প্রবাস-চিত্র/সহস্রধারা
সহস্রধারা।
এক শনিবার অপরাহ্নে আমরা পাঁচ জন প্রবাসী বাঙ্গালী একটি ছেটে খাটো সভা করিলাম; সভার উদ্দেশ্য, তৎপরদিন রবিবার কোন স্থানে বেড়াইতে যাওয়া,—কিন্তু কোথায় যাওয়া যায়, এই কথা লইয়া সভ্যগণের মধ্যে মহা আন্দোলন উপস্থিত। দুই জন সিদ্ধান্ত করিলেন যে, তাঁহারা লছমনসিদ্ধির পাহাড়ে যাইবেন। লছমন-বিদ্ধি দেরাদূন হইতে ছয় মাইল; লছমন নামে একজন সন্ন্যাসী যেখানে যোগসিদ্ধ হইয়াছিল, তাই সে স্থান পবিত্র। আমরা তিন বন্ধু সহস্রধারা-দর্শনের বন্দোবস্ত করিলাম; সহস্রধারা দৃশ্যশোভার জন্য বিখ্যাত। রবিবার অতি প্রত্যুষে লছমন-সিদ্ধির দল রওনা হইবার পর আমরা যাত্রা করিলাম। আজ আমি পদব্রজে চলিতে নিতান্তই নারাজ, কাজেই একখানি এক্কা ভাড়া করিয়া তাহার উপর দেহভার সংস্থাপন করা গেল এবং বেলা ন’টার সময় রাজপুর নামক একটা সহরে উপস্থিত হইয়া, আর গাড়ী চালাইবার রাস্তা নাই দেখিয়া, আমরা সেইখানেই অবতরণ করিলাম।
রাজপুর একটি ছোট সহর; কতকগুলি সাহেবী হোটেল ও ক্ষুদ্র বৃহৎ অট্টালিকায় এই ক্ষুদ্র সহর পরিপূর্ণ। সাহেবেরা মসূরী ল্যাণ্ডোর সহরে উঠিবার সময়ে এখানে খানা পিনা করিয়া থাকেন। রাজপুর হইতে ক্রমাগত দুই হাজার ফিট উপরে উঠিলে মসূরী; নিকটে আর কোন বড় আড্ডা নাই বলিয়াই এখানে জনতা কিছু বেশী। রাজপুর দেখিলে মনে হয়, মানব তার ক্ষুদ্র হাত দু’খানিতে প্রকৃতিদেবীর পাষাণময় অঙ্কে একখানি খেলানার দোকান সাজাইয়া রাখিয়াছে। নির্জ্জন পর্ব্বতক্রোড়ে জনকোলাহলপূর্ণ মানব-অশ্ব-যান-সঙ্কুল এই ক্ষুদ্র জনপদ বেশ মনোরম। বিশেষ শরতের এই উজ্জ্বল প্রভাতে এই পীত রৌদ্রে যখন অনুর্ব্বর পার্ব্বত্য প্রদেশ কর্ম্মশীল মনুষ্যগণের উৎসাহপূর্ণ মুখ হাস্যময় বোধ হইতেছিল, তখন সুশ্যামল বঙ্গদেশের শরতের প্রভাতে এক মধুর পল্লীর দৃশ্য আমার মনে পড়িতেছিল।
রাজপুর হইতে সহস্রধারা দুই মাইলের কিছু বেশী। আমি পূর্ব্বাপরই হাঁটিতে নারাজ; পাহাড়ে ডাণ্ডী ছাড়া আর উপায় নাই। কাজেই পাঁচ সিকা দিয়া এক ডাণ্ডী ভাড়া করা গেল। শালপ্রাংশু মহাভুজ চারিজন পাহাড়ীর স্কন্ধে সডাণ্ডী আমার এই সুগুরু দেহভার সংস্থাপিত করিয়া উপরে উঠিতে লাগিলাম। বন্ধুবর ও চ-বাবু মাথায় চাদর বাঁধিয়া লাঠী হাতে পদব্রজে চলিলেন; তাঁহাদের ছত্রটি পর্য্যন্ত আমার মস্তকে ছায়াদান করিতে লাগিল। এই রাজবাঞ্ছিত অভিযানে আমার মনে ভারি আনন্দ বোধ হইতে লাগিল; কিন্তু যাঁহারা এই প্রকারে পরের স্কন্ধে বিচরণ করিয়া, আপনার সাহঙ্কার দৃষ্টির নীচে বিশ্বসংসারকে “নস্যাৎ” করিয়া এক অপূর্ব্ব গর্ব অনুভব করেন, তাঁহাদের সেই আনন্দ অনুভব করা আমার ভাগ্যে ঘটিয়া উঠে নাই। পাহাড় দিয়া নামা উঠা করা এক দুরূহ ব্যাপার, এক একবার উঠিতে যেন বুক ভাঙ্গিয়া যায়, আবার