প্রবাস-চিত্র/তিহরী
তিহরী।
আমি এবার পুণ্যসলিলা ভাগীরথীর উৎস দর্শন করিবার জন্য বাহির হইয়াছিলাম। পর্ব্বত প্রদেশে একটা গন্তব্য স্থান স্থির না করিয়া চলা যায় না; যে দিকে চক্ষু যায়, সেই দিকেই চলিব, এরূপ বন্দোবস্ত হইলে, চাই কি জীবনের অবশিষ্ট কয়টি দিন বৃক্ষতলে ও পর্ব্বতগহ্বরেই কাটিয়া যায়। আর অনাহারে ও পরিশ্রমে সে দিন কয়টিও সংক্ষিপ্ত হইয়া আসে। আমার যে তাহাতে বিশেষ ক্ষতিবৃদ্ধি ছিল, এমন নহে। অতৃপ্তি অশান্তি লইয়া আমি হিমালয়ের মহামহিমময় সৌন্দর্য্যসাগরে ডুবিতে পারিতাম না। স্বর্গের সুন্দর মনোমোহন দৃশ্যপট আমার নয়নসমক্ষে নূতন শোভায় উদ্ভাসিত হইয়া আবির্ভূত হইত, আমার অশান্ত প্রেমহীন নীরবদৃষ্টির তাচ্ছিল্য তাহাদিগকে দূরে অপসারিত করিয়া দিত; নন্দনকাননের অপূর্ব্ব শোভা আমার তাপিত বক্ষে প্রেমের সঞ্চার করিত না। এত বিড়ম্বনা এত নিরাশাকে সঙ্গী করিয়া পথ চলিবার কষ্ট বুঝাইবার নহে—ভগবানের নিকট প্রার্থনা করি, কাহাকেও যেন বুঝিতে না হয়।
গঙ্গোত্রী যাইবার সর্ব্বজন পরিচিত পথ একটি, তবে পর্ব্বতবাসিগণ হিমালয়ের বক্ষে আজন্ম প্রতিপালিত, তাহারা নিজেদের জন্য সর্ব্বদাই স্বতন্ত্র পথের বন্দোবস্ত করিয়া লয়। সে পথে আমার ন্যায় অন্নভোজী বাঙ্গালী বীরের কথা দূরে থাকুক, যাঁহারা প্রতিবেলায় সেরভর আটা ও তদুপযুক্ত অন্যান্য দ্রব্যের সদ্ব্যবহার করেন, তাঁহাদেরও চলিবার সাধ্য নাই; সে সকল ‘পাকদাণ্ডী’ দৃঢ়কায় ক্ষুদ্রদেহ পর্ব্বতবাসিগণেরই যাতায়াতের পথ। গঙ্গোত্রীর যাত্রীদল হরিদ্বার হইতে দেরাদূন আইসে, দেরাদূন হইতে বাহির হইয়া শ্বেতকায়গণের বিলাস-কুঞ্জ মুশৌরী ল্যাণ্ডোরের ভিতর দিয়া ‘তিহরী’ রাজ্যে উপস্থিত হয়; সেখান হইতে গঙ্গোত্রীর একই পথ। আমরা অপর পথে তিহরী গিয়াছিলাম; পর্ব্বতপ্রদেশে অনেক দিন বাস করায় আমাদের পথ ঘাট অনেকটা পরিচিত হইয়া গিয়াছিল।
আমার এ ভ্রমণ-বৃত্তান্ত—‘তিহরী’ হইতে আরম্ভ করিতে হইতেছে। যখন লোটা কম্বল সম্বল করিয়া পর্ব্বতের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিলাম, তখন যদি জানিতাম যে, হিমালয়ের কথা লিখিতে হইবে, তাহা হইলে সেই কম্বলের মধ্যে একখানি টেলের ডায়েরি বাঁধিয়া লইতাম। ভবিষ্যৎদৃষ্টির অভাবে মানুষের অনেক ক্ষতি হয়, তাহার এক প্রত্যক্ষ প্রমাণ আমার এই ভ্রমণবৃত্তান্তের আরম্ভ এই তিহরী হইতে।
‘তিহরী’র ভৌগলিক অবস্থানের একটা বিবরণ দিতে হইতেছে; সাধারণতঃ আমাদের স্কুলের ছাত্রেরা যে ভূগোল পাঠ করিয়া থাকে, তাহার মধ্যে ‘তিহরী’ রাজ্যের নাম বড় দেখিতে পাওয়া যায় না। গড়োয়াল রাজ্য দুই ভাগে বিভক্ত; ব্রিটিশ গড়োয়াল ও স্বাধীন গড়োয়াল। স্বাধীন অর্থে নেপাল বা ভূটানের ন্যায় স্বাধীন নহে, ইংরাজের আশ্রয়াধীন রাজা— Protected State। পূর্ব্বে এই রাজাদের রাজধানী শ্রীনগরে ছিল, নেপালের অত্যাচারে তিষ্ঠিতে না পারিয়া বর্ত্তমান রাজার পূর্ব্বপুরুষেরা পলায়ন করিয়া তিহরীতে আগমন করেন। নেপাল যুদ্ধের পরে ইংরাজেরা গড়োয়ালের এক অংশ স্বরাজ্যভুক্ত করেন; বর্ত্তমান শ্রীনগর তাহার রাজধানী। ইংরাজের আফিস আদালত সমস্তই সেখানে। গঙ্গা নদীর এক পারে ইংরেজের সীমানা, অপর পারে তিহরীর রাজার রাজ্য।
তিহরী রাজ্যের সবিশেষ ইতিহাস সংগ্রহ করা আমার ভ্রমণের উদ্দেশ্য হইলে আমি তাহার অনুসন্ধান করিতাম। এমন কি, সে সময়ে তিহরীর ইতিহাস জানিবার সামান্য আগ্রহও আমরে মনে উদিত হয় নাই; সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীর রাজা রাজড়ার খবরের আবশ্যক কি, আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবর, জানিয়া কোনও লাভই নাই। তাই বলিয়া তিহরী রাজ্য সম্বন্ধে আমার যে কোন জ্ঞানই ছিল না, তাহা নহে; কোন বিশেষ কারণে তিহরী রাজ্যের অনেক সংবাদ আমাকে শুনিতে হইয়াছিল।
আমার একজন শ্রদ্ধেয় বন্ধু তিহরী রাজ্যের একটি গোলযোগের সময়ে গোলযোগকারিগণের এক পক্ষের মোক্তার ছিলেন। তাঁহার কল্যাণে আমি পূর্ব্বেই অনেক বিষয় জানিতাম। অন্যের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা, বা যাহার সহিত আমার কোন সাক্ষাৎসম্বন্ধ নাই, এমন গোলযোগের আমূল অনুসন্ধান করিয়া ব্যক্তি বা পরিবারবিশেষের দোষগুণের সমালোচনার আমি পক্ষপাতী নহি। পরের দোষোদ্ঘাটন পূর্ব্বক সেই কথা লইয়া বিশ্রামসময় অতিবাহিত করা সময়ের যথেষ্ট সদ্ব্যবহার বটে! পরনিন্দা পরচর্চ্চা না করিলে আমাদের অনেকেরই দিনটা বৃথা যায় বলিয়া মনে হয়; পরের ঘরের কথা আলোচনা করিয়া আমরা বিশেষ আনন্দ অনুভব করি; কাহারও কোন গুপ্তরহস্যের সন্ধান পাইলে আমরা সহস্রচক্ষু হই; তিহরী-ব্যাপারে আমারও সেই প্রকার হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমার সেই সময়ের উদাস দৃষ্টির সমক্ষে কেহই বড় স্থান পাইতেন না; সুতরাং তিহরী রাজ্যের কথা সবিশেষ আমার স্মরণ নাই।
