বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রাণোচ্ছ্বাস/কৃতজ্ঞতাপ্রকাশ ও প্রার্থনা

উইকিসংকলন থেকে

কতজ্ঞতা প্রকাশ ও প্রার্থনা।

(১)

কেমনে বলিব তুমি নহ বিদ্যমান
হে আনন্দময়ী মাতঃ! দেখি অনুক্ষণ—
রবে এ বিশ্বসংসারে, অপূর্ব্ব কৌশল—
তব—প্রত্যেক বস্তুতে; অদ্ভুত সকল!

(২)

মাতৃ-কুক্ষি-কারাগারে ছিলাম যখন,
কেমন সুন্দর-ভাবে রক্ষিলে আমায়!
পাছে কোনরূপে লাগে গায়েতে বেদন,
ব’লে, জলকোষ সৃজিলা তথায়!

(৩)

অক্ষম জানিয়া মোরে করিতে আহার,
মাতৃ-নালে মম নাল করিলা যোজিত;
জননী যাহাই খান—আমার আহার—
হয় গো তাহাতে; তব অপরূপ লীলা!

(৪)

ভূমিষ্ঠ হইনু যেই, জননীর স্তনে—
দিলা তুমি দুগ্ধ মম তরে সুমধুর!
দেখিবার তরে দিলা নয়ন আননে,
কর্ণ দিলা গীত বাদ্য শুনিতে মধুর!

(৫)

বিবিধ সুরস দ্রব্য আস্বাদন তরে—
দিলা মোরে জিহ্বা তুমি; দিলা ঘ্রাণেন্দ্রিয়
বিবিধ ফুলের বাস আঘ্রাণের তরে;
স্পর্শসুখ ভোগ জন্য দিলা স্পর্শেন্দ্রিয়।

(৬)

হস্ত দিলা কাজকর্ম্ম করিবার তরে;
পাদদ্বয় দিলা মোরে করিতে ভ্রমণ—
একস্থান হ’তে অন্য স্থানেতে গমন;
যে যে যন্ত্র প্রয়োজন দিল। অকাতরে।

(৭)

তব কৃপাগুণে মাগো! শশিকলা-সম
দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে হইনু এমন!
পড়েছিনু কতবার রোগেতে বিষম!
বাঁচিতাম না গো বিনা তোমার যতন।

(৮)

বিপদে পড়িনু কত নাহিক গণনা,
উদ্ধার কেমনে হব ভাবিয়া না পাই!
কিন্তু মাগো যত বার ডেকেছি তোমায়,
অমনি আসিয়া তুমি করেছ উপায়!

(৯)

কাল কি খাইব তার, না ছিল সংস্থান;
(কিন্তু) কোথা হ’তে আসে অর্থ, না জানি সন্ধান;
মায়ের, ভক্তের প্রতি অশ্চির্য্য বিধান!—
যে করেছে মার পায়ে, আত্ম-বলিদান!

(১০)

নিজের তরে না শুধু, পরের জন্যেতে
যা চেয়েছি তা পেয়েছি, মায়ের কাছেতে;
এযে অদ্ভুত ঘটনা, কে করে বর্ণনা?
মায়ের ভক্তের প্রতি অপার করুণা!

(১১)

প্রতি দিন কৃপা তব দেখিয়া নয়নে,
অভাগা, তোমাকে মাগো ভুলিবে কেমনে?
অবিশ্বাস, কৃতঘ্নতা—দুই মহাপাপ—
করিলে পাইব শেষে বড় মনস্তাপ!

(১২)

তাইমা বলি গো শুন দেহ মোরে বর—
যেন অবিশ্বাসী, যেন কৃতঘ্ন, না হই;
জানি নাহি প্রায়শ্চিত্ত এ দুই পাপের!
জানি নাহি প্রায়শ্চিত্ত এর মৃত্যু বই!

