বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রবাস-চিত্র/টপকেশ্বর

উইকিসংকলন থেকে

টপকেশ্বর।

বাঙ্গালাদেশ নয় যে লম্বা চওড়া ছুটি পাওয়া যাইবে। আমাদের পূজার ছুটি সবেমাত্র তিন দিন। সে তিন দিনে কোন দূরতর দেশে বেড়াইতে যাইবার আশা বিড়ম্বনা মাত্র। সেই জন্য কোন একটা বড় রকমের অভিযানের পরিবর্ত্তে এই পর্ব্বতের চারিরিকে যাহা আছে তাহাই দেখিব, স্থির করিলাম। এখানে যাহা আছে, তাহার অপেক্ষা বেশী আর কোথায় কি থাকিতে পারে? গিরি প্রাচীর পরিবেষ্টিত সুন্দর শস্য-শ্যামল প্রদেশ, চির কলনাদিনী নির্ঝরিণী, হরিৎলতাপল্লবসমাচ্ছন্ন কুসুমকুঞ্জ এবং বিহঙ্গকুলের অবিরাম কলধ্বনি। সংসারের ক্ষুধিত কোলাহল সেখানে নাই; পাণ্ডিত্য, তর্ক, মীমাংসা প্রভৃতির পর্ব্বতপ্রমাণ ধূলিতে সেই নির্ম্মল প্রদেশ আচ্ছন্ন নয়; শুধু স্বভাবের শোভা, পৃথিবীর তৃষ্ণা নিবারণের জন্য প্রকৃতির প্রেমের উৎস; শুধু শান্তি ও বিরাম, সুখ ও সন্তোষ। সেই জন্যই পাহাড়ে যাওয়াই স্থির হইল। মহাষ্টমীর দিন, দুই প্রহরের সময় বন্ধুবর শ—বাবুর সঙ্গে টপকেশ্বর অভিমুখে যাত্রা করিলাম। কিন্তু এবার চারিদিক যে প্রকার নির্জ্জন নিস্তব্ধ দেখিলাম তাহা বচনাতীত। তাহার মধ্যে আপনাকে হারাইয়া ফেলিতে হয়; কথা বলিলে মনে হয় আমার ভিতর হইতে আমিটা বাহিরে আসিয়া যেন আমারই সম্মুখে দাঁড়াইয়া কথা বলিতেছে. আর চারিদিক হইতে তাহার গম্ভীর প্রতিধ্বনি উত্থিত হইতেছে। কোন প্রকার কোলাহল না থাকিলে স্থানের গাম্ভীর্য্য বর্দ্ধিত হয়। টপকেশ্বর ত একেই মহা গম্ভীর স্থান, তাহার উপর সেদিন সেখানকার গুর্খাদের ঘরে ঘরে পূজা; তাহারা সেই পূজাতেই ব্যস্ত, কাজেই গোলমালের কোন অবসর ছিল না। এই পার্ব্বতা গুর্খাজাতি এই সময় নিজ নিজ ঘরে পূজা করে, এবং ছাগ মহিযাদির বলি দেয়। উপাসনা বিষয়ে তাহাদিগকে অসভ্য বলিবার যো নাই। তাহারা ভগবানের মহাসিংহাসনের নীচেই গভীর ভক্তি ও নিষ্ঠাভরে অবনত হয়, তাঁহার প্রতিনিধিত্বের জন্য কোন মৃতপুত্তলিকার অবতারণা আবশ্যক বলিয়া মনে করে না।