নামিবার সময় বোধ হয়, কে যেন পা দু’খানা ধরিয়া সবলে নীচের দিকে টানিতেছে! আমার মনে ভয় লইতে লাগিল, বুঝি বা ডাণ্ডীওয়ালারা পা পিছ্লাইয়া পড়িয়া যাইবে, আর আমি ডাণ্ডীসমেত ধরণীতলে পতিত হইয়া ইহজন্মের সুখ মিটাইয়া ফেলিবার সুবিধা পাইব। যাহা হউক, বাল্যকাল হইতেই ফিলজফাইজ করার প্রতি আমার কিছু অতিরিক্ত ঝোঁক আছে; কাজেই আমার মনে হইতে লাগিল, পাহাড়ে উঠা নামা পাপ পুণ্যের পথমাত্র; পুণ্যপথে উঠা যেমন কঠিন, পাপপথে অবতরণ তেমনি অনায়াসসাধ্য; কিন্তু এই আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাপারের মধ্যে বিলক্ষণ একটা বৈসাদৃশ্য আছে। পাহাড়ে নামিতে আরম্ভ করিয়া ইচ্ছা হইলেই আমরা থামিয়া আবার উপরে উঠিতে পারি; কিন্তু পাপপুণ্যের মধ্যে যে ব্যবধান আছে, তাহা শুধু একটুমাত্র ইচ্ছাতেই অতিক্রম করা যায় না; তাহা অতিক্রম করিতে হইলে হৃদয়ের দেববল ও পশুবলের অবিশ্রাম সংগ্রাম অপরিহার্য্য; পাপপুণ্যের গতি সামান্য ইচ্ছার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হইবার নহে।
ডাণ্ডীতে দুই মাইল পথ অতিক্রম করিয়া বেলা প্রায় সাড়ে দশটার সময়ে এক বটবৃক্ষতলে উপস্থিত হওয়া গেল; আমার সঙ্গীদ্বয় পূর্ব্বেই সেখানে উপস্থিত হইয়া বিশ্রাম করিতেছিলেন। এই স্থানে ডাণ্ডীত্যাগ। এখানে একটি নির্ঝর পার হইতে হইল; এই নির্ঝরের উজানেই সহস্রধারা। আমরা পার হইয়া অগ্রসর হইতে লাগিলাম। দুই দিকে অত্যুচ্চ পর্ব্বত, পর্ব্বতগাত্রে সহস্র প্রকার সুন্দর পুষ্প বিকশিত, আর শত শত সমুন্নত বৃক্ষ তাহাদের দূরবিস্তৃত শাখা প্রশাখায় সেই রমণীয় প্রদেশ আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছে; কুলকুল শব্দে ও বিহঙ্গকুলের হর্ষকাকলীতে সেই বিজন প্রদেশের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ হইতেছে। আমার মনে হইল, ত্রিদেবের নন্দনকানন বুঝি এই রকম, মন্দাকিনীর স্ফটিক প্রবাহ বুঝি এমনই নির্ম্মল ও শুভ্র, দেববালাগণের অমর সঙ্গীত বুঝি এই বিহগকাকলীর মতই মধুর; এ কাকলী যেন মূক প্রকৃতিমাতার হৃদয়ের উচ্ছ্বসিত আনন্দগীতি।
সেই নির্ঝরের অল্প পরেই সহস্রধারায় জল পড়িতেছে, এই অর্থে নির্ঝরের নাম ‘সহস্রধারা’; সহস্রের অর্থ এখানে অসংখ্য। আমরা যে দিকে দাঁড়াইয়াছিলাম, সেই পারেই সহস্রধারা, কিন্তু সম্মুখে আর পথ না থাকায় আমাদের অপর পার অবলম্বন করিতে হইল। এই সময় আমাদের দুই জন পাহাড়ী পথপ্রদর্শক জুটিয়াছিল; সাহেব বা কোন বড়লোক দেখিলে ইহারা পথ দেখাইয়া দেয়, এবং নানাপ্রকার প্রস্তর সংগ্রহ করিয়া উপহার দেয়; বলা বাহুল্য, এই উপায়ে মধ্যে মধ্যে ইহারা যথেষ্ট উপার্জ্জন করে। আমাদের যখন ইহারা বড়লোক বলিয়া ঠিক করিয়াছিল, তখন ইহাদের বুদ্ধিবৃত্তির প্রথরতাকে তারিফ করিতে হয়!
