বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রেম-পাগলিনী/চতুর্থ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

 সরকারি ডাক্তারথানায় সেই খাদ্যদ্রব্যগুলি পরীক্ষার জন্য রাখিয়া এবং মহম্মদের মৃতদেহ পরীক্ষার রিপোর্টের একখানি নকল লইয়া আমি থানায় ফিরিয়া আসিলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর স্নানাহার সমান করিলাম, পরে এক নিভৃতস্থানে বসিয়া চিন্তা করিতে লাগিলাম।

 ডাক্তারের রিপোর্টে প্রকাশ যে, জল বা জলীয় কোন খাদ্যদ্রব্যে তীব্র সেঁকোবিষ মিশ্রিত থাকায় মহম্মদের অকাল-মৃত্যু ঘটিয়াছে। কোথায় এবং কাহার দ্বারা সে বিষ মিশ্রিত হইল? যেখানে মহম্মদ নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে গিয়াছিল, সেখানে সে যে সকল খাদ্যদ্রব্য ভক্ষণ করিয়াছে, তাহাতে নিশ্চয়ই বিষ নাই, যদি থাকিত, তাহা হইলে আরও অনেকেরই তাহার দশা প্রাপ্ত হইত। যখন তাহা হয় নাই, তখন মহম্মদের ভগ্নীর বাড়ীতে কেবল যে তাহারই খাদ্যে বিষ মিশ্রিত হইয়াছিল, এমন কোন কথা নাই। তবে যদি তাহাকে আদর করিয়া স্বতন্ত্র বসাইয়া কোন লোক খাওয়াইয়া থাকেন, তাহা হইলে সন্দেহের কথা বটে। কিন্তু আবদুল সাদেকের মুখে যাহা শুনিয়াছিলেন, তাহাতে মহম্মদের সেরূপ আদর হয় নাই; সে অপরাপর নিমন্ত্রিত লোকদিগের সহিত এক পংক্তিতে বসিয়া আহার করিয়াছিল, এইরূপই বোধ হইয়াছিল। সুতরাং যদি আবদুলপ্রদত্ত খাবারগুলিতে বিষ না থাকে, যাহা খুব সম্ভব নাই, তাহা হইলে যে সোঁকোবিষ দ্বারা মহম্মদের মৃত্যু হইয়াছে, সে বিষ কোথা হইতে আসিল? বাড়ীতে ফিরিয়া আসিয়া সে কিছু ভক্ষণ করিয়াছিল কি না, তাহা জানা আবশ্যক।

 সময়মত সরকারি ডাক্তারখানা হইতে একখানি পত্র আসিল। পত্রখানি আমারই, খুলিয়া পাঠ করতঃ জানিতে পারিলাম, আবদুল যে খাদ্য-সামগ্রী আমার সহিত পাঠাইয়া দিয়াছেন, সেগুলি বিষশূন্য। মহম্মদের বাড়ীতে পুনরায় গমন করার আবশ্যক বিবেচনায় অগ্রসর হইলাম। একবার ভাবিলাম, ছদ্মবেশে যাওয়াই উচিত, কিন্তু কিছুক্ষণ পরে পুলিসের পোষাক পরিয়াই গমন করিলাম।

 মলঙ্গালেন নামক গলির শেষ প্রান্তে মহম্মদের বাড়ী। জমীদারের নিকট হইতে জমী খাজনা লইয়া নিজ ব্যয়ে সে সেই খোলার বাড়ী প্রস্তুত কর।ইয়াছিল। উৎকৃষ্ট আতসবাজী প্রস্তুত করিতে পারিত বলিয়া অনেক সৌখিন লোকের সে পরিচিত ছিল এবং নূতন নূতন বাজী প্রস্তুত করিয়া তাঁহাদিগকে দেখাইয়া যথেষ্ট অর্থ উপার্জ্জন করিত। মহম্মদের কখনও অর্থের অভাব হয় নাই।

