বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রেমের খেলা/পঞ্চম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।


 পরদিন অতি প্রত্যূষ্যে গাত্রোত্থান করিলাম। আমি যখন প্রাতঃকৃত্য সমাধা করিয়া বিচক্ষণ বহুদর্শী ডাক্তারের ছদ্মবেশ ধারণ করিলাম, তখন উষার আলোকে চারিদিক উদ্ভাসিত হইয়াছিল। কাক কোকিলাদি বিহঙ্গমকুল স্ব স্ব নীড় ত্যাগ করিয়া আহারান্বেষণে ব্যাপৃত হইয়াছিল, গৃহস্থগণ স্ব স্ব শয্যা ত্যাগ করিয়া গৃহকর্ম্মে নিযুক্ত হইতেছিল।

 অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া অবশেষে ডাক্তারের বেশেই কম্পাউণ্ডার বাবুর সহিত সাক্ষাৎ করিতে মনস্থ করিলাম। কিন্তু লোকাচার আকার-প্রকার ও ভাবভঙ্গী দেখিয়া সশস্ত্র হইয়া যাইতে বাধ্য হইলাম। একটা দোনলা পিস্তল ও একখানা ছোড়া সঙ্গে লইলাম, কিন্তু এমন ভাবে রাখিলাম, যাহাতে কম্পাউণ্ডার বাবু কোনরূপ সন্দেহ করিতে না পারেন।

 আমার এক বন্ধু বড় ডাক্তার। তাঁহার নিকট হইতে গোটাকতক ডাক্তারি যন্ত্র আনাইয়া সঙ্গে রাখিয়াছিলাম। কোচমানকে রীতিমত শিক্ষা দিয়া আমি গাড়ীতে উঠিলাম। সে শকট চালনা করিল।

 গাড়ীখানি যেমন সেই ডিস্পেন্সারির সম্মুখে গিয়া পঁহুছিল, অমনি উহার একটি ঘোড়া টলিয়া পড়িল। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ীখানিও হেলিয়া পড়িল। আমি ও কোচমান লম্ফ দিয়া নিম্নে অবতরণ করিয়া গাড়ীখানি ধরিয়া ফেলিলাম। উহা আার পড়িয়া গেল না বটে কিন্তু সম্মুখের একখানি চাকার চতুঃপার্শ্বস্থ লৌহনির্ম্মিত বেড়খানি খুলিয়া গেল। অশ্বরজ্জু গাড়ীর একস্থানে বন্ধন করিয়া কোচমান একজন মিস্ত্রী ডাকিয়া আনিতে ছুটিল। আমি সেইখানে দাঁড়াইয়া রহিলাম।

 গাড়ীখানির ঐরূপ অবস্থা হওয়ায় সেইস্থানে অনেক লোকের জনতা হইয়াছিল। বলা বাহুল্য যে, কম্পাউণ্ডারও আমার গাড়ীখানি পড়িতে পড়িতে রক্ষা পাইল দেখিবার জন্য ডিস্পেন্সারি হইতে বাহির হইয়াছিলেন।

 কোচমান মিস্ত্রী আনিতে চলিয়া গেল, অপরাপর লোকেরাও স্ব স্ব কার্য্যে গমন করিল। কম্পাউণ্ডার বাবু আমাকে দণ্ডায়মান দেখিয়া দয়া করিয়া ভিতরে ডাকিলেন। আমিও সহিসের হস্তে গাড়ীর তার দিয়া তাঁহার ডিস্পেন্সারিতে প্রবেশ করিলাম।

 দেখিতে যাহাই হউক, কম্পাউণ্ডারের আচরণ সে দিন অতি সুন্দর। ভিতরে যাইবা মাত্র তিনি শশব্যস্তে একখানি চেয়ার আনিয়া আমাকে বসিতে দিলেন। আমি উপবেশন করিলে পর তিনি একখানি ছোট ডিশে করিয়া আমার নিকট দুটো চুরুট ও দিয়াশলাই আনিয়া অতি বিনীতভাবে বলিলেন, “চুরুট ইচ্ছা করুন। মহাশয়কেও ডাক্তার বলিয়া বোধ হইতেছে।”

 যদিও আমি চুরুট ভক্ত নহি, তত্রাচ কম্পাউণ্ডার বাবুর মান রক্ষার জন্য সেই ডিস হইতে একটী লইয়া মুখে দিলাম এবং দিয়াশলাইয়ের সাহায্যে ধরাইয়া টানিতে লাগিলাম। তিনিও একটী লইয়া ধরাইলেন এবং আমার সম্মুখে একখানি চেয়ার আনাইয়া তাহাতে উপবেশন করিলেন।

 কিছুক্ষণ কোন কথা হইল না। পরে আমি করিলাম, “আপনি জানেন, নিকটে কোথাও মিস্ত্রী পাওয়া যাইতে পারে?”

