বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রাকৃতিকী/মনুষ্যসৃষ্ট

উইকিসংকলন থেকে

মনুষ্যসৃষ্টি

মানুষ যে হঠাৎ একদিন তাহার হস্তপদ ও জ্ঞানবুদ্ধি লইয়া পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে নাই তাহার প্রচুর প্রমাণ আছে। যে দিন বিধাতার অনন্ত শক্তির এক ক্ষুদ্র কণা জড়ে প্রবিষ্ট হইয়। নির্জীবে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করিয়াছিল, সেই দিন হইতেই মনুষ্যসৃষ্টির আরম্ভ। কত বৎসর পূর্ব্বে এই প্রকারে জীবের অঙ্কুর উৎপন্ন হইয়াছিল, তাহা স্থির করা কঠিন বটে, কিন্তু পৃথিবীর শৈশব জীবনেরই কোন এক শুভ মুহূর্তে প্রাথমিক জীবের স্বেচ্ছা সঞ্চলনে যে, ধরাবক্ষ ক্ষুব্ধ হইয়াছিল তাহা সুনিশ্চিত। আধুনিক জীবতত্ত্ববিদগণ এই প্রাথমিক জীবকেই মনুষ্যের অতি প্রাচীন পূর্ব্বপুরুষ বলিয়া স্থির করিয়াছেন, এবং সেই জড়বৎ জীব কোন ধারায় ক্রমবিকাশ লাভ করিয়া বৃক্ষলতা পশুপক্ষী এবং নরবানর ইত্যাদিতে পরিণত হইয়াছে, তাহাও নির্দ্দেশ করিয়াছেন। সুতরাং প্রাথমিক জীবের সৃষ্টিকে মনুষ্যসৃষ্টির প্রারম্ভ বলা অসঙ্গত নয়।

 জীবের লক্ষণ নির্দ্দেশ করিতে গেলে বৈজ্ঞানিকগণ বলিয়া থাকেন, বাহিরের নানা প্রাকৃতিক শক্তির সহিত সামঞ্জস্য রক্ষা করিয়া নিজেকে ঠিক রাখাই জীবের প্রধান ধর্ম্ম। তাপ, আলোক, বায়ুর চাপ, ভূমধ্যাকর্ষণ প্রভৃতি নানা প্রবল প্রাকৃতিক শক্তি পদার্থের উপর যে প্রভাব বিস্তার করিতেছে, তাহা উপেক্ষার বিষয় নয়। গোড়ার খবর লইলে বলিতে হয়, ইহারাই নানা আকারে কাজ করিয়া পৃথিবীকে গড়িয়া তুলিয়াছে। সদ্যসৃষ্ট জীবটির উপর যখন এই সকল প্রাকৃতিক শক্তি প্রবলভাবে কাজ করিতে আরম্ভ করিয়াছিল, তখন টিকিয়া থাকিবার জন্য যে, জীবাঙ্কুরটিকে বহু চেষ্টা করিতে হইয়াছিল তাহা আমরা অনুমান করিতে পারি। কিন্তু সেই জড়যুগে আত্মরক্ষার আকাঙ্ক্ষা ক্ষুদ্র জীবগুলির হাতে কোন্ অস্ত্র দিয়া নিজের পথ নিজে কাটিয়া লইবার পরামর্শ দিয়াছিল, তাহা এখন আর জানিবার উপায় নাই। এই সময়ের সন্ধিবিগ্রহের ইতিহাস চিরদিনই আমাদের নিকট অজ্ঞাত থাকিবে।

 দেশের প্রাচীন ইতিহাস যখন লোপ পাইয়া যায়, চতুর ঐতিহাসিক পণ্ডিত অস্পষ্ট শিলালিপি এবং জীর্ণ মন্দিরের স্থাপত্যনৈপুণ্য পরীক্ষা করিয়া ইতিহাসহীন যুগের অনেক তত্ত্বের উদ্ধার করিয়া থাকেন। জীবতত্ত্ববিদগণও এই উপায়ে তামসাচ্ছন্ন জড়যুগের এক ইতিহাস দাঁড় করাইয়াছেন। তখনকার প্রাকৃতিক অবস্থার কথা মনে রাখিয়া এবং ভূপ্রোথিত শিলাময় জীবকঙ্কাল পরীক্ষা করিয়া ইঁহাদিগকে জীবের পুরাতত্ত্ব লিখিতে হইয়াছে। আধুনিক মানুষ প্রাকৃতিক উপদ্রবকে কৃত্রিম উপায়ে দমন করিয়া চারিদিকটাকে তাহার জীবনের এত অনুকূল করিয়া রাখিয়াছে যে, এখন একবার মানুষ হইয়া জন্মগ্রহণ করিতে পারিলে জীবনটা শেষ পর্য্যন্ত বেশ সহজেই কাটিয়া যায়। ইতর জীবগণ জীবনরক্ষার এই সুবিধাটুকু হইতে বঞ্চিত। তাই বিরুদ্ধ প্রকৃতির সহিত সংগ্রাম করিতেই ইহাদের জীবনের অনেকটা সময় বায়িত হইয়া যায়। প্রাথমিক জীবগণ আধুনিক ইতর জীবের তুলনায় অনেক নিকৃষ্ট ছিল, সুতরাং ইহাদিগকেও যে, বাহিরের শক্তির সহিত সংগ্রাম করিয়া জীবন রক্ষা করিতে হইয়াছিল তাহা নিশ্চিত। এই অবস্থায় অনুকূল শক্তিকে আশ্রয় করিয়া নিষ্ঠুর প্রতিকূল শক্তির সহিত সংগ্রাম করা ব্যতীত আর উপায় থাকে না। প্রাথমিক জীবের জীবনের অনেক সময় এই প্রকার সংগ্রামেই কাটিয়া গিয়াছিল। তার পরও শত্রুর কবল হইতে উদ্ধার নাই দেখিয়া তাহাদিগকে আত্মরক্ষার
প্রাথমিক প্রাণী অ্যামিবা

