বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রবাস-চিত্র/নালাপানি

উইকিসংকলন থেকে

নালাপানি।

 ‘নালাপানি’ নামটি শুনিলে সহজেই ইহার অর্থ বুঝিতে পারা যায়। ‘নালা’ অর্থ পয়ঃপ্রণালী, আর ‘পানি’ অর্থ জল; এই দুইটি শব্দ একত্র করিয়া অর্থনিষ্কাশন করিলে খালের জল ছাড়া যে আর কোনও আধ্যাত্মিক অর্থ পাওয়া যায় না, তাহা বোধ করি অধ্যাত্মবাদিগণও অসঙ্কোচে স্বীকার করিবেন! বাস্তবিকও নালাপানির অন্য কোনও অর্থ নাই।

 হিমালয় পর্ব্বতের একটি নিম্ন পাহাড় হইতে এই নির্ঝরটি নির্গত হইয়াছে। এই ঝরণার জল এমন পরিষ্কার ও সুস্বাদু যে, তাহার সহিত কলিকাতার কলের জলেরও তুলনা হইতে পারে না; এতদ্ভিন্ন এ জলের এমন একটি গুণ আছে, যে জন্য দরিদ্র লোক বিশেষ কৃতজ্ঞ না হইলেও, অলস ধনী ও অজীর্ণরোগগ্রস্ত জীবন্মৃত ব্যক্তিগণ স্বর্গের সুধার সহিত এই জলের তুলনা না করিয়া থাকিতে পারে না। এ জল অসম্ভব ক্ষুধাবৃদ্ধি করে; যে দিনান্তে একবারও উদর পরিতৃপ্ত করিবার সম্বল সংগ্রহ করিতে পারে না, তাহার পক্ষে ক্ষুধার বৃদ্ধি কষ্টকর, বরং ক্ষুধা হ্রাস করিবার কোনও উপায় থাকিলে তাহার উপকার হয়। কিন্তু যে সকল ধনিসন্তান পিতৃপিতামহের উপার্জ্জিত অতুল ঐশ্বর্য্যের অধিকারী হইয়া দিবারাত্রি বিলাসসাগরে ডুবিয়া আছেন, এবং প্রতিদিন চর্ব্ব্য চুষ্য লেহ্য পেয়ের দ্বারা উদর পূর্ণ করিয়া বয়স্যগণে পরিবৃত হইয়া তাহাদের মুখে নিজ কথার পুনরুক্তি শুনিতে শুনিতে তাকিয়ার উপর ভর দিয়া অলস মধ্যাহ্ন অতিবাহিত করেন, এবং দিবাবসানে স্ফীতোদরের সুবিস্তীর্ণ পরিধিতে হস্তার্পণ পূর্ব্বক বলেন, “আজ ক্ষিদেটা বড় মন্দা হে!”— নালাপানির জন্য তাঁহাদের সেই ক্ষুধাহীনতা রোগের মহৌষধ; ভিজিট দিয়া ডাক্তার ডাকিবার প্রয়োজন নাই, এক এক গণ্ডুষ তুলিয়া খাইলেই হইল, উদরাগ্নিতে ঘৃতাহুতির ন্যায় তাহা কার্য্যকর হয়, এবং মূহূর্ত্তের মধ্যে সমস্ত খাদ্য জীর্ণ হইয়া যায়; অম্ল রোগেরও এই জল অব্যর্থ ঔষধ।

 যে স্থান হইতে এই ঝরণা বাহির হইয়াছে, সেই পাহাড়ের নামও নালাপানি, এবং গ্রামের নামও নালাপানি হইরাছে। গ্রাম বলিলে পাহাড়ে গ্রামের যাহা অর্থ, তাহাই বুঝিতে হইবে;—সেই আট দশ বিঘা জমীর উপর দশ পনের ঘর অধিবাসী; সংখ্যা খুব বেশী হইলেও পঁচিশ ঘরের অধিক হইবে না; ইহাদের অধিকাংশই নেপালী গুরখা।

 এই নালাপানিতে দুইখানি দোকান আছে; একখানিতে আটা, ডাইল, লবণ, ঘৃত, লঙ্কা প্রভৃতি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিক্রীত হয়, আর একখানিতে সদাশয় ইংরাজ গবর্মেণ্টের সযত্নরক্ষিত, গৌরববাহিনী, বিপুল অর্থ-প্রদায়িনী সুরা বিক্রীত হয়। পর্ব্বতের মধ্যে ২৫।৩০ ঘর গৃহস্থের জন্য পুণ্যসলিলা নালাপানির পার্শ্বেই, সত্যসত্যই যে স্থান হইতে নালাপানির ঝরণা বাহির হইয়াছে, তাহারই গাত্রে মদ্যালয় সংলগ্ন। যে দিন এই সুন্দর স্থানে, এমন পরিষ্কার, সুস্বাদু, সুপেয় নির্ম্মল জলের উৎস-সন্নিকটে এই মদের দোকান দেখিয়াছিলাম, সেই দিন পানদোষনিবারণের জন্য উৎসর্গীকতজীবন, লোলচর্ম্ম, পক্ককেশ, ঋষিপ্রতিম বৃদ্ধ ইভান্স সাহেবের সৌম্য মূর্ত্তি আমার নয়নসমক্ষে উদিত হইয়াছিল। অনেক দিন পরে তাঁহার জলদগম্ভীর কথাগুলির প্রতিধ্বনি যেন শুনিতে লাগিলাম। বহুদূরবর্ত্তী, হিমাচলক্রোড়স্থিত দেরাদুনের মিশন স্কুলের প্রকাণ্ড হল কম্পিত করিয়া বুদ্ধ পরম-উৎসাহ-পূর্ণ হৃদয়ে যে হৃদয়স্পর্শী কথা কয়টি বলিয়াছিলেন, এতদিন পরে আজও যেন তাহা কর্ণে আসিয়া বাজিতেছে; বৃদ্ধ বলিয়াছিলেন, “দারু মৎ পিয়ো, খোদা গঙ্গাজীমে দারু নেহি ঢাল দিয়া, ইয়ে বহুৎ মিঠা পানি ঢাল দিয়া, গঙ্গাজীকো পানি ছোড়কে কাহে দারু পিতে হো।”—হায়, পরদুঃখকাতর আত্মত্যাগী বৃদ্ধ, তুমি যাহাদের এ কথা বুঝাইতে গিয়াছ, তাহারা মনুষ্যত্ববর্জ্জিত বর্ব্বর, নতুবা তোমার এই মধুর উপদেশ তাহাদের হৃদয়ে স্থান পাইল না কেন? এখনও ত দ্বিগুণ উৎসাহে মদ্য বিক্রীত হইতেছে। মানুষ যখন দিক্‌বিদিক্‌জ্ঞানশূন্য হয়, তখন বুঝি দেবতাও তাহাকে রক্ষা করিতে পারেন না। পশুত্বের নিকট দেবশক্তিও ব্যর্থ!