 কম্পাউণ্ডার বাবু বাহ্যিক বেশ সরল। তিনি হাসিয়া বলিলেন, “আমরা সামান্যলোক, গাড়ী ঘোড়ার কথায় নাই। কোথায় ঘড়া গাড়ু মেরামত হয়, জিজ্ঞাসা করিলে বলিতে পারি। আপনার প্রশ্নের উত্তর করিতে পারিলাম না।”

 আমিও হাসিলাম। হাসিতে হাসিতে বলিলাম, “এখানে কোথাও বড় আস্তাবল নাই?” .


 কম্পাউণ্ডায় কিছুক্ষণ ভাবিয়া উত্তর করিলেন, “আপনি যথার্থ অনুমান করিয়াছেন। আপনার কোচমান ঐ কথাই বলিয়া গেল। জমিরদ্দি সর্দ্দারের আস্তাবল। সেখানে গাড়ী মেরামত হয় বটে! আমার মনে ছিল না।”

 আমি বলিলাম, “সে আস্তাবল এখান হইতে কত দূর? এক ঘণ্টার মধ্যে গাড়ীখানি মেরামত হইবার সম্ভবনা আছে কি? যদি তাহা না হয়, তাহা হইলে আমাকে একখানা তাড়াটীয়া গাড়ী করিয়াই যাইতে হইবে।”

 কম্পাউণ্ডার জিজ্ঞাসিলেন, “কোথাও ডাক আছে না কি?”

 আ। আজ্ঞে হাঁ —একটা ফোড়া অস্ত্র করিতে হইবে।

 ক। কোথায় হইয়াছে?

 আ। বড় খারাপ স্থানেই ফোড়া হইয়াছে। হিপ জয়েণ্টের উপর, ব্যাপার গুরুতর।

 ক। আজ্ঞে হাঁ —ফোড়ার মুখ হইয়াছে?

 আ। কই না —ও রকম যায়গায় ফোড়া হইলে প্রায়ই মুখ হয় না। ঐ সকল ফোড়া অস্ত্র করা নিতান্ত সহজ নহে।

 বাধা দিয়া কম্পাউণ্ডার বাবু বলিয়া উঠিলেন, “সহজ, ও কথা মুখেও আনিবেন না। অপরে বলে বলুক, যাহারা জানে না, তাহারা বলিতে পারে; কিন্তু আপনি বা আমি ওরূপ কথা মুখে আনিতে পারি না। আমাদের বাবু একবার একটা ফোড়া অস্ত্র করিতে গিয়া একটা শিরা কাটিয়া ফেলিয়াছিলেন; শেষে হারিস সাহেব আসিয়া তবে রোগীকে বাঁচান।”

 আমি মনে মনে হাসিলাম। ভাবিলাম, ঔষধ ধরিয়াছে, এই যার কাজের কথা বলিতে আরম্ভ যাউক। এই চিন্তা করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনার নাম কি? আপনার সহিত আলাপ করিয়া বড় সন্তুষ্ট হইলাম। আজ কাল বাহ্যিক অনেক ভদ্রলোক দেখিতে পাওয়া যায় কিন্তু প্রকৃত ভদ্রলোকের সংখ্যা নিতান্ত অল্প।”

 কম্পাউণ্ডার বাবু ত মানুষ! তোষামোদ করিলে দেবতারাও বশীভূত হন। আমার মুখে প্রশংসা শুনিয়া তিনি পরম আপায়িত হইলেন। পরে হাসিতে হাসিতে উত্তর করিলেন, “আজ্ঞে আমার নাম মনমোহন।”

 আ। আপনার বাবুর নাম কি?

 ক। তারিণী প্রসাদ বোস এম, বি। “

 আমি আশ্চর্য্যান্বিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “সত্য না কি? এইটীই কি তারিণী বাবুর ডিসপেন্সারি? তাঁহার বাড়ীতেই ত ডিসপেন্সারি আছে?”

