বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রাণোচ্ছ্বাস/রাজা রামমোহন রায়ের প্রতি

উইকিসংকলন থেকে

রাজা রামমোহন রায়ের প্রতি।

(১)

কে তুমি শুইয়া এই মন্দির-ভিতরে
অনন্ত নিদ্রায় আছ সমাধি-নিহিত?
যোগ-রত-যোগি-মত, বল হে আমায়,
দেব কি দানব কিম্বা মানব-প্রধান?

(২)

এসেছি এথায় আমি খুঁজিতে তাঁহায়
এসেছেন এথা যিনি, করিতে মোচন
ভারতের দুঃখ রাশি, হ’য়ে প্রতিনিধি—
প্রজার পঁচিশ কোটী, মহাসভা-কাছে।

(৩)

শুনেছি আর্ণোর গুহা আছে শ্বেতদ্বীপে,
তথায় আছেন তিনি সমাধি-নিহিত,
হারায়ে আপন প্রাণ ভ্রাতৃ-কার্য্য-তরে!
এই কি আর্ণোর গুহা,—এই সে মন্দির?

(৪)

বলে দেও পথিকেরে কে আছ হেথায়,
বিদেশী আমি গো হায়! না জানি সন্ধান!
বলে দেও দেব নর যে আছ হেথায়,
ব্যাকুল অন্তর মম—বিলম্ব সহে না!

(৫)

কোথা হ’তে যেন বাণী উঠিল আকাশে,
কে যেন বলিল মোরে—‘এই আর্ণো-গুহা—
এই সে মন্দির—যথা অনন্ত নিদ্রায়,
শায়িত আছেন রামমোহন রতন!’

(৬)

আনন্দে উৎফুল্ল আমি হইনু তখন!
শ্রবণ-দর্শন-আদি ইন্দ্রিয়-পঞ্চক
প্রবেশি সকলে নেত্রে দেখিতে লাগিল
সেই অপূর্ব্ব মন্দির, নেত্র-মনো-হারি!

(৭)

ভক্তিভাবে করযোড়ে রহিনু তখন
মন্দির-সমীপে আমি, করি নত জানু;
কহিনু—এসেছি দেব, ভক্তি-উপহার,
দিয়া পূজিতে তোমায়, ভারত-হইতে।

(৮)

লহ পূজা মোর দেব—করি দয়া মোরে!
অকৃতজ্ঞ মোরা—তাই তোমা হেন জনে
পূজি না সকলে! বীরপূজা—বীরার্চ্চনা
যে দেশে না হয়, কবে সে দেশ উঠেছে?

(৯)

ধর্ম্মবীর—দয়াবীর আর দানবীর,
যুদ্ধবীর-সম-পূজ্য—অথবা অধিক—
পূজ্য; যেহেতু তাঁহারা অধিক মঙ্গল—
করেন-ধরার; তাই পূজিব তোমায়!

(১০)

দীনহীন আমি—নাহি মোর অন্য ধন—
ভক্তি কৃতজ্ঞতা বিনা; অমূল্য সে ধন!
লহ দয়া করি দেব! তব যোগ্য তাহা;
অসার সে পূজা দেব! ভক্তি-শূন্য যাহা!

(১১)

স্বামি-চিতানলে দগ্ধ হ’ত সতীগণ—
জাতি-কুল-ভয়ে, কিম্বা কুটুম্ব-তাড়নে―
অনিচ্ছায়! তুমি দেব রাজাকে বুঝায়ে
করিলা আইন, যাতে সে বীভৎস প্রথা―

(১২)

হইল রহিত! সতীগণ ব্রহ্মচর্য্য
করিয়া দেখাতে নিজ প্রকৃত সতীত্ব
সুবিধা পাইল দেব! পুড়িয়া মরিলে
নিভিল সকল ক্লেশ! কিন্তু দিন দিন—

(১৩)

করি বিন্দু বিন্দু রক্ত দিয়া উপহার—
যে সতী করয়ে পূজা নিজপতি দেবে,
তাহার তুলনা দেব, নাহি এ জগতে;
আমরণ ব্রহ্মচর্য্য শ্রেষ্ঠ সব হ’তে!

(১৪)

সহমরণ কঠোর! কিন্তু তাহা হ’তে—
ব্রহ্মচর্য্য আমরণ—অধিক কঠোর,
অধিক পরীক্ষাস্থল! প্রতিপদে বিঘ্ন!
সে মহাপরীক্ষা দিতে পারে কয় সতী?

(১৫)

তাই বলি দেব! রক্ষিয়া সতীরে,—
রক্ষিয়াছ নারীকুলে; প্রকৃত সতীরে
পরীক্ষা দিবার তুমি—দিয়াছ সুবিধা;
পুড়িয়া মরিলে তার কি হ’ত সুবিধা?

(১৬)

নারী-হৃদয়-ভাণ্ডার অনন্ত স্নেহের―
উৎস! সে উৎস হইলে রুদ্ধ—মরুসম—
হইত ভারত! তুমি রক্ষিলা ভারতে—
আজ! রক্ষিয়া সতীরে চিতানল হ’তে।

(১৭)

আর ভারতবাসীর হৃত অধিকার
উদ্ধার করিয়া তুমি সাধিলে মঙ্গল!
কত গুণ তব দেব! বলিব কেমনে?
হায় ক্ষীণজিহ্ব আমি—তথা জ্ঞানহীন!