 মলঙ্গা লেনে প্রবেশ করিলেই মহম্মদের বাড়ীখানি দেখিতে পাওয়া যায়। আমি দূর হইতে দেখিলাম, এক যুবতী তাহার বাড়ীর সদর দরজায় দাঁড়াইয়া অপরের সহিত হাস্য-পরিহাস করিতেছে। আমার কেমন সন্দেহ হইল, আমি আর অগ্রসর না হইয়া নিকটস্থ এক বাড়ীর দরজার সম্মুখে কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিলাম। দেখিলাম, একজন যুবক তাহার দিকট গিয়া কি কথা কহিতে লাগিল।

 ঠিক সেই সময় আর একজন লোক সেই গলির ভিতর প্রবেশ করিল। লোকটা যেন পরিচিত বলিয়া বোধ হইল। আমি তাহাকে নিকটে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “বাপু! মহম্মদ বাজীওয়ালার বাড়ীর দরজায় ঐ স্ত্রীলোকটাকে চেন?”

 সে একবারমাত্র নির্দ্দিষ্ট দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া হাসিতে হাসিতে বলিল, “উনিই মহম্মদের চতুর্থ পত্নী।”

 আ। মহম্মদ ত মারা পড়িয়াছে, তাহার স্ত্রীর এত আনন্দ?

 লো। উনি আদরের স্ত্রী ছিলেন। স্বামীর ভাল মন্দের সঙ্গে উহার বড় একটা সম্পর্ক নাই।

 আ। চরিত্র কেমন?

 লো। আপনি স্বচক্ষেই দেখুন। কাল যাহার স্বামী-বিয়োগ হইয়াছে, সে যখন আজ অপর পুরুষের সহিত হাসি তামাস। করিতেছে, তখন আর আমার বলিবার প্রয়োজন নাই।

 এই বলিয়া সে হাসিতে হাসিতে চলিয়া গেল। আমিও আর সেখানে অপেক্ষা না করিয়া! মহম্মদের বাড়ীর দিকে গমন করিলাম।

 বাড়ীর দরজার নিকটে যাইবামাত্র সেই যুবক দৌড়িয়া পলায়ন করিল। যুবতীও তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিল। আমি একা বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিলাম।

 কিছুক্ষণ পরে মহম্মদের স্ত্রী এক প্রৌঢ়াকে সঙ্গে করিয়া পুনরায় তথায় আগমন করিল। আমি তখন প্রৌঢ়াকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “মহম্মদের স্ত্রী এইমাত্র কোথায় গিয়াছিল? এ বাড়ীতে যখন একটা হত্যাকাণ্ড হইয়াছে, তখন সকল সময় একজন লোক এখানে থাকা নিতান্ত আবশ্যক।”

 প্রৌঢ়া গম্ভীরভাবে উত্তর করিল, “মালকী এতক্ষণ এখানেই আপনাকে দেখিবামাত্র দৌড়িয়া আমাকে ডাকিতে গিয়াছিল।”

 আ। কেন? আমি ত আর বাঘ নহি?

 প্রৌ। আপনার সহিত কথা কহিতে উহার লজ্জা করে।

 আ। কেন? অপরের সহিত কথা কহিতে লজ্জা হয় না?

 প্রৌ। মাল্‌কা যুবতী—সে কেমন করিয়া একা আপনার সম্মুখে দাঁড়াইয়া কথা কহিবে?

 আ। সত্য। কিন্তু আমি যে এইমাত্র উহাকে অপর একজন যুবকের সহিত কথা কহিতে দেখিলাম।

 প্রৌঢ়া সহসা কোন উত্তর দিল না। সে মালকার দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “বাবু কি বলিতেছেন, শুনিতেছ? কাহার সহিত কথা কহিতেছিলে?”