অপর পারে যে পর্ব্বত হইতে অজস্র ধারে জলধারা পড়িতেছিল, আমরা ঠিক তাহারই নিকটে গিয়া দাঁড়াইলাম। যে দৃশ্য আমার নয়ন সম্মুখে উন্মুক্ত হইল, তাহা বর্ণনা করা আমার সাধ্যাতীত; বাস্তবিকই তাহা বর্ণনার বিষয় নহে। সুধু চাহিয়া দেখা ও আপনাকে ভুলিয়া যাওয়া ভিন্ন ভাবিবার বিষয় আর কিছুই থাকে না; কেবল মনে হয় ‘gaze and wonder and adore’, প্রাণ তখন আপনা হইতে বিশ্বপিতার চরণে অবনত হয়। ভগবানের স্নিগ্ধ প্রেম অতি বড় অবিশ্বাসীর হৃদয়ও ধীরে ধীরে আপ্লুত করিয়া ফেলে, এমনই হৃদয়মুগ্ধকারী দৃশ্য, কবিত্বপূর্ণ সৌন্দর্য্যের মধুর বিকাশ, উদার নির্ঝরণীর মর্ম্মস্পর্শী চিরকলতান! সৃষ্টির কোন্ প্রথম দিনে সমুজ্জ্বল প্রভাতালোকে বুঝি কোন নির্ঝরবালার বক্ষ হইতে পাষাণভার অপসারিত হইয়াছিল, তাই সে তাহার দীর্ঘ কারাবাসের অবসানে নিস্তব্ধ চতুর্দ্দিক তাহার প্রেমানন্দরবে ঝঙ্কারিত করিতে করিতে আপনার লক্ষ্যপথে অগ্রসর হইতেছে। এ গানের বিরাম নাই, বিশ্রামা নাই! কত পাখী তাহাদের কণ্ঠস্বর মিলাইয়া গান গাইতে গাইতে ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে, কিন্তু তাহার কুলধ্বনির শেষ হয় নাই; কত পূর্ণিমা নিশি নির্ব্বাক হইয়া তাহার স্বচ্ছ রজতস্রোতে ঢল ঢল শুভ্র চন্দ্রিকারাশি ঢালিয়া দিয়াছে আবেশ-বিহ্বল মৌনবৃষ্টিতে তাহার উচ্ছ্বাস নিরীক্ষণ করিয়াছে, সে উচ্ছ্বাসের আজও শেষ হয় নাই; কত সুন্দর ফুল নির্ঝরের চতুর্দ্দিকে ফুটিয়া তাহার কলতান সুরভিত করিয়া তাহাদের পাষাণশয্যায় দেহলতা পাতিত করিয়াছে, সে তবুও ছুটিয়া চলিতেছে!
