বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রাচীন বাংলার গৌরব/লুইপাদ ও তাঁহার সিদ্ধাচার্যগণ

উইকিসংকলন থেকে

১২

লুইপাদ ও তাঁহার সিদ্ধাচার্যগণ

 বাংলার দ্বাদশ গৌরব লুইপাদ ও তাঁহার সিদ্ধাচার্যগণ। লুইপাদের কথা পূর্বে দুই-একবার বলিয়াছি। তিনি আদি-সিদ্ধাচার্য ছিলেন। অনেক জায়গায় তাঁহাকে আদি-সিদ্ধাচার্য বলিয়াছে। তাঁহার বাড়ি বাংলায় ছিল। রাঢ়দেশে এখনও তাঁহার নামে পূজা হয়, তাঁহার নামে পাঁটা ছাড়িয়া দেয়। ময়ূরভঞ্জেও তাঁহার পূজা হয়। তিব্বতীরা তাঁহাকে সিদ্ধাচার্য বলিয়া পূজা করে। তিনি অনেক বাংলা গান লিখিয়াছেন, অনেক সংস্কৃত বৌদ্ধ গ্রন্থের টীকা-টিপ্পনীও লিখিয়া গিয়াছেন, তিনি একটি সম্প্রদায়ই সৃষ্টি করিয়াছেন। সে সম্প্রদায় হয় সহজযান হইবে, নাহয় সহজযানেরই কোন ভাগ হইবে।

 সিদ্ধাচার্যগণ এককালে যে বাংলায় ও পূর্ব-ভারতে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিলেন, তাহার আমরা একটি প্রমাণ পাইয়াছি। খ্রীস্টের জন্মের তেরোশত বৎসর পরে হরিসিংহ নামে একজন রঘুবংশী মিথিলায় রাজা হইয়াছিলেন। তিনি এক সময় নেপাল আক্রমণ করিয়াছিলেন, তাঁহার ভয়ে বাংলা ও দিল্লির মুসলমানেরা ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল। পরিণামে তাঁহারই বংশের সন্তান নেপালে রাজা হন। হরিসিংহের মন্ত্রী চণ্ডেশ্বর অনেকগুলি স্মৃতির পুস্তক লেখেন। তাঁহার সভায় একজন কবি ছিলেন, তিনি সংস্কৃতে বেশ প্রহসন লিখিতেন। ইহার নাম জ্যোতিরীশ্বর কবিশেখরাচার্য। ইনি বোধ হয় বাংলাতেও কবিতা লিখিতেন। ইঁহার আধা-বাংলা, আধা-সংস্কৃত একখানি অপূর্ব পুস্তক আছে, তাহার নাম বর্ণনরত্নাকর। কবিতা লিখিতে গেলে কাহার কিরূপ বর্ণনা করিতে হয়, সেই বিষয়ে উপদেশ দেওয়া পুস্তকের উদ্দেশ্য। তিনি ঐ পুস্তকে চৌরাশি সিদ্ধের নাম করিতে গিয়া ছিয়াত্তর জনের নামমাত্র করিয়াছেন, ইহাদের মধ্যে লুইএর অনেকগুলি শিষ্যের নাম আছে। হরিসিংহের সময় পর্যন্ত লুইএর দল যে চলিয়া আসিতেছিল, ইহাতেই বোধ হয় যে, লুই একজন অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন।

 তাঞ্জুরে লেখা আছে যে, লুইকে মৎস্যান্ত্রাদ বলিত, অর্থাৎ তিনি মাছের পোঁটা খাইতে বড়ই ভালবাসিতেন। (কোন্ বাঙালীই বা না বাসেন!) তাঞ্জুরে আবার সেইখানেই লেখা আছে, “তাই বলিয়া লুই মৎস্যেন্দ্রনাথ নহেন, মৎস্যেন্দ্রনাথ মীননাথের পুত্ত্র, লুই মহাযোগীশ্বর।”

 সিদ্ধাচার্যগণের মধ্যে লুই, কুক্কুরী, বিরুআ, গুড়রী, চাটিল, ভুসুকু, কাহ্নু, কামলি, ডোম্বী, শান্তি, মহিত্তা, বীণা, সরহ, শবর, আযদেব, ঢেণ্ঢন, দারিক, ভাদে, তাড়ক—এই কয়জনের ‘চর্যাপদ’ বা কীর্তনের গান পাওয়া গিয়াছে। ঐ সকল পদ মুসলমান বিজয়ের পূর্বেই দুর্বোধ হইয়া উঠিয়াছিল, তাই সহজিয়ামতে উহার সংস্কৃত টীকা করিতে হইয়াছিল। ইহা ছাড়াও বহু সংখ্যক দোহাকোষ ছিল। ঐ সকল দোহাকোষেরও সংস্কৃত টীকা ছিল। অনেকগুলি দোহাগীতিকা ছিল, তাহারও সংস্কৃত টীকা ছিল। এই সমস্তেরই ভুটিয়া ভাষায় তর্জমা আছে। যে কয়জন সিদ্ধাচার্যের নাম করিলাম, ইঁহাদের সকলেরই গ্রন্থ আছে, সমস্তই ভুটিয়া ভাষায় তর্জমা হইয়া গিয়াছে। সুতরাং ভুটিয়া ভাষাগ্রন্থ, বিশেষ তাঞ্জুর গ্রন্থ খুঁজিলে যে শুধু বাঙালীদের ধর্মমত পাওয়া যাইবে এমন নয়, বাংলা সাহিত্যেরও একটি ইতিহাস পাওয়া যাইবে। বাঙালীর পূর্বপুরুষের কথা বাঙালী কিছুই জানেন না, কিন্তু তাঁহাদের শিষ্য ভুটিয়ারা বিশেষ যত্ন করিয়া তাঁহাদের গ্রন্থ রক্ষা করিতেছে। এটা বাঙালীর কলঙ্কের কথা হইলেও তাঁহার পূর্বপুরুষগণের বিশেষ গৌরব, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই!