বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রাণোচ্ছ্বাস/পিতৃদেবের প্রতি

উইকিসংকলন থেকে

পিতৃদেবের প্রতি।

(১)

পিতাগো দেওগো দেখা! ডাকে পুত্ত্র তব;
বৈকুণ্ঠ হইতে এস! দেখি প্রাণভরে!
কত দিন দেখি নাই, তাই দেখিবারে—
হয়েছে বড়ই সাধ—এস ত্বরা করে।

(২)

কত ভাল বেসেছিলে অভাগা সন্তানে,
কেমনে বর্ণিব আমি এক মাত্রাননে?
ফেলিয়া আমায় সেই কিশোর বয়সে,
গিয়াছ চলিয়া দেব—আর খোঁজ নাই!

(৩)

অপরাধ কি চরণে করেছিনু, মন—
ভাবিয়া করিতে স্থির পারেনাকো মম;
যেই অপরাধে তুমি দিয়া বিসর্জ্জন—
স্নেহমায়া পুত্ত্র-প্রতি, গেলা স্বর্গধাম।

(৪)

কত যে কাঁদিনু আমি—মেলিয়া নয়ন,
দেখিলে না তুমি পিতঃ! নিষ্ঠুর নির্দ্দয়!
অথবা কেমনে আমি বলিব তোমায়—
নিষ্ঠুর নির্দ্দয়? তুমি দয়ার নিধান!

(৫)

বলি’ত সকলে—তুমি ধর্ম্ম-অবতার,
দয়াবীর, স্নেহবীর! করুণা অপার—
ছিল দরিদ্রের প্রতি! দাতাকর্ণ দানে!
শান্তিবারি দিতে তুমি শোকাতুর জনে!

(৬)

যত দিন ছিলে তুমি জীবিত ধরায়
মনোদুঃখ কা’কে তুমি দেওনি সজ্ঞানে;
ছাড়িয়া পৃথিবী যবে গেলা স্বর্গধামে,
করিলে ব্যত্যয় এর! একি চমৎকার!

(৭)

যে নীতি ধরায় লোকে করেগো পালন,
স্বর্গে গেলে তার কিগো হয় ব্যভিচার?
জানিনা অজ্ঞানী আমি স্বর্গের বিধান!
বলে দেও পিতঃ মোরে আমি গো অজ্ঞান!

(৮)

ঘুমায়ে শয্যায় আমি থাকিতাম যবে
কতই শুশ্রূষা তুমি করিতে আমার—
বসি শয্যাপার্শ্বে কভু করিতে ব্যজন!
কভু গাত্রঘর্ম্ম বস্ত্রে করিতে মার্জ্জন।

(৯)

গালে হাত দিয়া কত করিতে সোহাগ!
জাগিয়া কৃত্রিম-নিদ্রা-ব্যজে দেখিতাম—
আমি সব!—হায় কোথা সে সুখের দিন—
অপার আনন্দে আমি যবে ভাসিতাম!

(১০)

পিতৃস্নেহ গাঢ়তর ভুঞ্জিয়া শৈশবে,
যৌবনে দিয়াই পাদ হলেম বঞ্চিত—
সেই স্বর্গসুখ হ’তে—অদৃষ্টের দোষে!
করেছিলু মহাপাপ তাই এ দুর্দ্দশা!

(১১)

তা না হ’লে ঋষিসম পাইয়া জনক,
অকালে হারাবে কেন অভাগা তাহায়?
যোগরত ঋষিগণ দীর্ঘজীবী হন,
যোগরত পিতা মোর কেন স্বল্পজীবী?

(১২)

আমারি অদৃষ্ট-দোষে! নতুবা তাঁহার―
ছিলনা কোনও দোষ—নিষ্কলঙ্ক চাঁদ!
আমারি করম-দোষে অকালে তাঁহার—
হইল মরণ; হায় কি অভাগা আমি!

(১৩)

ভুলি নাই এক-দিন-তরে সে মূরতি—
সদাশিব-মূর্তিসম—নয়ন-মোহন!
ভক্তি-উদ্দীপক! তথা শান্তির আধার!
দেখিলে সমস্ত দুঃখ বিদূরিত হয়!

(১৪)

প্রতিষ্ঠা করেছি আমি হৃদয়-মন্দিরে—
সে দেব-মূরতি! নিতি নিতি পূজি তাঁরে—
দিয়া ভক্তি-পুষ্পাঞ্জলি! আদর্শে তাঁহার,
গঠিত চরিত মম, চেষ্টি করিবারে।

(১৫)

সরল, সুধীর, শান্ত, দয়া-বিগলিত,
বিশ্বপ্রেমে মাখা, নিত্য-ধর্ম্ম-পরায়ণ,
সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয়, মধুর-ভাষিত,—
সর্ব্বগুণাধার পিতা ছিলেন আমার!

(১৬)

এখন সেরূপ লোক দেখিনা নয়নে,
এখন স্বার্থের রাজ্য এসেছে ভুবনে;
নিজ নিজ ভোগ তরে সকলে ব্যাকুল!
পরের দুঃখেতে কাঁদে অতি অল্প জনে!

(১৭)

সর্ব্বস্ব পরকে দিয়া আপনি ফকির
হইতে কজন পারে বলগো এখন?
পরের সর্ব্বস্ব ল’য়ে, এখন দস্তুর,
সকলে পাইতে চাহে— লৌকিক সম্মান!

(১৮)

পয়সা হইল যার—হ’ক না পামর—
তথাপি তাহার পদ, অনেকে লেহন—
করিতে কুণ্ঠিত নহে—কুকুরের মত!
ধর্ম্ম পড়িয়াছে বলি—ধনের মন্দিরে!

(১৯)

হয়েছি আমরা ঢালা বিদেশী ছাঁচেতে,
আর্য্যধর্ম্মে বিসর্জ্জন দিয়ে এবে মোরা—
হয়েছি বিকৃত অতি! চেনা নাহি যায়—
করিলে তুলনা পূর্ব্ব-পুরুষের সঙ্গে!

(২০)

চৈতন্য হয়েছে এবে; বুঝেছি এখন
ভুলিতে হইবে সব—যা শিখেছি মোরা—
বিদেশীর কাছে! তাই আদর্শ তোমার—
পিতঃ! এত প্রিয় মোর হয়েছে এখন!

(২১)

উঠিয়া সূর্য্যের আগে করি প্রাতঃস্নান,
বসিতে সন্ধ্যায় তুমি,—উঠিতে যখন—
উঠিত মস্তকে সূর্য্য; করি মিতাহার,
লভিতে বিশ্রাম-সুখ—মিত পরিমাণ!

(২২)

বৈকালে সংসার-কার্য্য করি সমাপন,
আবার বসিতে তুমি সন্ধ্যায় আপন,
জপ তপ সন্ধ্যাধ্যানে থাকিতে মগন—
বহুক্ষণ ধরি, পরে করিতে অশন।

(২৩)

করিয়া সমাপ্ত নৈশ অশন, শয়ন—
করিতে শয্যায় তুমি, স্মরি ভগবানে;
ছয় ঘণ্টাকাল মাত্র করিয়া শয়ন
আবার উঠিতে তুমি স্মরি ভগবানে।

(২৪)

পিতাগো করগো মোরে এই আশীর্ব্বাদ—
তোমা সম ধর্ম্মরত ভক্ত যেন হই!
পর দুঃখে আত্মসুখ দিয়া বিসর্জ্জন,
যেন সদানন্দে রই—যেন দেখা পাই!
ওঁ স্বস্তি! ওঁ স্বস্তি!! ওঁ স্বস্তি!!!