অত্যুচ্চ পর্ব্বত হইতে যে অজস্রধারে জল পড়িতেছে, সে জলধারা সূক্ষ্ম নয়, মুক্তাফলের ন্যায় স্থূলাকারে, পর্ব্বতের উপর হইতে ক্রমাগত নীচে পড়িতেছে। এই স্থানে পর্ব্বত সম্মুখের দিকে অনেকটা হেলা, কাজেই তাহার গা হইতে যে সমস্ত জলবিন্দু অবিশ্রান্ত পড়িতেছে, তাহা সোজাসুজি নীচেই পড়ে; অপর পারে দাঁড়াইয়া দেখিলে মনে হয়, যেন পর্ব্বতের উপর হইতে কে অনবরত মুক্তা ঢালিয়া দিতেছে, কিন্তু পৃথিবীর উষ্ণতার তাহা গলিয়া জল হইয়া যাইতেছে। পর্ব্বত ঠিক সোজা ভাবে উঠিলে এ শোভা দেখিবার সুযোগ হইত না, কারণ, তাহা হইলে, পর্ব্বতের গা বহিয়া জল পড়িত; কিন্তু বিধাতা এই অপূর্ব্ব সৌন্দর্য্য জগতের উপভোগ্য করিবার জন্যই যেন পর্ব্বতকে মাটীর সঙ্গে সূক্ষ্মকোণী অস্থায় স্থাপিত করিয়াছেন, আর অবিশ্রান্ত মুক্তাস্রোত ধরণীতল সিক্ত করিতেছে; নির্ঝর যেন অস্ফুটস্বরে গাইতেছে,—
‘তাঁহার আনন্দধারা জগতে যেতেছে বয়ে,
এস সবে নরনারী! আপন হৃদয় লয়ে।’
বাস্তবিকই এই পুণ্যনির্ঝরস্রোতে একবার শরীর সিঞ্চিত করিয়া লইলে আর শূন্যহৃদয়ে, তৃষিত প্রাণে ফিরিয়া যাইতে হয় না, তখন সত্যই মনে হয়,—
‘দেখেছি আজি তব প্রেমমুখ হাসি,
পেয়েছি চরণছায়া;
চাহি না কিছু আর পূরেছে কামনা
ঘুচেছে হৃদয়বেদনা।’
মুক্তাফলের ন্যায় জলবিন্দু ক্রমাগত নীচে পড়িতেছে, আর তাহার উপর সূর্য্যকিরণসম্পাত হওয়ায় সর্ব্বক্ষণই উজ্জল রামধনু প্রতিফলিত হইতেছে। একে ত সবই খুব সুন্দর, তাহার উপর এই প্রকার রামধনু সৌন্দর্য্যের চরমোৎকর্ষ, বিধাতা প্রকৃতি দেবীর ক্রোড়ে যেন বিবাহবাসর সজ্জিত করিয়া রাখিয়াছেন।
জ্ঞানের সহিত ভক্তি, কবিত্বের সহিত বিজ্ঞান এই মহা পুণ্যক্ষেত্রে একত্র সম্মিলিত হইয়া কর্ম্মভূমি উদ্দেশে দ্রুত ছুটিতেছে। ১৮৬৮ খ্রীষ্টাব্দে এক জন ইংরাজ ভ্রমণকারী সহস্রধারা দর্শন করিয়া Calcutta Reviewর কোন সংখ্যায় তাহার একটা বর্ণনা প্রকাশ করিয়াছিলেন, তাঁহার বর্ণনার কিয়দংশ এখানে ভাষান্তরিত করিয়া দিলে, বোধ হয়, আমার বক্তব্য অনেক পরিষ্কার হইবে। তিনি বলেন, “এই দিন ভ্রমণের প্রারম্ভে আমরা একটি অতি সুন্দর দৃশ্য দেখিয়া অতিশয় পুলকিত হইয়াছিলাম। তা আবার একখানি শিলাখণ্ডের পশ্চাৎভাগে লুক্কায়িত থাকায় অধিকতর মনোরম দেখাইতেছিল। আমরা নিকটে যাইয়া একটা উচ্চ স্থানে দাঁড়াইবামাত্রই হঠাৎ দেখিতে পাইলাম, পাহাড়ের এক স্থান খনন করিয়া তাহার ভিতর হইতে একটি ঝরণা বাহির হইয়া আসিতেছে। ইহার দুই পাশে দুইটা গহ্বর থাকায় প্রায় এক শত ফিট উচ্চ একটি খিলান হইয়াছে, তাহার তলভাগ প্রস্থে আশি কি এক শো গজ হইবে। উপর পাহাড়ের সকল স্থান হইতেই জল চুয়াইয়া বিন্দু বিন্দু করিয়া একটি গহ্বরে পড়িতেছে। ঝরণার ঠিক উপরে বড় বড় গাছ ও প্রচুর সতেজ গুল্ম থাকায় কতকটা ছায়া হইয়াছে, আবার সূর্য্যের প্রখর কিরণ জলবিন্দুর উপর উজ্জ্বলভাবে প্রতিকলিত হইয়া সেই মনোহর দৃশ্যটিকে বর্ণনাতীত সুন্দর করিয়া তুলিয়াছে। গাছপালার নানা প্রকার রঙ, আলো ও ছায়ার বৈচিত্র্যে তাহার উপরিভাগ ঠিক ‘মাদার অব্ পারলের’ মত দেখাইতেছে।”
সহস্রধারার এই মধুর দৃশ্য দেখার পর আমরা Sulpher Spring (গন্ধকের উৎস) দেখিতে গেলাম। সেটি, সহস্রধারা হইতে দূরে নহে। আমরা যাইতে যাইতেই গন্ধকের অতি তীব্র গন্ধ পাইলাম; নিকটে যাইয়া দেখি, একটি ক্ষুদ্র পাহাড়ের গাত্রস্থ এক ছিদ্রপথে ধীরে ধীরে জল বহির্গত হইতেছে, সেই জলে গন্ধকের গন্ধ বৈজ্ঞানিক পণ্ডিতেরা বলেন, ঐ পাহাড়ের ভিতর গন্ধকের খনি আছে। সুদৃশ্যের জন্য সহস্রধারা কবি ও ভাবুকের নিকট আদরণীয়, কিন্তু বৈজ্ঞানিকের নিকটও তাহার কম আদর নহে। Dr. Warth একজন বৈজ্ঞানিক পণ্ডিত; তাঁহার কাছে কবিত্বের মর্য্যাদা বড় নাই। তিনি তাঁহার বৈজ্ঞানিক পুস্তকের (Manual of Natural Sciences) এক স্থানে লিখিয়াছেন, “চুনের পাথরের ভিতর দিয়া যে ঝরণা বহে, তাহার মধ্যে কোন দ্রব্য রাখিলেই তাহাতে চুণের লেপ পড়ে। রাজপুরের নিকট সহস্রধারার একটি ঝরণার জলে লৌহ আছে ও অপর একটিতে Hydrogen Sulphideএর গন্ধ পাওয়া যায়। এই শেষোক্ত দ্রব্যের সঙ্গে সহস্রধারার চুণের পাথরে যে সাদা Gypsum পাওয়া যায়, তাহার কোন প্রকার সম্বন্ধ আছে।” সহস্রধারার জল চূণের পাহাড় হইতে পড়িতেছে, তাই সে জলের এক আশ্চর্য্য গুণ, গাছ পাতা যাহা কিছু সেই জলে পড়ে, তাহাই চূণ হইয়া যায়। Dr. Warth এই রকম কতকগুলি সংগ্রহ করিয়া Dehra-Dun Forest Schoolএ রাখিয়া দিয়াছেন। আমিও সেই রকম অনেক পাথর আনিয়াছি। একটাতে একখণ্ড কাঠের খানিকটা কাঠ আছে, বাকি অংশ পাথর হইয়া গিয়াছে। গাছের পাতা ও ডাঁটা বেশ বুঝিতে পারা যায়, অথচ সমস্তটা পাথর; এমন কি, সুন্দর সুন্দর লতা পর্য্যন্ত কঠিন প্রস্তরে পরিণত হইয়াছে। একটা গাছের পাতা আনিয়াছি, তাহার এক দিক পাথর হইয়াছে, আর এক দিক পাতাই আছে। প্রকৃতি রাজ্যের এই আশ্চর্য্য নিয়ম দেখি হঠাৎ সঙ্গদোষগুণের কথা আমার মনে হইল, কোমল লতা পাষাণের সঙ্গে থাকিয়া নিজেও পাষাণ হইয়াছে! কত দেবচরিত্র যে নরপিশাচদের সহবাসে মনুষ্যত্ব হইতে বঞ্চিত হইয়া পশুত্ব প্রাপ্ত হয়, তাহার সংখ্যা নাই!
