বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রবাস-চিত্র/চন্দ্রভাগা-তীরে

উইকিসংকলন থেকে

চন্দ্রভাগা-তীরে।

শৈশবের চাঞ্চল্য এ বয়সেও আমাকে ত্যাগ করে নাই; এখনও দু’দণ্ড চুপ করিয়া বসিয়া থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার। হাতে কাজ কর্ম্ম থাকিলে কথাই নাই, কিন্তু কাজ কর্ম্ম না থাকিলে অকারণে ঘুরিয়া বেড়ান আমার স্বভাব; এ স্বভাব পরিবর্ত্তনের কোনও আশা নাই। ছোট ভাইয়েরা এখন আমার অভিভাবক, সহস্র চেষ্টাতেও তাঁহারা তাঁহাদের এই নাবালক জোষ্ঠটিকে সুপথে আনিতে পারিলেন না। কিন্তু তাঁহাদের উৎসাহ অথবা নীতি পুস্তক, এই দুইয়ের কিসের অভাবে আমার স্বভাব সংশোধিত হইল না, তাহা আমি এবং তাঁহারা কেহই স্থির করিয়া উঠিতে পারি নাই।

 হাতে কোনও কাজ নাই, এরূপ অবস্থায় চুপ করিয়া বসিয়া থাকিলেই মনের মধ্যে নানা প্রকার গভীর চিন্তার উদয় হইয়া মনটিকে অত্যন্ত কাতর করিয়া ফেলে। সে ভাবনা কেবল ইহকালে প্রাচীর সীমায় আবদ্ধ নহে, পরকাল পর্য্যন্ত তাহার গতি বিস্তৃত; সময়ে সময়ে তাহাকে দার্শনিক চিন্তার নামান্তর বলা যাইতে পারে। কিন্তু আমার মত গরিবের দার্শনিক চিন্তার দরকার কি? তাই আমি ছুটিয়া বাহির হই। লোকে অবসর পাইলেই বিশ্রাম করে, কিম্বা বন্ধু বান্ধবগণের সহবাসসুখে বা নির্জ্জনে পুস্তক পাঠে সময় অতিবাহিত করে,— কিন্তু আমি বিশ্রাম পাইলেই ঘুরিতে আরম্ভ করি। এরূপ অবস্থায় দুই দিনের ছুটি যে আমাকে অস্থির করিয়া তুলিবে, তাহার আর আশ্চর্য্য কি? কোথায় যাই, কিরূপে ছুটির দিন কাটাই, এই ভাবনাতেই অস্থির। জীবনের দিনগুলি কোনও রকমে অতিবাহিত হইলেই আমার নিকট পরম শান্তি।

 এই প্রকার যখন অবস্থা, সেই সময়ে সোমবারে একদিন ছুটি পাওয়া গেল। রবি সোম দুই দিন বিশ্রাম,—অতএব এই দুই দিন কাটাইবার জন্য কিঞ্চিৎ আয়োজন করিতে হইল।

 সৌভাগ্যক্রমে আমার এক সঙ্গী জুটিয়া ছিলেন। ইনিও আমার মত স্কুলের মাষ্টার; আমরা দুই জনে এক বাসাতেই থাকি, এবং ইনি আমার এক ঘরের সঙ্গী। জাতিতে বাঙ্গালী হইলেও বঙ্গদেশ বা বঙ্গভাষার সঙ্গে ইঁহার অধিক সম্বন্ধ নাই; ইঁহার পিতামহের সঙ্গে সে সম্বন্ধ ছিল বটে। তিন পুরুষ হইতেই ইঁহারা ‘পশ্চিমে’। ইনি বেনারস কলেজের ছাত্র, বয়স তেইশ চব্বিশ বৎসর। বেশ বুদ্ধিমান বটে, কিন্তু আমার অদৃষ্টদোষে পিতামাতা, ভ্রাতা ভগিনী, স্ত্রী, সকলেই বর্ত্তমান সত্ত্বেও, ইঁহার মন নির্ব্বেদভাবাপন্ন, সংসারের প্রতি আসক্তিবর্জ্জিত। বাহিরের লক্ষণেও তাহা কিঞ্চিৎ প্রকাশ পাইত; এবং মস্তকে দীর্ঘকেশ, মৎস্যমাংসত্যাগী, মিতাচারী এই ভদ্রলোকটিকে দেখিলে, যোগী ঋষির একটি নাগরিক সংস্করণ বলিয়া অনুমান হইত। তাহার ধর্ম্মমতও কিম্ভূতকিমাকার;—ব্রাহ্মসমাজ, আর্য্যসমাজ ও হিন্দুসমাজের অদ্ভূত মিশ্রণের উপর তত্ত্ববিদ্যার (থিয়সফি) আধিপত্য থাকিলে যেরূপ ধর্ম্মমত হয়, আমার এই বন্ধুটির ধর্ম্মও তদ্রূপ। এই বন্ধু আমার সঙ্গ গ্রহণ করিলেন; ইনি বেশ ধর্ম্মনিষ্ঠ এবং ইঁহার সহিত কথাবার্ত্তায় বেশ তৃপ্তি পাওয়া যায় বলিয়াই ইঁহাকে সঙ্গী করিলাম। কিন্তু গৃহজীবী এমন একটি অল্পবয়স্ক যুবককে সঙ্গে লইয়া বন জঙ্গলে বেড়ান আমি তত নিরাপদ মনে করি না; বিশেষতঃ বৈরাগ্যের দিকে তাঁহার যেরূপ ঝোঁক, তাহাতে তাঁহাকে লইয়া দুই চারি বার ঘুরিলেই হয় ত তিনি গৃহের বন্ধন ছিঁড়িতে পারেন। যাহা হউক, আমি অবসর পাইলেই একা ঘুরি, হ—বাবু (এই বন্ধুটির নাম) এ জন্য দুঃখিত এবং আমার প্রতি কিঞ্চিৎ উষ্মাযুক্ত। তাঁহার অনুযোগ, আমি কেন তাঁহাকে সঙ্গে লইয়া ঘুরি না;—আমি যে তাঁহার বৃদ্ধ পিতামাতা, প্রেমাস্পদ ভ্রাতাভগিনী এবং কিশোরী প্রণয়িনীর কথা ভাবিয়াই তাঁহার এই উমেদারীর প্রতি এত উদাসীন, সে কথা তিনি বুঝিতে পারেন না।

