বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রবাস-চিত্র/প্রবাস-যাত্রা

উইকিসংকলন থেকে

প্রবাস-চিত্র।

প্রবাস-যাত্রা

বঙ্গদেশ পরিত্যাগপূর্ব্বক আমাকে যে দেশান্তরে যাইতে হইবে, এ চিন্তা কখনও আমার মনে স্থান পায় নাই, এবং অন্য কেহ কখনও বিশ্বাস করিতে পারে নাই যে, আমার ন্যায় অলস, শান্তিপ্রিয় একটা লোক দুর্গম হিমালয়ের বড় বড় ‘চড়াই’ ও ‘উৎরাই’ পার হইয়া পদব্রজে সাধুসন্ন্যাসিগণের সঙ্গে ঘুরিয়া বেড়াইবে। কিন্তু অদৃষ্টের লেখা কে খণ্ডন করিতে পারে? দেশত্যাগ করিয়া আমাকে বহু দূর ঘুরিতে হইয়াছিল। চাকরীর উদ্দেশে নয়, শান্তির অন্বেষণে! শোকসন্তপ্ত, অধীর চিত্তকে সংযত করিবার জন্য জন্মভূমি ছাড়িয়া এক অনির্দিষ্ট দেশে যাত্রা করিলাম।

  প্রথমে যে দিন হাবড়া ষ্টেশনে গাড়ীতে উঠিলাম,—সে অনেক দিনের কথা, কিন্তু এখনও সে কথা বেশ মনে আছে; দুঃখের দিনের কথা বড় মনে থাকে। সব চেয়ে আমার মনে এই ভাবটি বেশী জাগিতেছিল যে, বাঙ্গালা দেশে আর কখনও ফিরিব না, এবং যাঁহারা আমার আপনার, তাঁহাদের স্নেহপূর্ণ মুখ আর একবার দেখিবার সম্ভাবনাও বিলুপ্ত হইয়াছে। আমার একটি বন্ধু আমাকে বিদায় দিবার জন্য ষ্টেশনে আসিয়াছিলেন। তাঁহার মুখখানি ভার; গাড়ী ছাড়িবার শেষ ঘণ্টা পড়িলে, তিনি গাড়ীর দরজা দিয়া দুই হাত বাড়াইয়া আমার হাত দুখানি চাপিয়া ধরিলেন; তখন অধিক কথা কহিবার অবকাশ ছিল না, এবং কথা কহিয়া মনের কথা দূর করা তখনকার পক্ষে অসম্ভব। গাড়ী ছাড়িয়া দিল; বন্ধুর দিকে শেষবার চাহিলাম, তাঁহার চক্ষু জলে পুরিয়া উঠিয়াছিল, আমার চক্ষুও বোধ করি শুষ্ক ছিল না;—একবার মনে হইল কোন্ অনির্দিষ্ট পথে, কোন্ দূর দেশে শান্তির কুহকে কেন ছুটিয়া চলিয়াছি; আর যাইব না, নামিয়া পড়ি। তখনই মনে হইল— সকলই মায়া, জীবন বিড়ম্বনাময়,—যদি বন্ধন ছিঁড়িয়াছি, তবে, আর কেন?—তখন মনে হইয়াছিল, বন্ধন ছেঁড়া বড়ই সহজ।

 অনেক দূরের টিকিট লইয়াছিলাম। গাড়ী ছাড়িয়া দিলে গাড়ীতে বসিয়া আমি সেই সুদূরবর্তী পশ্চিম দেশের পর্ব্বতবেষ্টিত নির্জ্জন গ্রামের চিত্র কল্পনা করিতেছিলাম। নানা দেশের যাত্রীতে গাড়ীখানি পূর্ণ; কিন্তু সেই সমাগত মনুষ্যমণ্ডলীর মধ্যে আমি একাকী; আড্ডায় আড্ডায় গাড়ী থামে, লোক উঠে এবং নামে; কিন্তু কেহই আমাকে জিজ্ঞাসা করে না,—“বাপু, তুমি কোথায় যাইবে?” আমারও কাহাকেও কোনও কথা জিজ্ঞাসা করিবার ছিল না। শুধু চিন্তা ভাল লাগে না; এক এক বার একটু আলাপ করিতে ইচ্ছা হইতেছিল, কিন্তু সেই জনকোলাহলের মধ্যে একখানিও পরিচিত মুখ দেখিতে পাইলাম না। অপরিচিত লোকের সঙ্গে আলাপ করিবার উৎসাহও ছিল না।