বর্ত্তমান রাজার স্বর্গীয় পিতা রাজা প্রতাপ সা, ১৯৪৩ সংবতে পরলোকগমন করেন। তিহরী রাজ্যের আয় অতি সামান্য, রাজ্যও ক্ষুদ্র। এখানে ইংরেজ রেসিডেণ্ট প্রভৃতির উৎপাত নাই। রাজা প্রতাপ সা অতিশয় ইংরেজপ্রিয় ছিলেন, তাহার ফলে তিহরী সহরের অবস্থা ফিরিয়া গিয়াছিল। তিহরী সহরের অবস্থানভূমি অতি সুন্দর। যিনি প্রথমে এই স্থানে রাজধানী স্থাপনের সঙ্কল্প করেন, তিনি অন্য যাহাই হউন, কবি না হইয়া যান না। পর্ব্বতের মধ্যে এমন মনোরম স্থান আমি আর দেখি নাই, প্রকৃতি-দেবী এই হিমালয়ের মধ্যে এই ক্ষুদ্র সহরটিকে সযত্নে রক্ষা করিতেছেন। প্রসন্ন-সলিলা গঙ্গানদী এই সহরের এক পার্শ্ব দিয়া প্রবাহিত হইতেছেন, ভিলং নামে আর একটি নদী আসিয়া তিহরীর নীচেই গঙ্গায় পতিত হইয়াছে। নদীদ্বয়ের সঙ্গমস্থলের উপরেই একটি ত্রিভুজের ন্যায় খানিকটা সমতল স্থান;—ত্রিভুজের দুই বাহু দুইটি তরঙ্গিণী; ত্রিভুজের ভূমি এক প্রকাণ্ডকায় দুরারোহ পর্ব্বত,—প্রকৃতির-স্বহস্তনির্ম্মিত পাষাণ প্রাচীর। সহর সুরক্ষিত করিবার জন্য কোন আয়োজনেরই আবশ্যকতা নাই; নদীদ্বয় এমনই খরস্রোতা যে, কাহারও সাধ্য নাই, নদী পার হয়। এই স্থানে রাজধানী। মহারাজ প্রতাপ সা গঙ্গানদীর উপরে একটা টানা সাঁকো প্রস্তুত করিয়াছিলেন, সেই সাঁকো পার হইয়াই মুশৌরী যাইবার পথ। তিহরী প্রবেশের এইটিই প্রকাশ্য পথ; ইহা ব্যতীত আর একটি ক্ষুদ্র পথ আছে, তাহা দ্বারা বৎসরের সকল সময়ে তিহরীতে প্রবেশ করা সহজ নহে। এই পথ শ্রীনগর হইতে বাহির হইয়া পর্ব্বতের পার্শ্ব দিয়া তিহরীতে আসিয়াছে। এ পথের মুখেও প্রকাণ্ড গেট এবং তাহা শাস্ত্রীপাহারায় সুরক্ষিত। কিন্তু সে পথের যে অবস্থা দেখিয়াছিলাম, তাহাতে সন্দেহ হয়, এখন সে পথে লোক চলিতেছে কি না। সন্ধ্যার সময়ে গঙ্গার উপরের সাঁকোর অংশবিশেষ টানিয়া তুলিয়া রাস্তা বন্ধ করা হয়, তখন আর কাহারও সহরে প্রবেশের পথ থাকে না।
রাজা প্রতাপ সা ইংরেজের অনুকরণে হাইকোর্ট স্থাপিত করিয়াছিলেন। ইংরেজী আইনের সহিত দেশীয় প্রথা পদ্ধতি মিশাইয়া রাজ্যশাসনের সুন্দর নিয়ম প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। রাজা ভিলং নদীর পারে একটি উচ্চ পর্ব্বতের উপরে ‘প্রতাপনগর’ নামে গ্রীষ্মাবাস প্রস্তুত করেন। অনেক অর্থ ব্যয় করিয়া কতকগুলি পাহাড়ীকে মুশৌরী প্রভৃতি স্থানে রাখিয়া ইরাজী ব্যাণ্ড শিখাইয়া লইয়া যান; আমি যখন তিহরী গিয়াছিলাম, তখন ইংরাজী ব্যাণ্ড শুনিয়া আমি অবাক্ হইয়া গিয়াছিলাম।
এই প্রকারে সুনিয়মে সুশৃঙ্খলায় রাজ্যশাসন করিয়া মহারাজ প্রতাপ সা পরলোক গমন করেন। তাঁহার তিনটি পুত্র তখন নাবালক। ইংরেজ গবর্মেণ্ট নাবালকের রাজ্যরক্ষার জন্য প্রতিনিধি-সভা (Council of Regency) গঠিত করেন, এবং মৃত রাজার কনিষ্ঠ ভ্রাতা প্রতিনিধি সভার সভাপতি (Regent) নিযুক্ত হন; তাঁহারই হস্তে ষ্টেট রক্ষার ভার প্রদত্ত হয়। এই রাজাভ্রাতার নাম কুমার বিক্রম সা। সচরাচর লোকে তাঁহাকে কুমার সাহেব বলিয়াই সম্বোধন করে।
সম্পত্তিভোগের কি মোহিনী শক্তি! যেখানে সম্পত্তি, যেখানে ক্ষমতা, সেইখানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সেইখানেই গোলযোগ। সামান্য ভূমিখণ্ডে সহস্র সন্ন্যাসীর স্থান হয়, কিন্তু এই বিশাল পৃথিবীতে দুই জন রাজার স্থান কুলায় না। আমরা দরিদ্র,—সম্পত্তি, ধনগৌরবের মহিমা জানি না। এই দেখি, যেখানে অর্থ, সেইখানেই অনর্থ; আর দেখি, যেখানে ক্ষমতা, সেখানেই তাহার অপব্যবহার, সেখানেই প্রতিযোগিতা। বিশ্বনিয়ন্তার এই বিশ্বরাজ্যে এই গোলযোগ আমরা বাঁধাইয়া দিতেছি; রাজপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম্মাধিকরণে বসিয়া নিরপেক্ষ বিচারকগণ প্রতিদিন আমাদের এই সমস্ত সম্পত্তি, ক্ষমতা, জোর জবরদস্তির মীমাংসা করিতেছেন; ধনীর বহু সঞ্চিত অর্থ পুলিশ, উকীল আর ষ্টাম্পবিক্রেতা ভাগ করিয়া লইতেছে; এ দৃশ্যের অভিনয় পুনঃ পুনঃ হইতেছে। মামলা মোকদ্দমার দায়ে বিপুল অর্থশালী ব্যক্তি পথের ভিখারী হইতেছে, তবুও কেহ সাবধান হয় না। তবুও যথাসর্ব্বস্ব উদ্ধারের জন্য যথাসর্ব্বস্ব পণ, আমরা প্রতিদিন দেখিতে পাই।
কুমার সাহেব অভিভাবক হইয়া সমস্ত রাজ্য স্বহস্তে পাইলেন। তাঁহার পরামর্শদাতা হিতৈষী বন্ধু অনেক জুটিয়া গেল। তাঁহার অন্য অনেক গুণ থাকিতে পারে, কিন্তু বুদ্ধিবিষয়ে তিনি বড় ভাই অপেক্ষা অনেক হীন। পরামর্শদাতাদের হস্তে কলের পুতুলের মত তিনি পরিচালিত হইতে লাগিলেন। তাহার ফল এই হইল, রাজ্যমধ্যে বিশৃঙ্খলা, বিচারবিভ্রাট, বা বিচারবিক্রয়। অনেকে অভিভাবকের নাম লইয়া নানাপ্রকার অত্যাচার করিতে লাগিল।
এদিকে রাজঅন্তঃপুরে আর এক পক্ষ ধীরে ধীরে বলসঞ্চয় করিতেছিলেন। মহারাজ প্রতাপ সাহের মৃত্যুর পর বিধবা রাণী সাহেবা অভিভাবকপদপ্রার্থিনী ছিলেন; কিন্তু ইংরেজ গবর্মেণ্ট মৃত রাজার কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিক্রম সাকে অভিভাবক করাই কর্ত্তব্য স্থির করায়, বিধবা রাণী নিরন্ত হইয়াছিলেন; কিন্তু নিশ্চিন্ত ছিলেন না। তাঁহার পক্ষেও অনেকে ছিলেন; অভিভাবকসভার সভ্যগণের মধ্যে দুই একজন রাণীর পক্ষ অবলম্বন করিলেন। গোপনে ষড়যন্ত্র চলিতে লাগিল। অবশেষে রাণী সাহেবা প্রকাশ্যভাবে উত্তরপশ্চিম প্রদেশের ছোটলাটের নিকট আবেদনপত্র প্রেরণ করিলেন। তাহাতে স্পষ্টভাবে কুমারসাহেবের শাসনের উপরে দোষারোপ করিলেন, তিনি বিচার-বিক্রয় করিতেছেন, তাঁহার হস্তে রাজ্য নষ্ট হইতে বসিয়াছে।