 ক। আজ্ঞে হাঁ, এটী তিনি নূতন খুলিয়াছেন। এখানে তিনি প্রায়ই থাকেন না। বিশেষ প্রয়োজন হইলে আমি তাঁহার বাড়ীতে সংবাদ পাঠাইয়া থাকি।

 আ। আপনি কতদিন কম্পাউণ্ডারি পাশ করিয়াছেন?

 ক। প্রায় পাঁচ বৎসর হইল।

 আ। এখানে কতদিন কর্ম্ম করিতেছেন?

 ক। প্রায় তিন বৎসর।

 আ। পূর্ব্বে আর কোথাও কার্য্য করিয়াছেন?

 ক।আজ্ঞে হাঁ—একটা প্যাটেণ্ট ঔষধের দোকানে।

 আ। এখানে কি আপনাকে সমস্ত দিনই থাকিতে হয়?

 ক।আজ্ঞে হাঁ- আমার বাসাও এই।

 আমি এতক্ষণ এই সুযোগই অন্বেষণ করিতেছিলাম। তখনই কম্পাউণ্ডার বাবুকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনি তবে এইখানেই থাকেন?”

 ক। আজ্ঞে হাঁ।

 আ। আপনার বাড়ীর পার্শ্বে অত পাহারাওয়ালা কেন বলিতে পারেন?

 ক। মুচির বাড়ীতে একটা খুন হইয়াছে।

 আমি চমকিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “খুন! কে করিল, কখন হইল?”

 ক। নিশ্চয়ই কাল রাত্রে এ কাণ্ড হইয়াছে। আমি ভাবিয়াছিলাম, মাগী আত্মহত্যা করিয়াছে। কিন্তু পুলিসের লোক অন্য কথা বলে। তাহারা বলিতেছে; কোন লোক উহাকে খুন করিয়া ঐরূপ ঝুলাইয়া রাখিয়া গিয়াছে।

 আ। হত্যাকারী ধরা পড়িয়াছে?

 ক। আজ্ঞে না —এখনও ধরা পড়ে নাই।

 আ। বাড়ীতে কি আর কোন লোক ছিল না?

 ক। আজ্ঞে না। রামামুচি ছোট বউকে লইয়া কোথায় গিয়াছিল।কাল প্রাতে বাড়ী ফিরিয়া এই ব্যাপার দেখিতে পায়।

 আ। রামা কে?

 ক। জুতাওয়ালা মুচি। তাহার দুই বিবাহ। বড় স্ত্রীই খুন হইয়াছে।

 আ। দুটী স্ত্রীই তবে বর্ত্তমান ছিল।

 ক। আজ্ঞে হাঁ।

 আ। কর্ত্তা বোধ হয় ছোটটীকেই বেশী ভালবাসিত। তাহার উপর যখন তাহাকেই লইয়াই বেড়াইতে গিয়াছিল, তখন বড় স্ত্রী যে অভিমান করিয়া গলায় দড়ী দিবে তাহাতে আর আশ্চর্য্য কি?

 বাধা দিয়া কম্পাউণ্ডার বাবু বলিলেন, “আজ্ঞে বিচক্ষণ ও বহুদর্শী লোক মাত্রেই ঐ কথা বলিতেছেন। কিন্তু পুলিসের তাহাতে বিশ্বাস হইতেছে না। তাহারা কেবল দোষীর অন্বেষণে নিযুক্ত আছে! জানি না, কতদূর কৃতকার্য্য হইবে। তাহাদের কার্য্য তাহারাই ভাল বোঝে।”

 আমি কিছুক্ষণ আর ঐ বিষয়ে কোন কথা জিজ্ঞাসা করিলাম না। সামান্য দুই চারিটা প্রশ্ন করিয়া আমি গাত্রোত্থান করিলাম। এমন ভাব দেখাইলাম, যেন বিলম্ব হওয়ায় আমি বড়ই ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি।

 আমাকে উঠিতে দেখিয়া কম্পাউণ্ডার বাবু আমার হাত ধরিয়া পুনরায় সেই চেয়ারে বসাইয়া দিলেন। পরে বলিলেন, “আর একটু অপেক্ষা করুন, আপনার কোচমান এখনই ফিরিয়া আসিবে। আপনার য়ত লোকের সহিত সাক্ষাৎ সকল দিন ঘটে না। যখন দয়া করিয়া পদধূলি দিয়াছেন, তখন আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন।”

 আমি তাঁহার অনুরোধ এড়াইতে পারিলাম না। পুনরায় সেই চেয়ারে বসিয়া পড়িলাম। কম্পাউণ্ডার বাবু একজন বেহারাকে তামাক দিতে বলিলেন।