 দেরাদূন হইতে এক মাইল উত্তরপূর্ব্বে নালাপানির পাহাড়। দেরাদুনের মধ্য দিয়া দুইটি ‘নহর’ (পয়ঃপ্রণালী) বহিয়া যাইতেছে। মসুরী পাহাড়ের পাদদেশে রাজপুর নামে একটি স্থান আছে। রাজপুরের একটা প্রকাণ্ড ঝরণাকে বাঁধিয়া রাজপুর হইতে দেরাদুনের রাস্তার পাশ দিয়া একেবারে নগরের মধ্যে আনিয়া ফেলা হইয়াছে। নগরের বাহির হইতেই তাহাকে দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া, এক ভাগ কর্ণপুর নামক স্থান দিয়া ও অন্য ভাগ বাজারের পাশ দিয়া, প্রবাহিত করা হইয়াছে। এই দুইটি নহরের জলেই সহরের সমস্ত কাজ চলে, এতদ্ভিন্ন এই নহরের সঙ্গে প্রত্যেক বাড়ীর যোগ আছে। কিছু পয়সা খরচ করিলে, পয়সার অনুপাতে একঘণ্টা বা অধ ঘণ্টার জন্য, যাহার যতখানি দরকার, বাগানে কি অন্য কোথাও ব্যবহারের জন্য ততখানি জল পাইতে পারে। এই জন্য যথারীতি যোগাইবার জন্য লোক নিযুক্ত আছে, এবং তাহাদের আফিসও আছে, পূর্ব্বে লোকে এই নহরের জলই পান করিত, কিন্তু এ জলের একটি মহৎ দোষ আছে। এই জল পান করিলে লোকের গলা ফুলিয়া যায়, এই জন্য যাহাদের অর্থ আছে, তাহারা লোক জনের দ্বারা দূরস্থ অন্য কোনও ভাল ঝরণা হইতে জল আনাইয়া পান করে। নালাপানির এই জল আবিষ্কৃত হইলে কিছু দিন পর্য্যন্ত নগরের লোক ইহা আনাইয়া লইত, কিন্তু তাহা অপেক্ষাকৃত ব্যয়সাধ্য হওয়াতে সকলে আনাইতে পারিত না; পরে মিউনিসিপালিটী নাটীর নীচে পাইপ বসাইয়া নগরের মধ্যে জল আনিয়াছেন, এবং দেরাদুনের প্রশস্ত Parade groundএর দুই প্রান্তে দুইটি ঘর প্রস্তুত করিয়া তাহাদের গায়ে নল বসাইয়াছেন। সকলে সেই নলের মুখ হইতে বিনা পয়সায় নালাপানির জল লইয়া যায়; নালাপানির জল সম্বন্ধে অধিক কিছু বলিবার নাই।

 কিন্তু এই জল ভিন্ন আরও কতকগুলি কারণে নালাপানি প্রসিদ্ধ। নালাপানিতে এক জন সন্ন্যাসীর একটি সুন্দর আশ্রম আছে; এই সন্ন্যাসী সাধারণ সন্ন্যাসীর দল হইতে কিঞ্চিৎ ভিন্ন প্রকৃতির, ইনি আর্য্যধর্ম্মাবলম্বী। আর্য্য ধর্ম্মের অর্থ—স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর প্রচারিত ধর্ম্ম; উত্তরপশ্চিম প্রদেশ ও পঞ্জাবের অনেক শিক্ষিত লোক এই ধর্ম্মাবলম্বী বটে, কিন্তু সন্ন্যাসী বা সাধুশ্রেণীর মধ্যে যে এই ধর্ম্ম বিস্তৃত হইয়াছে, আমার এরূপ জ্ঞান ছিল না। বিশেষতঃ, নানা কারণে সন্ন্যাসিদিগের উদার মত একটু বিস্ময়-উৎপাদক, তাই এই সন্ন্যাসিবরকে আমার বহুদিন হইতে দেখিবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু এত দিন সে আশা পূর্ণ হয় নাই। শুনিয়াছি, ইনি খুব পণ্ডিত এবং দর্শনশাস্ত্রে সবিশেষ পারদর্শী; ইনি মধ্যে মধ্যে দেরাদুন আর্য্যসমাজের সাপ্তাহিক অধিবেশনে উপস্থিত হন, কিন্তু আমার দুর্ভাগ্যবশতঃ তথাপি তাঁহার দর্শনলাভে সমর্থ হই নাই; কারণ, তিনি কোন্ দিন আসিবেন, তাহার কিছুমাত্র নিশ্চয় থাকিত না।