(১৮)

সত্য আর্য্য-ধর্ম্ম তুমি করিতে প্রচার,
এসেছিলে শ্বেতদ্বীপে; বলিতে সকলে—
আর্য্য-ধর্ম্ম ব্রহ্মময়—নহে পৌত্তলিক—
আর্য্য-ধর্ম্মে ব্রহ্মজ্ঞান একমাত্র বীজ!

(১৯)

হইল সকলে স্তব্ধ শুনি এ বারতা!
জানিত ইহারা—মোরা পুতুল-পূজক!
আর্য্যধর্ম্মে ব্রহ্মজ্ঞান একমাত্র বীজ—
শুনিয়া বিস্মিত এরা হয়েছে এখন।

(২০)

ঘোষিলে জগতে তুমি মহিমা অপার
তাঁর—যিনি সর্ব্বব্যাপী সত্য নিরঞ্জন!
যিনি সর্ব্বদর্শী নিত্য অজর অমর!
যিনি সর্ব্বশক্তি-সর্ব্ব-দয়ার নিধান।

(২১)

ব্রহ্মবাদী, ব্রহ্মজ্ঞানী—ভারতসন্তান—
হইল পূজিত আজ ধরার ভিতরে;
বিস্মিত খৃষ্টান আজ ভুলিয়া বিদ্বেষ—
ভ্রাতৃভাবে নিল তাঁরে আপন আলয়ে।

(২২)

তোমারি গুণেতে দেব এভাব-বিপ্লব!
অথচ আমরা হায় পূজিনা তোমায়!
অকৃতজ্ঞ মোরা—তাই রেখেছি তোমায়—
দেব! অনাদরে এই অজ্ঞাত গুহায়!

(২৩)

চল দেব নিজ গৃহে; এসেছি হেথায়—
আমি লইয়া যাইতে ভারতে তোমায়;
চল ত্বরা করি দেব! তব ভ্রাতৃগণ,
দেখিতে উৎসুক বড় হয়েছে এখন।

(২৪)

বিশ্বপ্রেমিক যে জন—নাহিক তাঁহার—
কোন নির্দ্দিষ্ট আলয়—সবে ভাই তাঁর!
প্রত্যেক ভ্রাতার গৃহ—তাঁহার অলয়।
প্রতিদেশ, প্রতিরাজ্য—তাঁর বাসস্থান!

(২৫)

স্বদেশ স্বজাতি তাঁর হয়গো বিলীন
সেই মহা-বিশ্ব-ভাবে! স্বধর্ম্ম তাঁহার
বিশ্বধর্ম্ম! গৃহ তাঁর অনন্ত জগত্!
অনন্ত গগন তাঁর গৃহ-চন্দ্রাতপ!

(২৬)

খ্রীষ্ট বৌদ্ধ মহম্মদী সকলে তোমায়
আপন বলিয়া জানে—তব শব ল’য়ে
হয়েছিল হুলস্থূল! কিন্তু হিন্দুগণ
জানে তুমি হও দেব! তাদেরি কেবল!

(২৭)

হৃদয়-মন্দিরে তারা স্থাপিবে তোমায়,
অসংখ্য মন্দিরে তুমি করিবে হে বাস!
তুচ্ছ এ মন্দির হয় তার তুলনায়!
চল আর কাজ নাই বিদেশেতে বাস।

(২৮)

সাজেনা—সাজেনা আর বিদেশেতে বাস!
ভারত জেগেছে এবে জ্ঞানের বিকাশে,
দেখিয়া হৃদয়ে তব হইবে উল্লাস;
ঐ শুন আনন্দ-ধ্বনি ভারত-আকাশে।

(২৯)

পঞ্চবিংশ-কোটী-সংখ্য মায়ের সন্তান—
তব আগমনী গায় হ’য়ে একতান;
চল দেব ত্বরা করি যাইয়া তথায়,
দিবে যোগ প্রাণভরে জাতীয় সভায়!

(৩০)

ধর্ম্ম রাজনীতি ল’য়ে তব ভ্রাতৃগণ,
করিছে তুমুল কাণ্ড—ভারত-ভিতরে;
উচিত কি থাকা তব ঘুমায়ে এখন?
উঠ—চল ত্বরা করি স্বদেশ-মাঝারে!

(৩১)

ঘুমায়ে ভারত, দেব! ছিল এত দিন,
তখন তোমার মূল্য বুঝেনি তাহারা!
আজ জাগিয়া তোমায় না দেখি সন্তান―
হয়েছে সকলে যেন আত্মহারা!

(৩২)

নগরে নগরে ফিরে গেয়ে ব্রহ্মনাম!
কিন্তু তোমায় না পেয়ে হতাশ তাহারা!
সেনাপতি বিনা সেনা যেন দিশাহারা!
হ’য়ে ছিন্ন ভিন্ন তারা—কাঁদে অবিরাম!

(৩৩)

আজ তব মুক্তি-সেনা হ’ত বিজয়িনী—
যদি তোমা মত নেতা থাকিত সম্মুখে!
দ্বিগ্বিজয়িনী হইত ভারত-জননী!
জগৎ গাইত তাঁর যশ শত মুখে!

(৩৪)

মহাসমিতি বসিছে নগরে নগরে—
তুলিতে ভারতে আজ সৌভাগ্য-চূড়ার!
বীর-চূড়ামণিতু মি ঘুমায়ে এথায়!
একি শোভা পায়? চল আপন মন্দিরে!