প্রাণোচ্ছ্বাস/জাহাজ মঙ্গলার প্রতি
জাহাজ মঙ্গলার প্রতি।
(১)
কি কাজ করিলে হায়! তুমি গো মঙ্গলে!
ডুবাইলে রসাতলে তিন শত জনে?
তিন শত জন সহ আপনি ডুবিলে
অতল গঙ্গার জলে! কারণ কে জানে?
(২)
ভাসাইলা অশ্রুজলে কত শত জনে!
কাঁদিছে জননী কত আজ পুত্ত্র-শোকে!
কাঁদে কত সতী আজ পতি-মৃত্যু-শোকে!
হ’য়ে পাগলিনী তারা—হৃদে বজ্র হানে!
(৩)
প্রতি গৃহে আজ শুন ক্রন্দনের রোল!
শিশু কাঁদে, পত্নী কাঁদে, কাঁদে মাতৃগণ!
আকুল ভারত আজ শুনি গণ্ডগোল!
শোকেতে আকুল আজ সব ভ্রাতৃগণ!
(৪)
হায় কি কুক্ষণে তারা, মঙ্গলা-উপরে—
উঠিয়া বাটীর দিকে ধাবিত হইল!
হায়! কেন অন্ধকারে জাহাজ ছাড়িল?
নিয়তির গতি বল কে রোধিতে পারে?
(৫)
কত অভাগিনী—আজ হ’য়ে নিরাশ্রয়—
কাঁদে উচ্চৈঃস্বরে হ’য়ে আকুল হৃদয়!
চতুর্দ্দিকে অন্ধকার দেখে নিরন্তর!
তাঁদের কপালে আজ যেন যুগান্তর!
(৬)
আহার প্রস্তুত ক’রে, কত যে রমণী—
প্রতীক্ষা করিতেছিল প্রাণপতি তরে—
গণনা তাহার নাই! রতি-পতি-জিনি
প্রাণপতি আসিছেন—ভাবিছে অন্তরে!
(৭)
এক এক করি চারি প্রহর রজনী―
জাগিয়া কাটাল তারা, আশার প্রদীপ—
নিভিল, নিভাল দীপ! আকুল রমণী—
ভাবিয়া পতির তরে! জ্বলে চিন্তাদীপ—
(৮)
অন্তর-ভিতরে হায়! ধিকি ধিকি ধিকি!
এদিকে সূরজ ওই, অরুণ নয়নে,
পূরব সাগর হ’তে—মারি উঁকি ঝুঁকি—
দেখিতে লাগিল সেই কাতর ললনে!
(৯)
বাড়াইতে তাহাদের অন্তর্দাহ যেন,
অনিচ্ছুক হ’য়ে রবি ধীরে গগণেতে—
উঠিতে লাগিল! কিন্তু তাদের এহেন
দুঃখের দুর্দ্দিনে ব্যথা পাইল তাহাতে।
(১০)
বলিল মনেতে তারা—‘হে সূরজ দেব!
কেন উদিলে গগণে আজ—বাড়াইতে—
অভাগিনী-দুঃখ-ভার? বল কোথা দেব!
রেখে এলে পতিগণে, মোদের বধিতে?
(১১)
ব’লে দেও কোথা তাঁরা এবে, যাই চলি—
তথা বিহঙ্গ-গতিতে, আনি পতিগণে!
পতি বিনা গতি নাই! পতিই সকলি―
সতীর! আঁধার সব পতির বিহনে!
(১২)
প্রত্যূষে উঠিরা শয্যা হ’তে মাতৃগণ,
জিজ্ঞাসিল বধূজনে কোথা পুত্ত্র ধন?
রাত্রিতে আসেনি, শুনে প্রাণের রতন,
অমঙ্গল-ভয়ে করে অশ্রু বিসর্জ্জন!
(১৩)
তাহা দেখি শিশুগণ কাঁদিয়া উঠিল,
বাবা বাবা ক’রে তারা ডাকিতে লাগিল!
কোথা বাবা কোথা তুমি? এস ঘরে ফিরে
লহ লহ আমাদের কোলের ভিতরে।
(১৪)
কত যে খাবার তুমি আন প্রতিদিন—
আমাদের তরে! আজ কোথায় রহিলে—
তুমি ভুলিয়া মোদের? মোরা দীনহীন
কাঙ্গাল-সন্তান মত ভাসি অশ্রুজলে।
(১৫)
এস বাবা ত্বরা করি বিলম্ব সহে না!