 সুতরাং সন্ন্যাসীর সহিত আলাপ করিবার ইচ্ছা বিশেষ প্রবল হওয়াতে, এক দিন অপরাহ্ণে আমি আমার জনৈক দীর্ঘকাল প্রবাসী বন্ধুকে সঙ্গে লইয়া নালাপানিদর্শনে যাত্রা করিলাম। নালাপানির পথে একটু অগ্রসর হইলেই একটি শুষ্ক নদী পার হইতে হয়;—এই নদীর নাম রিচপানা। এই নদীর ধারে চুণ প্রস্তুতের আড্ডা; এই নদীর মধ্যে এবং আশে পাশে অনেক ‘চুণা পাথর’ পাওয়া যায়; শীতের সময় ব্যবসায়িগণ সেই সকল পাথর কুড়াইয়া একত্র করে, তাহার পর বড় বড় গর্ত্ত কাটিয়া তাহার মধ্যে স্তরে স্তরে কাঠ ও ঐ পাথর সাজাইয়া রাখে, শেষে তাহাতে আগুণ ধরাইয়া দেয়। সমস্ত পুড়িয়া গেলে, গর্ত্ত হইতে সেগুলি তুলিলে দেখা যায়, পাথরগুলি অতি সুন্দর পরিষ্কার চুণে পরিণত হইয়াছে। এই ‘রিচপানা’ নদী পার হইয়া সামান্য দূরেই স্থানীয় শ্মশানক্ষেত্র। শ্মশানভূমির পার্শ্ব দিয়া আমরা চলিতে লাগিলাম। এ ক্ষেত্রে আমি অনেকবার আসিয়াছি; কত দিন সন্ধ্যার সময় ইহার নীরব গম্ভীর ভাব দেখিয়া স্তম্ভিতহৃদয়ে জীবন ও মৃত্যু সম্বন্ধে কত কথা চিন্তা করিয়াছি। দুই একবার আমার আত্মীয় বন্ধুগণের স্নেহ ও প্রীতির অবলম্বন স্ত্রী ও পুত্ত্র কন্যার অন্তিমকার্য্য শেষ করিতে আসিয়া, ইহকাল ও পরকালের এই সংযোগস্থলে দাঁড়াইয়া, শোকসন্তপ্ত মনে অশ্রু মুছিয়াছি। নিকটেই আমার এক জন পরম আত্মীয়ের প্রিয়তমার সমাধিমন্দির, এই ক্ষুদ্র সমাধিপার্শ্বে বসিয়া কত দিন তাঁহার স্বভাবের পবিত্রতা, তাঁহার আশ্চর্য্য সরলতা, এবং রমণীহৃদয়ের মধুরতার কথা চিন্তা করিয়া, তাঁহার অভাবে হৃদয়ে গভীর বেদনা অনুভব করিয়াছি; বহুদূরবর্ত্তী এই বিদেশে, প্রবাসের গভীর অভাবের মধ্যে কতদিন তাঁহার আদর ও যত্নে মাতার করুণা ও ভগিনীর স্নেহ ফুটিয়া উঠিয়াছিল। আজ তাঁহার ক্ষুদ্র বালকবালিকাগুলি নিরাশ্রয়, তাঁহার হতভাগ্য স্বামীর হৃদয় শোকাকুলিত; এই শোকসন্তপ্ত পরিবারের হৃদয়ভারের কথা ভাবিয়া আমার অসীম দুঃখও ভুলিয়া যাই। যে দিন ‘নালাপানি’ দেখিতে যাই, তাহার পাঁচ সাত দিন পূর্ব্বে আমার এক জন আত্মীয়াকে এই সমাধির নিকটেই দগ্ধ করিয়া গিয়াছি, চিতার অঙ্গার তখন পর্য্যন্ত পড়িয়া আছে দেখিলাম, তাহাতেই তাঁহার ইহজীবনের স্মৃতি বিজড়িত ছিল, সংসারে আর কেহ নাই যে, তাঁহার জন্য এক বিন্দু অশ্রু ত্যাগ করে। একবার চিতার নিকটে নিশঃব্দে দাঁড়াইলাম, পরলোকগত আত্মার জন্য আর একবার, বুঝি এই শেষবার ভগবানের করুণা প্রার্থনা করিলাম। তাহার পর পাহাড়ে উঠিতে লাগিলাম।