পূর্ব্বেই বলিয়াছি, সহস্রধারা দেখিয়াই ক্ষান্ত হওয়া যায় না; সেই আনন্দধারা, প্রেমধারা, পতিতপাবনী পূতধারার নীচে বসিয়া শরীর পবিত্র করিয়া লইবার প্রলোভন সম্বরণ করা দুরূহ হইয়া উঠে। আমরা স্নানবস্ত্র পরিধান করিয়া ঝরণার নীচে মস্তক পাতিলাম, মস্তকের উপর অজস্রধারায় জল পড়িতে লাগিল, যেন বহুদিনের পাপ তাপ ধৌত করিয়া আমার এই পাপকলুষিত, সংসারতাপে জর্জ্জরিত জীবনকে এক শুভ্র শান্ত পবিত্র পরিচ্ছদ পরাইয়া দিল; এই পবিত্র ধারাপাতে শরীর যে প্রকার স্নিগ্ধ ও প্রফুল্ল হইল, সে স্নিগ্ধতা ও প্রফুল্লতা বহু দিন অনুভব করি নাই; সেখান হইতে আর উঠিয়া আসিতে ইচ্ছা হইতেছিল না। স্নানান্তে আহারাদির পর এখানে অনেকক্ষণ বসিয়া রহিলাম। প্রাণ আর এ স্থান ছাড়িতে চাহে না; সুধু ইচ্ছা করে, নির্ঝরের কুলধ্বনি, বিহঙ্গের কূজন, আর প্রস্ফুটিত কুসুমসৌরভাকুল সমীরণের মৃদুহিল্লোলবিক্ষুব্ধ বৃক্ষপত্রের অবিরাম সর্ সর্ শব্দে, এই দুঃখশোকসন্তপ্ত, সংসারসংগ্রামে নিপীড়িত হৃদয়ের ক্লান্তি দূর করি।
অনেকক্ষণ পরে ধীরে ধীরে উঠিয়া যে বৃক্ষতলে ডাণ্ডী রাখিয়া গিয়াছিলাম, সেখানে ফিরিয়া আসিলাম। তখনও খানিকটা বেলা ছিল, তাই বৃক্ষমূলে একটু বিশ্রাম করা গেল। ফিরিবার সময়ে আমার সঙ্গী একজন বন্ধুকে ডাণ্ডীতে চড়িবার জন্য বিশেষ অনুরোধ আরম্ভ করিলাম; অনেক অনুরোধ উপরোধের পর তিনি ডাণ্ডীতে উঠিলেন। আমি তাঁহাদের অনুগমন করিতে লাগিলাম। খানিক অগ্রসর হইয়া দেখি, সম্মুখে একটা প্রকাণ্ড চড়াই। এই স্থান হইতে পাহাড়ের গা দিয়া উপরে উঠিবার পথ, কিন্তু রাস্তা ভারি গড়ানো; সেই পথে উপরে উঠিতে গেলে বুকের হাড়গুলি মট্মট্ করিয়া ভাঙ্গিয়া যাইতেছে মনে হয়। ডাণ্ডী আগে চলিয়া গেল, আর আমি ঘুরিয়া ফিরিয়া ধীরে ধীরে উঠিতে লাগিলাম; কিন্তু সেই প্রকাণ্ড চড়াইয়ের এক অষ্টমাংশ উঠিতেই আমার প্রাণান্তপরিচ্ছেদ হইল। একে দেহভার নিতান্ত লঘু নহে, তাহার উপর এই প্রকার ভ্রমণ কখন অভ্যাস নাই, কাজেই পা আর চলে না; মধ্যে দুই তিনবার বসিয়া পড়িয়াছিলাম। কিন্তু আমি এই প্রবল চেষ্টা, যত্ন ও পরিশ্রমসহকারে যতটুকু উঠিয়াছি, তাহা অতি সামান্য পথ; এতেই এত গলদঘর্ম্ম! কি করা যায়, তখন জরাজীর্ণ, শুষ্কদেহ চিররোগীর মত অতি ধীরে ধীরে পা ফেলিয়া অগ্রসর হইতে লাগিলাম। কিন্তু আমাকে বেশী দূর যাইতে হইল না; দেখি, সম্মুখের বাঁকের মাথায় আমার বন্ধুটি ডাণ্ডী-নামাইয়া বসিয়া আছেন। তিনি ইতিপূর্ব্বেই দৈববাণী করিয়াছিলেন যে, চড়াই উঠা আমার মত বীরপুরুষের কর্ম্ম নয়; কিন্তু আমি তাঁহার কথার ঘোর প্রতিবাদ করার তিনি আমার অবিবেচনার ফলভোগ করিবার একটু অবসর দিবার জন্যই এই পথটুকু ডাণ্ডীতে অসয়াছিলেন, এবং আমার শোচনীয় অবস্থার বিষয় কতকটা অনুমান করিয়া এই নির্জ্জন প্রদেশে আমার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন। আমি