বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রেম-পাগলিনী/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

 রাত্রি প্রায় আট্‌টা। আকাশে চন্দ্র নাই, ঘরের মধ্যে সেই জলচৌকির উপর একটি পিত্তলের পিলসুজে মৃত্তিকার প্রদীপ হইতে অতি ক্ষীণ আলোক বাহির হইয়াছিল। সেই আলোকে পরীক্ষার সুবিধা হইবে না জানিয়া, একজন কনষ্টেবলকে একটা আলোক সংগ্রহ করিতে আদেশ করিলাম। কিছুক্ষণ পরেই সে একটা প্রকাণ্ড মশাল লইয়া গৃহমধ্যে প্রবেশ করিল। ঘরটী আলোকিত হইল।

 মৃতদেহ পরীক্ষা করিয়া কোন স্থানে কোনরূপ আঘাতের চিহ্ন দেখিতে পাইলাম না। গলদেশ কোনরূপ স্ফীত বলিয়া বোধ হইল না। চক্ষুদ্বয় ঘোর রক্তবর্ণ ও দৃষ্টি ঊর্দ্ধ হইলেও চক্ষু কোটর হইতে বহির্গত হয় নাই। মুখে তখনও সামান্য ফেণা লাগিয়া ছিল। মুখের ভঙ্গী অতি ভয়ানক। অল্পবয়স্ক বালক বালিকাগণ সে মুখ দেখিয়া আতঙ্কে চীৎকার করিয়া পলায়ন করিবে।

 পরীক্ষা দ্বারা যতদূর বুঝিতে পারিলাম, তাহাতে বিষপানে মৃত্যু বলিয়াই বোধ হইল। এখন কোন্ বিষে তাহার মৃত্যু তাহাই দেখিতে হইবে। উহা আমার অসাধ্য; লাস সরকারি ডাক্তারের নিকট পাঠাইতে হইবে। কিন্তু তাহার পূর্ব্বেই আমাকে কতকগুলি বিষয় জানিতে হইয়াছিল।

 পুলিস-কর্ম্মচারীর মুখে শুনিয়াছিলাম, যুবতী সেই বৃদ্ধের স্ত্রী। আমার কেমন সন্দেহ হইল;— বৃদ্ধের বয়স ষাইট বৎসর, যুবতীর বয়স পনর বৎসরের অধিক নহে, বৃদ্ধের বয়সের সিকি অর্থাৎ তাহার পৌত্রীর বয়সের সমান; বড়ই বিসদৃশ বলিয়া বোধ হইল। জিজ্ঞাসা করিলাম, বৃদ্ধের কয় বিবাহ? উত্তরে প্রৌঢ়ার মুখে শুনিলাম, শত্রুর মুখে ছাই দিয়া বৃদ্ধ উপর্যুপরি চারিটী বিবাহ করিয়াছে। বর্ত্তমান যুবতী তাহার চতুর্থ স্ত্রী। সৌভাগ্য বশতই বলুন, আর দুর্ভাগ্য বশতই বলুন, মহম্মদের একটাও সন্তান জন্মে নাই।

 এই সকল কথা অবগত হইয়া আমি প্রৌঢ়ার দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, যাঁহার বাড়ীতে মহম্মদ আজ নিমন্ত্রণে গিয়াছিল, তিনি মহম্মদের কে?

 প্রৌ। ভগ্নী।

 আ। কেমন ভগ্নী? সহোদরা?  প্রৌঢ়া আমার মুখের দিকে হাঁ করিয়া চাহিয়া রহিল। কিন্তু খুবতী ঘোম্‌টার ভিতর হইতে অতি মৃদুস্বরে উত্তর দিল, “হাঁ—মার পেটের বোন।”

 যদিও কথাগুলি মৃদুস্বরে উচ্চারিত হইয়াছিল, তথাপি আমি শুনিতে পাইলাম। প্রৌঢ়াও তখন তাহার কথায় সায় দিয়া বলিল, “হাঁ হাঁ, রমজানী মহম্মদের মার পেটের বোন।

 আমি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলাম, “সেখানে কি উপলক্ষে এই নিমন্ত্রণ?”

 প্রৌঢ় এবার আমার কথা বুঝিতে পারিল। সে তথনই উত্তর করিল, “ভগ্নীর বিবাহ।”

 আ। কবে? হইয়া গিয়াছে?

 প্রৌ। না,—এখন ও হয় নাই; কার্ত্তিক মাসের আজ চার তারিখ, মাসের দশ দিনে বিবাহ। আজ হইতে আমোদ আহ্লাদ খাওয়া ইত্যাদি আরম্ভ। কিন্তু হায়, মহম্মদের অদৃষ্টে নাই; বেচারার কেন যে এমন হইল, কে বলিতে পারে?”

 আ। আজ কখন মহম্মদ সেখানে গিয়াছিল?

 প্রৌ। ইনি বলিতেছেন, বেলা প্রায় দশটার সময়।

 আ। তুমি কে? তুমি কি এ বাড়ীর লোক নও?

 প্রৌ। আজ্ঞে না—অমি এই পাড়াতেই বাস করি বটে কিন্তু এ বাড়ীর লোক নহি।

 আ। তবে তুমি এখানে কেন?

 প্রৌ! যখন মহম্মদের মুখ দিয়া ফেণা বাহির হইতেছিল এবং সে গোঁ গোঁ শব্দ করিতেছিল, তখনই মালকা ভয়ে আমাকে ডাকিয়া আনিল, আমি সেই সময় হইতেই এখানে আছি।

 আমি আশ্চর্য্যান্বিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “মাল্‌কা কে?”

 প্রৌ। মহম্মদের এই স্ত্রীর নাম মাল্‌কা।

 আ। তুমি এখানে আসিয়া কি দেখিলে?

 প্রৌঢ়া যে যে কথা বলিল, পাঠক মহাশয় তাহা পূর্ব্বেই অবগত আছেন।

 প্রৌঢ়ার শেষ কথা শুনিয়া আমি আর কোন কথা জিজ্ঞাসা করিলাম না। মৃতদেহ সত্বর সরকারী ডাক্তারখানায় পাঠাইয়া দিয়া আমি থানায় ফিরিয়া গেলাম।