 এই সময় কর্ড লাইনে মধুপুরের কাছে একটা পুল ভাঙ্গিয়া পথ খারাপ হইয়াছিল, ডাকগাড়ী ছাড়া অন্য কোনও গাড়ী সে পথে চলিত না। ডাকগাড়ী ভগ্ন সেতুর এ পারে আসিয়া থামিত; ডাক পার হইলে আবার অপর পার হইতে দ্বিতীয় গাড়ী ছাড়া হইত। আমি মিক্সড্ ট্রেণের আরোহী, আমাদের গাড়ী কানুজংশন হইতে দক্ষিণ পথ অবলম্বন করিল। বামে বা দক্ষিণে কোন দিকেই আমার কিছু আপত্তি ছিল না, এবং এক দিনের স্থানে দুই চারি দিন লাগিলেও আমি নিশ্চিন্ত; কোনও রকমে দিনপাত করা ছাড়া তখন আমার জীবনের অন্য উদ্দেশ্য ছিল না।

 গাড়ী যতই অগ্রসর হইতে লাগিল, লোকজনের ভিড় ততই বাড়িয়া উঠিল। সঙ্গে সঙ্গে কথা, গল্প, হাস্য পরিহাস গণ্ডগোল—সে সকলের আর ইয়ত্তা রহিল না। একজন তাঁহার ভ্রাতার সঙ্গে পৃথক হওয়ার গল্প বলিতেছিলেন; শুনিলাম, তাঁহার সহোদর কিঞ্চিৎ অতিরিক্ত পরিমাণে স্ত্রৈণ, এবং তাহাই তাঁহাদের এই পারিবারিক বিপত্তির কারণ। আর এক জন লোক তাহার অংশীদারকে কিরূপে ফাঁকি দিবে, একজন সুহৃদের সঙ্গে সেই সম্বন্ধে বড়যন্ত্র আঁটিতেছিল। একজন বেঞ্চে হেলান দিয়া গান গাহিতেছিল, হঠাৎ অর্দ্ধপথে গান ছাড়িয়া পার্শ্ববর্ত্তী আর এক জনকে জিজ্ঞাসা করিল, “মহাশয়! কল্কেটা একবার দেবেন?” নিকটে আর একটি তাম্রকূটপায়ী কল্কেটাতে একটা দম দিবার জন্য অনেকক্ষণ হইতে উমেদার ছিল; সে তাহার অধিকারহানির সম্ভাবনা দেখিয়া একটু রাগিয়া চোখ গরম করিয়া উঠিল; কিন্তু পূর্ব্বোক্ত গায়কবর তাহাতে ভ্রূক্ষেপমাত্র না করিয়া দুইটী উৎকট দমে কলিকাসঞ্চিত তামাকটুকু নিঃশেষ করিয়া সেই গরম লোকটার হাতে দিল, এবং পূর্ব্ববৎ গাহিতে লাগিল,—

“ঘোরা তিমিরা রজনী, সজনি,
না জানি কোথায় শ্যাম গুণমণি,
পৃষ্ঠে দুলিছে লম্বিত বেণী।”—ইত্যাদি।

 পৃষ্ঠে লম্বিত বেণী দুলার কথা মিথ্যা, তবে মস্তকে একটা অনতিদীর্ঘ শিখা দুলিতেছিল বটে, এবং গায়কবর শ্যামদরশনের জন্য কিরূপ কাতর হইয়াছিলেন, শুধু গান শুনিয়া তাহা ঠাহর করা যায় না; কিন্তু সেটি যে, ‘ঘোরা তিমিরা রজনী,’ তাহাতে আর সন্দেহ ছিল না,। গ্রীষ্মকাল, কৃষ্ণপক্ষের একাদশী কি দ্বাদশী, এবং তখন রাত্রি ১২ টা; আকাশে অল্প মেঘ করিয়াছিল, সুতরাং ভাল করিয়া নক্ষত্র দেখা যাইতেছিল না, শুধু স্তব্ধ প্রান্তরের বক্ষ ভেদ করিয়া আমাদের গাড়ী উর্দ্ধশ্বাসে ছুটিতেছিল।