নাবালকের নাতার এই আবেদনপত্র ছোটলাট উপেক্ষা করিতে পারিলেন না, উপেক্ষা করা কর্ত্তব্য বোধ করিলেন না। ১৯৪৮ সংবতে, কি তাহার কিছু পূর্ব্বে, বিভাগীয় কমিশনর শ্রীযুক্ত মেজর রস সাহেবের উপর অনুসন্ধানের ভার অর্পিত হইল; সেই সময়ে স্বর্গীয় বাবু রঘুনাথ ভট্টাচার্য রাণীর পক্ষের প্রধান কর্ম্মচারী ছিলেন। রঘুনাথ বাবু প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ও লেখক মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। তীক্ষ্ণবুদ্ধি বাঙ্গালী রঘুনাথ বাবুর যত্নে ও চেষ্টায় রাণীর পক্ষ জয়লাভ করিল। কুমার সাহেব অভিভাবকের পদ হইতে অপসারিত হইলেন, রাণী সাহেবা সেই পদে প্রতিষ্ঠিত হইলেন।
গৃহবিবাদ-বহ্ণি প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। কুমারসাহেবের উপর অত্যাচার আরম্ভ হইল। তিহরীরাজ্য হইতে তাঁহার চিরনির্ব্বাসন দণ্ড হইল। অন্য উপায় না দেখিয়া কুমার সাহেব আর এক জন বুদ্ধিমান বাঙ্গালীর আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। বহু দিন পর্য্যন্ত গাড়োয়ালের এক ক্ষুদ্র রাজ্যে দুই পক্ষের উকীল দুই বাঙ্গালীর উর্ব্বরমস্তিক পরিচালিত হইতে লাগিল; পর্ব্বতবাসী গাড়োয়ালীগণ মসী ও বাক্যুদ্ধ অবাক হইয়া দেখিতে লাগিল। ছোটলাটের আসন টলিল, তিনি সমস্ত অনুসন্ধানের জন্য বহুদূরবর্ত্তী পর্ব্বতবেষ্টিত তিহরী রাজ্যে উপস্থিত হইলেন, কূটবুদ্ধিবলে উভয় পক্ষকেই পরাজিত করিলেন। কুমার সাহেব স্বপদে না হউক, সম্পদে প্রতিষ্ঠিত হইলেন। নাবালক রাজকুমারের গদীপ্রাপ্তির আর অধিক দিন বিলম্ব নাই; এ সময়ে অন্য কোন পরিবর্ত্তন করিয়া লাভ নাই, ইত্যাদি বাক্যে আশ্বস্ত করিয়া, রাণী সাহেবাকেই অল্প দিনের জন্য অভিভাবক স্থির রাখিয়া, ছোটলাট নাইনিতালে প্রস্থান করিলেন। তিহরী রাজ্যের গৃহবিবাদ মিটিয়া গেল। রাজভাণ্ডারে সঞ্চিত প্রভূত ধনরাশি উভয় পক্ষের বিবাদে জলের মত খরচ হইয়া গেল।
এই সমস্ত ব্যাপারের অল্প দিন পরেই আমি তিহরী যাই। কুমার সাহেবের পক্ষীয় বাঙ্গালী বাবুর সহিত আমার বিশেষ পরিচয় আছে; এজন্য অনেকে আমাকে তিহরী যাইতে নিষেধ করিয়াছিলেন। হয় ত আমার উপরে কোন প্রকার অত্যাচার হইতে পারে। কেহ কেহ বলিলেন, আমি হয় ত সহরেই প্রবেশ করিতে পারিব না। কিন্তু আমার ন্যায় লোটাকম্বলধারী ব্যক্তির মনে সে সব জাগে নাই; আর রামের রাজ্য শ্যামের হস্তেই যাউক, আর হরির হস্তেই যাউক, তাহাতে আমার ক্ষতি বৃদ্ধি নাই। সুতরাং আমার উপরে কোন প্রকার অত্যাচার হইবে, তাহা আমি মোটেই বিশ্বাস করিতে পারি নাই।
এই অবস্থায় একদিন অপরাহ্ণসময়ে আমি ও একজন সন্ন্যাসী বন্ধু তিহরীতে প্রবেশ করি। স্বাধীন রাজ্যে এই আমাদের প্রথম পদার্পণ।
গঙ্গোত্রীর পথে তিহরী প্রধান সহর। এক দিন বৈশাখ মাসের সুন্দর অপরাহ্ণে আমি প্রথম এই স্বাধীন রাজ্যে প্রবেশ করি। মুশৌরী হইতে তিহরী প্রবেশের যে পথ, আমরা সে পথ দিয়া আসি নাই; শ্রীনগরের পথে তিহরী প্রবেশ করিয়াছিলাম।
সহরে প্রবেশ করিবার পূর্ব্বেই একটি দ্রব্যে আমাদের দৃষ্টি বিশেষ আকৃষ্ট হইয়াছিল। ব্যাপার তেমন গুরুতর নহে, কিন্তু আমার সঙ্গীর চক্ষে তাহার মূল্য অনেক। বহু দিন পর্ব্বতপথে ভ্রমণ করিয়াছি, অনেক পর্ব্বতগহ্বরে কত বিনিদ্র রজনী অতিবাহিত করিয়াছি, কত নির্ঝরিণীর পূত শীতল বারি করপুটে পান করিয়া তৃষ্ণা দূর করিয়াছি। পাষাণহৃদয় হিমালয়ের হৃদয়ের অন্তস্তলে যে মহাপ্রেমের অনন্ত উৎস লোকলোচনের অদৃশ্য অবস্থায় বাস করিতেছে, তাহারই দুই একটি সামান্য চিহ্ন এই সব নির্ঝর। আমরা অনেক নির্ঝরের জল পান করিয়াছি, কিন্তু এই স্বাধীন হিন্দুরাজ্যে প্রবেশের পূর্ব্বে, পথিপার্শ্বে একটি নির্ঝরের যে জল পান করিয়াছিলাম, তাহা অমৃতধারা; এমন সুমিষ্ট জল আমি কখনও পান করি নাই। তিহরী-রাজ সেই নির্ঝর বাঁধিয়া তাহার মুখের কাছে একটি গোমুখ, পাথরে খেদিত করিয়া বসাইয়া দিয়াছেন। সেই গোমুখ হইতে দিবসরজনী অজস্রধারে ভগবানের করুণাধারা অবিশ্রান্ত পতিত হইতেছে। হিন্দুর রাজধানীর প্রবেশদ্বারে হিন্দুর পরমদেবতা দয়াবতী গাভীর মূর্ত্তি অকাতরে তৃষ্ণাতুর পথিককে জলদান করিতেছে। পতিতপাবনী গঙ্গার ধারা গোমুখের ভিতর দিয়া ধরাধামে অবতীর্ণ হইয়াছেন; এখানে সেই গঙ্গোত্রীর পথে প্রথমেই আমরা তাহার একটা ছোটো খাটো নমুনা দেখিলাম।
