প্রাণোচ্ছ্বাস/স্বপ্ন
স্বপ্ন।
(১)
দেখিনু স্বপনে এক মূরতি মধুর,
স্নেহের অনন্ত খনি—পূর্ণ গরবিণী!
অনুপম রূপরাশি, শোভিছে চিকুর—
দাম প্রফুল্ল আননে, প্রেম-পাগলিনী!
(২)
সুনীল কমলদুটী আননে বসান,
বিকীরিত করিতেছে অপূর্ব্ব কিরণ!
অবিরাম হইতেছে অমৃত ক্ষরণ,
আপ্লুত দর্শক-দেহ, সিঞ্চিত বসন।
(৩)
অপূর্ব্ব স্বর্গীয় মূর্ত্তি! মন-প্রাণ-হরা!
দেখিলে নিশ্চিয় তুমি হবে আত্মহারা,
ঝলসিত দুনয়ন সে কিরণ-জালে,
অনুপম গতি তাঁর জিনেছে মরালে।
(৪)
ধীরে ধীরে আসি দেবী বসিলা সমীপে,
করিল নিস্তেজ তাঁর দেহাভা প্রদীপে,
মিটি মিটি দীপালোক মাঝে সেই জ্যোতি-
র্ম্ময় রমণী-মূরতি শোভিতেছে অতি।
(৫)
মৃদু মৃদু স্বরে দেবী জিজ্ঞাসা করিলা—
কুশল-বারতা মম,—আর জিজ্ঞাসিলা—
কেন আমি বিষাদিত? কি দুঃখ আমার?
একাকী কেন বা আছি? অভাব কিসের?
(৬)
কোন্ দেশে বাড়ী মম, কি কাজ করিতে—
এসেছি হেথায় আমি, কে আছে বাটীতে?
ইচ্ছা-সুখে আসিয়াছি?—অথবা জ্বালায়?
অথবা বিরাগী হ’য়ে আপন ইচ্ছায়?
(৭)
শুনি প্রশ্নাবলী স্তব্ধ চকিত হইনু!
পড়িলাম অকস্মাৎ যেন হ’তে সানু;
ইতি-কর্ত্তব্য-বিমূঢ় হইনু তখন,
কি দিব উত্তর ভেবে আকুলিত-মন!
(৮)
মনের অবস্থা মম বুঝিয়া রমণী—
ধরিলা হস্তেতে মোর;—সুমধুর বাণী—
বাহিরিল মুখে তাঁর,—কি ভয় তোমার?
শোক দুঃখ থাকে—আছে প্রতিকার তার।
(৯)
বল তুমি মন খুলে দিতেছি অভয়,
বলিলে আমার কাছে নাহি কোন ভয়;
বলিলে মনের জ্বালা জুড়াবে এখন
দুঃখের রজনী যাবে আসিবে সুদিন!
(১০)
শুনিয়া আশ্বাসবাক্য সাহসে নির্ভর
করিয়া বলিনু আমি, কাহিনী দুর্ভর!
দেবী আমি চির দিন প্রেমের কাঙ্গালী—
যে প্রেমে নাহিক স্বার্থ—নাহি দলাদলি।
(১১)
জগতে যে প্রেম দেখি, সব স্বার্থ-দুষ্ট,
স্বার্থের সংশ্রবে প্রেম সব হয় নষ্ট!
কলসী-পূরিত দুগ্ধে এক ফোটা চোণা—
যেমতি; তেমতি প্রেমে স্বার্থ এক কণা।
(১২)
এক কণা স্বার্থ পড়ি প্রেমের ভাণ্ডেতে,
প্রেম-সুধা বিষ করে বিদিত জগতে,
সে বিষ-পানেতে হয় মানুষ অসুর,
দেবত্ব ঘুচিয়া হয় সমান পশুর।
(১৩)
সেবিষে জর্জ্জর দেহ হয়েছে আমার,
এসেছি হেথায় তাই ছাড়িয়া সংসার,
আছে মোর দারা সুত দুহিতা জননী,
ভাই বন্ধু সব আছে ধনে মানে মানী।
(১৪)
কিন্তু কই ভালবাসা—নিষ্কাম অটল?