আদিম সমুদ্রচর প্রাণী
কোন স্থায়ী উপায় উদ্ভাবনের জন্য চিন্তা করিতে হইয়াছিল। প্রবল শত্রুপক্ষের বাণবর্ষণে যখন যোদ্ধার ধনু ভগ্ন হইয়া যায় এবং আত্মরক্ষার চেষ্টায় তূণীর শূন্য হইয়া পড়ে, তখন নিজের দেহপ্রাণ অক্ষত রাখিবার জন্য তাহাকে উপায়ান্তর অবলম্বন করিতে হয়। পার্শ্বচর শরীররক্ষকের স্কন্ধে যে কঠিন বর্ম্ম সঙ্কটকালের জন্য রাখা হইয়াছিল, তাহার প্রতি তখন যোদ্ধৃবরের দৃষ্টি পড়ে। সেই কঠিন বর্ম্মে আচ্ছাদিত হইয়া দাঁড়াইলে বিপক্ষের বাণ বর্ম্মে ঠেকিয়া শতধা হইয়া পড়িয়া যায়। প্রতিকূল প্রাকৃতিক শক্তির নিষ্ঠুরতার হাত হইতে উদ্ধার পাইবার জন্য জীবকে ঠিক্ পূর্ব্বোক্ত প্রকারেই সংগ্রাম করিতে হইয়াছিল। বর্ম্ম প্রস্তুত ছিল না, নিজের শরীরকে রূপান্তরিত করিয়া ইহারা বিরুদ্ধ শক্তির আক্রমণ হইতে ত্রাণ পাইত। এক কোষময় প্রাথমিক জীব দ্বিধা খণ্ডিত হইতে হইতে যে অসংখ্য সন্তানসন্ততি উৎপন্ন করিত তাহাদের মধ্যে সকলগুলিই মূলজীবের ছাঁচে না জন্মিয়া নানাকারণে বিকলাঙ্গ হইয়া জন্মিত। এই বিকলতা মহাভারতের বীর কর্ণের সহজ কবচের ন্যায় কার্য্য করিলে প্রাকৃতিক উপদ্রর তাহাদিগকে স্পর্শ করিতে পারিত না। জীবনসংগ্রামে জয়যুক্ত হইয়া যে সকল জীব নানাযুগে পৃথিবীতে বিচরণ করিয়াছিল, তাহাদিগকে মহাবীর কর্ণের ন্যায়ই সহজ কবচধারী হইয়া জন্মিতে হইয়াছিল।

 জীবের এই ক্রমপরিবর্ত্তন পৃথিবীর কেবল শৈশবজীবনেরই ঘটনা নয়, বাহিরের প্রাকৃতিক শক্তি যেমন ধীরে ধীরে পরিবর্ত্তিত হইয়া আসিতেছে, জীবও সেইপ্রকার নানা আকার পরিগ্রহ করিয়া জাতির পর জাতি সৃষ্টি করিতে করিতে চলিয়াছে। বর্ত্তমান যুগেও এই পরিবর্ত্তনের ধারার বিরাম নাই। ইহার অন্ত কোথায়, এবং ইহা কোন্ দিক্ লক্ষ্য করিয়াই চলিয়াছে, তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা আমাদের জ্ঞানবুদ্ধির অতীত।

 ইচ্ছাশক্তির সঞ্চার হওয়ার পর শত্রুকবল হইতে রক্ষা পাইবার জন্য জীবকে প্রকৃতির মুখাপেক্ষী হইয়া থাকিতে হয় নাই। এই স্বাভাবিক ইচ্ছাশক্তির ইঙ্গিতেই মনুষ্য প্রভৃতি উন্নত প্রাণী কৃত্রিম উপায় উদ্ভাবন করিয়া এখন সহস্র প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়া সংগ্রাম করিতেছে। প্রাচীন জীবের এই ইচ্ছাশক্তির লেশমাত্র ছিল না। বাহিরের উদ্দাম প্রকৃতির চালনায় শরতের মেঘের ন্যায় তাহাকে নানা আকার পরিগ্রহ করিতে করিতে লক্ষ্যহীন অবস্থায় চলিতে হইয়াছিল। ইহার মধ্যে যাহারা ঘটনাবৈচিত্র্যে কুপথ অবলম্বন করিয়াছিল, মৃত্যুর গ্রাস হইতে তাহারা রক্ষা পায় নাই। ভাগ্যক্রমে যাহারা সুপথের পথিক হইয়াছিল, কেবল তাহারাই ক্রমোন্নতি লাভ করিতে পারিয়াছিল। আধুনিক মানবজাতি সেই আদিম জীবের কোন এক সুপথগামী বংশধর হইতেই জন্মিয়াছে। যে পথ অবলম্বন করিয়া জড়বৎ অপকৃষ্ট জীব শেষে মানবের ন্যায় উন্নত প্রাণীতে পরিণত হইয়াছে, আমরা বর্ত্তমান প্রবন্ধে তাহারই কিঞ্চিৎ আভাস দিব মাত্র।