 একটু ঘুম আসিল। ঘুমের বেশী অপরাধ ছিল না। নেই বেলা ১১টার সময় গাড়ীতে চড়িয়াছি, রাত্রি ১২টা পর্য্যন্ত সমভাবে বসিয়া লোকের নামা উঠা দেখিতেছি, আর কোলাহল শুনিতেছি; আহারও নাই, নিদ্রাও নাই। এতক্ষণে নিদ্রাকর্ষণ হওয়াতে যাত্রীদের গাঁটরীগুলো একটু সরাইয়া জড়সড় ভাবে শুইয়া পড়িলাম। রাত্রি প্রায় দুইটা কি দেড়টার সময়ে, নাম মনে নাই, এমন একটা ষ্টেশনে মাথার কাছে খট্ খট্ শব্দ হওয়াতে ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল; মাথা তুলিয়া দেখি আমার কামরার দ্বার ধরিয়া একটা লোক টানাটানি করিতেছে। কামরাটী এখন নিস্তব্ধ; যে ভদ্রলোকটী শামদরশনের আশায় হতাশ হইয়া বেহাগ গাহিয়া বিরহজ্বালা মিটাইতেছিলেন, দেখিলাম, আর একটা বেঞ্চে তাঁর মুণ্ডুটা লুটাইতেছে। যুদ্ধশেষে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত বীরের ন্যায় যাত্রিদল গাড়ীতে নানারকম ভঙ্গী করিয়া শুইয়া পড়িয়াছে। থার্ডক্লাসের গাড়ী, আলো বেশী নাই; এক কোণে উপরে একটা লণ্ঠন টিপটিপ করিয়া জ্বলিতেছিল, তাহাতে সমস্ত গাড়ী আলোকিত হয় নাই।

 গাড়ীর দরজায় চাবি দেওয়া ছিল; কিন্তু যে দরজা ধরিয়া টানাটানি করিতেছিল, সে এক জন পশ্চিমদেশীয় ব্যক্তি। কিছুতে গাড়ী খুলিতে না পারায় সোর গোল করাতে এক জন পুলিসম্যান আসিয়া গাড়ীর দরজাটা খুলিয়া দিল। উঠিয়া বসিলাম, বাতায়নপথে চাহিয়া দেখিলান, ষ্টেশনটা অতি ছোট; আমাদের গাড়ী ষ্টেশন হইতে অনেক দূরে প্ল্যাটফরমের এক প্রান্তে আসিয়া লাগিয়াছে।

 দ্বার খোলা হইলে দেখিলাম, সেই লোকটী একটী যুবতীকে গাড়ীর মধ্যে তুলিয়া নিয়া তাহাকে একটু বসিবার যায়গা দিবার জন্য সবিনয়ে আমাকে অনুরোধ করিল। একটি ছোট ছেলে কোলে হইয়া যুবতী গাড়ীর মধ্যে আসিয়া বসিলে, সেই লোকটি তাহার লটবহর আনিবার জন্য স্টেশনের দিকে ছুটিয়া গেল; ছোট ষ্টেশন, গাড়ী বোধ হয় এখানে দুই এক মিনিটের বেশী থামিবার নিয়ম নাই; সুতরাং তাহার অপেক্ষা না করিয়াই গাড়ী ছাড়িয়া দিল। দেখিলাম, গাড়ী ছাড়িবামাত্র সে লোকটি আমাদের গাড়ীর দিকে দৌড়িয়া আসিতেছে, কিন্তু পাঁচ সাত হাত না আসিতেই ষ্টেশনের লোকেরা তাহাকে আটকাইয়া ফেলিল। বেচারা যদি এ দিকে দৌড়িয়া না আসিয়া নিকটে কোনও একটা গাড়ীতে উঠিয়া পড়িত, তাহা হইলে তাহার কোনও অসুবিধাই হইত না, পরের ষ্টেশনে নামিয়া অনায়াসেই আমাদের গাড়ীতে আসিতে পারিত। কিন্তু বিপদকালে অনেক বুদ্ধিমানের বুদ্ধি লোপ পায়; একজন নিরক্ষর হিন্দুস্থানী যে, এই বিপদে হতভম্ব হইয়া পড়িবে, তাহার আর আশ্চর্য্য কি?