প্রাণোৎসর্গ কই আর বিশ্বাস অটল?
অল্পেতে ভঙ্গুর সব—সহজে চঞ্চল!
এই আছে এই নাই—স্বার্থই প্রবল!
(১৫)
থাকে কাছে যতক্ষণ অপর্য্যাপ্ত ধন,
ততক্ষণ আমি বড় আদরের ধন!
বুদ্ধি-বিদ্যা-গুণবত্তা-রূপের আধার!
যেই আমি লক্ষ্মী-ছাড়া, অমনি আঁধার!
(১৬)
চাইনা তেমন প্রেম মুহূর্ত্তে ভঙ্গুর,
চাইনা তাহাকে যেনা করয়ে সবুর!
চাইনা তাহাকে ‘দেও’ বলিব মাত্রেতে—
যথা তথা হ’তে এনে হবে যারে দিতে!
(১৭)
শান্তি নাই, সুখ নাই—সংসার ভিতরে!
আপন ইচ্ছায় তাই—এসেছি হেথায়,
একাকী রয়েছি শুয়ে,—স্থণ্ডিল শয্যায়;
অনন্ত শূন্যের ভাব—হৃদয়-ভিতরে!
(১৮)
অভাগার দুঃখরাশি করিতে দ্বিগুণ—
কেন দেবী দেখা দিলে?—কি কাজ হেথায়—
তব বুঝিতে না পারি! সম্বর এখন—
তব আয়ত লোচন—না চাহি তোমায়!
(১৯)
মধুর হাঁসিয়া দেবী বলিলা আমায়,
হে ভদ্র এসেছি আমি স্বরগ হইতে,
ঈশ্বর-আদেশে হেথা লইতে তোমায়;
আমা সাথে তথা তব হইবে যাইতে।
(২০)
প্রেমের ভিখারী তুমি—প্রেম-শূন্য ধরা!
এখানে তোমার বাস যোগ্য নাহি হয়,
বৈকুণ্ঠ-ধামেতে চল পাবে প্রেম-ধারা;
অনন্ত অসীম ধারা শুষ্ক নাহি হয়!
(২১)
এক বিন্দু প্রেম-সুধা যদি পান কর,
হইবে অমর তুমি চির শান্তি পাবে;
শোক দুঃখ দূরে যাবে—পাইবে অপর—
মূর্ত্তি কাঞ্চন-সন্নিভ—চিরসুখী হবে।
(২২)
নিষ্কাম প্রেমের ভূমি—স্বরগের পুরী,
নয়ন মোহিত হয় দেখিলে মাধুরী!
স্বার্থক জীবন তার যে দেখে তাঁহারে,
ধরা তাকে দূরে থাক! ছুঁতে যমে নারে।
(২৩)
স্বার্থক জীবন তব! দেখিতে যাঁহারে—
না পান মহর্ষিগণ, দেখিতে তোমারে
ব্যাকুল অন্তর তাঁর—চল ত্বরা করি,
যথায় আছেন বসে বৈকুণ্ঠের হরি!
(২৪)
উঠাইলা বামা মোরে, ধরিয়া করেতে;
উঠিনু তখনি আমি ঘুমের ঘোরেতে;
উঠিনু উঠিয়া হায়, দেখিনু আঁধার!
কোথা সেই দেবীমূর্ত্তি? সব শূন্যাকার!
(২৫)
জ্বালিয়া দ্বিগুণ মোর হৃদয়-আগুণ—
জগৎ আঁধার করি-হায় অন্তর্ধান
করেছেন স্বর্গ-দেবী! করি হায়! হায়
অভাগা অবার শুলো স্থণ্ডিল-শয্যার।
(২৬)
কাতরে করুণা করি শ্রান্তি-বিনাশিনী
নিদ্রাদেবী আসি ক্রোড়ে নিলা অভাগারে!
