বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রাণোচ্ছ্বাস/স্তোত্র

উইকিসংকলন থেকে

প্রাণোচ্ছ্বাস।

স্তোত্র।

নমো-বিশ্বরূপায়! নমো-বিশ্বকুহকিনে!

(১)

দয়াময় হে ঈশ্বর পতিত-পাবন!
দীন হীনে দয়া কর, করুণা-নিধান!
এ জগতে বল মোর, কে আছে এমন
পরম আত্মীয় জন, তুমি হে যেমন?

(২)

তুমি বিনা গতি মুক্তি, অনাথের নাথ!
কি আছে জীবের আর, জানিনা! জানিনা!
নির্ব্বোধ মানব তবু, বুঝেও বোঝে না!
জেনেও জানে না, সদা মোহে ভুলে রয়!

(৩)

মোহে ভুলে, ভুলে যায় জগৎ-জননী!
পিতা মাতা পাতা ধাতা—সকলি গো তুমি—
তুমি ভাই, তুমি বোন্—তুমি সাথী সখা—
তুমি সখী, তুমি জায়া, তুমি জীবকায়া!

(৪)

তুমি গাছ, তুমি পাতা, তুমি শাখা মূল!
তুমি গিরি, তুমি নদী, তুমি হে সাগর!
তুমি পোত, তুমি পা’ল তুমি হে নাবিক!
তুমি তৃণ লতা ঘাস, তুমি সরোবর!

(৫)

তুমি ফুল, তুমি ফল, তুমি হে মুকুল!
ফুলের সুবাস তুমি, তুমি গন্ধবহ!
তুমি ক্ষিতি, তুমি অপ্, তুমি হে মরুৎ!
তুমি তেজ, তুমি ব্যোম,—তুমি পঞ্চভূত!

(৬)

যে দিকে ফিরাই আঁখি, যা কিছু হে দেখি,
পঞ্চের বিকার সব—সেই পঞ্চভূত—
তোমারি মায়ার ফল!—তাই বলি নাথ!
বিশ্বে বিশ্বরূপে কিবা আছয়ে প্রভেদ?

(৭)

ঐ যে রয়েছে রবি গগনে উদিত,
রজত কিরণে দিক্ করিয়া উজ্জ্বল,
ললাট-ভালেতে তব যেন শ্বেত ফোটা!
সে রবি অভিন্ন কভু নহে তোমা হ’তে।

(৮)

ঐ যে নক্ষত্র-মালা গগন-শোভন!—
পৃথিবীর অন্ধকার হরিয়া লইয়া,
কিরণ-বসনে অঙ্গ ঢেকেছে ইহার,
এরাও অভিন্ন কভু নহে তোমা হ’তে।

(৯)

আর যে চন্দ্রমা ওই—পূর্ণ মনোহর—
নক্ষত্র-ফুলের মালা ধরিয়া বক্ষেতে,
ক্ষুধা বরষিয়া ঠাণ্ডা করিছে ভূতল,
সে চন্দ্র অভিন্ন কভু নহে তোমা হ’তে।

(১০)

যে চন্দন ভক্তিভাবে, অঙ্গেতে লেপন,
করিয়া প্রফুল্ল লোক হয় হে সতত,
যাহার পবিত্র-বাসে, ভক্তি গদগদ
না হয় যাহার মন, সে জন পামর!—

(১১)

সেই যে চন্দন দেব-দুর্ল্লভ সামগ্রী—
তাহাও যেমতি তুমি; তেমতি হে তুমি—
ওই ন্যক্কার-জনক মল মূত্র পূঁজ!
মেধ্যামেধ্য সব তুমি ওহে বিশ্বরূপ!

(১২)

আমি যে অজ্ঞান, তাই বুঝিতে না পারি,
কি সাধ্য আমার নাথ! বুঝিহে তোমায়—
না দিলে বুঝায়ে মোরে কৃপা বিতরিয়া—
নয়ন থাকিতে অন্ধ, মোহ-অন্ধকারে!

(১৩)

দিয়াছিলে জ্ঞান-নেত্র অর্জ্জুনে যেমন,
দেওহে তেমতি মোর ফুটায়ে নয়ন,
দেখি প্রাণভরে কত রূপ ধর তুমি,
ওহে বিশ্বনাথ! কত সাজে সেজে আছ!

(১৪)

ভক্ত জন সদা হয় অবোধ অজ্ঞান!
যোগ্যতা বুঝেনা তারা, সদা আব্‌দার
বাপের নিকটে পেতে যা-কিছু হে ভাল;
সাজে হে আব্‌দার বলি করেহে আব্‌দার।

(১৫)

জানে সবে ভক্ত-বাঞ্ছা-কল্পতরু তুমি!
বিদিত পুরাণে, তন্ত্রে, তথা স্মৃতি বেদে;
তাই ভক্ত আমি আজ ডাকিহে তোমায়,
দেখাও তোমার সেই অনন্ত মূরতি!

