বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রবাস-চিত্র/মুশৌরী

উইকিসংকলন থেকে

মুশৌরী।

 যে দিন আমি সর্ব্ব প্রথম পর্ব্বতারোহণ করি, আমার জীবনের সে একটি স্মরণীয় দিন। কারণ সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করিয়া অক্লান্তভাবে পর্ব্বতে পর্ব্বতে বিচরণ করার আরম্ভ সেই দিনে। পর্ব্বত বিচরণের আনন্দ তেমন অতি অল্পবারই অনুভব করিয়াছি; কিন্তু এখন স্বীকার করিতে আপত্তি নাই যে, তত ভয়ও আর কখন অনুভব করি নাই। আসন্ন মৃত্যুস্রোত কতবার জীবনের চতুর্দ্দিকে ফেনিল হইয়া উঠিয়াছে, এবং বিপদের উপর বিপদ দুর্গম ও নির্জ্জন শৈলপথে কত সময় আমার ক্লিষ্ট, ক্ষিণ্ণ, অবসন্ন দেহটিকে চূর্ণ করিয়া দিবার সম্ভাবনা জানাইয়াছে; অটল সহিষ্ণুতার সহিত ধীরভাবে সে সকল সহ্য করিয়াছি। তাহার পর যাহা স্বপ্নেও ভাবি নাই, আমার সেই পুরাতন জীবনের অবসান হইয়াছে; জীবনের আর একটি অভিনব যুগে পদার্পণ করিয়াছি; কিন্তু সেই দিনে,—আমার পর্ব্বতারোহণের প্রথম দিনে, যে ভয় ও সঙ্কোচ আমার কৌতুকোদ্দীপ্ত হৃদয়ের মধ্যে হৃৎকম্প উপস্থিত করিয়াছিল, তাহা অভিনব।

 আমি যে দিন প্রথমে দেরাদুনে যাই, সে যে খুব বেশী দিনের কথা, তাহা নহে; তাহার পূর্ব্বে পর্ব্বতারোহণ দূরের কথা, পর্ব্বতদর্শনও কোন দিন আমার ভাগ্যে ঘটে নাই। মনে পড়ে, বাল্যকালে হাবড়ায় রেলে চড়িয়া একবার বর্দ্ধমান পর্য্যন্ত গিয়াছিলাম। পশ্চিমে কে কত দূর বেড়াইয়াছে, সেই কথা লইয়া বর্ষাকালে একদিন টিফিনের ছুটির সময় ক্লাসের ছেলেদের মধ্যে ভারি তর্ক উঠিয়াছিল। সকলে স্ব স্ব অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার পর আমি বলিলাম, “আমি বর্দ্ধমান পর্য্যন্ত গিয়াছি,—সে অনেক দূর।” আমার এই সৌভাগ্য কয় জন বন্ধুর প্রীতিকর হইয়াছিল, বলিতে পারি না, কিন্তু দুই এক জন বয়োবৃদ্ধ বান্ধবের মনশ্চক্ষুর সম্মুখে সেই কথায় হয় ত একটি শ্বেত সৌধ, সৌবশিখরে একটি সুসজ্জিত কক্ষ, এবং সেই কক্ষস্থিত একটি অলোকসুন্দরী রাজকন্যার চিত্র পরিস্ফুট হইয়া উঠিয়াছিল; বুঝি রত্নদ্বীপের উজ্জ্বল আলোক তাহার সুন্দর মুখ এবং আগ্রহস্ফূরিত চক্ষুর উপর পড়িয়া, তাহা উদ্ভাসিত করিয়াছিল; কে জানে, যুবতী তখন মাল্যরচনা করিতেছিলেন, কি কাহারও আশাপথ চাহিয়া ছিলেন। যাহাই করুন, সেই বাল্যকাল হইতে আমার মনে কিন্তু উত্তর-পশ্চিমপ্রদেশে ভ্রমণের একটা দুর্দ্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা জাগিয়া উঠিয়াছিল; আমার নবজাগরিত কল্পনায় দেখিতে পাইতাম, ধূসর পর্ব্বতশ্রেণী উন্নতমস্তকে দণ্ডায়মান রহিয়াছে, কটিতটে মেঘলার ন্যায় শামিল তরুরাজি, উর্দ্ধে তুষারমণ্ডিত শুভ্র কিরীট, উপত্যকায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুটীর, এবং সেই সকল কুটীরপ্রান্তে ও বনান্তরালে দণ্ডায়মান পার্ব্বত্য অধিবাসিবৃন্দ। গৃহকোণবাসী বালকের অতৃপ্ত হৃদয়ে তাহারা প্রবাসের আনন্দ বিতরণ করিত। কে জানিত, এ কল্পনা একদিন সত্যে পরিণত হইবে?

