প্রাণোচ্ছ্বাস/অধীনতা
অধীনতা।
(১)
স্বাধীনতা-ধন অমূল্য রতন!
‘শ্ববৃত্তির্ণ কদাচন’—শাস্ত্রের শাসন,
ব্রাহ্মণের প্রতি এই—কঠোর বিধান!
পতিত ব্রাহ্মণ তাহা—করেনা পালন।
(২)
উপবীত-ধারী সব—কলিতে এখন—
যবন-অধীনে করে লেখনী চালন!
মসীজীবী হ’য়ে সবে—ধর্ম্মে বিসর্জ্জন—
দিয়াছেন এবে; নাই ইহার মার্জ্জন।
(৩)
ঋষিগণ যোগরত ছিলেন যখন,
করেছিল এই দেশ কি শোভা ধারণ!
তখন ভারত ছিল স্বর্গের মতন!
পবিত্র ভারত হয়, নরক এখন!
(৪)
পরপদলেহী যত পতিত সন্তান,
রত্নগর্ভা জননীর কলঙ্কের স্থান,
ভাবিলে এসব কথা বিদরে পরাণ!
ভাবে তাই কয় জন পাষণ্ড সন্তান?
(৫)
ভাবিতে ভাবিতে কভু দুঃখ-অবসান—
হ’লেও হইতে পারে! কে করে নির্ব্বাণ
মনানল, যদি সবে ঘুমে অচেতন!
না করে কেহই যদি দুঃখের চিন্তন?
(৬)
দাসত্বে চলিয়া যায় মানসিক তেজ!
মানসিক বৃত্তি গুলি থাকেনা সতেজ!
ধরায় পতিত গ্যাসক্ষয়ে ব্যোমযান,
মানব পতিত হলে তেজ-অন্তর্দ্ধান!
(৭)
নিস্তেজ মানব হ’তে কি আশা বলনা?
রাজ-শূন্য রাজ্যতরি কদাচ চলেনা,
কর্ণধার-শূন্য তরি কখন চলেনা,
বাষ্পশূন্য লৌহযন্ত্র কখন নড়েনা।
(৮)
তেজঃক্ষয় যাতে হয় করোনা এমন—
কাজ; ব্রহ্মতেজ বিনা—নহে হে ব্রাহ্মণ—
কেহ; যদি তুমি হ’তে চাও সুব্রাহ্মণ
করোনা চাকরী কভু—থেক হে স্বাধীন।
(৯)
অধীনতা নানাবিধ আছয়ে সংসারে—
সামাজিক-রাজনীতি-পরিবার-গত,
সকল অপেক্ষা জ্বালাকর ব্যক্তি-গত!
ভোগে সে গো সে যন্ত্রণা, দাসত্ব যে করে।
(১০)
উঞ্ছবৃত্তি ভাল পর-দাসত্ব-অপেক্ষা,
অনশনে মৃত্যু শ্রেয়ঃ হয় তদপেক্ষা!
পতিত আমরা তাহা—বুঝেও বুঝিনা,
ঘৃণা লজ্জা নাই, তাই ভেবেও ভাবিনা!
(১১)
ধর্ম্মবিসর্জ্জন দিয়া অধিক বেতন—
পাইতে লোলুপ মোরা! কি লজ্জার কথা!
বলিতে সকল কথা বড় পাই ব্যথা!
নির্দ্দোষীকে দোষী ব’লে দিই বিসর্জ্জন।
(১২)
লঘু পাপে গুরুদণ্ড করিগো বিধান—
করিতে মনিবে তুষ্ট—নির্দ্দয় এমন!
যেন অর্থ ভিন্ন নাই—আর কিছু ধন!
যেন চতুর্ব্বর্গ-ফল এক প্রমোশন!
(১৩)
এমন অনেক ঘটে, কিছু লাভ নাই—
কেবল সাহেবে তুষ্ট করিতে যাইয়া,
অনেক ঘরের কথা তাঁকে ব’লে দিই—
মাতৃ-কন্যা-কুৎসা গাই তথায় যাইয়া!
(১৪)
অকারণে “বাবা” ব’লে—কলঙ্ক রটাই,—
মায়ের,—নির্জ্জনে ধূলি লইগোপায়ের,
লইয়া মাথায় দিই—ছি ছি কি বালাই,
বাহিরে আসিয়া নিন্দা করি সাহেবের!
(১৫)
ছি ছি কি লজ্জার কথা! মরিগো মরমে!
মরিগো দুঃখের কথা বলিতে, শরমে!
হায় বিধি, কেন মোরা জন্মিয়া মরিনি!
শুনিতে না হ’ত ম’লে দারুণ কাহিনী!
(১৬)
আর্য্যের সন্তান হ’য়ে, দাসত্ব-লাঞ্ছনা!
একি বিধি বল মোর ললাট-লেখনা!
লিখিতে বিদরে প্রাণ!―সহেনা যাতনা!
বলবিধি এর কভু, শেষ কি হবেনা?
(১৭)
বল কবে হবে এই দুঃখ-অবসান?
নিশা যায় দিন আসে দেখিগো বিধান!
আমাদের নিশার কি নাহি অবসান?
অনন্ত অসীম নিশা! একিগো বিধান?
(১৮)
গগণে উদিত চন্দ্র হয় প্রতিপদে,
মোর নিশা গাঢ় হয় প্রতি প্রতি পদে;
শুক্লপক্ষ নাহি আসে সদা কৃষ্ণপক্ষ!
মম পক্ষে কেন বিধি জানিনা বিপক্ষ!
(১৯)
এইরূপে চির দিন যদি যায় দিন,
কিসের লাগিয়া প্রাণ ধরিবে এ দীন?
বিষহীন-ফণী-পারা হ’য়ে তেজোহীন,
মৃতের মতন আর কাটাব কদিন?
(২০)
দয়াময়! দয়া ক’রে লহ সবে কোলে,
কাতর হইয়া ডাকি আমরা সকলে;
দাসত্ব-পীড়িত জনে দেহ পদাশ্রয়,
ভারত-বাসীরা আজ বড় নিরাশ্রয়!
(২১)
না আছে এমন জন কাঁদে কাছে যার,
পরাণ খুলিয়া ব’লে হৃদয়-যাতনা!
পুত্রের দুঃখেতে কাঁদে হৃদয় তোমার,
তোমার নিকটে আশা পাইতে সান্তনা!
(২২)
বিদিত জগতে তুমি অতি দয়াময়,
নিরাশ্রয়, শোকাতুর, দীনের সহায়!
দীন নিরাশ্রয় তাই ভারত-সন্তান,
লয়েছে শরণ তব পেতে পরিত্রাণ।
(২৩)
অনেক যন্ত্রণা তারা পেয়েছে জীবনে,
আরও যন্ত্রণা দিলে সহিবে কেমনে?
পরীক্ষা হয়েছে শেষ, দেহ পরিত্রাণ!
এই ভিক্ষা মাগি মোরা ভারত-সন্তান!
(২৪)
তুমি না করিলে ত্রাণ, সাধ্য আর কার—
অসাধ্য রোগের হায়! করে প্রতিকার?
এস দয়াময়! দীনে করহ উদ্ধার
তাপিত সন্তান ডাকে, সহিত শ্রদ্ধার!