প্রাণোচ্ছ্বাস/বিজয়া
বিজয়া।
(১)
আজ বিজয়ীর দিনে, গাইব মায়ের নাম,
দ্রুত এস ভ্রাতৃগণ! চলিল মা পিতৃধাম;
আবাহন ক’রে এনে দেয় মাকে বিসর্জ্জন!
মাতৃ-প্রতি এরূপ যে করে সে নহে সজ্জন।
(২)
অথবা অভয়া-পক্ষে সম্ভব সকলি হয়,
আবাহন বিসর্জ্জন কল্পনামাত্র গো হয়!
যিনি সদা বিদ্যমান সর্ব্বত্র, আছেন হেথা―
তাঁর আবাহন বিসর্জ্জন—সে কথার কথা!
(৩)
অভয়া বরদা তুমি, দীনদুঃখ-বিনাশিনী!
দুর্গা, দুর্গতি-নাশিনী, ভব-ভয়-নিস্তারিণী!
অসুর-দলনী মাগো! নিত্য-শিব-সঙ্গিনী।
সুখদা, মোক্ষদা, মাগো! পাপি-পতিত-পাবনী!
(৪)
ভব-সৃজন-কারিণী! ভব-পালন-কারিণী!
ভব-প্রলয়ঙ্করী মাগো! সর্ব্বদুঃখ-বিনাশিনী!
স্নেহময়ী মা! নিত্য-শিব-সঙ্গিনী!
কাতরে করুণাময়ী! ভকত-জন-তারিণী!
(৫)
কি সাধ্য আমার মাগো! বর্ণি তব গুণরাশি?
ভজন পূজন মাগো! আমি কিছুই না জানি!
কৃপা ক’রে যদি মাগো! আবির্ভূত হও আসি,--
এ হৃদয়-মাঝে, তবে হ’লে হ’তে পারি জ্ঞানী।
(৬)
তব দত্ত জ্ঞানে মাগো! পারি বর্ণিতে তোমারে!
তব কৃপা বিনা, কার সাধ্য বর্ণিবে তোমারে?
ওমা দয়াময়ী কৃপা করি দেহ সেই জ্ঞান—
যে জ্ঞানে ঘুচিবে মাগো মম সমস্ত অজ্ঞান!
(৭)
অজ্ঞান ঘুচিয়ে যাবে, পাব পূর্ণ মোক্ষধাম,
মাগো দেহ মোরে সেই জ্ঞান, শান্তি-শিব-ধাম!
তুমি মা কল্যাণী ধনী!—ব্রহ্ম-শক্তি-স্বরূপিণী!
ভব-ভয়-বিনাশিনী, ব্যক্ত-অব্যক্ত-রূপিণী!
(৮)
জগৎ-জননী মাগো! স্থূল-সূক্ষ্ম-বিকাশিনী!
ভকত-জন-রঞ্জিনী মাগো! বিপদ-ভঞ্জিনী!
হরি হর ব্রহ্মা যাঁকে ধ্যানে জ্ঞানে নাহি পায়,
বলে দে ওগো মা! তাঁকে এ দীন কেমনে পায়?
(৯)
আঁধার করিয়া মাগো কোথায় চলিলি বল?
তোর পিছে পিছে যাবে ভারত-সন্তান-দল,
বিসর্জ্জন যেই হবে অমনি আমরা সবে
সলিলে প্রবেশি মাগো! হব পরিণত শবে।
(১০)
মাতৃহীন হ’য়ে মাগো কেমনে বাঁচিব বল?
নিরাশ্রয় ভারতের কেবল তুই সম্বল!
তোকে ফেলে তোর ছেলে ধরায় কেমনে রবে?
জলহীন সরোবরে কেমনে মীন বাঁচিবে?
(১১)
তাই বলি শুন মাগো যেওনা যেওনা কোথা,
মিলে সব তব পুত্র তোমাকে পূজিবে হেথা!
দানব-দলনী তুই―ছেলে ফেলে যাস্নে কোথা,
দানবের দল মাগো, যতদিন রবে হেথা!
(১২)
অতি দুরন্ত দানব—পেলে ছাড়েনা কখন,
আশ্রয়-সহায়-হীনে—করিবে নিশ্চয় গ্রাস!