 কিন্তু আমার জীবনমধ্যাহ্নে সত্য সত্যই এমন এক দিন আসিল, যে দিন আমি মাতৃভূমির স্নেহময় ক্রোড় হইতে চিচ্যুত হইয়া, সুদূর উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে শান্তি এবং শৈত্য লাভের আশায় উপস্থিত হইলাম। অনেক দেশ অতিক্রম করিয়া হিমালয়ের ক্রোড়বর্ত্তী দেরাদূন সহরের নিভৃত নিবাস অতীব মনোরম বলিয়া বোধ হইল।

 দেরাদূনে আসিলাম বটে, কিন্তু পর্ব্বতারোহণের সুখলাভ করিতে পারিলাম না। দেরাদূনে আসিতে শিভালিক পর্ব্বত শ্রেণীর মধ্য দিয়া আসিতে হয়; কিন্তু শেষরাত্রে ডাকের গাড়ীতে দুরন্ত শীতের মধ্যে ঘুমাইতে ঘুমাইতে পার্ব্বত্যপথ অতিক্রম করিয়া কিছুমাত্র তৃপ্তি লাভ করিতে পারি নাই। একদিন স্থির করিলাম, পদব্রজে গিরিপর্য্যটন করিতে হইবে।

 দেরাদূন হইতে বেড়াইতে যাইবার প্রধান স্থান মুশৌরী সহর। মুশৌরী ইংরাজরাজকর্ম্মচারিবর্গের গ্রীষ্মাবাস; দেরাদূন হইতে অধিক দূর নহে, বার মাইল মাত্র। বিশেষতঃ প্রবাসীর নিকট তাহা একটি দেখিবার জিনিস। সুতরাং দেরাদূনে আসিয়া তাহা দেখিবার জন্য অধীর হইয়া পড়িলাম।

 এখনও বেশ মনে আছে, এক শুক্রবারে বেলা প্রায় ১টায় সময় মুশৌরী দেখিবার জন্য দেরাদূন হইতে বাহির হইলাম। তখন গ্রীষ্মকাল—দেরাদূনে বেশ গরম পড়িয়াছে, সমস্ত দিনের রৌদ্রে পর্ব্বত যেমন ভয়ানক গরম, রাত্রে তাহা আবার তেমনই শীতল; উত্তরপশ্চিম প্রদেশের ইহা একটি প্রধান বিশেষত্ব; দেরাদূনে এই বিশেষত্বের আরও ভাল করিয়া উপলব্ধি করা যায়। আমি গ্রীষ্মোপযোগী পরিচ্ছদে সজ্জিত হইয়া বাহির হইলাম, বন্ধুটির অনুরোধে কিছু কিছু গরম কাপড়ও সঙ্গে লওয়া গেল। দেরাদুন হইতে একখানি ট্যাণ্ডাম্ ভাড়া করিয়া রাজপুরে উপস্থিত হওয়া গেল। রাজপুর মুশৌরী পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। দেরাদুন হইতে ইহা প্রায় পাঁচ মাইল; এখান হইতে সাত মাইল চড়াই অতিক্রম করিলে মুশৌরীতে উপস্থিত হওয়া যায়।