 এই স্থান হইতেই পাহাড়ে উঠিতে হয়। পাহাড় খুব উচ্চ নহে; অল্প দূর উঠিয়াই সেই মুদিখানা দোকান, আর উদারপ্রকৃতি খৃষ্টান ইংরাজরাজের সমুন্নত মহিমা-ধ্বজা সেই শৌণ্ডিকালয়। সকল জিনিষ ক্রয়বিক্রয়েরই একটি নির্দ্দিষ্ট সময় আছে, কিন্তু “কোম্পানী বাহাদুরের অনুমতিক্রমে খুচরা আফিং গাঁজা মদ প্রভৃতি বিক্রয় করিতেছি” এই সাইনবোর্ড যুক্ত ছোট দোকানে খরিদদারের সময় অসময় নাই। নিতান্ত যখন দেখিবে খরিদদার নাই, তখনও অন্ততঃ দুই চারি জন উমেদার শিক্ষানবিশী করিতেছে। আজ রবিবার অপরাহ্ণ, গুরখা পল্টনের সিপাহীগণ আজ বিশ্রাম পাইয়াছে, তাই আজ এ দোকান খুব সরগরম দেখা গেল। যখন আমরা সেই দোকানের নিকট উপস্থিত হইলাম, তখন সেখানে খুব হাসি তামাসা চলিতেছিল। বলা বাহুল্য, সুরাদেবীরও উপাসনা চলিতেছিল; পাশেই নালাপানি—আমরা সেই নালাপানির জল অঞ্জলি পুরিয়া পান করিতে লাগিলাম। হতভাগ্যেরা যখন হৃদয়ের শোণিত এবং প্রাণের বিনিময়ে উপার্জ্জিত অর্থে গরল পান করিতেছিল, তখন আমরা ভগবানের করুণাধারা প্রাণ ভরিয়া পান করিতেছিলাম। এমন স্বচ্ছ সুস্বাদু জলধারা—বিধাতার করুণাধারা ভিন্ন তাহাকে আর কিছু বলিয়াই তৃপ্তি হয় না। স্থানের সৌন্দর্য্য, তাহার উপর এমন মধুর গম্ভীর সন্ধ্যাকাল, চতুর্দ্দিকে শ্যামল লতাপল্লব, তাহার মধ্যে এই নির্ঝরিণীর আনন্দোচ্ছাস; সঙ্গী বন্ধুর প্রাণ ভাবে বিভোর হইয়া উঠিল। তিনি আমাকে সেখানে বসিয়াই একটি গান গাহিতে বলিলেন। কি গান গাহিব? এমন স্থানে আসিয়া আর কোন গান কি মনে আসে? প্রাণের আনন্দ ও উচ্ছ্বাস সঙ্গীতে ধ্বনিত লয়। আমাদের হৃদয়ের গভীর আনন্দ ব্যক্ত করিবার উপযোগী সঙ্গীত সহজেই মনে পড়িল। দুই বন্ধুতে সেই নির্ঝরের পাশে দীর্ঘবাহু শালবৃক্ষের মূলদেশে উপবেশন করিয়া মুক্তপ্রাণে গাহিতে লাগিলাম,—

“তাঁহারি আনন্দধারা জগতে যেতেছে বয়ে,
এস সবে নরনারী আপন হৃদয় লয়ে।
সে আনন্দে উপবন, বিকশিত অনুক্ষণ,

সে আনন্দে ধায় নদী আনন্দবারতা কয়ে।
সে পুণ্য নির্ঝরস্রোতে বিশ্ব করিতেছে স্নান,
রাখ সে অমৃতধারা পুরিয়া হৃদয় প্রাণ;
তোমরা এসেছ তীরে, শূন্য কি যাইবে ফিরে,
শেষে কি নয়ননীরে ডুবিবে ভূষিত হ’য়ে।
চিরদিন এ আকাশ নবীন নীলিমাময়,
চিরদিন এ ধরণী যৌবনে ফুটিয়া রয়;
সে আনন্দরসপানে চিরপ্রেম জাগে প্রাণে
দহে না সংসারতাপ সংসার-মাঝারে র’য়ে।”

 গানের শেষে মনে হইল, এই নির্ঝরপার্শ্বে, শৈল-অন্তরালবর্ত্তী এই তরুচ্ছায়ায়, প্রকৃতির এই রমণীয় নিভৃত কুঞ্জে প্রকৃতির কবি পূজনীয় রবীন্দ্রনাথকে বসাইয়া যদি তাঁহার মুখে এই গানটি শুনিতে পাইতাম, তাহা হইলে চতুর্দ্দিকের এই পবিত্র সৌন্দর্য্য আরও সুন্দর বলিয়া বোধ হইত; এই সঙ্গীতশ্রবণে হয় ত তাহার যথার্থ উপভোগ হইত। এবং হৃদয়ের পিপাসাও কথঞ্চিৎ প্রশমিত হইত। চক্ষু দ্বারা সর্ব্বদা সকল সৌন্দর্য্য অনুভব করা যায় না, কিন্তু কর্ণে যদি মধুর ভাষায় সেই সৌন্দর্য্যের মর্ম্ম ধ্বনিত হয়—এবং সঙ্গে সঙ্গে সকল সৌন্দর্য্যের যিনি কারণ, তাঁহার বিকাশ অনুভব করা যায়, তাহা হইলে হৃদয়ের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা অনেকাংশে পরিতৃপ্ত হয়। যখনই যে সুন্দর স্থানে গিয়াছি, কবিবরের রচিত সেই সকল স্থানের রমণীয় দৃশ্যবৎ সুন্দর গান গাহিতে ইচ্ছা হইয়াছে, কিন্তু এ ভাঙ্গা গলায় শূন্য-হৃদয়ে কি তেমন করিয়া গাহিতে পারা যায়?—পারি নাই, তাই সেই দূর প্রবাসে, নির্জ্জন অরণ্য, মেঘমণ্ডিত গিরিশৃঙ্গ, উপলসঙ্কুল খরতোয়া পার্ব্বত্য প্রবাহিণী, প্রকৃতির প্রমোদ উদ্যান, সকল সুন্দর স্থানেই কবিবরের অভাব বড় গভীর ভাবে অনুভব করিয়াছি। আমার পরম পূজনীয় পিতৃস্থানীয় আত্মীয় প্রসিদ্ধ গণিতজ্ঞ পণ্ডিত ও জ্যোতিষী শ্রীযুক্ত কালীমোহন ঘোষ মহাশয়ের মুখে শুনিয়াছি যে, দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর মহাশয় যখন দেরাদুনে বেড়াইতে আসিয়াছিলেন, তখন এক দিন এই সুরম্য স্থান দেখিয়া তিনি এতই আনন্দিত হইয়াছিলেন যে, বলিয়াছিলেন,—“বড়ই ইচ্ছা করে, আমার যারা আপনার জন আছে সকলকে ডেকে এনে এই সুন্দর ছবিখানি দেখাই—এ স্থানটি অতি সুন্দর, অতি সুন্দর!” দেরাদুনে অবস্থানকালে তিনি অনেক সময়ই বলিতেন, “কে যেন কোনও এক সুন্দর দেশ হ’তে এই রমণীয় সহরটা চুরি ক’রে এনে এই পাহাড়ের মধ্যে লুকাইয়া রেখে গেছে।”

