প্রাচীন সাহিত্য/মেঘদূত

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

মেঘদূত

 রামগিরি হইতে হিমালয় পর্যন্ত প্রাচীন ভারতবর্ষের ষে দীর্ঘ এক খণ্ডের মধ্য দিয়া মেঘদূতের মন্দাক্রান্ত ছন্দে জীবনস্রোত প্রবাহিত হইয়া গিয়াছে, সেখান হইতে কেবল বর্ষাকাল নহে, চিরকালের মতো আমরা নির্বাসিত হইয়াছি। সেই যেখানকার উপবনে কেতকীর বেড়া ছিল, এবং বর্ষার প্রাক্কালে গ্রামচৈত্যে গৃহবলিভুক্‌ পাখির নীড় আরম্ভ করিতে মহাব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল, এবং গ্রামের প্রাস্তে জম্বুবনে ফল পাকিয়া মেঘের মতো কালো হইয়াছিল, সেই দশার্ণ কোথায় গেল। আর, সেই-বে অবস্তীতে গ্রামবুদ্ধের উদয়ন এবং বাসবদত্তার গল্প বলিত তাহারাই বা কোথায়। আর, সেই সিপ্রাতটবর্তনী উজ্জয়িনী। অবশু তাহার বিপুল ত্র, বহুল ঐশ্বৰ্ধ ছিল, কিন্তু তাহার বিস্তারিত বিবরণে আমাদের স্মৃতি ভারাক্রান্ত নহে— আমার কেবল সেই-বে হর্ম্যবাতায়ন হইতে পুরবধুদিগের কেশসংস্কারধূপ উড়িয়া আসিতেছিল তাহারই একটু গন্ধ পাইতেছি, এবং অন্ধকার রাত্রে যখন ভবনশিখরের উপর পারাবতগুলি ঘুমাইয়া থাকিত তখন বিশাল জনপূর্ণ নগরীর পরিত্যক্ত পথ এবং প্রকাও স্বযুপ্তি মনের মধ্যে অনুভব করিতেছি, এবং সেই রুদ্ধদ্বার স্বপ্তসৌধ রাজধানীর নির্জন পথের অন্ধকার দিয়া কম্পিতহদয়ে ব্যাকুলচরণক্ষেপে যে অভিসারিণী চলিয়াছে, তাহারই একটুখানি ছায়ার মতো দেখিতেছি, এবং ইচ্ছা করিতেছে তাহার পায়ের কাছে নিকষে কনকরেখার মতো যদি অমনি একটুখানি আলো করিতে পারা যায়।

 আবার সেই প্রাচীন ভারতখওটুকুর নদী-গিরি-নগরীর নামগুলিই বা কী শুন্দর। অবস্তী বিদিশা উজ্জয়িনী, বিন্ধ্য কৈলাস দেবগিরি, রেব। সিপ্র। ৰেজৰতী । নামগুলির মধ্যে একটি শোভা সন্ত্রম শুভ্রতা আছে । সময় যেন তখনকার পর হইতে ক্রমে ক্রমে ইতর হইয়া আসিয়াছে, তাহার ভাষা ব্যবহার মনোবৃত্তির যেন জীর্ণতা এবং অপভ্রংশত ঘটিয়াছে। এখনকার নামকরণও সেই অনুযায়ী । মনে হয়, ঐ রেব-সিপ্রা-নির্বিন্ধ্যা নদীর তীরে অবতী-বিদিশার মধ্যে প্রবেশ করিবার কোনো পথ যদি থাকিত তবে এখনকার চারি দিকের ইতর কলকাকলি হইতে পরিত্রার্ণ পাওয়া যাইত। ; অতএব, বক্ষের যে মেঘ নগনীনগরীর উপর দিয়া উড়িয়া চলিয়াছে, পাঠকের বিরহকাতরতার দীর্ঘনিশ্বাস তাহার সহচর হইয়াছে। সেই কবির ভারতবর্ষ, যেখানকার জনপদবদিগের প্রতিক্ষিলোচন জৰিকার শিখে নাই এবং পুরবস্তুদিগের জলতাৰিজমে পরিচিত নিবিড়পক্ষ কৃষ্ণনেত্ৰ হইতে কৌতুহলদৃষ্টি মধুকরশ্রেণীর মতো উর্ধ্বে উৎক্ষিপ্ত হইতেছে সেখান হইতে আমরা বিচ্যুত হইয়াছি, এখন কবির মেঘ ছাড়া সেখানে জার কাহাকেও দূত পাঠাইতে পারি না।