 রাজপুর একটি সুন্দর সহর। বাড়ীগুলি ছোট ছোট, পথ ঘাট পরিষ্কার। অনেক ছোট বড় ইংরাজ এখানে বাস করেন। রাজপুরে আসিয়াই ট্যাণ্ডম্ ছাড়িতে হইল; কারণ, ট্যাণ্ডমে চড়িয়া এ চড়াই অতিক্রম করা যায় না। কাজেই এখানে আসিয়া পর্ব্বতারোহণের উপযোগী যানে আরোহণ করিতে হয়। এই অভিপ্রায়ে এখানে ডাণ্ডী, ঝাপান, ঝোড়া, এই তিন রকম যানের বন্দোবস্ত থাকে। কষ্টসহ, সবলকার পাহাড়ীরা সেই সকল যান আরোহী সহিত স্বন্ধে লইয়া পর্ব্বতে আরোহণ করে। যাহারা অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং পর্ব্বতারোহণে পারদর্শী, তাহারা কোন প্রকার যানের সাহায্য না লইয়া পদব্রজেই মুশৌরীতে যাত্রা করে; কিন্তু সেরূপ লোকের সংখ্যা নিতান্ত অল্প। তখন পর্ব্বতারোহণে আমার “হাতে খড়ি”ও হয় নাই, সুতরাং সেই সাত মাইল চড়াই পদব্রজে অতিক্রম করা আমার পক্ষে অসম্ভব বোধ করিলাম। প্রথমেই একটি যানের সন্ধানে বাহির হওয়া গেল গেল। আমরা দুটি বন্ধুতে অনেক পথ, অনেক আড্ডা, হোটেলের আশে পাশে ঘুরিয়া বেড়াইলাম, যত দোকান ছিল, সমস্ত তন্ন তন্ন করিয়া অনুসন্ধান করিলাম, কিন্তু একখানিও যানের সন্ধান পাইলাম না। আমার বন্ধুটি একটু আশ্চর্য্য হইলেন; কারণ, তাঁহার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় এরূপ যানের অভাব আর কখনও তাঁহাকে অনুভব করিতে হয় নাই। আমি আজ তাঁহার সঙ্গে আসিয়াছি, সুতরাং সেই জন্যই হয়ত নিরাশ হইতে হইল ভাবিয়া আমার মন বড়ই বিষণ্ণ হইল। আমি কবিবর ভারতচন্দ্রের একটি পুরাতন কবিতার আবৃত্তিপূর্ব্বক কিঞ্চিৎ রসিকতা প্রকাশের উদ্যোগ করিতেছি, এমন সময় বন্ধুবর তাঁহার একজন পরিচিত নাগরিকের নিকট সংবাদ পাইলেন যে, সেদিন সকালে একজন অজ্ঞাতনামা রাজা রাজপুরে আসিয়া দেশের সমস্ত ডাণ্ডী এবং ঝাপান লইয়া দলবলের সঙ্গে মহাসমারোহে মুশৌরী গিয়াছেন। আমি বড়ই বিপদে পড়িলাম; দেরাদূন হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছি, অথচ মুশৌরী না দেখিয়া ফিরিব, ইহা অসম্ভব। আবার সাত মাইল চড়াই ভাঙ্গিয়া সেখানে পদব্রজে যাওয়া, তাহা অপেক্ষাও অধিকতর অসম্ভব।

 অনেকক্ষণ চিন্তার পর বন্ধুটি বলিলেন, একমাত্র উপায় আছে। আমার মনে বড় আশার সঞ্চার হইল; কিন্তু যখন তিনি বলিলেন যে, “অশ্বারোহণে যাওয়াই এখন সর্ব্বাপেক্ষা অধিক সঙ্গত”, তখন একেবারে বসিয়া পড়িলাম। ঘোড়ায় চড়িয়া পাহাড়ে উঠা—এমন অসম্ভব কথা ত কখন শুনি নাই! ভায়া রহস্য করিতেছে ভাবিয়া তীক্ষ্মদৃষ্টিতে একবার তাঁহার দিকে চাহিলাম; কিন্তু তাঁহার ভাবে রহস্যের কোন লক্ষণ দেখা গেল না। আমি সাহস করিয়া বলিলাম, “ভাই! এ চতুষ্পদ জন্তুগুলিতে চড়া বড়ই দুঃসাহসের কাজ, তাহাতে আবার পাহাড়ের উপর; আমার দ্বারা তাহা হইবে না।” বন্ধুটি অনেক ভরসা দিতে লাগিলেন, আমি কিন্তু কিছুতেই সম্মত হইলাম না। ঘোড়ার উপর উঠিয়া বসিয়া ধরিবার যদি একটা কিছু বন্দোবস্ত থাকিত, তাহা হইলেও বিশেষ চিন্তার কোন কারণ ছিল না; বলা বাহুল্য, অনেকবার ঘোড়ায় চড়িবার সখ হইলেও, এই গুরুতর অভাবের জন্য সখ মিটাইতে পারি নাই, এবং “শৃঙ্গিণাম্ শস্ত্রপাণিনাম্” চাণক্য পণ্ডিতের এই অতি নিরাপদ নীতিবাক্যের অনুসরণ করিয়া আসিয়াছি।

 আমার কোন কথায় কর্ণপাত না করিয়া, বন্ধু আমাকে একেবারে একটা ঘোড়ার আড্ডায় লইয়া উপস্থিত হইলেন। দেখিলাম, প্রকাণ্ডকায় কতকগুলি ঘোটক বাধা আছে; যেমন দৈর্ঘ্য, তেমনই বিস্তার; কাল, লাল, সাদা, নানা রকম রঙ্গের; দেখিলে বোধ হয়; সকলগুলিই উচ্চৈঃশ্রবার বংশধর। বন্ধুবর একটি সুন্দর অশ্ব বাছিয়া লইলেন, এবং আমার জন্যও একটি মনোনীত করা হইল। সেই শ্বেতকায় তেজস্বী অশ্ব দেখিয়া আমি বিস্ময়ে ও ভয়ে চুপ করিয়া রহিলাম, পর্ব্বতারোহণের উচ্চাকাঙ্ক্ষাটা সম্পূর্ণরূপ পরিপাক হইয়া গেল।

 যাহা হউক, যখন দেখিলাম, অশ্বারোহণ ভিন্ন আর উপায় নাই, তখন একটি ছোট রকমের অশ্বের জন্য উমেদারী করিতে লাগিলাম। কিন্তু সহিস বলিল যে, “এ ঘোড়া বহুত ঠাণ্ডা।” বন্ধু নির্ভয়ে অশ্বারোহণ করিলেন; আমি দুই তিন বার চেষ্টার পর দুই জন সহিসের সাহায্যে ঘোড়ার পিঠে উঠিলাম। আমার সৌভাগ্যবশতই হউক, কি স্বভাবতঃ শান্ত বলিয়াই হউক, অশ্ববর কোন প্রকার অসহিষ্ণুতা প্রকাশ করিল না। বন্ধু অগ্রসর হইলেন, আমিও ধীরে ধীরে তাঁহার পশ্চাতে চলিতে লাগিলাম; ক্রমে অল্পে অল্পে সাহসের সঞ্চার হইল; মনে হইতে লাগিল, বাল্যকাল হইতে ঘোড়ার চড়ার অভ্যাগ না রাখিয়া কি অন্যায়ই করিয়াছি। আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে একটু অনুতাপেরও উদ্রেক হইল।

 অল্প দূর অগ্রসর হইয়াই, এক স্থানে যাত্রীদিগকে ‘টোল’ দিতে হয়। সেখানে একটু থামিয়া টোলের পরসা দিয়া আবার অগ্রসর হইলাম। অশ্ব অতি ধীরে ধীরে চলিতেছে, কত লোক আমার পশ্চাতে আসিয়া অগ্রে চলিয়া গেল। বন্ধুবর বেগে অশ্ব চালাইয়া দিয়াছিলেন; তাঁহার অশ্ব কখন বেগে, কখন মন্থরগমনে গ্রীবাভঙ্গী করিয়া চলিতে লাগিল, কখন বা কঠিন পাথরের উপর দুই এক বার পদস্খলন হইল; আমি কিন্তু সমানভাবে চলিতেছি। বন্ধু দুই একবার বক্র পার্ব্বত্যপথের অন্তরালে অদৃশ্য হইয়া পড়েন, আবার আমাকে না দেখিতে পাইয়া অশ্ব ফিরাইয়া সতৃষ্ণনয়নে আমার অপেক্ষা করেন। পথ অত্যন্ত বন্ধুর দেখিয়া, সহিসকে সঙ্গছাড়া করিতে আমার সাহস হয় নাই; আমার অনুরোধে সে বেচারা ক্রমাগত ঘোড়ার লেজ ধরিয়া চলিতেছে। তাহার গুম্ফশোভিত কাল গম্ভীর মুখখানি দেখিয়া, আমার সন্দেহ হইল যে, সে প্রতিমুহূর্ত্তে আমার মৃত্যুকামনা করিতেছে। তাহার এই নীরব অভিসম্পাত হইতে উদ্ধারলাভের কোনও উপায়ই দেখা গেল না; বাস্তবিক আমার মত আনাড়ী সওয়ার সে তাহার সহিস জন্মে আর দ্বিতীয় দেখে নাই। তাহার এই অসম্ভব বিরক্তিনিবারণের জন্য, আমি তাহাকে সম্ভবত পুরস্কার দিতে প্রতিশ্রুত হইলাম; তাহাতে তাহার সেই বিকট মুখ হাস্যপূর্ণ হইয়া উঠিল। সে ঘোড়াওয়ার চাকর মাত্র, মাসিক বেতন ভিন্ন তাহার অধিক কিছু প্রাপ্তির আশা ছিল না, সুতরাং বক্‌শিস্ তাহার উপরি-পাওনা; অতএব আমাকে বিশেষ সন্তর্পণে লইয়া যাইবার জন্য সে কিঞ্চিৎ মনোযোগী হইল। বক্‌শিসের প্রলোভনে সহিসকে রাজী করিলাম বটে, কিন্তু ঘোটকটি এতক্ষণ পরে আমার উপর গররাজি হইয়া উঠিল; তাহাকে প্রলোভিত করিবার কোন উপায়ই আবিষ্কার করিতে পারিলাম না। যতই উপরে উঠিতে লাগিল, ততই তাহার অবাধ্যতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা বৃদ্ধি পাইতে লাগিল; বোধ করি, এমন ধীরভাবে সহিষ্ণুতার সহিত চলা তাহার কখনও অভ্যাস ছিল না, এমন অকর্ম্মণ্য সওয়ারও সে কখনও লাভ করে নাই। আমি তাহাকে যতই পাহাড়ের উপর পথের দিকে লইয়া যাইতে চেষ্টা করি, সে ততই গিরিগহ্বর ও অধিত্যকার দিকে ছুটিতে চায়। উপায়ান্তর না দেখিয়া সহিসের শরণ লইলাম। সে, স্মিতমুখে ক্রমাগতই বলে, “কুচ ডর্ নেহি।” আমার প্রাণে কিন্তু “ডরের” অভাব ছিল না। সেই নির্ভীক কঠিনদেহ পাহাড়ীর আশ্বাসবাক্যে বিশ্বাসস্থাপনপূর্ব্বক কোন্ নির্জ্জীব অনভ্যস্থ বঙ্গবীর অশ্বের উপর আসন স্থাপন করিতে সক্ষম হয়? প্রতি পদক্ষেপণেই মনে হইতে লাগিল, এইবার বুঝি আমার পতন ও মূর্চ্ছা হয়!