 আদিম জীবের উৎপত্তির পর তাহার বংশধরগণ দুইটি পৃথক জাতিতে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। প্রাচীন যুগের আকাশ এখনকার মত পরিষ্কার ছিল না। তখন এখনকার তুলনায় আকাশে অঙ্গারক বাষ্প অধিক পরিমাণে মিশ্রিত থাকিত। এক জাতি কেবল অঙ্গারক বাষ্প দেহস্থ করিয়া শরীর পোষণ করিত, এবং অপরটি অক্সিজেন বায়ু গ্রহণ করিয়া জীবিত থাকিত। অঙ্গারক বাষ্পে অঙ্গার ও অক্সিজেন যুক্তাবস্থায় থাকে। উভয়ই জীবদেহ গঠনের খুব উপযোগী হইলেও, মুক্ত অক্সিজেন জীবকে যেমন কর্ম্ম কুশল করে, অঙ্গারক বাষ্প সে প্রকার করে না। অঙ্গারক বাষ্পগ্রাহী জীবের এইখানেই উন্নতির পথ রোধ হইয়া পড়িয়াছিল। অক্সিজেনগ্রাহী জীব যখন উন্নতির পথে চলিবার জন্য চঞ্চল হইয়া দাঁড়াইয়াছিল, তাহাদিগের অঙ্গারকবায়ুভোজী সহোদরগণ ঠিক একস্থানে দাঁড়াইয়া কিপ্রকারে বহু অঙ্গারক বাষ্প দেহস্থ করিতে হইবে, তাহার উপায় উদ্ভাবনে ব্যস্ত ছিল।

 অক্সিজেন্‌ভুক জীব বহুকাল একই আকারে থাকিতে পারে নাই। বহিঃপ্রকৃতির সহিত সামঞ্জস্য রাখিতে গিয়া ইহারা সমেরুদণ্ড ও অমেরুদণ্ড (Vertebrate and Invertebrate) এই দুই জাতিতে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। এক যুগে এই দুই জাতির মধ্যে অমেরুদণ্ড জীব পৃথিবীতে খুব প্রাধান্য লাভ করিয়াছিল। মাকড়সা মধুমক্ষিকা পিপীলিকা প্রভৃতি তাহাদেরি বংশধর। ইহারা বহিঃপ্রকৃতির সহিত নিজেদের মিলাইয়া যেমন অনায়াসে চলাফেরা করে, অপর কোন জীবই সেপ্রকার পারে না। সমাজবন্ধনের কৌশলে ইহারা সমগ্র ইতর জীবের শীর্ষ স্থানীয়। এই সকল আলোচনা করিলে বলিতে হয় যে, যে সমেরুদণ্ড জাতি হইতে মনুষ্যের উৎপত্তি হইয়াছে, তাহা এককালে উন্নতির পর্য্যায়ে অমেরুদণ্ডজাতির অনেক নীচে ছিল। ভূতত্ত্ববিদ্‌গণও আজকাল এই সিদ্ধান্তের অনুমোদন করিতেছেন।

 আনেরুদণ্ডজাতি প্রথমে দ্রুতগতিতে উন্নতির দিকে চলিয়া শেষে তাহাদের সমেরুদণ্ড ভ্রাতৃগণের সহিত প্রতিযোগিতায় জয়ী হইতে পারে নাই। মেরুদণ্ডের অভাবে দেহের চর্ম্মকে ইহারা ইন্দ্রিয়াদি রক্ষার প্রধান অবলম্বন করিয়া তুলিয়া একটা মহা ভুল করিয়াছিল, এবং এই ভুলই তাহাদের ভবিষ্যৎ উন্নতিপথের কণ্টক হইয়া দাড়াইয়াছিল। স্থূলচর্ম্ম দ্বারা সর্ব্বাঙ্গ আবৃত থাকায় আকারে বৃহত্তর হইবার চেষ্টা করিতে হইলে, ইহাদিগকে সেই আবরণকে বিদীর্ণ করিতে হইত। অদ্যাপি কাঁকড়া চিংড়ি মাছ প্রভৃতি অমেরুদণ্ড জীব এই প্রকারে চর্ম্মবিদীর্ণ করিয়াই বাড়িয়া থাকে। সমেরুদণ্ড জীবের দেহস্থ অস্থি যে কাজ করে, অমেরুদণ্ড প্রাণিগণ তাহাদের দেহের কঠিন আবরণ দ্বারা ঠিক সেই কাজ করাইয়া লয়। দেহের প্রধান প্রধান ইন্দ্রিয় ও পেশীগুলি ঐ আবরণে আবদ্ধ থাকে; কাজেই চম্মত্যাগ করার পর নূতন চর্ম্ম বাহির হওয়া পর্য্যন্ত ইহাদিগকে অকর্ম্মণ্য হইয়া পড়িয়া থাকিতে হয়। বৎসরে দুই তিনবার করিয়া যদি মানুষকে দেহের অস্থি ত্যাগ করিতে হইত, এবং নূতন অস্থিগুলিকে অঙ্কুরিত ও কার্য্যোপযোগী করিবার জন্য যদি দুই তিন মাস শয্যাশায়ী থাকিতে হইত, তাহা হইলে মানুষ কখনই এত উন্নতি লাভ করিতে পারিত না। অমেরুদণ্ড জীব দৈহিক উন্নতির জন্য চর্ম্মত্যাগে অভ্যস্ত হইয়া, ঠিক পূর্ব্বোক্ত কারণে উন্নতি লাভ করিতে পারে নাই। কিছুদিন জীবনসংগ্রামে প্রবৃত্ত থাকিয়া ইহারা যে একটু অভিজ্ঞতা লাভ করিত, লুপ্তচর্ম্ম হইয়া পড়িলে অনভ্যাসে তাহার প্রায় সকলি নষ্ট হইয়া যাইত।

 অমেরুদণ্ডজাতির মধ্যে কতকগুলি জীব চর্ম্মত্যাগের পূর্ব্বোক্ত অসুবিধাটা বুঝিয়া উন্নতির আশায় চুর্ম্মত্যাগ হইতে বিরত হইয়াছিল। কিন্তু এই সুবুদ্ধিও তাহাদের ভবিষ্যৎ পথ নিষ্কণ্টক করিতে পারে নাই। এক নূতন বিঘ্ন আসিয়া উন্নতির পথ রোধ করিয়া দাঁড়াইয়াছিল। চর্ম্মত্যাগ অভ্যাস পরিহার করায়, ইহাদের সকলকেই অল্পায়ু ও ক্ষুদ্রাবয়ববিশিষ্ট হইয়া জন্মিতে হইত, এবং যাহারা জোর করিয়া দেহের আয়তন বৃদ্ধির চেষ্টা করিত তাহাদের ক্ষুদ্র জীবনটা পুনঃপুনঃ দেহের পরিবর্ত্তন করিতেই কাটিয়া যাইত।