 মনে পড়িতেছে কোনো ইংরেজ কবি লিখিয়াছেন, মাছুষের এক-একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতে, পরস্পরের মধ্যে অপরিমেয় অশ্রুলবণাক্ত সমূদ্র । দূর হইতে যখনই পরস্পরের দিকে চাহিয়া দেখি, মনে হয়, এক কালে আমরা এক মহাদেশে ছিলাম, এখন কাহার অভিশাপে মধ্যে বিচ্ছেদের বিলাপরাশি ফেনিল হইয়া উঠিতেছে। আমাদের এই সমুদ্রবেষ্টিত ক্ষুদ্র বর্তমান হইতে যখন কাব্যবfণত সেই অতীত ভূখণ্ডের তটের দিকে চাহিয়া দেখি তখন মনে হয়, সেই সিপ্রাতীরের যুখীবনে যে পুষ্পলাবী রমণীর ফুল তুলিত, অৰষ্ঠীর নগরচারে যে বৃদ্ধগণ উদয়নের গল্প বলিত, এবং আষাঢ়ের প্রথম মেঘ দেখিয়া ষে প্রবাসীরা আপন আপন পথিকবধুর জন্ত বিরহব্যাকুল হইত, তাহাদের এবং আমাদের মধ্যে যেম সংযোগ থাকা উচিত ছিল । আমাদের মধ্যে মকুন্তত্বের নিবিড় ঐক্য আছে, অথচ কালের নিষ্ঠুর ব্যবধান। কবির কল্যাণে এখন সেই অতীতকাল অমর সৌন্দর্যের অলকাপুরীতে পরিণত হইয়াছে ; আমরা আমাদের বিরহবিচ্ছিন্ন এই বর্তমান মর্তলোক হইতে সেখানে কল্পনার মেঘদূত প্রেরণ করিয়াছি।

 কিন্তু কেবল অতীত বর্তমান নহে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে অতলম্পর্শ বিরহ । আমরা যাহার সহিত মিলিত হইতে চাহি সে আপনার মানসসরোবরের আগম তীরে বাস করিতেছে, সেখানে কেবল কল্পনাকে পাঠানো যায়, সেখানে সশরীরে উপনীত হইবার কোনো পথ নাই। আমিই বা কোথায় আর তুমিই বা কোথায় ! মাঝখানে একেবারে অনন্ত। কে তাহ উত্তীর্ণ হইবে। অনন্তের কেন্দ্রবর্তী সেই প্রিয়তম DBDD DDBBBB BBBS B BB BBBS DDD BDD DDDDSBB DBBS ইজিতে ভুল-ভ্রান্তিতে আলো-আঁধারে দেহে মনে জন্মমৃত্যুর দ্রুততর স্রোতোবেগের মধ্যে তাহার একটুখানি বাতাস পাওয়া যায় মাত্র। যদি তোমার কাছ হইতে একটা দক্ষিণের হাওয়া আমার কাছে আসিয়া পৌছে, তবে সেই আমার বহুভাগ্য, তাহার, অধিক এই বিরহলোকে কেহই আশা করিতে পারে না।

ভিা সম্ভঃ কিসলয়পুটান দেবদারুক্রমাণাং ।
ষে তৎকীরক্রতিস্থরভয়ে দক্ষিণেন প্রবৃত্তা । ,
জালিদান্তে গুণবতি ময় তে তুষারান্ত্রিবাতা

এই চিরবিরহের কথা উল্লেখ করিয়া বৈষ্ণব কৰি গাহিয়াছেন ।

দুহু কোলে দুহ কঁাদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া। আমরা প্রত্যেকে নির্জন গিরিশৃঙ্গে একাকী দণ্ডায়মান হইয়া উত্তরমুখে চাহিয়া আছি; মাঝখানে আকাশ এবং মেঘ এবং সুন্দরী পৃথিবীর রেবা সিপ্রা অবন্তী উজ্জয়িনী, সুখ-সৌন্দর্য-ভােগ-ঐশ্বর্যের চিত্রলেখা; যাহাতে মনে করাইয়া দেয়, কাছে আসিতে দেয় না; আকাঙ্ক্ষার উদ্রেক করে, নিবৃত্তি করে না। দুটি মানুষের মধ্যে এতটা দূর! কিন্তু এ কথা মনে হয়, আমরা যেন কোনাে-এক কালে একত্র এক মানসলােকে ছিলাম, সেখান হইতে নির্বাসিত হইয়াছি। তাই বৈষ্ণব কবি বলেন : তােমায় হিয়ার ভিতর হইতে কে কৈল বাহির! এ কী হইল। যে আমার মনােরাজ্যের লােক, সে আজ বাহিরে আসিল কেন। ওখানে তত তােমার স্থান নয়। বলরাম দাস বলিতেছেন : তেঁই বলরামের, পহু, চিত নহে স্থির! যাহারা একটি সর্বব্যাপী মনের মধ্যে এক হইয়া ছিল তাহারা আজ সব বাহির হইয়া পড়িয়াছে। তাই পরস্পরকে দেখিয়া চিত্ত স্থির হইতে পারিতেছে না; বিরহে বিধুর, বাসনায় ব্যাকুল হইয়া পড়িতেছে। আবার হৃদয়ের মধ্যে এক হইবার চেষ্টা করিতেছি, কিন্তু মাঝখানে বৃহৎ পৃথিবী। | হে নির্জন গিরিশিখরের বিরহী, স্বপ্নে যাহাকে আলিঙ্গন করিতেছ, মেঘের মুখে যাহাকে সংবাদ পাঠাইতেছ, কে তােমাকে আশ্বাস দিল যে, এক অপূর্ব সৌন্দর্যলােকে শরংপূর্ণিমারাত্তে তাহার সহিত চিরমিলন হইবে। তােমার তাে চেতন-অচেতনে পার্থক্যজ্ঞান নাই, কী জানি, যদি সত্য ও কল্পনার মধ্যেও প্রভেদ হারাইয়া থাক।

১২৯৮