 এইরূপ “সসেমিরা” অবস্থায় কিয়দ্দূর অতিক্রম করার পর দেখিলাম, দুই জন সাহেব অশ্বারোহণে পশ্চাৎ দিক হইতে আমার দিকে অগ্রসর হইতেছেন; তাঁহাদের অশ্বদ্বয় সবেগে আসিতেছিল, এবং তাঁহাদিগের উচ্চ সহাস্য কলধ্বনিতে সেই নিভৃত পার্ব্বত্যপ্রদেশ প্রতিধ্বনিত হইতেছিল। দেখিয়া আমি সঙ্কুচিতভাবে পথ ছাড়িয়া এক পার্শ্বে দাঁড়াইলাম। পশ্চাতের ঘোড়া ছুটিয়া আসিতেছে দেখিয়া যে সম্মুখের অশ্বারোহী এক পাশে স্থিরভাবে অপেক্ষা করে, এ দৃশ্য বোধ হয় উক্ত পুরুষপুঙ্গবদ্বয়ের নিকট অদ্ভুতপূর্ব্ব; তাই তাঁহারাও অশ্বের বেগ সংবরণ করিয়া আমার পার্শ্বে আসিয়া উপস্থিত হইলেন, এবং অপরিচিত বিদেশী ভদ্রলোককে প্রশ্নকৌতূহলে বিব্রত করা নীতিসঙ্গত না হইলেও, আমার গন্তব্যস্থান কোথায়, তাহা জিজ্ঞাসা করিলেন। তাঁহাদের জেরায় প্রকাশ হইয়া পড়িল যে, বেলা দুইটার সময় রাজপুর ছাড়িয়া এই সাড়ে চারিটার সময় এখানে আসিয়া পৌছিয়াছি। এ কথা শুনিয়া বোধ হয় তাঁহারা বুঝিলেন যে, আমার অশ্বারোহণের সখ পর্ব্বতারোহণের সহিষ্ণুতা অপেক্ষা অল্প নহে; সুতরাং আমার ন্যায় ওস্তাদ অশ্বারোহীকে কিঞ্চিৎ বিদ্রূপ করিবার প্রলোভন সংবরণ করা সেই রসিক খৃষ্টশিষ্যদ্বয়ের পক্ষে অসম্ভব হইয়া উঠিল। এক জন বলিলেন, “Babu, you should have started in the morning to reach the station at 5.” আর এক জন হাসিতে হাসিতে বলিলেন, “It is better for you to go back,”—তাঁহাদের এই অযাচিত উপদেশের জন্য যথাযোগ্য ধন্যবাদ প্রদানপূর্ব্বক আমি আবার ঘোড়া চালাইলাম, আমার সঙ্গী বন্ধু তখন অনেক দূর চলিয়া গিয়াছেন।