 এবার এই রবি ও সোম দুই দিনের ছুটিতে একাকী কোথাও যাইতে ইচ্ছা ছিল না; সঙ্গিহীনের প্রাণের মধ্যে একটি সঙ্গীর কামনা জাগিয়া উঠিল। এই অরণ্য ও পর্ব্বতে ভ্রমণোপযোগী সঙ্গী কোথায়? প্রকৃতির সুন্দর শোভন দৃশ্য দেখিবার জন্য অনেকে সঙ্গী হইতে চাহেন, কেহ বা পুরাতত্ত্ব কিম্বা প্রত্নতত্ত্ব আবিষ্কারের আশার দুর্গম গিরিপথে, কি সঙ্কটময় বহু প্রাচীন পার্ব্বত্য উপত্যকায় গমন করিতে পারেন; কিন্তু কেবল উদ্‌ভ্রান্তভাবে ঘুরিয়া শ্রান্ত হইবার আশায় বোধ করি কেহই আমার সাহচর্য্য অবলম্বন করিতে সম্মত নহেন। অন্য কহ সম্মত না হইলেও, এ বিষয়ে হ—বাবুর কিছুমাত্র আপত্তি দেখিলাম না; সুতরাং আমার সঙ্গে যাইবার জন্য তাঁহাকে প্রস্তুত হইতে বলিলাম। তিনি তখনই প্রস্তুত; আমার সঙ্গে বনে বনে ঘুরিবেন, তাঁহার আর এ উৎসাহ রাখিবার স্থান হইল না। তিনি এক্কা কি ঘোড়ার বন্দোবস্ত করিবার জন্য বাহির হইতেছেন দেখিয়া আমার বড় হাসি আসিল। আমাকে হাসিতে দেখিয়া তিনি কিছু অপ্রতিভ হইলেন। আমি বলিলাম, “কোথায় যাইতে হইবে, না জানিয়াই যানের বন্দোবস্ত!”—তিনি ভাবিয়াছিলেন, আমরা যেখানে যাইব, সেখানে গাড়ী ঘোড়া যাইতে পারে, উত্তম হাট বাজার আছে, এবং সঙ্গে দুই এক জন চাকর বাকরও চলিবে; কিন্তু আমি বুঝাইয়া দিলাম, আমার সঙ্গে চলিতে হইলে যান বাহনের আশা ত্যাগ করিতে হইবে। আমি পদব্রজে যাইব, লোকজনের কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই। বন্ধুটি রাস্তার দূরত্বের বিষয় চিন্তা করিয়া কিঞ্চিৎ বিষণ্ণ হইলেন; তাহার পর তিনি প্রবল তর্কের দ্বারা প্রতিপাদন করিতে লাগিলেন, আমার এই প্রকার কঠোরতাস্বীকার নিরর্থক; আমি যখন সাধু সন্ন্যাসী নই, তখন যতটুকু বিলাসভোগ দূষণীয় নয়, তত টুকুর প্রশ্রয় দেওয়া আমার উচিত। আমি যে বিলাস ও প্রয়োজন, এ উভয়ের পার্থক্য ভুলিয়া যাইতেছি, ইহা বন্ধুবর অন্যায় বলিয়া সিদ্ধান্ত করিলেন। আমি সংক্ষেপে বলিলাম, বিলাস-সুলভ ও প্রয়োজনীয়, এই উভয় দ্রব্যের মধ্যে যে পার্থক্য আছে, তাহা অতি সামান্য; সেই জন্য অল্প কারণেই গোলযোগ ঘটে। আজ যে জিনিস বিলাসোপকরণ বলিয়া মনে হয়, দুই দিন পরে তাহাই প্রয়োজনীয় হইয়া পড়ে; তখন তাহা না হইলে আর চলে না। তর্কে সুবিধা হইল না দেখিয়া তিনি প্রশ্ন করিলেন, আমি কত দূর যাইব? তত দূর হাঁটিয়া যাওয়া সম্ভব কি না, আজ রাত্রে ফিরিয়া আসা কি সহজ হইবে? সেখানে থাকিবার স্থান আছে কি না, এবং সেখানে খাদ্যদ্রব্য পাইবার কতটুকু সম্ভাবনা? এই সমস্ত বিষয়ে প্রশ্নের উপর প্রশ্ন বর্ষণ করিয়া তিনি আমাকে বিব্রত করিয়া ফেলিলেন। আমিও তাঁহার প্রত্যেক প্রশ্নের নিরাশাব্যঞ্জক এক একটি উত্তর দিতে লাগিলাম। বলিলাম, রাস্তা কত দূর, তাহা জানি না; জিজ্ঞাসা করিতে করিতে পথ চলিতে হইবে; হাট বাজার নাই; থাকিবার স্থান আছে কি না, জানি না, না থাকারই অধিক সম্ভাবনা; সেখানে কোন প্রকার খাদ্যদ্রব্যও পাওয়া যায় না; পথ হইতে দুই এক পয়সার বুট ভাজা সংগ্রহ করিতে হইবে। ভায়া অবিলম্বে বুঝিলেন, এ এক নূতন রকমের তীর্থ-পর্য্যটন। অতএব, এ সমস্ত অসুবিধা সত্বেও তিনি নিবৃত্ত হইলেন না। তাঁহার বিশ্বাস, যেখানেই যাই, তাঁহার ন্যায় বন্ধুকে কখনই অনাহারে বাঘ ভালুকের মুখে সমর্পণ করিব না। আমাদের ভ্রমণের লক্ষ্য কি, তাহা জানিবার জন্য তিনি বিশেষ ব্যস্ত হইলেন। তাঁহার কৌতুহলনিবৃত্তির জন্য বলিলাম, “চন্দ্রভাগা-তীরে।”

 নাম শুনিয়াই তিনি হাসিয়া আকুল; বলিলেন,—“এতখানি বাক্যকৌশলের কিছু আবশ্যক ছিল না, সরল ভাবে পঞ্জাবভ্রমণে যাওয়া হইবে বলিলেই সকল কথা বুঝা যাইত।” তাহার পর তিনি প্রমাণ করিতে বসলেন, এই দুই দিনের ছুটিতে কিছুতেই পঞ্জাবভ্রমণে যাওয়া যায় না; পদব্রজে ত দূরের কথা; তবে খুব কষ্ট স্বীকার করিলে অম্বালা কি অমৃতসর পর্য্যন্ত ঘুরিয়া নিয়মিত সময়ে চাকরীতে হাজির হওয়া যায়। আমি এক কথায় সমস্ত সারিয়া দিলাম। বলিলাম, “তোমার কোনও চিন্তা নাই, আমি যোগবলে তোমায় লইয়া যাইব।”—ভায়া Theosophist মানুষ; আমার যোগবলের কথা বিশ্বাস করিলেন কি না জানি না, কিন্তু নিরস্ত হইলেন।

 শনিবারের দিন আমাদের আয়োজন শেষ হইল। আয়োজনের মধ্যে মোটা একখানি গাত্রবস্ত্র, একখানি পরিধেয় বস্ত্র, এবং নগদ চারি আনার পয়সা। ভায়ার চক্ষুস্থির! এ কি রকমের আয়োজন; এতেই চন্দ্রভাগা-দর্শন ঘটিবে? কোনও প্রকারে শনিবারের রাত্রি কাটিয়া গেল।