তোমার জননী কাঁদে! আমাদের মাতা—
তোমার তরেতে কাঁদে, আসিয়া দেখনা?
মোদের অদৃষ্টে কিগো, করিলে বিধাতা?
(১৬)
এইরূপ আন্দোলনে কাটে কিছুকাল;—
এমন সময় এ’ল বারতা করাল—
‘মঙ্গলা ডুবেছে গঙ্গা-জলের ভিতরে,
লইয়। বক্ষেতে তার শত শত নরে!’
(১৭)
প্রতি গ্রামে প্রতি ঘরে উঠিল ক্রন্দন!
বাড়াইল প্রতিধ্বনি সেই ভীম রোল!
শত শত মাত। হ’ল পুত্ত্র-শূন্য-কোল!
গগণ বিদীর্ণ করে সতীর ক্রন্দন।
(১৮)
শিশুগণ-যোগ দেয় সে মহাক্রন্দনে,
উলটি পালটি ক’রে কাঁদে শিশুগণ!
সতীগণ কোলে লয়, আপন নন্দনে,
মুখ পানে চেয়ে ক’রে অশ্রু বিসর্জ্জন।
(১৯)
আবার ফেলিয়া তারে দেয় ধরাতলে!
ছোটে পাগলিনী-প্রায় স্বামীর উদ্দেশে!
শোকের জ্বালায় কভু ডুবিতে সলিলে—
ধায়! উন্মাদিনী-প্রায় ফিরে গৃহে আসে—
(২০)
আবার ছুটিয়া! যেন কোন লক্ষ্য নাই!
দৃষ্টি লক্ষ্য-শূন্য! গতি নির্লক্ষ্য চঞ্চল!
উন্মাদের চিহ্ণ সব! যেন সংজ্ঞা নাই!
ধূলি-বিলুণ্ঠিত তার বসন-অঞ্চল!
(২১)
বধূর দেখিয়া ভাব, শাশুড়ী ব্যাকুল!
সম্বরি আপন শোক, বধূর তরেতে—
উঠিয়া দাঁড়ায়ে ধ’রে বধূরে বসাল,
মাথায় জলের ছিটা লাগিল দিইতে।
(২২)
‘মা! মা!’ করি শিশুগণ ডাকিতে লাগিল,
অনেক ক্ষণের পর চৈতন্য হইল,
তখন সতীর মুখে কথা বাহিরিল
বলিল তখন সতী—‘কোথা প্রাণপতি?’
(২৩)
সে কথা শুনিয়া সবে কাঁদিয়া উঠিল!
উঠিল কান্নার রোল গগন-মণ্ডলে!
এইরূপে প্রতিগৃহ হ’য়ে শোকাকুল—
কাঁদিল! করিল কত বিলাপ কে বলে?
(২৪)
হায়! আজ শূন্য প্রাণে শূন্য গৃহে সবে—
হ’য়ে আত্মহারা রয়! কে করে সান্ত্বনা?
সবে জ্ঞানহারা! লক্ষ্য-বুদ্ধি-হারা সবে!
মৃত্যু যবে দেখা দিবে, যাবে এ যন্ত্রণা!
(২৫)
দয়াময় হে ঈশ্বর! দেহ দয়া করি—
অবলে সান্ত্বনা তুমি! হায় শূন্য ঘরে—
শূন্য প্রাণ ল’য়ে সতী, কাটাবে কি করি,
দুর্ভর জীবন-কাল! জিজ্ঞাসি তোমারে?
(২৬)
ভারত-রমণী হায়! অতি অভাগিনী!
পতি বিনা গতি তার নাহি এ জগতে!
জগৎ-পতিরে তাই ডাকে কাঙ্গালিনী,
বলে দেও কি লইয়া থাকিবে ভারতে?
(২৭)
দুগ্ধপোষ্য শিশু ওই! কি খাইয়া বল—
বাঁচিবে?—কাহার কাছে দাঁড়াবে এখন?
বলে দেও দীননাথ! সংসার অচল―
হ’লে, পূরাবে অভাব, এবে কোন্ জন?
(২৮)
রাজার গৃহিণী হায়! হ’য়ে কাঙ্গালিনী,
কেমনে বলগো ভিক্ষা মাগিবে এখন?
কার দ্বারে দাসী-বৃত্তি করি অনাথিনী—
পূরাবে উদর-ভার, হে মধুসূদন?