 কিয়ৎক্ষর পরে আমি “ঝরিপানি” নামক স্থানে উপস্থিত হইলাম। বন্ধুবর আমার জন্য এই স্থানে অপেক্ষা করিতেছিলেন। আমার জন্য ভদ্রলোকের বিষম বিপদ, আমাকে ফেলিয়া চলিয়া যাইতেও পারেন না, আবার আমাকে সঙ্গে লইয়া চলাও অসম্ভব। “ঝরিপানি” হইতে মুশৌরী অতি নিকটে। যখন আমরা মুশৌরী সহরের মধ্যে উপস্থিত হইলাম, তখন প্রায় অপরাহ্ণ। অপরাহ্ণে মুশৌরী পাহাড়ের দৃশ্য অতি বিচিত্র এবং আনন্দপ্রদ। মুশৌরী উচ্চশ্রেণীর ইংরাজের গ্রীষ্মাবাস। শিমলায় বড়লাট সাহেব গ্রীষ্মকালে সদলে বাস করেন; দার্জিলিংয়ের বিরামকুঞ্জে আমাদের বঙ্গেশ্বর গ্রীষ্মকাল অতিবাহিত করেন; নাইনিতাল উত্তরপশ্চিম প্রদেশের ছোটলাটের নৈদাঘ-নিকেতন; আর এই মুশৌরী-সহর লাটদলের নিম্নশ্রেণীস্থ সাহেব বিবির আড্ডা। গ্রীষ্মকালেই এই আড্ডা জম্‌কাইয়া উঠে। এই সময় মুশৌরী তন্বী নাগরীর ন্যায় যেরূপ সুসজ্জিত হয়, অমরসুন্দর হর্ম্ম্যাবলী হইতে আরম্ভ করিয়া নন্দনকাননতুল্য বিলাস-উপবনে যে অশ্রান্ত আনন্দ ও উচ্ছসিত হর্ষের অবিরাম স্রোত প্রবাহিত হয়, তাহার ঠিক বর্ণনা করিতে হইলে, প্রচুর শক্তি ও লিপিকুশলতার প্রয়োজন। এক কথায় এই বলা যাইতে পারে যে, এক জন নবাগত প্রবাসীর চক্ষে বিলাসিতা ব্যতীত আর কিছুই এখানে দৃষ্টিগোচর হয় না। এই স্থির, শান্ত, নির্ম্মল সন্ধ্যার প্রাক্কালে যখন পৃথিবী একটি উদার গাম্ভীর্য্যে পরিপূর্ণ হইয়া উঠে, নিস্তব্ধ ধরাতল ও অন্ধকারসমাচ্ছন্ন উন্মুক্ত আকাশের মধ্যে একটি পবিত্র মিলন সংঘটিত হয়, চতুর্দ্দিকে উন্নত পর্ব্বত ও তাহাদের অঙ্গস্থিত স্তূপাকার নিশ্চল বৃক্ষরাশি কৃষ্ণবর্ণ মেঘের ন্যায় নয়নসমক্ষে প্রতীয়মান হয়, তখন আমাদের কর্ম্মশ্রান্ত, অবসন্ন হৃদয়ও ধীরে ধীরে সংযত হইয়া আসে; একটি অপার্থিব, পবিত্র এবং শান্তিময় ভাবে প্রাণ পরিপূর্ণ হইয়া উঠে; চিরমঙ্গলময়ের উদ্দেশে আমাদের মস্তক অবনত হয়। তখন যে সঙ্গীত আমাদের হৃদয় আকর্ষণ করে, তাহা পবিত্র এবং শান্তিময়, গম্ভীর এবং প্রশান্ত মহিম্নঃস্তোত্র; দেবালয়ের শঙ্খঘণ্টাধ্বনি সে সময় আমাদিগকে যে সুখ এবং আনন্দ প্রদান করে, অন্য কোন প্রকার বাদ্যো-সে আনন্দদানে সক্ষম নহে।