 রবিবার অতি প্রত্যুষে তাঁহাকে সঙ্গে লইয়া বাহির হইলাম। দেরাদুন হইতে সাহারণপুর আসিতে হইলে একটি পথ পাওয়া যায়; এই পথটি দেরাদুন হইতে বাহির হইয়া ঠিক দক্ষিণ মুখে আসিয়াছে, এবং শিভালিক পর্ব্বতশ্রেণী ভেদ করিয়া সাহারণপুর পর্য্যন্ত বিস্তৃত। সেই জনহীন, পর্ব্বতাকীর্ণ, সৌন্দর্য্যবহুল, উচ্চ পার্ব্বত্য প্রদেশ দিয়া আমরা দুইটী প্রাণী নিঃশব্দে অতি ধীরে অগ্রসর হইতেছিলাম। ক্রমে পূর্ব্ব দিক পরিষ্কার হইয়া আসিল; বিহঙ্গের সুমিষ্ট প্রভাতকাকলী স্তব্ধ বনস্থলী আচ্ছন্ন করিয়া নবীন সূর্য্যের আহ্বানগীতিরূপে যেন ঊর্দ্ধ গগননগুলে প্রেরিত হইল। চতুর্দ্দিকে অযত্নসম্ভূত তৃণলতার সুরভি পুষ্প মুক্তাফলের ন্যায় শিশিরভারে আনত। নবোদিত সূর্য্যের লোহিত কান্তি বৃক্ষপত্র ভেদ করিয়া ধূসর পর্ব্বত অঙ্গে পতিত হওয়ায় বোধ হইতে লাগিল, কেহ লোহিতচূর্ণে পর্ব্বত-অঙ্গ রঞ্জিত করিয়াছে। আমরা কোনও লতামণ্ডপ বেষ্টন করিয়া, কোনও উচ্চ-বৃক্ষ-তল দিয়া আঁকা বাকা সঙ্কীর্ণ পথে চলিতে লাগিলাম, এ যেন আমাদের শৈশবের জীবনপথে অগ্রসর হওয়া,—তেমনি উদ্বেগহীন, আনন্দপূর্ণ। যত দূর দৃষ্টি পড়ে, সমস্ত প্রদেশের উপর এক অটল বিশ্বাস এবং সুদৃঢ় অনুরাগ প্রকাশিত; সমস্ত পথই অজ্ঞাত, কিন্তু আশঙ্কাশূন্য, যেন আপনার মাতার ন্যায় প্রকৃতি জননী অঙ্গুলি সঙ্কেতে আমাদিগকে ঈপ্সিত স্থানে লইয়া যাইতেছেন।

 এইরূপ কবিত্বপূর্ণ পথ দিয়া প্রীতি উচ্ছ্বসিত মনে ঘুরিতে ঘুরিতে দেরাদূন হইতে দুই তিন মাইল দূরস্থ পর্ব্বত অধিত্যকায় একটি নদী দেখিতে পাইলাম; এই নদীর নাম “বিন্ধ্যাল”। সমস্ত গিরিনদী যে প্রকৃতির, “বিন্ধ্যাল”ও সেই প্রকার প্রকৃতিসম্পন্ন। এ সকল নদীতে জল থাকে না। বিস্তু পর্ব্বতে যখন প্রবল বর্ষণ আরম্ভ হয়, তখন এই সকল নদী দিয়া কয়েক ঘণ্টা প্রবলবেগে জলপ্রবাহ প্রবাহিত হয়। তখন কাহার সাধ্য সেই প্রবল স্রোত রোধ করে, কিম্বা সেই সময় নদী পার হইয়া যায়? কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই আর কিছু নাই, সম্পূর্ণ শুষ্ক, জলবিন্দুশূন্য। এই কারণে এ সকল নদীর উপর সেতু নির্ম্মাণের কোনও প্রয়োজন হয় না।

 আমরা যখন নদী পার হইলাম, তখন তাহা শুষ্ক, সুতরাং পারের জন্য কোনও অসুবিধা ভোগ করিতে হইল না। এই তিন মাইল চলিয়াই আমার বন্ধুটি কাতর হইয়া পড়িলেন, এবং সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মাষ্টারজি, এমনি পদব্রজে কি সাহারণপুরে যেতে হবে?” আমি তাঁহার কথায় কর্ণপাতমাত্র না করিয়া সোৎসাহে এবং সবেগে চলিতে লাগিলাম। নিরুপায় ভাবে তিনি পশ্চাৎ পশ্চাৎ অগ্রসর হইতে লাগিলেন। এক এক বার তিনি কাতরতা প্রকাশ করিয়া কোনও কথা বলিবার উপক্রম করিলেই, একটি সুন্দর দৃশ্যের দিকে তাঁহার দৃষ্টি আকর্ষণ করি, আর তিনি সমস্ত ভুলিয়া যান; মহা আহ্লাদে এবং আশ্চর্য্য ভাবে, মুগ্ধনেত্রে সেই দৃশ্য দেখিয়া তাহার সমালোচনা আরম্ভ করেন এবং উপসংহারে বলেন, “এমন সুন্দর দৃশ্যের মধ্যে ডুবিয়া থাকিলে জীবনের পূর্ণ উপভোগ হইতে পারে। এই সমস্ত সৌন্দর্য্যের অনুভূতি জ্ঞানানুভূতি অপেক্ষা কত মহত্তর; এই সৌন্দর্য্যানুভূতি তখনই সার্থক হয়, যখন তাহা সেই পরম সুন্দর পুরুষকে বা মহিমান্বিত অনন্ত প্রকৃতির অখণ্ড মাধুরীকে ধারণা করিতে পারে। আমরা বৃথা জ্ঞানের উদ্বোধনে রত রহিয়াছি, ইহাতে না আছে তৃপ্তি, না আছে শান্তি, ইহাতে কেবল অহঙ্কার বৃদ্ধির করে এবং সন্দেহের ভিতর হইতে আমরা গভীরতর সন্দেহে ডুবিয়া যাই।” আমি বলিলাম, “জগতের অভিব্যক্তিই সৌন্দর্য্যমূলক; এমন কি, জ্ঞানের মধ্যেও যদি সৌন্দর্য্যের বিকাশ না থাকিত, তাহা হইলে জ্ঞানের এত আদর থাকিত না। জ্ঞান অপেক্ষা বিধাতার সৌন্দর্য্যেই অধিক প্রীতি, এবং এই কথা যুনানীর অন্ধকবি মিল্টন অতি সুন্দর বুঝিয়াছিলেন, তাই আদমকে জ্ঞানের পরিবর্ত্তে চিরসৌন্দর্য্যের লীলানিকেতন ত্রিদিবের প্রমোদকানন পরিত্যাগ করিতে হইল।”—এইরূপ গল্পে ভুলাইয়া ভুলাইয়া তাঁহাকে লইয়া চলিলাম। অবশেষে বেলা প্রায় সাড়ে আটটার সময় ছয় মাইল পথ অতিক্রম করিয়া একখণ্ড প্রস্তরের উপর তিনি বসিয়া পড়িলেন, এবং বলিলেন, “আর ত চলিতে পারি না; সকলই সুন্দর, কিন্তু এই গদ্য অংশ পথচলাটুকু যদি না থাকিত!”