(২৯)
আর জননী দুঃখিনী হ’য়ে পাগলিনী―
পুত্ত্র-শোকে—কত দিন কাটাইবে কাল?
অশ্রু-জলে হ’য়ে অন্ধ হায়! অভাগিনী—
অচিরে হারাবে প্রাণ! নিভিবে অনল!
(৩০)
হে বিধাতঃ! তব চক্র বুঝে কার সাধ্য?
অভিপ্রায় কি সাধিলে, তুমি শুদ্ধ জান!
সৃষ্টির কৌশল বুঝা নরের অসাধ্য!
দুর্জ্ঞেয় বিষয়ে মন হয় সন্দিহান।
(৩১)
কে বলিতে পারে কেন দুঃখের আগার—
এই জগৎ-সংসার? কেন হাহাকার—
চতুর্দ্দিকে শ্রুত হয়! কেন অশ্রুজল—
হায় বহে নিরন্তর চক্ষে সবাকার!
(৩২)
দারিদ্র্য, অকাল-মৃত্যু, রোগ, শোক, তাপ—
ধরার ভিতরে কেন প্রভুত্ব করয়ে?
শ্মশানের পার্শ্বে নৃত্য ক’রে মনস্তাপ—
দেয় কেন শোক-দগ্ধ জনের হৃদয়ে?
(৩৩)
প্রগাঢ়-তিমির-মাঝে বিদ্যুৎ-বিকাশ—
যেমতি করয়ে হায়! তিমিরে প্রকাশ,―
তেমতি দুঃখের মাঝে সুখের বিকাশ—
হইয়া করয়ে দুঃখ অধিক প্রকাশ!
(৩৪)
হাঁসি কান্না এক স্থানে দেখা নাহি যায়!
হাঁসির সময় হাঁসি, কান্নার সময়—
কান্না সামঞ্জস্য হ’য়! হাঁসি কান্না হায়!—
এ সংসারে পার্শ্বাপার্শ্বি পরিদৃষ্ট হয়!
(৩৫)
শোক দুঃখ তুলনায় দ্বিগুণিত হয়!
শোকেতে অধীর মম অন্তর যখন,
অন্যদিকে হুলুধ্বনি পড়িছে তখন!
জন্ম মৃত্যু পাশাপাশি—দেখি প্রতিক্ষণ!
(৩৬)
উদর-অন্নের তরে আমি লালায়িত!
পার্শ্বের বাটীতে খায় একই সময়ে—
চর্ব্ব চোষ্য লেহ্য পেয় খাদ্য অগুণিত!
দেখিয়া জঠরানল জ্বলে দ্বিগুণিত!
(৩৭)
শীত-বস্ত্রাভাবে আমি কাঁপি থর থর!
শাল দেশিালা পরে যায় ধনিগণ!
কুটীরে বসতি মোর—সম্মুখে সুন্দর
সুরম্য প্রাসাদ ওই—দগ্ধিছে অন্তর!
(৩৮)
যাদের মরেছে লোক তারা হাহাকার—
করিতেছে অনুক্ষণ! পার্শ্বেতে তাহার—
তাশ পাশা খেলিতেছে—যুবকের দল!
কেহবা করয়ে শুন সঙ্গীত তরল!
(৩৯)
সহিতে কি পারে ইহা যারা শোকাকুল?
এ সকল দৃশ্যে হৃদে বাজে যেন শেল!
আমোদ প্রমোদ সব সুখের সময়—
লাগে ভাল? এ সময় যন্ত্রণা-আলয়!
(৪০)
হে করুণাময়! হ’য়ে করুণানিধান—
নহে সৃজিলা সংসার সামঞ্জস্যময়—
কেন হায়! জান তুমি ইহার কারণ—
তাই ভক্ত জন আজ জিজ্ঞাসে তোমায়।
(৪১)
বলে দেও যাতে পারি বলিতে সবায়—
এ সংসার নহে গো অসামঞ্জস্যময়!
দয়াময় ন্যায়-পর তুমি হে ঈশ্বর!
ভেদাভেদ তব কাছে অসম্ভবপর!
(৪২)
বলে দেও সৃষ্টিতত্ত্ব ভকত জনেরে;
মহিমা-প্রচার তব হউক সংসারে!
অবিশ্বাস চলে যাক্ মন হ’তে দূরে;
সান্ত্বনা পাউক্ লোক আপন অন্তরে!