আবার দেখিনু স্বপ্নে মূরতি মোহিনী—
কিন্তু সে মূরতি নহে—এবে ভিন্নাকারে।
(২৭)
অপূর্ব্ব মূরতি বটে—কিন্তু স্নেহময়ী—
জননী-সদৃশ, আসি উঠাইলা মোরে
ধরি করে, নিলা তুলি ক্রোড়ে, দয়াময়ী—
সস্নেহ বচনে কত জিজ্ঞাসিলা মোরে।
(২৮)
করযোড়ে জিজ্ঞাসিনু কোন্ দেশ হ’তে—
মাগো এসেছ হেথায়! অভাগার প্রতি—
এত দয়া কেন মাতঃ? কোথা হবে যেতে
হেথা হ’তে? বল দয়া করি পুত্র প্রতি।
(২৯)
জননী আনন্দময়ী শুনিয়া বচন
মোর—বলিলেন বৎস! লইতে তোমায়
এসেছি বৈকুণ্ঠ হ’তে—যাইব তথায়—
লইয়া তোমায়—এই আদেশ-বচন।
(৩০)
হৃদয় তোমার প্রতি বৈকুণ্ঠের নাথ!
এসেছিলা স্বর্গ-দেবী তাঁহার আদেশে—
লইতে তোমায়, কিন্তু নিদ্রার আবেশে—
তুমি হইয়া বিভোর, ছেড়োছ সে সাথ।
(৩১)
আবার এসেছি আমি তাঁহার আদেশে,
লয়ে যাব তোমা-ধনে সে অমর দেশে;
চল ত্বরা করি—যথা বৈকুণ্ঠের পতি—
তোমাধনে দেখিবারে সমুৎসুক অতি।
(৩২)
নিষ্কাম প্রেমের খনি—বৈকুণ্ঠ নগরী!
প্রেমের ভিখারী তুমি—প্রেমের ভাণ্ডারী—
হরি, ভকত-অধীন; ভকত যে জন—
পায় প্রেম অবিরাম বিনা আকিঞ্চন।
(৩৩)
পরম ভকত তুমি—তোমার কারণ
নির্ম্মিত হয়েছে বাটী—অপূর্ব্ব-গঠন—
ভকত-মণ্ডলী-মাঝে, থাকিবে তথায়,
হরি-প্রেম-গান গায় নিয়ত যথায়।
(৩৪)
করি হরিধ্বনি যথা ভ্রমর ঝঙ্কারে,
করি হরিধ্বনি যথা পাখী গান করে,
হরিধ্বনি হয় যথা পর্ব্বত-নির্ঝরে,
হরি-প্রতিধ্বনি হয় পর্ব্বত-গহ্বরে।
(৩৫)
হরি বোল হরি বোল ভিন্ন অন্য বোল—
যথায় নাহিক আর! সকলে পাগল—
কেবল হরির নামে! গায় পিককুল—
কেবল হরির নাম! ডাকে হরি গোকুল!
(৩৬)
আকুল সরাই হরি ব’লে! হরিনাম-
সুধা কেবল আহার! গায় হরিনাম!
খায় হরি নাম—মাখে গাত্রে হরিনাম!
যথা ধন ধান্য রত্ন এক হরিনাম।
(৩৭)
হরিনামে স্বার্থ ভুলে সকলে আপন―
হয়েছে তথায়, নাই আত্মপরজ্ঞান!
উপকার ক’রে নাহি চায় প্রতিদান!
স্বার্থের উপরে ন্যস্ত নহে প্রেমধন।
(৩৮)
চল বাছা ত্বরা করি বৈকুণ্ঠ নগরী,
যাহার সকাশে তুচ্ছ হয় স্বর্গপুরী—
কি কব ধরার কথা এত যম-পুরী!
বিলম্ব সহেনা বাছা রহিতে না পারি।
(৩৯)
অমনি চলিনু আমি তাঁহার পশ্চাতে,
পুষ্পক-রথেতে তুলি লইলা পার্শ্বেতে;
নিমেষ-মধ্যেতে রথ বৈকুণ্ঠ নগরী—
উত্তরিল―দাঁড়াইল ছাড়ি দ্বার দ্বারী।
(৪০)
দয়াময়ী দয়া ক’রে করেতে ধরিয়া,
লয়ে গেলা যথা হরি ছিলেন বসিয়া;
দয়াময় দয়া করি নিলা মোরে কোলে,
হরি হরি হরি ধ্বনি বলিল সকলে!