 আধুনিক রেসমকীট এবং নানা জাতীয় পতঙ্গগুলিই পূর্ব্বোক্ত জীবের বংশধর। ইহাদের পূর্ব্বপুরুষগণ উন্নতির পথ নির্ব্বাচনে যে ভ্রম করিয়াছিল, তাহারি ফলে অদ্যাপি ইহারা। ক্ষুদ্রাবয়ববিশিষ্ট ও অল্পায়ু হইয়া জন্মিতেছে, এবং জীবনের অধিকাংশ সময়ই দেহপরিবর্ত্তন করিয়া কাটাইতেছে। বলা বাহুল্য এই প্রকার ক্ষুদ্র জাতি কখনই বুদ্ধিমান্ হইয়া উঠিতে পারে না। বুদ্ধির জন্য বৃহৎ মস্তিষ্কের প্রয়োজন। ক্ষুদ্রদেহে সে প্রকার মস্তিষ্কের স্থান নাই। পিপীলিকার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের শক্তি বৃহৎ মানবমস্তিষ্কের তুলনায় হীন নয় বলিয়া একটা কথা আছে। একথাটা যে সম্পূর্ণ নিরর্থক তাহা নানা পরীক্ষায় প্রতিপন্ন হইয়া গিয়াছে।

 বংশানুক্রমে বহুকাল একই কার্য্য অবিচ্ছেদে করিতে থাকিলে, কাজেব ভিতরকার খুঁটিনাটি সকল ব্যাপার ভাল করিযা বুঝিবার শক্তি সেই বংশের একটা বিশেষত্ব হইয়া দাঁড়ায়। নানা জাতীয় জীবের বিশেষ বিশেষ বুদ্ধি এবং জ্ঞান ঠিক এই প্রকারেই ক্রমবিকাশ লাভ করিয়া শেষে সেগুলি জাতিগত সম্পদ্‌ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। যে জীবকে তাহার ক্ষুদ্রজীবনে দুই তিনবার দেহপরিবর্ত্তন করিতে হয়, সে কখনই অবিচ্ছেদে কোন একটা কার্য্য করিবার অবসর পাইতে পারে না। কাজেই ইহাতে তাহাব বুদ্ধিও স্ফূর্ত্তি পাইবার সুযোগ হইতে বঞ্চিত হইয়া পড়ে। পরিবর্ত্তনশীল দেহ লইয়া পতঙ্গজাতিকে ঠিক এই কারণেই অল্পবুদ্ধি হইয়া থাকিতে হইয়াছে। রেসমের কীট যখন সুঁয়োপোকার আকারে থাকে, তখন তাহাকে কেবল বৃক্ষপত্র আহার কবিয়াই জীবনধারণ করিতে হয়। এই অবস্থায় উহারা নানাশত্রুর গ্রাস হইতে আত্মরক্ষা করিয়া সুস্বাদু পত্র উদরস্থ কবিবার কৌশল শিখিয়া ফেলে। কিন্তু সেই পোকাগুলিই যখন সুদীর্ঘ নিদ্রার পর গুটি কাটিয়া প্রজাপতির আকারে বাহির হইয়া পড়ে, তখন তাহাদের পূর্ব্বের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা কোন কাজেই লাগে না। এই অবস্থায় তাহাদিগকে সম্পূর্ণ নূতন শত্রুর সহিত সংগ্রাম করিয়া নূতন উপায়ে আহার সংগ্রহের জন্য শিক্ষানবিসি করিতে হয়। কাজেই পূর্ব্বাপর জীবনের কোন অভ্যাসই তাহাদের মর্ম্মে প্রবেশ করিয়া বুদ্ধিকে উন্নত করিতে পারে না।

 পূর্ব্বোক্ত বিবরণগুলি হইতে স্পষ্টই বুঝা যায়, অমেরুদণ্ডী জীব প্রথমে তাহার সমেরুদণ্ড ভ্রাতাকে পশ্চাতে ফেলিয়া শেষে নিজেই পিছনে পড়িয়াছিল, তাহারা আত্মোন্নতি ও আত্মরক্ষার যে কয়েকটি উপায় গ্রহণ করিয়াছিল, তাহার কোনটিই উহাদিগকে মনুষ্যত্বের দিকে অগ্রসর করে নাই। যে সকল প্রাণী কোমলদেহে কঠিন মেরুদণ্ডকে পোষণ করিতে আরম্ভ করিয়াছিল, শেষে কেবল তাহারাই জয়ী হইয়া পড়িয়াছিল।

 সমেরুদণ্ড জীব বহুকাল জলচর প্রাণীর আকারে সমুদ্রে বিচরণ কবিয়াছিল, এবং পরবর্ত্তী যুগে ইহাদেরি কতকগুলি স্থলচর হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। জীবতত্ত্ববিদ্‌গণ এই পরিবর্ত্তনের নানাপ্রকার কারণ প্রদর্শন করিয়া থাকেন। তন্মধ্যে চন্দ্রের আকর্ষণকে যাঁহারা প্রধান কারণ বলিয়া উল্লেখ করেন, তাঁহাদেরি কথা যথার্থ বলিয়া মনে হয়। ইঁহারা বলেন, অতি প্রাচীনকালে যখন চন্দ্র পৃথিবীর খুব নিকটে ছিল, তখন তাহার প্রবল টানে সমুদ্রজালে অত্যন্ত অধিক জোয়ার-ভাঁটা হইত। এই জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে যে সকল জলচর জীব স্থালে উঠিত, ভাঁটার জলের সঙ্গে তাহাদের সকলগুলিই সমুদ্রে পড়িত না। এই প্রকারে কতকগুলি জীবকে প্রতিদিনই দুইবার করিয়া স্থলবাসী হইতে হইত। হঠাৎ প্রতিকূল অবস্থায় আসিয়া পড়িলে, প্রতিকূলতাকে অনুকূল করিয়া লওয়াই জীবের জীবত্ব। কাজেই সাধারণ জলচর জীব যে শ্বাসযন্ত্রের সাহায্যে জলের ভিতরকার অক্সিজেন সংগ্রহ কবিয়া জীবিত থাকিত, তাহার পরিবর্ত্তন আবশ্যক হইয়াছিল। জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে স্থলে আসিয়া পড়িলে তাহা দ্বারা বায়ুর অক্সিজেন সংগ্রহ করা যাইত না। এই প্রয়োজনই জলচরের ফুলকোকে (gill) অলস করিয়া রাখিয়া নৃতন শ্বাসযন্ত্র ফুসফুসের (Lungs) উৎপত্তি করিয়াছিল।