সেই নির্ঝরের নিকট হইতে বাহির হইয়া ছোট একটি পর্ব্বত বেষ্টন করিয়াই আমরা সম্মুখে একটি উদ্যানবেষ্টিত প্রকাণ্ড অট্টালিকা দেখিতে পাইলাম। কখনও তিহরীরাজ্যে যাই নাই; সেই বৃহদায়তন অথচ সুদৃশ্য অট্টালিকা, তাহার চারিদিকে সুন্দর উদ্যান ও মধ্যে মধ্যে দীঘিকা দেখিয়া আমরা তাহাকেই রাজবাড়ী মনে করিয়াছিলাম। বাড়ীর বহিরাংশ ইংরাজী ধরণে প্রস্তুত; বাগানও বোধ হয় কোন সাহেবের পছন্দমত নির্ম্মিত হইয়াছিল। ভিতর-বাড়ীর গঠন সেকেলে বড়মানুষের অন্তঃপুরের মত। আমরা দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া এই বাড়ী দেখিতেছি ও তাহার সমালোচনা করিতেছি, এমন সময়ে আমরা যে পথে আসিয়াছিলাম, সেই পথেই আর এক জন পর্ব্বতবাসী আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহারও গন্তব্যস্থান তিহরী; সেখানে রাজদরবারে তাহার কি আবেদন আছে, সেই জন্য সে দূর পর্ব্বতগৃহ হইতে রাজধানীতে আসিয়াছে। সে বলিল, আমরা যে বাড়ীর সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছি, এটি বাগানবাড়ী; রাজকুমারেরা মধ্যে মধ্যে এখানে বেড়াইতে আসেন। সহর এখনও প্রায় এক মাইল দূরে। আমরা আর কখনও তিহরী সহর দেখি নাই, শুনিয়া সে লোকটি আমাদিগকে সঙ্গে লইয়া যাইতে স্বীকার করিল, এবং সেখানে পৌঁছিয়া আমাদের সুবিধা করিয়া দিতে পারিবে, এ ভরসাও যথেষ্ট দিল। বনে জঙ্গলে পর্ব্বতগুহায় কোনও গোল নাই, কোনও অসুবিধা নাই; প্রকৃতিমাতা তাঁহার সুবিশাল গৃহদ্বার সকলের জন্যই সমানভাবে উন্মুক্ত রাখিয়াছেন; ধনী, দরিদ্র, পণ্ডিত, মূর্খ, অসস্কোচে সেই মাতৃক্রোড়ে স্থান পায়; বৃক্ষতলে বা পর্ব্বতগহ্বরে হাত পা ছড়াইয়া বিশ্রাম করা যায়; ভগবানের করুণাধারায় তৃষ্ণা দূর হয়; প্রকৃতির অক্ষয় ভাণ্ডারে প্রতিদিন কত ফল মূল সঞ্চিত হইতেছে, অনায়াসে গ্রহণ কর, কেহ বাধা দিবে না। কিন্তু লোকালয়ে তাহা হইবার যো নাই, প্রতি পদে তোমাকে সাবধান হইতে হইবে; লোকালয়ে সব নিয়ম, সব আদবকায়দা, সামাজিক কৃত্রিমতা; তাহারই মধ্যে তোমাকে চলিতে হইবে, তাহার একটিকেও অবহেলা করিবার শক্তি তোমার নাই, অন্ততঃ থাকা উচিত নহে। লোকালয়ে তুমি সামাজিক জীব, বনে জঙ্গলে তুমি মুক্তপক্ষ অসামাজিক জীব। তাই লোকালয়ে প্রবেশ করিতে সে সময়ে আমাদের মনে একটু সঙ্কোচ ভাবের উদয় হইয়াছিল। পথ ঘাট দেখাইয়া দিবার জন্য, একটা বাসস্থান গোছাইয়া দিবার জন্য এক জন লোক পাইয়া, একটু ভাল বোধ হইল। রাজারাজড়ার দেশ, আর আমরা রুক্ষ্মকেশ, মলিনবসন লোটা-কম্বল-ধারী সন্ন্যাসী; রাজদ্বারে যাইতে কেমন একটা সঙ্কোচের ভাব আমাদের মনে স্বতঃই আসিয়া উপস্থিত হয়।
আগন্তুক পথিকের সহিত নানা বিষয়ে কথোপকথন করিতে করিতে আমরা সহরে প্রবেশ করিলাম। প্রথমেই হাইকোর্টের প্রকাণ্ড বাড়ীর সম্মুখ দিয়া আমরা চলিয়া গেলাম। দ্বিতল বাড়ী, নিম্নতলে হাইকোর্ট বসে, উপরে রাজকুমারেরা থাকেন। রাজকুমার তিনজনই আজমীর কলেজে পড়েন, গ্রীষ্মের অবকাশে এখন বাড়ীতে আছেন; শীঘ্রই কলেজ খুলিবে, এবং তাঁহারাও চলিয়া যাইবেন। কুমারেরা রাজ-অন্তঃপুরে থাকেন না।
সন্ধ্যা প্রায় আগত দেখিরা আমরা তাড়াতাড়ি বাজারের মধ্যে প্রবেশ করিলাম। একটি স্থানে আমাদের সঙ্গী আমাদিগকে একটু অপেক্ষা করিতে বলিয়া একটা ছোট গলির মধ্যে প্রবেশ করিল। আমরা তাহার অপেক্ষায় দাঁড়াইয়া আছি; সে আর ফিরিল না। অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া বিরক্ত হইয়া আমরা সে স্থান ত্যাগ করিলাম। এক দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম, এখানে কোনও দোকানে বাসা মিলিবে না; মুসাফির লোকের বাসের জন্য রাজার নির্ম্মিত অনেকগুলি বাড়ী আছে, সেখানেই সকলকে থাকিতে হয়; থানাদারের নিকট যাইয়া বলিলেই, সে একটা বাড়ীতে থাকিবার বন্দোবস্ত করিয়া দিবে।
এইবার আমাদিগকে থানায় যাইতে হইবে। আমার সঙ্গী এ সমস্ত ব্যাপারে তেমন অগ্রসর নন। বনে জঙ্গলে ধর্ম্মোপদেশ দিতে তিনি খুব তৎপর, কিন্তু এই বৃদ্ধ বয়সে কোথায় থাকিব, কি খাইব, এ সকলের বন্দোবস্ত করিতে তাঁর অনিচ্ছা। ‘যাহা হয় হইবে,’ এই তাঁর ‘মটো’; কিন্তু আমি সে ভাবের হইলে হয় ত সে দিন রাস্তার ধারেই কতক রাত্রি পড়িয়া থাকিতে হইত; শেষে নগররক্ষকগণের রুলের গুঁতা বা সুমিষ্ট সম্ভাষণে আপ্যায়িত হইয়া পলায়নের পথ পাইতাম না। যাহা হউক, সঙ্গী মহাশয়কে একস্থানে বসাইয়া রাখিয়া আমি থানাদারের বাসায় গেলাম। দেখিলাম, আফিসেই তাঁহার বাসা। তিনি অন্তঃপুরে আছেন; কখন বাহিরে আসিবেন জিজ্ঞাসা করায়, “থোড়া সবুর করণে হোগা” জবাব পাইলাম। সবুরে মেওয়া ফলিবে কি না, বুঝিতে পারিলাম না, তবুও বসিয়া থাকিতে হইল। দীর্ঘ আধ ঘণ্টা অন্তঃপুরের পথ পানে চাহিয়াই কাটিয়া গেল; অবশেষে থানাদার মহাশয় দর্শন দিলেন। উচ্চ গদীর উপর তাকিয়া লইয়া যখন তিনি বেশ ভাল করিয়া উপবেশন করিলেন, তখন আমিই সর্ব্বাগ্রে উপস্থিত হইয়া আমার আরজ নিবেদন করিলাম। কোথা হইতে আসিয়াছি, কোথায় যাইব, সঙ্গে কয় জন মানুষ, তাহা লিখিয়া লইয়া নিকটস্থ একজন পেয়াদার উপরে আমাদের ভার দিলেন। আমি যখন বাহির হইয়া আসিব, তখন থানাদার মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, “কয় আদ্মিকা সিধা ভেজ্নে হোগা?” থাকিবার স্থানেরই সুবিধা হইতেছিল না, এখন আবার সিধাও পাঠাইতে চায়। আমি ভদ্রভাবে সিধা গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিলাম। বাজার হইতে দ্রব্যাদি কিনিয়া খাইবার সঙ্গতি আমাদের আছে, তাহাও বলিলাম; এবং পয়সা দিয়া যদি থাকিবার স্থান মিলিত, তাহা হইলে তাঁহাকে বিরক্ত করিতে আসিতাম না, এ কথাও জানাইয়া দিলাম। তিনিও একটু খাটো সুরে বলিলেন যে, রাত্রিও হইয়াছে, এত রাত্রিতে রাজবাড়ী হইতে সিধা বাহির হইবে কি না সন্দেহ, সুতরাং আমরা বাজার হইতেই খাবার সংগ্রহ করিয়া লই। তাঁহাকে ধন্যবাদ দিয়া আমি বাহির হইলাম।