 একটু বিশ্রামের পর, আর অধিক চলিতে হইবে না, এই আশ্বাস দিয়া আবার চলিতে লাগিলাম। অল্প দূরে—রাস্তার ধারে একটি গ্রাম দেখিতে পাইলাম। গ্রাম দেখিয়া বন্ধুটির দেহে প্রাণ আসিল; তাড়াতাড়ি আমরা গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করিলাম। বেলা বোধ হয় তখন নয়টা বাজিয়াছে। গ্রামের নামটি আমার মনে নাই। পশ্চিমের গ্রামগুলির নাম—তাহাদের পার্ব্বত্য প্রকৃতির অনুরূপ, অত্যন্ত শ্রুতিকঠোর; শত শত গ্রাম ঘুরিয়াছি, সকলগুলির নাম শ্রুতিধর ভিন্ন অন্য কাহারও মনে রাখা সম্ভব নহে। গ্রামে দুই তিনখানি ছোট দোকান, তাহাতে প্রধান প্রধান প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি পাওয়া যায়। দেখিলাম, অদূরে লাল রঙ্গকরা পাথরের অতি সুন্দর একটি অট্টালিকা, কিন্তু এই অট্টালিকা ও তাহার অধিবাসিবৃন্দের মধ্যে আকাশ পাতাল প্রভেদ। অট্টালিকাটি কেমন সুন্দর, ছবির মত সুশোভন; তাহার ভিতরে কেহ যদি প্রস্ফুটিত পুষ্পরাজি থরে থরে সজ্জিত রাখিত, তাহা হইলেই তাহার সদ্ব্যবহার হইত; কিন্তু তৎপরিবর্ত্তে ছিন্নবস্ত্রপরিহিত, অপরিষ্কারের জীবন্ত মূর্ত্তি কয়েকটি মানব গা দুলাইয়া ঘাড় নাড়িয়া সমস্বরে উর্দ্দূ পড়িতেছে। তাহাদের সেই সমবেত সুর আমাদের কানে নিতান্ত মন্দ লাগে নাই। দেখিলাম, এই গোষ্ঠের নেতা প্রকাণ্ড এক সাদা পাগড়ীধারী, বেত্রহস্ত, বিশ বাইশ বসর বয়স্থ এক শ্মশ্রুবিরল গুরুমহাশয়। তিনি ত্বরিতপদে আমাদের নিকট উপস্থিত হইলেন। দেখিলাম, গুরুমহাশয়টি আমারই এক পূর্ব্বতন ছাত্র। তাঁহার অনুরোধে আমরা বিদ্যালয়গৃহে প্রবেশ করিলাম। ছাত্রেরা মাটীতে কম্বল বিছাইয়া তাহার উপর বসিয়া আছে। হঠাৎ প্রভাতকালে অপরিচিত দুইটি অতিথিকে দেখিয়া সেই বালকবৃন্দের হৃদয়ে যে ভয় ও বিস্ময়ের আবির্ভাব হইল, তাহাদের চঞ্চলচক্ষুর কোমল স্পন্দনেই আমি তাহা অতি সহজে অনুমান করিতে পারিলাম। বিশেষ যখন তাহাদের গুরুমহাশয় অতি ব্যগ্রভাবে আমাদের বসিবার আয়োজন করিতে লাগিলেন, এবং চেয়ারখানিতে স্থানসংকুলান হইবে না দেখিয়া, অদূরস্থিত একটি কেরোসিনের বাক্স বহিয়া আমাদের নিকট রাখিলেন, তখন ছাত্রেরা একেবারে অবাক্ হইয়া গেল; ভাবিল, তাহাদের যমের যম আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে!

 গুরুমহাশয় সবিনয়ে তাঁহার ছাত্রগণের পরীক্ষা লইবার জন্য অনুরোধ করিলেন। ছাত্রেরা যে যে ভাষা শিক্ষা করিতেছে, সে সকল ভাষায় আমার অসীম দখল! বাস্তবিক, উর্দ্দূ ও ফরাশীতে আমার যেরূপ অভিজ্ঞতা, তাহাতে এই দুই ভাষায় অন্যের বিদ্যা পরীক্ষা চলে না; কিন্তু আজকাল ভাষাজ্ঞানের উপর পরীক্ষা নির্ভর করে না; প্রমাণের জন্য অধিক দূর যাইতে হইবে না, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ই তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। বিশ্ববিদালয়ের নিকট আমরা, বিশেষতঃ এই গুরুমহাশয়শ্রেণী, বিশেষ ঋণী; কারণ, আমাদের বিদ্যাবুদ্ধি হইতে আরম্ভ করিয়া অন্ন বস্ত্র পর্য্যন্ত সমস্তই তাঁহার প্রসাদাৎ। কিন্তু সত্য বলিতে কি, যদি ভাষাজ্ঞানের উপর পরীক্ষা নির্ভর করিত, তবে প্রবেশিকা পরীক্ষায় নির্দ্দিষ্ট বাঙ্গালা হইতে ইংরেজীতে অনুবাদের প্রশ্নপত্রের ভাষার চেহারা সম্পূর্ণ পরিবর্ত্তিত দেখিতাম; এবং স্থূলোদর সিভিলিয়ান-পুঙ্গবেরা বাঙ্গালা ভাষায় পরীক্ষাদানকালে The remarkable ladyর বঙ্গালু বাদে “ঐ মন্তব্যা স্ত্রীলোক” লিখিয়া অপূর্ব্ব ভাষাভিজ্ঞতা এবং অভিনব উদ্ভাবনীশক্তির পরিচয় প্রদান করিতেন না।

 যাহা হউক, দুই চারিটি কথায় পরীক্ষা শেষ করিয়া, গুরুমহাশয়কে চন্দ্রভাগার পথের কথা জিজ্ঞাসা করিলাম; জানিতে পারিলাম, এই গ্রাম অতিক্রম করিয়া দক্ষিণের দিকে একটি জঙ্গল আছে, তাহার ভিতর দিয়া প্রবেশ করিতে হইবে। অধিক বিলম্ব না করিয়া, একটি দোকান হইতে কড়াইভাজা ও গুড় কিনিয়া দুই জনে অগ্রসর হইলাম।

 ঘুরিতে ঘুরিতে আমরা আমরা শিভালিকের একেবারে কোলের কাছে আসিয়া পড়িয়াছি। রাস্তার ধারে এক জন কৃষক জমি চরিতেছিল, তাহাকে পথের কথা জিজ্ঞাসা করিলাম। সে দক্ষিণের একটি রাস্তা দেখাইয়া দিল। আমরা তাহার নির্দ্দেশ মত চলিতে লাগিলাম বটে, কিন্তু কোনও পথই দৃষ্টিগোচর হইল না, কেবল অরণ্যের মধ্যে রেখাবৎ একটি চিহ্ন। তাহাই অবলম্বন করিয়া লতা পাতা দুই হাতে সরাইতে সরাইতে চলিতে লাগিলাম। কোথাও পথ বেশ পরিষ্কার, আবার কোথাও গভীর জঙ্গল। স্থানে স্থানে ভয়ানক অন্ধকার—সূর্য্য-কিরণের চিহ্নমাত্র দেখা অসম্ভব। খানক দুরেই আবার সমস্ত পরিষ্কার, বেশ রৌদ্র, এবং চারি দিক খোলা। প্রকৃতির এই প্রকার বিভিন্ন দৃশ্যের মধ্যে দিয়া প্রায় দুই মাইল ঘুরিতে ঘুরিতে চন্দ্রভাগা-তীরে উপস্থিত হইলাম।

 এই চন্দ্রভাগা একটি সংকীর্ণকায়া ক্ষুদ্র গিরিনদী। সিন্ধুর অন্যতম শাখার নামও চন্দ্রভাগা; কিন্তু তাহার সহিত এই ক্ষুদ্র নগনদীর কোনও সম্বন্ধ নাই। সে চন্দ্রভাগা মহাপ্রতাপশালী, দুর্দ্দমনীয় সিন্ধুনদের একটি প্রধান শাখা; সে নিজেই বিখ্যাত, এবং তাহার চঞ্চল গতি পঞ্চনদের বিস্তৃত বক্ষঃ সুশোভিত করিতেছে; আর আমাদের পুরোবর্ত্তিনী এই চন্দ্রভাগা অরণ্যসঙ্কুল শিভালিকের কোনও এক অজ্ঞাত অংশে অন্ধকারাচ্ছন্ন গহ্বরে জন্মলাভ করিয়া, কত নির্ঝর ও জলপ্রপাতের দ্বারে দ্বারে সামান্য জল ভিক্ষা করিয়া মৃদুগতিতে অগ্রসর হইতেছে; আমাদের দেশের ছোট খালেও ইহা অপেক্ষা অধিক জল থাকে।