(১৩)

জ্বলন্ত তোমার মূর্ত্তি দেখি স্তরে স্তরে!
দেখি অপূর্ব্ব কৌশল আপন শরীরে;
একটি মানব-দেহ একটি জগৎ!
তাহার ভিতরে আছে শৃঙ্খলা বৃহৎ।

(১৪)

স্থূল সূক্ষ্ম বহু যন্ত্র ক―রে অবিরাম,—
কাজ তথা; চলে রক্ত,হ’তে রক্তধাম—
শিরায় শিরায় তথা ধমনী-ভিতরে,
যোগায় ধমনী শিরা রক্ত স্তরে স্তরে।

(১৫)

ধুইয়া সকল দেহ—দিয়া বল তারে,
দুর্ব্বল দূষিত রক্ত ফেরে নিজ ঘরে;
দ্বিধা-বিভক্ত সে ঘর; হৃৎপিণ্ড নামেতে—
বিদিত বিজ্ঞানে তাহা; না পারি বর্ণিতে—

(১৬)

সূক্ষ শিল্প ইহাতে যা আছে অপরূপ!
অপূর্ব্ব ফুস্ ফুস্ যন্ত্র—এর অনুরূপ!
দুইটী পরদা তার,—নির্ম্মল বাতাস—
ঢোকে একটী-ভিতরে; দূষিত বাতাস—

(১৭)

বাহিরায় অন্য দিয়া; দেহের পূরণ—
আর দেহের শোধন,-করে এইরূপে!
বায়ুকে বলেছে প্রাণ—ইহারি কারণ,
প্রাণ বন্ধ হ’লে প্রাণী বঁচিবে কি রূপে?

(১৮)

নিশ্বাস প্রশ্বাস সাম্য-ভাবে যতক্ষণ
থাকে, ততক্ষণ প্রাণী সুস্থভাবে;
ব্যত্যয় হইলে এর, যায় অন্য ভাবে;
বায়ুর প্রকোপ হ’লে হয় তনু ক্ষীণ।

(১৯)

সেই রূপ পিত্ত কফ হইলে কুপিত—
কিম্বা বায়ু পিত্ত কফ,—অথবা একটী—
এর হইলে কুপিত, হয় উপস্থিত—
ঘোর গণ্ডগোল! খসে নক্ষত্র একটী!

(২০)

সামঞ্জস্য তুমি মাগো! সতত রেখেছ;
না জেনে কেবল মোরা তোমার নিয়ম,
দূষি গো তোমায় কত! অপরাধ ক্ষম
কৃপাময়ী ব’লে তুমি চরণে রেখেছ।

(২১)

মস্তক মস্তিষ্কাধার—কেমন সুন্দর—
কেশে ঢাকা, আর কপালে আবৃত!
ভ্রূ-পল্লব-দ্বারা নেত্র রক্ষিত সুন্দর!
শ্রবণ বিবর কিবা কেশেতে রক্ষিত!

(২২)

বসা, মজ্জা, অস্থি, আর ধমনী মণ্ডল,
গ্রন্থি, লোম, লোমকূপ, অঙ্গুলি-সকল—
প্রত্যেকে দেদীপ্যমান অপূর্ব্ব কৌশল
তব, হে আনন্দময়ী! সুন্দর শৃঙ্খলা!

(২৩)

গলনলী দিয়া খাদ্য যায় পাকস্থলী—
তথায় পচিত হ’য়ে যায় পায়ুদেশে;
জীর্ণ খাদ্য হ’তে রক্ত যায় রক্তস্থলী,
অসার খাদ্যের অংশ যায় বহির্দ্দেশে।

(২৪)

শ্রান্তিদূর তরে নিদ্রা করেছ সৃজন;
দিবসে করিয়া শ্রম ক্লান্ত জীবগণ—
আশ্রয় লয় গো তার; নবীভূত হয়—
তাহে সমস্ত শরীর, তোমার কৃপায়।

(২৫)

আমার তরেতে তুমি সৃজিলা পাদপ—
লতা; ফলপুষ্পে পূর্ণ করিলে তাহায়!
সে তরু-তলেতে বসি কত দিন জপ―
করিলাম আমি—স্নিগ্ধ হলেম ছায়ায়।

(২৬)

সুস্বাদ ফলেতে তার, উদর পূরণ
করিলাম কত আমি! কুসুম চয়ন—
করিলাম কত লতা হ’তে অগণন!
করিলাম মনসাধে তোমার পূজন!

(২৭)

ধন ধান্যে পূর্ণ ধরা, করিলা জননী—
সকলি আমার তরে; দিলা অরণ্যানী
ক’রে পূর্ণ শাখি-গণে, তথা পশুপালে;
কত সুখ লিখেছ মা আমার কপালে!