সেখানে পৌঁছিবামাত্রই তিনি দুই একটি ভর্ৎসনায় আমাকে আপ্যায়িত করিয়া ডাণ্ডীতে উঠিয়া বসিবার জন্য পরামর্শ দিলেন, আমিও বাক্যব্যয় না করিয়া নিতান্ত সুশীল ও সুবোধ বালকের মত তাঁহার আজ্ঞানুবর্ত্তী হইলাম। তিনি পদব্রজে চড়াইয়ে উঠিতে উঠিতে দেখিতে দেখিতে যে কোথায় অদৃশ্য হইলেন, তাহা আমি ভাবিয়া স্থির করিতে পারিলাম না। অনেক দিন পাহাড়ে বাস করিয়া এবং সরকারী কার্য্যোপলক্ষে এই পার্ব্বত্য প্রদেশের দুরারোহ স্থান সকলে যাতায়াত করায়, এ রকম ভ্রমণ তাঁহার বেশ অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছে। আমি উপরে আসিয়া শুনিলাম, তিনি অনেক পূর্ব্বে সেখানে পৌঁছিয়াছেন।
রাজপুর হইতে আমাদের বাসা প্রায় ছয় মাইল; রাজপুরে একখানি এক্কা ভাড়া করা গেল। সূর্য্য প্রায় অস্ত যার, এমন সময়ে আমাদের এক্কা রাজপুরের উঁচু নীচু রাস্তা দিয়া দেরাদূনের দিকে আসিতে লাগিল। যাইতে যাইতে সান্ধ্যপরিচ্ছদ-পরিহিত দুই পাঁচ জন সাহেবকে এদিক ওদিক যাইতে দেখিলাম; কনককেশী ক্ষীণাঙ্গী মেম সাহেব মামাদের স্যন্দনের ঘর্ঘর শব্দে চকিত নেত্র উত্তোলন করিয়া একবার আমাদের দিকে চাহিলেন।
ধীরে ধীরে চারি দিক অন্ধকার হইয়া আসিল; কেবল পশ্চিম আকাশে একটু আলো আছে; কিন্তু সে লোহিত রাগও ধীরে ধীরে অপসৃত হইতে লাগিল, এবং এতক্ষণ যে ক্ষুদ্র ক্ষুত্র মেঘখণ্ডগুলি অস্তমিত তপনের শেষ কিরণচ্ছায়ায় রঞ্জিত হইয়াছিল, তাহারা ক্রমে বিবর্ণ হইয়া দূর দূরান্তরে ভাসিয়া যাইতে লাগিল। আকাশে তারকার নীরব দৃষ্টি, বায়ুসঞ্চালনে পর্ব্বিত্য বৃক্ষপত্রের সরসর কল্পন ও আমাদের এক্কার ঘর্ঘরধ্বনির মধ্য দিয়া বশিষ্ঠাশ্রম-প্রত্যাগত রাজা দিলীপের ন্যায় আমরা অগ্রসর হইতে লাগিলাম। দেখিতে দেখিতে পর্ব্বতবাসীদের ক্ষুদ্র কুটীরে মৃৎপ্রদীপগুলি জ্বলিয়া উঠিল, তাহার দুই একটা রশ্মিচ্ছটা আমাদের গাড়ীতে আসিয়া পড়িতে লাগিল, এবং কতকগুলি পার্ব্বত্য বালক বালিকা তাহাদের অপরিচ্ছন্ন পরিচ্ছদ ও সরলতাপূর্ণ কচি মুখগুলি লইয়া উৎফুল্ল ভাবে আমাদের গাড়ীর কাছে আসিয়া দাঁড়াইতে লাগিল। আজ এই পর্ব্বতপ্রান্তস্থ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুটীর গুলিতে আলোকরশ্মি ও পার্ব্বত্য বালক বালিকাগণের সরল মুখচ্ছবি এবং কৌতূহলপূর্ণ দৃষ্টি দেখিয়া কত শরদাগমে গৃহে প্রত্যাগমনের কথা মনে জাগিয়া উঠিতেছিল। সে দিনে আর এ দিনে কি গভীর ব্যবধান! এই ব্যবধানের উপর একমাত্র মৃত্যু ভিন্ন আর কেহ সেতু নির্ম্মাণ করিতে সক্ষম নহে।
আমাদের যান অবিলম্বে নির্দ্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হইল, সুতরাং প্রাচীন চিন্তাগুলিকে বিদায় দিয়া অবতরণ করা গেল, এবং স্মিতমুখে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে এই পর্য্যটনসম্বন্ধে আলোচনা করিতে করিতে রাত্রি অতিবাহিত হইয়া গেল।