 ঝরণা দেখা শেষ হইলে, সন্ন্যাসীর আশ্রম দেখিবার জন্য অত্যন্ত উৎসুক হইলাম। জানিতে পারিলাম, তাহা আরও উপরে। বিলম্ব না করিয়া সেই আঁকাবাঁকা পথ বাহিয়া উপরে উঠিতে লাগিলাম। কিয়ৎক্ষণ পরে সন্ন্যাসীর আশ্রমদ্বারে উপস্থিত হওয়া গেল। আমাদিগকে দেখিবামাত্র সন্ন্যাসী অতি সমাদরে আমাদিগকে তাঁহার আশ্রম প্রাঙ্গণে আহ্বান করিলেন। দেখিলাম, তিনি তিন চারিটি বালককে ব্যাকরণ শিক্ষা দিতেছিলেন। বালক কয়টি শরীর দুলাইয়া তাড়াতাড়ি ব্যাকরণ আবৃত্তি করিতেছিল। আমাদের দেশে পূজার সময় পুরোহিত ঠাকুরেরা যেমন চণ্ডী পাঠ করে, তাহার এক বর্ণ ও বুঝিবার যো নাই, ইহাদের এ আবৃত্তিও তদ্রূপ। আমরা বাহিরে জুতা রাখিয়া আশ্রমপ্রাঙ্গণে প্রবেশ করিলাম। তিন চারিখানি সুন্দর পরিষ্কার ঘর, উঠানটি ঝক্‌ঝক্ করিতেছে। চারিদিকে অনেকগুলি গাছ; ফলভরে বৃক্ষগুলি অবনত, সতেজ পত্রে স্নিগ্ধতা ক্ষরিত হইতেছে। তপোবনপ্রাঙ্গণে একটি বিল্বতরু; একটি রুদ্রাক্ষের গাছ অতি সযত্নে রক্ষিত হইয়াছে। স্থানটি সন্ন্যাসী ও তাঁহার সঙ্গিগণের যত্নে তপোবনের ন্যায় শোভান্বিত হইয়াছে; তাহার স্নিগ্ধ ভাব দেখিলে হৃদয় জুড়াইয়া যায়। সন্ন্যাসী যে কাঠোর প্রকৃতি দার্শনিক নহেন, সেই শুষ্ক যোগসাধনার মধ্যেও কবিহৃদয় বর্ত্তমান, তাহা তাঁহার স্থাননির্ব্বাচনেই স্পষ্ট বুঝিতে পারিলাম। স্থানটি এমন সুন্দর যে, সেখানে দাঁড়াইলে সমস্ত দেরাদুন সহরটি বেশ পরিস্ফূটরূপে দেখা যায়, ঠিক যেন একখানি চিত্রের ন্যায় সুশোভন ও নয়নরঞ্জন। দিবাবসানে এই তপোবনের উন্মুক্ত প্রান্তে দাঁড়াইয়া একবার দেরাদুনের সৌম্য শান্ত শোভা নিরীক্ষণ করিলাম, আলো ও ছায়ার মধুর মিলনে গিরিউপত্যকা-বিরাজিত, হরিৎপত্রবৃক্ষশ্রেণীপরিশোভিত, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অট্টালিকাপূর্ণ দেরাদুন সহর সমস্ত দিনের পরিশ্রমের পরে যেন বিশ্রাম করিতেছে, এবং সান্ধ্যতপনের লোহিত প্রভা তাহার সর্ব্বাঙ্গে প্রতিফলিত হইতেছে; মধ্যাহ্নের অস্ফুট কলরব যেন ধীরে ধীরে চতুর্দ্দিকে ব্যাপ্ত হইয়া গিয়াছে। অনেকক্ষণ ধরিয়া এই শোভা দেখিয়া তপোবনের তরুচ্ছায়ায় প্রত্যাবর্ত্তন করিলাম।

 ধনীর অট্টালিকায় উপস্থিত হইলে তাঁহারা হস্তী অশ্ব গৃহসজ্জা প্রভৃতি দেখাইয়া থাকেন, সঙ্গে সঙ্গে হয় ত তাঁহাদের মনে কিঞ্চিৎ গর্ব্বেরও আবির্ভাব হইয়া থাকে; আমাদের সন্ন্যাসী ঠাকুরের নিকটেও সেই মানব-রীতির ব্যবহারবিষয়ে ব্যতিক্রম লক্ষিত হইল না। তিনি আনন্দপূর্ণহৃদয়ে তাঁহার তপোবনের প্রত্যেক বৃক্ষ আমাদিগকে দেখাইতে লাগিলেন, কোন্ বৃক্ষটি কোন্ বৎসর রোপিত হইয়াছিল, এমন কি, কোন্‌টি কবে ফলবান হইয়াছিল, তাহা পর্য্যন্ত তাঁহার মনে আছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ভগবানের কৃপার কথা বলিতে লাগিলেন, অবশেষে বিগলিতহৃদয়ে বলিলেন, “আরে বাবা! দীনদয়াল কঠিন প্রস্তর্‌সে অমৃতধারা বাহার্ কর দিয়া”—তাঁহার চক্ষুও অশ্রুপূর্ণ হইয়া উঠিল; নিজের হৃদয়ের দিকে চাহিয়া দেখিলাম—তাহা মরুময়, পাষাণের অপেক্ষাও কঠিন! ভগবানের নামে সহজে তাহা গলিতে চাহে না।