 এদিকে গাড়ী ছাড়িল দেখিয়া স্ত্রীলোকটি সেই শিশুপুত্রকে কোলে লইয়া গাড়ী হইতে লাফাইয়া পড়িবার ইচ্ছায় তাড়াতাড়ি দ্বার খুলিয়া ফেলিল। গাড়ীর মধ্যে আর সকলেই নিদ্রিত। এখন আমার কি করা উচিত, তাহা ঠিক করিতে পারিলাম না। গৃহস্থের মেয়ে, হঠাৎ তাহার হাত ধরিয়া ফিরানও আমার পক্ষে কর্ত্তব্য নহে; অথচ আমি হিন্দুস্থানীভাষার যে রকম সুপণ্ডিত, তাহাতে লাফাইয়া পড়িলে তাহার কিরূপ বিপদের সম্ভাবনা, তাহা বুঝাইয়া তাহাকে নিরস্ত করাও আমার সাধ্যায়ত্ত নহে; সুতরাং অগত্যা “কুচ ভয় নেহি,” “নেহি নামো” ইত্যাদি দুই চারিটা স্বরচিত হিন্দুস্থানী কথায় তাহাকে নিবৃত্ত করিবার চেষ্টা করিলাম, সঙ্গে সঙ্গে গাড়ীর দরজাটা সজোরে ধরিয়া রহিলাম। স্ত্রীলোকটি উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিতে লাগিল। আমাদের ও আমাদের পাশের কামরার দুই চারি জন হিন্দুস্থানী ঘুমাইতেছিল, স্ত্রীলোকের ক্রন্দনশব্দে তাহারা উঠিয়া পড়িল; সকল কথা শুনিয়া তাহারা কিংকর্ত্তব্যসম্বন্ধে নানাপ্রকার অভিপ্রায় ব্যক্ত করিতে লাগিল; এক জন একটা অভদ্রোচিত রসিকতা করিতেও ত্রুটী করিল না; যদিও তাহার সমস্ত রসিকতাটুকুর অর্থ আবিষ্কার করা আমার সাধ্য হয় নাই, তথাপি যতটুকু বুঝিলাম, তাহাতে আমার সর্ব্বশরীর জ্বলিয়া গেল; কিন্তু উপায় নাই, সুতরাং প্রশান্তভাবে সেই নীচ রসিকতাটুকু পরিপাক করিতে হইল। মনকে প্রবোধ দিলাম যে, ছোটলোকের কাছে ইহা অপেক্ষা আর কি বেশী আশা করা যায়? “চোরা না শুনে ধর্ম্মের কাহিনী,” সুতরাং ধর্ম্মজ্ঞানসঙ্গত দুই একটা উপদেশবাক্য প্রয়োগ করাও বাহুল্য বোধ করিলাম।

 অনেক কষ্টে স্ত্রীলোকটিকে শান্ত করিয়া বসাইলাম; সে কাঁদিতে লাগিল। একে আমি হিন্দুস্থানী ভাষা বুঝি না, তাহার উপর সে কাঁদিতে কাঁদিতে জড়াইয়া জড়াইয়া যে সকল কথা বলিতে লাগিল, তাহার একবর্ণও আমি বুঝিতে পারিলাম না। এইমাত্র বুঝিলাম যে, সে ভাগলপুরের ওপাশে বরিয়ারপুর ষ্টেশনে নামিবে। বরিয়ারপুরের নিকটে তাহার বাপের বাড়ী; যে পুরুষটি গাড়িতে উঠিতে পারে নাই, সে তাহার বড় ভাই। আমি তাহাকে আশ্বাস দিয়া বলিলাম, তাহাকে বরিয়ারপুরে নামাইয়া রাখিয়া যাইব। আমার সকল কথা বুঝিতে না পারিলেও যুবতী এটুকু বুঝিল যে, আমি তাহার শুভানুধ্যায়ী। যুবতীর কোলের ছেলেটি তিন চারি মাসের বেশী হইবে না। স্ত্রীলোকটিকে বিশেষ ব্যাকুল দেখিয়া তাহার ছেলেটিকে আমি কোলে লইয়া বসিলাম; তাহাকে দেখিয়া আর একটি ক্ষুদ্র সুন্দর শিশু ও তাহার স্নেহময়ী মাতার কথা আমার মনে পড়িয়া গেল—তাহারা আর এ পৃথিবীতে নাই। আমার ক্রোড়ে আসিয়া শিশুটি হাত পা নাড়িয়া খেলা করিতে লাগিল, শেষে ঘুমাইয়া পড়িল; তখন তাহার মাতার ক্রোড়ে তাহাকে অর্পণ করিলাম।