 টপকেশ্বরে তিনটি পর্ব্বত গহ্বর আছে। তাহার মধ্যে একটিতে প্রবেশ করিয়া আমার মনে বড়ই আনন্দের সঞ্চার হইল। চতুর্দ্দিকে শব্দমাত্র নাই, কেবল গহ্বরের সম্মুখ দিয়া একটি ক্ষুদ্রকায়া নির্ঝরিণী অবিরাম কুল কুল শব্দে নাচিয়া নাচিয়া আঁকিয়া বাঁকিয়া দ্রুতগতিতে নিম্নদিকে চলিয়া যাইতেছে; সে যেন একটি দ্রব স্ফটিকের প্রবাহ! মধ্যাহ্ন সূর্য্যের তীক্ষ্ণ কিরণচ্ছটা পাহাড়ের বড় বড় গাছের দুই একটি পাতার ভিতর দিয়া এই নির্ঝরের জলের উপর আসিয়া পড়িয়াছে। নির্ঝরিণী যেন তাহাতেই তাহার চিররুদ্ধ প্রাণে এক অনন্ত আনন্দের,—এক স্বর্গীয় আলোকের বিকাশ অনুভব করিতেছে; আর স্বাধীনতার মুক্ত সমীরণ সেবন করিবার জন্য অধিকতর অধীর হইয়া আজন্মের পিতৃগৃহ পরিত্যাগ করিয়া ছুটিতেছে। আমার বস্তুতই রবি কবির সেই কবিতাটা মনে উদয় হইল,

উন্মাদিনী কল্লোলিনী
ক্ষুদ্র এক নির্ঝরিণী
শিলা হোতে শিলান্তরে লুটিয়া লুটিয়া,
ঘন ঘন অট্টহেসে
ফেনময় মুক্তকেশে
প্রশান্ত হ্রদের কোলে পড়ে ঝাঁপাইয়া।”

 চারিদিকের শত শত অপরিচিত বৃক্ষশাখা হইতে কত সুন্দর পক্ষী গান করিতেছে, আর পর্ব্বত গাত্রে স্নিগ্ধ-শ্যাম শৈবাল সবুজ মখমলের মত বিস্তৃত আছে; তাহার মধ্যে নানা রঙ্গের ফুল। আমার মনে হইল, আমি বুঝি মৃত্যুর রাজ্য, অশান্তির আলয় পরিত্যাগ করিরা এক অমর শান্তিপূর্ণ রাজ্যে উপস্থিত হইয়াছি। সৌন্দর্য্য-সাগরে প্রাণ ডুবিয়া গেল।

 কিছুক্ষণ পরে আমরা অন্যান্য গহ্বরের সন্ধানে বাহির হইলাম। এখানে যে তিনটি গহ্বরের কথা বলিয়াছি তাহাদের মধ্যে সোজা হইয়া দাঁড়াইতে পারা যায় না, কিন্তু ভিতরে অনেকদূর যাওয়া যায়। সন্ন্যাসীরা সেই সমস্ত জনমানবশূন্য অন্ধকারময়গহ্বরে বসিয়া জপতপ করিয়া থাকেন; মনঃসংযোগের পক্ষে ইহা অপেক্ষা উপযুক্ত স্থান বোধ করি আর নাই। নির্ঝরের জল বেশি হইলে এই সকল গহ্বরে যাইবার সুবিধা থাকে না; কারণ যদিও জল তখন গহ্বরের মধ্যে যায় না কিন্তু সেই সকল গহ্বর হইতে বাহির হইয়া লোকালয়ে আসিতে হইলে নির্ঝরের জল ভাঙ্গিয়া টপকেশ্বর মহাদেবের নিকট উপস্থিত হইতে হয়। সেখানে ধর্মাত্মা শ্রীযুক্ত কালিকৃষ্ণ ঠাকুর মহাশয়ের নির্ম্মিত রাস্তা ধরিয়া উপরে উঠিতে পারা যায়। পূর্ব্বে বর্ষাকালে কেহই টপকেশ্বরে যাইতে পারিত না, কারণ হয়ত দেখা গেল নদীর তেজ বেশ কম, আপাততঃ কোন বিপদের সম্ভাবনা নাই; কিন্তু তখনই হয়ত হঠাৎ পাহাড় হইতে হু হু করিয়া জল নামিয়া আসিল, আর হরত চারি পাঁচ দিন পর্য্যন্ত সেই প্রকার বেগে জল বহিতে লাগিল। তখন সে স্থান হইতে জীবন লইয়া ফিরিয়া আগমন যে ভয়ানক কঠিন ব্যাপার, তাহা সহজেই বুঝিতে পারা যায়। যাহা হউক কালিকৃষ্ণ বাবুর অনুগ্রহে যাতায়াতের সে অসুবিধা দূর হইয়াছে।