অভয়া থাকিলে কাছে ভয় থাকেনা কখন,
তোর কাছ-ছাড়া হ’লে মাগো পাই বড় ত্রাস!
(১৩)
তাই করযোড়ে মাগো মোরা করি অনুরোধ,
আমরা পঁচিশ কোটি ছেলে করিয়া বিরোধ,
করিয়াছি এত দিন তোরে বড় জ্বালাতন,
না করিব হেন কাজ—এই প্রতিজ্ঞা এখন।
(১৪)
আজ বিজয়ার দিনে সবে করি কোলাকুলি,
পরস্পর-মনোবাদ দ্বেষাদ্বেষি সব ভুলি,
মায়ের নিকটে আজ ক’রে শপথ গ্রহণ,
আমরা সকলে যাই ফিরে গৃহেতে আপন।
(১৫)
গাও সবে মিলে আজ যত ভারত-সন্তান
একতান-মনপ্রাণ—ভারতের দুঃখ-গান!
সেই সন্তান-ক্রন্দনে, কাঁদিবে মায়ের প্রাণ,
পাষাণের মেয়ে বটে, কিন্তু মা নহে পাষাণ!
(১৬)
এখন হইতে মার বিসর্জ্জন নাহি হবে,
সোনার ভারতে এই দুর্দ্দিন যদিন রবে,
থাকিতে দুর্দ্দিন এই, রব কেমনে নীরবে?
যতকাল রবে দুঃখ, পূজিব মায়েরে সবে।
(১৭)
রাবণের গ্রাস হ’তে জানকী-উদ্ধার-তরে,
করেছিলা রঘুমণি; অকালে বোধন মার;
দানবের গ্রাস হ’তে জননী-উদ্ধার-তরে,
আমরা সকলে নিত্য করিব বোধন মার!
(১৮)
বিশাল ভারত-ক্ষেত্র হইবে মায়ের পীঠ,
তুষার-মণ্ডিত হিম-গিরি হইবে মুকুট;
অসংখ্য বিচিত্র মেঘ হইবে মায়ের চাল,
অনন্ত ভারতাকাশ হ’বে চাঁদোয়া-পাল!
(১৯)
নর্ম্মদা, যমুনা, সিন্ধু, তথা গঙ্গা, গোদাবরী—
ব্রহ্মপুত্র, দামোদর, কৃষ্ণা, তাপ্তী, কাবেরী—
সরস্বতী, ভাগীরথী, সরযূ, গোমতী—আর
অবশিষ্ট নদ নদী হইবে রজত-হার!
(২০)
নিঝর-ঝর্ঝর-শব্দ হইবে ঢাকের রব,
সানাই বাজনা হ’বে বিহঙ্গ-কুলের রব;
সাগর-তরঙ্গ-ধ্বনি হ’বে কামানের রব,
সে রবে কাহার সাধ্য পারে থাকিতে নীরব?
(২১)
সে রবে রবেনা দুঃখ, জেনো হইবে নীরব—
প্রজাদ্রোহী পশু যত! কোটী কোটী জন-রব—
শুনিয়া তাহারা যাবে, পলায়ে যথায় সব—
আছয়ে কুটুম্ব জন; আশা কেবল কেশব!
(২২)
নাহি অস্ত্র, নাহি শস্ত্র,—নাহি কামান বন্দুক,
নাহি বারুদ গোলক,—আছয়ে কেবল মুখ;
কোটী কোটী মুখে মোরা—করিব মায়ের স্তব!
শুনে প্রতিধ্বনি, হ’বে ভয়েতে কম্পিত সব!
(২৩)
রাম রঘুমণি ল’য়ে করেতে ধনুক বাণ,
নীলোৎপল তরে নিজ নয়ন যুগল যান―
উৎপাটিতে; অমনি মা ধরিলা করেতে তাঁরে,
সন্তুষ্ট হইয়া দেবী বর দিলেন তাঁহারে।
(২৪)
আমরা পঁচিশ কোটী মায়ের সন্তান মাকে—
উৎপাটি নয়ন দিব উপহার ঝাঁকে ঝাঁকে!
দেখি মা প্রসন্না নাহি ক দিন হইতে পারে!
সন্তানের পূজা কভু মা কি উপেক্ষিতে পারে?