 এদিকে প্রত্যেক ষ্টেশনে গাড়ী থামে, আর আমি মুখ বাড়াইয়া নিই, যদি সেই লোকটি টেলিগ্রাম করিয়া থাকে। ভাগলপুর পার হইয়া গেলাম, তবু কোনও সংবাদ পাওয়া গেল না। ক্রমে গাড়ী বরিয়ারপুর ষ্টেশনের নিকটবর্ত্তী হইল। আমার মনে নানা রকম ভাবনা আসিতে লাগিল। এই সুন্দরী যুবতীকে একাকিনী ষ্টেশনে নামাইয়া দেওয়া কর্ত্তব্য কি না। এই রাত্রে যদি সে পথ চিনিয়া যাইতে না পারে, ষ্টেশনের লোকেরা যদি এই অসহায়া যুবতীর উপর কোনও প্রকার অত্যাচার করে, তাহা হইলে উপায় কি? অনেক চিন্তার পর স্থির করিলাম, আমি বরিয়ারপুর ষ্টেশনে নামিব। চির দিন নিজের সুখ সচ্ছন্দতা খুঁজিয়া আসিয়াছি। সে সমস্ত শেষ হইয়াছে, এখন আর সে জন্য চিন্তা নাই; এখন এক বার দেখা যাক্, পরকে একটু সুখী করা যায় কি না।

 স্ত্রীলোকটির কাছে আমার অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলাম। সে আশ্বস্ত এবং সানন্দ মনে আমার পা ধরিয়া কৃতজ্ঞতা দেখাইতে গেল; আমি তাহাকে নিবৃত্ত করিলাম।

 বরিয়ারপুর ষ্টেশনে গাড়ী থামিল। ষ্টেশন ছোট। স্ত্রীলোকটির ভাই এখানে টেলিগ্রাম করিয়াছিল, কিন্তু ষ্টেশনের লোকেরা, ব্রেকভ্যানের দিক হইতে অনুসন্ধান আরম্ভ করিয়াছিল, কাজেই তাহারা আসিতে আসিতে আমি গাড়ী হইতে নামিয়া পড়িলাম, এবং যুবতীকেও নামাইলাম। ষ্টেশনমাস্টার আসিয়া আমাদের তারের খবরের কথা বলিল।

 ষ্টেশনমাষ্টার লোকটার একটু ইংরাজী বলিবার সখ ছিল; কিন্তু কথাবার্ত্তায় তাহার যেরূপ বিদ্যার দৌড় দেখিলাম, তাহাতে তাহার এ সখটুকু না থাকিলেই ভাল হইত। কিন্তু অনেক লোকই আপনাকে সামান্য বলিয়া মনে করে না, সুতরাং এ বেচারীরও দোষ দেওয়া যায় না। সে ইংরাজীতে আমাকে বলিল, “Don’t fear, Babu, you go Babu, we are here, let her alone, Babu”—আমি বলিলাম, যখন এখানে নামিয়াছি, তখন আজ আর যাইব না।

 ষ্টেশনে কর্ম্মচারীর মধ্যে এক ষ্টেশনমাষ্টার; এবং এক জন লোক; সে একাই পুলিসম্যান, মশালচি, টিকিটসংগ্রাহক, কুলি এবং ষ্টেশন মাষ্টারের আরদালী;—একাধারে সমস্ত। আমার সঙ্গে একটা চামড়ার পোর্টমাণ্টো; পুলিসম্যান ওরফে কুলিশ্রেষ্ঠ সেটি ষ্টেশনের ভিতর লইয়া আসিল। আমি ও ষ্টেশনমাষ্টার আগে, রমণীটি পশ্চাতে; আমরা ষ্টেশন-ঘরে প্রবেশ করিলাম।