(২৮)

সুখের তীব্রতা মাগো! অনুভব তরে―
তেমতি দিয়াছ দুঃখ ভুঞ্জিবারে মোরে;
মিষ্টান্ন অনেক খেলে হয় রুচি যথা—
তেঁতুল ভক্ষণে, সুখ-পরে দুঃখ তথা!

(২৯)

মম পানীয়ের তরে করিলা স্বজন—
কত নদ নদী! কত হ্রদ ও সাগর!
তাহে ছাড়ি দিলা কত মৎস্য অগণন!
সৃজিলা তীরেতে কত অপূর্ব্ব প্রান্তর!

(৩০)

দিলা মুক্তা শুক্তি-মধ্যে, অনেক প্রবাল-
দ্বীপ সৃজিলা জলেতে; সুবর্ণ রজত
হীরা রাখিলা খনিতে; রাখিলা মৃণাল—
জলে কমল-সহিত; মণি মরকত-

(৩১)

সৃজিলা; সৃজিলা তথা কত পদ্মরাগ;
সৃজিলা চন্দন, ধূপ, ধূনা ও গুগ্‌গুল!
সৃজিলা সূরজ শশী তথা তারাদল!
দিয়াছ সকলে তুমি নিজ নিজ ভাগ!

(৩২)

বঞ্চিত কাহাকে তুমি করোনি ধরায়!
অতি দীন হীন মাগো! তোমার কৃপায়—
পেয়েছে সকলি যাহা তার প্রয়োজন,
না বুঝে কেবল ক’রে দুঃখ অনুক্ষণ।

(৩৩)

স্থূল সূক্ষ্মে নাহি ভেদ! সকলি সমান—
জ্ঞানীর নয়নে! দেখ ক্ষুধা শান্তি পায়—
মোটা সরু ভাতে! মোটা কাপড় সমান
সরু কাপড়ের সঙ্গে— নিবারণ হয়—

(৩৪)

লজ্জা শীত উভয়েতে; প্রবৃত্তি যেমন!
রুচি-অনুসারে হয় মায়ের বিধান!
বাঞ্ছা-কল্পতরু তিনি! যিনি যাহা চান—
একাগ্র সুদৃঢ় মনে, তিনি তাহা পান।

(৩৫)

কেমনে বিশ্বাসী ভক্ত ভুলিবে তোমায়—
বল? যতক্ষণ তার মনেতে রয়েছে—
গাঁথা যত উপকার পেয়েছে ধরায়—
রাশি রাশি, অগণন মাগো! তব কাছে।

(৩৬)

তাই বলি মাগো! দেহ মোরে এই বর—
যত দিন দেহে রবে প্রাণ, তত দিন—
করি যেন মাগো! তব মহিমা ঘোষণ,
সহি যেন দুঃখ কষ্ট হইয়া নীরব।

(৩৭)

সন্দেহ আসিলে ভক্তি রবেনা কখন,
আসন্ন মরণ তব জানিও তখন;
অবিশ্বাস মহাপাপ! সন্দেহ বিষম—
শত্রু, গ্রাসিলে তোমায়, ঘটিবে বিষম।

(৩৮)

তাহ’তে নির্গম নাই সহজে তোমার—
রক্ষা নাই! রক্ষা নাই! বিনা কৃপা মার;
এস তাই প্রাণ-ভরে ডাকি মাকে ভাই,
উচ্চৈঃস্বরে একতানে ডাকি মাকে তাই।

(৩৯)

এস ডাকি মাকে যাতে পরিত্রাণ পাই—
এস প্রাণ ভরে মাকে ডাকি গো সবাই—
এ গ্রহ না ঘটে যেন—তোমার দোহাই—
করো মা! এদের হাত যাহাতে এড়াই!

(৪০)

ওমা! বলি শুন দেহ মোরে এই বর,—
যতক্ষণ মম ক্ষীণ কণ্ঠে রবে স্বর,
গাইতে গাইতে তব মহিমার গান,
ধরা হ’তে যেন পারি করিতে প্রয়াণ!

ওঁ স্বস্তি! ওঁ স্বস্তি!! ওঁ স্বস্তি!!!