 সমেরুদণ্ড জলচর জীব পূর্ব্বোক্ত প্রকারে স্থলচর জীবে পরিণত হইয়া ক্রমোন্নতির পথ ধরিতে পারিয়াছিল কি না, এখন আলোচনা করা যাউক। জলচর জীব পরীক্ষা করিতে গেলে প্রথমেই তাহার মস্তিষ্কের ক্ষুদ্রতা আমাদের চোখে পড়ে। এই অসম্পূর্ণতার কারণ নির্দ্দেশ করা কঠিন নয়। যে জাতি আবশ্যকীয় সমস্ত জিনিষ হাতের

গোড়ায় পাইয়া একঘেয়ে জীবন অতিবাহন করে, তাহার মস্তিষ্কের বিকাশ কোনক্রমেই সম্ভবপর নয়। সর্ব্বদাই প্রায় সমোষ্ণ জলে বিচরণ করিয়া জলচরগণ জীবনকে খুবই একঘেয়ে করিয়া তুলিয়াছিল। শীতাতপ ঝড়বৃষ্টির অত্যাচার হইতে রক্ষা পাইবার জন্য ইহাদিগকে মোটেই বুদ্ধির পরিচালনা করিতে হইত না, এবং আহার্য্যও প্রচুর পরিমাণে হাতের গোড়ায় সঞ্চিত থাকিত। কাজেই জলকে স্থায়ী আবাসস্থান রূপে নির্বাচন করাই ইহাদের সর্ব্বনাশের মূল কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। ইহাদেরি যে সকল বংশধর হঠাৎ স্থলচর হইয়া পড়িয়াছিল, উন্নতি কেবল তাহাদেরি নিকট সুলভ হইয়া আসিয়াছিল।

 স্থলচর হইয়া জীবগণ বহুদিন একভাবে চলিতে পারে নাই। শীঘ্রই আর এক সঙ্কটকাল উপস্থিত হইয়াছিল। স্থলচরগণ অবস্থাবিশেষে পড়িয়া পক্ষী এবং স্তন্যপায়ী এই দুই পৃথক্ জাতিতে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। এই জাত্যন্তর পরিগ্রহের কারণ নির্ণয় করিতে গেলে, রক্তসঞ্চলন-পদ্ধতি ও শ্বাসযন্ত্রের ক্রমিক পরিবর্ত্তন অনুসন্ধিৎসুর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সাধারণ স্থলচরদিগের মধ্যে যাহাদের হৃৎপিণ্ডের প্রকোষ্ঠের সংখ্যা বাড়িয়া গিয়াছিল, এবং সঙ্গে সঙ্গে ফুস্‌ফুসের আয়তনও প্রসারিত হইয়াছিল, তাহারা আর পূর্ব্বের প্রকৃতি রক্ষা করিয়া থাকিতে পারে নাই। বৃহৎ ফুস্‌ফুসের সাহায্যে পরিষ্কৃত হইয়া বিশুদ্ধ রক্ত সর্ব্বদাই তাহাদের ধমনীতে চলিত। তাছাড়া দেহাভ্যন্তরে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের যোগে প্রবলভাবে রাসায়নিক কার্য্য শুরু হওয়ায়, পূর্ব্বপুরুষদিগের তুলনায় তাহাদের শরীরের তাপও যথেষ্ট বৃদ্ধি পাইয়া গিয়াছিল। এই প্রকারে নবশক্তিযুক্ত হইয়া নুতন জীবগণ অলস হইয়া বসিয়া থাকিতে পারে নাই। সেই সময়ে সমগ্র ভূভাগ জলচর জীব হইতে উৎপন্ন মহাকায় সরীসৃপ (Reptiles) দ্বারা আকীর্ণ ছিল। ইহাদেরি সহোদরগণ যখন নূতন শক্তি এবং উন্নত প্রকৃতি লইয়া জন্মগ্রহণ করিল, তখন নূতন পুরাতনে ঘোর সংগ্রাম উপস্থিত হইয়াছিল। নূতন জীব প্রচুর অক্সিজেন দেহস্থ করিয়া যে শক্তির সঞ্চয় করিত, তাহাই উহাদিগকে মহাকায় সরীসৃপদিগের গ্রাস হইতে রক্ষা করিত। ক্ষিপ্রতা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের প্রতিযোগিতায় পুরাতন নূতনকে পরাভব করিতে পারিত না। ইহা ছাড়া এই সময়ে নূতন জাতিতে আর যে একটি শুভ লক্ষণ প্রকাশ পাইয়াছিল, তাহা পুরাতনকে আরো পশ্চাতে রাখিয়াছিল। পুরাতন জীবগণ বংশবিস্তারের জন্য অণ্ড প্রসব করিত, তাহাদেরি সন্তানদিগের শরীরে যখন উষ্ণ শোণিতধারা বহিতে লাগিল, তখন এই সৌভাগ্যবান্ বংশধরগণ অণ্ড প্রসব অভ্যাস ত্যাগ করিয়া জীবন্ত শাবক প্রসব করিতে আরম্ভ করিল। এই ব্যাপারটি নূতন জীবগুলিকে মনুষ্যত্বের দিকে এত অধিক অগ্রসর করিয়াছিল যে, মূল জীবের মনুষ্যত্বলাভের আশায় এখানেই জলাঞ্জলি পড়িয়াছিল।