 ষ্টেশনে আসিয়া তারের খবরটা দেখিতে পাইলাম। মাষ্টারজির সঙ্গে একটু আলাপ হইল। তিনি লোক নিতান্ত মন্দ নন। আমরা সেই রাত্রি ষ্টেশনে থাকিতে অনুরুদ্ধ হইলাম। এই স্ত্রীলোকটিকে অপরিচিত স্থানে ছাড়িয়া দিতে সাহস হইল না, অথচ উভয়ে ষ্টেশনের ক্ষুদ্র একটি কক্ষে রাত্রি কাটানোও অকর্ত্তব্য বোধ করিলাম। যুবতীকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম, তাহার বাপের বাড়ী ষ্টেশন হইতে এক ক্রোশ দূরে; এ দিকে ভাগলপুর হইতে গাড়ী পরদিন বেলা এগারটার আগে আসিবে না। রাত্রি জ্যোৎস্নাময়ী; শুনিলাম, পথে কোনও ভয় নাই। বাঁধা রাস্তা নাই বটে কিন্তু ক্ষেত্রের আইলের উপর দিয়া বেশ যাওয়া যায়। ষ্টেশনের পুলিসম্যানটিকে সঙ্গে যাইতে বলিলাম, কিন্তু সে ষ্টেশনমাস্টারের “সবে ধন নীলমণি”—তাহাকে ছাড়িয়া ষ্টেশনমাস্টারের এক দণ্ড চলিবার যো নাই। রাত্রি প্রায় শেষ হইয়াছিল, সুতরাং আমি ইচ্ছা করিলাম, ষ্টেশনে বসিয়াই অবশিষ্ট রাত্রিটুকু কাটাইয়া দিই, সকালবেলা যুবতীকে তাহার পিত্রালয়ে পঁহুছাইয়া দিব। কিন্তু স্ত্রীলোকটি আমার অভিপ্রায় শুনিয়া কান্নাকাটি আরম্ভ করিল, সঙ্গে সঙ্গে তাহার শিশুটিও কান্না যুড়িয়া দিল। অগত্যা আমি আমার পোর্টম্যাণ্টোটি ষ্টেশনমাষ্টার মহাশয়ের জিম্মায় রাখিয়া তাহাদের সঙ্গে রওনা হইলাম। এবার যুবতী আমাকে পথ দেখাইয়া চলিল। অনেক রাত্রে জ্যোৎস্না উঠিয়াছিল। পাতলা মেঘের ভিতর দিয়া সেই জ্যোৎস্না ঘুমন্ত মাঠের বুকে আসিয়া পড়িয়াছে। দূর বনে অল্প অল্প কি নড়িতেছে। দুই একটা পাখী মধ্যে মধ্যে ডাকিয়া উঠিতেছে, এবং পূর্ব্বাকাশ পরিষ্কার হইয়া আসিয়াছে। আমরা দুইটি প্রাণী গ্রাম লক্ষ্য করিয়া দ্রুতপদে চলিতে লাগিলাম। শুনিয়াছিলাম রাস্তা প্রায় এক ক্রোশ, কিন্তু চলিতে চলিতে পা ব্যথা করিতে লাগিল, তবুও রাস্তা শেষ হয় না। আমার সন্দেহ হইল, যুবতী বুঝি পথ ভুলিয়াছে। তাহাকে সে কথা বলিলাম, সে হাসিয়া বলিল, “লড়কি কি কখন বাপের বাড়ীর পথ ভোলে?”—এতক্ষণ পরে তাহার মুখে হাসি দেখিয়া আমার মনে আনন্দ হইল।

 আমরা যখন যুবতীর পিত্রালয়ে পঁহুছিলাম, তখন ভোর হইয়াছে, তবে চারি দিক বেশ পরিষ্কার হয় নাই। ডাকাডাকি করিতে সকলে উঠিয়া পড়িল। একজন অপরিচিত বাঙ্গালী বাবুর সঙ্গে মেয়েকে আসিতে দেখিয়া তাহারা অবাক্ হইয়া আমার দিকে চাহিয়া রহিল। তাহার পর মেয়েটি যখন সংক্ষেপে আমার পরিচয় প্রদান করিল, তখন, তাহাদের উপকারের জন্য আমি নিজের কাজ ক্ষতি করিয়া এতটা কষ্ট স্বীকার করিয়াছি শুনিয়া, তাহারা প্রাণ খুলিয়া আমাকে ধন্যবাদ প্রদান করিতে লাগিল। যুবতীর বাপ এক জন অশীতিপর বৃদ্ধ; কৃতজ্ঞতাভরে, সে আমার হাত জড়াইয়া ধরিল। আমি আমার সেই সৃষ্টিছাড়া হিন্দুস্থানী ভাষায় তাহাদিগকে পরিতুষ্ট করিলাম; বলিলাম, আমার কোন ক্ষতি হয় নাই, তোমাদের যে উপকার করিতে পারিয়াছি, তাহাতেই আনন্দিত হইয়াছি। ভদ্রলোকে যে এ রকম উপকার করে, তাহা তাহাদের বিশ্বাস ছিল না। ভদ্রলোকের ভদ্রতাতেও লোকের অবিশ্বাস, এ কতকটা বিস্ময়ের কথা বটে! আমি বড় ক্লান্ত হইয়াছিলাম, সমস্ত রাত্রি জাগরণ, তাহার উপর এই পরিশ্রম, বিশ্রামের জন্য একটা বিছানা চাহিলাম; তাহারা তাড়াতাড়ি আমার জন্য একটা শয্যা রচনা করিয়া দিল; বিনা বাক্যব্যয়ে আমার শয়ন ও নিদ্রা।