একখানি দ্বিতল টিনের ঘরের উপর আমাদের বাসা হইল। রাত্রের অন্ধকারে রাজপথের দিকের বারন্দায় আসিয়া আমরা বসিলাম; পেয়াদা চলিয়া গেল। ঘরের মধ্যে অন্ধকার, কোথায় কি আছে, ভাল করিয়া দেখিতে পাইলাম না। পেয়াদা মহাশয় যে লণ্ঠনটি আনিয়াছিলেন, তাহা তিনি লইয়া গেলেন। অনেক কষ্টে রাস্তা খুঁজিয়া নীচে নামিলাম। যে দোকানে খাবার কিনিতে যাই, সেই বলে, অপরিচিত বিদেশী লোককে সরকারের বিনা হুকুমে খাবার বেচিতে পারিব না। বিষম জ্বালা, আবার সরকারের হুকুম কোথায় আনিতে যাই? এমন সময়ে দেখি, আমাদের গৃহপ্রদর্শনকারী পেয়াদা মহাশয় সেই পথে যাইতেছেন। তাহাকে সমস্ত খুলিয়া বলায়, সে একজন দোকানদারকে বলিয়া দিল। আমি সেখান হইতে খাবার কিনিয়া ঘরে ফিরিব, এমন সময়ে একজন লোক সেখানে আসিরা জুটিল, এবং আমাদিগকে বিদেশী দেখিয়া, কোথা হইতে আসিতেছি কোথায় যাইব প্রভৃতি খরব লইল। দেরাদুনে থাকি, আমি বাঙ্গালী বাবু, এই কথা শুনিয়া সে জিজ্ঞাসা করিল, “আপ মিয়াজিকো জান্তা?” কোন্ মিয়াজি জিজ্ঞাসা করার সে বলিল, “দেরাদূন্কা বাঙ্গালী বাবু কালীকান্ত সাহেব যো স্কুল বানায়া, উয়ো স্কুলমে মিয়াজি পড়্তা।” বুঝিলাম মিয়াজি অপর কেহ নহেন, বর্ত্তমান রাজকুমারের মাতুল ‘মিয়া জিৎসিং।’ আমাকে স্বীকার করিতে হইল যে, আমি তাঁহাকে জানি; কিন্তু তিনি যে আমার বিশেষ পরিচিত, আমার ছাত্র, তাহা আর ভাঙ্গিলাম না, বলিবার দরকারও ছিল না; চুপচাপ করিয়া চলিয়া যাইবার ইচ্ছা। কিন্তু তাহা হইল না। আমি বাসায় পৌঁছিয়া খাবার রাখিয়া জল আনিতে গিয়াছি, এমন সময়ে সেই লোকটি আসিয়া আমাদের বাসার সন্ধান লইয়া গেল।
ক্ষুধার অত্যাচার যথেষ্ট থাকা সত্ত্বেও আমরা দুই জনে বসিয়া গল্প আরম্ভ করিয়া দিলাম। গল্পের প্রধান বিষয় তিহরীর ইতিহাস; আমি যাহা জানিতাম, সমস্ত বলিতে লাগিলাম, কথায় কথায় আহারে বিলম্ব হইয়া গেল।
রাত্রি প্রায় আটটা, এমন সময়ে তিন চারি জন অশ্বারোহী ও মশাল হস্তে দুই তিন জন বরকন্দাজ আসিয়া আমাদের বাসার সম্মুখে দাঁড়াইল; মশালের আলোকে দেখিলাম, অগ্রবর্ত্তী অশ্বারোহী ‘মিয়া জিৎসিং।’ ছাত্র হইলেও এ অবস্থায় তাঁহাদিগকে অভ্যর্থনা করা আমার কর্ত্তব্য মনে করিয়া, অন্ধকারে পথ অনুসন্ধান করিয়া নীচে যাইতে না যাইতেই তাঁহারা সদলে দর্শন দিলেন, এবং তাঁহাদিগকে সংবাদ না দিয়া আসিয়া এ ভাবে থাকা যে আমার পক্ষে নিতান্তই যুক্তিবহির্ভূত হইয়াছে, অন্য কথার পূর্ব্বে মিয়াজি তাহাই আমাকে বুঝাইতে আরম্ভ করিলেন। অবশ্য, তাঁহার সে অনুযোগের কোনও জবাব আমার তহবিলে ছিল না; আমি সে কথা চাপা দিয়া অন্যান্য কথা পাড়িবার চেষ্টা করিলাম; আগন্তুক অপরিচিত ভদ্রলোক কয়জনকে সাদর সম্ভাষণ করিলাম, এবং আমাদের জীর্ণ ছিন্ন কম্বলাসনে বসিবার জন্য অনুরোধ করিলাম।
তখনই চারিদিকে ধুম পড়িয়া গেল; থাকিবার জন্য ভিন্ন বাড়ীর ব্যবস্থা হইল। কিন্তু আমার সঙ্গী আর সে স্থান ত্যাগ করিয়া ‘পাদমেকং’ যাইতে স্বীকৃত নন; কাজেই সেইখানেই আমাদের শয়নের জন্য চারপাই, বিছানা আসিয়া হাজির হইল। বাজার হইতে আহারের জন্য যে দ্রব্যগুলি আনিয়াছিলাম, চাকরদের পদতলে পড়িয়া তাহাদের মিষ্টান্নজীবন ধূলিকণায় পরিণত হইল!
এতরাত্রে সিধা আনিয়া রান্নাবান্না করিয়া আহার করিতে গেলে সমস্ত রাত্রিই সেই কার্য্যে অতিবাহিত হইবে ভাবিয়া রাজবাড়ী হইতে আর সিধা আসিল না। আজ সন্ন্যাসীর অদৃষ্টে রাজভোগ;—অলঙ্কার ব্যবহার করিতেছি না, সত্য সত্যই রাজভোগ। মনে পড়ে, কিছু দিন পূর্ব্বে এক দিন হিমালয়ের মধ্যে এক স্থানে দুই প্রহরে রুটীর সঙ্গে বনের শাক ভাজা খাইবার বন্দোবস্ত করিতে পারিয়াছিলাম; সেই দিন আমার সঙ্গী পূজনীয় স্বামীজি বলিয়াছিলেন, “আজ আমাদের রাজভোগ।” সেই শাকরুটী বা বনের ফল মূল বা অনেক দিন কেবলমাত্র ঝরণার জল খাইয়াই অতিবাহিত করিরাছি।
প্রত্যূষে বন্দী ও স্তুতিগাঠকগণের গীতধ্বনি এবং নহবতের মনোহর ও শ্রুতিসুখকর প্রভাতী গানে আমাদের নিদ্রাভঙ্গ হইল। শয্যায় শয়ন অবস্থাতেই যথার্থ হিন্দুরাজ্যের প্রভাব বুঝিতে পারিলাম। সংস্কৃত পুস্তকাদিতে প্রভাতে স্তুতিপাঠকদিগের সুমধুর গীতধ্বনিতে রাজা মহারাজগণের নিদ্রাভঙ্গ হইত, পড়িয়াছিলাম; কিন্তু জিনিসটি কি, তাহা আজ বুঝিলাম। ও দিকে নহবতে সুন্দর তানলয়ে বিভাসটোড়ী আলাপ করিতেছে; এদিকে তারস্বরে সুগায়কগণ প্রভাতপবন কম্পিত করিয়া গান করিতেছে! বৈশাখের প্রভাত যেন মহাসৌন্দর্য্যময় বোধ হইল। হিমালয়ের জনশূন্য ক্রোড়ে বৃক্ষতলে অনেক নিশা যাপিত হইয়াছে, প্রভাতে বিহঙ্গের বৈতালিক গানে বৃক্ষপত্রের মৃদুকম্পনে ও বৃক্ষচ্যুত পত্রস্পর্শে অনেক দিন ঘুম ভাঙ্গিয়াছে; সে এক প্রকারের আনন্দ, সে এক রকমেই সুখ; আর এই দ্বিতল প্রকোষ্ঠে সুকোমল শয্যায় নিশাযাপন, প্রভাতে নহবতের বাদ্যে ও বৈতালিকের কণ্ঠধ্বনিতে নিদ্রাভঙ্গ, এ আর এক রকমের আনন্দ। কোনটি উৎকৃষ্ট, আর কোনটি অপকৃষ্ট, তাহার তুলনা আমি এত দিন পরে করিতে পারিতেছি না।
