ধ, আর একবার ‘ঝাণ্ডা’ উঠাইবার জন্য টানাটানি করিল। মুহূর্ত্তের মধ্যে ঝাণ্ডা উঠিয়া গেল। সহসা সেই বিষাদাচ্ছন্ন জনস্রোতের মধ্যে যে আনন্দ কল্লোল উত্থিত হইল, তাহা অনির্ব্বচনীয়; উৎসাহে সকলে “জয় গুরুজী কি জয়!” রবে আকাশ বিদীর্ণ করিল; এই মধুর দৃশ্য দেখিয়া দুর্ব্বল প্রাণ, উৎসাহহীন বাঙ্গালী যে আমি, আমার হৃদয়ও যেন এই বীরজাতির ন্যায় উদ্দীপনাপূর্ণ হইয়া উঠিল; আমিও তাহাদের সঙ্গে সমস্বরে “জয় গুরুজী কি জয়!” বলিয়া উঠিলাম।
এই দিনে মহান্তের বেশ দশ টাকা উপার্জ্জন হয়; সকলেই তাঁহাকে প্রণামী দেয়। গুরুদ্বারে নিত্য অতিথিসেবা আছে। ‘ঝাণ্ডা’ মেলার ১৫ দিন পূর্ব্ব হইতে অহোরাত্র মন্দির প্রাঙ্গণে গান হয়; দলে দলে গায়কেরা চারি দিকে গান করিতেছে, দিবারাত্রির মধ্যে বিরাম নাই, বিশ্রাম নাই, এক দল যাইতেছে, এক দল আসিতেছে; লোকে লোকারণ্য। মন্দিরের মধ্যে কেহ জুতা পায়ে দিয়া যাইতে পায় না, বাহিরে জুতা খুলিয়া রাখিয়া ভিতরে প্রবেশ করিতে হয়; আমাদের দেশের ন্যায় জুতা চুরী যাইবার কোনও আশঙ্কা নাই।
গুরুদ্বার এবং ঝাণ্ডার কথা কিছু কিছু বলা হইল। গুরু রামরায়ের মৃত্যু সম্বন্ধে দুই একটি কথা বলিয়া আমরা এই প্রবন্ধের উপসংহার করিব। এরূপ প্রবাদ আছে যে, রামরায় মধ্যে মধ্যে একটি ঘরে প্রবেশ করিয়া দুই তিন দিন ধরিয়া তাহার অভ্যন্তরেই বাস করিতেন; ভিতর হইতে অর্গল বদ্ধ করিয়া দিতেন, সুতরাং অন্য কেহই সে ঘরে যাইতে পারিতেন না। শুনিতে পাওয়া যায়, এই সময় তিনি যোগবলে নানাস্থানে ভ্রমণ করিতেন। একবার তিনি তাঁহার চারি স্ত্রীকে বলিলেন যে, তিনি সপ্তাহকাল গৃহমধ্যে থাকিবেন, এই সময়ের মধ্যে যেন কেহ তাঁহাকে না ডাকে। প্রথম চারি দিন এক ভাবেই অতিবাহিত হইল। কিন্তু গৃহমধ্যে কোনও সাড়া-শব্দ পাওয়া যায় না দেখিয়া, তাঁহার স্ত্রীগণ অত্যন্ত ভীত ও চিন্তিত হইলেন; পঞ্চম দিনে তাঁহার পতিপ্রাণা তৃতীয়া স্ত্রী আর থাকিতে পারিলেন না। ঘরের দ্বার ভাঙ্গিয়া ভিতরে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, গুরুজী যোগাসনে বসিয়া আছেন, চক্ষু নিমীলিত, মুখে প্রসন্ন ভাব বিরাজিত, কিন্তু স্পন্দহীন, দেহে প্রাণ নাই। চারি দিকে হাহাকার রব উঠিল; সকলেই বুঝিল, দেহে প্রাণ আর ফিরিয়া আসিবে না; তাঁহার ইহজীবনের কার্য শেষ হইয়াছে।
রামরায় যে আসনে বসিয়া যোগমগ্ন অবস্থায় দেহ ত্যাগ করেন, সেই আসন এই মন্দিরমধ্যে সযত্নে রক্ষিত হইয়াছে। গুরুজীর মৃত্যুর পর তাঁহার প্রধানা পত্নী মতো পঞ্জাব কুঙার সমস্ত বিষয় পর্য্যবেক্ষণের ভার গ্রহণ করেন; অবশেষে গুরুজীর শিষ্যশ্রেণীর মধ্যে সর্ব্বপ্রধান হরপ্রসাদ, মহান্ত পদ লাভ করেন। এই সময় হইতে নিয়ম হয় যে, মহান্তের মৃত্যু হইলে তাঁহার সর্ব্বপ্রধান শিষ্য মহান্ত হইবেন। বর্ত্তমান মহান্তের নাম প্রয়াগদাস; এই যুবক মঠধারী কোনও কোনও মহান্তের ন্যায় দুরাকাঙ্ক্ষ না হইলেও, বিলাসিতাশূন্য নহেন। যে দেবসম্মান ও ঐশ্বর্য্যের মধ্যে ইঁহারা প্রতিপালিত, তাহাতে বিলাসী হওয়া আশ্চর্য্য নহে, বরং বিলাসশূন্য হওয়াই বিচিত্র। যাঁহারা সর্ব্বপ্রথমে মঠ সংস্থাপিত করেন, তাঁহারা প্রায়ই অনাসক্ত যোগী, কিন্তু পরবর্ত্তী মহান্তেরা সেই সকল মহৎপ্রকৃতি গুরুর শিষ্যত্ব স্বীকার করিয়াও, তাঁহাদের অলৌকিক গুণগ্রাম, অবিচল একনিষ্ঠা এবং একান্ত নির্লেপ লাভ করিতে পারেন না। বিবিধ কামনা কঠোরতার আবরণের অভ্যন্তরে সামান্য বহ্নিকণার ন্যায় লুক্কায়িত থাকে; কালক্রমে তাহা প্রজ্জ্বলিত হইয়া দাবানলের সৃষ্টি করে, এবং তাহাতে মঠের পবিত্রতা, গৌরব সমস্ত দগ্ধ হইয়া যায়। গুরুদেবের এই মঠ সম্বন্ধে অবশ্য এতখানি কথা বলা যায় না; কারণ, এই মঠ বঙ্গদেশে নহে, এবং এই স্বাধীন প্রকৃতি বীরজাতির মধ্যে এখনও ইহার অতীত গৌরব অক্ষুণ্ণ আছে। বিবাদ বিসংবাদে, কিম্বা মামলা মকদ্দমায় ইহার অর্থভাণ্ডার শূন্য হইবার এখনও কোনও কারণ ঘটে নাই; কিন্তু পূর্ব্বের সেই ভাব ও ভক্তির উচ্ছ্বাস এখন আর নাই। তবে শিখজাতির মঠ, তাই ইহা হইতে এখনও প্রাণ অন্তর্হিত হয় নাই; হইলে আমাদের দেশের মঠগুলির হ্যায় ইহা ধর্ম্মমহিমার স্থায়ী উপহাসমাত্রে পর্য্যবসিত হইত।