 জাগিয়া দেখি, রোদে সমস্ত আঙ্গিনা ভরিয়া গিয়াছে, বেলা তখন প্রায় দশটা। আমি যেখানে শুইয়াছিলাম, সেখানে আর কেহ ছিল না, কিন্তু এত বেলা পর্য্যন্ত অপরিচিত স্থানে নিদ্রা যাওয়াতে কিছু অপ্রস্তুত হইয়া পড়িলাম; উঠিয়া সসঙ্কোচে বাহিরে আসিয়া দেখি, বারাণ্ডায় সকলে বসিয়া আছে। আমাকে দেখিয়া পরিবারস্থ সকলে সসম্ভ্রমে উঠিয়া দাঁড়াইল। আমি আর বিলম্ব না করিয়া স্নান করিয়া আসিলাম। স্নান শেষ হইলে দেখিলাম, যুবতীর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আসিয়া পঁহুছিয়াছে। বেচারা ষ্টেশনে আসিয়া সকল কথা শুনিয়াছিল; কৃতজ্ঞতার চিহ্নস্বরূপ সে আমার পোর্টম্যাণ্টোটাও বহিয়া আনিয়াছে।

 সে দিন তাহারা আমাকে কিছুতেই ছাড়িয়া দিল না। তাহাদের মধ্যে অন্ততঃ আর এক দিনও বাস করিবার জন্য আমার হাত পা ধরিয়া অনুরোধ করিতে লাগিল। তাহাদের বিনয়পূর্ণ অনুরোধ উপেক্ষা করিতে আমার কিছুতেই প্রবৃত্তি হইল না। দেখিলাম, তাহারা গরীব বটে, কিন্তু হৃদয়হীন নহে। তাহাদের সংসারে অনেক অভাব থাকিলেও সেখানে শান্তির অপ্রতুল ছিল না; আমার শান্তিহীন হৃদয় এই সন্তুষ্ট ও শান্তিপূর্ণ পরিবারের মধ্যে আসিয়া যেন অনেকটা প্রফুল্ল হইয়া উঠিল। বৃদ্ধের পাঁচটি ছেলে, আর এই যুবতীই একমাত্র কন্যা। ছেলেগুলি সকলেই পিতার আজ্ঞাবহ, তিনটী ছেলের বিবাহ হইয়াছে; বৃদ্ধা গৃহিণী আছেন। বড় ছেলের সন্তানাদি কিছু হয় নাই, দ্বিতীয় পুত্রের দুইটী সন্তান। মোটের উপর বেশ সুখের সংসার।

 আহারাদির পর তাহাদের সঙ্গে একত্র বসিয়া তাহাদের সুখ দুঃখের গল্প শুনিতে লাগিলাম। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আমি ইহাদের নিতান্ত আপনার হইয়া পড়িলাম। মেয়েরা সকলে আমার সম্মুখে আসিতে কোনও আপত্তি করিল না। এখানে মায়ের স্নেহ, ভাইয়ের সম্মান, ভগ্নীর আদর, কিছুরই অভাব দেখিলাম না। এক এক বার মনে হইল, এই নিরক্ষর চাষার পরিবারেই দিন কতক কাটাইয়া যাই; কিন্তু থাকা হইল না; সেই রাত্রেই আমি তাহাদের গৃহ ত্যাগ করিলাম। মেয়ে ও বধূরা আমার সঙ্গে অনেক দূর পর্য্যন্ত আসিল, তখনও আর দুদিন থাকিবার জন্য অনুরোধ! গৃহস্বামীর দুই পুত্ত্র আমার সঙ্গে ষ্টেশন পর্য্যন্ত আসিল।

 শীঘ্রই লৌহরথ ধূম উদ্গীরণ করিতে করিতে প্লাটফরমের উপর আসিয়া থামিল। গাড়ীতে উঠিয়া বসিয়া আমার নবপরিচিত বন্ধুগণের কথা ভাবিতে লাগিলাম।