 সমস্ত দেখা শেষ হইলে সন্ন্যাসীর সঙ্গে আমরা একটি বাঁধান গাছের তলে আসিয়া বসিলাম। সন্ন্যাসীর কয়েক জন শিষ্যও আসিয়া উপস্থিত হইলেন। আজ পল্টনের ছুটি, কেহ মদের দোকানে বসিয়া সুরাদেবীর সেবা করিতেছে, কেহ বা সপ্তাহান্তে আজ সন্ন্যাসীর কাছে আসিয়া এক সপ্তাহের জন্য প্রাণের ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ সংগ্রহ করিতেছে; পুণ্যকথা শুনিতে শুনিতে এই সকল সিংহবিক্রম উদ্ধত সৈনিকপুরুষের হৃদয়ও মেষের ন্যায় শান্ত ভাব অবলম্বন করে।

 সন্ন্যাসী অনেক শাস্ত্র-কথা বলিলেন; হরিশ্চন্দ্রের কথা, জন্মদুঃখিনী পুণ্যবতী জানকীর পবিত্র কাহিনী, নল দময়ন্তীর দুর্দ্দশার বিবরণ প্রভৃতি পৌরাণিক বৃত্তান্তও বিস্তৃত করিতে লাগিলেন। এই সকল কথা বলিতে বলিতে হয় ত তাঁহার মনে হইয়া ছিল যে, আমরা যখন লেখা-পড়া-জানা লোক, তখন আমাদের এ সকল কথা জানাই খুব সম্ভব, তাই গল্পের শেষে আমাদিগের দিকে চাহিয়া হিন্দীতে বলিলেন, “ইহারা অধিক লেখা-পড়া জানে না, ইহাদিগকে এই সকল পুরাণকথা বলিলে ধর্ম্ম ও নীতি সম্বন্ধে ইহাদের অনেক জ্ঞান হয়, ইহারা অনেক দূর হইতে আসিয়াছে, এবং এই সকল কথা শুনিতে ইহাদের আগ্রহ অত্যন্ত অধিক।”—যাহা হউক, এ সকল কথা সমাপ্ত হইলে তিনি আমাদের নিকট দর্শনের নিগূঢ়তত্ত্বের আলোচনা আরম্ভ করিলেন, এবং “মায়াবাদ”, “দ্বৈতাদ্বৈতবাদ”, “অবতারবাদ”, “জন্মান্তবাদ” প্রভৃতি বিষয় বলিতে লাগিলেন। দেখিলাম, লোকটি বেশ তার্কিক; ইঁহার আর একটি বিশেষত্ব দেখিলাম, ইনি শাস্ত্রকে দূরে রাখিয়া তর্ক করেন। আমাদের দেশের পণ্ডিতেরা প্রথমেই শাস্ত্র চাপিয়া ধরেন, এবং তর্কে পরাস্ত হইলে শাস্ত্রের উপর আপনার অপদস্থ পণ্ডিত্যাভিমান স্তূপাকার করিয়া মুক্তকণ্ঠে যে সকল বাপান্ত ও অভিশাপান্ত প্রয়োগ করেন, তাহা শাস্ত্রের উক্তি বলিয়া অতি অল্প লোকেরই ভ্রম হয়। এই জ্ঞানী সন্ন্যাসীর নিকট সেই সনাতন প্রথার ব্যভিচার দেখিয়া আমার মনে অত্যন্ত বিস্ময়ের উদ্রেক হইয়াছিল, কিন্তু প্রকৃত পণ্ডিত ও মূর্খ গণ্ডিতের পার্থক্য বুঝিয়া বড়ই আনন্দ বোধ হইল। ইনি বেদ অভ্রান্ত বলিয়া বিশ্বাস করেন, আর্য্যধর্ম্মাবলম্বীদিগের ইহাই বিশ্বাস,—সন্ন্যাসী বলিলেন, তর্কক্ষেত্রে যাহা অভ্রান্ত, তাহাকে আনিয়া ফেলিলে স্বাধীন তর্কের পথ সহসাই রুদ্ধ হইয়া যায়, এবং ভ্রম ও সন্দেহের মধ্যে পড়িয়া প্রাণ আকুল হইয়া উঠে, যাহা প্রাণের বস্তু বিশ্বাসের নির্ভর, তর্কের যুদ্ধে তাহাকে বর্ম্মরূপে ব্যবহার করা যুক্তিসঙ্গত নহে, কারণ যদি সেই বর্ম্ম ভেদ করিয়া অস্ত্রের আঘাত লাগে, তবে তাহা অত্যন্ত সাংঘাতিক হইয়া উঠে। ইঁহার মুখেই আমি প্রথমে শুনিলাম, “কেবলং শাস্ত্রমাশ্রিত্য ন কর্ত্তব্যো বিনির্ণয়ঃ। যুক্তিহীনে বিচারে তু ধর্ম্মহানিঃ প্রজায়তে॥” এই শ্লোকটি পরে বোধ হয়, পূজ্যপাদ বঙ্কিম বাবুর প্রাণে বিশেষরূপে বাজিয়াছিল। সে কালের পণ্ডিতশ্রেণীর মধ্যে এরূপ স্বাধীন মতের কথা প্রায় শুনিতে পাওয়া যায় না, তাই বঙ্কিম বাবুর বিরুদ্ধে সেকেলে পণ্ডিতদিগের আক্রোশের বিশেষ পরিচয় পাওয়া যায়। এমন কি, সেই জন্যই বোধ হয় কেহ কেহ তাঁহাকে হিন্দুত্বের সীমা হইতে নির্ব্বাসন করিতেও কুণ্ঠিত নহেন; কিন্তু উল্লিখিত শ্লোকটিও প্রাচীন পণ্ডিতদিগের রচনা; ইহা হইতেই আমরা প্রাচীন পণ্ডিতদিগের উদারতা, যুক্তির প্রতি গভীর ভক্তি এবং কর্ত্তব্যের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা এবং তাঁহাদের আধুনিক চেলাদিগের ভণ্ডামী ও অশ্রদ্ধেয় বাক্যকৌশলের পরিচয় পাই। কিছু দিন পূর্ব্বে ‘সাধনায়’ উক্ত পত্রিকার জনৈক প্রবন্ধের লেখক প্রাচীন শূন্যবাদ সম্বন্ধে কথা প্রসঙ্গে লিখিয়াছিলেন, ইংরাজীতে একটি গল্প আছে, কিল্‌কেনির বিড়ালেরা এমন যুদ্ধ করিত যে, যুদ্ধাবসানে তাহাদের লেজগুলি ভিন্ন আর কিছু অবশিষ্ট থাকিত না। কিন্তু প্রাচীন শূন্যবাদীদিগের তর্কযুদ্ধে লেজ দূরের কথা, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকলই উড়িয়া যাইত। এ কথা প্রাচীন পণ্ডিতদিগের সম্বন্ধে যতখানি না খাটুক, আধুনিক পণ্ডিতদিগের সম্বন্ধে খাটে বটে! আমার এক জন শ্রদ্ধাভাজন বন্ধু অনেক সময়ই বলিয়া থাকেন, “উদরে কিঞ্চিৎ গব্যরস (অর্থাৎ ইংরাজী বিদ্যা) না পড়িলে স্বাধীন যুক্তির দ্বার মুক্ত হয় না।” আমার বর্ত্তমান সন্ন্যাসী ঠাকুর কিন্তু এক জন honourable exception। যাহা হউক, সন্ন্যাসী মহাশয়ের স্বাধীন মত কিরূপ, তাহা জানিবার অভিপ্রায়ে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, দেশ কালপাত্রভেদে আইনের কেমন নজীর গঠিত হয়, সেইরূপ এখন শস্ত্রাদিসম্মত বিধিরও “রদ বদল” করা উচিত কি না? সন্ন্যাসী এই কথা শুনিরা বিশেষ তেজের সহিত বলিয়াছিলেন, “আল্‌বৎ!” অবশেষে কিঞ্চিৎ চিন্তা করিয়া নেন একটু বিষণ্ণভাবে বলিলেন, “আরে বাবা বহুৎ রং বদল হো গেয়া; আভি হিন্দু লোগোঁনে হরওয়াক্ত শাস্ত্রবিরুদ্ধ কার্য্য সমাজমে চালায় লেতেঁ হি।”—তাঁহার কথার ভাবে এই বুঝিলাম, রদ বদল চাই, তবে এখন যেরূপ ভাবে তাহা হইতেছে, সেরূপ প্রার্থনীয় নহে।