 টপকেশ্বর একটী তীর্থস্থান; যাত্রীগণ এক খণ্ড প্রস্তরকে মহাদেব বলিয়া পূজা করে। এ স্থানের নিকটে মানুষের বাস নাই; ইতিপূর্ব্বে যে গুর্‌খাদের কথা বলিয়াছি তাহারা দূরে দূরে বাস করে। এখানে আসিয়া পড়িয়া থাকিলে আহারের জন্য ভাবিতে হয় না; গুর্‌খারা এ সম্বদ্ধে ভারি তৎপর; অতিথিকে অনাহারে রাখিয়া আহার করিতে ইহারা কিছুতেই রাজী নয়। এমন সাহসী ও অতিথিপ্রিয় জাতি বোধ হয় পৃথিবীতে অতি অল্পই আছে। ইংরাজদের দুই রেজিমেণ্ট গুরখা সৈন্য আছে। এই দুই দলে সৈন্যসংখ্যা দুই হাজারের কিছু বেশী। দুই দলই এখানে থাকে; একদল Old Regiment; দ্বিতীয় দল অল্প দিন প্রস্তুত হইয়াছে, তাহার নাম New Regiment (নয়া পল্টন) পার্ব্বত্য প্রদেশে ইংরাজরাজ যত যুদ্ধ করিয়াছেন সর্ব্বত্রই এই দুই দল তাঁহাদের সঙ্গে ছিল; মিসর যুদ্ধেও ইহারা ইংরাজ সৈন্যের সঙ্গে ছিল। সাহস, আতিথেরতা সত্যপ্রিয়তা প্রভৃতি অনেক গুণ থাকিলেও ইহারা অত্যন্ত গোঁয়ার এবং মাতাল। ইহাদের যুদ্ধের অস্ত্র বন্দুক, কিন্তু জাতীয় অস্ত্র ছোট ছোট তরবারি বা খুক্‌রী।

 বেলা শেষ হইল দেখিয়া আমরা আবার সেই সঙ্কীর্ণ চক্র পথ ধরিয়া শ্রান্তদেহে ধীরে ধীরে নামিয়া আসিতে লাগিলাম। সূর্য্যাস্তের পূর্ব্বে পার্ব্বত্য প্রদেশের শোভা কি সুন্দর! যাহারা এ শোভা দেখেন নাই তাঁহাদিগকে বুঝাইয়া দিতে যাওয়া সম্ভব নহে। ঘুরিতে ঘুরিতে যখন পাহাড়ের কোন উচ্চ অংশে উঠি, দেখি সূর্য্যের লোহিত চক্র পাহাড়ের অন্তরাল হইতে উঁকি মারিতেছে, তাহার কণককিরণধারা পশ্চিম আকাশের বহুদূর পর্য্যন্ত স্বর্ণমণ্ডিত করিয়া বৃক্ষপত্রে, পর্ব্বতগাত্রে, শ্যামল শৈবালদলে, পার্ব্বত্যপুষ্পের পাঁপড়ীতে ও বিহঙ্গের সুন্দর পক্ষে প্রতিফলিত হইতেছে। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখীর দল এদিক হইতে ওদিকে উড়িয়া যাইতেছে; তাহাদের বিচিত্র কূজনে, তাহাদের মুক্তপক্ষ স্বাধীন জীবনে আনন্দোচ্ছ্বাস ও গভীর শান্তির ভাব প্রকাশ পাইতেছে। আবার যখন পর্ব্বতের কোন অধিত্যকাস্থ রাস্তায় আসিয়া পড়ি, তখন দেখি, সন্ধ্যা খুব গাঢ় হইয়া আসিয়াছে, ঝিঁঝিরা সংগীত আরম্ভ করিয়া দিয়াছে, আর নির্ঝরের সেই অবিরাম কুলকুল ধ্বনি আরও গম্ভীর হইয়া উঠিয়াছে। পাখীর গান তখন বন্ধ, উন্নতশীর্ষ বৃক্ষগুলির সে জীবন্ত ভাবও অপগত; শুধু অন্ধকার ডালে ডালে পাতায় পাতায় স্তূপাকার হইয়া বিভীষিকার বিস্তার করিতেছে, আর তাহাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্রপথে বহুদূরবর্ত্তী রহস্যময় তারকার স্নিগ্ধচ্ছটা প্রবেশ করিয়া কবিত্বের বিকাশ করিতেছে।