 নূতন জীব নিঃসহায় শিশুসন্তানগুলিকে প্রসব করিয়া প্রথম প্রথম বড়ই গোলযোগে পড়িত। শাবকগুলিকে শত্রুর কবল হইতে রক্ষা করা তাহাদের জীবনের একটা প্রধান কর্ত্তব্য হইয়া দাঁড়াইত। তত্ত্ববিদগণ বলেন, সন্তানরক্ষার এই চেষ্টাই জীবগণকে উন্নতির পথ দেখাইয়া দিয়াছিল। অনেক সময় দেখা যায়, কোন বিশেষ উন্নতির জন্য যখন সকল অবস্থাই অনুকূল, তখন প্রকৃতি সেই উন্নতিপথ রোধ করিবার জন্য মোহিনী বেশে আসিয়া জীবকে বিপথগামী করিয়া দেয়। নিঃসহায় শাবকগুলিকে রক্ষা করিবার উপায় উদ্ভাবনের জন্য যখন জীবগণ ব্যস্ত, তখন কাহারো উদরের নিম্নে চর্ম্মপুট নির্ম্মাণ করিয়া বা কাহারো লাঙ্গুলে শাবক ঝুলাইয়া রাখিবার ব্যবস্থা করিয়া দিয়া স্বয়ং প্রকৃতি জীবগণের চিন্তা দূর করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। কাঙ্গারু প্রভৃতি জীব প্রকৃতির এই অবাচিত দান গ্রহণ করিয়া চিন্তার দায় হইতে মুক্তিলাভ করিয়াছিল। অপর জীবগণ মোহিনী প্রকৃতির মায়ায় ধরা দেয় নাই। ইহারা নৈসর্গিক উপায় ত্যাগ করিয়া, স্বাধীন চিন্তার সাহায্যে শাবকরক্ষার উপায় উদ্ভাবন করিবার জন্য চেষ্টা আরম্ভ করিয়াছিল।

 শাবকদিগকে স্তন্যদান করিলেই পিতামাতার কর্ত্তব্য শেষ হয় না। শিক্ষা প্রদানেরও প্রয়োজন। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা বংশধরদিগকে জানাইবার যে, একটুও আবশ্যক আছে, ইহার পূর্ব্বে কোন জীবই তাহা ভাল করিয়া অনুভব করে নাই। নিঃসহায় শিশুসন্তান প্রসব করিতে আরম্ভ করিয়া অবধি জীবগণ এই ব্যাপারটির প্রয়োজনীয়তা বুঝিতে আরম্ভ করিয়াছিল। বৈজ্ঞানিকগণ বলেন, এই জ্ঞান এবং পূর্ব্বোক্ত স্বাধীন চিন্তার চেষ্টা স্তন্যপায়ীদিগকে মনুষ্যত্বের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর করিয়াছিল।

 আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি, যে জাতি বা যে ব্যক্তি জীবনের সমগ্র আবশ্যক সামগ্রী সর্ব্বদাই সম্মুখে প্রস্তুত দেখিতে পায়, তাহার ভবিষ্যৎ উন্নতির আশা অতি অল্পই থাকে। পক্ষিজাতি ও স্তন্যপায়িগণ একই মাতৃগর্ভ হইতে প্রসূত হইয়াছিল, এবং উষ্ণ শোণিত-ধারায় উভয়েরই দেহ শক্তিশালী হইত। সুতরাং এই অবস্থায় উভয়েরই উন্নতি অবশ্যম্ভাবী বলিয়া মনে হইবারই কথা। কিন্তু পক্ষিজাতি উন্নতির পথ ধরিতে পারে নাই। পূর্ব্বোক্ত বিঘ্নটি আসিয়া পথ রোধ করিয়া দাঁড়াইয়াছিল। ইহারা অতি অল্পকাল মধ্যে শরীরের অনেক উন্নতি করিয়াছিল। অদ্যাপি ইহাদের উন্নতদেহের নিকট শ্রেষ্ঠ জীব মনুষ্যকেও পরাভব মানিতে হয়। কিন্তু শরীররক্ষার জন্য যাহা কিছু আবশ্যক তাহার সকলি সম্মুখে প্রস্তুত পাইয়া তাহারা বুদ্ধিচালনার সুযোগই পায় নাই। ইহাই মনুষ্যত্বের সোপানে উঠিবার পথে কণ্টক রোপণ করিয়াছিল। দৈহিক পূর্ণতার সহিত কোন প্রকারে যদি বুদ্ধির পূর্ণতা আসিয়া যোগ দিত, তাহা হইলে পক্ষিজাতি যে কি আশ্চর্য্য জীবে পরিণত হইত তাহা আমরা কল্পনাই করিতে পারি না।