 প্রায় সন্ধ্যা হইয়া আসিল দেখিয়া আমরা সন্ন্যাসীর নিকট বিদায় লইয়া উঠিলাম। সন্ন্যাসী আমাকে দুই তিনটা অপক্ক রুদ্রাক্ষ আনিয়া দিলেন, এবং বন্ধুকে একটি সুপক্ক বৃহৎ “পেঁপে” উপহার দান করিলেন। আমরা তাঁহাকে প্রণাম করিয়া, সেই পুণ্য তপোবন পরিত্যাগ পূর্ব্বক লোকালয়ের দিকে অগ্রসর হইলাম।

 পথে আসিতে আসিতে সঙ্গী বন্ধুকে বলিলাম, দেরাদুনের চতুষ্পার্শ্বে যাহা দেখিবার, তাহা সমস্তই দেখা শেষ হইল, বোধ হয়, আর কিছু দেখিতে বাকি থাকিল না; বন্ধু আমার গর্ব্ব চূর্ণ করিবার নিমিত্ত অল্প হাসিয়া বলিলেন, তিনি আমাদের বাসস্থানের অতি নিকটেই এমন কিছু দর্শনযোগ্য বস্তু দেখাইতে পারেন, যাহা আমি সে প্রদেশে দেখিবার আশা করি নাই। আমি আকাশ পাতাল ভাবিয়া সেরূপ কোনও বস্তুর আবির্ভাব কল্পনা করিতে পারিলাম না, তখন তিনি সেই দিনই সেই আকাঙ্ক্ষিত বস্তু দেখাইবার জন্য প্রস্তুত হইলেন।