 নির্জ্জন নদীতীরে একটি প্রাচীন শিবমন্দির। মন্দিরে মহাদেব লিঙ্গমূর্ত্তিতে বিরাজমান; মন্দিরের প্রস্তর কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করিয়াছে, এবং এই মধ্যাহ্নকালেও তাহার মধ্যভাগ হইতে অন্ধকার বিদূরিত হয় নাই। কতকাল হইতে এই মূর্ত্তি এখানে প্রতিষ্ঠিত! হয় ত চতুর্দ্দিকে কত পরিবর্ত্তন চলিয়া গিয়াছে, কিন্তু বিগ্রহের কোনও পরিবর্ত্তন হয় নাই। যাঁহার প্রতিমূর্ত্তি, তাঁহারই ন্যায় মহাসমাধিনিমগ্ন যেন বিশ্বের প্রলয়ের সহিত বিশ্বেশ্বরের কিছুমাত্র সম্বন্ধ নাই।

 এই মন্দিরের সম্মুখে অতি জীর্ণ আর একটি সামান্য মন্দির দেখা গেল। প্রবাদ, ভগবান বুদ্ধ এই স্থানে বহুদিন যাবৎ তপস্যা করিয়াছিলেন। এ কথা কত দূর প্রমাণিক, তাহা স্থির করা কঠিন; তাহার পর কতকাল অতীত হইয়াছে, বোধ হয়, কোনও লিখিত বিবরণও নাই। সুতরাং, এই মন্দির বুদ্ধদেবের তপশ্চর্য্যা সম্বন্ধে কোনও সাক্ষ্য না দিলে ইহার সত্যাসত্যের নির্ণয় হয় না; কিন্তু এমন সুন্দর স্থানে বুদ্ধদেব তপস্যা করিয়াছেন বলিলে অসম্ভব বোধ হয় না। এই সকল স্থানে আসিলে বুঝিতে পারি, যোগী ঋষিগণ ভগবানের চিন্তায় দেহপাত করিবার অভিপ্রায়ে এইরূপ স্থান কেন মনোনীত করিতেন। আরণ্য প্রকৃতির স্নিগ্ধ গম্ভীর শোভা, প্রত্যেক বৃক্ষলতা ও তুষারধৌত প্রস্তরখণ্ডের সুপবিত্র শান্তভাব, এবং উপলব্যথিত-গতি ক্ষীণকায়া। এই গিরিনদীর নির্ম্মল প্রবাহ, এ সমস্ত দেখিলে মনে আর কোনও কথার উদয় হয় না,—শুধু অনাদি অনন্ত মহাপুরুষের মধুর সত্তায় হৃদয় পরিপূর্ণ হইয়া যায়। এখানে সকলই সহজ, সকলই সুন্দর। পার্ব্বত্য বৃক্ষশ্রেণীতে পক্ষিগণের কি স্বাধীন আনন্দধ্বনি, নদীজলে মৎস্যকুলের কি নির্ভয় সন্তরণ! বুদ্ধদেব এখানে তপস্যা করুন আর না করুন, তাঁহার ধর্ম্মের মূলতত্ত্ব “অহিংসা পরমো ধর্ম্মঃ”—এই মহতী উক্তি এই পার্ব্বত্য প্রকৃতির প্রাণে প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হইতেছে। এই নীতিকে অনুপ্রাণিত করিবার জন্য মনুষ্যের অনুশাসন এখানে সম্পূর্ণ নিরর্থক।

 চন্দ্রভাগার গতি ধীর; পার্ব্বত্য নদীর লম্ফ ঝম্ফ গতি, সিংহনাদ, ফেনিল তরঙ্গের বেগ, এখানে সে সকল কিছুই নাই। সামান্য শব্দ করিতে করিতে চন্দ্রভাগা অগ্রসর হইয়াছে। কত বিভিন্ন বর্ণের মৎস্য যে সেই অল্প জলে খেলা করিতেছে, তাহার সংখ্যা নাই। জল সর্ব্বত্রই এক হাঁটু, দুই এক স্থানে একটু বেশী হইতে পারে। জীর্ণ মন্দিরটির এক দিকের দেওয়াল ফাটিয়া গিয়াছে, এবং তাহারই ভিতর হইতে একটি নির্ঝর বাহির হইয়া চন্দ্রভাগায় মিশিয়াছে। এই নির্ঝরের জল কেমন নির্ম্মল; যেন বীরের শরাঘাতে বিদীর্ণবক্ষা বসুন্ধরার মর্ম্মস্থান হইতে প্রসন্নসলিলা ভোগবতী সমুদ্ভূত হইয়া তৃষাতুরের অভীষ্ট সিদ্ধ করিতেছেন। ভগ্নমন্দিরের সোপানে বসিয়া, এই ক্ষুদ্রকায়া তরঙ্গিণীর অনাবিল পুণ্য প্রবাহের দিকে চাহিয়া, কত কথাই ভাবিতে লাগিলাম; এই শুভ্র দিবালোকে বায়ুহিল্লোলিত উন্নত বৃক্ষরাজির ঘন পল্লবের সঘন মর্ম্মর শব্দ, নদীর অস্ফুট কলধ্বনির সহিত মিশ্রিত হইয়া যুগান্ত প্রবাহিত রহস্যাভাষের ন্যায় শ্রুত হইতে লাগিল, বুঝি ইহা বিশ্বপিতার অনাদ্যন্ত যশোগীতির ক্ষীণ প্রতিধ্বনি।

 প্রতি বৎসর চৈত্রসংক্রান্তির দিন এখানে একটি মেলা হয়। নিকটস্থ গ্রামসমূহের স্ত্রী, পুরুষ ও বালক বালিকারা সকলে সে দিন একত্রিত হইয়া চন্দ্রভাগায় স্নান করে, এবং মন্দিরে শিবের মস্তকে দুগ্ধ ও বিল্বপত্র “চড়ায়”। এদেশে শিবের মাথায় জল ঢালার নাম “জল চড়ান”। আমি এই সময় একবারও চন্দ্রভাগায় আসিতে পারি নাই; কারণ, ঠিক এই দিনে হরিদ্বারের মেলা আরম্ভ হয়; হরিদ্বারের মেলা দেখিবার লোভ একবারও সংবরণ করিতে পারি নাই, এখানকার মেলাও এ পর্য্যন্ত দেখা হয় নাই। তবে মধ্যে মধ্যে এখানে আসিবার সুযোগ হইত, কিন্তু আমি ইচ্ছাপূর্ব্বক সে সুযোগ ত্যাগ করিতাম। বর্ষাকালে আমার বন্ধুগণ দল বাঁধিয়া মৎস্যানুসন্ধানে এই নদীতীরে আসিতেন; কিন্তু এমন সুন্দর পবিত্র স্থানে,—যেখানে “অহিংসা পরমোধর্ম”-প্রচারক কিছু কাল যোগসাধনায় কালাতিপাত করিয়াছেন, সেখানে জীবহিংসার জন্য দল বাঁধিয়া আসা আমার নিকট সঙ্গত বলিয়া বোধ হইত না।

 মহাদেবের মন্দিরমধ্যে বস্ত্রাদি রাখিয়া, এই প্রবল রৌদ্রের মধ্যে শীতে কম্পমান দেহে দুই জনে স্নান করিতে নামিলাম। বাসায় গরম জলে স্নান করাই আমাদের নিয়ম। আমার সঙ্গী বন্ধু অনেক দিন পরে অবগাহনের সুবিধা পাইয়া হাঁটুজলেই সন্তরণ আরম্ভ করিলেন; এত শীত, কিন্তু তাঁহার ভ্রূক্ষেপও নাই। আমাদের সোৎসাহে দেহমর্দ্দন ও লম্ফ ঝম্ফে মৎস্যকুলের মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার হইল; অবশেষে সেই অল্প পরিমাণ জল পঙ্কিল করিয়া আমরা তীরে উঠিলাম। অনন্তর গুড় কড়াইভাজা ভক্ষণের পালা!