(১৬)

ঘুচে যাক্ মোহ মোর! নিবুক আগুণ
জ্বলিছে অন্তরে যাহা—ধিকি ধিকি সদা—
রাবণের চিতা সম—অমৃত বর্ষণে—
অমৃত দর্শনে—তাহা হোক্ নির্ব্বাপিত!

(১৭)

শোক দুঃখ মনস্তাপ হে বিশ্ব-ভূপতি!
সকলি তোমারি মায়া;—পাঠাও তাদের
করিতে ছলনা জীবে, মায়া-মৃগ-রূপে;
অবোধ মানব মরে, প’ড়ে সে কুহকে।

(১৮)

হে বিশ্ব-কুহকী! কার আছে হেন সাধ্য
বুঝে ইন্দ্রজাল তব, না বুঝায়ে দিলে!
স্থূল-বুদ্ধি লোকে মাত্র বুঝে স্থূল স্থূল,
ভিতরে প্রবেশ করে অতি অল্প লোকে।

(১৯)

যারা প্রাণ মন দেহ সকলি অর্পণ
করেছে চরণে তব; তুমি নিরন্তর
শোক দুঃখ মনস্তাপ দেওহে তাদের;
দগ্ধে দগ্ধে কর খাঁটি সোণার মতন।

(২০)

কাড়ি লও ধন বস্ত্র—স্ত্রীপুত্ত্র দুহিতা—
সর্ব্বস্ব কাড়িয়া লও—যা-কিছু হে ভাল—
সতী ভার্য্যা কাড়ি লও, কাহারো বেলায়
আদর্শ সতীরে কর আদর্শ অসতী।

(২১)

যে ভক্ত যাহাতে রক্ত—তার তাই লও
কাড়ি;—কে বুঝে মহিমা তোমার অপার?
কিন্তু লীলা সব তব জীব-শুভ-হেতু,—
যে জানে তাহার মন রয় হে অটল।

(২২)

যাকে যত ভালবাস—তার তত কষ্ট!
ধার্ম্মিকের প্রাণে সদা বাজে তব শেল,
কামার-হাতুড়ী যথা পিটায় লোহায়,
করিতে ইহায় দৃঢ় কঠিন ইস্পাত!

(২৩)

না পিটালে লোহা কভু হয় কি ইস্পাত?
না পোড়ালে সোণা কভু হয় কি নির্ম্মল?
না শাসিলে ছেলে কভু হয় কি সুশীল?
না পোড়ালে কাদা কভু হয় কি ইষ্টক?

(২৪)

আদুরে ছেলের বল কবে কি হয়েছে?
বিনা কষ্টে রত্ন মিলে কে কবে দেখেছে?
বিধাতার দণ্ড কভু যে না সহিয়াছে,
তাহার অদৃষ্টে দুঃখ নিশ্চয় রয়েছে!

(২৫)

অটল-অচল-সম ভক্তের অন্তর,
ঝঞ্ঝাবাতে বিচলিত কভু নাহি হয়;
তৃণেতে সানুতে বল কিসের অন্তর,
উঠিলে বাতাস যদি কাঁপয়ে উভয়?

(২৬)

বিশ্বাস অটল যার তব বিশ্বরূপে,
বিপদে তাহার মন কেন বিচলিবে?
সে জানে—নাবিক যিনি, তিনিই তরঙ্গ—
সে তরঙ্গে রঙ্গে তাই অঙ্গ ভাসাইবে।

(২৭)

তরঙ্গ কাটায়ে ভক্ত বীরের মতন,
সহ কর্ণধার তরি—যাবে স্বর্গধাম;
তথা গিয়া জ্ঞান-নেত্রে দেখিবে সকল,
অজ্ঞান মোহের হাত হইতে এড়াবে।

(২৮)

সাধু! সাধু! সাধু! বলি ওহে দীননাথ!
লইবে তুলিয়া কোলে তব ভক্ত জনে,
যখন দেখিবে তার বিশ্বাস অটল—
তব বিশ্বরূপে, ভেদ বুদ্ধি গেছে সব!

(২৯)

এক হ’তে পঞ্চ কোষে আবৃত জীবাত্মা
মেঘমুক্ত-সূর্য্য-সম হইবে উজ্জ্বল!
এক এক কোষ করি যবে পঞ্চ কোষ
পুড়িয়া হইবে ভস্ম দুঃখ-হুতাশনে!

(৩০)

চৈতন্যে চৈতন্যে তদা অপূর্ব্ব মিলন
দেখিয়া বিস্মিত হ’বে দর্শকের মন!
ব্যক্তিত্ব ঘুচিয়া যাবে—বিশ্বত্ব আসিবে,
বিদেহ মুক্তিতে জীব চৈতন্য পাইবে!

ওঁ স্বস্তি! ওঁ স্বস্তি!! ওঁ স্বস্তি!!!