তিহরী রাজ্যের বর্ত্তমান ইতিহাস যাহা পাইয়াছি, তাহা সমস্তই লিখিয়াছি; পূর্ব্বে ইতিহাস সংগ্রহ করিতে যেরূপ উৎসাহ থাকা আবশ্যক, যতখানি অনুসন্ধান করিবার আগ্রহ থাকা কর্ত্তব্য, আমার আপাততঃ তাহা নাই। নেপাল ও গড়োয়াল রাজ্যের কোনও বিস্তৃত ইতিহাস আমি আজ পর্য্যন্তও পাঠ করিতে পাইলাম না। হুইলার সাহেব বা সেই রকমের দুই চারি জন দায়িত্ববোধশূন্য ইতিহাসলেখকের সংগৃহীত বা কল্পিত ইতিহাস পড়িয়া কতকগুলি ভ্রমাত্মক বিবরণ জানিয়া রাখা আমার ভাল বোধ হয় না। এই সমস্ত কারণে আমি তিহরীর পূর্ব্ব ইতিহাস লিখিতে পারিলাম না।
তিহরী সহর দেখিলেই, সেই সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজ গড়োয়াল রাজ্যের বর্ত্তমান প্রধান নগর শ্রীনগরের কথা আমার মনে পড়ে। অনেকদিন পূর্ব্বে এই শ্রীনগরসম্বন্ধে আমি একটি প্রবন্ধ লিখি। এই স্থানে তাহার কিয়দংশ উদ্ধৃত করিয়া দিলেই তিহরীর সঙ্গে শ্রীনগরের কি সম্বন্ধ এবং তিহরীর এই সমস্ত সুরম্য রাজপ্রাসাদ দর্শন করিলে কেন শ্রীনগরের কথা মনে হয়, তাহা বুঝিতে পারা যাইবে।
“অনেক দিন পূর্ব্বে একবার নেপালের রাজা গড়োয়াল রাজ্য আক্রমণ করেন। গড়োয়ালের রাজা যুদ্ধে পরাস্ত হন এবং পর্ব্বতে পলায়ন করেন; এই সময় হইতে গড়োয়াল নেপালের অধিকারভুক্ত হয়। গড়োয়ালরাজ উপায়ান্তর না দেখিয়া ইংরেজের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করিলেন এবং তাঁহাদের সাহায্যে গড়োয়াল স্বাধীন হইল। কিন্তু এই স্বাধীনতা প্রায় অর্দ্ধেক গড়োয়ালের পরিবর্ত্তে ক্রীত হইয়াছিল। যুদ্ধের ব্যয়স্বরূপ গড়োয়ালের অনেকখানি ইংরেজ গ্রহণ করেন—এই অংশের নাম “বৃটীশ-গড়োয়াল”; আর অবশিষ্ট অংশের নাম স্বাধীন গড়ায়াল; তবে নেপাল বা ভোটের মত স্বাধীন নয়। যাঁহারা অনুগ্রহ করিয়া পরের হাত হইতে রাজ্য জয় করিয়া দিলেন—আবশ্যক হইলে যে তাঁহারা তাহা কাড়িয়া লইতেও পারেন, এ কথা বলাই বাহুল্য। তবে এ রকম অবস্থায় যতখানি স্বাধীনতা থাকার সম্ভাবনা, গড়োয়ালের তাহা যথেষ্ট আছে। আর স্বাধীন গড়োয়ালের আর একটু ভরসা এই যে তাহাতে প্রলোভনের এমন কিছুই নাই, যে জন্য এ দেশের দেশীয় পাগ্ড়ীর পরিবর্ত্তে রাতারাতি ইংরেজের টুপি ও ছড়ি আমদানি হইতে পারে; বরং প্রলোভনের যে টুকু ছিল সে টুকু আপদ অনেক আগেই মিটিয়া গিয়াছে; নেপালের কবল হইতে গড়োয়াল উদ্ধার করিয়া ইংরেজ গড়োয়ালের উৎকৃষ্ট অংশটুকুই অধিকার করিয়াছেন—এই বাজে অংশ স্বাধীন গড়োয়ালই তিহরী রাজ্য।
“নেপালরাজ গড়োয়াল আক্রমণ করার পর, গড়োয়ালরাজ রাজ্য ত্যাগ করিয়া পলায়ন করিলে, নেপালীরা অরক্ষিত প্রাসাদ ও সুরম্য রাজপুরী সম্পূর্ণরূপে শ্রীভ্রষ্ট করিয়া ফেলিয়াছিল। পরে ইংরেজের সহায়তায় যখন গড়োয়াল পুনর্বিজিত হইল, তখন গড়োয়ালের রাজা আর শ্রীনগরে ফিরিয়া আসিলেন না; তিনি শ্রীনগর হইতে ৩২ মাইল দূরে উত্তরপশ্চিম কোণে অলকনন্দার অপর পারে তিহরীতে পলায়ন করিয়াছিলেন; সেইখানেই তিনি বাস করিতে লাগিলেন। তিহরী রাজ্য স্থাপন সম্বন্ধে ইহার অধিক আমি জানি না।”
আজ তিহরীতে অবস্থান; সঙ্গী তাহাতে প্রথমে সম্মত ছিলেন না; তিনি এখন লোকালয় অপেক্ষা বন জঙ্গলই বেশী ভাল বাসেন। আমিও যদি তাঁরই মতে মত-দিয়া বলি, বন জঙ্গল লোকালয় অপেক্ষা ভাল, তবে একটা প্রকাণ্ড মিথ্যা কথা বলা হয়। হিমালয়ের মহামহিমময় সৌন্দর্য্য অবশ্যই ভালবাসি; যখন পর্ব্বতের উচ্চতা শৃঙ্গের চিরতুষাররাশির উপর সূর্য্যকিরণ প্রতিফলিত হইয়া অপূর্ব্ব শোভায় দিঙ্মণ্ডল উদ্ভাসিত করে, তখন হৃদয় সে দৃশ্যে পূর্ণ হইয়া যায়, চক্ষু আর সে দিক হইতে ফিরিতে চাহে না; কিন্তু তাহারই পাশে পাশে হৃদরের এক নিভৃত কোণে আমার সেই ক্ষুদ্র গ্রামের ক্ষুদ্রতম বাসভবনের একটা স্নিগ্ধ শ্যামছায়ার সুশীতল দৃশ্য আমাকে যে অন্যদিকে ফিরাইয়া লয়, সে কথা অস্বীকার করি কি করিয়া। এই জীর্ণ কম্বলের মধ্য হইতে যে একটা মমতার গন্ধ ছুটিয়া বাহির হয়, তাহা ঢাকি কি দিয়া? লোকালয়ের উপরে যে একটা আজন্ম টান, তাহা যে আমরণের সঙ্গী, সে কথা গোপন করিবার উপায় কি? তাই লোকালয় দেখিলেই সেখানে দুই দিন বাস করিতে ইচ্ছা করে; ক্ষুদ্র গৃহস্থের গৃহস্থালীর পবিত্র দৃশ্য অপরিতৃপ্ত হৃদয়ে দেখিতে প্রাণ ব্যাকুল হয়। এ অবস্থার তিহরীতে এক দিন বাসের ইচ্ছা হইবে, তাহাতে আর বিচিত্র কি। আমার আগ্রহাতিশয় দর্শনে স্বামীজিও তাহাতেই মত দিলেন; তবে তিনি স্পষ্ট জানাইরা দিলেন সহরের মধ্যে তিনি বাহির হইবেন না, সমস্ত দিনটা এই ঘরের মধ্যেই কাটাইবেন। তিনি তাঁর সেই ব্যাঘ্রচর্ম্মাসনে চাপিয়া বসিলেন, আমি সহর দর্শন করিবার জন্য বাহির হইলাম।