 আমরা জলযোগ শেষ করিয়া, শিবমন্দিরে দুই জনে শয়ন ও উপবেশনে মধ্যাহ্ণ অতিবাহিত করিলাম। এখান হইতে আর ফিরিতে ইচ্ছা হয় না; গৃহের সৌন্দর্য্য বদ্ধ, যেন মায়াবিজড়িত, সেখানে অল্প দুঃখ শোকে হৃদয় ক্ষুব্ধ হয়, সামান্য সুখেই বক্ষ ভরিয়া যায়, এবং সেই স্তূপাকার সুবর্ণশৃঙ্খলের মোহন ভারের নিম্নে প্রাণ বিসর্জ্জন করা, জীবনের পরম উদ্দেশ্য বলিয়া প্রতীত হয়। কিন্তু মুক্ত প্রকৃতির এই লীলাক্ষেত্রে উপস্থিত হইলে বুঝিতে পারা যায়, চতুর্দ্দিকে যে সৌন্দর্য্য বিকশিত রহিয়াছে তাহা বাধাবন্ধহীন, মহিমাময়, বিচিত্রতাপূর্ণ; গুটি পোকা যেমন তাহার রূদ্ধ গৃহভেদ করিয়া বিচিত্রবর্ণ পাখা মেলিয়া গভীর আনন্দে নীল মুক্তাকাশে উড়িয়া যায়, তাহার গৃহের দিকে আর ফিরিয়া আসিতে প্রবৃত্ত হয় না, সেইরূপ এখানে আসিলে গৃহে ফিরিয়া যাইতে ইচ্ছা হয় না। জীবন-মরীচিকার ঘোর পিপাসা বুঝি এই সকল স্থান ভিন্ন অন্য কোথাও প্রশমিত হয় না!

 অনাহারে এখানে রাত্রিযাপনের সঙ্কল্প করা গেল। অপরাহ্ণে মন্দিরের বাহিরে বসিয়া দুই জনে কথাবার্ত্তা কহিতেছি, এমন সময় একটি লোক আমাদের নিকটবর্ত্তী হইল। নিকটেই কোনও গ্রামে তাহার বাসগৃহ; গৃহে তাহার স্ত্রী ও দুইটি কন্যা আছে। সে চাষ করে; বাড়ীতে বাগান আছে; বাগানে নানাপ্রকার তরকারী উৎপন্ন হয়; দেরাদূনের বাজারে তাহা বিক্রয় করিয়া লবণ তৈল প্রভৃতি আবশ্যক দ্রব্যাদি কিনিয়া আনে। এতদ্ভিন্ন তাহার কয়েকটি গরু আছে। কিন্তু সে দুগ্ধ বিক্রয় করে না। আমরা সেইখানেই রাত্রিযাপন করিব শুনিয়া, সে আশ্চর্য্য হইয়া গেল, এবং আমাদিগকে এই বিপদপূর্ণ অভিপ্রায় হইতে নিবৃত্ত হইতে বলিল। কারণস্বরূপ একটি লোমহর্ষণ গল্পও বলিয়াছিল; গল্পটী এই,—

 এই মন্দির দিনের বেলা যেরূপ দেখা যায়, রাত্রে সেইরূপ থাকে না; রাত্রে ইহার অতি ভয়ানক প্রহরী আছে। সন্ধ্যা হইলেই দুইটী বৃহৎ অজগর সর্গ জঙ্গল হইতে মন্দির বারান্দায় উপস্থিত হয়, এবং উদাত ফণায় সমস্ত রাত্রি মন্দির রক্ষা করে। তাহাদের ভয়ে রাত্রিকালে মন্দিরে বাস করা দূরের কথা, সন্ধ্যার পর এ পথে কেহই চলিতে ভরসা করে না। গভীর রাত্রে দেবতারা স্বর্গ হইতে এই মন্দিরে পূজা করিতে আসেন। কৃষকেরা প্রভাতে ফুল ফল পর্য্যন্ত পড়িয়া থাকিতে দেখে, এবং এক একদিন রাত্রে তাহাদের দূরস্থ গ্রাম হইতে তাহারা শঙ্খ ঘণ্টাধ্বনি পর্য্যন্ত শুনিতে পায়। একবার একজন সন্ন্যাসী কাহারও কথা না মানিয়া রাত্রিযাপনের জন্য এখানে আসিয়াছিল, কিন্তু তাহাকে আর সশরীরে ফিরিয়া যাইতে হয় নাই; প্রাতঃকালে মন্দির প্রাঙ্গণে তাহার মৃতদেহ পতিত ছিল, কে যেন তাহার শরীরের সমস্ত হাড় চূর্ণ করিয়া দিয়াছে। যে কৃষকটি আমাদের কাছে গল্প করিতেছিল, তাহার বিশ্বাস, এই মন্দির প্রহরী সর্প তাহাকে জড়াইয়া পিষিয়া মারিয়াছে। কৃষক আরও বলিল, এই মন্দিরটি শিবমন্দির হইলেও ইহা একটি সমাধিমন্দির। অনেক দিন পূর্ব্বে এখানে এক জন সন্ন্যাসী বাস করিতে আরম্ভ করেন; সকলের বিশ্বাস, সন্ন্যাসী কোনও দেবতা। সন্ন্যাসী এখানে আশ্রম প্রস্তুত প্রস্তুত করিয়াছিলেন, কিন্তু তাঁহার শিষ্যবর্গের কাহাকেও এখানে রাত্রিবাস করিতে দিতেন না; সন্ধ্যার পূর্ব্বেই তাহারা গ্রামে প্রবেশ করিয়া আশ্রয় অন্বেষণ করিয়া লইত। সন্ন্যাসীর গাঁজা, আফিং বা ভাং খাওয়া অভ্যাস ছিল না, তিনি ফলমূলাহারী ছিলেন; নিকটস্থ গ্রামের অধিবাসিবর্গ তাঁহাকে অত্যন্ত ভক্তি করিত। সেই সকল গ্রামবাসীরা রাত্রিকালে সভয়ে দেখিত, সন্ন্যাসীর আশ্রম অনেক দূর লইয়া আলোকাকীর্ণ হইয়াছে, সামান্য অগ্নিতে সেরূপ আলোক উৎপন্ন হওয়া সম্ভব নহে, অথচ সন্ন্যাসীর কুটীরে কখনও এত কাষ্ঠ থাকিত না, যাহা দ্বারা এরূপ প্রচুর আলোকের উৎপাদন করা যাইতে পারে। শুনা গেল, এখনও মধ্যে মধ্যে আলোক দেখা যায়। একবার সন্ন্যাসী তীর্থভ্রমণে গিয়াছিলেন, পাঁচ ছয় মাস পরে এক জন নবীন শিষ্য লইয়া আশ্রনে প্রত্যাগমন করেন। সে দিন অন্যান্য শিষ্যগণ রাত্রে তাঁহার নিকটে থাকিবার অনুমতি পাইল। রাত্রে তিনি ঘোষণা করিলেন, সেই দিনই তাঁহাকে পৃথিবী ত্যাগ করিয়া যাইতে হইবে। শিষ্যমণ্ডলী এই সংবাদে আকুল হইয়া উঠিল; তিনি আদেশ করিলেন, নবীন সন্ন্যাসী তাঁহার মৃতদেহ সমাহিত করিয়া তাহার উপর মন্দির নির্ম্মাণ করিবেন, এবং সেই মন্দিরে শিব প্রতিষ্ঠা হইবে। রাত্রি দুই প্রহরের সময় সন্ন্যাসী যোগাসনে উপবেশন করিলেন; চারি দিকে শিষ্যগণ তাঁহাকে পরিবেষ্টন করিয়া রহিল, কিন্তু, ধীরে ধীরে তাহারা অজ্ঞান হইয়া পড়িল। প্রত্যূষে উঠিয়া দেখে, সন্ন্যাসীর প্রাণ দেহত্যাগ করিয়াছে। নবীন সন্ন্যাসী তাঁহার গুরুদেবের আদেশ অনুসারে এখানে এই মন্দির ও এই শিবলিঙ্গ প্রতিঠিত করিয়াছেন; এবং তিনি চলিয়া যাইবার সময় আদেশ করিয়া গিয়াছিলেন, রাত্রিকালে এখানে কেহ বাস না করে। এই জন্য এ স্থান রাত্রিকালে জনমানবশূন্য অবস্থায় পড়িয়া থাকে। আমার সঙ্গী বন্ধুর ঘাড়ে “থিওসফির” বোঝা চাপিয়া আছে; তিনি আগা গোড়া সমস্ত কথা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিলেন। আবার ঠিক এই সময়ে সেই ভাঙ্গা মন্দিরের ভিতর হইতে একটি প্রকাণ্ড সর্প বাহির হইয়া বনের মধ্যে প্রবেশ করিল। আমাদের সংবাদদাতা কৃষক বলিল, সন্ধ্যা হইবার আর বিলম্ব নাই, তাই সাপ বাহির হইয়াছে, শীঘ্রই বনের মধ্য হইতে আহার সংগ্রহ করিয়া ফিরিয়া আসিবে।