 মাল্‌কা কিছুমাত্র চিন্তা না করিয়া তখনই উত্তর দিল, “কই— আমি আবার কাহার সহিত কথা কহিয়াছি? আমি ত সেই অবধি কাঁদিয়াই বেড়াইতেছি। আমার কি এখন কথা কহিবার সময়? আমার দশা কি হইবে বল দেখি? আমর ভরণ-পোষণ কোথা হইতে সংগ্রহ করিব, ভাবিয়া দেখ দেখি? বাবুকে দেখিয়াই আমি তোমার কাছে দৌড়িয়া গিয়াছিলাম।”

 মাল্‌কা। এই কথাগুলি এমনভাবে বলিয়াছিল যে, আমি তাহার সকল কথাই শুনিতে পাইলাম। প্রৌঢ়াকে আর কষ্ট না দিয়া আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “তবে এখানে যে যুবক দাঁড়াইয়াছিল, সে কে?”

 মাল্‌কা নিজেই উত্তর করিল, “তাহার নাম হোসেন। সে আমাদের কর্ত্তাকে “মামা” বলিয়া ডাকিত। সম্বন্ধে আমি তাহার মামী। সে এই বাড়ীর দরজায় দাঁড়াইয়া হাসিতেছিল বটে। কিন্তু সে আমায় দেখিয়া হাসে নাই।”

 আ। তবে কাহাকে দেখিয়া হাসিয়াছিল? সেখানে তখন ত আর কোন লোক ছিল না?

 মা। ছিল- আমাদের পার্শ্বের বাড়ীর ছাদে মতিবিবি দাঁড়াইয়া ছিলেন। তিনি হোসেনকে বড় ভালবাসেন।

 আ। মতিবিবি কে? সধবা কি বিধবা?

 মা। সধবা।

 আ। বয়স কত?

 মা। প্রায় ত্রিশ বৎসর।

 আ। হোসেনের বয়স ও ত প্রায় ঐরূপ?

 মা। আজ্ঞে হাঁ।

 আ। মতিবিবির স্বামী কি কার্য্য করেন?

 মা। কিছুই নয়। তিনি বড়লোক, পয়সার অভাব নাই।

 আমি আর কোন কথা না বলিয়া তখনই তথা হইতে বাহির হইলাম এবং মতিবিবির বাড়ীতে গমন করিলাম। প্রৌঢ়ার নিকট হইতে মতিবিবির স্বামীর নাম জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম, তাঁহার নাম হাফেজআলি।

 বাড়ীতে প্রবেশ করিবামাত্র একজন ভৃত্য আমার নিকট আসিয়া আমার আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করিল। আমি তাহাকে হাফেজআলি বাড়ীতে আছেন কি না জিজ্ঞাসা করিলাম।

 ভৃত্যের মুখে শুনিলাম, তিনি বাড়ীতে আছেন। ভৃত্যকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “এখন তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ হইতে পারে?”

 আমার পুলিসের বেশ দেখিয়াই হউক বা যে কোন কারণে হউক, ভৃত্য তখনই বাড়ীর ভিতর গেল এবং সত্বরে ফিরিয়া আসিয়া আমাকে পরম সমাদরে উপরে লইয়া গেল।

 উপরে উঠিয়াই দেখিলাম, এক প্রকাণ্ড দালান। তাহারই মধ্যস্থলে একখানা প্রকাণ্ড সতরঞ্চের উপর একটা বড় টেবিল। টেবিলের চারিদিকে দশ বারখানি ভাল ভাল চেয়ার। টেবিলের উপর তিন চারিখানি সংবাদপত্র ও পাঁচ ছয়খানি পুস্তক ছিল। তিনজন লোক সেইস্থানে বসিয়া সংবাদপত্র পাঠে নিযুক্ত ছিলেন। ভৃত্য আমাকে একেবারে সেইখানে লইয়া গেল এবং একজন সম্ভ্রান্ত মুসলমানের দিকে চাহিয়া বলিল, “ইনি আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছেন।”

 ভৃত্যের কথা শেষ হইতে না হইতে উপস্থিত সকলেই চেয়ার ছাড়িয়া দাঁড়াইয়া উঠিলেন এবং অতি যত্ন করিয়া আমাকে একখানি চেয়ারে বসিতে অনুরোধ করিলেন। আমি অগ্রে অতি বিনীতভাবে সকলকে বসিতে বলিয়া স্বয়ং নিদ্দিষ্ট চেয়ারে উপবেশন করিলাম।

 কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিলে পর আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনাদের মধ্যে মুনসী হাফেজআলি কে?”