পূর্ব্বদিন এখানে আসিবার সময়েই সহরের সমস্তটা এক রকম দেখা হইয়াছিল; তবুও আজ আবার বাহির হইলাম। প্রথমেই রাজবাড়ীর দিকে গেলাম। সহরের মধ্যে একটা উচ্চস্থানে রাজবাড়ী; সিপাহী সান্ত্রী অনেক দেখিলাম। পাছে অধিক অগ্রসর হইলে দুই চারিটি কৈফিয়ৎ দিতে হয়, এই ভয়ে একটু দূরে দাঁড়াইয়া রাজবাড়ী দেখিতে লাগিলাম। রাজার বাড়ী বলিলে সহজেই মনে যে একটা প্রকাণ্ড ভাবের উদয় হয়, তাহার কিছুই এ বাড়ীতে নাই; এই বাড়ীর সম্মুখে দাঁড়াইয়া এই রাজবংশের পূর্ব্বপুরুষগণের বাসগৃহ শ্রীনগরের ভগ্ন অট্টালিকাস্তূপের কথা মনে হইল। কিছুদিন পূর্ব্বেই শ্রীনগরে গিয়াছিলাম; যাহা দেখিয়াছিলাম, সে এক প্রকাণ্ড ব্যাপার! রাশি রাশি ইট আর পাথর স্তূপাকারে পড়িয়া আছে—দুই চারি বৎসর পরে কোন পর্য্যটক সেখানে গেলে ঐ স্তূপাকার ইট পাথরকে সুশ্যামল শৈবালসজ্জিত দেখিয়া একটা ছোট রকমের গিরিশৃঙ্গ বলিয়া মনে করিবে। সেই নীরস, অনাবৃত পাহাড়ের বুকে ভগ্ন প্রাসাদের বড় বড় দেওয়ালগুলি মুখব্যাদান করিয়া রহিয়াছে—পাথরের প্রকাণ্ড সিংহদ্বার বহুকাল হইতে একই অবস্থায় ঝড় বৃষ্টির সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া দাঁড়াইয়া আছে; আর যাঁদের জন্য তাহারা প্রথমে নির্ম্মিত হইয়াছিল, তাঁহারা আজ এই গিরিদুর্গে আশ্রয় লইয়া দিন কাটাইতেছেন; একবারও হয় ত সে দৃশ্যের কথা, সেই পরিত্যক্ত রাজ-অট্টালিকার কথা তাঁদের মনে হয় না। কিন্তু কত পরিব্রাজক, কত সন্ন্যাসী, সেই ভগ্ন রাজপ্রাসাদের দিকে চাহিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে, এবং কল্পনানেত্রে বহুশতাব্দী পূর্ব্বের একটা
‘কুসুমদামসজ্জিত দীপাবলী তেজে
উজ্জ্বলিত নাট্যশালা’
দৃশ্য দেখিতে থাকে। এই তিহরী রাজভবনের সম্মুখে দাঁড়াইয়া সত্য সত্যই এই রাজবংশের অতীত গৌরবের দৃশ্যে আমার হৃদয় ভরিয়া গেল। ধীরে ধীরে সে স্থান ত্যাগ করিয়া আসিলাম।
অপর দিকে কুমার সাহেবের বাড়ী। তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার কথা কেহ কেহ বলিয়া দিয়াছিলেন; কিন্তু এত দিন বনে জঙ্গলে ঘুরিয়া ঘুরিয়া মেজাজটা কেমন বদ্ হইয়া গিয়াছিল; রাজরাজড়ার দিকে যাইতে কেমন একটা সঙ্কোচের ভাব মনে আসিয়া উপস্থিত হইল; তাই সে দিকে গেলাম না। এক বার মনে হইল, এই দূর পর্ব্বতের মধ্যে আমার স্বদেশবাসী এক জন বাঙ্গালী আছেন, তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া আসি; কিন্তু কেমন বাধ বাধ বোধ হইতে লাগিল। নিকটেই গঙ্গা; গঙ্গার ধারে গিয়া বসিলাম। আমাদের দেশে যেমন গঙ্গায় স্নানের ঘটা, শত শত নরনারী কেহ স্নান করিতেছে, কেহ পূজা করিতেছে, কেহ উচ্চৈঃস্বরে গঙ্গার স্তব গান করিতেছে, এখানে সে দৃশ্য দেখিবার যো নাই। শীতপ্রধান দেশের লোক স্নানকার্য্যটি সংক্ষেপেই শেষ করে; কেহ বা মাসান্তে, কেহ বা দুই দশ দিন অন্তে স্নান করে। স্নানের ঘাটের উপরেই একটা দেবালয়; আমি সেই দেবালয়ের সিঁড়িতেই বসিয়াছিলাম। বিদেশী লোক একাকী বসিয়া আছে দেখিয়া মন্দিরের পূজকমহাশয় আমার নিকটে আসিয়া বসিলেন, এবং নানাপ্রকার কথা কহিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহার বাড়ী সহর হইতে অনেক দূরে; আজ ১৫ বৎসর এই মন্দিরের পৌরোহিত্য কার্য্যে ব্রতী আছেন। স্বর্গীয় মহারাজ প্রতাপ সা তাঁহাকে বিশেষ শ্রদ্ধা করিতেন, এবং তাঁহারই আগ্রহে পুরোহিত মহাশয় তাঁহার নির্জ্জন শৈলকুটীর ও তিন বিঘা জমি ছোট ভাইয়ের হস্তে দিয়া এখানে আসিয়াছেন; কিন্তু সে কাল আর নাই। বৃদ্ধ পুরোহিত মহাশয় একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেন “সো দিন চলা গেয়া!” সেকালের জন্য এই প্রকার আক্ষেপ, কাতারোক্তি, ভারতবর্ষের সর্ব্বত্রই শুনি। তুলনায় সমালাচনা করিতে গেলে অনেকেই সেকালের অনুকূলেই মত প্রকাশ করেন। এমন একশ্রেণীর লোক আছেন, তাঁহারা, যাহা কিছু সেকেলে, যাহা কিছু পুরাতন, সে সকলকেই কেমন একটা অতি শ্রদ্ধা ও প্রীতির চক্ষে দেখেন। যাহা চলিয়া গিয়াছে, যাহা আর ফিরিবে না, তাহার উপর বোধ হয় মানুষের মমতা হয়, এবং তাহার জন্য সেগুলিকে অতি সুন্দর বলিয়া মনে হয়। অতীত কার্য্যের স্মৃতি থাকে, কৃতকর্ম্মের সাফল্যমাত্র নয়নসমক্ষে প্রতিভাত হয়, তবে ঝঞ্ঝাটগুলি ত আর থাকে না; তাই সে এত মনোরম, তাই বর্ত্তমানের সহস্র সুবিধার উপরেও তাহার উচ্চ আসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
পুরোহিত মহাশয় সে কালের অনেক গুণ ব্যাখ্যা করিলেন; তখন পর্ব্বতে সোনা ফলিত, তখন গাভীগণ অকাতরে দুগ্ধদান করিত, মেঘ বারি বর্ষণ করিত; এই কলিযুগের শেষভাগে দেবগণ নিদ্রিত, পৃথিবী পাপে পরিপূর্ণ, দেশের ঘোর দুর্দ্দশা। বিনা বাদ প্রতিবাদে এই সব কথা বহুদিন হইতে শুনিয়া আসিতেছি, কাজেই ইহার মধ্যে আর নূতনত্ব কিছুই দেখিলাম না। স্বাধীনরাজ্য, বাতাসেও সংবাদ বহন করে, এই ভয়েই হয় ত পুরোহিত একটি কথা গোপন করিলেন; নতুবা তিনি যদি বলিতেন যে, স্বর্গীয় রাজা প্রতাপ সার মত রাজা আর নাই, তাঁর সময়ের সহিত তুলনা করিলে বর্ত্তমান সময় হীনপ্রভ হয়, তাহা হইলে সত্য সত্যই সে কথার প্রতিবাদ ছিল না। বিদেশী লোকের সঙ্গে বিনা সঙ্কোচে এ সব কথা বলা ভাল নহে, তাই পুরোহিত মহাশয় অন্য কথা পাড়িলেন। পুরোহিত পণ্ডিতব্রাহ্মণ, দুই চারিটি শাস্ত্রকথা, দশটি অনুষ্টূপচ্ছন্দের সংস্কৃত শ্লোক না আওড়াইলে তাঁর প্রতিপত্তি থাকে কৈ? তাই তিনি শাস্ত্রালোচনার ভূমিকা আরম্ভ করিলেন। শাস্ত্রালোচনা বেশ কথা, কিন্তু তারও সময় অসময় আছে। শনিবারের দিন দেড়টার সময়ে আফিস বন্ধ হইলে কেরাণীগণ যখন উর্দ্ধমুখে ছোটে, তখন দুই পয়সা দিয়া প্রকাণ্ড একখানি সংবাদপত্র কিনিয়া তাহার মধ্যের পাঁচ কলম বোঝাই অনিত্যতার বক্তৃতাপাঠ যেমন অসাময়িক, এই বেলা প্রায় দশটার সময়ে অস্নানে, অনাহারে শাস্ত্রগ্রন্থ খুলিয়া বসাও তেমনি সময়োপযোগী নহে। সুতরাং দুই এক কথায় পুরোহিত মহাশয়কে নিরুত্তর করিয়া আমি বিদায় গ্রহণ করিলাম।