 এই কথা শুনিয়া আমার সঙ্গী আর বিলম্ব না করিয়া মন্দিরের ভিতর হইতে গাত্রবস্ত্রাদি লইয়া বাসায় ফিরিবার উদ্যোগ করিলেন। আমার ফিরিবার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু সেখানে থাকিবারও যে সম্পূর্ণ ইচ্ছা ছিল, তাহা নহে; কারণ, দেখিয়া শুনিয়া এ সমস্ত অলৌকিক ব্যাপারে আমার কিঞ্চিং বিশ্বাস হয়। এখানে থাকিলে মারাত্মক কিছু না হউক, আমাদের কোনও বিপদ ঘটা আশ্চর্য্য নহে; সুতরাং এখান হইতে উঠিলাম। আমাদিগকে উঠিতে দেখিয়া পূর্ব্বোক্ত কৃষকটি বলিল, দেরাদূন এখান হইতে অনেক পথ, বেলাও আর অধিক নাই, পথে বিপদে পড়িতে পারি, অতএব যদি রাত্রে তাহার গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করি, তাহা হইলে সেখানে রাত্রিযাপন করিয়া প্রভাতে দেরায় ফিরিতে পারিব। আমার সঙ্গী সহজেই সম্মত হইলেন। আমার অসম্মতিরও অবশ্য কোনও কারণ ছিল না, বিশেষ এদেশীয় কৃষকেরা অত্যন্ত আতিথ্যপরায়ণ।

 আমরা দু’জনে কৃষকের পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলাম; সন্ধ্যার কিঞ্চিৎ পূর্ব্বে একটি অল্পপরিসর ভূট্টাক্ষেত্রের মধ্যে কৃষকের বাসগৃহে উপস্থিত হইলাম। বাড়ীতে দুইখানি ঘর—একখানিতে রান্না হয়, এবং তিনটি গাই বাঁধা থাকে, অর্থাৎ একখানি পাকশালা ও গোশালা একধারে উভয়ই, অন্যখানি শয়নগৃহ। কৃষকের পরিবারের মধ্যে স্ত্রী ও দুই কন্যা; আমরা গৃহস্বামীর শয়নগৃহের প্রশস্ত বারান্দায় আসিয়া বসিলাম;―সে তাহার স্ত্রীকে আমাদের কথা বলিল। আমাদের বাঙ্গালা দেশের গৃহলক্ষ্মীগণের গৃহে আজ কাল অতিথিসমাগমে তাঁহাদের প্রসন্নমুখে সহসা যে পরিমাণ বিরক্তির আবির্ভাব হয়, তাহাতে স্বামী মহাশয়েরাও ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়েন। ভারতের উত্তর-পশ্চিমপ্রান্তে এই পার্ব্বত্য কৃষকপরিবারে সেরূপ কোনও ভাবের পরিচয় না পাইয়া বড়ই আহ্লাদিত হইলাম, সেই সঙ্গে বাঙ্গলার মহিলা কুলের সহিত পর্ব্বতবাসিনী রমণীগণের একটু তুলনাও করিয়া লইলাম। কিন্তু এই তুলনায় সমালোচনা আমাদের সহৃদয়া পাঠিকাগণের প্রীতিপ্রদ হইবে না, অতএব সে কথা এখানে না বলাই ভাল।