 যাহা হউক সুপথগামী স্তন্যপায়িগণ ইহার পর কোন্ পথ অবলম্বন করিয়া মনুষ্যত্বের দিকে আরো অগ্রসর হইয়াছিল, এখন তাহার আলোচনা করা যাউক। এই পথ আবিষ্কারের জন্য আধুনিক জীবতত্ত্ববিদগণকে বহু গবেষণা করিতে হইয়াছিল। গবেষণাকারীদিগের মধ্যে প্রায় সকলেই এখন একবাক্যে বলিতেছেন, মহাকায় সরীসৃপ দ্বারা আচ্ছন্ন পৃথিবীতে ক্ষুদ্রকায় স্তন্যপায়ী জীবের আবির্ভাব হইলে, ঐ সকল বৃহৎ জীবের আক্রমণ হইতে রক্ষা পাইবার জন্য স্তন্যপায়ীদিগকে নিরাপদ স্থান অনুসন্ধান করিতে হইয়াছিল। সে সময় বৃহৎ বৃক্ষের অভাব ছিল না। জীবতত্ত্ববিদ্‌গণ বলেন, সম্ভবতঃ এই সময়ে অধিকাংশ স্তন্যপায়ী জীবই আধুনিক অপোসম্ (Opossum) প্রভৃতি প্রাণীর আকার ধারণ করিয়া বৃক্ষচর হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। ভূ-তত্ত্ববিদ্গণও এই সিদ্ধান্তের অনুমোদন করিতেছেন। অতি প্রাচীন শিলাস্তরে যে সকল জীবের চিহ্ন আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহাদের অনেকগুলিকেই বৃক্ষচর বলিয়া মনে হয়।

 বৃক্ষচর প্রাণীর দেহ পরীক্ষা করিলে, গাছ আঁক্‌ড়াইয়া ধরিবার জন্য তাহাতে কেবল দুইটিমাত্র সুব্যবস্থা দেখা যায়। কতকগুলি প্রাণী তাহাদের দীর্ঘ নখ দিয়া শাখা প্রশাখা আঁক্‌ড়াইয়া বৃক্ষে বাস করে। অপর কতকগুলি তাহাদের অঙ্গুলিগুলিকে দীর্ঘ করিয়া ডাল ধরিবার সুবিধা করিয়া লয়। কোন্ প্রাকৃতিক অবস্থায় পড়িয়া সাধারণ স্তন্যপায়ী জীব ক্রমে দীর্ঘনখী বা দীর্ঘাঙ্গুলি প্রাণীতে পরিণত হইয়াছিল তাহা এখন স্থির করিবার উপায় নাই। তবে সাধারণ স্তন্যপায়ী প্রাণী হইতেই যে, উক্ত দুই শ্রেণীর উৎপত্তি হইয়াছিল তাহা সুনিশ্চিত, এবং প্রতিযোগিতায় নখিগণকে পরাস্ত করিয়া অঙ্গুলিযুক্ত বৃক্ষচরগণই যে, মনুষ্যত্বের দিকে অগ্রসর হইয়াছিল, তাহাও স্থির।

 নখীদিগের নখই উন্নতির অন্তরায় হইয়াছিল। নখ দ্বারা ভাল করিয়া বৃক্ষশাখা আঁড়াইয়া ধরা বড়ই কষ্টকর। দেহ পুষ্ট হইলে এই কার্য্য একেবারে অসম্ভবই হইয়া দাঁড়ায়। কিন্তু বৃহৎ অঙ্গুলিযুক্ত প্রাণী যতই পুষ্টাবয়ব হউক না কেন, অঙ্গুলি দ্বারা শাখা ধরিয়া সে অনায়াসে বৃক্ষে বিচরণ করিতে পারে। বৈজ্ঞানিকগণ বলেন, নখের এই অনুপযোগিতাই বৃক্ষচারী নখিগণকে ক্ষুদ্রাবয়ব করিয়া রাখিয়াছিল। অপরদিকে দীর্ঘ অঙ্গুলিযুক্ত প্রাণিগণ ক্রমে দেহের সর্ব্বাঙ্গ পুষ্ট করিয়া উন্নত হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।

 যে সকল মানসিক শক্তি মনুষ্যকে ইতর প্রাণী হইতে পৃথক করিয়া রাখিয়াছে, সেগুলির আলোচনা করিতে গেলে গণনাশক্তির কথা সর্ব্বাগ্রে আমাদের মনে পড়িয়া যায়। পাঁচটি জিনিষের সহিত আর পাঁচটি জিনিষ যোগ করিলে, এই নূতন জিনিষগুলি যে পূর্ব্বের দ্বিগুণ হইয়া পড়িবে, তাহা ধারণা করিবার শক্তি কেবল মনুষ্যজাতিরই নিজস্ব। এই জ্ঞানের উন্মেষতত্ত্ব লইয়া ডাক্তার ওয়ালেস্ ও ডারুইন প্রভৃতি মহা পণ্ডিতগণ অনেক গবেষণা করিয়াছেন, কিন্তু কেহই স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারেন নাই। দুই একটি নব্য পণ্ডিত এ সম্বন্ধে গবেষণা করিয়া বলিতেছেন, পুষ্টাঙ্গ স্তন্যপায়িগণ যখন শাখী হইয়া বৃক্ষে বিচরণ করিতেছিল, সম্ভবতঃ সেই সময়েই ইহাদের মস্তিষ্কে গণনাশক্তির উন্মেষ হইয়াছিল। শাখী প্রাণিগণ যখন বৃক্ষ হইতে বৃক্ষান্তরে লাফাইয়া পড়িত, তখন তাহাদিগকে বিশেষ চেষ্টা করিয়া দূরত্বের একটা নির্ভুল হিসাব মনে স্থির রাখিতে হইত। এই হিসাবের ভুলে হয়ত প্রথমে অনেক প্রাণীকে ভূপতিত হইয়া জীবন বিসর্জ্জন করিতে হইয়াছিল, কিন্তু শেষে তাহারা আর সে প্রকার ভুল করিত না। ইহা ছাড়া হস্ত পদের পেশীগুলিকে কত সঙ্কুচিত করিলে এক লম্ফে কতদুর পৌঁছান

যায়, শাখী স্তন্যপায়ীদিগকে তাহারও একটা হিসাব করিতে হইত, শেষে হয়ত এই হিসাবগুলি তাহারা যন্ত্রবৎ করিত, কিন্তু তথাপি পূর্ব্বোক্ত ব্যাপারগুলিই যে স্তন্যপায়ীদিগের গণিত-জ্ঞানের উন্মেষ করাইয়া দিয়াছিল তাহা আর অস্বীকার করা যায় না।