 অতএব যাঁহারা শান্তির অন্বেষণে হিমালয়ে পরিভ্রমণ করিতে করিতে মুশৌরী সহরে উপস্থিত হন, তাঁহারা কখন এখানে আসিয়া তৃপ্তিলাভ করিতে পারিবেন না। ঐহিক সুখই এখানে সকলের একমাত্র লক্ষ্য। ইংরাজসমাজ লইয়াই এখানকার সমাজ, এখানকার অধিবাসিবৃন্দের অধিকাংশই ইংরাজ। সুদূর শ্বেতদ্বীপ কখন দেখি নাই, দেখিবার আশাও নাই; কিন্তু এখানে আসিয়া মনে হইল, ইংলণ্ডের পুরুষ ও ললনাগণের অধ্যুষিত কোন একটি গিরিউপত্যকা কোন ঐন্দ্রজালিকের মোহিনী শক্তির প্রভাবে হিমালয়ের বক্ষোদেশে আনীত হইয়াছে। রাজপথগুলি সুন্দর; গৃহগুলি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ছবির মত সুরম্য; বিরাম উপবন, লতাবিতানমধ্যবর্ত্তী নিভৃত পুষ্পকানন, খেলিবার মাঠ, ভ্রমণের জন্য নির্জ্জন নেপথ্য কিছুরই অভাব নাই। সন্ধ্যাকালে আলোকমালায় পথগুলি আলোকিত হইয়া উঠে; গৃহকক্ষ হইতে বাতায়নপথে উজ্জ্বল আলোকরশ্মি উদ্ভাসিত হইতে থাকে। এ সময় কোন আনন্দভবন হইতে সঙ্গীতধ্বনি উত্থিত হয়; কোন গৃহ হইতে সুশ্রাব্য বীণার ঝঙ্কার শুনিতে পাওয়া যায়; কোন নির্জ্জন নিকুঞ্জে প্রেমিকযুগল কাষ্ঠাসনে বসিয়া আপনাদের হৃদয়দ্বার উদ্ঘাটন করিয়াছেন; রাস্তার ধারে তিন জন যুবতী দাঁড়াইয়া গল্প করিতেছেন, এবং মৃদু হাস্যধ্বনিতে গল্পকে আরও মধুর করিয়া তুলিতেছেন। এক জন সাহেব একাকীই পর্ব্বতের পাশ দিয়া হু হু শব্দে ছুটিয়া চলিয়াছেন; আর এক দিকে একটি ক্ষীণাঙ্গী ইংরাজললনা কতকগুলি ফুল হাতে লইয়া, মৃদুমন্দগমনে অগ্রসর হইয়াছেন; একটি সাহেব যুবক তাঁহাকে দেখিয়া একটু সম্ভ্রমের সহিত মাথা হইতে টুপি উঠাইলেন; রমণী স্মিতমুখে একবার মস্তক নোয়াইয়া আবার অভীষ্ট পথে চলিতে লাগিলেন। এখানে যেন দারিদ্র্য দুঃখ নাই, কাহারও মনে বিষাদ কি কষ্ট নাই, সকলেই আনন্দোৎফুল্ল; দেখিয়া মনে হয়, এ কি ইন্দ্রপুরী, অথবা অমরভবন!

 এইরূপ নানা কথা ভাবিতে ভাবিতে দৃশ্যবৈচিত্র্যের মধ্য দিয়া আমরা ধীরে ধীরে চলিতে লাগিলাম। সাহেবদের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা রাস্তার উপর উচ্ছৃঙ্খলভাবে ছুটিতেছে, আবার আসিয়া আমার হাত চাপিয়া ধরিতেছে। লিভারী-পরা অহঙ্কারগর্ব্বিত দুই একটি সাহেবের খানসামা প্রভুর শিশুপুত্রকে ক্ষুদ্র গাড়ীতে ঠেলিয়া লইয়া যাইতেছে; ছেলেদের কাহারও হাতে একটা বাঁশী, কাহারও কোলে কাপড় চোপড় পরান একটা চীনের পুতুল। রাস্তার উপরই সাহেবদের ছেলেদের অন্য একটা স্কুল। কয়েকটা বওয়াটে ছেলে সেই স্কুলের পাশে দাঁড়াইয়া চুরুট ফুঁকিতেছিল ও নানা ভঙ্গীতে গল্প করিতেছিল। দুই জন কৃষ্ণকায় অশ্বারোহী সহজেই তাহাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। এক জন আমাদের জিজ্ঞাসা করিল, “What is the time by your horse, Sir?” আমার সঙ্গী বন্ধুটি নিতান্ত কম নহেন; তিনি উত্তর দিলেন—“3 feet 5 inches, my sons”—ছেলেরা হো হো করিয়া হাসিয়া হাততালি দিয়া উঠিল। লাইব্রেরী বাজারের একটু দূরে একটা গির্জ্জাঘর আছে, সেখানে একটু ‘উৎরাই’ নামিতে হয়। আমার সঙ্গী বন্ধু চারিদিক দেখিতে দেখিতে একটু অসতর্কভাবে চলিতেছিলেন, হঠাৎ তাঁহার অশ্বের সামান্য পদস্খলন হইল, আর তিনি একেবারে ভূমিসাৎ! অন্য স্থান হইলে কোন আপত্তি ছিল না, লাফাইয়া উঠিয়া গায়ের ধূলা, ঝাড়িলেই চলিত, কিন্তু সন্ধ্যার সময় গির্জ্জার সম্মুখে কতকগুলি সাহেব বিবির জটলার মধ্যে পতন কিঞ্চিৎ কষ্টকর। তাঁহাকে পড়িতে দেখিয়া অনেকে হাসিয়া উঠিল, তাঁহার দুর্দ্দশায় আমি অত্যন্ত দুঃখিত হইলাম; আঘাত লাগিয়াছে ভাবিয়া যথেষ্ট ভয়ও হইয়াছিল। যাহা হউক, বন্ধুবর পুনর্ব্বার তাঁহার অশ্বে আরোহণ করিয়া তাহাকে এক চাবুক কশাইয়া দিলেন, যেন তাহার অপরাধের জন্যই এমন একটা বিভ্রাট ঘাটল! তাঁহার ন্যায় শিক্ষিত অশ্বারোহীর যখন এই অবস্থা, তখন আমার অদৃষ্টে কি আছে, কে জানে! বহুকষ্টে অশ্ব বেচারীকে স্থির রাখিয়া, সন্ধ্যার সময় বন্ধুগৃহে উপস্থিত হইলাম।