 ভৃত্য যাঁহার দিকে চাহিয়া আমাকে দেখাইয়াছিল, তিনি অতি নম্রভাবে উত্তর করিলেন, “এই হতভাগ্যের নামই হাফেজআলি। বলুন, আপনার কোন্ কার্য্য করিতে হইবে?”

 আমি মুসলমানী কায়দা দেখিয়া আন্তরিক সন্তুষ্ট হইলাম। ঈষৎ হাসিতে হাসিতে বলিলাম, “অমন কথা বলিবেন না, আপনি যদি হতভাগ্য হন, তাহা হইলে পৃথিবীর আর সকলে কি? ঈশ্বরের ইচ্ছার আপনার যথেষ্ট আছে—উদরান্নের জন্য আপনাকে লালায়িত হইতে হয় না। আপনি যদি হতভাগ্য, তবে এ পৃথিবীতে সৌভাগ্যবান কে?”

 হাফেজআলি কেবল ধনবান নহেন, তিনি একজন জ্ঞানী ব্যক্তি। তিনিও হাসিতে হাসিতে উত্তর করিলেন, “অর্থ ই একমাত্র সৌভাগ্যের কারণ নহে। স্বীকার করি, আমার অর্থ আছে, চাকরি করিয়া উপরান্নের সংস্থান করিতে হয় না, প্রকাণ্ড বাড়ীতে বাস করিতেছি, উৎকৃষ্ট উপাদেয় খাদ্য ভক্ষণ করিতেছি, কিন্তু তত্রাপিও আমি হতভাগ্য। অর্থ হইলেই যে লোক সৌভাগ্যবান হয় না, আমিই তাহার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।”

 হাফেজআলির কথাগুলি সম্পূর্ণ সত্য, কিন্তু কেন যে তিনি একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত বিশেষ পুলিস-কর্ম্মচারীর নিকট এত কথা বলিলেন, তাহা বুঝিতে পারিলাম না। তিনি যে আন্তরিক অসুখী, তাঁহার মনে যে কোন ভয়ানক দুঃখের আগুন জ্বলিতেছে, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু আমি সাহস করিয়া সে সকল কথা জিজ্ঞাসা করিতে পারিলাম না।

 কোন উত্তর করিলাম না দেখিয়া, তিনি আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন, “মনের প্রকৃত অসুখ নিবারণ করিবার জন্য অনেক সময় কৃত্রিম আমোদে মত্ত থাকিতে হয়। আমি যে বন্ধু-বান্ধব লইয়া সদাই এইরূপ আনন্দে মত্ত থাকি, সে কেবল আমার মনের অসুখ দূর করিবার জন্য, আমি এ সকল আমোদের প্রকৃত আনন্দ উপভোগ করিতেছি তাহা মনেও করিবেন না।”

 হাফেজআলি যে সত্য সত্যই বড়ই ব্যথিত তাহা তাঁহার কথাতেই বুঝিতে পারিলাম। কিন্তু কেন তিনি এমন কথা বলেন, কেন এত দুঃখ করিতেছেন, তাঁহার এত কষ্ট কি জন্য? এই সকল কথা জানিবার জন্য আমার বড়ই কৌতূহল জন্মিল। আামি অতি বিনীতভাবে বলিলাম, “আপনার সহিত আমার কিছু প্রয়োজন আছে। যদি বিরক্ত না হন, তাহা হইলে কিছুক্ষণ নির্জ্জনে আপনার সহিত কথা কহিতে ইচ্ছা করি।”

 আমার কথায় অপর দুইজন লোক যেন বিরক্ত হইলেন; তাঁহারা আমার দিকে রাগান্বিতভাবে চাহিয়া রহিলেন। কিন্তু হাফেজআলি সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করিলেন না। তিনি আমার দিকে চাহিয়া ঈষৎ হাসিয়া গাত্রোত্থান করিলেন; পরে বলিলেন, “আসুন, আমরা পার্শ্বের ঘরে যাই।”