 আর অধিক বেলা নাই দেখিয়া আমরা তাড়াতাড়ি চলিতে লাগিলাম। শীঘ্রই পূর্ব্বকথিত শ্মশানের নিকট উপস্থিত হইলাম। সেখান হইতে সম্মুখ দিকে আসিলেই আমরা বাসায় যাইতে পারি; কিন্তু সে দিকে না আসিয়া বন্ধুটি আমাকে দক্ষিণ পাশের একটি জঙ্গলময় পথে লইয়া চলিলেন। কিছু দূর জঙ্গল ভাঙ্গিয়া আমরা “রিচপানা” নদীর তীরে আসিয়া পড়িলাম। সেখান হইতে একটু নীচে নদীর অপর পারে সহর দেখা যাইতেছে, যেন প্রতি মুহূর্ত্তে অন্ধকারের শান্তিময় ক্রোড়ে দেরাদুন ঢাকিয়া যাইতেছে। নদীতীরে আরও কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া দেখিলাম, একটি ক্ষুদ্র বনের আড়ালে অল্পপরিসর একটু স্থান লৌহ রেলিংএ পরিবেষ্টিত; তাহার মধ্যে দুইটি প্রস্তরনির্ম্মিত চতুষ্কোণ ক্ষুদ্র স্তম্ভ বিরাজিত। না জানি কোন মহাত্মার নশ্বর দেহের ধ্বংসাবশেষ এই রমণীয় নির্জ্জন প্রদেশে জীবনের অবসানে পরম শান্তি উপভোগ করিতেছে? কৌতূহলপূর্ণ হৃদয়ে ক্ষুদ্র লৌহকবাট ঠেলিয়া অভ্যন্তরে প্রবেশ করিলাম; তখন সন্ধ্যা বেশ গাঢ় হইয়া আসিয়াছিল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে স্তম্ভের গাত্রের দিকে চাহিলাম; দেখিলাম, স্তম্ভদ্বয়ের গাত্রে পূর্ব্ব ও পশ্চিম দিকে সুস্পষ্ট ইংরেজী অক্ষরে কি লেখা আছে। অন্ধকার হইয়াছিল, তথাপি বিশেষ যত্ন করিয়া লেখাগুলি পড়িয়া দেখিলাম; দক্ষিণ দিকের স্তম্ভের পশ্চিম পার্শ্বে লিখিত আছে;

To the Memory of

Major General Sir ROBERT ROLLO GILLISPIE

K. C. B.

Lieutenant O’HARA, 6th N. J.
Lieutenant GOSLING, LIGHT BATTALION
Ensign FOTHERGILL., 17th N. J.

Ensign ELLIS, Pioneers.
Killed on the 31st. October 1814,
Captain CAMPBELL, 6th N. j, Lieut. LUXFORD,
Horse Artillery,
Lieutenant HARRINGTON, H. M. 53 Regt.
Lieutenant CUNNINGHAM, 13th N. J.
Killed on the 27th November,
And of the non-commissioned officers and men
Who fell at the Assault.

 কোন্ কোন্ সৈন্যদল যুদ্ধ করিয়াছিল, এই স্তম্ভের পূর্ব্ব পার্শ্বে তাহাদিগের তালিকা আছে; তাহা উদ্ধৃত করা বাহুল্য।

 দ্বিতীয় স্তম্ভের পূর্ব্ব পার্শ্বে এইরূপ লিখিত আছে;—

This is inscribed
As a tribute of Respect for our adversary
BULBUDDER
Commander of the Fort
And his Brave Gurkhas
Who were afterwards
While in the Service of RANJIT SING
Shot down in their Ranks to the last man.
By Afgan Artillery.

 পশ্চিম পার্শ্বে;—

On the highest point
Of the hill above this Tomb

Stood the Fort of Kalunga;
After two assaults
On the 31st October and 27th November,
It was captured by the British troops
On the 30th. November 1814,
And Completely razed to the Ground.

 সমস্ত পাঠ করিয়া আমি অবাক্। এই শান্তিপূর্ণ বিজন প্রদেশে, এই স্নিগ্ধ সন্ধ্যাকালে, আমার মানস নয়নে একটি শোচনীয় ঐতিহাসিক দৃশ্য উন্মুক্ত হইল; শত শত বীরের হৃদয়শোণিতের কর্দ্দমিত কোলাহলপূর্ণ সংগ্রামক্ষেত্রে আমি দণ্ডায়মান! বর্ত্তমান শতাব্দীর প্রারম্ভে এই স্থানে অস্ত্রে অস্ত্রে ঝঞ্জনা বাজিয়া উঠিয়াছিল, বজ্রানল বক্ষে ধারণ করিয়া মৃত্যুস্রোতে প্রবাহিত হইয়াছিল!—আজ সমস্ত নীরব, শুধু এই দুইটির স্তম্ভ এবং কয়েকটি অক্ষর নীরব ভাষায় আগন্তুক পথিকের নিকট সেই ধ্বংসকাহিনী ঘোষণা করিতেছে। ভয়ে ও বিস্ময়ে সে স্থান পরিত্যাগ করিলাম।

 বিদ্যালয়ে যে ইতিহাস অধ্যয়ন করিয়াছি, তাহাতে এই ঘটনা সম্বন্ধে এক বর্ণ পড়িয়াছি বলিয়া মনে হইল না; Talboys Wheeler সাহেব তাঁহার ইতিহাসে অনেক কথা লিখিয়াছেন,—এ যুদ্ধ ব্যাপার সম্বন্ধে তিনিও বিশেষ কিছু উল্লেখ করেন নাই; শ্রদ্ধাভাজন শ্রীযুক্ত রমেশচন্দ্র দত্তের বিদ্যালয়পাঠ্য ভারত-ইতিহাসে কলুঙ্গার নামমাত্র উল্লেখ অছে। কিন্তু এই কলুঙ্গার যুদ্ধক্ষেত্র পরাক্রান্ত গুর্খা সৈন্যের অসাধারণ সাহস, অবিচলিত বীরত্ব এবং গভীর কর্ত্তব্যের বিকাশস্থল; হল্‌দীঘাট ও থর্ম্মাপলীর ন্যায় বীরত্বের ইহাও এক মহাতীর্থ, কিন্তু ইতিহাস এখানে মুক!