 যখন কোন প্রাণী একটি বিশেষ শক্তি হইতে বঞ্চিত হয়, প্রায়ই অপর আর একটি শক্তি সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পাইয়া সমগ্র শক্তিসমষ্টিকে পূর্ণ রাখে। ইহা একটা পরীক্ষিত প্রাকৃতিক নিয়ম। অন্ধের শ্রবণ ও স্পর্শশক্তির তীক্ষ্ণতা এবং বধিরের দৃষ্টিশক্তির প্রাখর্য্য চিরপ্রসিদ্ধ। এই প্রাকৃতিক নিয়মটিকে মনে রাখিয়া বৈজ্ঞানিকগণ বলেন, যখন মানবের অতি প্রাচীন পূর্ব্বপুরুষগণ স্তন্যপায়ীর আকারে বৃক্ষে বিচরণ করিতেছিল, তখন সেই সকল প্রাণীতে আরো কতকগুলি মনুষ্যসুলভ শক্তির সঞ্চার হইয়াছিল। অনেক ইতর প্রাণীর তুলনায় মানুষের দৃষ্টি ও ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত অল্প। বৈজ্ঞানিকগণ বলেন, মানবের প্রাচীন পূর্ব্বপুরুষগণ যখন শাখীর আকারে ছিল, তখন ধরাতলবিহারী প্রাণীদিগের ন্যায় তাহাদের ঘ্রাণ বা দৃষ্টিশক্তির চালনা করিতে হইত না। কাজেই ব্যবহারের অভাবে এগুলি ক্রমে দুর্ব্বল হইয়া গিয়া অপর শক্তির উন্নতি করিতে আরম্ভ করিয়াছিল। এই দুর্ব্বলতা বৃক্ষচর প্রাণীকে মনুষ্যত্বের দিকে যে, কত অগ্রসর করিয়াছিল তাহার ইয়ত্তা করা যায় না। ঘ্রাণশক্তির তীক্ষ্ণতা হারাইয়া ইহারা যখন কুকুরের মত গন্ধগ্রহণ করিয়া আহার্য্য অনুসন্ধানাদি করিতে পারিত না, এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টির অভাবে দূরস্থ শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করা যখন তাহাদের পক্ষে অসম্ভব হইয়া দাঁড়াইয়াছিল, তখন আত্মরক্ষার অন্য উপায় না থাকায় বুদ্ধির পরিচালনা করিয়া কার্য্য সম্পন্ন করা ব্যতীত তাহাদের আর গতান্তর ছিল না। এই পরিবর্ত্তনই ইহাদের উন্নতির পথ উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছিল।

 ইহার পর পুর্ব্বোক্ত প্রাণীদিগের মধ্যে বুদ্ধি-পরিচালনার কৌশল লইয়াই প্রতিযোগিতা চলিয়াছিল বলিয়া মনে হয়। বৃক্ষবিহারী প্রাণী হইতে যখন হস্তপদাদিযুক্ত মনুষ্যাকৃতি জীবের উৎপত্তি হইয়াছিল, তখন উহাদিগকে পশুপক্ষী বধ করিয়াই জীবন ধারণ করিতে হইত। বলা বাহুল্য এই কার্য্য, তাহাদের বুদ্ধিবিকাশের খুবই সাহায্য করিত। সমস্ত বৎসর ধরিয়া কোন স্থলেই হাতের গোড়ার শিকার পাওয়া যায় না। কাজেই বুদ্ধিমান্ শিকারীকে ভবিষ্যতের চিন্তা অভ্যাস করিতে হইয়াছিল। যাহারা এই চিন্তায় অনভ্যস্ত ছিল ক্ষুৎপিপাসা ও অনাহারে তাহাদের সকলকে সবংশে মৃত্যুমুখে পড়িতে হইত। এই প্রকারে কেবল একটিমাত্র উন্নতবুদ্ধি নরাকৃতি জাতি পৃথিবীতে টিকিয়া থাকিতে পারিয়াছিল। ইহাকেই আধুনিক মানবজাতির পিতামহ বলা যাইতে পারে। এই অসম্পূর্ণ মানবই ধীরে ধীরে পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হইয়া আধুনিক মনুষ্যজাতির সৃষ্টি করিয়াছে।

 মনুষ্যসৃষ্টির ঠিক্ পূর্ব্বেকার ব্যাপারগুলি আলোচনা করিলে মনে হয়, অসম্পূর্ণ মানব কতকগুলি প্রাকৃতিক দানকে অব্যবহারে কার্য্যের অনুপযোগী করিয়া নিজের উন্নতি খুব দ্রুত করিয়া তুলিয়াছিল। এই স্বেচ্ছাকৃত নিঃসহায়তা মানুষকে ঘেরিয়া না দাঁড়াইলে, সেই মানুষ কখনই এতদিনে এখনকার মানুষে পরিণত হইতে পারিত না। সেই নিঃসহায়তাই মানুষকে গৃহবস্ত্র ও অস্ত্রাদি নির্ম্মাণের কৌশল শিখাইয়াছে। মানুষ যদি পক্ষীর ন্যায় প্রকৃতিদত্ত বস্ত্রে দেহ আবৃত রাখিত, এবং তাহাদের ন্যায় পক্ষবিশিষ্ট হইয়া যথেচ্ছা গমনাগমন করিয়া সহজে আহার্য্য সংস্থান করিতে পারিত, তবে আজ আমরা মনুষ্যজাতিতে আধুনিক সভ্যতার লেশমাত্র দেখিতাম না, এবং উড়িবার কল আবিষ্কারের জন্য দেশের বড় বড় পণ্ডিতদিগকে চিন্তাকুল দেখিতাম না। প্রকৃতির বৈরিতাই পশুত্বে মনুষ্যত্বের আরোপ করিয়াছে।