বাসার আসিয়া দেখি, প্রকাণ্ড একটা সিধা আসিয়াছে। দ্রব্য নানাপ্রকার, এবং তাহার পরিমাণও বেশী; আমরা দুইটি মানুষে এক মাসেও তাহা খাইয়া ফুরাইতে পারি না। বুঝিলাম, এ প্রকাণ্ড সিধা রাজগৌরব প্রকাশের জন্য, নতুবা আমাদের মত দুইটি মানুষের দুই বেলার আহারের জন্য এত জিনিসের দরকার হয় না।
তিহরীতে সদাব্রত নাই; সাধু সন্ন্যাসী অতিথি সকলেই প্রতি দিন অপরাহ্ণে রাজবাড়ীতে সিধা পায়, এবং সন্ন্যাসীরা কিছু কিছু গাঁজার পয়সাও পায়। এ ব্যবস্থা মন্দ নহে; তবে শুনিলাম, পুর্ব্বে অতিথিসেবার যে প্রকার বন্দোবস্ত ছিল, এখন তাহা নাই। প্রতিনিধি শাসন প্রণালীতে এ প্রকার হওয়াই সম্ভব; কুমারগণ যখন রাজ্য নিজ হস্তে পাইবেন, তখন আবার সমস্তই পূর্ববৎ হইবে বলিয়া লোকের বিশ্বাস। সে দিন শুনিলাম, বর্ত্তমান রাজপুত্ত্রগণ পিতার ন্যায় দয়ালু এবং ন্যায়পরায়ণ।
অপরাহ্ণে আবার বাহির হইব, এমন সময়ে হাইকোর্টের বাড়ীর নিকট বিগল বাজিয়া উঠিল; ব্যাপার কি জানিবার জন্য, সদর দিকের বারান্দায় আসিয়া দাঁড়াইলাম। দেখি, এক জন অশ্বারোহী বিগল্ বাজাইতে বাজাইতে অগ্রে আসিতেছে, তাহার পশ্চাতে আরও দুই জন অশ্বারোহী; অস্তগামী সূর্য্যকিরণে তাহাদের সুবর্ণখচিত উষ্ণীষ শোভা পাইতেছে; তাহার পশ্চাতে একখানি জুড়িগাড়ী, শেষে আরও কতকগুলি অশ্বারোহী ও পদাতিক। শুনিলাম, প্রতিদিন অপরাহ্ণে রাজকুমারগণ মাতৃচরণে প্রণাম করিতে আগমন করেন, এবং এক ঘণ্টা থাকিয়া আবার ফিরিয়া যান। রাজকুমারেরা আসিতেছেন শুনিয়া, বাজারের লোক সমস্তই রাজপথে কাতার দিয়া দাঁড়াইল, এবং রাজার গাড়ী যখন সম্মুখ দিয়া যাইতে লাগিল, তখন সকলেই “জয় জয় মহারাজা” বলিয়া নতশিরে অভিবাদন করিতে লাগিল। ইহাই এখানকার প্রথা। এ দৃশ্য আমার অতি সুন্দর বোধ হইল। আমিও যথারীতি অভিবাদন করিলাম।
রাজকুমারগণ চলিয়া গেলে, আমি তিহরী জেল দেখিতে গেলাম। এখানকার জেলের বন্দিগণ যথেচ্ছ বাহিরে বেড়াইতে পারে, তবে ভয়ানক অপরাধিগণের সম্বন্ধে ভিন্ন ব্যবস্থা। এই জেলের মধ্যে নরহত্যাকারী নাথু উইলসনকে দেখিলাম। এই ভদ্রলোকের পরিচয় আবশ্যক। আমার মনে পড়ে, কিছু দিন পূর্ব্বে ইণ্ডিয়ান মিরারের সুযোগ্য সম্পাদক মহাশয় এই নাথু উইলসন সম্বন্ধে উক্ত পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লেখেন; সে প্রবন্ধের কোনও কথাই আমার মনে নাই।
পর্ব্বতের মধ্যে দেরাদূন, মশুরী প্রভৃতি সহর বসিলে, উইলসন নামে এক জন সাহেব দেরাদূনে বাস করেন। তিনি প্রথমে কাষ্ঠের কারবার আরম্ভ করেন, শেষে শিকারী রাখিয়া ব্যাঘ্রচর্ম্ম, মৃগচর্ম্ম, পাখীর পালক প্রভৃতির ব্যবসা করিয়া অগাধ ধন সঞ্চয় করেন, এবং সেই জন্যই ঐ দেশে Wilson money একটা প্রবাদবচন হইয়া গিয়াছে। এই উইল্সন সাহেব একটি পাহাড়ী রমণীকে বিবাহ করেন; সেই রমণীর গর্ভে দুইটি পুত্ত্র হয়; এক জনের নাম John কি Henry Wilson, দ্বিতীয় ব্যক্তি নাথু উইল্সন। জোষ্ঠ ভ্রাতার চেহারাও সাহেবের মত, এবং চালচলনও তাই। তিনি বিবি বিবাহ করিয়া দেরাদূনে পৃথক্ বাড়ীতে বাস করেন! নাথু উইলসন অতি দুর্দ্দান্ত প্রকৃতির লোক ছিলেন; অনেক দাঙ্গা হাঙ্গামা প্রভৃতি অপরাধে অভিযুক্ত হন, কিন্তু টাকার জোরেই হউক, বা অন্য কারণেই হউক, মুক্তি পান। অবশেষে কয়েকটি খুন করার অভিযোগে তিহরীতে অভিযুক্ত হন। অনেক চেষ্টা ও অনেক অর্থব্যয়ে প্রাণদণ্ড হয় না, দশ বৎসরের জন্য কারাগারে প্রেরিত হন। লোকটা ১২।১৩ জন লোককে হত্যা করিয়াও অনায়াসে অব্যাহতি পাইল। যে দিন তিহরীর কারাগারে তাহাকে দেখিয়া সত্য সত্যই আমার প্রাণ শিহরিয়া উঠিয়াছিল, সে দিন পশ্চিমদেশবাসী একজন বন্ধুর নিকটে শুনিলাম, নাথু উইলসন কারামুক্ত হইয়া দেরাদূনে আসিয়াছেন; তাঁহার মাতার মৃত্যু হইয়াছে। এখন বিষয়ের উত্তরাধিকার লইয়া দুই ভ্রাতায় মোকদ্দমা আরম্ভ করিয়াছেন।
রাত্রে জিতসিং মিয়া সাক্ষাৎ করিতে আসিলেন। তিনি রাজসরকার হইতে এক পরওয়ানা বাহির করিয়া আনিয়াছেন, এবং এক জন পিয়াদা নিযুক্ত করিয়াছেন। এই পেয়াদা পরওয়ানা লইয়া আমাদের সঙ্গে সঙ্গে যাইবে। তিহরীরাজ্যের মধ্যে আমরা যত দিন থাকিব, সেই পেয়াদা আমাদের সঙ্গে থাকিবে, এবং আমরা যে বেলা যেখানে থাকিব, সেই স্থানের লম্বরদার (আমাদের দেশের তহসিলদার) আমাদের খানাপিনার সরবরাহ করিবে। আমরা কিছুতেই সম্মত হইব না, মিয়াজি কিছুতেই ছাড়িবেন না। তাঁহার স্নেহের আবদার ছাড়াইতে পারিলাম না। তাঁহারা চলিয়া গেলেন। আমরা ষোড়শোপচারে আহারাদি করিয়া রাত্রে নিদ্রা গেলাম। প্রত্যূষে নহবতের সুন্দর টোড়ী আলাপে জাগ্রত হইয়া হিন্দু রাজার রাজধানী ত্যাগ করিলাম।