 কৃষকরমণী সন্তুষ্টচিত্তে আমাদের আহারের উদ্যোগ করিতে গেল; দুইটি সুসভ্য বিদেশী অতিথির কিরূপে অভ্যর্থনা করিবে, এই চিন্তাতেই তাহারা স্বামী স্ত্রী প্রথমে বিব্রত হইয়া পড়িল; কিয়ৎক্ষণ পরে কৃষকপত্নী ঘরের বাহিরে আসিরা “রি, রি, রি, রি, রো”—এইরূপ এক শব্দ করিল; উত্তরে দূর হইতে “কু” শব্দ শুনিতে পাইলাম, কে যেন ভাঙ্গা গলার মিষ্ট কণ্ঠে এই শব্দ উচ্চারণ করিল! গৃহস্বামিনী আমাদের সঙ্গে কথা কহিতে লজ্জাবোধ করিল, কিন্তু আমদের সঙ্গে কথা কহিবার মানুষের অধিকক্ষণ অভাব ছিল না;—অবিলম্বে কৃষকের হৃষ্টপুষ্টা, উন্নতদেহা গৌরাঙ্গী দুইটি কন্যা তিনটি গাই লইয়া সেখানে উপস্থিত লইল। আমাদের দেখিয়া তাহারা অত্যন্ত বিস্মিত হইয়া গেল; তাহাদের পিতা সকল কথা খুলিয়া বলিল। বড়মেয়েটি মার সাহায্যের জন্য রান্নাঘরে গেল, ছোটটি গোবৎস ধরিল, তাহার পিতা গোদোহন করিল। গোদোহন শেষ হইলে আমরা গল্প আরম্ভ করিলাম। সে সকল কি গল্প? তাহাতে আমাদের শিক্ষা সভ্যতার কোনও কথা ছিল না, জীবনসংগ্রামের গভীর আবর্ত্তে পড়িয়া আমরা যে প্রতিদিন অধিকতর ব্যাকুল হইয়া উঠিতেছি—আমাদের হৃদয়ের সেই ব্যাকুল ক্রন্দন এই সুখী ও শান্তিপূর্ণ কৃষকপরিবারে ব্যাপ্ত করি নাই। সংসারের অনেক কথা তাহারা বোঝে না,—রাজনীতি, ধর্ম্মনীতি, ও সমাজনীতির অনুশীলনে ইহাদের মস্তিষ্ক ব্যথিত না হইলেও, ইহাদের দিন বেশ নিরুদ্বেগে অতিবাহিত হইতেছে। ইহাদের সহিত কথা কহিয়া আমি বুঝিলাম না, কোন্ গুণে আমরা শ্রেষ্ঠ; ইহাদের নিষ্ঠা কেমন একাগ্র, ভক্তি কত গভীর, হৃদয় কত উদার ও মহৎভাবপূর্ণ, এবং বিশ্বাস কেমন অবিচল। আমাদের সংশয়, আমাদের সঙ্কোচ, আমদের মান-অভিমান-জ্ঞান ইহাদের নাই; ভগবান যদি আমাদের হৃদয়ে এই মূর্খ, পার্ব্বত্যপরিবারের ন্যায় সন্তোষ ও শান্তিদান করিতেন, তাহা হইলে এ শিক্ষা ও সভ্যতার আড়ম্বর পরিত্যাগ করিতাম।

 তাহাদের গল্পে তাহাদেরই পুরাতন কাহিনী ধ্বনিত হইতেছিল। তাহাদের সেই সকল গল্পের সহিত তাহাদের গভীর বিশ্বাস বিজড়িত। সে সকল গল্প যুক্তিতর্কের অতীত, কিন্তু তথাপি তাহা কেমন সুন্দর। কৃষকের ছোট কন্যাটি তাহার পিতার নিকট বসিয়া তাহার পিতাকে গল্পে সাহায্য করিতেছিল। হাত মুখ নাড়িয়া সে যখন সালঙ্কারে তাহার পিতার গল্পের অনুবৃত্তি আরম্ভ করিল, তখন আমি অবাক্ হইয়া দেখিতে লাগিলাম।—তাহার বর্ণনভঙ্গী সুন্দর,—কি বর্ণনকৌশল সুন্দর? বাস্তবিক মেয়েটি আশ্চর্য্য সুন্দরী, তাহার নিটোল দেহে প্রথম যৌবনের উজ্জ্বলকান্তি ফুটিয়া উঠিয়াছিল, এবং সেই চাঞ্চল্যের উপর সুন্দর সরলতা তাহার মধুর রূপকে অতি সুশোভিত করিয়াছিল। তাহার সরলতা, তাহার রূপমাধুরীও গ্রাম্যভাব দেখিয়া, প্রসিদ্ধ স্কচ কবির কবিতা মনে পড়িয়া গেল:—

“She was a bonnie sweet Sonsii lassie”

 কৃষকের ভাষার সুন্দর পরিচয়; কৃষক কবিই এ সৌন্দর্য্যবর্ণনার উপযুক্ত পাত্র। গল্প শুনিতে শুনিতে রাত্রি হইল। ইতিমধ্যে মা ও বড় মেয়ে গরম লুচি, শাকের চাটনি, কাঁচা ভুট্টার একটা ঝাল তরকারী ও গরম দুদ লইয়া, অতিথিসৎকারের বন্দোবস্ত করিল। আমরা আহারে বসিলাম; ছোট মেয়েটি “এটা খাও, ওটা খাও” বলিয়া জিদ করিতে লাগিল; তাহার কাছে আমরা অত্যন্ত পরিচিত হইয়া পড়িয়াছিলাম।

 আহারান্তে আমার সঙ্গী কম্বলের উপর নিজের কাপড়খানিতে সর্ব্বাঙ্গ আচ্ছাদিত করিয়া শয়ন করিলেন। দশ পনর মিনিটের মধ্যে তাঁহার নাসিকা গর্জ্জন আরম্ভ হইল; দুর্ভাগ্যবশতঃ নিদ্রা আমার এরূপ আজ্ঞাকারিণী নহে, (বন্ধুগণ কিন্তু এ কথা কিছুতেই বিশ্বায় করেন না), আমি বসিয়া গৃহস্বামীর সহিত গল্প করিতে লাগিলাম।

 বারান্দার এক পাশে জাঁতা ছিল; কাজ কর্ম্ম শেষ হইলে মেয়ে দুটি সেই জাঁতা ঘুরাইতে লাগিল; প্রথমে তাহারা অস্পষ্টস্বরে কি বলাবলি করিতেছিল। একটু লক্ষ্য করিয়া বুঝিলাম, আমাদের কথারই আলোচনা করিতেছে। ক্রমে রাত্রি অধিক হইল, আমাকে নিদ্রিত মনে করিয়া জাঁতা ঘুরাইতি ঘুরাইতে তাহারা গান ধরিয়াছিল। জাঁতা পিষিতে পিষিতে গান করা এ দেশের নিয়ম। প্রথমে দুই ভগিনী অতি ধীরে, সলজ্জভাবে গাহিতে লাগিল, যেন নৈশবায়ূর স্পর্শমাত্রে সেই মৃদুস্বর কাঁপিয়া ভাঙ্গিয়া যাইবে; কিন্তু ক্রমেই তাহা সুস্পষ্ট হইয়া গ্রামের পর গ্রামে উঠিয়া, এই নীরব নিশীথে চতুর্দ্দিকে প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। সে স্বর কেমন সুমিষ্ট, এবং প্রতি চরণের শেষে যে একটি কম্পন, তাহা অনেকক্ষণ ধরিয়া যেন কর্ণে মধুবর্ষণ করে। এতকাল পরে এখনও মধ্যে মধ্যে সেই গীতধ্বনি কর্ণে বাজিয়া উঠে; সেই নির্জ্জন পার্বত্যকুটীরে সেই নৈশগানের ধুয়া এখনো ভুলি নাই; এখনো মনে পড়ে—

“ওরে ধন দৌলাত”

 এবং নিজের অদ্ভূত কবিত্ববলে কত কথাই এই ধুয়ার সঙ্গে যোগ করিয়া নিজের ভাবুকতা প্রকাশ করি!

 কখন ঘুমাইয়াছিলাম, মনে নাই। প্রত্যূষে সঙ্গীর ডাকে নিদ্রাভঙ্গ হইল। গৃহস্বামী ও তাহার পরিবারবর্গের নিকট বিদায় লইয়া, দেরাদূনের দিকে অগ্রসর হইলাম। আমাদের বিদায় লইবার সময় কৃষকের ছোট মেয়েটি বলিয়াছিল, যদি আবার কখন এ পথে আসি, তবে যেন তাহাদের গৃহে অতিথি হই। পর্ব্বতপ্রান্তের এই অতিথিবৎসল কৃষক-পরিবারের কথা আমার অনেক কাল মনে থাকিবে।