 মুশৌরী সহরে বাজার ও দোকানের অভাব নাই। হোটেলের “বিলিয়ার্ড রুম” আলোকময়, কোনটাতে খেলোয়াড়গণ আসিয়া জুটিয়াছেন, কোনটাতে তখনও জুটেন নাই। এই সকল হোটেলের মধ্যে Himalayan Hotel সর্ব্বাপেক্ষা বড়; তাহার খ্যাতিও বহুদূর বিস্তৃত।

 রাত্রি বেশ সুনিদ্রায় কাটিয়া গেল। পরদিন সকালে কঞ্চিৎ গাত্রবেদনা অনুভূত হইল, কিন্তু তাহাতে ভ্রমণের ব্যাঘাত ঘটিল না। একটু বেলা হইলে কয়েকটি বন্ধুর সঙ্গে The great Trigonometrical survey আফিসের মানমন্দির দেখিতে যাওয়া গেল; অতি উৎকৃষ্ট দূরবীক্ষণ সাহায্যে বহুদুরবর্ত্তী তুষারাচ্ছন্ন পর্ব্বতশৃঙ্গসমূহ পর্য্যবেক্ষণ করিলাম। সেগুলি কি সুন্দর! শুভ্রকঠিন তুষাররাশির উপর বিন্দু বিন্দু শিশির সঞ্চিত হইয়াছে, তাহার উপর প্রভাত-সূর্য্যের লোহিত প্রভা বিকীর্ণ হইতেছে, শৈলশৃঙ্গগুলি ক্ষণে ক্ষণে নূতন বর্ণ ধারণ করিতেছে;—শোভা অতুলনীয়! দূরের ছোট ছোট গ্রামগুলি কেমন শোভাময়, সেই সকল কুয়াসাচ্ছন্ন বৃক্ষান্তরালবর্ত্তী গ্রাম যেন শৈশবস্মৃতির সুরম্য শুভ্র যবনিকায় সমাচ্ছন্ন। শৃঙ্গের পর শৃঙ্গ, পর্ব্বতের পর পর্ব্বত, অল্প অল্প ব্যবধানে অনন্ত অরণ্যশ্রেণী।

 অপরাহ্ণে বেড়াইতে বাহির হইলাম; সেই আনন্দ-উৎসব, সাহেব বিবির তেমনি জটিলা, হাস্য কৌতুক। সমস্ত দুঃখদারিদ্র্যকে ভারতের সমভূমিতে নির্ব্বাসিত করিয়া দিয়া ইহারা দিবারাত্রি বিরাম উপভোগ করিতেছে। শ্রান্তিকাতর অশান্ত হৃদয় লইয়া দুরে দাঁড়াইয়া ইহাদের হর্ষকোলাহল শুনিতে লাগিলাম; তাহাদের এই, উৎসাহ, এই অশ্রান্ত আমোদ, আমার বিস্ময়বিমুগ্ধ চক্ষুর সম্মুখে একটি উৎসবপূর্ণ অভিনয়দৃশ্যের ন্যায় প্রতীয়মান হইতে লাগিল; আমি পথপ্রান্তবর্ত্তী নীরব দর্শক। হায়, ইহারা যদি একবারও ভাবিত, এমন অভিনয়ও ফুরাইয়া যায়, এবং কালের একটিমাত্র ক্ষুদ্র ফুৎকারে উৎসবের উজ্জ্বল দীপাবলীও নির্ব্বাপিত হয়!